• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪৪ | ডিসেম্বর ২০০৯ | গ্রম্থ-সমালোচনা
    Share
  • অন্য এক পরণকথা : গোপা দত্তভৌমিক

    ধানসিদ্ধির পরণকথা ; মিহির সেনগুপ্ত, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি, ২০০৮, মাঘ ১৪১৪; ISBN: 978-81-295-0733-4










    দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ - শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে
    শঙ্খের মতো কাঁদে : সন্ধ্যায় দাঁড়াল সে পুকুরের ধারে,
    খইরঙা হাঁসটিরে নিয়ে যাবে যেন কোন কাহিনীর দেশে
    `পরণ-কথা'র গন্ধ লেগে আছে যেন তার নরম শরীরে,'

    [ ৩ সংখ্যক কবিতা / রূপসীবাংলা ]

    মিহির সেনগুপ্ত `ধানসিদ্ধির পরণকথা' গ্রন্থে পাঠককে যেন `কাহিনীর দেশে' নিয়ে যেতে চেয়েছেন, সেই দেশ বাংলাদেশের বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চল । জন্মভূমির দুর্নিবার টানে লেখক সেখানে ফিরে ফিরে যান । `সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম', `বিষাদবৃক্ষ' এবং `ধানসিদ্ধির পরণকথা' - তিনটি গ্রন্থ সেদিক দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত । `স্মৃতিবেদনার মালা একেলা' গাঁথার বহতা আখ্যান । `পরণকথা' ওই অঞ্চলের লোকগাথার এক বিচিত্র ধারা । গ্রন্থপাঠকালে প্রথমত মনে হয় ছোমেদ বয়াতিকে কেন্দ্রে রেখে `পরণকথার' একটি আনুপূর্বিক পরিচয় লেখক দিতে চাইছেন, পরে অনুভব করি শুধু এটুকুই তাঁর উদ্দেশ্য নয়, গভীরতর বক্তব্যকে তিনি প্রচ্ছন্ন রেখেছেন । `নিবেদনে' তাই লেখক জানিয়েছেন `আমার মাধ্যম পরণকথা' । পাঠক লক্ষ্য করে কীভাবে রূঢ় বাস্তবের মাটি থেকে এই কথা জন্ম লাভ করে, স্থানীয় কোনো ঘটনাবীজ থেকে অঙ্কুর বার হয়ে জনস্মৃতিতে ডালপালা মেলে দেয়, তারপর কোনো কথাকার কবিয়াল, বয়াতির উচ্চারণে মৌখিক সাহিত্যঐতিহ্য সৃষ্টি হয় । পরণকথার বিষয় সম্ভার বিস্ময় জাগানোর মতো - কখনো তা বিধুর কোনো ব্যর্থ প্রেমের গল্পে মৈমনসিংহগীতিকার স্মৃতিবাহী, কখনো বা গ্রামপত্তনের আর্থসামাজিক ধর্মীয় ইতিহাস, কখনো গ্রামীণ কোনো প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির অন্যায় বা ব্যভিচারের প্রতি বিদ্রুপতীক্ষণ স্যাটায়ার প্রতিম । কথনের ভঙ্গি স্বভাবতই আঁটোসাঁটো প্লটে বাঁধা কোনো উপন্যাস বা বড়ো গল্পের মতো নয় । মাঝে মাঝেই বাঁকবদল বা পাকসাট মারা তার বৈশিষ্ট্য । লেখকের ভাষায়, `এ যেন কোনো পয়োস্তি গ্রাম পারের নদীর খেয়াল খুশিমত, কখন ও সোজা কখন ও আড়বেঁকি চলা । ... স্থানীয় সংলাপে বললে বলতে হয়, পরণকথার কথা, হ্যার আগে বাইর অয় হাত পা ও হ্যাষে বাইর অয় মাথা ।' অর্থাৎ অনেক আশকথা, পাশকথা বলে তবে মূল কাহনে প্রবেশ ঘটে ।

    মিহির সেনগুপ্ত এই গ্রন্থের কথনভঙ্গিতেও ছোমেদ বয়াতিকেই গুরু মেনেছেন অর্থাৎ টানা কোনো গল্প বলেননি, কখনো এগিয়ে, কখনো পিছিয়ে কিছুটা শঙ্খিল গতিতে কাহিনী বুনেছেন । স্মৃতিকথার মধ্যে পুরে দিয়েছেন অন্য স্মৃতিকথা - গল্পের মধ্যে গল্প, তার মধ্যে গল্প । মোটা রুশী মা-পুতুলের পেট থেকে যেমন বড়ো, মেজো, সেজো, ন', রাঙা, ফুল, কুট্টি পুতুল বেরিয়ে আসার মজার খেলা চলে । বাচনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, আপাত অন্যমনস্ক অথচ সম্পূর্ণ সচেতন এক এলায়িত নির্মাণ । স্পষ্টতই প্রাচ্য গল্প বয়ন-শৈলীকে চিনে নেওয়া যায় । কথকতার আসরে বটগাছের তলায়, গ্রামীণ হাটে যেভাবে হাজার হাজার বছর ধরে জনমনের তটে নানা রঙিন গল্পের ঢেউ ভেঙেছে । প্রসঙ্গত মনে পড়ল সুনন্দা সিকদার তাঁর `দয়াময়ীর কথা' পুস্তকে তাঁদের গ্রাম দীঘাপাইতে সোনাঢুলির `শাস্তর' বলার গল্প শুনিয়েছেন । `আমাদের গাঁয়ের সবাই বলে, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার `ঠাকুরমার ঝুলি' আর `ঠাকুরদাদার থলে' লিখেছেন, এ সবই আসলে সোনাঢুলির শাস্তর । আমাদের গাঁয়ের জমিদারবাবুর ভাগ্নে ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন ।' সোনাঢুলি বলতো রূপকথা, ছোমেদ বয়াতি বলতো পরণকথা - দুটির পার্থক্য বিচারে যাবনা । সময়ের গর্ভে লুকিয়ে থেকে এক একটি গল্পবীজ এক একটি মূর্তি ধরে । পরণকথার বিস্তার অনতিঅতীতে, রূপকথার উত্স দূরে আরো দূরে `বিদর্ভনগরে' - প্রত্নলোকে ।

