• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | Rabindranath Tagore | রম্যরচনা
    Share
  • অপ্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ : অংশুমান গুহ

    সন্ধের অন্ধকার সবে নেমেছে। এখনো গা‌ঢ় হয়নি। এক সারি রাধাচূড়ো গাছের মধ‍্যে অনেক পাখি জড়ো হয়েছে। কলকাতার এক প্রান্তে।

    মার্চ মাস। হাওয়ায় রাধাচূড়োর সমস্ত পাতা নাচানাচি করছে। গাছের ভেতরের অন্ধকারে শ’য়ে শ’য়ে অথবা হয়তো হাজার হাজার পাখি কিচির মিচির করছে।

    পাখিরা কি ঘুমোনোর আয়োজন করছে? পাখিরা কি ঘুমোয়?

    এইসব ভাবতে ভাবতে আমার প্রিয় গীতিকারের একটা লাইন মনে পড়ল –

    এ পারে মুখর হল কেকা ওই!

    অবশ‍্য আমি যে কিচির মিচির শুনছি সেটা ময়না বা টিয়া বা অন‍্য কিছু। ময়ূর নয়। শুধু ময়ূরের ডাককেই কেকা বলে।

    ও পারে নীরব কেন কুহু হায়?

    আর সবাই জানে কুহু হল শুধু কোকিলের ডাক।

    কুহু সব সময়েই মধুর।

    কেকা কখনো কখনো কর্কশ লাগে। অবশ‍্য সব সময় নয়।

     
    কুহু ও কেকা


    গুনগুন করলাম –

      এ পারে মুখর হল কেকা ওই,   ও পারে নীরব কেন কুহু হায়।
      এক কহে, 'আর-একটি একা কই, শুভযোগে কবে হব দুঁহু হায়।'

    চৌষট্টি বছর বয়সে লেখা। কাফি রাগ। আরো বেশ কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীতের মত, এই গানেও একটা অর্থের উত্তরণ আছে। একটা সহজ সরল জায়গায় শুরু করে ভদ্রলোক আমাদের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যান অন‍্য কোথা, অন‍্য কোনোখানে। মানে, যদি আমরা মন দিই।

    ময়ূর ডাকছে। কোকিল ডাকছে না। তার মানে সময়টা বর্ষাকাল। (পরে আষাঢ়ের উল্লেখও আছে।)

       অধীর সমীর পুরবৈয়াঁ    নিবিড় বিরহব্যথা বইয়া
       নিশ্বাস ফেলে মুহু মুহু হায়॥

      

    ওই পুরবৈয়াঁ শব্দটা ইন্টেরেস্টিং। ওটা রবি ঠাকুর নিজের সুবিধামত বানিয়ে নেননি। ওটা একটা পুরোনো কথা, মৈথিলিতেও আছে, বাংলাতেও। মানে – পুব দিক থেকে আসা। পুব দিক থেকে আসা হাওয়া। আমাদের বঙ্গদেশে পুব থেকে হাওয়া দেয় প্রধানত বর্ষা আর বসন্ত কালে। যখন হয় ময়ূর ডাকে, নয় কোকিল।

    যাই হোক।

    একজন পাখি আছে।

    একজন নেই।

    কিন্তু রবি ঠাকুর যেন দুজনকেই এক সাথে চান, ’অধীর’ ভাবে! কল্পনা করছেন পাখিদুটোও মনে মনে দুটো ‘এক’ থেকে একটা

    ‘দুঁহু’ হতে চায়।

      'আষাঢ় সজলঘন আঁধারে   ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
      'আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে,  ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে।'

    ওই যে! উত্তরণ হয়ে গেছে!

    কবি নিজের মনের কথা বলছেন এবার। নিজের দুরাশার কথা। পাখিদের কথা নয়।

      আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে?

    এইখানে মিল আর ছন্দের রমণীয় মিলন-বন্ধনের মধ‍্যে হচ্ছে একটা আশ্চর্য শব্দের সৃষ্টি – তিথিডোর – একই সঙ্গে নমনীয় এবং দৃঢ়। শব্দটা এর আগে বাংলা সাহিত‍্যে দেখা যায়নি। পরে বুদ্ধদেব বসু ব‍্যবহার করেছেন।

    আইডিয়াটা জটিল নয়। আমরা সবাই সময়ের প্রবাহে যার যার জায়গায় আটকে আছি। রবি ঠাকুরের সাথে আকবরের দেখা হয়নি। কিম্বা চেকভের সাথে গালিলিওর। আজকের কোনো যুবক একশ’ বছরের পুরোনো কোনো সুন্দরী মহিলার ছবি দেখে আকৃষ্ট হতে পারে, মানসিক ভাবে তাদের দুর্দান্ত মিলও থাকতে পারে। কিন্তু দুজনে সময়-নদীর এমন দুই ঘাটে বাঁধা যে দেখা হবার সম্ভাবনা নেই। ঋতু বিবর্তনে একটা শীতের তাজা সীম আর একটা গ্রীষ্মের টাটকা পটলের এক সাথে মিলে কোনো রেসিপি হবে না।

