



তখন কোচবিহারে থাকতাম। বয়েস ৯-১০ হবে। স্কুলের ছুটি কখন হবে তার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকতাম। আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই ছিলো একটা আয়তাকার মাঠ। বাবা বাড়ি ফেরার আগে মাঠে খেলতে যেতাম। ওখানে অনেক রকম খেলা হতো। কখনও ক্রিকেট, কখনও কিতকিত কখনও এক্কাদোক্কা এই সব। আর কুচবিহারে স্কুল সংলগ্ন মাঠে অফিস লীগের খেলা হতো। সেখানে মাঝে মাঝে ফুটবল খেলা দেখতে যেতাম। খেলা দেখে বাড়ি ফিরতে দেরি হতো। দেরি করে ফিরলে বকুনি খেতাম।
একদিন খেলার মাঠে এক কাণ্ড ঘটলো। সেটা ছিলো কর্নার কিক। গোল মুখে সব জটলা করে ছিলো। জটলা থেকে একজন হেড দিতে গিয়ে পড়ে গেল। পড়ে যাওয়ার পর লোকটা দেখি আর উঠছে না। সবাই দেখি লোকটাকে চ্যাংদোলা করে মাঠের বাইরে নিয়ে গেল। খেলা তখন বন্ধ। একজন কার্ডিয়াক ম্যাসেজ দিচ্ছিল। মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিচ্ছিল। অ্যামবুলেন্সও এল। শুনলাম লোকটার হৃৎপিন্ড বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরলাম। মন খারাপ নিয়ে। বাবা অফিস থেকে ফিরে খবর নিয়ে এল লোকটা মারা গেছে। সেই থেকে ফুটবল খেলা নিয়ে মনে একটা ভয় ঢুকে গেছিলো।
আবার জেনকিন্স স্কুলের একটা মাঠ ছিলো, সেখানে ক্রিকেট খেলা হতো। যখন ক্লাস থাকতো না তখন ক্রিকেট খেলা দেখতাম। কয়েক জন ভালো খেলতো যেমল হাবুলদা, ময়না সুমনদা ইত্যাদি। আমাদের যিনি গেমস টিচার ছিলেন শৈলেন স্যার ওরফে ক্যাবলা দত্ত, ওনাকে কুচবিহারের মহারাজা কলকাতার খেলার মাঠ থেকে তুলে কুচবিহারে নিয়ে এসেছিলেন। ওনার তত্ত্বাবধানে ছেলেদের খেলার প্রশিক্ষণ চলতো।
গরমের ছুটির সময় এলে খুব ভালো সময় কাটতো। অপেক্ষা করতাম কখন বাবা অফিস যাবেন। যেই চলে যেতেন অমনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তাম। আমার দাদা, আমি, কল্যাণদা, বিশু, নীরা আর কয়েকটা মেয়েও খেলতে নামতো। কলুদার পায়ে সমস্যা ছিল। ও দাঁড়িয়ে খেলতে পারতো না। মোড়ায় বসে খেলতো। আমরা বল করতাম আর কলুদা ব্যাট নিয়ে খেলতো। সে এক দৃশ্য। খুব কষ্ট করে খেলতো আর উৎসাহ ছিলো অপরিসীম। একদিন শুনলাম কলুদাকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। যাবার সময় কলুদার সে কি অনাবিল হাসি। এবার ফিরে এসে তোদের সামনে দাঁডিয়ে খেলবো। আমরা ভাবছি কলুদা এল বলে… মাস পেরিয়ে গেল। কলুদার পাত্তা নেই। সেই যে গেল…। পরে জানলাম কলুদার আর কোনো দিন ফেরা হবে না।
কলুদার এক দিদি আর দুই বোন ছিল। এক বোন আমার খুব বন্ধু ছিল ভারতী (ভাও)। ওর সাথে এক্কাদোক্কা খেলতাম। ওদের বাড়ির রান্নাঘর সংলগ্ন একটা আম গাছ ছিলো। দুপুর হলেই ডাকতো। ভাও সিঁড়ি ধরতো আর আমি সিঁড়ি বেয়ে রান্নাঘরের চালে উঠে যেতাম। কাঁচা আম পাকা আম সব রকম আম পাড়তাম। ও বলতো বেশি আম পাড়িস না, জানতে পারলে মা বকা দেবে… শোনে আর কে? আম গাছ তো আমার মুঠোয়। পাকা আমগুলো ওখানেই সাবাড় করতাম। ও বলতো ওকে না দিলে সিঁড়ি ও সরিয়ে রাখবে। সত্যি একদিন ও সিঁড়ি সরিয়ে রাখলো আমি আর চাল থেকে নামতে পারছিলাম না। মনে মনে গজরাচ্ছিলাম। শেষদিকে থাকতে না পেরে রান্নাঘরের দেওয়াল বেয়ে নামতে গেলাম আর পড়ে গিয়ে পায়ে চোট পেলাম। গোড়ালি ফুলে গিয়েছে। ভাও দেখি ছুট্টে গিয়ে চুন-হলুদ গরম করে নিয়ে এল। খুব আদর করে লাগিযে দিলো। কাকুতি মিনতি করে বলছিলো কাকীমাকে বলিস না। যতো বলছিলো আমি ওকে চোখ রাঙিয়ে বলছিলাম তোর মাকে বলে দেবো। ও হু-হু করে কেঁদে ফেললো। সে কী কান্না। শেষমেশ ওর চিবুক ধরে ওর চোখের জল মুছে দিলাম। আমার বইপত্র সব আগোছালো থাকতো ও সেগুলোকে