    প্রাচ্য গল্পকলার বিশিষ্টধারা শুধু লোকাইতিহ্য নয়, লিখিত সাহিত্যেও প্রাচীন ও মধ্যযুগ জুড়ে যে রত্নভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে তা সকলেরই জানা । পঞ্চতন্ত্র, জাতক, কথা সরিত্সাগর, বৃহত্কথা, শুকসপ্ততি, আলিফ লায়লা বা আরব্যরজনী - এই তালিকা সুদীর্ঘ এবং ঐশ্বর্যময় । তুরস্কের এখনকার বিখ্যাত লেখক ওরহান পামুকের `মাই নেম ইজ রেড' গ্রন্থে গল্পের রহস্য গ্রন্থি উন্মোচনে এই শৈলীরই যেন চর্চিত এক আধুনিক রূপ লক্ষ্য করা যায় । পামুকের কথনশৈলীর আলোচ্য বিশিষ্টতাটি পশ্চিমী সমালোচকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি ।

    ধানসিদ্ধির পরণকথা এক অর্থে পথ চলার গল্প । সেই ইঙ্গিত আছে অধ্যায়নামে, `পথের কথা', `পাক্‌-পন্থের না-পাকপন্থ', `মধুমতীর ধারে' ইত্যাদি । এই পথ পরবাসী মানুষের ঘরে ফেরার আনন্দে করুণ, রঙিন । নৌকায় করে দুর্গাপুজোর সময় দেশে ফেরার এক শারদীয় ভোরে যে অনুভূতি লেখককে আপ্লুত করছিল তাই আসলে গ্রন্থটির মূল সুর,

    `... আজানের সুরটা ভেসে আসছে, সেইরকমই একটা সুরে গলা ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল । অকারণেই দুচোখে জল ভরে আসতে চাইছিল, যেন, বর্গ বর্ণের, আর ধর্মের বাইরে গিয়ে মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবেই সবসময় ভালোবাসার যে গভীর হৃদয়বৃত্তি, তাকে এই চোখের জলের আনন্দে স্নান করানোর মতো এক পুণ্যেচ্ছা বোধ করছিলাম ।'

    পরণকথার মাধ্যমে এই পুণ্যেচ্ছার বার্তাই লেখক পাঠকের মনে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন । এই ইচ্ছা শুধুমাত্র কল্পলোকের কোনো বিমূর্ত বাসনা রূপে তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়নি, সমকালীন বাংলাদেশের নিম্নবর্গের মানুষের চেতনায় সমন্বয়কামী শুভবোধকে তিনি জাগ্রত দেখেছেন - সেই গল্পই তাঁর উদ্দিষ্ট পরণকথা, বুলেট বা অমলাবালা আর ডাহাইয়া বা শীতলচন্দ্র ঘরামির পূর্বরাগ ও পরিণয়কে কেন্দ্র করে যা একটি নিটোল চেহারা পেয়েছে । নমশূদ্র ঘরের মেয়ে বুলেটের জন্মলগ্নেই তার মাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল পাকিস্তানী সেনাদের গুলি । অভাগী মেয়ের তাই অমন নামকরণ । মানুষ হয়েছে সে মুসলমান ধাত্রীমার বুকে, তাকে ডাকে `আম্মো' । আম্মোর স্বামী শুককুর আলি রাজাকারদের দলে নাম লিখিয়েছিল হিন্দু বন্ধু, প্রতিবেশীদের বাঁচাবার জন্য । বাঁচাতে পারেনি, নিজেও মরেছে পাক সেনাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে অসহায় দাঁড়িয়ে । `শিণ্ডলারস লিস্ট' চলচ্চিত্রের মতো মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অনেক না বলা ইতিহাস মিহিরের পরণকথায় স্থান পেয়েছে । নির্যাতন, পীড়ন, রক্ত আর অশ্রুর সেই এলোমেলো ইতিহাসে রাজাকার মানেই খুব খারাপ আর মুক্তিযোদ্ধা মানেই খুব ভালো - সর্বদা এই সরল সমীকরণ চলেনা । তবে মিহিরের পর্যবেক্ষণে ভাবালুতা স্থান পায়নি, বস্তুত নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য । বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ের কথা লিখতে গিয়ে তিনি স্পষ্টই জানিয়েছেন, `এই এলাকার আশপাশের মুসলমান গ্রামগুলোর মানুষেরা চূড়ান্ত অপহ্নবের সময়েও কেউ গ্রাম ছেড়েছে এমন প্রমাণ আমি পাইনি । তাদের উপর অত্যাচার উত্পীড়নের কথাও শুনিনি বা বাড়িঘরদোর জ্বালিয়ে দেওয়া, ধ্বংস করার কোনো নজির ও যুদ্ধের ঠিক পরপরই যখন গিয়েছিলাম, আমার নজরে পড়েনি । ব্যতিক্রম হিন্দুদের বাড়ি ঘর সম্পত্তি এবং প্রত্যক্ষ আন্দোলন বা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মুসলমান রাজনৈতিক কর্মী ।'

    মুক্তিযুদ্ধের মহত্ত্বকে কোনোভাবেই খাটো করেননি লেখক কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে প্রাথমিক স্তরে গ্রামীণ মানুষের বোঝাপড়ার, মানসিক দূরত্বের সমস্যাগুলিকে তুলে এনেছেন । গ্রামের শ্রেণিবিন্যাস সম্বন্ধে শহুরে মানুষের অনভিজ্ঞতা এবং নবাগতদের সম্বন্ধে নিম্নবর্গীয় কাহারদের অনাস্থার ব্যাপারটি চমত্কার বুঝিয়েছে খলিল - পুজোবাড়িতে রাঁধুনীর ভূমিকা নেওয়ার ফলে যার নাম খলিলঠাকুর অথবা বাচাপুতি বা বাচস্পতি ।

