



বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি আদ্যন্ত রোমান্টিক আর প্রকৃতিপ্রেমিক। রূঢ় রুক্ষ বাস্তব নয় ভাবুকতার জগতেই নাকি তাঁর বেশি ঘোরাফেরা। এই ধরনের ব্যাখ্যা খুবই প্রচলিত। তাঁর গল্পগুলি ফিরে পড়তে গিয়ে মনে হল এভাবে ছাপ মেরে দেওয়াতে কোথাও একটা মস্ত ভুল থেকে যাচ্ছে। বাস্তবকে দেখার দৃষ্টি সবার সমান হয় না। এক একজন লেখক এক এক ভাবে দেখে থাকেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিভূতিভূষণের দেখার তফাত আছে, আর সেটাই স্বাভাবিক। ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ পড়তে গিয়ে অবাক লেগেছিল। একেবারে সাধারণ ভাতের হোটেলের একজন গরিব রাঁধুনির সুখদুঃখ আশ্চর্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন – শুধু এইমাত্র নয়। তার রোজকার রান্নাবান্নার উদ্যোগ আয়োজন, খুঁটিনাটি বিচিত্র পুঙ্খতার এমন বর্ণনা কী করে সম্ভব হল তাই ভেবেছিলাম। একটি পেশার সঙ্গে অনেক অভ্যাস, বিশেষ দক্ষতা, মনোযোগ জড়িয়ে থাকে। হাজারী ঠাকুর যে এমন জীবন্ত হয়ে উঠেছে তার একটা কারণ রাঁধুনি বামুনের পেশাকে বিভূতিভূষণ অসাধারণ তন্নিষ্ঠতায় এঁকে দিয়েছিলেন। তীব্র ও গভীর সমানুভূতি ছাড়া এমনটা সম্ভব নয়। আজ এই লেখায় অবশ্য উপন্যাস নয়, তাঁর ছোটোগল্পের দিকেই দৃষ্টি রাখবো আমরা। ১৮৯৪ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত বহমান তাঁর স্বল্পায়ু জীবন। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘উপেক্ষিতা’ প্রকাশ পাচ্ছে ১৯২১ সালে। স্বাধীনতার পর মাত্র বছর তিনেক বেঁচেছিলেন বিভূতিভূষণ। সুতরাং ভারতের ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ কয়েক দশকের পটভূমি প্রধানত দেখা দিয়েছে তাঁর ছোটোগল্পে। ঐতিহাসিক গল্পগুলির কথা স্বভাবতই এখানে বলছি না। বাংলা পার হয়ে তখনকার বিহারের পটেও পাড়ি দিয়েছে তাঁর গল্প।
সাধারণ মানুষ কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত, অশিক্ষিত, অল্প-শিক্ষিত বা সুশিক্ষিত মানুষের উপার্জনের পথগুলির চেহারা কেমন ছিল, উপার্জন ও পারিবারিক জীবন মিলিয়ে কীভাবে দিন চলত অথবা চলত না, গ্রাম, মফস্বল, মাঝারি ও বড়ো শহরের সামাজিক বুনোট কেমন ছিল – বিভূতিভূষণের গল্পে তার তথ্যবহুল চিত্রায়ন ঘটেছে। তাঁর লেখনীর জাদু-ছোঁয়ায় বিবর্ণ যাপনচিত্র আকর্ষণীয় চলচ্ছবি হয়ে উঠেছে। সাহিত্য হিসেবে তো বটেই, আর্থসামাজিক ইতিহাসের দিক দিয়েও তার মূল্য কম নয়।
নিজে প্রথম জীবন থেকেই প্রধানত শিক্ষকতা করেছেন তাই শিক্ষকচরিত্র তাঁর গল্পে সাধারণভাবে আসারই কথা। বাঙালি মধ্যবিত্তশ্রেণীর একটি প্রধান পেশা ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই শিক্ষকতা। এই পরিচিত পেশাকে একটু পাশে সরিয়ে আমরা একটু অন্যধরনের পেশাগুলিকে লক্ষ্য করতে পারি। ‘ক্যানভাসার কৃষ্ণলাল’ চব্বিশ বছর ধরে সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত টিনের স্যুটকেস হাতে শিয়ালদা থেকে বারাসত এবং বারাসত থেকে শিয়ালদা পর্যন্ত তাঁতের মাকুর মতো যাতায়াত করে দত্তপুকুরের বাতের তেল বিক্রি করত। ট্রেনের হকার – এই পেশাটি কবে থেকে বেকার যুবকদের আশ্রয় হল তার খোঁজ নিলে আমরা হয়তো উনিশ শতকের শেষে গিয়ে পৌঁছবো। কিছুটা পড়াশোনা না থাকলে এই পেশার টেঁকা মুশকিল। তার সঙ্গে চাই চটকদারি বাক্যবিন্যাসের ক্ষমতা। যাকে বলে ‘স্ট্রীট স্মার্ট’ – সেই নাগরিক চতুরালি এই পেশায় জরুরি।
এই সমস্ত গুণাবলি পুরো দস্তুর থাকা সত্ত্বেও ক্যাশ সময়মতো না মেলানোর অপরাধে ইন্ডিয়ান ড্রাগ সিন্ডিকেট থেকে কৃষ্ণলালের চাকরিটি চলে যায়। বিভূতিভূষণ কোথায় কীভাবে কৃষ্ণলালের মতো চরিত্রকে শুধু দেখলেন তাই নয়, ঘনিষ্ঠভাবে চিনলেন জানতে ইচ্ছে করে। সে মেসে থাকে, পাইস হোটেলে খায়, কলকাতার দ্রুতগতির কর্মচঞ্চল জীবনের উচ্ছ্বাস তার শিরায় শিরায়। দেশের বাড়িতে দুদিনের জন্যও তার মন টেঁকে না। মনে হয় গ্রামে সবাই যেন ঘুমিয়ে আছে। কলকাতার পতিতাপল্লীতে তার প্রেয়সী গোলাপীর বাস। কৃষ্ণলাল আর গোলাপী বিবাহিত দম্পতি না হলেও তাদের মধ্যে পারস্পরিক টানের অভাব নেই। তাদের যৌথ জীবনের জোয়ার ভাঁটার কী বাস্তব বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। কৃষ্ণলাল তখন ক্যানভাসারের পেশায় দুহাতে রোজগার করছে। গোলাপীর ঘর ভরে উঠছে দেরাজ, আয়না, টেবিল হারমোনিয়াম, জোড়া জোড়া শাড়ি এমনকি কলের গানে। তারপর কৃষ্ণলালের রোজগারে মন্দা এল, গোলাপীরও বয়স হল। তবু ত্রিশ বছর তারা একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত আছে। চাকরি যাবার পরেও কৃষ্ণলালের ওপর গোলাপীর আস্থা কমেনি।
‘তোমার মতো কারও হয়না, আমি তো কতই দেখলাম দাঁতের মাজনের, ওষুধের ফিরিওয়ালা – আমাদের এই গলির মুখে হারমোনিয়াম গলায় বেঁধে নাচে, বক্তিমে দেয় পোড়ারমুখোরা – কিন্তু সে সব ফিরিওয়ালা তোমার মতো নয় – কৃষ্ণলাল রাগের সুরে বাধা দিয়ে বললে – কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা। তোকে নিয়ে আর পারিনে দেখচি – তারা হল ফিরিওয়ালা – আমরা হলুম ক্যানভাসার – হারমোনিয়াম পিঠে বেঁধে যারা গান গেয়ে ঘুঙুর পায়ে দিয়ে নেচে বেড়ায়, আমরা কি সেই দলের? অপমান হয়, ও কথা আমাদের বলো না!’
