• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৩৯ | আগস্ট ২০০৭ | গ্রম্থ-সমালোচনা
    Share
  • নেই-পাখির ডানার শব্দ : চিত্ত সাহু

    ঋতব্রত মিত্র, মাটি ও মোহর, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স, ৬৪ পৃ., ২০০৬ ISBN: 81-7756-535-4

    মহাভারত পড়লে সকলেই বলবেন, মহাভারতের মুষলপর্বটি রীতিমতো আধুনিক উপাদানে ভরপুর । এমন কি আজকের বিজ্ঞান-গবেষকও এক্সপেরিমেন্টের খোরাক পেতে পারবেন - পুরুষের পক্ষেও গর্ভবান হওয়া সম্ভব কিনা । মহাভারতকার অন্তত এমন একটি সম্ভাবনার কথা ভেবেছিলেন, কৃষ্ণপুত্র শাম্বের মুষলপ্রসবের বৃত্তান্তটি বর্ণনা করে । মুষল বা লৌহদণ্ডটি মানুষ নয় বটে, কিন্তু তার চূর্ণ থেকে অসংখ্য খাগতরুর জন্ম হয়েছিল । কে না জানে, খাগবৃক্ষের পত্রগুলিই অসিপত্র, দীর্ঘ এবং সুধার অসির আকারে, সেই অসিপত্রের সাহায্যেই যদুবংশের বিনাশ ঘটেছিল । যে কবি বলেন, `প্রকৃতিতে নারী নেই, নারীর ধারণা আছে শুধু', তিনিও কি অত:পর পুরুষশরীরে জন্মনিধানের কথা বলবেন তাঁর কবিতায় ? কিন্তু তাঁর মাটি ও মোহর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থে মুষলপর্বীয় বাকি ঘটনাগুলি -- জন্ম, আয়ুষ্কাল, মৃত্যু, শবদেহ, শবদাহ, রক্ত, মাংস, অস্থি, ভয়, নি:শব্দ হাহাকার - সব কিছু বিন্যস্ত, এবং এই সব কাঁটাছেঁড়ার মাঝখানেই তাঁর প্রশ্ন -

           জন্ম জন্ম কে কার বীর্যে কতখানি ঋণী ?

    সাত বছর আগে ঋতব্রত মিত্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঘর আছে ঘর নেই প্রকাশিত হলে কবিতামনস্ক পাঠকমহল কিছুটা নড়ে চড়ে বসেছিলেন । নবাগত এবং তরুণ, সবে গোঁফের কিরীচ চাড়া দিয়ে উঠেছে, যখন তার ইনিয়ে বিনিয়ে, ছন্দ এবং ছন্দ:স্পন্দের বারোটা বাজিয়ে বেধড়ক পঙ্ক্তিসম্ভার সাজানোর কথা, তখনই এই কবি তাঁর প্রথম কবিতার বইতে অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের সংকটকে উন্মোচিত করতে চেয়েছেন -



           পৃথিবী হাতে সতীশের ঘিলু দুলেই চলেছে হেসে,
           পাশে দাঁড়িয়ে হতভম্ব মাস্টারমশাই !

    গত ২০০৬ জানুয়ারিতে ঋতব্রতর ৪৯টি কবিতা নিয়ে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বেরুল - মাটি ও মোহর এবং ১১ পৃষ্ঠায় কবি সশরীরে এসে পড়েন, যেখানে লেখেন `প্রাকৃত' কবিতায় -

           যখন তখন তোমার পাশে এসে বসি, বর্ষীয়সী
                 পড়ন্ত রোদ লুটোয় তোমার পা-য়

    ইস্‌ আমি হলে কবিতাটাকে এভাবে সাজাতাম -

           যখন তখন তোমার পাশে এসে বসি,
                             বর্ষীয়সী
                       পড়ন্ত রোদ লুটোয় তোমার পা-য়

    তাহলে পাঠক বর্ষীয়সীকে ভালো ভাবে দেখতে পেতেন, আর তার পাশে এক ভীরু কম্পমান সম্মোহনে কন্টকিত তরুণ, যে তার নিজের অবস্থানটি বোঝাতে পেরেছে -

                       হঠাৎ কেমন
                       হাতছানি দেয় অভ্যস্ত ভয়

    সে ভয় কী, কেন, কখন, কেমন করে ? যা অনভ্যস্ত ? এই রহস্যাত্মক প্রশ্নগুলি পাঠকের মনে জেগে যায়, নিজের জীবন থেকেই পাঠককে এর উত্তর খুঁজে নিতে হয় । আর কবি নিজে প্রকৃতির মধ্যে, ঘাস-মাটি-রোদ বৃষ্টির মধ্যে তার উত্তর খুঁজতে থাকেন -

           কী বলবি কী বলবি ওরে ঝিম্‌ রোদ্দুর ?