    `জয়বাংলা ব্যাফারডা হ্যারগো কেউ বোজায় নায় । কিন্তু কাহার সমাজে য্যারা মাতব্বর, হ্যারা বেয়াকেই মুসলিম লীগ । ... মুক্তিবাহিনী ও পেরথম থিহাই হ্যারগো শত্তুর পক্ষ ঠাওরাইলে ।' পাঠকের মনে পড়বে `চিলেকোঠার সিপাই' উপন্যাসে বিপ্লবীদের সদিচ্ছা সত্ত্বেও অনিবার্যভাবে তৈরি হওয়া এই দূরত্বের কী অসামান্য ব্যাখ্যান করেছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস । শ্রমজীবীদের প্রতি একধরনের সূক্ষ্ম অবজ্ঞা মধ্যবিত্তমনে যেন অগোচরেই কাজ করে যায় ।

    ধানসিদ্ধির উপকূলকে হয়তো গোটা বাংলাদেশের ছোট্ট একটি প্রতীক রূপে নেওয়া চলে । বহুদিন ধরে হিন্দুমুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মিলিত প্রয়াসে গড়ে উঠেছিল যে-দেশের জনপদগুলি । হিন্দুসম্প্রদায়ের নানা জাতের মানুষ ধোপা, নাপিত, কামার, কুমোর, তেলি, কৈবর্ত এবং নমশূদ্ররা তাদের আলাদা আলাদা পাড়া তৈরি করেছিল । আবার উচ্চবর্ণীয়রা তাদের ভেদাচারি দম্ভ নিয়ে আলাদা পল্লী বানিয়ে নিয়েছিল । মুসলমান সমাজই ছিল সংখ্যাগুরু, তাদেরও প্রয়োজন ও পরম্পরা অনুযায়ী গড়ে উঠেছিল স্বতন্ত্র গ্রামসমাজ । ভেদবুদ্ধি ছিলনা এ কথা বললে সত্যের অপলাপ করা হবে । রবীন্দ্রনাথ যথার্থ লক্ষ্য করেছিলেন, `আমরা বহুশত বত্সর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখেদু:খে মানুষ; তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই ।' কিছু নির্বোধ দ্বন্দ্ব বিরোধের কথা, সামাজিক দূরত্বের কথা মিহিরও বলেছেন কিন্তু সর্বোপরি সুখ-দু:খ কলহপ্রীতি নিয়ে বহতা বজায় ছিল, `কোথায় যেন একটা সমীকরণ ও ঘটে চলেছিল, - খুব শ্লথ ভাবে হলেও । কিন্তু কোনও শূন্যতা ছিলনা । ছিল না কোনো সামাজিক নৈরাজ্য । ব্যাপারটা ঘটল দেশভাগকে কেন্দ্র করে ।'

    দেশভাগের কিছু আগে থেকেই সমস্ত সমীকরণ চূর্ণবিচূর্ণ করে হানাহানির সূত্রপাত ঘটল - তারপর থেকেই চলছে যেন ধারাবাহিক রক্তস্নান । এই সব ঘটনার রাজনৈতিক মাত্রা তো বহু আলোচিত । কিন্তু ঘটনাসমূহের ধাক্কায় বিমূঢ়, উচ্ছিন্ন সাধারণ মানুষের ধিক্কার প্রকাশিত হয়েছে সুধীর গাইনের হতবুদ্ধি জিজ্ঞাসায়,

    `পোঞ্চাশ সালে যেরা অইছেলে, হেয়ারে কইলাম রায়ট । হেয়ার পর অইতে লাগলে যা, হেয়ার বেবাক নাহি ডাকাতি । একাত্তইর সালে যেডা অইলে হেডারে বেয়াকে জাক্কের দিয়া কইলে মুক্তি যুইদ্দ, আর এহন যা অইতে আছে হেয়ার নাম নাকি সন্ত্রাস । মুই তো দেহি, কহন ও কেউ কেউ আচুক্কা বাঙালি অইয়া অবাঙালি কাডে, আবার কহনও রাজাকার, খানসেনারা পেরথমে হিন্দু হ্যারপর হিন্দু মোছলমান বেয়াকরেই কাডে । তয়কি এক জাইতরে কাডলে রায়ট কইতে আয়, আর দোনো জাইত মিলইয়া কাডাকাডি করলে হেডারে মুক্তি যুইদ্দ কয় ?'

    ঐতিহাসিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পণ্ডিত বা রাজনীতিজ্ঞরা নিরক্ষর সুধীরের এই প্রশ্নের উত্তর কী দেবেন জানিনা । নির্বোধ বলে ওদের প্রশ্নকে উড়িয়ে দেওয়াটাই আমাদের প্রচলিত রীতি । এই রীতি শিক্ষিত মানুষের পক্ষে নিরাপদ । তাতে পিঠ বাঁচানোর প্রয়াস অক্ষুণ্ণ রাখা যায় ।