যদিও ক্যানভাসারদের অবস্থাও তেমন সুবিধের নয়। আহিরিটোলার ঘাটে কৃষ্ণলালের সঙ্গে একজন ছোকরা ক্যানভাসারের পরিচয় হয়েছিল। সে সার্জিক্যাল মলম বিক্রি করে। কমিশন ভালো। কিন্তু ছুরি দিয়ে হাত ফালা ফালা করে কেটে দেখাতে হয়, নামই তাই হাতকাটা তেল। কৃষ্ণলালকে অবশ্য এমন বিপজ্জনক ক্যানভাসিং করতে হয়নি। পুরোনো চাকরিটিই কপালগুণে মাইনে বাড়িয়ে তার কাছে ফিরে এসেছে। মনিব বলেছিলেন কৃষ্ণলালের দিন গিয়েছে, এখন সবাই সুশ্রী ছোকরা ক্যানভাসার চায়, লম্বা জুলপি, ঘাড় বার করে চুল ছাঁটা, লপেটা জুতা পায়, থিয়েটারের রামের মতো গলা। সেই মনিবকে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে হয়েছে পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে। গল্পের শেষে হাত ভর্তি সওদা নিয়ে কৃষ্ণলালকে গোলাপীর খোলার ঘরের সামনে উপস্থিত হতে দেখি। দুটি প্রান্তজীবনবাসী মানব-মানবীর ক্ষণিক সুখের কথা ভেবে পাঠকের মন ও প্রসন্ন হয়ে ওঠে।
সমাজের নানা শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেলামেশা শুধু নয়, তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠার দুর্লভ ক্ষমতা ছিল বিভূতিভূষণের। হোটেলের ব্যবসা ফেল পড়িয়ে সর্বস্বান্ত শান্তিরাম কিংবা হ্যারিসন রোডের মেসে চ্যাপটা হাঁড়ি করে ক্ষীরমোহন ও রসগোল্লা বিক্রি করতে আসা ফিরিওয়ালা তাই এমন জীবন্ত তাঁর গল্পে। ক্ষীরমোহনওয়ালার ছেলের বৌভাতে নিমন্ত্রণ খেতে গেছেন গল্পকথক। সেই ছেলে শেষপর্যন্ত নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। বারোবছর পর দীনদরিদ্র পিতা ছেলের কুশপুতুল দাহ করে শ্রাদ্ধ করছে, সেখানেও ঘটনাচক্রে নিমন্ত্রিত গল্পকথক। ফিরিওয়ালার দুঃখী জীবনের পুরো চালচিত্র যেন পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
‘বামা’ গল্পটি নানাদিক দিয়েই অসামান্য। এই গল্পের কথক ও ক্যানভাসার – দৈব ওষুধের মাদুলি বিক্রি করে বেড়াতো নানা জায়গায়। চুঁচড়োর শচীশ কবিরাজ মাইনে ও রাহাখরচ দিতেন। কাপড়-চোপড় পরতে হত সাধু ও সাত্ত্বিক বামুনের মতো, গেরুয়া পোশাক, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো, গলায় মালা! মেমারি স্টেশনে নেমে একবার গন্তব্যস্থানে পৌঁছোবার সময় সে বিপদে পড়ে গেল। পথে একটা বাজারে লোকজন তাকে বলে এইসব দেশে ফাঁসুড়ে ডাকাতের ভয়, বিদেশি লোক দেখলে মেরে ধরে যথাসর্বস্ব কেড়ে নেয়। তখনো সে ভাবতে পারেনি কী ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হতে চলছে। প্রকাণ্ড এক দিঘির ধারে সন্ধ্যেবেলায় এক বৃদ্ধের সঙ্গে কথকের দেখা। অঞ্চলটি কথকের সম্পূর্ণ অচেনা জেনে সাদরে নিজের বাড়িতে বৃদ্ধ তাকে আতিথ্য দেয়। বৃদ্ধ সম্পন্ন গৃহস্থ, উঠোনে বড়ো বড়ো ধানের গোলা, গোয়ালঘরে কুড়ি বাইশটি গোরু, উঠোনের চারদিকে উঁচু উঁচু আটচালা ঘর। চণ্ডীমণ্ডপসংলগ্ন একটি আলগা কুঠুরিতে কথকের স্থান হল। গৃহস্থ জাতে বারুই, তাই স্বপাকের ব্যবস্থা করা হল সংলগ্ন চালায়। এই রান্না চালাতেই ঝাঁট দেবার অছিলায় বার বার আসতে থাকে বাড়ির একটি বৌ। এই মেয়েটিই বামা বারুইবাড়ির মেজবৌ – ঘটনাচক্রে কথকের জীবনযাত্রী। সে নীচু গলায় জানায়, ‘ঠাকুরমশায়, আপনি এখনই এখান থেকে পালান, না হলে আপনি ভয়ানক বিপদে পড়বেন – এরা ফাঁসুড়ে ডাকাত, রাতে আপনাকে মেরে ফেলবে।’
বাইরে থেকে দেখতে সম্পন্ন গৃহস্থ আর ভেতরে নিষ্ঠুর ডাকাত, গোটা গ্রামখানাই তাই। অদ্ভুত এক গোপন পেশার মুখোমুখি করলেন আমাদের বিভূতিভূষণ। ভুলিয়ে ভালিয়ে বিদেশি পথিকদের এনে ভিটেয় তুলে রাতে তার টাকাকড়ি লুঠ করে, তাকে খুন করে কুঠুরির মেঝের নীচে পুঁতে ফেলে পরিবারের পুরুষরা। এটাই তাদের বংশানুক্রমিক বৃত্তি। বামার বাবা মেয়ের বিয়ে দেবার জানতেন না। পরে বামার কাছে সব ধরা পড়ে যায়। দিনের পর দিন চোখের ওপর নরহত্যা বামার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে কিন্তু ঘরের বৌ হিসেবে সে ছিল একান্ত নিরুপায়। কথককে সে প্রাণপণে বাঁচাতে চেয়েছিল তার প্রধান কারণ কথক ব্রাহ্মণ। জন্মগত সংস্কারের বশে ভিটেতে ব্রহ্মহত্যা বন্ধ করতে চেয়েছিল বামা। কথককে নিজের পিতৃপরিবারের গুরুবংশের সন্তান সাজিয়ে কোনোক্রমে সে সফল হয়। এখানেও ডাকাত পরিবারের মধ্যে চিরাগত সংস্কার কাজ করেছে। যতো নিকৃষ্ট অপরাধীই হোক, কুটুম্বের গুরুবংশের কোনো সদস্যকে হত্যা করা তাদের পক্ষে উচিত মনে হয়নি। বিভূতিভূষণের বিভিন্ন গল্পে আমরা ব্রাহ্মণ সন্তান বিষয়ে সমাজের বিশেষ শ্রদ্ধা ও আবেগের প্রকাশ দেখেছি। লেখক নির্মোহভাবে ভারতবর্ষের জাতিবর্ণবিভাজিত জটিল সামাজিক ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণরা যে বিশেষ সুবিধা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ভোগ করেছে তার দলিলীকরণ করেছেন। আমাদের মনে পড়বে ১৭৭৫ সালে নন্দকুমারের ফাঁসি হয়। অভিযোগ ছিল জালিয়াতির। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বন্ধু বিচারপতি এলিজা ইম্পে এই দণ্ডাদেশ দেন। ব্রহ্মহত্যার পাপে কোম্পানির রাজত্ব ও ভূমি কলঙ্কিত হল এই বিশ্বাসে অনেক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের মানুষ কলকাতা ত্যাগ করেন। প্রায় দেড়শো বছর পরে আদালতে ইংরেজের আইন অনুযায়ী সব মানুষ জাতিবর্ণ নির্বিশেষে সমান – এই নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হলেও, অন্তর্গত স্তরে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে বিশ্বাস যথেষ্ট জোরালো ছিল। বিভূতিভূষণ এই কালবৃত্তের ভাষ্যকার।
বামা যেন রক্ষয়িত্রী মাতৃমূর্তি। গ্রামের এই বধূটি তার মানবিকতায়, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে অবাক করে দিয়েছিল কথককে। অতিথির প্রাণ বাঁচানোর জন্য তার চেষ্টা যেকোনো মুহূর্তে ধরা পড়ে তার নিজের বিপদ ডেকে আনতে পারতো। তার কথা শুনে মনে হয় নরহত্যা বন্ধ করার জন্য এটিই তার একমাত্র চেষ্টা নয়।
‘বিপদ কেটে গিয়েছে; আমার চোখে না পড়লে সর্বনাশ হত, ভিটেতে ব্রহ্মহত্যা হত। অনেক হয়েছে, - এই কুঠুরিতে, - এই বিছানায়, এই মেঝেতে অনেক লাশ পোঁতা...।’
... বললুম, “পুলিশ কি গাঁয়ের লোক কিছু টের পায়না,- কিছু বলে না?”
“কে কি বলবে! এ ফাঁসুড়ে ডাকাতের গাঁ। সবাই এ-রকম। ... এখন আমার একটি সন্তান হয়েছে – এ পাপ-ভিটেয় বাস করলে তার অকল্যাণ হবে। ওকে বারণ করি, কিন্তু ও কি করবে? মাথার ওপর শ্বশুর মশায় রয়েচেন – পুরনো ডাকাত, দাদারা রয়েচে ... আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন বাবাঠাকুর, আর ভয় নেই...”
গল্পটি পড়তে গিয়ে সাধারণ পল্লীবধূর অসাধারণ চারিত্র্যে যেমন পাঠক মুগ্ধ হয় তেমনি আপাত নিরীহ গৃহস্থের ছদ্মবেশে ফাঁসুড়ে ডাকাতদের নির্বিচার হত্যার ইতিবৃত্ত শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত নামিয়ে দেয়। গ্রামের শান্ত ছায়াসুনিবিড় আবহাওয়া যে কখনো কখনো কতোটা প্রতারক বিভূতিভূষণের সাহিত্যে অন্যত্রও তার ছবি আছে। ‘বিপদ’ গল্পটির পটভূমি একটু পিছিয়ে ১৩০১ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৮৯৪ খ্রীস্টাব্দ। দুর্গোৎসবের সময় রাধারমণ ভট্টাচার্য তল্পিবাহক শিবু ঘোষকে নিয়ে সোনার গাঁয়ে জমিদার বাঁড়ুজ্যেদের বাড়ি পুজো করতে যাচ্ছিলেন। শিবু বিশবছর ধরে তাঁর তল্পিবাহক। সে জানে ভট্টাচার্য নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ, কোথাও গেলে স্বপাক ছাড়া আহার করেন না। চালের দাম চড়া, দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। ভট্টাচার্যের ঘরেও গৃহিণীর দানশীলতার জন্য চাল বাড়ন্ত। শিবু পথে রেঁধে খাবার জন্য চাল আনেনি। ফলে পথে আরামডাঙায় বুনোপাড়া থেকে সে চাল ডাল সংগ্রহ করতে গেল। শিবু ভালো করেই জানে আরামডাঙার বুনোরা সব ঠ্যাঙাড়ে, খুনী। মানুষ খুন করে বিলে পুঁতে দেয়। তবু সে সাবধান হল না কেন পাঠকের মনে সন্দেহ জাগে। অচিরেই তিনজন জোয়ান লোক বড়ো সড়ো সিধে নিয়ে শিবুর সঙ্গে হাজির হন। শিবু জানে রাধারমণ শূদ্রযাজী ব্রাহ্মণ নন, এই সিধে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। শুধু ভয়েই কি সে এমন কাণ্ড করে বসল? রাধারমণ আপত্তি জানাতেই আরামডাঙার বুনোরা স্বরূপ প্রকাশ করল। তাদের দলপতি ভৈরব ডাকাত। ‘সেদিন ও হলুদপুকুরের মজুমদারদের বাড়ি চিঠি দিয়া ডাকাতি করিতে গিয়া গ্রামের লোকের সঙ্গে লড়াই করিয়া দুটিকে খুন করিয়া রাখিয়া আসিয়াছে।’ ডাকাতদের দাবি সামান্য, - সিধে গ্রহণ করে রাধারমণকে রাঁধতে হবে, তারা প্রসাদ পাবে। দক্ষিণার দশটাকাও তারা নিয়ে এসেছে। রাধারমণ কিন্তু রাজি হলেন না। তাঁর কথাতে যে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ভৈরব সর্দার ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছে তা বুঝেও তিনি সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শুভ নবমীতে তাঁর জন্ম। রামচন্দ্রের মতো।
