• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪৯ | অক্টোবর ২০১১ | প্রবন্ধ
    Share
  • ওবামার আমেরিকায়, আজকের বিশ্বে : দূর্বা বোস


    আমেরিকার ‘সাদা-কালো’-র সমস্যাতেই লুকিয়ে আছে আজকের বিশ্বের বা আমেরিকার এই বিশাল আর্থিক বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা এমন দাবি এই রচনার উদ্দেশ্য নয়।

    তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে ‘race’ ইস্যুটি যে কতটা আজও প্রাসঙ্গিক, এবং কেন- সেই খোঁজ, বিশ্লেষণের চেষ্টা মাত্র করা হয়েছে। চেষ্টা করা হয়েছে মনে করিয়ে দিতে যে আমেরিকান ধনতন্ত্র তৈরিই হয়েছিল ‘দাস-শ্রম'-এর ওপর নির্ভর করে। এই ‘পুরোনো’ ইতিহাসের একটা দীর্ঘ, প্রচ্ছন্ন ছায়া আজকের অর্থনৈতিক-সামাজিক সমস্যার গভীরে খাঁজে-খাঁজে জড়িয়ে আছে

    বারাক ওবামা নাকি ‘পোস্ট-রেশিয়াল’---এমন একটা কথা কানে যেতেই ‘সলোমন’ (*) তার বেহালা-টা পাশে ঠেলে দিয়ে, বিছানায় গুটিগুটি উঠে চাদর মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরলেন, তাঁর অবিশ্বাসের মুচকি হাসি কারুর নজরে এল না তাই। ‘পোস্ট-রেশিয়াল, অর্থাৎ কয়েক’শ বছরের ‘সাদা-কালোর’ দ্বন্দ্বের উত্তরণের নিশ্চিত ইঙ্গিত! ঠিক এমন করেই সে নাকি চাদরের তলায় ঢুকে পড়েছিল যখন শুনেছিল “ইম্যানশিপেশন প্রোক্লামেশন” (“the Emancipation Proclamation”) আসছে কালো-মানুষকে মুক্ত করতে। সে বহুদিনের কথা, সলোমনের বয়স তখন মাত্র পাঁচ। টোনি মরিসনের কাছে “গল্প শুনেছি” এমনধারাই নাকি স্বভাব তার। ‘সাদা’-মানুষ, কিংবা ‘সাদা-সমাজ’এর আশ্বাসে এইরকমই তার প্রতিক্রিয়া বরাবর। এত বছর পেরিয়েও পুরনো অভ্যাসের তাই কোনও অন্যথা হল না। সলোমনের গিন্নী কিন্তু মাথা নেড়ে বললেন: বলেছিলাম না, এমন দিন আসবেই, ওই “সাদা বাড়ি”-তে আমাদের নাতি-নাতনী একদিন ঘর আলো করবে! ঈশ্বরে তাঁর অগাধ বিশ্বাস, আর আস্থা তাঁর নিজের মনোবলে। স্রেফ তারই জোরে এই দুশো বছরে “নাতনীদের” পৌছে দিয়েছেন ইয়েল, হার্ভার্ড-এ। এই মনের জোরেই, দাঁতে দাঁত কামড়ে, কোনরকমে টিকিয়ে রেখেছেন সন্তানদের, সামলে রেখেছেন নিজেদের ভাঙ্গাচোরা কম্যুনিটি। সলোমনরা হতাশা, অবমাননায় কুঁকড়ে-যাওয়া মনে বেহালাটুকু আঁকড়ে ধরে সুরে ডুবে থেকেছেন নেশাগ্রস্তের মত, আর নয়ত স্ত্রী-সন্তান ফেলে রেখে অগোচরে পাড়ি দিয়েছেন ‘উত্তরে’, ‘আলোর সন্ধানে’। সলোমন-গিন্নীরা অমানুষিক পরিশ্রমে বহন করেছেন সন্তানপালনের মানবিক দায়। মাতৃত্বের দায় আর দাসত্বের বোঝা টানতে-টানতে কখনো কখনো মস্তিষ্কের বিকার ঘটেছে বই কী। জানলার ফাঁক দিয়ে গাঢ় অন্ধকারে ছুড়ে দিয়েছেন সদ্যজাত সন্তানকে; দাসমালিকের হাতে তুলে দেয়ার চেয়ে মাযের পক্ষে এও ভাল! সেই উন্মাদিনীদের নিজের সমাজও কিন্তু ক্ষমা করেনি। অথচ, দায় ফেলে পালিয়ে যাওয়া ‘সলোমন-রা পেয়েছে ‘বীরের খাতির’ -মরিসনের লেখায় ‘সলোমন’ আর তার জীবনসঙ্গিনীর অভিজ্ঞতা বারেবারে ঘুরে এসেছে। গত কিছুকালের ‘ব্ল্যাক’ ফেমিনিষ্ট সাহিত্য আর আন্দোলন ইতিহাসের বেশ কিছু প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে। আজ আমরা জেনেছি কেমন করে দাসত্বের অভিজ্ঞতা নিগ্রো নারী আর পুরুষের জীবনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছাঁদে ঢেলেছে। মূলস্রোত সমাজের এতকাল দাবি ছিল (এবং এখনো যা মুছে দেয়া যায়নি), ‘ব্ল্যাক’-দারিদ্র্য এবং তার আনুষঙ্গিক সমস্যার মূলে তাদের চারিত্রিক ত্রুটি দায়ী, অর্থাৎ তাদের ‘কর্ম-বিমুখতা’, অপরাধমূলক প্রবণতা ইত্যাদি (অবশ্য, যেকোনো সমাজেই সুবিধাভোগীরা এমনটিই ভেবে নিশ্চিন্ত থাকি)। আর নাকি দায়ী ওই সমাজে নারী-পুরুষের ঐতিহ্যগত ভূমিকার রদবদল। অর্থাৎ সংসারে বাপের চেয়ে মায়ের ভূমিকার প্রাধান্য। এই অতিসরলীকরণের প্রবণতা ওপরের কিছু তথ্যকে সামনে রেখে, ভেতরের সত্যিটাকে ঝাপসা করে রেখেছিল এদ্দিন। আসলে, দাসপ্রথায় শ্রমবিভাজনের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের ঐতিহ্যগত ধারাটি একেবারে গোড়াতেই ভেঙে গিয়েছিল। এদেশের ইতিহাসের এই এক মস্ত ‘আয়রনি’ বা পরিহাস। যার জের আজ পর্যন্ত বয়ে চলেছে। দাসত্বের অভিজ্ঞতা আফ্রো-আমেরিকান নারী-পুরুষের সম্পর্কে যেন এক ধরনের ‘সমতা’ এনে দিয়েছিল, দাসপ্রথা যেন একটা ইকুয়ালাইজার (‘equalizer’) হিসেবে কাজ করেছিল। ‘দাস-শ্রম’-এর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ঐতিহ্যগত ব্যবধানটুকু ঘুচিয়ে দিতে পারলে যে আখেরে তাদেরই লাভ সে কথা বুঝতে দাস-ব্যবসায়ীদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় নি। ইতিহাসের এক অদ্ভুত ঘটানাচক্রে ‘ব্ল্যাক’ মেয়েদের বিচরণভূমি তাই ঘরের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরে চলে আসে। এক অস্বাভাবিক অবস্থায় ‘নিগ্রো’ পুরুষকে সরে আসতে হয় বাইরের জগতের কর্মযজ্ঞ থেকে। তাছাড়া, পরিবারের পরিকাঠামোটিকে বেশ সুপরিকল্পিত ভাবে প্রথমেই ভেঙে টুকরো করে দেওয়া হয়, আফ্রো-আমেরিকানদের নিজেদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের অধিকারটুকুও মুছে দিয়ে। এইখানেই অন্যান্য ইমিগ্রান্ট-দের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, অভিজ্ঞতার সঙ্গে আফ্রো-আমেরিকান অভিজ্ঞতার প্রাথমিক ফারাক। অন্যান্য ইমিগ্রান্ট কম্যুনিটির ‘আমেরিকান স্বপ্ন’-এর সুযোগ কখনোই তাদের জোটেনি।

