• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৩৯ | আগস্ট ২০০৭ | গ্রম্থ-সমালোচনা
    Share
  • অস্ত্রের গৌরবহীন, একা ... : ঋতব্রত মিত্র

    অভিজিৎ তরফদার , মহাজাগতিক , কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স, , ১২৮ পৃ., ১৯৯৮ ISBN: 81-7215-826-2

    হবু-চিকিত্সকদের সঙ্গে দেখা হলে আমি কখনো-সখনো জিগ্যেস করি একজন চিকিত্সক-সাহিত্যিকের নাম । উত্তর আসে বনফুল । ঝটিতি । আরেকজন ? এবারে উত্তর একটু ভেবে । কিরীটি-খ্যাত নীহাররঞ্জন গুপ্ত । এরপর অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীই আর এগোতে পারে না । আমরা যদ্দুর জানি বাংলাসাহিত্যে প্রাচীনতম সাহিত্যিক-চিকিত্সক হলেন শ্রী তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৩-১৮৯১) । ইনি বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িক । এঁর সুযোগ্য উত্তরসূরীদের নামের দীর্ঘ তালিকা মিলবে ডা: অশোক বাগচীর বিশ্বসাহিত্যে চিকিত্সক বইটিতে ।

    পরবাসে র নিবিড় পাঠ বিভাগে শ্রী অভিজিৎ তরফদারের মহাজাগতিক উপন্যাসটি নিয়ে লিখতে বসে এ গৌরচন্দ্রিকাটুকু অবতারণার কারণ গদ্যকার নিজেও একজন প্রথিতযশা চিকিত্সক । আর যৌনকর্মী, সৈনিক, আইনজীবী বা অভিনেতার মতো চিকিত্সকেরও মসীধারণের খবর পেলে আমরা একটু বেশি মাত্রায় নড়ে-চড়ে বসি । কারণ একথা সহজ সত্য যে ভাষার ওপর দখল ও পাঠপরিধির বিস্তার ছাড়াও যাঁর অভিজ্ঞতা যত বেশি বৈচিত্র্যময় তাঁর সফল গদ্যকার হওয়ার তত বেশি সম্ভাবনা !

    লেখালিখির ক্ষেত্রে চিকিত্সক একটা বাড়তি সুবিধে পেতে পারেন । তা হল মৃত্যুচেতনার নিরন্তর সক্রিয়তা যা কিন্তু আদপে জীবনবিমুখ নয় কখনোই । যেহেতু পেশাগত কারণে চিকিত্সক মানুষের জন্ম-মৃত্যু-যৌনতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান অহরহ সেহেতু জগজ্জীবনকে নিরাসক্ত ভাবে অবলোকনের বাড়তি সুবিধেটুকু পাওয়া যায় । এর একটা বিপজ্জনক দিকও আছে । তা হল পরিণত বয়সে কিছুমাত্রায় মানসিক অবসাদে আচ্ছন্ন হওয়া আর তা থেকে মুক্তি পেতে রীতিমতো ভোগবাদী হয়ে পড়া । তবে যে কোন সচেতন মানুষ - শুধু চিকিত্সক কেন - নিজস্ব মানসিক শক্তিতে এই সমস্যা অতিক্রম করে সৃষ্টিশীল একটি জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন ।

    আলোচ্য উপন্যাসের মূল চরিত্র নক্ষত্র পেশায় সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ-চিকিত্সক - নেফ্রোলজিস্ট । যুগের তুলনায় একটু বেশি মাত্রায় সংবেদনশীল এবং মূল্যবোধপরায়ণ । আমরা কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক পুরোমাত্রায় জেনে-বুঝেও শেষমেশ হয়তো যা যা করে উঠতে পারি না আর সে কারণে নিয়ত অপরাধবোধে দগ্ধ হই, নক্ষত্র কর্মজীবনের গোড়ায় সেসবই করে উঠতে চায় ।

    সরকারি হাসপাতালেরই এক লিফ্টম্যান চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের একাংশের যোগসাজশে মুমূর্ষু রোগীকে বেডে তুলতে উত্কোচ দাবী করে । হাসপাতালে অতি পরিচিত এইসব দৃশ্য দেখলে "ঘাড় ঝাঁকিয়ে মুখে চুকচুক শব্দ করে চলে যাওয়াই রীতি ।" কিন্তু নক্ষত্র তা পারে না । রোগীদের নিয়মমাফিক দুবেলা দেখার বাইরে ও একটু একটু করে নিজের অজান্তেই ঢুকে পড়ে তাদের নিজস্ব বৃত্তের সীমানা পেরিয়ে । এবং হাড়ে হাড়ে টের পেতে থাকে "রোগী দেখা কিংবা তার চিকিত্সাটা এখানে মুখ্য নয়, আসল কথা কাজটা চালিয়ে যাওয়া" ।