    `ধানসিদ্ধির পরণকথা' তে বিন্যস্ত সমাজ ইতিহাসের উপাদান সমূহ বর্তমান প্রবন্ধকারের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তার কারণ মিহির অতীতকে নির্মোহ বস্তুবাদী দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছেন । বনেদি জমিদার বাড়িতে প্রচলিত আবেগপ্রবণ কিংবদন্তী সমূহের ভিত খুঁড়ে প্রকৃত সত্যের কুত্সিত কঙ্কাল দেখাতে তিনি দ্বিধাবোধ করেননি । এই সূত্রে নিজের পরিবারে প্রচলিত গল্পকথার সঙ্গে বেভারিজ সাহেবের লেখা বাকেরগঞ্জের ইতিহাস মিলিয়ে যেভাবে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা লক্ষণীয় । `হুনুরীবংশ পুরুষ ও তালুকমুলুকের পরণকথা' অধ্যায়টি জমিদারি, তালুকদারি, ভূমি রাজস্বব্যবস্থা নিয়ে তথ্যসন্ধিত্সু গবেষণা এবং পরিবারগুলিতে প্রচলিত গৌরবকথার তুলনা বিচারে দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে । এলাকার জমিদার বংশগুলির উদ্ভব ও বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাধারণ যে সূত্র বা ফর্মুলাটি তিনি বিবৃত করেছেন তা ধারাবাহিক প্রবঞ্চনা বা দুর্নীতিকে প্রায় প্রমাণ করে ছাড়ে ।

    `রায়ের কাঠির জমিদারদের দেওয়ান বা নায়েব ছিলেন কীর্তিপাশার জমিদারদের এক পূর্বতন পুরুষ । দেওয়ান থেকে, একসময় তাঁরা জমিদার হন । আবার কীর্তিপাশার মহলানবীশ থেকে পরে বাসণ্ডার সেনবাবুরা জমিদার হলেন । আর আমার পূর্বপুরুষদের একজন, নাম চূড়ামনি সেন ছিলেন বাসণ্ডার জমিদারদের কর্মচারি । তিনি অকালে মারা যান এবং তাঁর দুই নাবালক পুত্র তাঁদের এস্টেটে গোমস্তাগিরি করতে করতেই একটি তালুকদারির পত্তন করে ফেলেন । মজার ব্যাপারটি হল, এই সব কটি ক্ষেত্রেই একটি করে মনোরম এবং মহত্ত্বপূর্ণ কিংবদন্তি চালু আছে, যা বংশপুরুষরা বেশ গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকেন ।'

    জাদুমন্ত্রের দ্বারা যে প্রভূত বিষয়সম্পত্তি হস্তগত করা যায়না তা যেমন সত্য, তেমনি এই ব্যাপারে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের কতিপয় জমিদারবংশই দায়ী এমন ব্যাপারও নয় । আসলে তহবিল তছরূপ এবং ডাকাতি দুটি পন্থাই বহু স্বনামধন্য ব্যক্তিই গ্রহণ করেছেন । বহু বছর আগেই বড়লোকে ছোটলোকে প্রভেদ কিসে তা `সাম্য' প্রবন্ধে একরকম করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র ।

    `যদু চুরি করিতে জানে না, বঞ্চনা করিতে জানে না, পরের সর্বস্ব শঠতা করিয়া গ্রহণ করিতে জানে না, সুতরাং যদু ছোটলোক; রাম চুরি করিয়া, বঞ্চনা করিয়া, শঠতা করিয়া ধন সঞ্চয় করিয়াছে, সুতরাং রাম বড়লোক । অথবা রাম নিজে নিরীহ ভালমানুষ কিন্তু তাহার প্রপিতামহ চৌর্যবঞ্চনাদিতে সুদক্ষ ছিলেন ; মুনিবের সর্বস্বাপহরণ করিয়া বিষয় করিয়া গিয়াছেন, রাম জুয়াচোরের প্রপৌত্র, সুতরাং সে বড় লোক । যদুর পিতামহ আপনি আনিয়া আপনার খাইয়াছে - সুতরাং সে ছোট লোক । অথবা রাম কোন বঞ্চকের কন্যা বিবাহ করিয়াছে সেই সম্বন্ধে বড় লোক ।'

    কেত্তরা গ্রামে হাড়-পাঁজরা বার করা পৈতৃক ভদ্রাসনের সামনে দাঁড়িয়ে পূর্বজদের নানাবিধ বিষয়কর্ম তথা দুষ্কর্মের ভাবনা লেখককে বিষণ্ণ করেছে বটে, সঙ্গে সঙ্গে উনিশ শতকের বহু যুগন্ধর মহাপুরুষের কথাও তাঁর মনে পড়েছে, অর্থসম্পদ আহরণে যাঁরা কোনও পন্থাকে পরিত্যাজ্য জ্ঞান করতেন না । অবশেষে তিনি কৌতুকময় একটি সত্যবোধে উপনীত হয়েছেন, `সত্‌, সজ্জনলোক বিত্তশালী, একথা মূর্খেরা অথবা ধান্দাবাজেরা বলে ।'

    প্রবল প্রতাপশালী এই সব সামন্ত প্রভুদের ক্রিয়াকলাপের যেসব কাহিনী এই গ্রন্থে আছে তা এক কথায় ভয়ংকর । নিজেদের স্বার্থেই তাঁরা বিশাল লেঠেল বাহিনী পুষতেন । ধানসিদ্ধির অঞ্চলে এই বাহিনীর দুটি ভাগ - কাহার আর নগদি । যারা নগদে কাজ করে দিত তারাই নগদি । আজকের ভাষায় `সুপারি কিলার' বলা চলে । সৈয়দ আলি ছিলেন নগদি, তাঁর ছিল পাঁচশ লাঠিয়ালের একটি দুর্মদ বাহিনী । লম্বা ছিপছিপে অমায়িক মুখচ্ছবি সৈয়দ আলিকে দেখলে কেউ ধারণাই করতে পারতো না যে `তিনি একজন অপরিসীম শক্তির মানুষ এবং খুবই ঠাণ্ডা মাথায় যখন তখন খুন খারাবি করতে দক্ষ ।' কাহাররা নগদের বদলে উপযুক্ত কাজের জন্য জমিদারদের কাছ থেকে চাকরাণসূত্রে পাওয়া জমিজমা ভোগ করত । মিহিরের পরণকথায় কাহার এবং নগদিদের ব্যবহার করে ভূস্বামীদের কার্যসিদ্ধির নানা গল্প আছে । পাঠকের মনে পড়ে যেতে পারে `পল্লীসমাজ' উপন্যাসে রমেশের বিরুদ্ধে বেণী ও রমার যুগ্মপ্রয়াসে মুসলমান লেঠেল পাঠানোর ঘটনা । তবে শরত্চন্দ্রীয় বিবরণ এ ব্যাপারে খুবই সংক্ষিপ্ত । মিহিরের ভাণ্ডার থেকে আমরা দুটি উদাহরণ সমাজ ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলীকরণ হিসেবে আলোচনায় রাখতে পারি । প্রথমটি একটি গ্রামের অবলুপ্তির কাহিনী, দ্বিতীয়টি পত্তনের । সবই কর্তার ইচ্ছায় কর্ম ।

    বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী একটি গ্রামের প্রজারা একবার তালুকদার অক্ষয় রায়ের অত্যাচারে উত্যক্ত হয়ে কিছু দেশজ কুকথায় তাঁর নাকি অপমান করেছিল । সত্যিই কিছু বলেছিল কিনা বিচার অবশ্য হয়নি । কানাঘুষোয় কথাটি রায়ের কানে পৌঁছোলে তিনি সৈয়দ আলির নেতৃত্বে পাঁচশো নগদি পাঠিয়েছিলেন গ্রামটিকে সহবৎ শিক্ষা দেবার জন্য । এক রাত্রিতে সমস্ত গ্রাম শূন্য হয়ে গিয়েছিল । গ্রামবাসীদের মৃতদেহগুলির গতি হয়েছিল নদীতে । থানা পুলিশ আদালতে কিছুই প্রমাণ করা যায়নি কারণ ওখানে যে আদৌ কোনো জনবসতিপূর্ণ গ্রাম ছিল তার প্রমাণ দেবার জন্য গ্রামের কোনো মানুষ জীবিত ছিল না । আশেপাশের গ্রামের কেউ যে ভয়ে মুখ খোলেনি বলাই বাহুল্য ।

    দ্বিতীয় ঘটনাটি হল এক রাত্রির মধ্যে রহমত্পুর মতান্তরে রমানাথপুরের হিন্দু বাসিন্দাদের এনে খাদইয়ার পারের নয়াগ্রাম সৃজন । রহমৎ বা রমানাথপুরে হিন্দুমুসলমানের একত্র বসতি ছিল - যা স্থানীয় হিন্দু জমিদার রায়কর্তাদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে । হিন্দু ও মুসলমান আলাদা আলাদা গ্রামে বাস করবে এটাই অলিখিত নিয়ম । কিন্তু আদেশ নির্দেশে এ কাজ হবার নয়, সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে কেউ আসতে রাজি হবেনা । তাই মাজু রায় সৈয়দ আলিকে পাঁচশ লেঠেল নিয়ে বিনা রক্তপাতে কাজ হাসিল করার হুকুম দেন । কীভাবে খাদইয়ার পার রাতারাতি প্রাণভয়ে ত্রস্ত হিন্দু নরনারীর সমাগমে একটি নতুন গ্রাম হয়ে উঠল তার কিছুটা শুনবার জন্য আমরা ছোমেদ বয়াতির বাখানের শরণাপন্ন হতে পারি, খাল ধারে দাঁড়িয়ে সৈয়দাঅলির নিনাদে সেদিন গ্রামবাসীদের হৃত্কম্প হয়েছিল সংশয় নেই ।

    `ওডো ওডো গাও তোলো সোমায় বেশি নাই ।
    বিলম্ব করিলে কৈলোম মরিবা সবাই ॥
    যা কই বেয়াকজোনে কর হেই রূপ ।
    নাইলে যেয়ারে অইবে বাক্‌ বাইক্য চুপ ॥
    হুইয়া থাকপা পেরির তলায় কেউ না পাইবে ট্যার ।
    এহন যদি জাগো হেলে গুছাবা আখের ॥'
    এইসব ঘটনা অবশ্যই একধরনের নৈরাজ্য - তবে তা ১৯৪৬-৪৭ সালের মতো ব্যাপক ছিল না, মাঝে মাঝে ঘটতো । একদিকে সামন্ততন্ত্রের ভয়াল ব্যাদান, অন্যদিকে জমিদার গিন্নি `মাগো'র সঙ্গে গ্রামীণ কবিয়াল, গাজনের সন্ন্যাসী রায়বাড়ির ভৃত্য যজ্ঞেশ্বরের মা-ছেলে সম্পর্কের অনাবিল মাধুর্য - `বিগত যুগের' দুটি ছবিই এসেছে ।

    সামন্ততন্ত্রের সিংহবিক্রমের যুগ ধূসর অতীতে বিলীন হয়েছে তাই ছোমেদ বয়াতি এ সব গল্প তার পরণকথায় বুনে নিতে পেরেছে । স্থানীয় সংজ্ঞা অনুযায়ী `কতায় ছাতকুড়া না পড়লে আর কতার পিডে কতা না গজাইলে হেয়া পরণকতা হয়না ।' স্বভাবতই মনে হয় পরণকথার স্তরে স্তরে পুঞ্জিত হয়ে আছে আঞ্চলিক ইতিহাসের অজস্র অমূল্য উপাদান । কিন্তু সে-সব সঞ্চয় কি সবই হারিয়ে যাবে কিংবা ইতোমধ্যেই গেছে, কারণ পরিবর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছোমেদ বয়াতিরা তো আত্মরক্ষা করতে পারেনি । ভবিষ্যতের অনামী গবেষক তো তাদের খুঁজে পাবেন না । লেখক জানিয়েছেন `পরণকথা' বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে আর সজীব নেই ।