    অথবা,        খুঁজতে খুঁজতে বৃষ্টি এসে কখন ঢোকে ঝাপসা চোখে

    কবিতায় কবির সশরীর উপস্থিতি ভালো কবিতার এক দুর্লভ লক্ষণ । সশরীরে স্বর্গে আরোহণ করার চেয়েও দুর্লভ, এর তাত্ত্বিকতার দিকটি বোঝানো ক্ষমতার অপেক্ষা রাখে, দৃষ্টান্তও বেশি নেই । সমনস্ক কবিতাপাঠক রবীন্দ্রনাথের দুটি কাব্যগ্রন্থে- খুঁজে পাবেন - কড়ি ও কোমল এবং গীতাঞ্জলি -তে, প্রথমটি শুদ্ধ শরীর নিয়ে, দ্বিতীয়টি বিশুদ্ধ শরীরাতীত নিয়ে -- পাতালে এবং স্বর্গে এই সশরীর পরিক্রমা রবীন্দ্রনাথেই সম্ভব হয়েছে, যেক্ষেত্রে যুধিষ্ঠির কেবল স্বর্গেই পৌঁছেছিলেন ।

    আর দেখি আমরা জীবনানন্দের কবিতায়, বিশেষভাবে রূপসী বাংলা য় -- যখন কবি অন্ধকারে জেগে উঠে চেয়ে দ্যাখেন ডুমুরের গাছে ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে বসে আছে ভোরের দোয়েল পাখি, অথবা-

           একদিন এই দেহ ঘাস থেকে ধানের আঘ্রাণ থেকে এই বাংলার
           জেগেছিল; বাঙালি নারীর মুখ দেখে রূপ চিনেছিল দেহ একদিন;

    (৫২ সংখ্যক)

    আর পাবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় -

           এই মিলেতেই পদ্য মাটি, অলোকরঞ্জন হলে বাঁচাতেন
           কিংবা সুনীল অ্যাংলো-সাক্সন হার ছিঁড়ে একটুকরো মুক্তোয়
           আমার পিতাঠাকুর শুনেছি এঁটো হাত নিট্‌ মদ্যে আঁচাতেন
           ভোজ্যদ্রব্য বলতে আমার বিউলিডাল, একবাটি সুক্তো ।

    (পোকায় কাটা কাগজপত্র, শ্রেষ্ঠ কবিতা)

    সশারীরিকতা নিয়ে জয় গোস্বামী একটি দুর্দান্ত কবিতা লিখতে চাইলেন - পাগলী তোমার সঙ্গে

    আমি যাকে বলছি সশারীরিকতা, ঋতব্রতর কবিতায় তার সঙ্গে `ভয়' অনুভূতিটা অচ্ছেদ্য হয়ে আছে বলা যায়, যে ভয়ই শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে উসকে দিচ্ছে । তাঁর `ভয়' শীর্ষক কবিতার প্রথম চার ছত্র -

           সেজদাদু মারা যাওয়ার পর কাঁধ দিয়েছিলাম ।
           একটা দুলতে থাকা পা, পায়ের আঙুল
           দারুণ অবহেলা আর ঔদাসীন্যে
           টা টা করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে ।

    অথবা,

           ফুলবউদি আমাকে কোলে নিয়ে পাথরের মতো
           বসে । আমি ওর ঘন কালো চুলে ভয়ে ভয়ে হাত বুলিয়ে
           দিচ্ছি । অন্ধকার শুঁড়িপথ আর বউদির মাথার সিঁথিপথ
           একাকার হয়ে গিয়েছে ।

    (শুঁড়িপথ)

    শুধু ভয় নয়, এবংবিধ শরীরায়ণ প্রকাশ পায় -- মৃত্যু, বীভত্সতা, অসংগতি ও নোংরামির প্রেক্ষাপটে, যেমন -