‘শেষকালে এই তাঁর শুভ জন্মতিথির পরিণাম? শূদ্র-যাজন তিনি করেন না, এই অপরাধে এই দস্যুদের হাতে অপমৃত্যু ছিল তাঁর ললাট-লিপি? কত দুর্গা-ষষ্ঠীর বোধনে চণ্ডীপাঠের সময় সময় তিনি নিজেই আবৃত্তি করিতেন যজমানের বাড়ি –
যা দেবী সর্বভূতেষু মৃত্যুরূপেণ সংস্থিতা –
যদি করালবেশিনী নৃমুণ্ডমালিনী, কৃপাণহস্তা সেই দেবীর আবির্ভাব তাঁহার জীবনে আসন্ন হইয়াই থাকে, তাঁহাকে তিনি আবাহন করিয়া লইবেন।’
গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে বিলের ধারে তাঁকে ফেলে ডাকাতরা চোখের পলকে নরহত্যা করে ফেলল। মৃত্যুর আগে ব্রাহ্মণের মনে পড়ছিল শিশুপুত্রের মুখ আর ঈশোপনিষদের অসমাপ্ত পুঁথির কথা।
এই গল্প শুধু নির্মম দস্যুবৃত্তির কথা বলে না, আজ বিলুপ্ত একদা প্রচল সামাজিক ন্যায়নীতির অদ্ভুত বৈপরীত্যময় ছবি তুলে ধরে। গোঁড়া বর্ণাভিমান, শ্রেষ্ঠত্ববোধ এখানে মৃত্যুভয়কেও তুচ্ছ করেছে। শূদ্রযাজী হওয়ার থেকে মৃত্যুও বরণীয় রাধারমণের এই সিদ্ধান্ত বিগত যুগে একান্ত স্বাভাবিক। স্পর্শদোষ ভারতীয় বর্ণহিন্দু সমাজে কতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এখনো অনেকাংশে আছে, ইতিহাসে তার উদাহরণ কম নেই। অন্যদিকে ভৈরব সর্দার ও তার দলবলের মানসিকতাও ভয়ানক। তারা বিপুল পরিমাণ সিধে হাজির করেছে, ব্রাহ্মণ রাঁধবেন, তারা প্রসাদ পাবে। রাধারমণের প্রত্যাখ্যান তাদের উগ্র অহমিকায় ঘা দিয়েছে। কিন্তু সেই অপমানবোধ এতোটাই ভয়ঙ্কর যে তারজন্য ব্রাহ্মণকে কেটে তারা বিলের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। এমন নয় যে এতে তাদের কোনো আর্থিক লাভ হয়েছে। ব্রাহ্মণ নেহাৎ দরিদ্র সম্বলহীন ছিলেন। এ শুধু অকারণ পৈশাচিক নির্মমতা যা পেশাদার খুনীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া মানুষদের বোধহয় বিভূতিভূষণের মতো আর কেউ আঁকতে পারেন না। যাত্রাদলের অভিনেতা যদু হাজরার জীবনকাহিনী রয়েছে ‘যদুহাজরা ও শিখিধ্বজ’ গল্পে। চলচ্চিত্র এবং দূরদর্শনের বোলবোলাও এর আগে যাত্রার সমাদর শহর ও বিশেষত গ্রামাঞ্চলে অনেক বেশি ছিল। কথক তার কৈশোরে রাজা নল এবং শিখিধ্বজের ভূমিকায় যদু হাজরার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ‘চব্বিশ পরগণা থেকে মুরশিদাবাদ এবং ওদিকে বর্ধমান থেকে খুলনার মধ্যে যেখানেই বাজারে বা গঞ্জে বড় বারোয়ারির আসরে যাত্রা হত সে সব স্থানে দশ বার ক্রোশ পর্যন্ত যদু হাজরার নাম লোকের মুখে মুখে বেড়াত।’
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কথক যেমন কলকাতায় পড়াশোনা, চাকরির সূত্রে ভালো থিয়েটার ও ফিল্মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে তেমনি যাত্রাভিনয় ও বিপুল পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। স্বগ্রামে একবার যাত্রার আসরে কথক দেখল যাত্রা জুড়ির গান, বেহালাদারদের দীর্ঘ কসরত সরিয়ে অনেকটা থিয়েটারি ঢং নিয়েছে। একজন মোটা, কালো, বেঁটে লোক অভিনয় করছিল – কেউ তার অভিনয়ে হাততালি দেয়নি।
‘আমার সঙ্গে একদল স্কুলের ছেলে বসেছিল, তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল – এ বুড়োটাকে আবার কোথা থেকে জুটিয়েছে? দেখতে যেন একটা পিপে। অ্যাকটিং করছে দেখ্না ঠিক যেন সঙ! পাশের আর একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন – ও এককালে খুব নামজাদা অ্যাকটার ছিল হে, তখন তোমরা জন্মাওনি। ওর নাম যদু হাজরা।’
এবার চমকানোর পালা কথকের। পরের দিন যদু হাজরার সঙ্গে দেখা করল সে। জানা গেল তার ধারাবাহিক দুর্ভাগ্যের কথা। বৌ-মাস্টারের দলে বিখ্যাত ভৃগু সরকারের কাছে অভিনয় শিক্ষা তার। ‘এখনকার সব হয়েছে আর্ট – আর্ট, সে যে কি মাথা-মুণ্ডু তা বুঝিনে।’ একসময় দেড়শো টাকা পর্যন্ত মাইনে পেয়েছে যদু হাজরা। এখন বৃদ্ধ বয়সে পঁয়ত্রিশ টাকা মাইনেতে কাজ করছে। উপযুক্ত ছেলে মারা গেছে, গোটা সংসার বৃদ্ধের কাঁধে। চল্লিশ বছরে অভিনয়ের ধরনধারণ বদলে গেছে আজ আর যদুর কদর নেই। এর পর কলকাতার নেবুতলার গলিতে আবার বৃদ্ধ নটের সঙ্গে কথকের দেখা। তিন বছর হল যদু হাজরা কর্মহীন, দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে।
