• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৭ | জুলাই ২০২২ | কবিতা
    Share
  • তিনটি কবিতা : গুরাই কিস্কু
    translated from Santali to Bengali by লক্ষণ কিস্কু, বিশ্বেশ্বর কুণ্ডু
    বাংলা অনুবাদ | কবি/অনুবাদক পরিচিতি ও ভাষা ভাবনা (বিশ্বেশ্বর কুণ্ডু)

    গুরাই কিস্কুর কবিতাগুচ্ছ
    মূল সান্তাড়ি ও বাংলা অনুবাদ ─ লক্ষণ কিস্কু
    ভাষা-ভাবনাঃ বিশ্বেশ্বর কুণ্ডু

    কবিপরিচিতি

    লক্ষণ কিস্কু। ছদ্মনাম গুরাই কিস্কু। জন্ম ৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সাল, প্রত্যন্ত গ্রাম গিরোলবনী, ডাকঘর ফুলকুসমা, থানা বারিকুল, জেলা বাঁকুড়া, রাজ্য পশ্চিম বঙ্গ, দেশ ভারতবর্ষ। পিতা সমায় কিস্কু, মাতা চূড়ামণি কিস্কু।

    বিশেষত: সাঁওতালী সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বেড়ে ওঠা। সাঁওতালী সাহিত্যে একজন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যে কবিতার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিচরণ। তাঁর কবিতা "দিশা সাহিত্য পত্রিকা", প্রবাসী পত্রিকা "আশ্রম" ওটোয়া, কানাডা এবং "বর্ণিক" পত্রিকা (একযোগে প্রকাশিত কলকাতা, ত্রিপুরা, আসাম, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, বাংলাদেশে, আমেরিকা, লন্ডন, নিউজিল্যান্ড, স্পেন, বেলজিয়াম, দারুসসালাম) হতে প্রকাশিত।

    তিনি ফুলকুসমা বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। তিনি ২০০০ সালে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, মেদিনীপুর থেকে ইতিহাসে এম. এ. এবং পাঁশকুড়া বনমালী কলেজ থেকে ২০০১সালে বি. এড ডিগ্রী লাভ করার পর ১০ই অক্টোবর ২০০১ সালে রানিবাঁধ ব্লকের অন্তর্গত ধানাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয় শিক্ষক হিসাবে কাজে যোগ দেন। তিনি পেশায় শিক্ষক হলেও নেশায় একজন কবি ও সমাজসেবী।

    কবি লক্ষণ কিস্কু সরকারি এবং বেসরকারি বহু সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন থেকে সম্বর্ধনা ও পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি পশ্চিম বঙ্গ সরকার কর্তৃক "কবি সারদা প্রসাদ কিস্কু স্মৃতি পুরস্কার- ২০১৬ -১৭" এবং "সাধু রামচাঁদ মুর্মু স্মৃতি পুরস্কার-২০২০-২১" তথা, আদিবাসী" গুণীজন শিরোপাy সম্মানিত হয়েছেন।

    কবি লেখালেখির পাশাপাশি সমাজসেবী সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। তিনি ২০১৮ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত দিল্লি সাহিত্য আকাদেমি অনুমোদিত 'সারা ভারত সাঁওতালি লেখক সংঘ'-এর সহ সম্পাদক রূপে কাজ করেছেন এবং ২০ই ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে 'সারা ভারত সাঁওতালি লেখক সংঘ'-এর সভাপতি মনোনীত হয়েছেন। তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে চলেছেন।


    কবিকৃতি :-

    ২০২১ সাল পর্যন্ত কবি লক্ষণ কিস্কুর ১১ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

    সাঁওতালী সাহিত্য গ্রন্থ -

    ১) কাঁসাই -কুমারী খন মিলন ঘাট (কাঁসাই-কুমারী হতে মিলন ক্ষেত্র ) ২০০২-উপন্যাস
    ২) মার্শাল উমুল (আলো ছায়া ) ২০১০ - কবিতাগুচ্ছ
    ৩)সান্তাড়ি সাঁওহেৎ পহা (প্রাইমার) ২০১২ - শিশু সাহিত্য
    ৪) মানমী বাঞ্চা:-আয় অকা আশাতে (মানুষ বাঁচে কোন আশায় ) ২০১৪ - গল্প
    ৫) ডয়লং চেঁড়েয়া: গল (ভেসে যাওয়া পাখীর গান ) - কাব্যগ্রন্থ
    ৬) ডগর ২০১৮ - কবিতাগুচ্ছ প্রভৃতি।