                       সেই আমি জন্ম
           নিচ্ছি, দিশেহারা জননীসমিধ অযোনি উত্সর্গ
           করে মা তুই ফিরে আসবি, মুখে রক্ত, বুকে
           রক্ত, শোণিত ও রক্তকেশ,

    (অসমকাম)

    অথবা--

           জানি না কারা কী ভাবে ...
           আমার পিতার শব আমারই তো প্রাপ্য সন্তান

    (বাবাকে আড়াল থেকে দেখে)

    ঋতব্রতর কবিতা পড়তে গিয়ে পাঠককে কিছুটা পরিশ্রমী হতে হয়, যেহেতু তার কবিতার বইয়ের নাম মাটি ও মোহর বইতে শুধু ছবি, চিত্রকল্প ছন্দ-মিল-যতি আহা মরি বিস্তর ছত্র বা ছত্রাংশ - এককথায় টসটসে মোহরগুলি পাঠক কুড়িয়ে নেবেন, তা হতে পারছে না । মোহরের আগে মাটি আছে, অর্থাৎ ঐতিহ্যচেতনার একটি রোহভূমি আছে । রোহভূমির ভূমি কিংবা মাটি না খুঁড়লে মোহরগুলি পাওয়া যাচ্ছে না, যদিও অসংখ্য হিরে-মানিক বইয়ের পাতায় ইতস্তত ছড়িয়ে আছে, বলা যায় মাটি-চাপা পড়ে আছে ।

    কয়েকটি কবিতা, `অন্ধ ছবি', `সেলাই' `মিত্তিরবাড়ি' `বাবাকে আড়াল থেকে দেখে', `ভয়' কবিতায় ঐতিহ্যচেতনা তাঁর নিজস্ব পারিবারিক জীবনবৃত্তকে ছুঁয়ে আছে, যে পরিবারটি ছিল একদা যৌথ, বনেদি জমিদার বাড়ি, এবং এখন ভেঙে গেছে, ছন্নছত্র,-

           আর ভাঙা আয়না
           তোমার পারা-ওঠা পিঠে চড়ে গ্রাম চলেছে শহরের পেটে,
           সেখানে চোখ ধাঁধানো আতসবাজি
                 ধাক্কা মেরে এগিয়ে যাবার খেলা

    - (ভাঙা আয়না)

    পুরনো বাড়ির ছবিটি নিখুঁত--

           - পশলা কয়েক সুপুরি গাছ, নীলচে কালো রং
           আবছা গলি, হোঁচট, জং, কুকুর, ইট, কাদা
           পুরনো মোড়, ছপাস জল, ময়লা সোনাব্যাঙ
           সাপের জিভ, ছোবল নদী, জমিদারের বাড়ি
           এলিয়ে পড়া পাঁচিল, ঝোপ, শেয়াল, কাচভাঙা

    (অন্ধ ছবি)

    কিছু কবিতায় পরিবার-নিরপেক্ষ ঐতিহ্যভাবনা -

           যুগ যুগ ধরে সে গাছের গোড়া কেটে ফেলে দিতে
           দেখি বীজ হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে মাটিতে মাটিতে
           এরও পরে তুমি আমাকে তোমার বিচারের দিকে
           ঠেলে দাও, গলা টিপে ধরে বলো, হত্যাকারী কে ?

    (ঋণী)

    এবং এভাবেই পারিবারিক ঐতিহ্যবোধ সার্বিক ঐতিহ্যভাবনায় উত্তীর্ণ হয়েছে -- `দাগি' পিরতলার ঘাট, এই তো বনের শেষ, অভিযাত্রী, ইতিহাস, ভূয়োদর্শন প্রভৃতি কবিতায় । কবিতাগুলি স্বয়ংপূর্ণ, পরা-বাস্তবতার দ্যুতিমান আধারে স্থাপিত, পাঠক এক একটি কবিতা পড়েই ভারাক্রান্ত হতে পারবেন । পুরোনোকে ভেঙে বেরিয়ে আসার কী প্রবল উত্ক্ষেপ -

           বেরোবই ভাঙা আয়না / তোকে আমি পোড়াব আবার
           তিলে তিলে মেরে / ম'রে ম'রে / আমার ভেতরে আমি
           ভিতু শান্ত নোংরা কোথাকার !