    এভাবেই চলছে । একদিন বহির্বিভাগে রোগী দেখতে ব্যস্ত নক্ষত্র হাউসস্টাফের মুখে জানতে পারে ডায়ালিসিস শুরুর চারদিনের মাথায় কিছু রোগীর জ্বর আসছে । কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল বোতলবন্দী ডায়ালিসিস ফ্লুইডে ঘটে গেছে ছত্রাকের সংক্রমণ । মাইক্রোবায়োলজিক্যাল রিপোর্ট সমর্থন করলো এই আশাঙ্কাকে । কিন্তু নক্ষত্র অবাক হয়ে লক্ষ করলো বিভাগীয় প্রধান ডা: লাহিড়ী সুপারিনটেনডেন্টকে জানিয়েছেন আরোগ্য নামে একটি বাইরের কোম্পানির ওই ফ্লুইড - যা রোগীর বাড়ির লোক কিনে এনেছিল ওষুদের দোকান থেকে - তাতে কোন ছত্রাক পাওয়া যায়নি ।

    এদিকে ছত্রাকের সংক্রমণযুক্ত ওই ফ্লুইডের স্পেসিমেন নক্ষত্রর কাছ থেকে নিয়ে তা শুধু নিজের জিম্মায় রেখে দেননি ডা: লাহিড়ী, তা তুলে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কোম্পানির হাতে । বিনিময়মূল্য সদ্য ডাক্তারি পাশ করা পুত্রের জন্য তিনলাখি মারুতি । এ তথ্য নক্ষত্র জানতে পারে সাংবাদিক বন্ধু দেবাশিসের কাছ থেকে । তারই পরামর্শে বেনামে একটা চিঠি লেখে সে । - যেন পত্রলেখকের সন্তান মারা গেছে ডায়ালিসিসের ফ্লুইডে ছত্রাক সংক্রমণের জন্যই । সে চিঠি মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রাথমিক রিপোর্টের ফটোকপি সমেত দেবাশিসের বদান্যতায় একটি নামী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবার দিন কয়েকের মধ্যেই সুপারিনটেনডেন্টের ঘরে জরুরী মিটিং এর তলব । আসলে এনকোয়ারি । সেখানে সুপার ছাড়াও হাজির ডা: লাহিড়ী, মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান ডা: সেনগুপ্ত, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান ডা: পাণ্ডে, নক্ষত্রের `দুর্ব্যবহার' সম্পর্কে অভিযোগকারিণী তিনজন নার্স এবং সর্বোপরি ডক্টর শ্যামাদাস অধিকারী যিনি সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর্সের ডিরেক্টর থাকাকালীন প্রায় দশ কোটি টাকার গরমিল ধরা পড়ে । কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণাভাবে পিছলে বেরিয়ে ডা: অধিকারী আপাতত এই হাসপাতালে প্রশাসনিক পদাধিকারী হয়ে দিব্যি বিরাজিত । ডা: লাহিড়ী চেষ্টা করলেন নক্ষত্রকে দিয়ে একটা চিঠি লেখাতে যাতে সে ঐ চিঠির বক্তব্যকে অস্বীকার করে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চূড়ান্ত তথা অসত্য ফোর্জড রিপোর্টকেই ধ্রুবসত্য মেনে নেয় যাতে ঐ কোম্পানি এবং ডা: লাহিড়ীর নিজের গায়ে আঁচড়টি না লাগে । এর আগে আরোগ্য কোম্পানিও চেষ্টা করেছে নক্ষত্রর মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অযাচিত সাহায্য করতে ।

    কিন্তু নক্ষত্র অনমনীয় থাকার পরিণাম কলকাতা থেকে তার একদম উত্তরবঙ্গে পাহাড়ের কোলে সীমান্ত হাসপাতালে হঠাৎ বদলি, যাতে কোন প্রতিবাদী কন্ঠস্বর মহানগরে কখনোই না এসে পৌঁছোয় ।

