• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪০ | ফেব্রুয়ারি ২০০৮ | গল্প
    Share
  • জনৈক সাংসারিক লোকের রোজনামচা : সাবর্ণি চক্রবর্তী




    ॥ ১ ॥


    বর্ষাকালটা বড় বাজে ।

    বৃষ্টিটা এল ঠিক অফিসে বেরোবার মুখে । তখন আবার ছাতা নাও, জুতো পাল্টে রবারের জুতো পর । তাতে গেল খানিকটা সময় । রাস্তার ওপার থেকে বাস ধরতে হয় । ছাতা দিয়ে বৃষ্টি সামলে রাস্তা পার হতে হতে নাকের ডগা দিয়ে খালি বাসটা বেরিয়ে গেল । সরকারি বাস তো - আমার মত একটা লোক হাত দেখালে তোয়াক্কা করবে কেন ? ঠিক পেছনে যে মিনি বাসটা আসছিল, সেটা একেবারে বাধ্য ছেলের মত ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল । ভেতরে ঠাসগাদাই ভিড় । আমি তার ভেতর আমার পা, মাথা এবং ভেজা ছাতা ঢোকাবার চেষ্টা করছিলাম - গেটে দাঁড়ানো ক্লীনার ছোকরাটা - তাড়াতাড়ি উঠুন, জলদী, জলদী - বলতে বলতে ওর বাঁ হাত দিয়ে আমাকে ঐ ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল - পেছনে লাইন করে দাঁড়িয়ে যাওয়া গাড়িগুলো সব প্যাঁ পোঁ করে হর্ন বাজাচ্ছিল তো । এই মিনিবাস, প্রাইভেট বাস, এগুলোতে ওঠার একটা সুবিধে আছে - রাস্তার যেখানে হোক হাত দেখালেই দাঁড়িয়ে পড়ে লোক তুলে নেয় ।

    সাড়ে আটটা প্রায় বাজে, এর ভেতরই হাওড়া স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড় । শহরতলির লোকাল ট্রেনগুলো একটা করে ঢুকছে, আর পিল পিল করে লোকের স্রোত বেরিয়ে আসছে তার থেকে । যারা কলকাতার বাইরে যাবে তারা কেউ প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে নেই - সবাই প্ল্যাটফরমে ঢোকার মুখে ইণ্ডিকেটরের সামনে ঝাঁক বেঁধে দাঁড়ানো । আমিও সেই দলে মিশে আছি । পায়ের নীচের সিমেন্টের মেঝে বৃষ্টির জলে ভিজে অল্প অল্প পেছল - পাশেই পুরুষদের পেচ্ছাপখানা - লেখা রয়েছে প্রস্রাবাগার, পুরুষ - প্রচুর লোক ট্রেন থেকে নেমে এসে সেখানে ঢুকছে, তার খোলা দরজা দিয়ে ভেসে আসছে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ । সেই গন্ধ নাকে নিতে নিতে আমি বাকি সকলের মত ইণ্ডিকেটরের দিকে তাকিয়েছিলাম । এখনও ইণ্ডিকেটরে আমি যে ট্রেনে যাব তার প্ল্যাটফরম নাম্বার দেখাচ্ছে না । সবাই একদৃষ্টিতে ইণ্ডিকেটর বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে - কারণ প্ল্যাটফরম নাম্বার লাল অক্ষরে ফুটে উঠলেই সেদিকে দৌড় মারতে হবে । দেরি হয়ে গেলে ট্রেনে উঠে বসার জায়গা পাওয়া যাবে না । আমি দৈনন্দিনের যাত্রী - রোজ এই একাগ্র হয়ে ইণ্ডিকেটর বোর্ড দেখাটায় একটা সুবিধে বোধ হয় হচ্ছে - আমার মন:সংযোগের ক্ষমতা বাড়ছে । এই করতে করতে যদি কুণ্ডলিনী জাগাতে পারি তাহলে আর আমাকে পায় কে ? রোজ যে ট্রেনটায় যাই আজ বৃষ্টির জন্যে সেটা ধরতে পারিনি । হাওড়া স্টেশন থেকে এক ঘন্টা, সেখান থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট মফস্বলের বাস জার্নি । গিয়ে পৌঁছতে বেলা সাড়ে দশটা হয়ে যাবে ।

    ইণ্ডিকেটরে লাল অক্ষর ফুটে উঠল । ষোল নম্বরে দাঁড়ানো ট্রেনটা যাবে । দ্রুত হাঁটা শুরু করতে গিয়েই এক বিপত্তি । পা পিছলে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম । আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন এক জবরদস্ত চেহারার দশাসই মহিলা । তার কাঁধ থেকে ঝোলানো ভ্যানিটি ব্যাগটা ধরে কোনমতে সামলে নিলাম নিজেকে । কিন্তু ভীষণ ত্রক্রুদ্ধ এবং বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকালেন মহিলা । সভয়ে বললাম, সরি । ভেরি ভেরি সরি । তারপর পা টিপে টিপে ছুটলাম ট্রেনটার দিকে ।

    কলকাতা থেকে সাতান্ন কিলোমিটার দূরের বর্ধিষ্ণু মফস্বল শহর । আমাদের ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ সেখানে । আমি যখন গিয়ে পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটার কাছাকাছি । ব্যাঙ্ক খুলে গেছে - সদর দরজার তালার চাবি থাকে আমাদের পিওন গণেশের কাছে, ও এখানকারই লোক । অ্যাকাউন্টেন্ট রবীন, ক্যাশিয়ার সমর, এরাও স্থানীয় লোক । একমাত্র আমিই কলকাতা থেকে আসা যাওয়া করি । এর মধ্যেই চার পাঁচ জন লোক এসে গেছে টাকা তোলবার জন্যে । ম্যানেজারবাবু না এলে ক্যাশ ভল্ট খোলা যাবে না, এই কথা বলে ওদের দাঁড় করিয়ে রেখেছে রবীন । আমাকে দেখেই নানারকম মন্তব্য আরম্ভ হয়ে গেল - এই যে, এসে গেছে - এত দেরি কিসের - আমাদের সময়ের কোন দাম নেই নাকি - ওসব কথা না শোনার ভান করে আমি ভেতরের ঘরে ঢুকে গেলাম । তোমাদের তো রোজ একশো কুড়ি কিলোমিটার ঠ্যাঙাতে হয় না - তোমরা আর বুঝবে কি, কেন দেরি হয় ।

    রবীন আর সমর ঘরে ঢুকল । সঙ্গে লক্ষণ মণ্ডল । লক্ষণ মণ্ডল স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন নেতা গোছের লোক । ওর হাতে একটা বড় ব্রীফ কেস । প্রথমে ঘরের দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করা হল, তারপর খোলা হোল ব্রীফ কেস । ভেতরে তাড়া তাড়া টাকা । তবে নোটগুলো সবই পুরনো, প্রায় পচা । বাজারের ব্যাপারিদের হাত ঘুরে এসেছে তো । আমি, রবীন আর সমর মিলে টাকাগুলো ভাল করে গুণলাম । তারপর সমর ক্যাশ ভল্টের যে চাবিটা আমার সেটা নিয়ে গেল টাকা রাখতে । আর একটা চাবি থাকে ওর কাছে । দুটো চাবিই পরপর না লাগালে ভল্ট খোলা বা বন্ধ করা যায় না । এতক্ষণ ক্যাশ ভল্ট প্রায় খালিই ছিল । এইবার যারা টাকা তুলতে এসেছে তাদের টাকা দেওয়া শুরু হবে ।

