



৯ তারিখে যাত্রারম্ভ। এদিকে সেদিনই বুড়ির কলেজের স্পোর্টস। যা হোক, কোনওমতে স্পোর্টসের মাঠে বুড়িছোঁয়া হাজিরা দিয়ে দেড়টায় রওনা দিয়ে ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘরে পৌঁছনোর দশ মিনিট আগেই এয়ারপোর্টে হাজির হওয়া গেল। লাগেজ ব্যাগে পাওয়ার ব্যাঙ্ক রেখে দেওয়ার উজবুকামির জন্য বেশ খানিকটা সময় নষ্ট করেও ঠিক সময়েই Air India Express-এ সীট দখল করল বুড়োবুড়ি। সেও ঠিক সময়ে আকাশে উঠে সময়ের খানিক আগেই আবার বুড়োবুড়ি সমেত সকলকে নিরাপদে বাগডোগরার এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিল।
মালপত্তর সমেত বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সিবাহিত হয়ে মাল্লাগুড়িতে পরীক্ষিত Hotel Central Plazaয় পৌঁছে 204 নম্বর কামরায় ঢুকে আজকের মতো চলায় দাঁড়ি। মজার ব্যাপার, দু বছর আগে এই কামরাটাই আমাদের আস্তানা হয়েছিল।
আগামীকাল থেকেই তিন তীর্থ পরিক্রমা আরম্ভ হবে। রাতটা আপাতত কাঞ্চনজঙ্ঘার স্বপ্ন দেখেই কাটানোর প্রোগ্রাম করল বুড়োবুড়ি।
সকাল সকালই বুড়োবুড়ি রেডি হয়ে চলে এলো হোটেলের রেস্তোরাঁয়; কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের সদ্ব্যবহার করতে হবে তো! বুড়ো প্রায় গলা অবধি ঠুসে ফেলল নানান খাবারে। নেহাৎ ওদের নিতে গাড়ি চলে এলো, নাহলে ভোজনে বিশ্বরেকর্ডটা ভাঙ্গার চেষ্টা করত।
ন-টা চল্লিশে গাড়ি গা ঝাড়া দিল। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে চলতে চলতে সকালকে পিছনে ফেলে গাড়ি। দুপুরের দশ মিনিট বয়সে সারথির ব্রেকফাস্ট ব্রেকে বুড়োবুড়ি এক কাপ করে চা চাপিয়ে নিল। এবার গাড়ি চলল মসৃণ চলনে। একে একে চেল খোলা, পাপড়খেতি (পাপড়েরও চাষ হয়!!) হয়ে লাভা রোড ধরে দেড়টা ছুঁই ছুঁই বেলায় গাড়ি ঢুকল রিশপে — বাপ রে! এ কোন রিশপ রাস্তার দু পাশে এক ইঞ্চি জায়গায়ও খালি নেই; ঠাসাঠাসি রিসর্ট আর লজে। সেই শান্ত অরণ্যঘেরা রিশপ এখন লজ রিসর্টের অশান্ত মহল্লা।
বুড়োবুড়ির বিচলিত মনে শান্তির প্রলেপ লাগাল পথ যখন শুধুমাত্র পাখির ডাকে ভরা ছোট্ট গ্রাম শেউলেতে ঢুকল। গাড়ি গ্রামের শেষ প্রান্তে মারিয়া বস্তির সীমানা ছোঁয়া 'বী হাইভ হোম স্টে'-র আঙিনায় উঠে এলো একটা মিনি চড়াই চড়ে। প্রথম দর্শনেই প্রেম। বুড়োবুড়ি মুহূর্তেই আপন করে নিল জায়গায়টাকে। বাড়ির লোকজনও আপন হতে দশ মিনিটের বেশি সময় নিল না। এমন চমৎকার জায়গাকে ভালো না বাসাটাই আশ্চর্যের। দোতলা বাংলোর মতো বাড়ি; সামনে অনেকখানি জুড়ে ফুলের বাগান, তার নিচে রাস্তা বাঁক খেয়ে ছুট মেরেছে। রাস্তার ও পারে আরেকটা হোম স্টে, পাশে আরও একটা গড়ে উঠছে। শব্দ বলতে পাখিদের কিচির মিচির আর অবরে সবরে ছুটে যাওয়া সার্ভিস গাড়ির ভ্রুউম। ওদিকে এরপর সবুজ পাহাড় ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে আকাশের গায়ে বিছিয়ে থাকা মেঘের সাম্রাজ্যে মুখ লুকিয়েছে। ওই আড়াল থেকেই মাঝেমধ্যে মেঘের পর্দা অল্প তুলে উঁকি দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে নিচ্ছে বুড়োবুড়ি ঠিকঠাক আছে কিনা। বাকি বেলাটুকুর বেশির ভাগটাই কাটল বাগানে আর বারান্দায়। ধীরে ধীরে আকাশের আলো হলদেটে হতে হতে লালচে হলো, আর শেষমেশ একটা হাজারো চুমকি বসানো বিশাল কালো বেডকভারটা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। বুড়োবুড়িও সুস্বাদু খাবারে পাকস্থলি টাইট করে ঘরে ঢুকে কম্বল মুড়ি দিল।