    পূর্বের মতো প্রাণবন্ত নেই লেখকের নিজের গ্রামও । গোটা এলাকার মধ্যেই এক ধরনের নিষ্প্রাণ শূন্যতা তিনি লক্ষ্য করেছেন । তবু ব্রিজ পেরিয়ে গ্রামে প্রবেশের আবেগ উদ্বেল মুহূর্তে বহুকাল পরে ছেলেবেলার সঙ্গী বটগাছটিকে চিনতে পেরে স্বভূমির মায়ায় আচ্ছন্ন হয়েছেন । আমরা বোধহয় প্রত্যেকেই পূর্বজীবনের সঙ্গী বা সাক্ষীরূপে একটি গাছকে খুঁজি । ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত মনে পড়ছে, ইথাকায় ফিরে স্মৃতিচিহ্ন রূপে জলপাইগাছটিকে দেখে আপন মৃত্তিকা চিনেছিল ওডিসিউস । গ্রীকপুরাণের চরিত্রকে অনেক সময়ই প্রতীকী মনে হয় ।

    ভাঙাচোরা পৈতৃক অট্টালিকার পলেস্তারা খসা বিবর্ণ দেয়ালে মার হাতের লেখা চিনতে পারেন মিহির । কবে কোন কালে মা ধোপা বাড়ির কাপড়ের হিসেব লিখে রেখেছিলেন । মনে পড়ছে, বহুদিন পর নিশ্চিন্দিপুরের ভাঙা ভিটেতে এসে অপু দেখেছিল সর্বজয়ার রেখে যাওয়া লোহার কড়াই । অদ্ভুত এই সব স্মৃতির টুকরো মনে ঘনিয়ে আনে জীবনানন্দের পরাবাস্তব পংক্তিমালা,

    `এক একটি ইঁট ধ্বসে - ডুবজলে ডুব দিয়ে কোথায় হারায়
    ভাঙা ঘাটলায় এই - আজ আর কেউ এসে চাল ধোয়া হাতে
    বিনুনি খসায় নাকো - শুকনো পাতা সারাদিন থাকে যে গড়াতে;
    কড়ি খেলিবার ঘর মজে গিয়ে গোক্ষুরার ফাটলে হারায় ।'

    [ ২২ সংখ্যক কবিতা / রূপসী বাংলা ]

    `ধানসিদ্ধির পরণকথা' কিন্তু অভিনব কোনো বিষাদসিন্ধু নয়, রক্তপাতের ধারাবিবরণীও নয় বরং এক নতুন `মহিম্ন স্তব' আবৃত্তি । গাঙ্শালিকের মতন রোঁয়া ফুলিয়ে কিচির মিচির করতে করতে বুলেট তার আম্মোর হাত ধরে লেখকের সামনে এসে দাঁড়ালে তাদের উভয়ের মুখে এসে পড়া শরতের আলো লেখকের বিষণ্ণতাকে ধুয়ে দিয়েছে । বুলেট, আম্মো, ডাহাইয়া, তার পালকপিতা আমজাদ আলি বাউল এবং সর্বোপরি ছোমেদ বয়াতির মধ্যে লেখক এমন আশ্চর্য মুক্ত ব্যক্তিত্ব দেখতে পেয়েছেন, কার্তিককে উদ্ধৃত করে যাদের সম্বন্ধে অনায়াসে বলা যায়, `ও মোছলমানও না হিন্দুও না । ও হিন্দুমান । ও একজন মানুষ । এই মানুষদের মধ্যেই আছে খলিল, কার্তিক, সুধীর - ওরা ধর্ম, জাতপাত নিয়ে মাথা ঘামায় না । ওরাই মেতে উঠেছে পুজো বাড়ির আনন্দের মধ্যে মুসলমানের ঘরে মানুষ হওয়া দুটি হিন্দু ছেলেমেয়ের আসন্ন বিবাহ সম্ভাবনা নিয়ে । দুটি জিলিপির প্যাঁচওয়ালা সমাজই যে সাধ্যমতো বাধা দেবে তা জেনেই `নতুন জাইতে'র এই দুটি তরুণ তরুণীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে । এই দলে যোগ দিয়েছেন প্রসাদ মাস্টার, এমন কি এককালের দুর্ধর্ষ লেঠেল সর্দার সৈয়দ আলি এবং সৈজদ্দি । তবে মানবিক ভারসাম্যটিকে কেন্দ্রে ধরে রেখেছে ছোমেদ বয়াতি - `মানুষটার মধ্যে কী যেন একটা জাদু আছে । সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে মানুষের জন্য তার অপরিসীম দরদ এবং দায়বোধ ।' ছোমেদ অতি দরিদ্র, তার নিজের জমি নীলামে ওঠার পথে কিন্তু সব ভুলে একদিকে সে মেতে ওঠে ছন্দোবদ্ধ কাহিনী রচনায় - সারি জারি মারফতি, শিবের পালা পরিবেশনে, অন্যদিকে সহৃদয় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় প্রতিকূল সমাজব্যবস্থার আক্রমণে ধ্বস্ত, আর্ত মানুষের দিকে । বুলেট - ডাহাইয়ার আসন্ন গৃহস্থালি এবং তাকে ঘিরে শুভার্থীদের সহায়তার ছবি লেখকের মনে গভীর আশা জাগিয়ে তুলেছে । `এদের এই প্রচেষ্টা কী সমাজের একেবারে চূড়ান্ত তলদেশ থেকে নতুন ভাবে বরাবরের সমস্যাটির সমাধানের সূত্র খুঁজছে ? ... অবশ্যই এরকম নতুন ধারার মানুষের অবস্থিতি অন্যত্রও রয়েছে, যারা ত্রক্রমশ প্রয়োজনের তাগিদেই নতুন একটা পরম্পরার সৃজন হয়ত নিজেদের অজ্ঞাতেই করে চলেছে ।' এই সম্ভাবনার পথ ধরেই মিহিরের ধানসিদ্ধির আলেখ্য নতুন পরণকথা হয়ে উঠেছে । যার পট অতীত নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত ।