    এটা আমাদের ভেতরের ব্যবস্থা । এখানকার বাজারে প্রচুর দোকানপাট রয়েছে । তার ওপর সপ্তাহে তিন দিন হাট বসে । নগদ টাকার দরকার পড়ে বহু লোকের । চড়া সুদে একদিনের জন্যে টাকা ধার করে তারা । দিনের শেষে আমাদের যে টাকা বাড়তি থাকে, সেটা ক্যাশ ভল্টে যায় না, যায় লক্ষণ মণ্ডলের কাছে । ওর হাত দিয়ে এই টাকাটা বাজারে খাটে । পরের দিন আবার টাকা নিয়ে আসে লক্ষণ । সঙ্গে একদিনের সুদ । এই সুদটা আমাদের কজনের মধ্যে বাঁটোয়ারা হয় । সমর ক্যাশ বই, ভল্ট রেজিস্টার, সব ঠিকঠাক করে রাখে - ক্যাশের কাজে একেবারে ঘাগী হয়ে গেছে তো । হেড অফিস থেকে আমাদের ব্রাঞ্চ ইন্সপেকশন হবে ঠিক হলে আমরা আগে থেকে খবর পেয়ে যাই । সে কটা দিন এসব না করলেই হল ।

    চারটের সময় এখান থেকে একটা বাস ছাড়ে । রেল স্টেশনে চারটে বাহান্নয় একটা কলকাতার ট্রেন পাওয়া যায় - এই বাসটা ঐ ট্রেনটা ধরিয়ে দেয় । আমি ঐ বাসটায় চলে যাই । ব্যাঙ্কের কাজ চলে পাঁচটা পর্যন্ত - সে সব রবীন সামলায় । তাতেও বাড়ি পৌঁছতে সাতটা । বাড়ি ফিরে আমি পাই এক কাপ চা, আর গোটা চারেক পিস পাঁউরুটি টোস্ট - জ্যাম লাগানো । আমার কোলেস্টেরোল বাড়বে এরকম খাবার আমি যাতে খেতে না পাই তার দিকে তীক্ষণ নজর রাখেন আমার গৃহিণী । আজ দেখলাম চায়ের সঙ্গে রয়েছে স্তূপ করা কড়াইশুঁটির কচুরি । গিন্নীও হাসিমুখে খাবার টেবিলে এসে বসলেন - এটা ওটা সেটা কথা বললেন । সাধারণত এ সময়টায় টিভির সিরিয়াল দেখতে ব্যস্ত থাকেন তিনি । বুঝলাম আজ কোন বিশেষ কথা বলার আছে । বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হোল না । গৃহিণী বললেন, জানো, মা আসছেন । ।

    আমি ঘাড় নাড়লাম । বললাম, না, জানি না ।

    প্রিয়া হেসে আমার হাতে মৃদু একটি চড় মারলেন । বললেন, আহা, এই তো জেনে গেলে । আজই ফোন এসেছে । পরশু আসছেন । রবিবার আছে, তুমি স্টেশনে যেতে পারবে রিসিভ করার জন্যে ।

    আমি ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে যেতে হবে স্টেশনে ?

    এবার পত্নীর মুখ গম্ভীর হোল । বললেন, তুমি না গেলে আর কে যাবে ?

    আমি একমুখ ঠাণ্ডা চা দিয়ে চিবোন কচুরির দলা কোঁৎ করে গিললাম । বললাম, আচ্ছা যাব ।

    মেয়ে বুম্বী সোফায় হাত পা ছড়িয়ে বসে টি ভি দেখছিল । ওর পরনে জিনস আর টপ, হাতে রিমোট, মিনিটে মিনিটে রিমোটের বোতাম টিপে চ্যানেল পাল্টে পাল্টে দেখছে । ও সাধারণত এ সময় বাড়ি থাকে না, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যায় । আজ বোধহয় আড্ডা দেবার মত কাউকে পাওয়া যায়নি । ও বলে উঠল, দিদা আসছে, কি মজাই না হবে ।

    আমি চেয়ার ঠেলে খাবার টেবিল থেকে উঠে পড়লাম । এ বাড়িতে ছোট একটা কুঠরি আছে । সেটায় আমি ছাড়া বিশেষ কেউ ঢোকে না । আমি সেখানে ঢুকে বিছানায় লম্বা হলাম । আবার বেরোব রাতে খাবারের ডাক পড়লে । তার দেরি আছে । সাড়ে দশটা এগারোটার আগে হবে না ।

    রবিবার দিন আমি স্টেশন চত্বরে পায়চারি করছিলাম । বাইরে গাড়ি রাখার জায়গায় গিন্নী গাড়িতে বসে আছেন । নতুন কেনা একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা পড়ছেন । তাতে একটা প্রবন্ধ বেরিয়েছে - কি ভাবে মহিলারা বুড়ো বয়সেও যৌবন এবং সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারেন । সেটার ভেতর ডুবে আছেন আপাতত । আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন খোঁজখবর রাখতে - ট্রেন আসছে তার ঘোষণা হলেই দৌড়ে গিয়ে তাকে খবর দিতে । আমি একবার বলেছিলাম যে আমিও গাড়িতে বসি - ড্রাইভার স্টেশনের ভেতরে গিয়ে এই খোঁজটা নিক । অর্ধাঙ্গিনী আমার এই প্রস্তাব নস্যাৎ করে দিয়েছেন । ড্রাইভারের বুদ্ধির ওপর কোন ভরসা রাখা যায় নাকি ? ট্রেন যদি এসে যায় আর মা যদি নেমে পড়ে মেয়েকে দেখতে না পান ? কি হবে তখন ?

    অতএব আমি স্টেশনের বইয়ের দোকানে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছি আর মাঝে মাঝেই গিয়ে কালো বোর্ডে খড়ি দিয়ে লেখা ট্রেন কত লেট সেটা দেখছি । বাড়ি থেকে যখন ফোন করেছিলাম তখন লেট ছিল একঘন্টা, স্টেশনে পৌঁছে দেখলাম লেট হয়েছে দুঘন্টা । সেটা এখন কিছুক্ষণ পরপর দু ঘন্টা দশ মিনিট, দু ঘন্টা কুড়ি মিনিট এরকম হচ্ছে । গম্ভীর চেহারার এক ভদ্রলোক ভেতর থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে এসে পুরনো লেখাটা মুছে দিয়ে নতুন করে লিখে দিচ্ছেন - কেউ কোন প্রশ্ন করলে তার জবাব না দিয়েই ভেতরে ঢুকে যাচ্ছেন ।

    আমার শাশুড়ি থাকেন অস্ট্রেলিয়াতে । আমার শালা সেখানে থাকে । শ্বশুর গত হবার পর তিনি বিদেশিনী অর্থাৎ এন আর আই হয়েছেন । আপাতত আসছেন চেন্নাই থেকে, পণ্ডিচেরীতে আশ্রম দর্শন করে । আমার শালার প্রচুর চেনাজানা লোক আছে চেন্নাই এবং পণ্ডিচেরীর - তারাই ওখানকার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে । কলকাতার সব দায়িত্ব আমার, থুড়ি আমার গৃহিণীর ।