পুরোনো দিনের গরিমার গল্প করতে পারলে আর সে কিছু চায় না। কথক তার কাছে একদিন শিখিধ্বজের অভিনয় আবার দেখতে চাইল। যাত্রার আলোকোজ্বল আসর নয়, রাত ন’টার পর কলকাতার একটা পার্কে যদু হাজরা অভিনয় করে দেখাল, ‘বৃদ্ধ তার সেই পুরানো ট্র্যাজিক সুরে ‘হা-হা-হা-হা’ করে আমার দিকে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এল। সত্যিই কি অপূর্ব সে সুর, কি অপূর্ব ভঙ্গি! ভগ্নহৃদয় বৃদ্ধ নট তার জীবনের সমস্ত ট্র্যাজেডি ওর মধ্যে ঢেলে দিলে।’
‘দেহপট সনে নট সকলি হারায়’ – কিন্তু কয়েকটি অবিস্মরণীয় অভিনয় মুহূর্তে সত্যিই বোধহয় অমরত্ব ধরা দেয়।
‘বারিক অপেরা পার্টি’ আরেকটি অসামান্য গল্প। বারিক মন্ডল এক দরিদ্র মুসলমান চাষী – ভাগে জমি চাষ করে। গল্পকথকের সঙ্গে জমি বিক্রির সূত্রেই তার আলাপ। কথক জাপানি বোমার ভয়ে কলকাতা থেকে দেশের বাড়ি পালিয়ে এসে জমিজমায় মন দিয়েছে। বারিক তার প্রজা, কথকের জমিই সে ভাগে চাষ করে। কিন্তু চাষবাসে তার মন থাকলে তবে তো! সে বেহালা বাজায়, গান গায়। নিজের দুই ছেলে ও জেলেপাড়ার আরো কয়েকজনকে নিয়ে সে দল বেঁধেছে, নাম ‘বারিক অপেরা পার্টি’। সংসারে তার দুর্দশা ঘোচেনা, চতুর্দিকে ধারদেনা। রোজ ভাত জোটেনা তবু গান গাইতে পেলে তার মনে আনন্দ ধরে না। শোধ দেয়না বলে কেউ তাকে ধার দিতেও চায়না। ঘরদোরের অবস্থা ছন্নছাড়া, চালের খড় ঝুলে পড়েছে পচে। গাড়ি, গরু ক্রোক হয়ে গেছে, বারিকের হুঁশ নেই। সে মহা আনন্দে দুই ছেলেকে নিয়ে গানের আসরে মগ্ন। ওর ছোটো ছেলে পালায় কৃষ্ণ সাজে। হিন্দু পুরাণের নানা গল্প নিয়ে ওরা পালা বাঁধে। কথক মহা বিরক্ত হয়ে অকর্মণ্য বারিকের ভাগের জমি কেড়ে নেয়, পরে অনুতপ্তও হয় যখন শোনে বারিকের বড়ো ছেলেটি সাতদিন হল পুরোনো পিলে জ্বরে ভুগে মারা গেছে। কথক ভাবে পুত্রশোকাতুর বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দিতে তার বাড়ি যাবে। সেদিনই রাতে শোনে গোঁসাই বাড়িতে জন্মাষ্টমীর উৎসবে নাটমন্দিরে বারিক অপেরা পার্টির গাওনা হচ্ছে।
‘আসরে গিয়ে দেখি বারিক বিদূষকের ভূমিকায় দাড়ি নেড়ে নেড়ে খুব লোক হাসাচ্ছে।’
সংসারের দুঃখকষ্ট বারিকের যেন গায়ে লাগে না, শিল্পের জাদুস্পর্শ তাকে এক আশ্চর্য নিরাসক্ত ব্যক্তিত্ব দিয়েছে। পেশায় কর্ষণজীবী হলেও নেশায় সে সংগীতশিল্পী। পালাগান বাঁধা, সবাইকে শেখানো, নিজে বেহালা বাজিয়ে গাওয়া – এটিই তার সঞ্জীবনী শক্তি। এরই জোরে সংসারের অসহ দারিদ্র্য, লোকজনের হাতে অপমান, লাঞ্ছনা সব সে তুচ্ছ করতে পারে। এমনকি সন্তানের মৃত্যু বুকে শেল হানলেও আসরে বিদূষকের ভূমিকায় সে নেমে পড়তে পারে। শিক্ষিত সংস্কৃতিবান সমাজে এমন সংসার উদাসীন শিল্পী আমরা দেখিনা তা নয়। কিন্তু অজ পাড়াগাঁয়ে বারিকের মতো খাঁটি শিল্পীকে কে আবিষ্কার করবে বিভূতিভূষণ ছাড়া।
এই গল্পের আরেকটি দিক হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও গ্রামবাংলায় হিন্দু মুসলমানের সাংস্কৃতিক নৈকট্য। দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষ তখন ছড়িয়ে পড়লেও সর্বত্রগামী নয়। বারিক মন্ডল অনায়াসে হিন্দু পুরাণের গল্প নিয়ে পালা বাঁধে, অভিনয় করে। গোঁসাইবাড়িতে জন্মাষ্টমীতে গাওনার নিমন্ত্রণও পায়। এই সহজ মেলামেশার আবহাওয়া রাজনীতির কুটিল স্পর্শে আবিল হয়ে উঠবে শীঘ্রই। বারিক মনে করিয়ে দেয় মেদিনীপুরের চিত্রকর সম্প্রদায়কে। ধর্মে মুসলমান হয়েও যারা হিন্দু পুরাণ ও লোকপুরাণের কাহিনী নিয়ে পট আঁকে।
‘অন্তর্জলি’ গল্পটিতে আছে অধুনা বিলুপ্ত কবিগান রচনার পেশার বর্ণনা। এই গল্পের পটভূমি ১২৭৫ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৮৬৮ খ্রীস্টাব্দ। ডুমুরদহ গঙ্গার ঘাটে বিখ্যাত পাঁচালীকার ও কবিগান রচয়িতা দীনদয়াল চক্রবর্তীকে অন্তর্জলির জন্য আনা হয়েছে। তখনো মৃত্যু সমাসন্ন বুঝলে গঙ্গায় অন্তর্জলি করা বর্ণহিন্দু সমাজে প্রচলিত রীতি। দুই প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র, ভ্রাতুষ্পুত্র এবং পাঁচালীর দলের দোহার তো সঙ্গে আছে এছাড়া খবর শুনে দূরদূরান্ত থেকে লোক আসার বিরাম নেই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কবি’ উপন্যাসে নিম্নবর্ণজাত নিতাই কবিয়ালের সংগ্রামময় জীবনকাহিনী শুনিয়েছিলেন। বিভূতিভূষণ এক ব্রাহ্মণ কবিয়ালের আত্মোপলব্ধির গল্প লিখেছেন। কবিগান গেয়ে অর্থ ও খ্যাতি দুটিই যথেষ্ট অর্জন করেছেন তিনি। অনেক জমিজমা, বাগান। বাড়িতে জাঁকের দুর্গোৎসব হয়। অনুপ্রাসের ঘটা ও রচনার বাঁধুনির জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। সমবেত জনতা হায় হায় করছে, ‘এইখানটা দ্যাখো – বল্ দেখি মা কোন রঙ্গে ত্রিবিভঙ্গে রঙ্গক্ষেত্রে রঙ্গ দ্যাখো – আহা হা! ক্ষণজন্মা পুরুষ! আর জন্মাবে না। হয়ে গেল! পিদিম নিভে গেল।’