    রায়বাড়ির দুর্গাপুজোয় উভয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণের প্রকৃত আন্তরিকতা দেখে লেখকের মনে হয়েছে কবীর, দাদূ, রজ্জব অর্থাৎ মধ্যযুগীয় সন্তদের সমন্বয়পন্থী ধারাতেই চলতে চায় সাধারণ মানুষ । হিন্দু মুসলমানের মিলন প্রচেষ্টায় বাংলার নিম্নবর্গের মানুষের অসামান্য অবদানকে তিনি স্মরণ করেছেন ।

    `বাউল গঙ্গারাম ছিল নমশূদ্র, বাউল মনাই শেখের শিষ্য কালাচাঁদ মিস্ত্রি, তাঁর শিষ্য হারাই নমশূদ্র, তাঁর শিষ্য দিনু নট্ট, তাঁর শিষ্য ঐষোন যুগী এবং তাঁর শিষ্য বিখ্যাত মদন বাউল মুসলমান, আজও এই আসরেও দেখছি সেই নিম্নবর্গবর্ণের শিল্পী এবং গ্রাহকেরাই ভিড় করে আছে । সুধীর নমশূদ্র, কার্তিক, কৈবর্ত, ছোমেদ মুসলমান । গোল বাধায় ধর্মব্যবসায়ীর দল ।'

    এই সূত্রে মনে পড়ে গেল ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে বাংলার শোষিত পীড়িত উদ্বিগ্ন মানুষ কীভাবে সমন্বয়ের পথ খুঁজেছিল । মধ্যযুগীয় জীবনের প্রধান অবলম্বন ধর্ম - তার আশ্রয়েই অভিনব `পীর পাঁচালীর' উদ্ভব । `হিন্দুর দেবতা হইল মুসলমানের পীর ।' বিষ্ণু আর বিসমিল্লা একাকার হয়ে গিয়েছিলেন । কৃষ্ণরাম দাসের `রায়মঙ্গল' থেকে নবী-কৃষ্ণের সমন্বিত রূপটি উদ্ধার করা যাক,

    অর্ধেক মাথায় কালা      একভাগে চূড়া টানা
             বনমালা ছিলিমিলি তাতে ।
    ধবল অর্ধেক কায়       অর্ধনীল মেঘ প্রায়
             কোরান পুরাণ দুই হাতে ॥
    ঔপনিবেশিক শাসনে ভেদবুদ্ধির চিহ্ন আঁটা স্বার্থসন্ধানীরা এইসব প্রয়াসকে গুঁড়ো করে ধুলায় মিশিয়ে দিতে চেয়েছে । কিন্তু দূর্বা ঘাসের মতোই নিম্নবর্গের চিরজীবী সমন্বয় ভাবনা পারস্পরিক সহযোগিতা আর বন্ধুতার বারিবর্ষণে মনের মাটি ছেয়ে দিতে চাইছে, লক্ষ্য করেছেন মিহির । আবুল মোমেনের মনে হয়েছিল এই মুহূর্তের দাবি হল সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর মধ্যে সামাজিক মেলামেশার, উত্সবে পার্বণে সামাজিক যোগাযোগের উপলক্ষ্য তৈরি করে একে অপরের জীবনে প্রাসঙ্গিকতা অর্জন । বর্গ, বর্ণ, জাতকে পাশে ঠেলে এই প্রাসঙ্গিকতা অর্জনের পরণকথাই শুনিয়েছেন মিহির সেনগুপ্ত ।

    একবিংশ শতকে আচারধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণ ভেদবুদ্ধিকে দূরে সরিয়ে মানব সভ্যতা মুক্তমতি সহৃদয় সহাবস্থানের পথে পা বাড়াবে এই প্রত্যাশা কিছুটা থমকে দাঁড়ায় স্যামুয়েল হান্টিংটনের মতো পণ্ডিতদের একপেশে, নঞর্থক বিশ্লেষণে, কখনো অন্ধকারময় ভবিষ্যত্বাণীতে -------

    'ঝত্র বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্রছৎ বধত্রীত্ঠবঞয, ণ্ণত্রত্ঠূং ঠরুংধত্ধভঠবছৎ ধত্রংয, ংঊঠত্র যঞছত্ররু ঢষ্‌ ঞচ্‌ংঠশ ংঊঠত্র. ... ঝরুংত্রঞঠঞষ্‌ ছঞ ছত্রষ্‌ ত্‌ংটংৎ - ংঋংশযধত্রছত্‌, ঞশঠঢছত্‌, শছবঠছত্‌, বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্রছৎ বছত্র ধত্রত্ষ্‌ ঢং রুংংঈঠত্রংরু ঠত্র শংত্ছঞঠধত্র ঞধ ছত্র 'ধঞচ্‌ংশ', ছ রুঠীংঈংশংত্রঞ ংঋংশযধত্র, ঞশঠঢং, শছবং ধশ বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্র. ণঠযঞধশঠবছত্ত্ষ্‌ শংত্ছঞঠধত্রয ঢংঞগংংত্র যঞছঞংয ধশ ধঞচ্‌ংশ ংত্রঞঠঞঠংয ধী ঞচ্‌ং যছস্‌ং বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্র চ্ছটং রুঠীংঈংশংত্রঞ বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্রয. নংংঋছশছঞং বধরুংয ভধটংশত্রংরু ঢংচ্ছটঠধণ্ণশ ঞধগছশরু ঞচ্ধযং গচ্ধ ছশং 'ত্ঠূং ণ্ণয' ছত্ররু ঞচ্‌ং 'ঢছশঢছশঠছত্রয' গচ্ধ ছশং ত্রধঞ. মচ্‌ং শণ্ণত্‌ংয ধী ঞচ্‌ং ত্রছঞঠধত্রয ধী ঙচ্শঠযঞঠছত্ররুধস্‌ ংঈধশ রুংছত্ঠত্রভ গঠঞচ্‌ ংছবচ্‌ ধঞচ্‌ংশ গংশং রুঠীংঈংশংত্রঞ ংঈশধস্‌ ঞচ্ধযং ংঈধশ রুংছত্ঠত্রভ গঠঞচ্‌ মণ্ণশূয ছত্ররু ধঞচ্‌ংশ চ্‌ংছঞচ্‌ংত্রয. ংঔণ্ণযত্ঠস্য ছবঞংরু রুঠীংঈংশংত্রঞত্ষ্‌ ঞধগছশরু ঞচ্ধযং ধী ঈছশ ছৎ - ঝযত্ছস্‌ ছত্ররু ঞচ্ধযং ধী ঈছশ ছৎ -চ্ছশঢ. মচ্‌ং বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্রছৎ 'ণ্ণয' ছত্ররু ঞচ্‌ং ংন্ঞশছ বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্রছৎ 'ঞচ্‌ংস্‌' ঠয ছ বধত্রযঞছত্রঞ ঠত্র চ্ণ্ণস্ছত্র চ্ঠযঞধশষ্‌.'