    সাম্প্রতিক ইতিহাসও বড়ই অদ্ভুত: একই সঙ্গে ঘটছে “ওবামা” অন্যদিকে “ক্যাটরিনা”। ‘ক্যাটরিনা’ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো সাধারণত কোনও শূন্যতায় ঘটে না, সে আছড়ে পড়ে মানুষেরই তৈরী ঐতিহাসিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়, ‘ফাঁকি’-গুলো নগ্ন করে দিয়ে। ২০০৪ সালে ঘূর্ণী ঝড়ের দৌলতে গোটা পৃথিবী চেয়ে দেখল, এতো কাল পরেও, এমন কী যখন একজন কালো-মানুষকেই আমেরিকা নির্বাচিত করতে চলেছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে, বৃহত্তর ক্ষেত্রে দারিদ্র্য আর ‘রেস’ পরস্পরকে আঁকড়ে জড়িয়ে আছে।

    ২০০৭ সাল, ওবামা যখন ডাক দিচ্ছেন গোটা দেশকে এক হতে: “কোনও ‘সাদা আমেরিকা’ নয়, কোনও ‘কালো আমেরিকা’ নয়, সকলের জন্য একটিই আমেরিকা: ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা,” ঠিক তখনই দক্ষিণের লুইসিয়ানা অঞ্চলের ছোট্ট ‘সাবার্ব’-এ পুনরাবৃত্তি ঘটলো সেই পঞ্চাশের দশকের বিভীষিকার: হাইস্কুলের মাঠে একটি গাছে ঝুলতে দেখা গেল ফাঁসির দড়ি, ‘ন্যুস’। আমেরিকান ইতিহাস সম্পর্কে যাদের সামান্যতম ধারণা আছে তাঁরাই বুঝবেন এ কোন কদর্য ইঙ্গিত। আফ্রো-আমেরিকান ছাত্রগোষ্ঠীর প্রতিবাদের উত্তর হিসেবে সাদা ছাত্রের দল বন্দুক ইত্যাদি নিয়ে এসে হাজির হয়। আক্রমণের উদ্যোগ লক্ষ্য করে তাদের হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে ব্ল্যাক ছাত্রেরা সাঙ্ঘাতিক হিংসা কোনরকমে রোধ করেছিল। সেই সংঘাতের পর স্থানীয় পুলিশ ছ’জন কালো ছাত্রদের জেলে পোরে, সাদা গোষ্ঠী বেমালুম ছাড়া পেয়ে যায়। এই ঘটনায় গোটা অঞ্চলের কালো মানুষ একেবারে সেই ষাটের দশকের Civil Rights-এর কায়দায় স্বতস্ফূর্ত ভাবে রাস্তায় নেমে পড়েন। সময়টা ২০০৭, ওবামার নির্বাচনী-প্রচার তখন তুঙ্গে; প্রথম ‘কালো’ ভাবী প্রেসিডেন্ট কিন্তু তাঁর বক্তৃতায় একবারও এই ‘জেনা সিক্স’ (‘Jena Six’)এর ঘটনা উল্লেখ করেন না। তিনি যে গোটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন। তাই আপ্রাণ চেষ্টা যেকোনো ‘ব্ল্যাক ইস্যু’ থেকে দূরে থাকা। যে ছোট উপদেষ্টা-গোষ্ঠী তাঁকে নির্বাচনী কায়দা-কানুনের তালিম দিচ্ছিলেন এ তাঁদের পরামর্শ। তারপরের ঘটনা সকলের জানা। বারাক ওবামা, মধ্যনাম ‘হুসেন’ সাবধানে উহ্য রেখে, তাঁর ‘ইয়েস, উই ক্যান” মন্ত্রে সত্যিই ইতিহাস তৈরী করলেন। শুধু মাত্র আমেরিকাই নয়, গোটা বিশ্বের প্রগতিশীল মানুষের আশা-ভরসার উৎস ওবামা এলেন আমেরিকার এক চরম অর্থনৈতিক-সামাজিক বিপর্যয়ের মূহুর্তে। গোটা আমেরিকার কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি ‘কোনও ব্ল্যাক-আমেরিকা নয়, কোনও হোয়াইট আমেরিকা নয়, নজরে কেবল অবিভক্ত আমেরিকা: দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা!’ শুধু নির্বাচনী কৌশল হিসেবেই নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কার্যত মেনে নিলেন মূলস্রোত আমেরিকার দাবী: ‘এ সমাজ আজ বর্ণবিদ্বেষহীন, অতএব, কালো-মানুষের সমস্যা ইত্যাদি সব বস্তাপচা পুরোনো রাজনীতি।‘ বর্ণবিদ্বেষ আজও এ সমাজের প্রত্যেকদিনের জীবনের ছন্দে গাঁথা—অস্বীকার করে বসলেন এই বাস্তব-অবস্থাকে। মূলস্রোত সমাজের মতই ওবামাও ‘ভুলে’ গেলেন যে ফ্রেডরিক ডগলাস থেকে মার্টিন লুথার কিং-দের লড়াই কোনও সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক লাভের লড়াই ছিল না, আফ্রো-আমেরিকান মানুষের যথার্থ মুক্তির মধ্যেই যে আমেরিকান গণতন্ত্রের সুস্থ এবং পূর্ণ বিকাশের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এ কথা তাঁরা মর্মে-মর্মে বুঝেছিলেন। সেই বিশ্বাসেই ফ্রেডরিক ডগলাস পরম উৎসাহে ফেমিনিষ্ট আন্দোলনকে শুধু সমর্থনই করেননি, সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলেন। আর, মার্টিন লুথার কিং ‘ভিয়েতনাম-যুদ্ধের’ বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাতে দ্বিধা করেননি, এমন কী নিজের গোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়াই। তাঁরা বুঝেছিলেন ঘরের ভেতরের বর্ণবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ আর বাইরের জগতের মিলিটারি অভিযান এই সবই একসূত্রে গাঁথা। কোনও সুস্থ গণতন্ত্রে এদের কারুর স্থান নেই ---এই সত্যিকে অস্বীকার করে চরম ঐতিহাসিক ভুলটি করে বসলেন ওবামা-রা। এই একই ভুল করেছিলেন আরেকজন প্রগতিশীল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (এই প্রসঙ্গে আমরা পরে আসব)। আমেরিকার আজকের বিপর্যয়ের মূলেও শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো সমস্যা ‘রেস’ এবং দারিদ্র্য, একটির সঙ্গে আরেকটি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। (তাই কি? যদি ধরে নেয়া যায় যে আমেরিকায় কালো-মানুষরা নেই, তাহলে কি আজকের অর্থনৈতিক বিপর্যয় হোত না? আইসল্যাণ্ড এবং অন্যান্য বহু দেশেই যে একই মূল কারণ, সেটার ব্যাখ্যা কি? আমার মনে হয় এখানে একটু অতি সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে। এই বিপর্যয়ের জন্য ঐতিহাসিক কারণে ব্ল্যাকরা, কিন্তু জেনারালি সব ওয়ার্কিং ক্লাস-এর লোকেরাই আনুপাতিকভাবে বেশি ভুগছেন, সেটা ঠিক।) সেই সমস্যা যাকে বারেবারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে প্রান্তে। জমে ওঠা সেই প্রান্তিক সমস্যাই আজ আমেরিকান ‘গণতন্ত্রের’ ভিতকে নড়িয়ে দিচ্ছে। ‘দাসপ্রথা’-র মত এক ভয়ংকর অন্তর্দ্বন্দ্ব (contradiction)-কে ভেতরে রেখে যে ‘গণতন্ত্র’ যাত্রা শুরু করেছিল সেই দ্বন্দ্ব বারেবারেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মূলস্রোত সমাজ তাকে মূলত এড়িয়ে চলেছে। (আমার মনে হয় এটা ঠিক, দাসপ্রথার মতো আর এক বিভাজন সৃষ্টি হচ্ছে এক্সপ্লয়েটেড ও এক্সপ্লয়টার—those who can make money with money, and those who cannot.) ইতিহাসে নানা মূহুর্ত এসেছে পূর্ণ গণতন্ত্রে উত্তরণের সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে ছোট্ট সম্পত্তিভোগী ‘সাদা’ মানুষের গোষ্ঠী, আর তাদের নিয়ে তৈরী “কর্পোরেট আমেরিকা”। একদিকে সম্পত্তিভোগী, ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষীর দল, আর অন্যদিকে বাদবাকি মানুষ—বিপ্লব বা গণবিদ্রোহের জন্য জমি তৈরী। তবুও, ‘লিবার্টি, ফ্রীডম এণ্ড পারস্যুট অফ হ্যাপিনেস” (‘Liberty, Freedom and Pursuit of Happiness”)-স্লোগানে সাধারণ মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ রেখে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সমাজের সমস্ত সুযোগ কুক্ষিগত করে রাখার আশ্চর্য ক্ষমতা কেমন করে অর্জন করল সত্যিই বিস্ময়ের, এমনটি আর কোথাও মিলবে না, এমন কী প্রতিবেশী কানাডাতেও নয়। আজও, সেই ‘খেলাই’ চলছে; সরকারী ক্ষমতায় যেই আসুক, ‘ডেমোক্রাট’ কী ‘রেপাবলিকন’—তাদের অন্যতম দায়িত্ব বড়লোকের স্বার্থরক্ষা, অর্থাৎ যথেচ্ছ আয়কর ছাড়ের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা। আর তারই সঙ্গে তাল রেখে দরিদ্রমানুষের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ‘কল্যাণমূলক ব্যবস্থা’-গুলির জন্য বরাদ্দ অংশের ভাগ কমিয়ে আনা, এমন কী এজাতীয় উদ্যোগগুলির পাট তুলে দেওয়া, ‘সরকারী খরচ’ কমানোর অজুহাতে। বেশকিছু ঐতিহাসিক পালাবদলের মধ্যে দিয়েও এই মূল ব্যবস্থার তেমন কোনও পরিবর্তন কেন ঘটলো না বুঝতে হলে একটু পিছিয়ে গিয়ে দেখতে হবে। (Hmmm… are you saying that the American society is so insensitive to the disadvantaged in general, even when a majority of working class whites belong to that, because this class almost completely contain the Blacks?.. That is interesting---but then why do poor whites also accept such a situation? Many of them vote Republicans—but that has another explanation rooted in race… নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ...Interesting..)