    বাংলা ভাষায় রচিত –

    ১) সাঁওতালী ভাষায় অলচিকি লিপির গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার প্রেক্ষিত (গবেষণামূলক প্রবন্ধ )-২০১৩
    ২) রূপসাগরের তীরে ,২০২১ - কাব্যগ্রন্থ।

    [১]
    মূলঃ
    || আরাঃ সাকাম বাহা ||
    বাহা আরাঃ
    সাজাও সাকাম
    আচকাঞ্ কয়গ্‌
    চাঁদোয় দারাম

    সাসাং সাকাম
    সাড় বাহা,
    গাতেঞ তিঞাঃ
    গালাং উব্‌।

    আরাঃ কাতে
    বারু সাকাম,
    লেগেজ্‌ লেগেজ্‌
    বাহা সাজ্‌

    বাহা আরাঃ কাতে
    সাজাও সাকাম,
    মেলে মেলে কয়ঃ
    হড়ম রুমুয়।

    সাজাও বাহা
    লেমেঞ লুটি,
    সহর সাহা
    ভাবনা গা’হির।

    মূলঃ দুইঃ
    || তিঁগুন গিয়া’ঞ ||
    তিঁগুন গিয়া’ঞ ইঞ দ তিঁগুণ গিয়া’ঞ
    বহঃ তুলকাতে তিঁগুন গিয়া’ঞ।
    কেটেজ্‌ তিয়া’ঞ লাবিদ ডাঁডা
    সাব গিয়া’ঞ ফুরগা’ল ঝাণ্ডা।
    লটম গিয়া’ঞ জানুম ঝান্টি
    বেনাঃ গিয়া’ঞ ইঞ দ খাঁটি।
    চাঁদো ঠেনিঞ খজঃ দিল দাড়ে
    কামসাও পারমা’ঞ ব-বাড়িজ্‌ আড়ে।

    উডা’ গিয়া’ঞ ইঞ দ উডাঃ’ গিয়া’ঞ
    সেরমা আয়াংরে উডা’ঃ গিয়া’ঞ।
    অলঃ আকিল জীয়ন টুডাং’ দাড়ান
    ঠাকুর সিরজন─ অলং লিখন।

    তিঁগুন গিয়া’ঞ ইঞ দ তিঁগুণ গিয়া’ঞ
    বহঃ তুলকাতে তিঁগুন গিয়া’ঞ।


    মূলঃ তিনঃ
    || আরজ ||
    আম কি ইঞাঃ সেরেঞ রাহারে
    হিঁসিদ হয়েম হুয়ুঃ আ,
    আম কি ইঞাঃ মনে বাগানরে
    হুয়ুঃ আম তিরয়ো রাহা!
    লেমেঞ লুটি লাডাঃ লিটাঃ’
    ঞুতাৎ রাহলা ─ রিমিল সাহাঃ,
    এতাং সিতুং রিলা’মালা
    লাঁদায় লেকা মুলুজ্‌ আহ্‌লা

    ইঞ কি আমরেন কবি হুয়ুঃ আঞ, রানী
    আম কি ইঞরেন অনড়হে ডা’লী!
    আম কি ইঞাঃ মনে বাগানরেন জুরি
    হুয়ুঃ আম তিরয়ো রাহা!

    আম কি ইঞাঃ গালাং মালা
    লুতি তেরম রাহা
    লিবয় লবয় কাসো কয়সা
    টড়ঃ টড়ঃ জজ রাসা।

    লাঁদায়াম টিপ কাতে
    কিতা” হরাসি লাতার,
    আম কি ইঞাঃ লিল সেরমা বাহার
    লেকা মহে বাহা!

    পুকরী তালা পরায়নী
    হেলকাও দাঃ ─ তেন রড়া,
    আম কি ইঞাঃ মনে বাগানরে
    হুয়ুঃ আম তিরয়ো রাহা !