    যে শান্ত সেই ভীরু এবং সে নোংরা -- এবংবিধ দু:সাহসী উচ্চারণ মাটি ও মোহর এর অনেক কবিতায় । যেমন,

           ১. আরেকটু পরেই ছাই থেকে মুখ বার করবে
               ঠাণ্ডা কটা হাড়
                 (ভয়)

           ২. মাছ বোঝে কে আসল পাখনা নাড়ায়              (পিরতলার ঘাট)

           ৩. গম্ভীর সবুজ শব্দে নুয়ে আসে আশপাশ ।              (এই তো বনের শেষ )

           ৪. ডুবিয়েছিল যে সব যাত্রীকে / তাদের কিন্তু মরেনি একজনও
              তাদেরই হাড় ফিসফিসিয়ে বলে / নতুন করে জন্মকথা শোনো             (অভিযাত্রী)

    এ পর্যায়ের দুষ্পাচ্য অথচ অমোঘ এবং নতুন আবিষ্কারের মতো এক টি উপলব্ধি উন্মোচিত হয়েছে `মাঝরাত : চৌঠা মার্চ, দু হাজার দুই' কবিতায় -

           প্রকৃতিতে নারী নেই - নারীর ধারণা আছে শুধু !

    যে পিপাসা মেটানোর জন্য পূর্ণপাত্র পানীয় আজো পর্যন্ত খুঁজে পায়নি মানুষ, ঋতব্রতর এ কবিতায় সে পাত্রটাই নেই । সোজা বাংলায় নারীসংগপিপাসা আছে, কিন্তু নারী নেই । তখনই কবি বলেন -

           প্রকৃতিতে নারী নেই - নারীর ধারণা আছে শুধু ।

    বলা যেতে পারে, এভাবেই কবি ঋতব্রত উত্তর আধুনিকতায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, অর্থাৎ এই উত্তরণও আলটপকা কোনো কলমচালনা নয়, তরাই থেকে নন্দাদেবীর বুকের কাছে যাওয়ার শিকার সন্ধান, মাটি ও মোহর এর প্রথম কবিতায় তারই প্রস্তাবনা -

           এ ধনুক দিনকল্প, ও ধনুক রাত
           তেমন শরের খোঁজে প্রাণপাত করে
           সে কোন কিরাত ?

    এখন তবে কিছু মোহর কুড়োনো যাক্‌ ।

    কিছু অসাধারণ চিত্রকল্প :

           ১. সোনায় খাদের মতো / আলো এসে মেঘলা চাঁদের
              ছমছম চাপা হাসছে              (১২ পৃ)

           ২. কেবল তোমার ত্রস্ত বুকের / পরাগধানী অল্প সুখের বাতাস ছুঁতে
               কেতাথ্থ হোক । ইচ্ছে করি ।              ( ১৫ পৃ)

           ৩. ...চারপুরুষ দোরবন্ধ থেকে শুধু গেলাসের
              ঠুনঠান ঘুঙুর দমকানি বেহালা এস্রাজের কালোয়াতি বাতিদান
              ধুলোয় ভরপুর...              (১৭ পৃ)

           ৪. সাদা দাঁত থমকে আছে মুখের ভেতর ।              (৩২ পৃ)

           ৫. তবু টিঙটিঙে দুটো নাড়ি-টেপা হাতে
              কার চিঠি কাকে দিচ্ছ ডাকহরকরা ?            (৩৯ পৃ)

    এবং আরো অজস্র, যেগুলি নিছক কোনো ছিন্নমূল চিত্র নয়, অনুভূতির তরঙ্গমালায় সূর্যরশ্মির ফোস্কার মতো সংক্ষিপ্ত এবং ঢেউতেই যা মিলিয়ে যায়, পাঠক বুঝতেই পারেন না তিনি ঢেউ দেখছেন, আলোর ঝিকিমিকি দেখছেন । সম্ভবত কবিও নিজে বুঝতে পারেননি, তাইতো তাঁকে লিখতে হয় -

           মাথার ওপর নিভন্ত এক সূর্য ঘোরে;
           ছবির গাছের ডালে বসে নেই তো পাখি
           ও চিত্রকর
           তোমার খাতায়
           সুঠাম ডানার শব্দ তবে কোথায় রাখি ।              (অনুপূর্ব)