    শেষ পর্যন্ত ট্রেন এল । শ্বশ্রুমাতা নামলেন । কন্যা প্রথমে মাতাকে প্রণাম করলেন, তারপর মাতা পুত্রীতে পারস্পরিক গালে চুম্বন বিনিময় হোল । ততক্ষণে দুটো কুলি ভেতর থেকে খান ছয়েক বড় বড় স্যুটকেস নামিয়ে ফেলেছে । বাতানুকূল কোচ থেকে ছ'খানা স্যুটকেস নেমেছে, কি পরিমাণ কুলিভাড়া হতে পারে আমি তার আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম । গিন্নীর ত্রক্রুদ্ধ কটাক্ষপাত চোখে পড়তে বুঝলাম প্রণাম করতে দেরি হয়ে যাচ্ছে । ঝট করে উবু হয়ে পায়ে হাত ছোঁয়ালাম । কিন্তু এই প্রৌঢ় বয়েসে টেস্ট ক্রিকেটারের মত চট করে নিচু হতে গিয়ে পিঠে একটা টান লাগল - যন্ত্রণা পিঠ থেকে মাথা পর্যন্ত চিড়িক দিল একবার । সোজা হতে কষ্ট হচ্ছিল বলে মাথা তুলতেও দেরি হচ্ছিল । শাশুড়ী মাতা আমার ভক্তির আতিশয্য দেখে বড়ই খুশি হলেন । আমার মাথায় গালে হাত বুলিয়ে ডান হাতের পাঁচটা আঙুল একসঙ্গে জড়ো করে ঠোঁটে ছুঁইয়ে চুক করে আওয়াজে করলেন - বললেন, আহা থাক, হয়েছে হয়েছে ।

    যতক্ষণে সোজা হতে পারলাম ততক্ষণে মাতা এবং কন্যা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গেছেন । দুজনেরই মুখ ভরা খুশির হাসি । আমি দাঁড়িয়ে আছি প্ল্যাটফরমে, আমার চার পাশে ছড়ানো বড় বড় ভারি ভারি স্যুটকেসগুলো, এবং সামনে দুই লাল উর্দি পরিহিত কুলি । সেলাম ঠুকে বলল, গাড়িমে চঢ়া দেঙ্গে, চারশো রুপেয়া লাগেগা । আমি দর দস্তুর করতে গেলাম, তো ওরা দুজন হেসেই অস্থির । যাত্রী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় এলে কুলিভাড়া বেশি লাগে, আর নিজেদের গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই - দরটা আরও বাড়ে । দূর থেকে গৃহিণী চেঁচালেন, ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি করছো ? তাড়াতাড়ি এসো না । আমি কুলিদের বললাম, ঠিক হ্যায় - চারশোই মিলেগা । জলদী উঠাও মাল ।




    ॥ ২ ॥


    পরের দিন অফিসে বসে লেজারের হিসেব মেলাচ্ছিলাম । গত ব্রাঞ্চ ইন্সপেকশন হুড়ো দিয়েছে, লেজারের হিসেব মেলানো হয়নি বলে । রবীন একজন লোককে নিয়ে ঘরে ঢুকল, লোক না বলে এখনও ছোকরাই বলা যায় - বছর ত্রিশ বয়েস হবে । নাম নিরাপদ সাঁপুই - বাড়ি পাঁচমুড়ো গ্রামে, এখান থেকে কিলোমিটার দশেক হবে । নিজ চাষে পাঁচ একর জমি আছে, তাতে বছরে দু বার ধান ফলায়, আর শীতকালে সবজী । সম্পন্ন চাষী । আমাদের ব্যাঙ্কেই ওর প্রায় হাজার ষাটেক টাকা রাখা আছে । চাষ বাড়াবার জন্যে একটা পাওয়ার টিলার কিনতে চায় । ওর টাকা দিয়েই কিনবে । আমাদের কাছে এসেছে জেনেটেনে নেবার জন্যে - কে ভাল পাওয়ার টিলারের ডিলার, কার দোকান থেকে কিনলে ভাল জিনিষটা পাওয়া যাবে ।

    কথাবার্তা হল । গণেশ আমার আর রবীনের জন্যে দু পেয়ালা চা এনেছিল, আমি নিরাপদর জন্যেও একটা আনিয়ে দিলাম । রবীন যেহেতু এখানকার লোক, ও সব খোঁজখবর রাখে । নগেন দলুই পাওয়ার টিলারের ডিলার - ভাল মাল দেয় । ঠিক হল কাল নিরাপদ আসবে বেলা দুটোর পর - ব্যাঙ্কিং আওয়ার শেষ হয়ে গেলে পরে । রবীন ওকে নগেন দলুইয়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে কথাবার্তা বলিয়ে দেবে । তারপর ঠিক হবে কি ভাবে পেমেন্ট দেওয়া হবে আর নিরাপদ পাওয়ার টিলারের ডেলিভারি নেবে ।

    বাড়ি ফেরার সময়টা সমানে বৃষ্টি হল পশলায় পশলায় । এরকম হলে ট্রেন বেশিরকম লেট চলে । বাড়ি পৌঁছতে আটটা বেজে গেল । বাড়ি ঢুকতেই গিন্নী বললেন, ড্রাইভারকে বসিয়ে রেখেছি । গাড়ির কি কি সব মেরামত করতে হবে । ওর সঙ্গে কথা বলে নাও । মা এসেছেন, এখন গাড়িটাকে একেবারে ঠিক ঠাক রাখার দরকার ।

    বসার ঘরের দরজা খোলা । সেখান থেকে বিলিতি গান এবং টিভির উদ্দাম আওয়াজ ভেসে আসছে । ড্রাইভার বসার ঘরের দরজার বাইরে একটা টুলে বসে উঁকি মেরে টি ভি দেখছিল । আমার সাড়া পেয়ে এদিকে মুখ ঘোরাল । একগাল হেসে মেরামতির ফিরিস্তি দিল । রেডিয়েটর ফুটো হয়েছে । সায়লেন্সার ফেটে গিয়েছে, পেট্রল ট্যাংক থেকে তেল ভালভাবে এঞ্জিনে আসছে না, সাসপেনশন খারাপ হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি । কম করে হাজার পাঁচেক টাকার ধাক্কা । মেরামতিতে খরচা যত বাড়বে ড্রাইভার ততই খুশি হবে, কারণ অন্তত দশ পার্সেন্ট ওর পকেটে যাবে । বুড়ি গাড়ি, গিন্নী হরদম ওটাকে ব্যবহার করেন, তার ওপরে এখন এন আর আই শ্বশ্রুঠাকুরানি উপস্থিত । নিশ্বাস ফেলে ড্রাইভারকে বললাম - তাহলে নিয়ে যাও মেকানিকের কাছে । খুব খুশি হয়ে চলে গেল ড্রাইভার ।