    পুরোনো ইতিহাসের প্রাসঙ্গিকতা:

    আমেরিকান সংস্কৃতির একেবারে জৈবিক অংশ হওয়া সত্বেও আফ্রো-আমেরিকান উপস্থিতি আজও যেন একটা ধাঁধা বা প্যারাডক্স (paradox) হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আজকের সামাজিক অবস্থার বিশ্লেষণে পুরোনো ইতিহাসের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই সন্দিহান, বিশেষ করে নতুন আসা ইমিগ্রান্ট (immigrant)মহল। তাঁদের প্রশ্ন: অন্যান্য ‘ইমিগ্রান্ট’গোষ্ঠীর তো এমন ভয়ংকর চেহারা নয়! ‘কালো’-রা এত পিছিয়ে রইল কেন? কারণ, তাঁরা ভুলে যান যে “আফ্রো-আমেরিকানরা ‘ইমিগ্রান্ট’ নন, তাদের পায়ে শেকল পরিয়ে, আফ্রিকার মাটি থেকে জোর করে উপড়ে আনা হয়েছিল। আমাদের মত স্বেচ্ছায় সাত-সমুদ্দুর পার হয়ে ‘আমেরিকান পাই’-এর স্বাদ পেতে তারা আসেন নি। দ্বিতীয়ত, তাঁরা বোঝেন না এক প্রজন্মের সামাজিক-আর্থিক সুযোগ, সুবিধে পরবর্তী প্রজন্মে বাহিত হয় কোন প্রক্রিয়ায়— সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে গোটা সামাজিক অসাম্যকেই মোটামুটি অটুট রেখে পৌছে দেওয়া যায় নতুন প্রজন্মের হাতে। ইউরোপীয় উপনিবেশের শুরুর দুই শতাব্দী জুড়ে আমেরিকার মাটিতে ‘নতুন বিশ্ব’ তৈরী হয়েছিল গণহত্যা আর দাস-ব্যবসা/বর্ণবিদ্বেষের ওপর ভর করে। ইউরোপ থেকে আসা গোষ্ঠীর মানুষের মুনাফার জন্য। এই ইউরোপীয়রাই আমেরিকার ‘সাদা’ সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হল। ইতিহাসের সঙ্গে তাল মেলা্নোর প্রয়োজনে সমাজবিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু কিছু প্রগতিশীল টুকরো আইনকানুন সামাজিক কাঠামোয় গুঁজে দিতে হয়েছে, নেতাতই দায়ে পড়ে। তাই সেসব চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আলগা গয়নার মত থেকে গেছে, প্রয়োজন মতো ‘খুলে রাখলেও’ চলে। সিভিল ওয়ারএর পরে অল্প কিছুদিন ‘পুনর্গঠন’-এর সময়ে (১৮৬৫ সাল নাগাদ), ১৯৫০-৬০-এর দশকে সিভিল রাইট্স-এর মধ্যে দিয়ে কিছু প্রগতিশীল আইন-ইত্যাদি বর্ণবিদ্বেষী-কাঠামোয় স্থান দিতে হয়েছে। মূলস্রোত সমাজ অবশ্য সেই সব পরিবর্তনকে সামলে রাখার উপায়ও খুঁজে নিয়েছে। সামাজিক সংস্কারের কোনও পর্যায়েই ‘আফ্রো-আমেরিকান’ মানুষের সমস্যা এদেশের জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে স্থান পায়নি, তাকে সবসময়েই প্রান্তে সরিয়ে রাখা হয়েছে, টিকিয়ে রাখা হয়েছে সামাজিক অসাম্যকে।


    প্রথম পর্যায়ের সংস্কার:

    ‘সিভিল ওয়ার’(১৮৬৫) –এর মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিক দাসপ্রথার অবসান ঘটেছিল ফেডারাল সরকারের তথা আব্রাহাম লিংকনের নির্দেশে, দাস-বিদ্রোহের কারণে নয়; আফ্রো-আমেরিকান ইতিহাসের এ এক মর্মান্তিক সত্য। এর পরের অধ্যায়ও, অর্থাৎ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, নিয়ন্ত্রিত হল ‘মুক্তিদাতাদের’ বাসনা-অনুয়ায়ী। বলাই বাহুল্য, একথা স্বীকার করতে হচ্ছে আফ্রো-আমেরিকান মানুষের সাহস, আত্মসম্মান বোধ, বীরত্বকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়েই। নতুন ধনতন্ত্রের জোয়ারেই ভেঙে পড়েছিল পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা। প্রগতিবাদী আব্রাহাম লিঙ্কন এবং তাঁর সহযোগীরা সময়ের সুযোগে গৃহযুদ্ধের রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে ‘ইমানশিপেশান প্রক্লেমেশন’ ঘোষণা করেন। সময়ের কারণেই লিঙ্কন-কেও খুবই সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছিল, কোনও বৈপ্লবিক চেষ্টা এড়িয়ে। এমনকি, পুরোনো সংবিধানের বদলে নতুন সংবিধান রচনা হল না সদ্যোমুক্ত আফ্রো-আমেরিকানদের পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি জানিয়ে!