    ভাষা-ভাবনাঃ ─ বিশ্বেশ্বর কুণ্ডু

    সান্তাড়ি শব্দের উচ্চারণ বৈচিত্র্য ─
    সান্তাড়ি ভাষায় একটি বিশেষ স্বর-ধ্বনি রয়েছে যা বাংলা আ-কার আর এ-কারের মাঝা মাঝি ─ যেমন, গা’হির, গিয়া’ঞ, ফুরগা’ল প্রভৃতি। যেটিকে বাংলা লিপিতে প্রকাশ করতে গেলে আকারের উপর ই বা উ ধ্বনির ইলেক বা উড়ানী চিহ্নটি ব্যবহারের রীতি রয়েছে। ইউনিকোড অভ্রতে তা নেই। তাই এখানে অ্যাপস্ট্রফি বা ঊর্ধ্ব কমা ব্যবহার করা হয়েছে। এই চিহ্ন রোমান লিপির মাধ্যমে সান্তাড়িভাষা প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
    বাংলার মতোই সান্তাড়িতেও রুদ্ধ উচ্চারণের বর্ণে অনেক সময় হসন্ত লেখা হয় না; কোথাও শেষে আবার কোথাও শব্দের মাঝখানে রুদ্ধ উচ্চারণ। মূল কবিতায় হসন্ত দেওয়া নেই অথচ উচ্চারণ রুদ্ধ সেগুলিতে আমরা হসন্ত চিহ্ন দিলাম যাতে পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হয়।
    নীচের শব্দার্থ-সারণীতে এরকম শব্দের উচ্চারণ সঙ্কেত সন্নিবেশিত হল। যে শব্দ গুলিকে তারকাঙ্কিত করা হয়েছে সেগুলি হয় অন্যভাষার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে, নয় তো অন্যভাষাকে প্রভাবিত করতে পারে। ‘মূল’ শব্দে মূল সান্তাড়ী শব্দ সূচিত হয়েছেঃ
    সান্তাড়ি ধ্বনির উচ্চারণে অন্তস্থ–য়-এর অকারান্ত উচ্চারণ ─ রুমুয়, কয়গ্‌, কয়ঃ, পরায়নী।
    অন্তস্থ–য়-এর রুদ্ধ উচ্চারণ ─ চাঁদোয়্‌, লাঁদায়্‌, লিবয়্‌ লবয়্‌, পয়্‌রানী (পাঠান্তরে)।
    সান্তাড়ি ধ্বনির উচ্চারণে একটি সাধারণ সূত্র হল ─ ‘ঞ’ ধ্বনি অকার ভিন্ন অন্য স্বর যুক্ত হলেই মুক্ত উচ্চারণ হতে পারে। কেবল ‘ঞ’ - শব্দের মাঝে বা শেষে থাকলে তার উচ্চারণ সব সময় রূদ্ধ-(হসন্ত-যুক্ত)-ই হবে। সে ক্ষেত্রে অল-চিকি বা রোমান হরফে লেখা হলে ‘ঞ’-র পর কোনো স্বর (vowel) বসবে না।
    তৎসম বা তৎসমপ্রায় শব্দ─ সান্তাড়ী ভাষায় বেশ কিছু সংস্কৃত বা তার প্রভাবযুক্ত ভারতীয় ভাষা বাংলা হিন্দী প্রভৃতি এবং ইংরেজী ও অন্যান্য বিদেশী ভাষার শব্দের প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করা যায়; যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামান্য ধ্বনিপরিবর্তন লক্ষিত হয়। কবি গুরাই কিস্কুর কবিতা গুচ্ছ থেকে তার কিছু নিদর্শন:
    সাড় ─ সতেজ, তু. বাং ‘অসাড়’-এর বিপরীত। আচকাঞ্ ─ আচকা, আচমকা সং. আচম্বিত, হঠাৎ [আচকা + ইঞ]। ‘ভাবনা’ শব্দটি মূলতঃ সংস্কৃত। তিনটি পূর্ণ অক্ষর। কিন্তু বাংলার মতো সান্তাড়ীতেও মধ্যের অকারটি লুপ্ত হয়ে উচ্চারণে দুটি অক্ষর─ ভাব্‌না–তে দাঁড়িয়েছে। ‘বহঃ তুল কাতে’ ─ বহঃ = মাথা; ‘তুল’ বাংলা তুল্‌ (= তোলা)ধাতুর সমতুল। ‘কাতে’ (=ইয়া)প্রত্যয় যোগে এখানে অসমাপিকা ক্রিয়া। ঝাণ্ডা─ ‌হিন্দীর ‘ঝণ্ডা’ বাংলাতেও ‘ঝাণ্ডা’ রূপে ব্যবহৃত হয়। খাঁটি─ বাংলাতেও শুদ্ধ, পবিত্র অর্থে ব্যবহৃত। খজঃ─ তু. বাং. খোঁজ, চাওয়া বা প্রার্থনা করা। উড়া’ ─ তু. বাং. উড়া। কি ─ তু. বাং. কি [প্রশ্নসূচক সর্বনাম]।