    বসার ঘরে ধুন্ধুমার কাণ্ড । বুম্বী তার গুটি ছয়েক বন্ধু বান্ধবী নিয়ে পুরো ঘরটা জুড়ে আছে । দুটি মেয়ে আর চারটে ছেলে । বুম্বী বোধহয় বন্ধুদের তার ফরেন দিদাকে দেখাতে নিয়ে এসেছে । বুম্বীর দিদা আপাতত ঘরের অন্য কোণে বসে ফোন করতে ব্যস্ত । মেয়ে দুটোর সাজগোজ বুম্বীর মতই - ছেলেগুলোর লম্বা চুল, মেয়েলি চেহারা - একটার চুল এত লম্বা যে রাবার ব্যাণ্ড দিয়ে ঘোড়ার ল্যাজের মত করে বেঁধে রেখেছে । ওরা সব নিজেদের মধ্যে তুই তুই করে কথা বলছে, হাত ধরে টানছে, চিমটিও কাটছে । এবার টি ভি-র পর্দায় একজন বিখ্যাত পুরুষালী হিন্দি নায়কের সাক্ষাত্কার নিচ্ছেন জনৈকা বিগতযৌবনা ছিপছিপে চেহারার সুন্দরী - অত্যন্ত খাটো শর্টস এবং স্কিন টাইট টপ পরে আছেন তিনি । নায়ক কথা বলতে বলতে জানালেন যে তিনি পড়াশোনায় অত্যন্ত খারাপ ছিলেন, আর লেখাপড়া একেবারেই পছন্দ করতেন না । তাই শুনে সুন্দরীটি হেসে উঠলেন, তার চোখ দুটি ছোট হয়ে গেল, কুন্দশুভ্র দন্তপংক্তি বিকশিত হল এবং মুখগহ্বর থেকে হাস্যধ্বনি নির্গত হল - হিই খিট, হিই খিট । নায়ক টি ভি ক্যামেরার সামনে নেচে দেখালেন যে একটি সিনেমায় তিনি কিভাবে নেচেছিলেন - সাক্ষাত্কারিনী সুন্দরীটি তার হাত ধরে নাচতে শুরু করলেন । আর সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে বুম্বী আর তার বন্ধুরা । এমন সময় অর্ধাঙ্গিনী ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এবং দেখলেন যে আমার চোখ টি ভি-র নৃত্যরতা সুন্দরীর ওপর নিবদ্ধ । আমার দিকে একটি জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রিমোটের বোতামের এক চাপে টি ভি বন্ধ করে দিলেন তিনি । অপরাধীর মত মুখ করে আমি আমার কুঠরিতে ঢুকে পড়লাম ।

    কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বেরোতে হল আমাকে । বুম্বীর বন্ধুরা চলে গেছে, বুম্বীও বোধ হয় তাদের সঙ্গে পাড়া বেড়াতে গেছে । এসেছেন এক প্রৌঢ় দম্পতী । শ্রীমতী সুলেখা ঘোষ আর তার স্বামী বিপুল ঘোষ । আমাদের পাড়াতেই থাকেন । এক পাড়ার প্রতিবেশি হিসেবে আমাদের মধ্যে জানাশোনা আছে । কিন্তু আমরা এদের বিশেষ খাতির দেখিয়ে থাকি । তার কারণ মহিলা বুম্বীর কলেজের অধ্যাপিকা । বুম্বী কলেজে সামনের ইয়ারে প্রমোশন পাবে কিনা তার অনেকটাই নির্ভর করবে এই মহিলা বুম্বীকে পরীক্ষায় কিরকম নম্বর দেবেন তার ওপর । ভদ্রলোকের হাতে একটা বড় প্ল্যাস্টিকের ঝোলা ব্যাগ । তার থেকে তিনি একগাদা নতুন বই বার করলেন । সব আনকোরা চকচকে । সর্বনাশ করেছে ।

    ভদ্রলোক বছর কয়েক হল সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন । তারপর থেকে সাহিত্যে বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টায় গল্প লিখে চলেছেন । প্রত্যেক বছর বইমেলায় নিজের খরচে পেন্সনের টাকায় একটি করে গল্পগ্রন্থ বার করছেন । তারপর সেই বই কিনতে হচ্ছে আমার মত হতভাগ্যদের । গত বছরের বইটার গোটা কুড়ি কপি আমাকে গছিয়েছিলেন তিনি । আমার চেনাপরিচিতদের সেই বই বিক্রি করে দেব এই কড়ারে আমার থেকে কুড়িটি কপিরই দাম নিয়ে নিয়েছিলেন । সেগুলো এখনও ডাঁই হয়ে পড়ে আছে, একটাও কাউকে গছাতে পারিনি । হাসিমুখে আমার দিকে একটা নতুন বই বাড়িয়ে ধরে বললেন, এবারকার গল্পগুলো একেবারে নতুন স্টাইলে লিখেছি । পড়ে দেখবেন কি রকম লাগে ।

    আমি দেঁতো হাসি দিয়ে দুহাতে সেই বই নিলাম । বললাম, নিশ্চয়ই পড়ব । তারপর ভদ্রলোককে তেল দেবার জন্যে বললাম, ভাল তো লাগবে নিশ্চয়ই । আপনি তো খুবই ভাল লেখেন ।

    ভদ্রলোক অত্যন্ত উত্সাহিত হলেন । তার গতবছরের বইটার গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন । পৃথিবীর কোন কোন বিখ্যাত লেখকের ভাবধারায় তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন, কি কি ঘটনা তাকে গল্পগুলো লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল - এই সব । আমার গিন্নী অতিথিদের জলযোগের ব্যবস্থা করতে রান্নাঘরে ঢুকেছেন - অতএব সুলেখা দেবীর কথা বলার কোন সঙ্গী ছিল না । হাসিমুখে তিনি প্রতিভাবান স্বামীর কথা শুনছিলেন - পৃথিবী এখনও তোমাকে চিনল না গোছের একটা মুগ্ধ দৃষ্টি পতির মুখের ওপর মেলে রেখেছিলেন । আমি লেখাগুলোর একটাও পড়িনি - সময় বা রুচি কোনটাই আমার নেই - আমি খালি ঠিক সময়মত মাথা নেড়ে ভদ্রলোকের কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম । ভদ্রলোকের স্ত্রীভাগ্যে একটু হিংসেও হচ্ছিল - আহা, আমার অর্ধাঙ্গিনী যদি আমার বাক্যিসুধা এভাবে পান করতেন ।

    গৃহিণী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন । পেছনে খাবারের প্রকাণ্ড ট্রে হাতে মেনকা - আমাদের রান্নার কাজের মেয়েমানুষ । চা, ডবল ডিমের ওমলেট আর ছুঁড়ে মারলে মানুষের মাথা ফেটে যায় এরকম সাইজের রাজভোগ । ওই সব খাবারের সদ্ব্যবহার করার পর ভদ্রলোক বললেন, আজ আমরা উঠি । এই দশটা বই আপনার জন্যে এনেছি । দামটা সস্তাই - সত্তর টাকা করে । সাতশো টাকা দিলেই হবে ।

    আমি ভেতরের ঘর থেকে টাকা বার করে এনে ভদ্রলোকের হাতে দিলাম । সে টাকা পকেটে পুরে উনি সস্ত্রীক বিদায় নিলেন । বুম্বী ফিরল রাত দশটা পার করে । গৃহিণী কঠোর তিরস্কার করতে লাগলেন - এত রাত পর্যন্ত কোথায় থাক, ধিঙ্গি মেয়ে কোথাকার ? খবরের কাগজে পড় না - গুণ্ডা বদমাশে শহরটা ভরে গেছে, ল অ্যাণ্ড অর্ডার বলে কিছু নেই ?