    আনুষ্ঠানিক দাসপ্রথা ভেঙে যাওয়ার পরে লিঙ্কন-সহ গোটা সমাজের সামনে এসে পড়ল এক বিরাট দায়িত্ব: মুক্ত আফ্রো-আমেরিকান গোষ্ঠীকে মুলস্রোতে ফিরিয়ে নেওয়া। তৈরী হল ফ্রীডমেন্স ব্যুরো (‘Freedmen’s Bureau’, সদ্য-মুক্ত মানুষদের বাসস্থান, শিক্ষা ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে। আফ্রো-আমেরিকান মানুষ নিজেরাই এই কাজে সক্রিয়ভাবে হাত লাগিয়েছিলেন। আমেরিকার গর্ব “পাব্লিক স্কুল’-এর মূল কাজ এই সময়েই নতুন করে গুরুত্ব লাভ করেছিল। আফ্রো-আমেরিকান গোষ্ঠী এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহারে লেগে পড়েন। জমি বন্টন: ‘ফর্টি একর্স এণ্ড আ মিউল’ যুদ্ধের শেষে জেনারেল শেরম্যান মুক্ত মানুষদের জন্য জমি বন্টনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ব্যক্তি/পরিবার প্রতি বরাদ্দ হয়েছিল চল্লিশ একর করে জমি। আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যুর পরই পুনর্গঠনের চেষ্টাকে সক্রিয়ভাবে ঠেকাতে এগিয়ে এলেন নতুন প্রেসিডেন্ট অ্যাণ্ড্রু জনসন। ঘোষণা করলেন: দাসপ্রথার আইনগত বিলুপ্তির সঙ্গে ‘পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়েছে”। সারা সমাজ জুড়ে ফিরে এল ‘স্লেভারী’, নতুন নামে। সদ্য প্রাপ্ত জমির মালিকানা ফিরিয়ে দিয়ে সেই মাটিতেই ক্ষেত-মজুরীর (share-cropping) জীবন শুরু হলো। এখনো এদেশের ইতিহাসে ‘ফর্টি একর্স এণ্ড আ মিউল’ গোটা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার সারমর্ম/প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, আইন, গণ-মাধ্যম---যাবতীয় সামাজিক সম্পদ নতুন করে ছিনিয়ে নেওয়া হল। সমাজের সুযোগ-সুবিধে ‘কালো’ মানুষের নাগাল থেকে সরিয়ে রাখার দায়িত্বে তৈরী হল কুখ্যাত ‘ক্যু-ক্লুক্স-ক্ল্যান’ (Ku-Klux-Klan)-এর মত সংগঠন। ‘জিম ক্রো’(Jim Crow)আইনে ‘সাদা’-দের জন্য রক্ষিত স্কুল, রেস্তোরা, সুইমিং পুল সহ অন্যান্য পাব্লিক এলাকায় কাল-মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ হল। এসবই অবশ্য চলেছিল ‘সেপারেট বাট ইকুয়াল’ (‘separate but equal’)- এর ‘যুক্তিতে’, ঠিক যেমনটি হয়েছিল গোড়ায়, ‘লিবার্টি, ফ্রীডম এণ্ড পারস্যুট অফ হ্যাপিনেস’ (‘liberty, freedom and pursuit of happiness’) –এর দোহাই দিয়ে!—পূর্ণ গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকে সামলে রাখা হল শেয়ার-ক্রপিং আর ‘সেগ্রিগেশন’-এর সাহায্যে।


    ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ এবং ‘নিউ ডীল’

    ১৯২৯ সাল, আমেরিকা সহ গোটা বিশ্বের এক নিদারুণ আর্থিক-সামাজিক বিপর্যয়ের অধ্যায়, যা আজও ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ (“Great Depression”) নামে পরিচিত। ইতিহাস থেকে এও আমরা জানি কেমন করে প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট গোটা সমাজটাকে সেদিন নিশ্চিত পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তাঁর NRA (National Recovery Act), যা ‘নিউ ডীল’ (“New Deal”) নামে পরিচিত, ব্যবস্থার সাহায্যে। শুরু হয়েছিল দেশ জুড়ে এক দারুণ কর্মযজ্ঞ। সরকারী বিনিয়োগে তৈরী হল নতুন ব্রিজ, রাস্তা, কারখানা। আর, তার সাথে চাকরির সুযোগ। এমনকি সাধারণ গরীব শ্রমিক পাড়ায় পাড়ায় তৈরী হল থিয়েটার হল, সংস্কৃতিকে বৃত্তে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর এই পরিকল্পনার সুযোগ থেকে আওতায় এল না কেবল ‘আফ্রো-আমেরিকান’ গোষ্ঠী। সচেতন ভাবেই কৃষিশ্রম এবং গৃহশ্রমকে রাখা হয়েছিল ‘নিউ ডীল’-এর পরিকল্পনার বাইরে। কারণটা ‘সোজা’, এই দুটি ক্ষেত্রই ছিল আফ্রো-আমেরিকান শ্রমের উপর নির্ভরশীল। ‘দক্ষিণের’ ‘সাদা’ ভোট হাতে রাখতে এই মাসুল দিতে হয়েছিল রুজভেল্ট-দের। এরই প্রতিক্রিয়ায় ১৯৩৫ সালে ‘হারলেম’ (“Harlem”) ফেটে পড়ল বিক্ষোভে (Zinn 404)। হাজার দশেক আফ্রো-আমেরিকান নারী-পুরুষ তছনছ করেছিল ‘সাদা’ প্রতিষ্ঠান, দোকান-বাজার। শেষ জীবনে রুজভেল্ট স্বীকার করেন ‘দক্ষিণ’-এর সাদা-সমাজকে হাতে রাখতে এই ব্যবস্থা মেনে নিতে হয় তাঁকে। ‘নিউ ডীল’-কে আজ অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীই তাই ‘সাদা’ মানুষের জন্য তৈরী ‘আফরমেটিভ একশান’ (“affirmative action’) হিসেবে দাবী করেন।


    সিভিল রাইট্স: দ্বিতীয় পর্যায়ের সংস্কার

    শেষ পর্যন্ত রেভরেন্ড মার্টিন লুথার কিং-এর নেতৃত্বে ষাটের দশকের গণ-আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আইনগতভাবে ‘সেগ্রিগেশন’ তথা ‘বর্ণবিদ্বেষের’ সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু, এতদিন ধরে গেঁথে বসা সংস্কার কী আইনের খোঁচায মেলান যায়? মধ্যবিত্ত পাড়াতে কালো-পরিবার আসতে শুরু করায় ‘সাদা’ সমাজে পালাই-পালাই রব উঠল। আইনকে তোয়াক্কা না করে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের অভ্যস্ত গন্ডি সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থায় তৎপর হয়ে উঠল। শহরগুলোর প্রান্তে পড়ে রইল গরীব আফ্রো-আমেরিকান আর লাটিনো সমাজ। আর, শহর থেকে দূরে গড়ে উঠল মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ‘সাবার্ব’, মূলত ‘সাদা’-দের নিয়ে। ‘সিভিল রাইটস বিল’ পাশ হয়ে যাওয়ায় মূলস্রোত আমেরিকা এবার নিশ্চিন্ত, ‘আফ্রো-আমেরিকান গোষ্ঠীর সমস্যা সামলানোর দায় এবার সম্পূর্ণ সেই গোষ্ঠীর মানুষের নিজেদের’।


    বাসস্থান আর পাব্লিক স্কুল: ‘স্লেভারী আন্উইলিং টু ডাই’ (“Slavery Unwilling to Die”)

    গৃহ-যুদ্ধের আগে দাসমালিকদের প্রাসাদের গন্ডিতেই দাস-কুঠিতে (slave-quarters) আলাদা থাকতো হতো আফ্রো-আমেরিকানদের। দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে দেওয়ার পর ‘সাদা-সমাজ’ টিকিয়ে রাখল পুরোনো রীতি ‘Jim Crow” চালু করে। আবার, ১৯৬৮ সালে সিভিল রাইটস বিল পাস হওয়ার পর শহরের পাব্লিক স্কুলে ‘কালো’ ছাত্ররা আসতে শুরু করায় ‘সাদা’ ছাত্ররা পাব্লিক স্কুল ছেড়ে দলে দলে বেসরকারী স্কুল-এ যেতে শুরু করল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, কেমন করে আমেরিকান ‘সবর্ব’ তৈরী হয়েছিল ‘সাদা’ সমাজ ‘কালো’ মানুষের সংসর্গ এড়াতে শহর ছেড়ে দূরে তাদের আস্তানা গড়ে তুলতে শুরু করায়। এসময়, ‘ফোর্ড মোটর’ কোম্পানী এই প্রক্রিয়াকে সহজ এবং ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছিল, শহর ছেড়ে অনেক দূরে, বিশাল জমি নিয়ে তৈরী হল বিলাসী ‘সাদা’ সমাজ, যা আমেরিকান সাবার্ব নামে পরিচিত। এদেশের সরকারী নিয়ম অনুয়ায়ী ছাত্র যে অঞ্চলে বাস কেবল সেই এলাকার পাব্লিক স্কুলেই তাকে যেতে হবে। আর, পছন্দ না হলে দামী বেসরকারী স্কুলে যাও! সাদা বড়লোকেরা ‘সবর্ব’-এ সরে আসায় “কালো পাড়া”-র ইস্কুলের বরাদ্দ অর্থের ভাগ কমতে লাগলো। হিসেবটা সহজ: পাব্লিক স্কুল চলে মূলত সেই এলাকার বাসিন্দাদের আয়কর থেকে। অর্থাৎ, মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পাড়ার স্কুলের মান স্বভাবতই উঁচুতে রইল আর শহরের গরীব অঞ্চলের ইস্কুলের মান নীচে। আর, এই ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার জন্য হাতে রইল ‘সরকারী ব্যবস্থা’। এই ভাবে শহরের ভেতরের স্কুল (“inner city school’)-গুলি দারিদ্র্য, ‘ড্রাগ’ আর বন্দুকের অবাধ মিলন-ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াল। আইনকে পুরোপুরি ‘অগ্রাহ্য’ করে না হলেও, আইনকে সামলেই টিকে রইল আমেরিকান-অপার্থেইড (apartheid) একবিংশ শতাব্দীতেও।


    ‘ওয়েলফেয়ার’ বা রাষ্ট্র-কল্যাণমূলক ব্যবস্থা’-র ওপর আঘাত:

    আমেরিকায় আধুনিক ‘Welfare System’ বা ‘কল্যাণমূলক ব্যবস্থা’ প্রচলিত হয় “গ্রেট ডিপ্রেশান”-এর সময়ের বিপর্যয় সামাল দিতে, “নিউ ডীল”-এর অংশ হিসেবে। এই সময়েই নিয়ম-মাফিক দরিদ্র্ আফ্রো-আমেরিকান গোষ্ঠী এই সরকারী অনুদানের সুফল খানিকটা পেতে শুরু করেন। সাদা-কালো নির্বিশেষে গরীব পরিবারগুলির জন্য Aid to Families with Dependent Children (AFDC), স্কুল মিলস , ‘ফুড-স্টাম্প্স’ মেডিকেড, মেডিকেয়ার ইত্যাদি ব্যবস্থা হল। নিউ ডীলের কারণে সাময়িকভাবে রক্ষা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ভুলে গেল “গ্রেট ডিপ্রেসনের” ভয়ানক অভিজ্ঞতা। আর, সুবিধাভোগী সমাজের পক্ষ থেকে দাবি উঠল “welfare” ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে, সরকারী ব্যয় সামলানোর ছুতোয়। তড়িঘড়ি উঠে এলেন রোনাল্ড রেগনের মতো নেতা। ‘ওয়েলফেয়ার কুইন’ (“welfare queen”)-এর মিথ তৈরী হয়েছিল এইসময়েই। সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল গরীব (মূলত ‘কালো’)মেয়েদের প্রতি কদর্য কটাক্ষ এবং বিদ্রূপ। এই মানসিকতা সমাজের এমনই গভীরে গাঁথা যে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন-কেও ওয়েলফেয়ার রেফর্ম বা সংস্কারের অজুহাতে গরীব মেয়েদের, যাঁরা একলা ছেলেপুলে নিয়ে কোনরকমে দিনযাপন করছেন তাঁদের প্রয়োজনে বরাদ্দ অনুদানের ভাগ ভয়ংকর ভাবে ছেঁটে ফেলতে হয়। এ সেই প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন যাঁকে ঠাট্টা করে বলা হতো ‘প্রথম ব্ল্যাক প্রেসিডেন্ট’, আফ্রো-আমেরিকান সংস্কৃতির প্রতি যাঁর দরদ আর ভালোবাসার কথা ‘সুবিদিত’!


    আজকের অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং ‘প্রান্তিক-সমস্যা’:

    দেশ-জুড়ে(এবং পৃথিবী-জুড়ে) আজ যে অর্থনৈতিক ‘সুনামী’ নেমেছে তার সঙ্গেও আমেরিকার বর্ণ-বৈষম্যের একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। ‘আমেরিকান ড্রীম’-এর মূল কথা হল বাড়ীর মালিকানা। ‘পুনর্গঠন’-এর সময় থেকেই অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান-গুলির ঝোঁক এই ‘আমেরিকান ড্রীম’-এর গপ্পকে সামনে রেখে সদ্য-মুক্ত আফ্রো-আমেরিকান-দের সামান্য পুঁজিটুকু কব্জা করা। ‘স্লেভারী’-পরবর্তী সময়ে “ক্ষেত-মজুরী’ এবং ‘ডেট-পিয়নেজ’-এর ঘটনা নথিবদ্ধ আছে। এক কথায় বাড়ী-র মালিকানা অনেকদিন পর্যন্ত ‘সাদা-সমাজের’ একচেটিয়া অধিকার ছিল। সময় খানিকটা এগিয়েছে, তার সঙ্গে ‘তাল’ রাখতে গেলে কিছু ‘সংস্কার’ প্রয়োজন। তাই ‘সরকারী’ পক্ষ থেকে ব্যাঙ্কগুলিকে উৎসাহ দেওয়া হল ‘সহজ’-কিস্তিতে ‘কালো’-মানুষকে ঋণ দিতে। তাদের বলা হল না যে এই সহজ কিস্তির একটা ভয়ংকর বিপজ্জনক দিক আছে। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন-এর আমল থেকেই এই চেষ্টার শুরু। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় ব্যাঙ্কগুলির ওপর ‘সরকারী’ নজরদারী প্রায় সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হল। এ যেন সেই ‘ক্যাটরিনা’-র মতই, দুর্বল ‘লেভি’-র বাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে গেল মূলত ‘কালো’-মানুষকে। আজকে অবশ্য সেই জোয়ারে সাদা-কালো দরিদ্র, এমনকি মধ্যবিত্ত-জীবন পর্যন্ত বিপন্ন।

    “অগ্নিকোণের তল্লাট জুড়ে দুরন্ত ঝড়ে তোলপাড় কালাপানি” —কবির ‘অগ্নিকোণ’ (সুভাষ মুখোপাধ্যায়) ছিল ভারতবর্ষের উত্তর-পুবে, চীন-দেশে। আজকের ‘তোলপাড়’ ঈশান-কোণ থেকে ঘুরে উত্তর-পশ্চিমে, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যে। সেই ঢেউ এসে লাগছে সুদূর আমেরিকার Midwest-এ, যেন কোনও ‘দৈব-যোগে’! যে কোনও কৌতুহলী দর্শকের মনে হতেই পারে মিশরের উত্তাপে আমেরিকার শ্রমিক-আন্দোলন বুঝিবা দীর্ঘ শীতঘুম থেকে নড়েচড়ে উঠছে। দুর্ভাগ্যবশত: বর্ণবিদ্বেষ আমেরিকার শ্রমিক-আন্দোলনকে একেবারে শুরু থেকেই দ্বিধাবিভক্ত করে রেখেছে। না হলে কোথায় ছিল এইসব প্রতিবাদকারীরা যখন প্রেসিডেন্ট রেগন কিংবা প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন ওয়েলফেয়ার রেফর্ম’ করেছিলেন গরীব মেয়েদের জীবনের মূল্যে? ‘উইসকনসিন’ বা ‘মিডওয়েস্ট’-এর মূলস্রোত সমাজ ‘সাদা’, তাই আন্দোলনের সফলতা সম্পর্কে সংশয় থেকেই যায়। আমেরিকার শ্রমিক-আন্দোলন সম্পর্কে মার্ক্স-সাহেবের ১৮৬৭ সালের মন্তব্য আজও করুণভাবে প্রযোজ্য: “In the United States of America every independent movement of the workers was paralyzed so long as slavery disfigured a part of the Republic. Labor cannot emancipate itself in the white skin where black is branded.” (Feagin 4) ১৮৬৭ সালের ব্যাধি আজও জড়িয়ে রেখেছে সমাজটাকে, আরও অনেক সূক্ষ্ম জালে।