    হয়েম ─ সান্তাড়ী ভাষার অন্যতম বৈশষ্ট্য ব্যক্তিবাচক সর্বনাম পদ গুলি অনেক সময় অন্য শব্দের সঙ্গে সন্ধিবদ্ধ হয়ে যায়; একই সর্বনাম একটি বাক্যে একাধিকবার ব্যবহৃত হ’তে পারে। এখানে ‘হয়’ (= হাওয়া)ও ‘আম’ (= তুমি) শব্দের সন্ধিতে ‘হয়েম’ হয়।
    ছন্দোভাবনা ─
    ‘আরাঃ সাকাম বাহা’ কবিতায় বাংলা ছড়ার আদলে ছন্দের দোলা বেশ উপভোগ্য। পাঁচটি স্তবকে পঞ্চমটিতে ‘আরাঃ-কাতে’ আর ‘মেলে-মেলে’ শব্দগুচ্ছকে একটি করে শব্দ ধরলে প্রতিটি চরণে দুটি করে শব্দ দিয়ে সাজানো।
    ‘তিঁগুন গিয়া’ঞ’ একটি চতুর্দশপদী (সনেটধর্মী) কবিতা। এতে প্রতি দুই চরণে অন্ত্যমিল বাংলা পয়ার ছন্দের আদলে।
    ‘আরজ’ কবিতার ছয়টি স্তবকে ছন্দোবৈশিষ্ট্য হ’ল প্রতিটির শেষ চরণে আকারান্ত মিল। এ ছাড়া প্রথম স্তবকে প্রথম তৃতীয় চরণে এবং দ্বিতীয় চতুর্থ চরণে অন্তমিল; দ্বিতীয় ও চতুর্থ স্তবকে আকারান্ত মিল; তৃতীয় স্তবকের প্রথম তিন চরণে ই-বর্ণান্ত মিল; পঞ্চম স্তবকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় চরণে ‘আর’ ধ্বনির মিল। শেষ স্তবকের চারটি চরণে অন্ত মিলের অভাব।
    অলঙ্কার-ভাবনা ─
    সাহিত্য-শাস্ত্রে অলঙ্কার দুই প্রকারের─ শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার। শব্দালঙ্কারের মধ্যে অনুপ্রাস কবিদিগের বিশেষ প্রিয়। সঙ্কলিত দ্বিতীয় কবিতা ‘তিঁগুন গিয়া’ঞ’-এ প্রতি দুই চরণে অন্ত্যানুপ্রাসের মিল লক্ষণীয়। আবার দ্বিরুক্ত শব্দগুচ্ছেও অনুপ্রাসের অনুরণন শ্রুত হয়। কবিতা গুলিতে দ্বিরুক্ত বা বহুবার ব্যবহৃত শব্দ সমূহঃ লেগেজ লেগেজ, মেলে মেলে, তিঁগুন গিয়া’ঞ (প্রথমে ও শেষে তিনবার), উড়া’ গিয়া’ঞ (দু-বার)। এছাড়া এক বা দুই বর্ণের অনুপ্রাসও অজস্রঃ
    ইয়া’ঞ ─ গিয়া’ঞ তিয়া’ঞ
    গ ─ তিঁগুন গিয়া’ঞ,
    স ─ সাজাও সাকাম, সাসাং সাকাম, সহর সাহা (ক. ১); কাকসো কলসা (ক. ৩)।
    ত, ঞ ─ তুল কাতে, গাতেঞ তিঞা (ক. ১)
    দ ─ দিল দাড়ে,
    ন ─ তিঁগুন জীয়ন দাঁড়ান সিরজন লিখন (ক. ৩)
    প ─ পুকরী পরায়নী (ক. ৩)
    র ─ সেরেঞ রাহারে, তির্‌য়ো রাহা,
    ল ─ গালাং লাবিদ ফুরগা’ল লটম, অলঃ আকিল অলং লিখন লেমেঞ লুটি, লাডাঃ লিটাঃ’ রাহ্‌লা রিমিল, রিলা’ মালা, লাঁদায় লেকা, মুলুজ আহলা লিবয় লবয়, গালাং মালা, লুতি তালা হেলকাও।
    হ─ হিঁসিদ হয়েম।
    অর্থালঙ্কারঃ