    উপন্যাসটি শেষ হচ্ছে বরফঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে ভোরের সূর্যের লোহিত রশ্মিপাতে; এক প্রসন্ন সকালের সূচনায়, আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হচ্ছে পাঠকের উপন্যাসটি ফিরে পড়ার তাগিদ । কারণ চিকিত্সাবিজ্ঞানের কিছু বিষয়কে যে এখানে শুধু সাহিত্যরসসিক্ত করে পরিবেশন করা হয়েছে তা-ই নয়, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ঘটনাটি আন্তরিক করে তুলতে এমন কিছু অণু-ঘটনার সাহায্য নেওয়া হয়েছে যাতে মানবস্বভাব তার সহৃদয়তা-প্রেম-প্রীতি-শঠতা-ক্রূরতা- লালসা সবকিছু নিয়েই স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল । যেমন হাসপাতালের ডেপুটি সুপারের অসৎ কর্মীকে শাস্তিদানের প্রয়াস, সেবিকা শিউলি ও তরুণ চিকিত্সক শুভ্রাংশুর রোগীর প্রতি কর্তব্যপরায়ণতা, চন্দ্রা-মন্দিরা-হেমপ্রভার পারিবারিক জীবনবৃত্তের ভগ্নাংশে নক্ষত্রর লগ্ন হয়ে যাওয়া । যেমন জনসেবক বটুক পাণ্ডাদের প্রিয়পাত্র রোগীকে ভর্তি করা নিয়ে কুশলী তদ্বির, হতদরিদ্র দেহাতি কিশোরীর কিডনি নিজের ছেলের শরীরে প্রতিস্থাপনের জন্য ছিনিয়ে নিতে মাধো সিং-এর হঠকারি উদ্যোগ । এমন আরো অনেক টুকরো ঘটনা, অনেক পার্শ্বচরিত্র ..... ।

    জীবনানন্দ তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন মহাপৃথিবী । এক্ষেত্রে `মহা' শব্দাংশটি ঈষৎ ব্যঙ্গার্থে প্রযুক্ত । যেমন মূর্খ বোঝাতে মহাপণ্ডিত শব্দটির ব্যবহার । গ্রন্থশেষে লেখক বন্ধনীর মধ্যে লিখে দিয়েছেন - "এই উপন্যাসের চরিত্রগুলি কাল্পনিক । তবে বাস্তব অনেক সময় কল্পনার থেকেও কঠোর ও কর্কশ" । এর থেকেই বোঝা যায় প্রকৃতির অফুরন্ত দানে ঐশ্বর্যশালী এই যে দৈনন্দিন জগত, এরই মধ্যে মানুষ তার স্বভাবের যাবতীয় ঊনতা-সীমাবদ্ধতার সমবায়ে তৈরি করে এমনই এক পাপবিদ্ধ মরজগৎ যার জাঁতাকলে পিষে মানুষের শুভবুদ্ধি সুচেতনার প্রাণান্তকর অবস্থা । আর ভেতরের সেই জগতটিকে উপন্যাসের স্বল্প পরিসরে স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে নেওয়াই লেখকের অভিপ্রায় ।

    সেই অভিপ্রায়ের শরিক হতে গিয়ে পাঠককে মুখোমুখি হতে হয় এক গভীরতর আত্মিক সংকটের । উপন্যাসের ভাষা সরল । আঙ্গিকও জটিলতা-বর্জিত । কিন্তু চরিত্রায়ণের মুন্সিয়ানা পাঠককে আলোড়িত করে । দিব্যি বুঝে নেওয়া যায় এ যুগের মানুষ দু:খি, বিষণ্ণ । কারণ তার পাপবোধ তাকে পাপকর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে না । না-পারার অমোঘ ব্যর্থতাবোধ তাকে নতুন করে দু:খ-বিষাদ-হতাশায় জর্জরিত করে । এই ভিশাস্‌ সাইকেল থেকে মুক্তি পেতে বা কিঞ্চিৎ স্বস্তি পেতে সে কল্পনা করে নিতে পারে নক্ষত্রের মতো কোন চরিত্রকে যে অন্যায়ের সঙ্গে আপোষহীন, `ভয়াবহভাবে' সৎ । কিন্তু এই পরিত্রাণ সাময়িক । আমাদের যাবতীয় সুশিক্ষা যে আমাদের কৃতকর্মজনিত পাপবোধের শুশ্রুষা দিতে অপারগ - সেই কঠিন সত্যটির প্রতি অপ্রত্যক্ষ অঙ্গুলিনির্দেশ আছে এই উপন্যাসে । কিন্তু দার্শনিকতার গুরুভার কাহিনির গতিকে ক্ষুণ্ণ করেনি, আড়ষ্ট করেনি চরিত্রগুলিকেও । এই বৈশিষ্ট্যটি আমরা শ্রী তরফদারের পরবর্তী লেখাগুলিতেও খুঁজে পেতে চাইবো ।

    (পরবাস ৩৯, অগস্ট, ২০০৭)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)