    আমরা সবাই হয়তো এটা মেনে নিই। কারণ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

    কিন্তু সেটাই কবির অন্তরের একটা কষ্ট। একটা দুরাশা।

    ঋতুর দু ধারে থাকে দুজনে, মেলে না যে কাকলি ও কূজনে,
          আকাশের প্রাণ করে হূহু হায়।

    আবার কথার খেলা। কেকা আর কুহু নির্দিষ্ট পাখির প্রসঙ্গে ব‍্যবহৃত। কাকলি আর কূজন হল জেনেরিক পাখির ডাক।

    কুহু, দুঁহু, মুহু, হূহু। এরকম দু’ অক্ষরের উহু-মার্কা শব্দ বা শব্দান্ত বাংলাতে এই চারটে ছাড়া আর আছে? উঁহুঁ!

    এখন অনেকেই রবি ঠাকুরকে ইর্রেলেভেন্ট মনে করে। অপ্রাসঙ্গিক। আমি করি না। তার কারণ তিনি এখনো প্রায়শই আমার মনের কথা বলেন। বলেন মাধুরী মিশিয়ে, বিনা বাহুল‍্যে, সংক্ষেপে। বলেন ছন্দে, সুরে, ভাষার সৌন্দর্যে। এমন কি মাঝে মাঝে বকেও দেন। যেমন আমার বিজ্ঞানী অজ্ঞেয়বাদী মন নিয়ে যখন ‘ডাকঘর’ পড়ছিলাম, তখন ঠাকুরদার মুখে উনি আমাকে সোজা বললেন –

       চুপ করো অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না।

    রাধাচূড়োর সারিতে পাখির কিচির মিচির শুনে আমার মনে হয়েছিল – ওরা কি ঘুমোনোর আয়োজন করছে? পাখিরা কি ঘুমোয়?

    উত্তরটা পরে পেয়েছিলাম।

    হ্যাঁ, ঘুমোয়। কিন্তু খুব সতর্কভাবে! প্রকৃতির অনেক শত্রুর হাত থেকে বেঁচে থেকে। কোনো কোনো পাখি এক চোখ খুলে ঘুমোয়। কিছু পাখি – যেমন হাঁস – যখন দল বেঁধে ঘুমোয়, তখন দলের বাইরের দিকের পাখিরা এক চোখ খোলা রেখে পাহারাদারের কাজ করে। মাঝখানের পাখিরা দুই চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে বা ঝুলন্ত অবস্থায় ঘুমোয়। আর কোনো কোনো পাখি ঘুমোয় উড়ন্ত অবস্থায়। যেমন পরিযায়ী (migratory) পাখিরা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ওড়ার সময়, ছোট ছোট বিরতিতে ঘুমিয়ে নেয়। বেশিরভাগ পাখিই মানুষের মতো রাতে ঘুমোয়। উটপাখি তাদের লম্বা পা ভাঁজ করে মাটির ওপর উবু হয়ে বসে ঘুমোয়। গাছের ডালে থাকা ছোট পাখির ছানারা অনেক সময় তাদের বাসার ভেতরে শুয়ে বা মাথা নিচু করে ঘুমায়। কিছু জলচর পাখি ডাঙায় থাকলে অনেক সময় বালি বা ঘাসের ওপর বুক ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ে। পোষা পাখিরা খাঁচার মেঝেতে বুক ঠেকিয়ে শুয়ে ঘুমোতে পারে।

    আর কিচির মিচির? সন্ধের এই কূজনকে ইংরিজিতে evening chorus বলে। এটা বিজ্ঞানের ভাষা। ভোরের কাকলিকে বলে dawn chorus. সন্ধের কোরাসের কারণ অনেক। হাজিরা দেওয়া, মানে একে অন‍্যকে জানানো “আমি এসে গেছি”। আশ্রয় ভাগাভাগি করে নেওয়া, মানে কে কোথায় বসবে ঠিক করে নেওয়া। শিকারী প্রাণী – যেমন বেড়াল – সম্বন্ধে একে অন‍্যকে সতর্ক করা ও সম্মিলিত শক্তি দেখানো। এমন কি, বৈজ্ঞানিক গবেষকরা মনে করেন, এই শব্দের মাধ্যমে পাখিরা সম্ভবত খাবারের ভালো উৎসের সন্ধান বা কোনো নতুন বিপদের আশংকার খবর দলের মধ্যে বিনিময় করে নেয়।

    সারাদিনের ব‍্যস্ততার পর দু’ মিনিট পাখির আওয়াজ শুনে মনটা অকারণে শান্ত হয়ে গেল। ওরাও এবার আস্তে আস্তে শান্ত হবে। ওরা বাড়ি ফিরে এসেছে। এখন আমার বাড়ি ফেরার পালা।

       Silence will carry your voice like the nest that holds the sleeping birds.

    (Stray Birds, Tagore, 1916)



    অলংকরণ (Artwork) : উইকিমেডিয়া থেকে: Challiyan ও Jatin Sindhu-র তোলা পাখির ফটো
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments