• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪৬ | সেপ্টেম্বর ২০১০ | গ্রম্থ-সমালোচনা
    Share
  • গ্রন্থপরিচয়: রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্র, ধূর্জটিপ্রসাদ অনুবাদে-অনুভবে, খেরোর খাতা, তারানাথ তান্ত্রিক : ভবভূতি ভট্টাচার্য


    ॥ ইট-কাঠ-পাথরে রবিকিরণ, বৃক্ষ-শষ্পেও ॥


    রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্র , ভঁংঊইয়া ইকবাল . "বাংলা একাডেমী", ঢাকা . প্রথম প্রকাশ মে ১৯৮৫ । ISBN: 984-07-3313-3


    সাড়ে-পাঁচ বছরের এক বালক মামুন মাহমুদ । সহজপাঠ পড়ার আনন্দে বিশ্বকবিকে এক পত্র লিখেছে । কবি জবাবে তাকে লিখলেন, "বত্স, তুমি যখন আমার সহজপাঠ পড়েছ, তখন বিনা-পরিচয়েই আমার সঙ্গে তোমার জানাশোনা হয়ে গেছে । ……বয়স হলে শান্তিনিকেতনে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো ।" (পরবর্তী জীবনে এই মামুন মাহমুদই ছিলেন সেই সৎ ও নির্ভীক পুলিশ অফিসর, মুক্তিযুদ্ধকালে যিনি খান সেনাদের হাতে শহিদ হন ।)

    বা, পরবর্তী কালের নামী সাহিত্যিক মোহাম্মদ ফেরদাউস খান । দশম শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় রবীন্দ্রনাথকে বলাকা -র "হে বিরাট নদী, ……..যে মুহূর্তে পূর্ণ তুমি সে মুহূর্তে কিছু তব নাই"-এর গূঢ়ার্থ জানতে চেয়ে লেখেন । কবি তাকেও বিমুখ করেননি । কী চমত্কার তাঁর একলাইনি উত্তরখানি, লিখলেন, "চিরধাবমান যে কালের স্রোতে সূর্য চন্দ্রতারা ভেসে উঠেছে এবং ডুবে যাচ্ছে, যার মধ্যে কোনো ধ্বংস অবশেষ মলিনতা রেখে যায় না তাকেই নদীর সঙ্গে তুলনা করেছি "।

    বা, কম. মুজাফ্ফর আহ্মদের জামাতা সাহিত্যিক-সম্পাদক আবদুল কাদির সাহেবের দিলরুবা কাব্যগ্রন্থ পড়ে কবির শংসাপত্র, যা কাদির সাহেবের আজীবন পাথেয় হয়ে ছিল । স্মৃতিকথায় লিখেছেন তিনি, "আমি আবার গুরুদেবকে কদমবুসি করলাম । তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করলেন । সেদিনের দেখা সুমহান রবীন্দ্র-মূর্তির স্মৃতি আমার মনে অম্লান হয়ে আছে ।"

    রবীন্দ্রনাথ কোনো অনাত্মীয়কে পত্র লিখছেন, নাম-সই দাদু বলে, কী চমত্কার, না ?! লিখেছেন, কালিম্পং থেকে ৫ আষাঢ় ১৩৪৫ তারিখে, বগুড়ার কিশোরী জেব-উন-নেসা জামালকে : "আমার কবিতা তোমার ভালো লাগে, সেই ভালো লাগার সম্বন্ধটাই টিকে থাকবে, সেজন্য আমারও টিকে থাকবার দরকার রইবে না ।" এ'শিক্ষা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কে-ই বা দিতে পারতেন ?

    এ'হেন মণিরত্ন ছড়িয়ে আছে এই কেতাবের পাতায়-পাতায় । পড়তে পড়তে চোখে জল এসে যায় : ইনি কবি বিশ্বকবি নন, শিক্ষাশাস্ত্রী, সঙ্গীতকার বা ভাষাবিদো নন । ইনি আমার বড় আপনার মানুষ, আমার প্রাণের মানুষ । সে-সব ছড়িয়ে থাকা নামী-অনামী পাঠক-পাঠিকার মধ্যে সেই ঋষিপুরুষ যেন খঁংউজে পান তাঁর কোনো হারানো কন্যাকে, কোনো প্রিয়জন, সখাকে-------এ'বাস আসে এই পত্রাবলী থেকে । এ'সকল পত্রের প্রাপকগণও বহু যত্নে-আনন্দে লালন করে এসেছেন এ'সকল পত্রাবলী । সম্পাদক ভঁংঊইয়া সাহেবের মুন্সিয়ানা এই, যে বহু ক্লেশে বহু শ্রমে এ' সকল পত্র দুই-মলাটের মধ্যে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ফোটোকপি সহ । তাই এ'-কেতাব সযত্নে ঘরে রাখার মত-------আনন্দে, বুকের কাছে ।

    হঁযা, এ'সংকলনের সমস্ত প্রাপকগণই ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান ছিলেন । সেটিই এই গ্রন্থের বিশেষত্ব । কবির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি (১৯১৩) থেকে তাঁর প্রয়াণের (৭ অগাস্ট ১৯৪১) আড়াই মাস আগে পর্যন্ত ঊনচল্লিশজনকে লেখা বাহান্নটি চিঠি এই সংকলনে ঠাঁই পেয়েছে ।

    অবশ্য, শুধু ব্যক্তিগত আদরের সুরে তাঁর দূর-দূরান্তের ভক্তজনকে লেখামাত্র নয়, কবির এ' পত্রাবলীতে উঠে এসেছে অনেক গূঢ় সমস্যা-প্রসঙ্গও । যেমন এম. এ. আজান বা আলতাফ চৌধুরীকে লেখা দীর্ঘ চিঠিগুলি, যাতে বাঙলা ভাষায় আরবি-ফার্সি শব্দের বহুল ব্যবহার প্রসঙ্গে মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন কবি, উঠে এসেছেন এক উদার, মহান বিশ্বকবি । বা, তত্কালীন যুক্তবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী স্যর আজিজুল হককে লেখা তাঁর শিক্ষা-ভাবনা সম্বলিত দীর্ঘ পত্রখানি । বা, সিরাজগঞ্জের জেহাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর এলাহী বক্স সাহেবকে লেখা অসাধারণ পত্রখানি, যেখানে কবি লেখেন, "মানুষের দু:খ-দূর ঈশ্বরের উপাসনার শ্রেষ্ঠ অঙ্গ । …………যাঁর বাক্যের দ্বারা কর্মের দ্বারা কোন মানুষ পীড়িত হয় না, তিনিই যথার্থ মুসলমান ।"

    এ'সবই সংকলনখানির মণি-মুক্তো ।

    কে নেই তাঁর পত্র-প্রাপকের তালিকায় ? নামী, বিখ্যাতজন থেকে অনামী-অখ্যাত ভক্তকুল, যাঁদের পরিচয় বহু প্রচেষ্টাতেও সম্পাদকমশায় খঁংউজে পাননি । মহ: শাহীদুল্লাহ্‌, কাজী আবদুল ওদুদ, সুফিয়া কামাল, আর আহ্মেদ (ভারতে আধুনিক দন্তচিকিত্সার পুরোধাপুরুষ), কবি নজরুল-বন্দে আলী মিঞা-জসীমউদ্দীন-গোলাম মোস্তাফা, আচার্য রেজাউল করিম, হুমায়ুন কবীর-------এনারা সব বিখ্যাত মানুষ । আবার, ৯৭ পৃষ্ঠার চমত্কার পত্রখানি যে কাজী আহমদকে লিখেছেন কবি, তিনি নিতান্তই অনামী, তাঁর পরিচয় জানা যায়নি । কবি তাঁকে লিখেছিলেন, "ধর্ম যদি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, খর্ব্ব করে, তার চেয়ে শোচনীয় কিছু হতে পারে না । যাঁরা সর্ব্ব মানুষের এক ঈশ্বরে যথার্থ বিশ্বাস রাখেন, তাঁরা কোনো কারণেই মানবকে অপমান করে নিজের ধর্মকে অপমানিত করতে পারেন না ।" ------- এ'যে রবিকিরণ : বৃক্ষ-শষ্পে যেমন পড়ে, পড়ে তেমন ইট-কাঠ-পাথরেও ।

    "অবোধ জনে কোল দিয়েছেন তাই আমি তাঁর চেলা "!

    শেষে কয়েকজন পত্রপ্রাপকের সাদাকালো আলোকচিত্র মুদ্রিত হয়েছে । তাতে মুর্শিদাবাদের নবাব মির্জা ওয়াসিফ আলীর চিত্র দেখে ভাবলাম, ইনিও কি বাঙলাভাষা জানতেন নাকি ? না, এ'-কেতাবের শেষাংশে এক ছোট ইঙ্গ-বিভাগও রয়েছে যে, তাতেই স্যর খাজা নিজামুদ্দিন, বিহারের খলিলুর রহমান সাহেবের পাশে মুর্শিদাবাদের নবাবসাহেবকে লেখা পত্রখানিও স্থান পেয়েছে, যাতে তাঁকে " Dear Nawab Bahadur" বলে সম্ভাষণ করেছেন কবি ।

    এ'গ্রন্থখানিকে অবশ্য নতুন বলা যাবে না : ১৩৯১-এর' দেশ সাহিত্য-সংখ্যায় এর কিছু চিঠি প্রকাশিত হবার পর, ১৯৮৫তে গ্রন্থাকারে প্রথম মুদ্রণ বেরোয় । বর্তমানে তাই এটিকে দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের তালিকাতেই রাখতে হবে । ঢাকা বাঙলা একাদেমির কাছে, অতএব, আমাদের আবদার এই বই পুন:মুদ্রণের । কিছু মুদ্রণপ্রমাদও অবশ্য শুধরে নিতে হবে । শুরুর দিকে চমত্কার রবীন্দ্র-স্কেচখানির সাক্ষর চিনি-চিনি করেও চিনতে পারলুম না ! শিল্পী-পরিচয়ও দেওয়া নেই । মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর-কৃত প্রচ্ছদখানিও বড্ড সাদামাটা হয়ে গেল যে ! আরও সুন্দর ও শিল্পসুষমামণ্ডিত প্রচ্ছদ চাই, এ' বইয়ের সৌরভ যাতে আঘ্রাত হবে ।




    ॥ মহারাজ ,………নিরখি শুধু অন্তরে ॥


    ধূর্জটিপ্রসাদ : অনুবাদে-অনুভবে , অনন্তকুমার চক্রবর্তী, সুচেতনা প্রকাশন, কলকাতা - ৯; ISBN : নেই


    তাঁর বহুধা বিভক্ত প্রতিভার কোনো তুলনা ছিল না ।

    "বিচিত্র ছাত্রজীবন । ইংরেজী ও সংস্কৃতে প্রথম হয়েও দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পাশ করেন (১৯০৯) । কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে দুই বছর আই-এস-সি পড়েন । পরের বছর ১৯১২ খৃ রিপন কলেজ থেকে পাশ করে ইংরেজীতে অনার্স এবং রসায়ন ও গণিত নিয়ে বি.এ পড়া শুরু করেন । কিন্তু ইংরেজী ও গণিতে ভাল নম্বর পেলেও রসায়নে ফেল করেন । বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ১৯১৬ খৃ বি.এ ও ১৯১৮ খৃ এম.এ পাশ করে আইন পড়তে থাকেন । ১৯২০ খৃ পুনরায় অর্থনীতিতে এম.এ পাশ করেন । ………..১৯২২ খৃ লক্ষ্মৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্ব বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দেন । এখানেই ৩২ বছর কাটে ।" ------- [সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান]

    আবার এই ধূর্জটিপ্রসাদই ছিলেন লক্ষ্মৌ ম্যারিস কলেজের (অধুনা, ভাতখণ্ডে সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়) সর্বপ্রথম ব্যাচের ছাত্র, অশোক মিত্র (আই.সি.এস) যাঁকে "এক প্রকৃত রেনেশাঁস পুরুষ" বলে বর্ণনা করেছেন । অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্রের মতে, "ওই একটি মানুষ, যিনি একা লক্ষ্মৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদল পাল্টে দিয়েছিলেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে সংস্কৃততর করেছিলেন, সম্ভ্রান্ততর করেছিলেন ।" ১৯৪৯-এ শচীন চৌধুরী যখন বম্বে থেকে "ই.পিড়ব্লু" প্রকাশ শুরু করেন, প্রথম সম্পাদকীয় লেখার ভার পড়েছিল কার ওপরে ? সেই লক্ষ্মৌর ডি পি মুখুজ্জে, আর কে ? সম্পাদক-মশায় স্বয়ং সে-গর্বে গর্বিত ছিলেন !

    আর, এই-কাহিনি খানি বহুপূর্বে কোথাও পড়া, তথ্যচ্যুতি তাই হতেও পারে : একবার, ধূর্জটিপ্রসাদ তখন লক্ষ্মৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক । দর্শন বিভাগ এক আলোচনা-সভার আয়োজন করেছে, তাতে দেশের কোণ-কোণ থেকে নামীদামী পণ্ডিতগণ এসেছেন । কিন্তু, কী সর্বনাশ ! বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নিজেই যে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লেন ! কী হবে এবার ? কে দেবেন প্রধান আহ্বায়কের স্বাগতভাষণ ? ছাত্রদের মাথায় হাত ! তারা উপাচার্য নরেন্দ্র দেবকে ধরে পড়ল । তাঁর কিন্তু কোনো হেলদোল ছিল না । তিনি সটান বলে দিলেন, "তোমরা প্রোফেসর ধূর্জটীপ্রসাদকে ধরো । উনিই উদ্ধার করবেন ।" বাস্তবে হলও তাই । অর্থনীতির অধ্যাপক ধূর্জটিপ্রসাদ ঝাড়া দেড়টি ঘন্টা এস্থেটিক্স নিয়ে ভাষণ দিলেন দেশ-বিদেশের নামীদামী বিদ্বজ্জনের সম্মুখে । বেঁচে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ।

    এই ছিলেন ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় : আদ্যন্ত বাঙালি এক সংবেদন শীল মানুষ ।

    আর হঁযা, ইনিই আবার অন্ত:শীলা, আবর্ত বা মোহানা -র মত মননশীল উপন্যাসের লেখকও বটেন !

    এ'হেন ধুর্জটিপ্রসাদকে কিন্তু বঙ্গদেশ চিনতে পারেনি, অন্তত: তাঁর জীবদ্দশায় (নইলে তাঁকে সারা জীবন লক্ষ্মৌ-আলিগড় করে কাটাতে হবে কেন ?) । চিনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ । স্বীকৃতি দিয়েছিলেন কালের এক শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতশাস্ত্রী রূপে । নইলে তাঁর সেই বিখ্যাত ব্যাঙ্গ-গীতিতে, "ভয় শুধু ধূর্জটিদাদার"-------এর ব্যাখ্যা কী ?

    যাহোক্‌, ধূর্জটিপ্রসাদ-বন্দনা একবার শুরু হলে সহজে থামবার নয়, যেমনটি করেছিলেন অনন্তকুমার চক্রবর্তী মশায়, তাঁর এই আলোচ্য গ্রন্থখানির মধ্যে দিয়ে : ধূর্জটিপ্রসাদ : অনুবাদে-অনুভবে । বাঙালি যে সময়মত গুণীর কদর আজও করতে শেখেনি, তার আরেক নমুনা-------জীবদ্দশায় বা আজও অনন্তকুমার কোনোরকম স্বীকৃতি পাননি । নইলে, গানের ভেলায়, বেলা-অবেলায় বা তোমার সুরের প্রতিধ্বনি -র লেখককে আজ চিনিয়ে দিতে হয় ? যে-কোনো বাঙালি সঙ্গীতপ্রেমীর কাছে অনন্য সম্পদ অনন্তবাবুর লিখন । যেমন, এ'খানি ।

    আলোচ্য গ্রন্থে লেখক অনন্তকুমার polymath -প্রতিভাধর ধূর্জটিপ্রসাদকে ছঁংউতে চেয়েছেন দু'ভাবে : এক : ধুর্জটিপ্রসাদের স্বীয়কীর্তির মধ্য দিয়ে------- "অনুবাদে" । আর দুই: গ্রন্থকারের মননে-------"অনুভবে" । এই ভঙ্গীটিই অনন্য, অসাধারণ !

    প্রথম "অনুবাদ" বিভাগে স্থান পেয়েছে ধূর্জটিপ্রসাদের চারটি যুগান্তকারী ইঙ্গ-রচনা, অনন্তকুমারের তরতরে বঙ্গানুবাদে :

    ১। ( Tagore, the Supreme Composer ) মহত্তম সংগীত স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ
    ২।
    ( Tagore —A Study, Ch-V : Drama & Music) নাটক থেকে সংগীত
    ৩।
    (Indian Music : An Introduction) ভারতীয় সংগীতের উপক্রমণিকা
    ৪।
    (Tagore's Music) রবীন্দ্র-সংগীত ।

    রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আলাপ-আলোচনা লিখন-পঠন গত প্রায় শতাব্দীকাল ধরে কম তো হয়নি, আজও হয়ে চলেছে, চলবেও । তবু, আজও ধূর্জটিপ্রসাদের সঙ্গীত ভাবনা-সম্বলিত প্রবন্ধাবলীর পুন: পুন: পাঠ নব নব উন্মোচন এনে দেয় : পাণ্ডিত্য ও আত্মনিবেদনের এ'হেন সমাহার আর কার লেখায় পাওয়া যায়, ভাবতে বসতে হবে । যেমন, তাঁর সাহিত্য একাদেমি প্রকাশিত `
    Tagore's Music ' প্রবন্ধখানি, যেখানে তিনি লিখছেন, "যদি বলা যায় তিনি তানসেন, বৈজু, গোপাল, সদারং, অদারং ও অনুরূপ শিল্পীদের চেয়েও বড়ো তা হলে বোধ হয় অত্যুক্তি হয় না…………এমন হতেও পারে, যে এই গুলিও কালক্রমে রাগ হয়ে যাবে, যেমন, ঠাকুরী বা রবীন্দ্র তোড়ি, রবীন্দ্র ভৈরবী, রবীন্দ্র-পূরবী বা রবীন্দ্র-সারং ইত্যাদি ।"

    পড়ে মনে ধন্ধ জাগে, ধূর্জটিপ্রসাদ কী সত্যিই অর্থোডক্স সঙ্গীতশাস্ত্রী ছিলেন, না নিবেদিতপ্রাণ রবীন্দ্রভক্ত ? মনের মধ্যে এ'হেন বিতর্ক উস্কে দিতেও তো এই বইখানি হাতের কাছে রাখা চাই । আর ধূর্জটিপ্রসাদের এই উচ্চতার চার-চারটি প্রবন্ধ দুই মলাটের মধ্যে পাওয়াই এক সৌভাগ্যের কথা নয় কি ?

    তবে, এখানেই শেষ নয় । দ্বিতীয় "অনুভব"-বিভাগখানি যেন আরও সমৃদ্ধ, আরও প্রাণবন্ত ! এখানে ধূর্জটিপ্রসাদের সঙ্গীত-ভাবনা ও সাহিত্য-শিল্প-ভাবনার ওপর অনন্তকুমারের দুইখানি মূল্যবান রচনা গ্রন্থিত হয়েছে, যে-মানের রচনা বাঙলা "সঙ্গীত-সাহিত্যে" বড় বেশি হয়নি । এখানে শুধু শিল্প-সাহিত্য নয়, বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কের মত জরুরী বিষয়ও আলোচিত হয়েছে । অনন্তকুমার লিখেছেন, "বৈজ্ঞানিকও যদি আর্টিস্টের কাছে শিক্ষানবিশি করেন তা হলে বিজ্ঞানেরই উপকার । দু'জনকেই সততার পথে চলতে হয়, ফাঁকি দিলে কারুরই চলে না । বিজ্ঞানের ইতিহাস আছে, আর্টের ইতিহাস আছে । দুয়েরই ইতিহাস সমাজ নির্ণয় করে, দুয়েতেই বাদ দিতে হয় অবান্তরকে ।"

    কী বলেন সুধী পাঠিকা ? এ'-বই একখণ্ড কাছে না রাখলে চলে ?

    অবশ্য, যদি পান । প্রকাশকের ঘরে অনন্তকুমার চক্রবর্তীর কোনো বই-ই আজ আর ছাপা নেই । সারা কলেজ স্ট্রিট ঢঁংউড়ে একখানিই মাত্র কপি পাওয়া গেল । এ'-বই তাই মাথায় করে রাখার মত !

    কোনো বড় হাউসের উচিত অনন্তকুমারের সমগ্র রচনাবলী সুলভে গ্রন্থিত করা । এতে বাঙলা প্রবন্ধসাহিত্য ঋদ্ধ হবে ।

    মাভৈ: ।


    ॥ অনাবিল আনন্দের অফুরন্ত উত্স ॥
    (একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ )


    খেরোর খাতা ; লীলা মজুমদার ; আনন্দ পাবলিশার্স ; কলকাতা - ৯ . প্রথম প্রকাশ ১৩৮৮ ISBN:


    মনখারাপ হলে স্বামী বিবেকানন্দ মৌনী নিতেন, রবীন্দ্রনাথ সারারাত জেগে নতুন গান বাঁধতেন, সত্যজিৎ রায় একা একা দাবা খেলতেন, আর এই-অধম লীলা মজুমদার পড়ে : পদিপিসির বর্মীবাক্স, গুপীর গুপ্তখাতা, টংলিং -------অফুরন্ত অমৃত-ভাণ্ডার ! গ্রন্থের অন্তিম উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষকে আনন্দ দেওয়া, ধর্মগ্রন্থের উদ্দেশ্য যদি হয় আরও আরও আনন্দ দেওয়া, তবে লীলা মজুমদারের রচনা অতি উচ্চস্তরের ধর্মগ্রন্থ ।

    বালাই ষাট্‌, সুধী পাঠক যেন এ' নিবন্ধকে "গ্রন্থ-সমালোচনা" ভাববেন না, এ' "গ্রন্থ-পরিচয়"-ও নয়, এ'হল নিখাদ "গ্রন্থ-তর্পণ", সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত । শৈশবে মধ্য কলকাতার ঘিঞ্জি গলির ক্লেদ যাঁদের কলম-কোদণ্ডে মুহূর্তে উদার আকাশে ডানা মেলে উড়ে যেত, সেই দীনেশ চট্টোপাধ্যায়, অনিল ভৌমিক, অজেয় রায়দের অগ্রগণ্যা ছিলেন লীলাদি, শ্রীমতী লীলা মজুমদার । পরে জানি, তিনি সত্যজিৎ রায়ের পিসি, ইংরিজি সাহিত্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম ! কিন্তু সেকালে কে আর অত খবর রাখত ? তিনি তখন পকেট থেকে লোম-ওয়ালা ল্যাবেঞ্চুস বের করা অতি আপন গুপী !

    লীলা মজুমদার বাঙলা সাহিত্যের অগ্রগণ্যা শিশু-সাহিত্যিক । কিন্তু সেটা যে তাঁর পরিচয়ের ছোট্ট এক অংশ মাত্র, তিনি যে শিশুর-চোখে-বিশ্ব-দেখা এক মহান রস-রচনাকার, সেটা যেন আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই । তাই আজ আমাদের এ' গ্রন্থ-তর্পণ, তাঁর এক রসরচনা ভাণ্ডার নিয়ে -- দেড়শো পৃষ্ঠার চটি খেরোর খাতা !

    রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ তো আমাদের চারিপাশেই ঘিরে রয়েছে : মানুষ-জনে, গাছে-পাথরে-সায়রে ------- সেটা কে কী ভাবে দেখেন ও তার প্রকাশ করেন (কেউ কলমে, কেউ তুলিতে তো কেউ সুরে)------- তাতেই এক-এক শিল্পীর পরিচয় । কেউ শুধু "লোক" দেখে, তো লীলাদির মত শিল্পী দেখেন "কাঠ-অচেনা সহযাত্রী" । তাঁর "বিজয়মেসোর চোখ দেখলে মনে হত সর্বদা হাসি পাচ্ছে ।" ট্রেনের কামরার নিভু নিভু আলো তাঁর ভাষায় "অন্ধকার যেন বারে বারে কথা কয়ে যাচ্ছে ।" তাঁর অনবদ্য বর্ণনায়, অসাধারণ অভিব্যক্তিতে "সামান্য দূরত্ব" "কাগ-ওড়া ছ' মাইল" হয়ে ওঠে । একটা বাক্য পড়তে শুরু করার আগে কী করে জানব তাতে হঠাৎ করে কী এক অসামান্য বর্ণনা আছে, কব্জির শেষ মুহূর্তের মোচড়ে বিশ্বনাথের লেট-কাটের মত ? উদা: (তাঁর শান্তিনিকেতনের কুকুরের গল্প প্রসঙ্গে :) "দুটো বয়স্ক কুকুরের বদলে একটা মা আর দুটো খিদে-পাওয়া ছানা আসে" !

    না:, এ' যেন 'ক্রিটিকাল এপ্রিশিয়েশন' হয়ে গেল । এ'সব তো পরে আসা উচিত । আগে গল্পটা তো শুনি :
    বাঘ বেরিয়েছে বর্মার জঙ্গলে, যেখানে লীলাদির বাবা জরিপের বড় সায়েব । মস্ত কুলীবস্তিতে ছাপ্পান্নটা তক্তপোষ আর পিঁড়ে । জ্বরোরুগী জানকীকুলি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "দাদা, দুপুরে বড় বাঘ এসে পিঁড়ে গুনে গেচে । রেতে ফের আসবে রে নিতে ! চল্‌, আমরা পালাই !"

    বা, রাতের ট্রেনের কামরায় বাইরে ঝুলন্ত ডাকাত (?) দোর খোলার অনুনয় করে চলেছে । মেয়ের দাপটে খুলতে পেলে না কোমলহৃদয় পটোদিদি । শেষটায় ডাকাত জল চাওয়ায় দু'টো ভীমনাগের কড়াপাক সহ দিতে বড্ড ভাব হয়ে গেল তার সঙ্গে । স্টেশনের আলো কাছে আসতে অবশ্য সে টুপ্‌ করে হাতটি ছেড়ে দিল !

    বা, সেই জন্তুপ্রেমী পড়শি-দম্পতি, যাঁরা টট্টরে গ্রীষ্মেও চড়ুইয়ের বাসা ভাঙার ভয়ে ফ্যান চালাতেন না ; বা, বাঘের বন্ধু বিজয়মেসো, যাঁর ঘরে মশারির মধ্যে ঢাউস সাইজের এক শিলিং ফ্যান ঘুরত । এ'হেন চরিত্রে আর ঘটনামালায় ভরা এ' খেরোর খাতা

    আরও আছে------- রবীন্দ্রনাথের হোমিওচিকিত্সা, লীলাদিরও (শেষটায় বাক্সের ওষুধের একেকটা ফুরিয়ে আসতে থাকায় কাছাকাছি নামের ওষুধ দিতেন তিনি, আর তাতে রোগ সারতও !) ; গুলিখোরের বাঘ পাকড়ানো, খৃশ্চানের লক্ষ্মী পুজো, পূণর্দার মাছ, সাপ, লক্ষ্মীরাম্মা, হেঁচকি ------- কোন্টা ছেড়ে কোন্টা বলব ? কোনো লেখাই দৈর্ঘ্য গড়ে আড়াই পাতার বেশি নয়, আড়াই-আড়াই ঘন্টার সুবাস ছড়িয়েও রেশ রেখে যায় !

    তাঁর নানা সময়ে নানান পত্রিকায় প্রকাশিত সাতচল্লিশখানি রম্য রচনার এই সংকলনটির মধ্যে অন্তত: দু'টি রচনার তুলনা মেলা ভার : এক. `পটোদিদি' আর দুই. `ভালোবাসা' । স্বাধীনচেতা পটোদিদি পায়ের কেড্সে প'ড়ে পাওয়া সবুজ তেলরঙের তলানিটুকু মাখিয়ে নেন জ্যাদা টিঁকবে বলে, এবং, নিজে "কে ?" ভুলে গেলে পটাপট দু'টো কঠিন ট্রিগোনোমেট্রির আঁক কষে নিতেন !! বারে বারে নানা কাহিনিতে উঠে এসেছেন লীলাদির এই মায়ের বয়সী ননদ পটোদিদি, বাঙলার প্রথম মহিলা গণিতস্নাতক, জন্ম ১৮৮৩ (কিংবদন্তী বাঙালি গণিতজ্ঞা ফজিলতুন্নেসা বেগমের সিনিয়র) ! হুঁ হুঁ বাবা, কী ভেবেছেন ? লীলা মজুমদারের এই গল্পে সব, স--ব চরিত্রই সত্যি, পাক্কা সত্যি, বাঘ-টাগ সহ । আর `ভালোবাসা' রচনাটি ? উঁহু, বলব না । জ্যোতি ঠাকুরের মত ঐতিহাসিক চরিত্র আছেন যে এতে ! সুধী পাঠক, এ'সব লেখা ইতোমধ্যে পড়ে ফেলেছেন তো আবার পড়ুন, বারবার পড়ুন । ধ্রুপদী সঙ্গীতের মত পরতে পরতে এর রস জেরে উঠবে ।

    একখানি মস্ত খামতি এই কেতাবের, যার কোনো ক্ষমা নেই : পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা অজস্র অসাধারণ পেন্সিল স্কেচ, যার মান প্রায় উপেন্দ্রকিশোরীয়, তার কোনো শিল্পী-নামোল্লেখ নেই !? অমিয় ভট্টাচার্যকৃত প্রচ্ছদখানি অনবদ্য হতে গিয়েও হতে পারেনি পিছনের শিলুয়েটগুলি চিত্রাঙ্কণের সঙ্গে বিরোধ ঘটিয়ে ফেলায় । ছবিটি তাই খুলল না ।

    এহ বাহ্য । বইখানি ঘরে রেখে দিন । দু'দিন তো অন্তত: পড়বেন : যেদিন বিষ্টি পড়বে, আর যেদিন পড়বে না ।


    ॥ চলে গেলেন তারানাথ : মট্‌ লেনের মেজবাবু ॥


    তারানাথ তান্ত্রিক , তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় । মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা - ৭৩ । প্রথম প্রকাশ ১৯৮৬ ।


    চলে গেলেন তারানাথ । থুড়ি তারাদাস । তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ।

    সূর্যসম পিতার ব্যক্তিত্বের ছটায় ম্লান শিল্পী-সাহিত্যিকের সংখ্যাও নেহাত কম নয় : সন্দীপ রায় থেকে নবকুমার বসু ইত্যাদি ইত্যাদি । তারাদাসও হয়ত তার ব্যতিক্রম ছিলেন না, বা হয়ত ছিলেন । কারণ, বিভূতিভূষণের সূর্যসম প্রতিভার পাশে তারাদাসের স্নিগ্ধ সাঁঝের প্রদীপসম লিখনশৈলী কোনোদিনই তুলনীয় হয়নি । তবু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রাবলী ------- কাজল বা এই তারানাথ তান্ত্রিক ------- নিজগুণেই দীপ্ত হয়ে ছিল, থাকবে । তাই নৈ:শব্দের শিল্পী তারাদাসের সাম্প্রতিক প্রয়াণ তাঁর সৃষ্ট এই অনন্য চরিত্রের আলোচনা ও পুন:-পঠন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক করে দেয় ।

    তারানাথ তান্ত্রিকের চরিত্রের শুরুয়াত্‌, কাজলের মতই, বিভূতিভূষণের কলমে । বিভূতিভূষণ তারানাথ তান্ত্রিকের মাত্র দুটি কাহিনি লিখে গিয়েছিলেন । সেই বর্তিকাই সারা জীবন বয়ে নিয়ে চলে গেছেন তারাদাস------- আমরা পেয়েছি অদ্ভুত ও অতিপ্রাকৃতীয় রসের অসাধারণ বেশ কয়েকটি কাহিনি, যা এই সংকলনে গ্রন্থিত হয়েছে । বাংলা সাহিত্যে এ'হেন কাহিনিমালা আর প্রায় নেই বললেই চলে, কারণ উদ্ধারণপুরের ঘাট বা তন্ত্রাভিলাসীর সাধুসঙ্গ কাছাকাছি হলেও ঠিক তারানাথ তান্ত্রিকের গোত্রের লিখন নয় । গা-ছমছমানির পাশাপাশি তারানাথের প্রত্যেকটি কাহিনিতে এযাডভেঞ্চার রসেরও সঞ্চার ঘটেছে যে, যেটা "কিশোর সাহিত্য"-এর ছোঁয়া এনে দিয়েছে ।

    চমত্কার কৃশকলেবর গ্রন্থ এ'খানি------- ১২০ পৃষ্ঠার মধ্যে তারানাথের বেশ ক'খানি গল্প শোনা গেছে । মজলিশি ঢং-এ তারানাথ শুনিয়েছেন শব-জাগানো বেতালের গল্প থেকে জাতিস্মর বিরাজবালা বা মানুষ থেকে বুনো কুকুরের রূপ ধারণ করা বিশুঠাকুরের গল্প । না, যুক্তিবাদী তার্কিক মন নিয়ে এ' গল্পমালিকা পড়তে বসলে চলবে না । মনটাকে যদি শহুরে ইঁদুর-দৌড় থেকে সরিয়ে বীরভূমের শ্মশান-প্রান্তর বা তুমুল বর্ষণমুখর অন্ধকার গঙ্গাতীরে নিয়ে ফেলতে পারেন, আসবেন তারানাথের গল্প শুনতে । আর যদি আসেন, আসর শেষে দেখবেন এখানে মোবাইল ফোন নেই, ইন্টারনেট নেই, বসের চোখ রাঙানি বা টার্গেট নন-এচিভমেন্টের বুক-ধুকপুকানি নেই, কারণ আপনি ফিরে গেছেন সেই ফ্রক বা হাফ-প্যান্ট পরা কিশোর দিনগুলোতে !

    কেউ কেউ এ'গল্পগুলি বড় গোলগোল পাবেন ------- বড্ড সাদামাটা, কোনো পল নেই তাতে । গল্পের শুরুতেই যেন শেষটাও সহজেই অনুমান করা যায় । `বিপদ'গুলো যেমন অভিপ্রেত এসেছে, তার সমাধানগুলোও যেন পাঠক পূর্বেই বুঝে ফেলতে পারেন ।

    না, এতে গল্পবলার রস বিশেষ বিঘ্নিত হয় না । কারণ গল্পগুলি স্লাইডের পর স্লাইড হিসেবে চলচ্চিত্রের মত চোখের সামনে ভেসে ওঠে । আচ্ছা, তারানাথ তান্ত্রিক নিয়ে কোনো সিনেমা বা টিভি সিরিয়াল আজও হয়নি কেন, যখন তার যথেষ্ট উপাদান এর মধ্যে রয়েছে ? তাছাড়া, বিদেশি ড্যানিয়েল ডিফো বা রুডিয়ার্ড কিপলিং বা ব্রাণ্ডার ম্যাথুজের অনেক অতিপ্রাকৃতীয় গল্পের মানই তারাদাসের চেয়ে নিরেস, শুধু বহুল প্রচারিত ইঙ্গভাষা ও বিপণনের জোরে আজও কেটে যাচ্ছে । বুড়ো তারানাথ বেচারি সেই মট্‌ লেনের এঁদো গলিতে তেলমাখা মুড়ি আর চা খেয়ে পাশিং-শো সিগারেট টানা শেষে এযাশট্রে হিসেবে ব্যবহৃত নারকেলমালাতে স্টাব গঁংউজেগঁংউজেই গেল ।

    তারানাথ তান্ত্রিক আসলে কে ? তারাদাসবাবু উত্তরটা এড়িয়ে গেছেন । আমরা কিন্তু ধরতে পেরে গেছি । আপনি পারেননি ? পারবেন, পারবেন । এ' বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতেই পারবেন । পাঠককুল যে এ' উত্তর পেতে আগ্রহী, সেটা বইটির পুন: পুন: মুদ্রণেই প্রমাণিত । তবে পুন:মুদ্রণেও বহু বানান বিভ্রাট চোখে পড়ল যে ! মধুসুদন চৌধুরী কৃত প্রচ্ছদখানি চমত্কার হয়েছে । বইখানির মূলসুর সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন ।

    থাক্‌ ঘরে রাখা এ' বই । মাঝেমাঝেই পাতা ওল্টাবো, কোনো বৃষ্টি ভেজা লোডশেডিং-য়ের সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় । বেশ লাগবে আবার ।

    পুন: :- ফ্রন্টিয়ার পত্রিকার গলি হিসেবেই কলকাতার মট্‌ লেন বিখ্যাত হয়ে আছে । না, শুধু বড়বাবু সমর সেনই নন, মট্‌ লেনের বাসিন্দে এক মেজবাবুও যে ছিলেন । তিনি এই তারানাথ তান্ত্রিক । চলে গেলেন শূন্য করে দিয়ে । চিরকালের মত ।

    (পরবাস-৪৬, সেপ্টেম্বর, ২০১০)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • কীভাবে লেখা পাঠাবেন তা জানতে এখানে ক্লিক করুন | "পরবাস"-এ প্রকাশিত রচনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রচনাকারের/রচনাকারদের। "পরবাস"-এ বেরোনো কোনো লেখার মধ্যে দিয়ে যে মত প্রকাশ করা হয়েছে তা লেখকের/লেখকদের নিজস্ব। তজ্জনিত কোন ক্ষয়ক্ষতির জন্য "পরবাস"-এর প্রকাশক ও সম্পাদকরা দায়ী নন। | Email: parabaas@parabaas.com | Sign up for Parabaas updates | © 1997-2024 Parabaas Inc. All rights reserved. | About Us