    বুম্বী পাত্তাই দিল না । অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বলল, গুণ্ডা বদমাশকে যদি ভয়ই করব তাহলে এতদিন কারাটের ট্রেনিং নিলাম কি করতে ? এই বলে ছোট্ট একটু লাফ মেরে মুখে একটা হুপ্‌ শব্দ করে একটা লাথি ছুঁড়ল । সেটা লাগল একটা চেয়ারে, বিকট আওয়াজ করে সেটা মাটিতে আছড়ে পড়ল । গিন্নী তাড়াতাড়ি সেটাকে সোজা করে দাঁড় করালেন । দেখা গেল সেটার একটা পায়ার খানিকটায় চলটা উঠে গেছে । মাতা কন্যার দিকে কটমট করে তাকালেন । অবহেলায় দু কাঁধে ঝাঁকুনি দিল বুম্বী । তারপর হাতমুখ না ধুয়েই খাবার টেবিলে বসে পড়ে চেঁচাল, মেনকাদি, খাবার দাও ।

    আমরা সবাই খেতে বসলাম । আমার শাশুড়িমাতা আগের দিনের ট্রেনযাত্রার ধকল কাটাবার জন্যে সায়ংকালীন নিদ্রা দিচ্ছিলেন । গৃহিণী সস্নেহে তাকে ডেকে তুললেন - ওমা, মা, ওঠো খেতে এসো । খেতে খেতে শ্বশ্রুমাতা বললেন, জয়ি, তোদের এই ফ্ল্যাটটায় বেশ দমচাপা গরম । শোবার ঘরটায় একটা এসি লাগিয়ে নিতে পারিস ।

    আমার পত্নীর নাম জয়ন্তী, সংক্ষেপে জয়ি । বিজয়ীর মত তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, শুনলে তো - মা কি বললেন । শীগগির একটা এসি লাগাবার ব্যবস্থা কর ।

    বুম্বী একটা চেয়ারে বসে টেবিলের তলা দিয়ে উল্টোদিকের একটা চেয়ারে পা তুলে দিয়ে মাংসের হাড় চুষছিল । মুখ থেকে হাড়টা বার করে বলল, বাপিটা ভীষণ কিপ্টে । আমাদের গাড়িতেও একটা এসির দরকার । আমার কত বন্ধুর গাড়িতে এসি লাগানো রয়েছে ।

    আমি চুপচাপ খাওয়া শেষ করলাম । তারপর শাশুড়িমাতা বাথরুমে গেছেন এরকম একটা ফাঁক বুঝে আমি শোবার ঘরে ঢুকলাম । আমার জামাকাপড় সবই এ ঘরের আলমারিতে থাকে । এ ঘরটায় ঢোকা তো এখন আমার জন্যে প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে । গোটা কয়েক স্যুটকেস খোলা হয়েছে, গিন্নী তার থেকে যাবতীয় জিনিষ বার করে খাট জোড়া বিছানার ওপর থরে থরে সাজিয়ে রাখছেন - শাড়ি, পারফিউম, বিদেশী সাবান, বিদেশী চকোলেটের টিন, আত্মীয় স্বজনদের জন্যে যাবতীয় উপহার সামগ্রী । আমি পরের দিন অফিসে পরে যাবার জন্যে আমার জামা বার করে নিয়ে নিজের গর্তের দিকে যাচ্ছিলাম, এমন সময় প্রিয়া ডাকলেন - শুনছ, একটা কথা তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছি ।

    আমি ফিরে দাঁড়ালাম । বললাম, শুনছি, বলো ।

    আজ সন্ধেবেলা বান্টি ফোন করেছিল । ওদের কলেজ বিল্ডিং ফাণ্ডের জন্যে টাকা চেয়েছে - পনেরো হাজার । এক সপ্তাহের মধ্যে দিতে হবে । তাড়াতাড়ি করে টাকাটা পাঠিয়ে দাও ।

    বান্টি আমার ছেলে, বুম্বীর থেকে দু'বছরের বড় । উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় নম্বর খুবই খারাপ পেয়েছিল । কোথাও কোন চান্স পাচ্ছিল না - পরীক্ষা দিয়ে এঞ্জিনীয়ারিং কলেজে ঢোকা তো দূর অস্ত । এমন সময় কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোল - দক্ষিণ ভারতের একটি প্রাইভেট ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের কর্তারা কলকাতায় আসছেন - অমুক তারিখ থেকে অমুখ তারিখ অমুক হোটেলে স্পট অ্যাডমিশন হবে । ম্যানেজমেন্ট কোটার সীটে ভর্তি করানো হয়েছিল বান্টিকে - লেগেছিল নগদ আড়াই লাখ । অফিসে কো অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি থেকে ঝেড়েমুছে ধার করতে হয়েছিল তখন । এখন খরচা হিসেবে বান্টিকে মাসে চার হাজার টাকা পাঠাতে হয়, তার ওপর কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এটা সেটা ছুতো করে ছাত্রদের থেকে টাকা আদায় করে । বান্টি পাশ না করা পর্যন্ত ব্যাপারটা চলবে । তবুও - পাশ করলে পর বান্টির হাতে এঞ্জিনীয়ার হয়েছে, এই কাগজটা তো থাকবে ।

    আমি গিন্নীর কথার উত্তরে বললাম, আচ্ছা দেখছি । তারপর ঢুকে গেলাম আমার কুঠরিতে ।




    ॥ ৩ ॥



    অফিসে আমার ঘরে বসে রবীনের সঙ্গে কথা বলছিলাম । রবীন নিরাপদকে নগেন দলুইয়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছে । ও আমাকে প্ল্যানটা বোঝাচ্ছিল । নগেন দলুই আসলে একটি জোচ্চর । ওর দোকানের দেয়ালে খালি কতগুলো পাওয়ার টিলারের ছবি টাঙানো রয়েছে । ও প্রথমে লোকের কাছ থেকে টাকা নেয় পাওয়ার টিলার বিক্রি করবে বলে । তারপর খদ্দেরকে বলে কোম্পানিতে অর্ডার দিয়েছে, মাল এলেই ডেলিভারি দেওয়া হবে । তারপর মাল আসতে দেরি হচ্ছে বলে খদ্দেরকে ঘোরাতে থাকে । টাকা আর ফেরৎ দেয় না । বেশ কিছু লোককে ঠকিয়েছে এইভাবে । রবীন প্রথমে নিরাপদকে দিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে নিয়েছে, তারপর ও নিজেই কাগজটায় লিখেছে যে নিরাপদ ব্যাঙ্ককে অথরিটি দিচ্ছে ওর জমা টাকা তুলে নিয়ে নগেন দলুইকে পেমেন্ট করার জন্যে । এখন আমি খালি অর্ডার করে দেব, যাতে নিরাপদর অ্যাকাউন্ট থেকে ঐ টাকাটা তুলে নেয়া যায় ।

    রবীন বলল, নগেন দলুই নেবে দশ হাজার । বাকি টাকা আমাদের ক্যাশে দিয়ে দেবে । সমর আর গণেশের পাঁচ, পাঁচ করে - বাকি টাকা আমার আর আপনার - আধাআধি ।

    আমি এক কথায় রাজি হতে পারলাম না । নিরাপদও তো ছেড়ে দেবে না । নগেন দলুইয়ের কাছে যাবে - আমাদের কাছেও আসবে পাওয়ার টিলার পায়নি বলে । তার ওপর ওর সঙ্গে কোন পার্টির যোগাযোগ আছে তা কে জানে ! লোকজন নিয়ে এসে যদি ঝামেলা বাধায় - তখন ?