বেশ গুছিয়ে দিতো। ওর বাবা কুচবিহারের রাজবাড়িতে কাজ করতেন। বই মলাট দেবার জন্য মোটা পেপার নিযে আসতেন। ভারতী আমার বইয়ের মলাট, খাতার কভার করে দিতো। আর মাঝে মাঝে আচার করে নিয়ে আসতো। বিকেল হলেই এ আমাকে তোর্ষা নদীর কাছে বেড়াতে নিয়ে যেতো। সেখানে কেশব সেন আর সুনীতি দেবীর স্মৃতিসৌধ ছিলো। সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে ছুটে বাড়ি ফিরতাম। বেশিরভাগ দিন ওই আগে দৌড়ে ফিরতো। এই ভাবেই চলছিলো। কলুদা যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেল সেদিন থেকে ওকে খুব মনমরা হয়ে যেতে দেখলাম। ও আর সেভাবে খেলতে আসতো না। এইভাবেই চলছিলো… তার পর অ্যানুয়াল পরীক্ষা চলে এল।
কুচবিহারের রাসমেলা খুব বিখ্যাত। নভেম্বর মাসে রাসমেলা। মদনমোহন বাড়িতে মহারাজা ভুপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুর এসে রাসমেলার উদ্বোধন করলেন। সেকি উদ্দীপনা। মেলাতে অনেক কিছু পাওয়া যায়। মঠ থেকে পাঁচমেশালি। স্কুল যাওয়ার পথে রাসমেলার মাঠ পড়তো। কারিগররা প্রায় একমাস ধরে মেলাপ্রাঙ্গণের কাজ করতো। সার্কাসের দলও আসতো। অমর সার্কাস বাবার সাথে দেখতে গিয়েছিলাম। ভারতীকে একদিন মেলাতে যাবার জন্য বললাম। ওকে ফেলে সার্কাসে গিয়েছিলাম বলে ও খুব রাগ করেছিলো। ওইদিন ওর পরীক্ষা ছিল বলে যেতে পারেনি সেই জন্য ওকে পরের দিন নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তাতে সে না বলে দিলো। পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। ডিসেম্বরে পরীক্ষা হয়ে গেল। এর মধ্যে নাট্যকার মহেন্দ্র গুপ্ত আর ওনার মেয়ে ইভাদি আমাদের বাড়ি এলেন। মহেন্দ্র গুপ্তকে জেঠু বলতাম। একদিন আমরা ওনার যাত্রা দেখতে গিয়েছিলাম। ইভাদিকে আমাদের বাড়িতে রেখে উনি কলকাতা চলে গেলেন। এরমধ্যে একদিন ইভাদিকে নিযে জয়ন্তী, রাজাভাত খাওয়া, মাথাভাঙা বেড়াতে গিয়েছিলাম। রাজাভাত খাওয়ার ফরেস্ট বাংলোতে এক রাত কাটালাম। সেই জঙ্গলে থাকার অনুভূতি ভুলবার নয়। হাতি দেখেছিলাম। আর থেকে থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ। হ্যাজাকের আলোয় পোকারা ঘিরে রেখেছিলো। নৈঃশব্দ্যর মধ্যে ঝিঁঝিঁর আওয়াজ সত্যি এক অনির্বচনীয় পরিবেশ।
সকালে বেরিয়ে জয়ন্তী নদীর ধারে গেলাম। বড় বড় নুড়িপাথরের উপর পাহাড়ি নদী আপন বেগে বয়ে চলেছে। জলের উপর পা ভিজিয়ে নিলাম। প্রকৃতির মাঝে দিন দুয়েক থেকে বাড়ি ফিরলাম।
এর পর পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলো। পরীক্ষায় সেকেন্ড হলাম। সেবার কুচবিহারের রানী জিনিয়া নারায়ণ প্রাইজ দিতে এসেছিলেন। দুবছরের প্রাইজ দশ বারোটা বই পেয়েছিলাম। ভারতীকে বলেছিলাম প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের দিন যেতে। ও গেল না। ইভাদি জানতে পেরে আমাদের মধ্যে ভাব করানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। আমার খুব ইচ্ছা করতো ওর সাথে কথা বলার। ইভাদিও চলে গেলেন।
দিন এইভাবে চলতে লাগলো।
বাবার ছিলো বদলির চাকরি। বাবার কলকাতায় বদলি হলো। স্কুলও আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। কলকাতার স্কুলে ভর্তি হবো। কুচবিহার জেনকিন্স স্কুলেও বেশ কজন বন্ধু হয়েছিলো। ওদের ছেড়ে যেতে মন যেতে চাইছিলো না। স্কুলের কয়েকজন মাষ্টারমশাইও খুব ভালোবাসতেন। স্কুলে আমার ফেয়ারওয়েল হলো। কলকাতা আমরা এরোপ্লেনে ফিরেছিলাম। যাবার আগের দিন ভাও-এর সাথে দেখা হলো। ওরও মন খুব খারাপ হয়েছিলো। কী দারুণ চিন্তা …এরোপ্লেন থেকে দেখতে পেলে চিঠি ফেলে দেবো। বাড়ির পাশের মাঠে দাড়িয়ে থেকো…
চিঠি ফেলা আর হলো না।