    ‘সাদা-কালো’-র ‘আইডিয়লজী’ আমাদের জাতপাতের মতই মোক্ষম অস্ত্র, যেকোনো প্রগতিশীলতাকে ঠেকিয়ে রাখতে এর জুড়ি নেই। এই ‘বোধ’ থেকে জন্ম নিয়েছে এক চরম অবাস্তব ধারণা ‘নীগার’(“Nigger”), জনমানসে্র গভীরে গাঁথা একটি এমন জীবন্ত ‘ছবি’, সামাজিক বিবর্তন এবং ন্যূনতম যুক্তবুদ্ধিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সে মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ‘সব কালো-মানুষই অশিক্ষিত, আলসে, অসৎ আর বেহিসেবী’ - এককালে এই ছিল সোজা হিসেব। সময় পালটেছে, তাই তাল রাখতে আদ্যিকালের ফর্মুলায় আজকে গোটা সরকারি কর্মচারীদের, বিশেষ করে সরকারী ইস্কুলের শিক্ষকগোষ্ঠীকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, কর্মবিমুখতা, অদক্ষতার দোহাই গেয়ে। সেই একই যুক্তি: ‘সমাজের জঞ্জাল’ উপড়ে না ফেললে ‘ফ্রী মার্কেট’-এর ম্যাজিক অবাধে চলবে কী করে? এই যুক্তিতে ভরসা করে, ক্ষমতা, লোভে অন্ধ ‘উইসকনসিন’-এর রিপাবলিকন গভর্নর স্কট ওয়াকার সরকারী কর্মচারীদের ইউনিয়নে যোগ দেওয়া (collective bargaining power)নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বসলেন। শ্রমিকদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হল গণ-আন্দোলন। শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দিতে এগিয়ে এলেন পাব্লিক স্কুল শিক্ষক, এমনকি ছাত্ররা শুরু করল ক্লাস্-বয়কট, শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে। আজও চলছে সেই লড়াই, গভর্নর ওয়াকরের দলকে ইতিমধ্যেই কোণঠাসা করে। সত্যিকথা বলতে কী, ওয়াকরের এই চরম নীতিই যেন খানিকটা অনুঘটকের কাজ করল শ্রমিক-আন্দোলনের শীতঘুম ভাঙ্গাতে।

    সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের সামনে আজ মস্ত চ্যালেঞ্জ: ওবামার ঐতিহাসিক ভুলকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া। সেই এগোনো সম্ভব হবে বর্ণবিদ্বেষের বীজকে আমূলে উপড়ে ফেলার সচেতন চেষ্টার মধ্যে দিয়ে, প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে। আর, আফ্রো-আমেরিকান সমস্যার সমাধানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গোটা সমাজটার মুক্তির চাবিকাঠি —এই উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে। আসলে, এদেশের রাষ্ট্রনেতারা, রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্রাট, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই এতকাল একমাত্র গ্রহণযোগ্য অর্থনীতি হিসেবে ধরে নিয়েছেন, যার ভিত্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ‘উদ্যোগ’; পরিণাম অফুরন্ত প্রাচুর্যের পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য। আর, তারই সঙ্গে তাল মিলিয়ে জায়গা করে নিয়েছে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ (=সাম্রাজ্যবাদ)। এই নিয়মে মাঝে-মাঝে তীব্র বিপর্যয়ও ঘনিয়েছে, যেমনটি ঘটেছিল ১৯২৯ নাগাদ। “নিউ ডীল”-এর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য মিলিয়ে গেছে সব সতর্কতা, নতুন করে প্রচলিত ‘ধনতন্ত্র’ গুছিয়ে বসেছে, সামাজিক ক্রিয়াকলাপে, মানুষের মনে! তবে, আজকের বিপর্যয় এতই গভীর এবং ব্যাপক যে ‘নিউ ডীল’-এর কায়দায় কোনও আংশিক পরিবর্তনে এই বিশাল ধ্বস সামলানো সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় সকলের মনেই। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু আমেরিকার বোধহয় সময় এসেছে অভ্যস্ত ধনতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সীমার বাইরে পা বাড়ানো। তবে সেই আহ্বানে সাড়া দিতে রাজী এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব কোথায়? আবার, হতাশাকে পাশে ঠেলে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে: আজ আবার যখন সমাজের ভেতরের জমে থাকা দ্বন্দ্ব, বিক্ষোভ উপছে উঠছে, ঠিক তখনই আরব-মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকারই মদত-পুষ্ট একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে জোরালো হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের সোচ্চার। জমি আবারও তৈরী, তবে এখনো হলপ করে বলা মুশকিল আজকের বিদ্রোহও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবের রাস্তায় পৌঁছবে কিনা। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কেবল আশা করা যায় যে ‘আমেরিকান স্বপ্ন’-এর স্বাদ পেতে সারা পৃথিবীর মানুষ ছুটে এসেছে, অথচ যে ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ আজও অধরা-ই থেকে গেছে তা বাস্তবে রূপায়িত হোক প্রকৃত মানব-মুক্তির মন্ত্রে, ভেতরে এবং বাইরে সঙ্গতি রেখে, যেমনটি ভেবেছিলেন এদেশের কবি:

    “O, let America be America again---
    The land that never has been yet---
    And yet must be—the land where every man is free.
    The land that’s mine---the poor man’s, Indian’s, Negro’s
    ME---……”

    ----James Mercer Langston Hughes (as quoted by H. Zinn)


    (*) টোনী মরিসনের উপন্যাস ‘Song of Solomon’-এর সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

    এই রচনায় প্রায় কোনও লেখকের প্রত্যক্ষ কোটেশন নেই। এই সমাজের ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য বুঝতে যেসব বই বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছে তার বিবরণ রইল নীচে:

    • Davis, Angela Y. “Women, Race and Class”, Vintage Book, 1983
    • Feagan, Joe R. “Racist America”: Roots, Current realities & Future Reparations Pub. By: ‘Routledge’, 2001
    • Giddings, Paula, “When and Where I Enter: The Impact of Black Women on Race and sex in America”, Bantan Books, NY, 1984
    • Zinn, Howard, “A People’s History of the United States: 1492-Present”, Harperperennial Modern classics, 1999]



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)