মৃত্যুপথযাত্রী দীনদয়ালের স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে অতীতের বহু জমজমাট কবিগানের আসরের স্মৃতি। রাসু নৃসিংহ, হরু ঠাকুর, নবাই ঠাকুর, এন্টনি কবিয়ালের চাপান উতোরের কারুকার্য। আমাদের মনে পড়ে যাবে বিভূতিভূষণের বাবা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় কথকতা করতেন। দীনদয়াল ও তার নামজাদা প্রতিপক্ষের বয়ানে বিভূতিভূষণ ঠিক বিগত যুগের আবেশ মাখা কবিগান রচনা করে দিয়েছেন। উনিশ শতকের মতো চটুল অনুপ্রাসের ছটা, হালকা মেজাজের আধ্যাত্মিকতা – আসর জমানোর সব কলাকৌশল তাতে উপস্থিত। কতোবার কতো আসরে কীভাবে সমাদর ও সম্মান পেয়েছেন দীনদয়ালের মৃত্যুর আগে সেসব মনে পড়ছে। সেই সঙ্গে নিম্নবর্ণের কীর্তনওয়ালী বিনোদিনীর সঙ্গে মধুর আলাপনের কথা। জয়পরাজয়, আনন্দ-বিষাদ, কৃতিত্ব ও ত্রুটিবিচ্যুতিসহ গোটা বিগত জীবন যেন গঙ্গার ঘাটে অন্তর্জলি অবস্থায় দীনদয়ালের মনের পটে ভেসে উঠছে।
আশ্চর্য বিশ্বাসী এক ভৃত্যের গল্প রুপো-বাঙাল। আজ এমন চরিত্র হয়তো অলীক রূপকথা মনে হতে পারে কিন্তু রুপোর মতো মানুষ অনতিদূর অতীতে বিরল ছিল না। আমাদের পূর্ব প্রজন্মের স্মৃতিতে তাদের উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল। আমরাও তার কিছু কিছু শুনে বড়ো হয়েছি। রুপো ধর্মে মুসলমান, সে নাকি অল্প বয়সে সাজিমাটির নৌকো চড়ে দক্ষিণদেশ থেকে কথকদের গ্রামের ঘাটে নিরাশ্রয় অবস্থায় এসেছিল। কথকের ঠাকুর্দা অসহায় রুপোকে আশ্রয় দেন। সেই থেকে রুপো কথকদের বাড়ির বাঁধা কৃষাণ। শুধু তাই নয় কথকের বাবা সীতানাথ চক্রবর্তীকে সে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। এছাড়া সে গ্রামের চৌকিদারও বটে। বিদেশ থেকে এসেছিল তাই তার উপাধি ‘বাঙাল’। কিষাণের কাজে রুপোর মাসমাইনে সাড়ে তিনটাকা অথচ তার হাতেই সীতানাথ চক্রবর্তীর চার পাঁচটা ধানের গোলা, প্রজাপত্র সব দেখার ভার। সীতানাথ নায়েবের চাকরি করেন মরেলডাঙা কাছারিতে। সেখানেই থাকেন, মাঝে মাঝে গ্রামে আসেন পরিবারের কাছে।
রুপো এক বর্ণ লেখাপড়া জানে না অথচ দু-তিন মাস ধরে কোন কোন প্রজা কতো পরিমাণ শস্য ঋণ নিয়েছে তা নিখুঁতভাবে মনে রাখে এবং মুখে মুখে সীতানাথকে হিসেব দিয়ে দেয়। কখনো এক কাঠা ধান কি কলাইয়ের অঙ্ক এদিক ওদিক হয়না। সীতানাথকে মানুষ করেছে বলে রুপোর দাপটও কম নয়। একবার অসুখে শয্যাশায়ী রুপো সীতানাথ ডাকছেন শুনে বলেছিল, ‘এখন যেতি পারবোনা – জ্বরে মরচি। তা সীতানাথ আর আসতে পারলে না পায়ে পায়ে? তার একটু এলে কি মান যেত? রুপো অন্যায় কিছু বলেনি কিন্তু সীতানাথের সামন্ততান্ত্রিক দাম্ভিকতায় ভৃত্যের এই সাহস অসহ্য বোধ হল। তিনি রুপো সেরে উঠে আসার পর কড়া সুরে ধমক দিলেন – তাতে অপমানের পরিমাণ কম ছিলনা। ‘তোমার এত বড় আস্পর্ধা, তুমি বলো আমি পায়ে পায়ে তোমার বাড়ি যাব? তুমি জানো, কার সামনে তুমি দাঁড়িয়ে আছ? তোমার মুণ্ডুটা যদি কেটে ফেলি তাহলে খোঁজ হয়না, তুমি জানো?’ এমন হুমকির সামনেও রুপো এতোটুকু বিচলিত হয়না বরং গলা চড়িয়ে বলে, ‘হ্যাঁরে সীতেনাথ, তোকে যে কোলে করে মানুষ করেছিলাম একদিন, মনে পড়ে? এখন তুমি বড় হয়েচ, বাবু হয়েচ, সীতেবাবু – এখন তুমি আমার মুণ্ডু কাটবা না? বড্ড গুণবন্ত হয়েচিস তুই, হ্যাঁ সীতেনাথ –
মনিব এবং ভৃত্যের এহেন সংলাপ বিনিময় সেযুগেই সম্ভব ছিল। রুপোর কান্না শুনে ঠাকুরমার ছুটে আসা এবং সীতানাথের দোষ স্বীকারেও গোলমাল মিটল না। রুপোর রাগ কমেনা, সে চাবির থোলো ছুঁড়ে দিল সীতানাথের সামনে। সে আর কাজ করবে না। এবারের তর্কাতর্কির পর কান্নার পালা সীতানাথের। ‘আমার বড্ড কষ্ট হয়েচে রুপোদা, তুমি আমায় এমন করে বললে শেষকালে। আমি গৃহত্যাগী হবো....।’ কথকরা তখন ছেলেমানুষ, অবাক হয়ে তারা দেখতে লাগল দুই প্রাপ্তবয়স্কের কান্না। রাতে চৌকিদারির ফাঁকে রুপো কথকদের বাড়ি এসে ঠাকুরমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলত – ‘ওঠো বৌমা, জাগন থাকো। রাত খারাপ।’ অন্ধকারে বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপের পৈঠায় ওপর বসে থাকত। ‘গোলার ধান যাবে, সীতেনাথের যাবে। চোরের যা উপদ্রব হয়েছে, তার খবর কি জানবা?’ নিঃস্বার্থ ভাবে গোটাজীবন অন্নদাতার ঋণ শোধ করে মৃত্যুর আগে ঘোর জ্বরে প্রলাপের মুহূর্তেও রুপোকাকা সীতানাথকে ধান চাল কলাইয়ের হিসেব বুঝিয়ে দিচ্ছিল। সাড়ে তিনটাকা মাইনের কৃষাণের সততা, বিশ্বস্ততা, সারল্যের এই ছবির সামনে পাঠকের মাথা নত হয়ে যায়। বিভূতিভূষণের রুপোকাকা যেন সৎ বিশ্বাসী মানুষের আলোকোজ্বল মূর্তি হয়ে মনে থেকে যায়। কথকের শেষ কথাটা কানে বাজতে থাকে, ‘এই সব চোরাবাজারের দিনে, জুয়োচুরির দিনে, মিথ্যে কথার দিনে বড্ড বেশি করে রুপোকাকার কথা মনে পড়ে।’