    আমার ভয়কে হেসে উড়িয়ে দিল রবীন । বলল, আরে দাদা, আমি সব খোঁজখবর না নিয়েই কি এই মতলব করেছি ? নগেন দলুই এর হাতে লোকজন গুণ্ডা ফুণ্ডা সব আছে । ওর কাছে গিয়ে বেশি ঝামেলা করলে পিটিয়ে ঠাণ্ডা করে দেবে । তাছাড়া এ ব্যাপারে ব্যাঙ্কের দায়িত্ব কোথায় ? নিরাপদ তো আমাদের লিখেই দিয়েছে ওর টাকা তুলে নগেন দলুইকে দিতে । ব্যাঙ্ক তো ওর কথামতোই কাজ করছে । আপনি আর ওসব চিন্তা করবেন না - খালি অর্ডারটা করে দিন । বাকি সব আমি সামলে নেব'খন । আমি আর দেরি না করে সই করে দিলাম । বললাম, নগেনকে বলো যদি টাকাটা কাল পরশুর মধ্যে দিতে পারে ।

    বাড়ি ফিরতে যথারীতি সন্ধে পার । এসে দেখলাম আমার গৃহিণীর মাসতুতো পিসতুতো ইত্যাদি সম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয়া এসেছেন আমার শাশুড়ি সন্দর্শনে । সঙ্গে তাদের স্বামীরা এবং সন্তানাদি - কিছু বালক বালিকা এবং কিশোর কিশোরী । অতিথিদের পায়ের কাছে নামিয়ে রাখা কাপে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া চা - আর প্লেটে বিস্কিট এবং মিষ্টির ধ্বংসাবশেষ । ছেলেমেয়েগুলো দৌড়ে বেড়াচ্ছে এঘর থেকে ওঘর - সমানে চেঁচাচ্ছে, হাসছে আর ছোটখাট মারামারি করে নিচ্ছে । একটি যুবক শাড়ী বিক্রীওয়ালা এসেছে । আমার স্ত্রী ওর কাছ থেকে কিস্তিতে শাড়ী কিনে থাকেন । ছোকরা - মলয় না কি যেন একটা ওর নাম - প্রায় বছর দুই ধরে আমার বাড়িতে আসছে শাড়ী বিক্রীর জন্যে । আগে ওর অবস্থা খুব খারাপ ছিল । চেহারা দেখলেই সেটা বোঝা যেত - রোগা, হাড় বের করা । এখন দিব্যি গোলগাল চেহারা হয়েছে । শুনেছি কোথায় একটা ফ্ল্যাট ও বুক করে ফেলেছে কেনার জন্যে । শাড়ীর গাঁটরী মাটিতে রেখে খুলে ফেলেছে - একটার পর একটা শাড়ী টেনে বার করছেন মহিলারা, ভাঁজ খুলে ফেলছেন, তার পরই পছন্দ হচ্ছে না বলে ছোকরার হাতে ফেরৎ দিয়ে দিচ্ছেন । প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শাড়ীগুলো আবার অত্যন্ত নিপুণভাবে ভাঁজ করে ওর বোঁচকায় সাজিয়ে রাখছে ছেলেটা । স্বামীদের মধ্যে কয়েকজন মুখে একটু প্রশ্রয়ের হাসি মেখে নিজের পত্নীর শাড়ী বাছা দেখে যাচ্ছেন - বাকিদের চোখ টি ভি-র দিকে । অত্যন্ত জনপ্রিয় সিরিয়াল চলছে - নায়ক নায়িকা হাত মুখ নেড়ে টি ভি-র পর্দায় মূকাভিনয় করছেন, কারণ শাড়ী বাছার সুবিধের জন্যে টি ভি-র আওয়াজটাকে মিউট করে দেওয়া হয়েছে । আমার গৃহিণী একটা শাড়ী টেনে বার করলেন, ভাঁজ খুলে নিজের গায়ের ওপর মেলে ধরে আমার দিকে একটি প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিপাত করলেন । বললেন, এই বোমকাইটা ভারি সুন্দর, না ?

    ওই মলয় ছোকরা বলল, ওটা চার হাজার তিনশো - আপনার জন্যে চার হাজার দুশোয় দিয়ে দেব ।

    বোমকাই এর দাম শুনে আমি তো চমকাই আর কি । আমি কিছু বলবার আগেই শ্বশ্রুমাতা বললেন, ভারি সুন্দর মানিয়েছে । ওটা তুই নিয়ে নে, জয়ি ।

    গিন্নী পত্রপাঠ মলয়কে বললেন, ওটা আমার জন্যে বেঁধে দাও । তারপর গিন্নী আরও দুটো শাড়ী নিলেন - একটা আমার শালার স্ত্রীর জন্যে, আর একটা নিজের মায়ের জন্যে । বাকি মহিলারাও অপছন্দ করতে করতে প্রত্যেকেই একটা করে শাড়ী কিনে ফেললেন, কারণ দাম পরে দিলেও চলবে । মলয় ওর বোঁচকার একটা কোণের থেকে একটা ছোট নোট বুক বার করল । সেটাতে সব মহিলাদের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর এসব লিখে নিল । তারপর হাসিমুখে নিজের গাঁঠরি বাঁধল, সেটা কাঁধে ফেলে বিদায় হল ।

    এরপর আমাদের বসার ঘরের আলোচনা বিভিন্ন খাতে বইতে লাগল । যেহেতু আমার শাশুড়ী অস্ট্রেলিয়া নিবাসী, বিভিন্ন বিদেশের নানারকম বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে লাগল । এই দম্পতিরা প্রায় প্রত্যেকেই কোন না কোন বিদেশে ঘুরে এসেছেন - আর কোথাও না হলে নিদেনপক্ষে নেপাল বা বাংলাদেশ । খালি আমার স্ত্রীর অক্ষম স্বামী এ পর্যন্ত তাকে কোন বিদেশে পাঠাতে পারেনি বলে তিনি গম্ভীর মুখ করে এসব আলোচনা শুনে গেলেন আর মাঝে মাঝে কড়া চোখে আমার দিকে তাকালেন । এক মহিলার স্বামী অনেকদিন আফ্রিকাতে পোস্টেড ছিলেন । সেই আফ্রিকার অভিজ্ঞতার সুবাদে তিনি অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া আর ক্রিকেট পিচ নিয়ে একটা ছোটখাট বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন । শেষ পর্যন্ত একজন তার হাতের ঘড়ি দেখলেন এবং ঘোষণা করলেন, দশটা বাজে । এবার উঠতে হয় । তখন পাঁচ দম্পতি এবং তাদের আটটি সন্তানের আঠেরোটি হাত আমার শাশুড়ীর পদস্পর্শ করল - সদর দরজার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আঠেরো জোড়া জুতোর থেকে যে যার জুতো খুঁজে নিয়ে পায়ে গলাল আর দরজার বাইরে পা দিল । শাশুড়ী মাতা সদর দরজা পর্যন্ত এলেন, প্রত্যেক দম্পতিকে আবার আসবার জন্যে সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন । যখন এই পর্ব শেষ হল আমি আমার হাতের ঘড়ি দেখলাম । দশটা কুড়ি । কুড়ি মিনিট সময় কেটেছে প্রণাম, জুতো পরা আর আবার আসব এই প্রতিশ্রুতিতে ।