    হান্টিংটন সাহেব এমনকি একটি বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না
    'স্ধযঞ ত্ঠূংত্ষ্‌ ঠত্রটধত্টঠত্রভ ংঔণ্ণযত্ঠস্য ধত্র ধত্রং যঠরুং ছত্ররু ত্রধত্র-ংঔণ্ণযত্ঠস্য ধত্র ঞচ্‌ং ধঞচ্‌ংশ.' এইসব ভয় জাগানো, বিপথগামী পাণ্ডিত্যকে ব্যর্থ প্রমাণ করে মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে কোনো তত্ত্ব বা যুক্তির খাপেই তাকে পুরোপুরি আঁটা যায়না । সেকেলে কবি চণ্ডীদাসের বহু পুরোনো কলি মনে পড়ে যাচ্ছে । মানবতায় ঋদ্ধ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধের বাস্তব ছবি বলেই `ধানসিদ্ধির পরণকথা' পড়তে ভালো লাগে । মনে আশা জাগে । বিশ্বাস দৃঢ় হয়, মানুষ-ই সত্য ।

    ভাষার ব্যাপারে মিহির সেনগুপ্তকে কোনো ভাবেই আপোসকামী বলা যাবে না । বাচনে আঞ্চলিকতার স্বাদগন্ধ এবং ঝাঁঝ তিনি পুরোপুরি রেখেছেন । কৌতুকময়তা এবং বেদনা, - নম্র এবং দুর্বিনীত শব্দরাজির মধ্যে স্রোতের মতো বয়ে চলেছে । কিছু কিছু শব্দ নাগরিক শ্রবণে কিঞ্চিৎ কড়া ঠেকতে পারে সেক্ষেত্রে দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণের সংলাপের শ্লীলতা অশ্লীলতা বিচারে বঙ্কিমের মন্তব্য মনে পড়ে যায়, `রুচির মুখ রক্ষা করিতে গেলে ছেঁড়া তোরাপ, কাটা আদুরী, ভাঙ্গা নিমচাঁদ আমরা পাইতাম ।'

    চান্দ্রদ্বীপি উপভাষাকে পাদটীকা ছাড়া যেভাবে মিহির সেনগুপ্ত গ্রন্থের পর গ্রন্থে ব্যবহার করে চলেছেন তাতে পাঠকের, বিশেষত রাঢ়বঙ্গের পাঠকের প্রশিক্ষণ প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে । এই ভাষায় পাঠককে রীতিমতো দড় করে তুলবেন মনে হয় লেখকের এই প্রশংসনীয় সংকল্প রয়েছে । এই ব্যাপারে তিনি একটি ঘরানা তৈরি করে তুলছেন বলা যায় ।



    গ্রন্থপঞ্জি :

    -------ধানসিদ্ধির পরণকথা : মিহির সেনগুপ্ত
    -------দেশ-বোধের মানচিত্র : মিহির সেনগুপ্ত
    -------বঙ্কিম রচনাবলী সমগ্র সাহিত্য : সাহিত্য সংসদ
    -------বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য (দ্বিতীয় খণ্ড) : আহমদ শরীফ
    -------দয়াময়ীর কথা : সুনন্দা সিকদার
    -------
    মচ্‌ং বত্ছযচ্‌ ধী বঠটঠত্ঠজ়্ছঞঠধত্রয ছত্ররু ঞচ্‌ং শংস্ছূঠত্রভ ধী গধশত্রু ধশরুংশ : নছস্ণ্ণংৎ .ংঐ ণণ্ণত্রঞঠত্রভঞধত্র
    -------এখন পর্যাবরণ বিষয় : দেশভাগ (এপ্রিল ২০০৯) : সম্পাদক অনিল দাস, আমন্ত্রিত সম্পাদক গৌতম রায়

    (পরবাস-৪৪, ডিসেম্বর, ২০০৯)

    (প্রসঙ্গত: মিহির সেনগুপ্ত'র স্মৃতিচারণ `হওয়া না হওয়ার বৃত্তান্ত' পরবাস-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে -- সম্পাদক)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • কীভাবে লেখা পাঠাবেন তা জানতে এখানে ক্লিক করুন | "পরবাস"-এ প্রকাশিত রচনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রচনাকারের/রচনাকারদের। "পরবাস"-এ বেরোনো কোনো লেখার মধ্যে দিয়ে যে মত প্রকাশ করা হয়েছে তা লেখকের/লেখকদের নিজস্ব। তজ্জনিত কোন ক্ষয়ক্ষতির জন্য "পরবাস"-এর প্রকাশক ও সম্পাদকরা দায়ী নন। | Email: parabaas@parabaas.com | Sign up for Parabaas updates | © 1997-2024 Parabaas Inc. All rights reserved. | About Us