ভোলা যায়না বিভূতিভূষণের আঁকা একটি পতিতা মেয়েকে। গল্পের নাম ‘বিপদ’ – মেয়েটির নাম হাজু। কথকের গ্রামেরই মেয়ে, তার ছেলেবেলার খেলার সাথী রামচরণ বোষ্টমের মেয়ে। রামচরণ মারা গেছে, সংসারে প্রভূত অনটন। খাওয়া জোটেনা। শ্বশুরবাড়িতেও হাজুর আশ্রয় জোটেনি, এদিকে তার কোলে একটি ছোটো ছেলে।
‘একদিন দেখি, রায়েদের বাহিরের পৈঠায় বসিয়া সেই মেয়েটি হাউহাউ করিয়া এক টুকরা তরমুজ খাইতেছে। যে ভাবে সে তরমুজের টুকরাটি ধরিয়া কামড় মারিতেছে, ‘হাউহাউ’ কথাটি সুষ্ঠুভাবে সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।’
চুরি করে খায় বলে গ্রামের কেউ ওকে কাজে রাখতে চায়না। হাজুর মা নিজেই চূড়ান্ত দারিদ্র্যগ্রস্ত ফলে মেয়েটি দোরে দোরে ভিক্ষা করে বেড়ায়। এরই মধ্যে আকাল শুরু হয়ে গেল, বাজারে ধানচাল মেলেনা। কেউ ভিখিরিকে মুষ্টি ভিক্ষাও দেয়না। কথক দয়াপরবশ হলে হাজুকে একদিন বাড়িতে ডেকে খেতে দিলেন। ‘নিছক খাওয়ার মধ্যে যে কি আনন্দ থাকিতে পারে তাহা জানিতে হইলে হাজুর সেদিনকার খাওয়া দেখিতে হয়।’ এরপর কথক খবর পেলেন হাজু বনগাঁয় গিয়ে ‘নাম লিখিয়েচে’ অর্থাৎ বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করেছে। গল্পটি পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা। সেই ভয়াবহ আকালের দিনে পেটের ভাত জোগাড় করতে কতো মেয়েই হাজুর মতো দেহব্যবসা করতে বাধ্য হয়েছিল। বিভূতিভূষণ হাজুর মধ্যে সেইসব নাম না জানা অভাগিনীদের ধরে রেখেছেন।
কথকের সঙ্গে হাজুর আবার দেখা মন্বন্তরের পরে মহকুমা শহরের একটি গলিতে শীতসন্ধ্যায়। ‘জ্যাঠামশায়’ বলে একটি রঙিন কাপড় পরা মেয়ে ডাক দেওয়াতে এগিয়ে গেলেন কথক। হাজুর পরিচয় দেবার ভঙ্গিটি ভোলা যায়না, ‘আমার বাবার নাম রামচরণ বৈরাগী। আমি যে এই শহরে নটী হয়ে আছি।’ এমন গর্বের সুরে সে কথাক’টি বলল, যেন জীবনে পরম সার্থকতা লাভ করেছে। এতো বড়ো শহরে নটীর পেশায় যুক্ত থাকা কি কম কথা। সমাজে প্রতিষ্ঠিত সচ্ছল মানুষের কাছে যতোই ঘৃণ্য হোক পতিতাজীবন, হাজুর মতো দুর্ভাগা মেয়ে, যার গ্রামের দিনগুলি কেটেছে নিছক উঞ্ছবৃত্তি করে, দুটো বেশি খাবার জন্য গালমন্দ শুনে, কাঁচালঙ্কা বা পেঁপে চুরির জন্য মারধোর খেয়ে, তার কাছে শহরের নটীর জীবন একটা রীতিমতো সার্থকতা। কথক অনুরোধ এড়াতে না পেরে তার ঘরে গিয়েছেন। খড়ছাওয়া একটি পরিচ্ছন্ন ঘর – ভাড়া সাড়ে সাতটাকা। যে হাজু খেতে পেতনা, তার ঘরে ফর্সা চাদর পাতা বিছানা, জলচৌকিতে ঝকঝকে করে মাজা পিতল কাঁসার বাসন। বোষ্টম বাড়ির মেয়ে, কৃষ্ণের ছবি রাখতে ভুল হয়নি। ডুগিতবলা, হুঁকো টিকে – অতিথির বিনোদনের উপকরণ সব মজুত। হাজু তার গ্রামতুতো জ্যাঠামশাইকে নিজের সম্পদ দেখায়, চিনেমাটির পেয়ালা, আয়না, টুকনি ঘটি। দুটি বেলা চা খাওয়ার অভ্যাস হয়েছে তার। ছেলের জন্য মাকে টাকাও পাঠায়, গ্রামের রসিক লোকদের তার কাছে যাতায়াত আছে। যদিও টাকা মার হাতে পোঁছায়না – হাজু তা জানেনা। ছেলেকে নিজের কাছে আনতে চায়, ‘এখানে খাবার ভাবনা নেই জ্যাঠামশায়, দোকানের খাবার খেয়ে খেয়ে তো অচ্ছেদ্দা হোল। সিঙ্গেড়া বলুন, কচুরি বলুন, নিমকি বলুন – তা খুব। এমন আলুর দম করে ওই বটতলার খোট্টা দোকানদার, অমন আলুর দম কখনো খাইনি।’ জ্যাঠামশাইকে সন্দেশ পেঁপে কাটা চা দিয়ে অতিথিসৎকার করেছে হাজু। পাঠক অনুভব করে বিভূতিভূষণ কোনো নৈতিক মানদণ্ড দিয়ে হাজুকে বিচার করছেন না। পতিতার পেশা যে মন্দ মেয়েদেরই জন্য – এমন কোনো উচিত অনুচিত ব্যাখ্যার মধ্যে যাচ্ছেন না। নিজের উপার্জিত অর্থে হাজু সাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখেছে – সেই পরিতৃপ্তির আনন্দ গল্পটির প্রধান সম্পাত। ‘কাল ও ছিল ভিখারিণী, আজ ও পথে আসিয়া ওর অন্নবস্ত্রের সমস্যা ঘুচিয়াছে, কাল যে পরের বাড়ি চাহিতে গিয়া প্রহার খাইয়াছিল, আজ সে নিজের ঘরে বসিয়া গ্রামের লোককে চা খাওয়াইতেছে, নিজের পয়সায় কেনা পেয়ালা পিরিচে – যার বাবাও কোনোদিন শহরে বাস করে নাই বা পেয়ালায় চা পান করে নাই। ওর জীবনের এই পরম সাফল্য ওর চোখে। তাহাকে তুচ্ছ করিয়া, নিন্দা করিবার ভাষা আমার জোগাইল না।’