    আমি বাথরুমে ঢুকলাম হাত মুখ ধোবার জন্যে । অফিস থেকে ফেরার পর এসব করার ফুরসৎ হয়নি । বুম্বী শুয়ে ঘুমোচ্ছে । আজ ওরা কলেজ থেকে পিকনিকে গিয়েছিল - খুব নাচানাচি করেছে বোধহয় । আমার গিন্নী তারস্বরে ডেকে ওকে তোলবার চেষ্টা করতে লাগলেন । বুম্বী একবার করে উ: আ: করছে, আবার পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে । দেখা যাক ও কতক্ষণে ওঠে । ও উঠলে তবেই রাতের খাবার দেওয়া হবে ।




    ॥ ৪ ॥


    তিন মাস কেটে গেছে । এই তিন মাসে অনেক জল গড়িয়ে গেছে গঙ্গায় । শাশুড়ীমাতা তার নিজভূমি, অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে গেছেন । কলেজে ঢোকার সময় বান্টিকে একটা সেকেণ্ড হ্যাণ্ড স্কুটার কিনে দেওয়া হয়েছিল । সেটা প্রায়ই খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে সে একটি আনকোরা নতুন মোটর বাইক দাবী করেছে । এ মাসে টেলিফোনের বিল এসেছে ছ'হাজার সাতশো বিরাশী টাকার । বিলের অঙ্কটা দেখে আমি আমার গিন্নীর ক্লাছে কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলাম । তাতে তিনি আমার ছোট মনের পরিচয় পেয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং ছোটবেলায় আমার মাতাপিতা আমাকে কোন সহবৎ শিখিয়েছেন কিনা সে সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । আপাতত: আমি অফিসে বসে আছি । আমার সামনে টেবিলের ওপর রয়েছে হেড অফিস থেকে আসা একটি চিঠি - অতি মারাত্মক একটি চিঠি ।

    দায়ী ঐ ব্যাটা নিরাপদ । ও প্রথমে গিয়েছিল নগেন দলুইয়ের কাছে । সেখানে সুবিধে করতে না পেরে ব্যাঙ্কে এসেছিল ঝামেলা পাকাতে । সঙ্গে পাঁচ ছ জন লোক । এসে গলা তুলে চীত্কার । এই মারে তো সেই মারে । ওদের মধ্যে একজন তো আমাকে দু একটা ধাক্কাও মেরে দিয়েছিল । ভাগ্যিস তখন লক্ষণ মণ্ডল ব্যাঙ্কে ছিল । ওই বাঁচিয়ে দিল । যে লোকটা আমাকে ধাক্কা মারছিল প্রথমে তাকে জোরে একটা ঠেলা মেরে দূরে সরিয়ে দিল । তারপর নিরাপদর কলার চেপে ধরে বলল, দ্যাখো ছোকরা, তুমি যে দোকানদারকে টাকা দিয়েছ তার কাছ থেকে মাল বুঝে নাও - ইচ্ছে হলে তার নামে মামলা করো গে যাও । এ ব্যাপারে ব্যাঙ্কের আর কোন দায়িত্ব নেই । এখানে যদি ঝামেলা করো এক্ষুনি পুলিস ডেকে ধরিয়ে দেব - বলব ব্যাঙ্কের টাকা লুঠ করতে এসেছো ।

    নিরাপদর চাইতে লক্ষণ একমাথা লম্বা - শরীরটাও সে পরিমাণে তাগড়া । নিরাপদ আর তার দলবল সুড়সুড় করে কেটে পড়ল । আমরা হাঁফ ছাড়লাম । সেদিন আমরা লক্ষণের আধ পার্সেন্ট সুদ মাপ করে দিয়েছিলাম ।

    কিন্তু নিরাপদর পেটে যে আরও কিছু মতলব আছে তা কে জানতো ? সোজা একটা কমপ্লেন ঠুকেছে হেড অফিসে । আমরা জোচ্চুরি করে ওর টাকা তুলে নিয়েছি । তদন্ত করতে এলো এক ব্যাটা ছোকরা অফিসার । যতই ওকে বলি, চলুন কাছেই বেড়াবার জায়গা আছে, ঘুরিয়ে আনি - ঘুষ ঘাষ দেবারা ইসারা করি, ততই লোকটা বলে এই কাগজ দেখান, ওই ভাউচার দেখান । সব জেরক্স কপি করে নিল ও ব্যাটা । তারপর নগেন দলুই কিরকম লোক সে সম্বন্ধে খোঁজ নিল ধারে কাছের বিভিন্ন লোকের থেকে । তারা যা যা বলল সব লিখে নিঅল । তারপর ফিরে গিয়ে আমার নামে একটা জঘন্য রিপোর্ট । যেহেতু আমি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, পুরো ঘটনাটার জন্যে আমাকেই দায়ী করা হয়েছে । এই চিঠিটা একটা শো কজ নোটিশ - আমি যা উত্তর দেব তার ভিত্তিতে হেড অফিস ঠিক করবে আমার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা ।

    দুটোর পর আমার টেবিলের চারধারে সকলের জটলা হচ্ছিল । আমি ভাবছিলাম চাকরী গেলে কি করব । চাকরী থেকে বরখাস্ত হলে ব্যাঙ্কে গ্র্যাচুইটি দেবে কিনা সন্দেহ । প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা শেষ হয়ে যাবে ফ্ল্যাট কেনার ধারের বাকি টাকা শুধতে । কিন্তু মকানটাই তো শেষ কথা নয় - রোটি আর কাপড়া কোথা থেকে আসবে ? তাছাড়া বান্টির এঞ্জিনিয়ারিং পড়া, বুম্বীর বিয়ে, গিন্নীর গাড়ি, ড্রাইভার, শাড়ী, টেলিফোন । এই হিসেবটা কিছুতেই মেলানো যাচ্ছিল না । রবীন বলছিল ওর চেনা কোন কোন লোক কি কি পাথর হাতের আঙুলে আংটিতে ধারণ করে কত বড় বড় সব বিপদ থেকে রেহাই পেয়েছে । গণেশ বলছিল এখান থেকে কাছেই একটা গাঁয়ে একজন তান্ত্রিক সাধুবাবা আছেন । বিশেষ বিশেষ অমাবস্যা পূর্ণিমায় তার ভর হয় । সেই ভরের সময় তিনি যাদের ওপর দয়া করেন তাদের গায়ে থুতু দেন । যাদের গায়ে এই থুতু পড়ে তারা বড়ই ভাগ্যবান । তাদের সব বিপদ কেটে যায় ।

    সমর এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল । এবার বলল, ওই ডিপার্টমেন্টে ব্যানার্জী বলে একজন জেনারেল ম্যানেজার আছেন । উনিই এ ব্যাপারে ডিসাইডিং অথরিটি । দাদার উচিত এখন গিয়ে ব্যানার্জী সাহেবকে ধরা ।

    আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম । বললাম, ফ্যানটাসটিক । সমর, তুমহারা জবাব নেহি । কিন্তু এই ভদ্রলোকের বাড়ির ঠিকানা দরকার । অফিসে তো এসব কাজ হবে না ।

    সমর বলল, সে হয়ে যাবে । আমি হেড অফিসে আমার বন্ধুদের কাছে খোঁজ নিচ্ছি । ব্যানার্জী এখন এখানেই আছেন না ট্যুরে রয়েছেন, তাও জেনে দিতে পারব । পরশু সব খবর পেয়ে যাবেন ।

    আমি ঘাড় নাড়লাম । হেড অফিসের চিঠির উত্তর দেবার জন্যে আমাকে দশ দিন সময় দেওয়া হয়েছে । আজ সোমবার । ঠিকানাটা বুধবার জানতে পারলেও চলবে ।

    বুধবার দিন সমরের কাছ থেকে ব্যানার্জী সাহেবের ঠিকানা, ফোন নাম্বার এসব পাওয়া গেল । আরও জানা গেল যে এ সপ্তাহে উনি এখানেই আছেন, কোথাও ট্যুরে যাচ্ছেন না । আমি বাড়ি এসে পাঁজি দেখলাম । দেখা গেল বৃহস্পতিবারের চাইতে শুক্রবার দিনটাই ভাল - লেখা রয়েছে যাত্রায় সিদ্ধিযোগ । শুক্রবার সন্ধেবেলা আমি সাহেবের বাড়িতে হাজির হলাম । আমার হাতে কটা বড় মোটা ব্রীফকেস - একটা ছোটখাট স্যুটকেস বললেই হয় । আমি ব্যানার্জী সাহেবের ব্যাঙ্কেই কাজ করি শুনে বাচ্চা চাকরটা আমাকে ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকতে দিল । আমাকে বাইরের ঘরে বসতে বলে ভেতরে গেল সাহেবকে খবর দিতে ।

    আমি কিন্তু বসলাম না । হাতের বোঝাটা মাটিতে নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়েই রইলাম । কর্তা ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে জাঁকিয়ে বসে থাকতে দেখলে বিরক্ত হতে পারেন - আর তাহলে তো সব গেল । সাহেব বেরিয়ে এলেন - পরণে আধময়লা হাতকাটা গেঞ্জি আর প্রায় ময়লা লুঙ্গী, একটাঅ তেলচিটে পৈতেও রয়েছে গায়ে । আমাকে দেখে ভ্রু কোঁচকালেন - কারণ আমাকে কোনদিন দেখেননি । নিজে বসলেন না - দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বিরক্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার ?

    আমি প্রথমে দুহাত জোড় করলাম, তারপর মুখে একটা বশংবদ ভাব এনে নিজের পরিচয় দিলাম । সার্‌, একটা বিশেষ দরকারে আপনার কাছে এসেছি - এই ভূমিকা করে আমার গল্পটা বলে ফেললাম । বার বার বললাম যে আমি নির্দোষ, ব্যাঙ্কের ডিপজিটরের লিখে দেওয়া চিঠির ভিত্তিতেই আমরা তার অ্যাকাউন্টের টাকা ভেঙে পাওয়ার টিলারের ডিলারকে চেক লিখে দিয়েছি ।

    কর্তার ভ্রুকুঞ্চন ঘোর থেকে ঘনঘোর হচ্ছিল । উনি বললেন, দেখুন এসব কথা বলতে হলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে অফিসে আসবেন, বাড়িতে নয় । ঠিক আছে ? এবার আপনি যেতে পারেন ।

    আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, নিশ্চয়ই সার্‌ । তারপর এক হাতে ব্রীফকেসটার পুরো ওজনটা ধরে রেখে অন্য হাতে ওটা খুলে ফেললাম - একটা খুব দামী স্যুটের কাপড় বার করে বললাম, সার্‌, আপনাকে তো প্রায়ই বিদেশে যেতে হয় - এই সামান্য জিনিষটা আপনার কাজে লাগবে বলে এনেছিলাম ।

    ব্যানার্জীর কপাল সোজা হয়ে গেল । চোখ চকচক করে উঠল, তাতে লোভের ছায়া পড়ল । এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে কাপড়টা নিয়ে তিনি নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন । তখন আমি ব্রীফকেস থেকে একটা গয়নার কেস বার করলাম - তার ভেতর থেকে একটা সোনার নেকলেস বার করে বললাম, ম্যাডামের জন্যেও একটা ছোট্ট জিনিষ এনেছিলাম ।

    উনি পরিষ্কার খুশি হয়ে গেলেন এবং গিন্নীকে ডাকলেন । ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন একটি প্রৌঢ়া সুদর্শনা মহিলা । কর্তা আমাকে দেখিয়ে বললেন, এ ভদ্রলোক আমাদের অফিসে কাজ করেন । আমাদের জন্যে প্রেজেন্ট এনেছেন । তোমার জন্যে এই নেকলেসটা ।

    মহিলার সারা মুখে খুশি উপচে পড়ল । প্রায় দৌড়ে এসে কর্তার হাত থেকে নেকলেসটা নিয়ে নিলেন । ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটা দেখতে লাগলেন আর বার বার বললেন, বা:, কি সুন্দর - কি সুন্দর ।

    কর্তা হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে অভয় দেবার মত করে মাথা নাড়লেন । বললেন, ঠিক আছে । আপনার কেসটা আমি দেখব । আপনি খালি ঐ চিঠির একটা উত্তর দিয়ে দিন ।

    এর দিন পনেরো পরে আমাদের ব্রাঞ্চে হেড অফিসের চিঠি এল । আমার বিরুদ্ধে কেসটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । সেদিন বিকেলে আমরা একসঙ্গে বসে একটু খাওয়া দাওয়া করলাম । একটা করে গরম ভাজা সিঙাড়া, খাস্তা কচুরি, আর সামনের মিষ্টির দোকান থেকে আনানো শোনপাপড়ি । চা ছোট সাইজের খুরীর বদলে বড় খুরীতে । খাবারের দামটা আমিই দিয়ে দিলাম । লক্ষণ মণ্ডল এসেছিল টাকা নিতে - পরের দিন হাট রয়েছে । ওকেও এক প্লেট দেওয়া হল ।

    সেদিন বাড়ি পৌঁছে চা খাচ্ছিলাম । বাড়ি খালি । মেনকা চা আর পাঁউরুটি টোস্ট দিয়ে গেছে । বলেছে গৃহিণী আর বুম্বী সিনেমা দেখতে গেছে । খাবার টেবিলের ওপরে রাখা একটা খামের চিঠি চোখে পড়ল । ক্রেডিট কার্ডের বিল । গতমাসে আঠারো হাজার চার্শো টাকার কেনাকাটা করা হয়েছে । চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমি ভাবতে লাগলাম এ মাসটা লক্ষণ মণ্ডলের থেকে এক পার্সেন্ট সুদ বেশি নেওয়া যায় কি না । রবীনের সঙ্গে একটু পরামর্শ করতে হবে ।

    (পরবাস-৪০, জানুয়ারি, ২০০৮)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)