    চিত্রকল্প কী ও কেন - এর সদুত্তর পেতে চাইলে ঋতব্রতর এ ছত্রগুলির পরিচয় পেতেই হবে । নেই পাখির ডানার শব্দই হল চিত্রকল্প । নেই পাখির ডানার শব্দই হল কবিতা । বিশেষভাবে ঋতব্রতর কবিতা ।


    ছন্দের কথাই বলা যাক -

    ছন্দে ঋতব্রতর এলেমদারি কম নয় । নবপর্যায়ের কৃত্তিবাস পত্রিকায় ইতিমধ্যেই তার বাংলা কবিতার প্রচলিত তিন ছন্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ, অর্ধমাত্রার অস্তিত্ব বিচার, এক ছন্দের ভেতরে অন্য ছন্দের অনুপ্রবেশ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা বাংলা ছন্দের দিগন্তকে আরো প্রসারিত করেছে । ছন্দ নিয়ে কবিতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষারও নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে । মাটি ও মোহর কাব্যগ্রন্থে কবি নিজে কী করেছেন, দেখা যেতে পারে :

    পাঠক প্রথমেই ৩৮ পৃষ্ঠায় `কবি' শীর্ষক কবিতাটি পড়ুন । কবিতাটি পড়ে যেতে কোনো অসুবিধে হবে না, পাঠকের কানে বেশ সুখশ্রাব্যই ঠেকবে । নিতান্ত কাঁচা পাঠক হলে দু'একটি জায়গায় ছোট্ট হোঁচট খাবেন এই পর্যন্ত । কিন্তু পাঠক জানতেই পারবেন না যে তিনি এক বিতর্কিত ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছেন ।

    আপাতনিরীহ পঙ্ক্তিগুলি দু পর্বে বিভক্ত । শেষ পর্বগুলির মাত্রাসংখ্যা ৪ এবং তা দলবৃত্তের ৪, যেহেতু মুক্ত এবং রুদ্ধ (অর্ধস্বর সমেত) সব দলই এক এক মাত্রা ।

    মনে হতে পারে, শেষ পর্বগুলিকে ৫ মাত্রায় ফেলে কলাবৃত্ত বলে দাবি করব, কিন্তু `কাজ করে যায়', `জল সিঞ্চন' এবং `ধুলোর বসন' পর্বগুলি তখন ৬ মাত্রা না হয়ে যায় না । সুতরাং ৫ মাত্রার দাবিকে খারিজ করতে হয় ।

    এবারে পঙক্তির প্রথম পর্বগুলি ধরুন । ৪ মাত্রা খাটছে না, বলাই বাহুল্য । মুশকিল হচ্ছে, কলাবৃত্তে ধরুন কিংবা মিশ্রবৃত্তে ধরুন - মাত্রাসংখ্যা কোথাও ৮, কোথাও ৯ । মিশ্রবৃত্তে কোথাও বা ৭ হচ্ছে -

           হারিয়ে জন্ম নিতে - কলাবৃত্তে ৮, মিশ্রবৃত্তে ৭
           হেসেও অদৃশ্য হয় - কলাবৃত্তে ৯, মিশ্রবৃত্তে ৮
           সাদরে আড়াল রাখে - কলাবৃত্তে ৮, মিশ্রবৃত্তে ৮
           কথারা লাজুক, তেমন - কলাবৃত্তে ৯, মিশ্রবৃত্তে ৯
    এ-পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, প্রথম পর্ব হয় কলাবৃত্ত না হয় মিশ্রবৃত্ত, আর শেষ পর্ব দলবৃত্ত । আর মাত্রার আপাত অসমতার বেলায় বলতেই হবে, যে শোষণবৃত্তির কথা রবীন্দ্রনাথ কেবল পয়ার অর্থাৎ মিশ্রবৃত্তের সম্পর্কে বলেছিলেন, সেই শোষণবৃত্তি এখন মাত্রাবৃত্ত বা কলাবৃত্তেও খেটে যাচ্ছে ।

    `কবি' কবিতার ছন্দবিচার এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না কিন্তু । পুরো কবিতায় প্রস্বরের একটি ভূমিকা আছে - কোথাও স্ফুট, কোথাও অর্ধ-স্ফুট, কোথাও প্রায় অস্ফুট । পাঠকের কান তৈরি থাকলে প্রস্বরের এই লুকোচুরি খেলা চট করে ধরে নেবেন । যেমন, তৃতীয় স্তবকে, দু পঙ্ক্তি -