বিভূতিভূষণের গল্প উপন্যাসে ক্ষুধার একটি সুতীব্র ভূমিকা আছে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষের যা প্রথম দরকার সেই খাদ্য – কতো কষ্ট করে মানুষ সংগ্রহ করে তা তিনি নিজে দেখেছেন, পাঠককে দেখিয়েছেন। হাজুর মতো হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে – দুবেলা পেট ভরে খাওয়া যার কাছে স্বপ্ন ছিল, তাকে পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করে অন্ন উপার্জনের জন্য ধিক্কার দেবার কথা পাঠক আর ভাবতেও পারেনা। ন্যায় অন্যায়ের কি একটিই মানদণ্ড – এই প্রশ্ন তাকে ভাবিয়ে তোলে।
শিক্ষক বৃত্তিধারী অনেকেই বিভূতিভূষণের গল্পে দেখা দিয়েছেন কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে এমন একজন সামনে এসে দাঁড়ান, যিনি কোনো স্কুলে চাকরি জোটাতে পারেননি, সম্ভবত সে যোগ্যতা তার নেই। তিনি সাধারণ একজন গৃহশিক্ষক – ‘বিধু মাস্টার’। এই গল্পে কথক পিন্টু ফোর্থ ক্লাস বা ক্লাস সেভেনে পড়া এক কিশোর। তাদের পাঁচ ভাইবোনকে পড়াবার জন্য গৃহশিক্ষক চেয়ে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন রাশভারি মেজকাকা। ম্যাট্রিক পাশ ছিপছিপে লম্বা কালোপানা বিধু মাস্টারকে বহাল করা হয়েছিল। কথক, ঝন্টু, মিন্টু, চাঁদু আর সকলের ছোটো রেবাকে তিনি রাতে তিনঘন্টা করে পড়াতেন, বেতন সাতটাকা। কামাই করা বারণ। ক্লাস সেভেনের বইপত্র বিধু মাস্টারেরে কাছে বোধহয় বেশ কঠিন মনে হত। তবু প্রাণপণে বোঝাতে চেষ্টা করতেন। পিন্টু কিন্তু মাস্টারের প্রতি আদৌ শ্রদ্ধাশীল ছিলনা। সে সর্বদা মাস্টারের ভুল ত্রুটি সন্ধান করত আর মেজকাকাকে তা বলতেও ছাড়ত না। বিধু মাস্টার পাঁচটি ছাত্রছাত্রীকেই খুব স্নেহ করতেন। প্রায়ই তাঁর সামান্য উপার্জন থেকে অবাক জলপান, স্বাধীন ভাজা, ঘুগনিদানা, কুলপি বরফ কিনে তাদের খাওয়াতেন। ছোট্টো রেবার জন্মদিনে তিনটাকা দিয়ে কলের রেলগাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। অন্য ভাইবোনেরা মাস্টারকে পছন্দ করলেও পিন্টুর মন গলেনি। এমনকি বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি লাটাই পেয়েও নয়। এরই মধ্যে পথে বিধু মাস্টারের সঙ্গে পিন্টুর দেখা। তিনি ছাত্রকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। টিনের চাল দেওয়া মেটে বাড়ির দোতলায় ছোট্টো অপরিসর অপরিষ্কার ঘর। ফালি বারান্দাটা মানুষের ভারে সামান্য কাঁপে। এই ঘরটি দেখে মাস্টারমশায় সম্পর্কে পিন্টুর মনে বড়ো অনুকম্পা হল। ছাত্রকে বসিয়ে বিধু মাস্টার এক ঠোঙা খাবার কিনে আনলেন। এই প্রথম পিন্টু বুঝল তাঁর শ্রমের পারিশ্রমিক এভাবে অপচয় করা তাঁর শরীরের বিন্দু বিন্দু রক্তগ্রহণ করার সামিল। পিন্টু ভাবল আর সে মাস্টারের টাকা এভাবে অপচয় করতে দেবেনা।
কিন্তু সে সুযোগ আর এলনা, মেজকাকার কাছে ধরা পড়ে গেল বিধু মাস্টার ইংরেজি ভালো জানেন না। তাছাড়া পিন্টুর হাফইয়ার্লির রেজাল্ট মোটেই ভালো হয়নি। তার দায় নিশ্চয়ই পুরো মাস্টারের নয়। কিন্তু আগে থেকে মাস্টার সম্বন্ধে মেজকাকার কান ভারি করে পিন্টুই তো তাঁকে অসন্তুষ্ট করে রেখেছিল। বিধু মাস্টারের চাকরিটি চলে গেল। নীরবে নিঃশব্দে তিনি প্রস্থান করলেন। তাঁকে বলা হল বাকি মাইনে মাসের দু তারিখে এসে নিয়ে যেতে। এই নেহাৎ শান্ত নিরীহ সহৃদয় গৃহশিক্ষকটি তার যাবতীয় অসাফল্য দিয়েই যেন পাঠকের মন জয় করে নেন। তিনি সত্যিই যে ভালো পড়াতে পারতেন না, ইংরেজি বা বিজ্ঞান গণিত বিষয়ে যে তাঁর দুর্বলতা ছিল সেই বিচার পিছনে পড়ে যায়। গৃহশিক্ষকতার বৃত্তি অবলম্বন করে কলকাতার নির্মম জীবনে কোনোমতে টিঁকে থাকার চেষ্টা করছেন যে মানুষ তাঁর চাকরি চলে যাবার মতো দুর্দৈবের জন্য মেজকাকা ও পিন্টুর ওপর পাঠকের গভীর ক্ষোভ জন্মায়। বিধু মাস্টার যেন জীবনযুদ্ধে সামান্য বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে হাবুডুবু খাওয়া ভালোমানুষদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। পাটোয়ারী বুদ্ধিওয়ালা সংসার যাদের কপালে বারবার পরাজয়ের তিলক কেটে দেয়।