           হারিয়ে জন্ম নিতে বক্র হাসে
           হেসেও অদৃশ্য হয় কপট ত্রাসে

    অথবা, শেষ স্তবকের দু ছত্র -

           রক্তে ছবি ফোটায় শব্দ গুলো
           লোকটা নির্বিকারে ওড়ায় ধুলো

    অত:পর পঙ্ক্তিগুলোর কাঠামোও বদলে যায়, আমরা সাজাতে পারি -

           হারিয়ে        জন্ম নিতে       বক্র হাসে
           হেসেও        অ দৃশ্য হয়        কপট ত্রাসে

    কিংবা,

           রক্তে + ছবি ফোটায় / শব্দগুলো //
           লোকটা + নির্বিকারে / ওড়ায় ধুলো //

    এখন পঙ্ক্তিগুলি আর দ্বিপার্বিক থাকে না, হয়ে যায় ত্রিপার্বিক, এবং প্রথম পর্বকে অতিপর্ব ধরলে বাকি দুই পর্ব হয়ে যায় দলবৃত্তের চার মাত্রা, প্রস্বরকে উপযুক্ত সম্মান দিয়ে ।

    শেষে একটি মাত্র সিদ্ধান্তে আসা যায় : ঋতব্রত এমন এক অনুসন্ধানী কবি যিনি কী ভাববস্তুতে কী আঙ্গিকনির্মাণে কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছেন । এ পরীক্ষায় নেতি-নেতি পদ্ধতি আছে, কিন্তু প্রাপ্তি সর্বদাই ইতিবাচক -

           বেরোবই ভাঙা আয়না
           তোকে আমি পোড়াব আবার

    আছে আবিষ্কার ও উপলব্ধি । `খোঁজ' নামক দীর্ঘ কবিতায় সেই উপলব্ধিই ঘোষিত হয়েছে -

           ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলি
           রাস্তার বকুল রাস্তা
           গলির সতীন কানাগলি

    বকুল রাস্তায় অনেক পুণ্যবান হেঁটেছেন, গলি রাস্তায়ও হেঁটেছেন কেউ কেউ, কিন্তু কানাগলি যে গলির ঈর্ষাতুর সতীন - এই দুরন্ত অথচ নি:শব্দ তথ্য কি কোনো শ্রদ্ধেয় পাপকর্মা ইতিপূর্বে আবিষ্কার করেছেন ?

    ঋতব্রতর কবিতায় এমনি সব কাণ্ড অনেক আছে, সুখশ্রাব্য কবিতার পেছনে নানা যান্ত্রিক কলকাঠি, যার নিষ্কর্ষ হল, বাংলা কবিতায় তিন বৃত্তের বেড়া ভাঙছে, তিন কন্যে গলা জড়াজড়ি করেই শিব ঠাকুরের বিয়ে সম্পূর্ণ করছে, এমন দিন শীগ্গির আসছে, যেদিন কবিতার সজ্জিত পঙ্ক্তিমালায় পর্ব থাকবে, শ্রাব্যতা থাকবে কখনো স্রোতল কখনো উচ্চাবচ কখনো ছিন্নপাপড়ি সংলাপ, তারই সঙ্গে থাকবে বৃত্তের আইনভাঙা মাত্রাস্মকতা - কবিতা হবে নতুন কবিতা । তখন কবিতার ক্লাস আবার নতুন করে সাজাবেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ছন্দের পুরোনো জীর্ন বারান্দায় দাঁড়িয়ে শঙ্খ ঘোষ আর এক নতুন বারান্দার কথা বলবেন - `ঘর আর পথের মাঝখানে যেন এক খোলা বারান্দা আছে কোথাও । কখনো বা চলে আসা যায় সেই বারান্দায় ছন্দের বন্ধনের মধ্যে থেকেই কখনো কখনো ভেঙে দেওয়া যায় তার শুকনো নিয়ম, মিটিয়ে নেওয়া যায় গদ্যপদ্যের পরোক্ষ বিরোধ ।'

    (পরবাস ৩৯, জুন, ২০০৭)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)