    সাহিত্যে নানা অর্থালঙ্কারের মুলে রয়েছে উপমা (simili)। উপমা অলঙ্কারে দুটি মূল উপাদান ─ উপমেয় ও উপমান। উপমেয়─ কবির বর্ণনীয় ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়; আর উপমান হল অপরাপর ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয় যার সঙ্গে উপমেয়ের তুলনা করা হয়। এই তুলনা কর্মে উপমানের সঙ্গে উপমেয়ের সাদৃশ্য, অভেদ আরোপ, অথবা উপমানের চেয়ে উপমেয়ের উৎকর্ষ, বা অপকর্ষ প্রভৃতি নানা ভাব প্রতিপাদিত হয়। অলঙ্কার শাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ না করেও কবি গুরাই কিস্কুর কবিতায় এক ঝলকে যেসব উপমা আভাসিত হ্য় তার কয়েকটি এখানে পরিবেশিত হচ্ছে :
    ‘আরাঃ সাকাম বাহা’ ─ প্রেম বিষয়ক কবিতা। কবিতার শীর্ষকে দুটি উপমানশব্দ সমুজ্জ্বল─ ‘সাকাম’ আর ‘বাহা’ ─ পাতা আর ফুল, দুটিই লালরঙের। কবিতার প্রথম স্তবকে লাল ফুল ও পাতার পরিচ্ছদে মণ্ডিত উপমেয়র অকস্মাৎ অক্ষিপাতে উদিত চাঁদের ঝলককে মনে করিয়ে দিচ্ছে। এখানে রূপকের পর্দায় যে উপমেয় আচ্ছাদিত, দ্বিতীয় স্তবকে হলুদ পাতা আর বিকশিত ফুলে ‘গাতেঞ তিঞাঃ’ অর্থাৎ প্রেয়সীর চুলের বিনুনি সাজিয়ে আমাদের কাছে হাজির করেছেন কবি গুরাই। চতুর্থ স্তবকে কবি দেখাচ্ছেন তাঁর প্রেয়সীর ‘মেলে মেলে কয়ঃ’ বা মিটিমিটি চাওয়ার মাঝে তনুমনে তড়িৎ ছটার কান্তি ছড়ায়─ ‘হড়ম রূমুয়ঃ’। এমন সাজানো ফুলের (মতো) নরম ঠোঁট (উপমেয়) ─ ‘লেমেঞ লুটি’ যে ললনার সে দূরে সরে গেলে প্রেমিকের বিরহ ভাবনা গভীর হওয়াই স্বাভাবিক নয় কি?
    ‘তিঁগুন গিয়া’ঞ’ কবিতায় কবির সঙ্কল্প ও আত্মপ্রত্যয় প্রকাশিত। এই কবিতায় শব্দালঙ্কারের অনুপ্রাস ছাড়া অর্থালঙ্কারের তেমন বাহুল্য নেই। তবে জ্ঞানগৌরবময় ও ভ্রমণ-পিপাসু হয়ে পাখির মতো আকাশে উড়ে অথবা বলা ভাল যে মহাকাশ-যানের মতো মহাকাশে পাড়ি দিয়ে সেখানে অবস্থান করবেন। পাখি বা মহাকাশযান উহ্য রেখেই উৎপ্রেক্ষায় সাফল্যের উচ্চশিখরে আরোহণের সঙ্কল্পে দৃঢ প্রত্যয়ী কবি।
    ‘আরজ’ কবিতায় প্রেমিক তাঁর প্রণয়িণীর কাছে নানা উপমানের আয়োজনে জিজ্ঞাসার মাধ্যমে আর্জি বা মিনতি রাখছেন। এখানে কবিতার কথক ‘ইঞ’ (আমি অর্থাৎ প্রেমিক) শ্রোত্রী ‘আম’ (তুমি অর্থাৎ প্রেমিকা)─ দুজনই অঙ্গী উপমেয়। অঙ্গ উপমেয় হিসেবে সঙ্গ নিয়েছে উভয়ের ভাব অনুভাব প্রভৃতি। উপমান গুলির সঙ্গে উভয়ের ভাব অনুভাবের অভেদ আরোপ এবং সাদৃশ্যাদি কল্পিত হয়েছে উপমাগর্ভ রূপকআদি নানা অলঙ্কারের প্রয়োগে। প্রেমিকের গানের সুরে প্রেমিকা হ’ল হাল্কা হাওয়া; মন রূপ বাগানে বাঁশির সুর স্বরূপ। উপমান চয়নে আরো কত বৈচিত্র্য!
    প্রথম স্তবকে ─ ইঞাঃ সেরেঞ রাহারে─ আমার গানের সুরে (উপমেয়) হিঁসিদ হয়েম ─ তুমি হাল্কা হাওয়া স্বরূপ (উপমান); ইঞাঃ মনে বাগানরে─ আমার মনের বাগানে (উপমেয়) আম তিরয়ো রাহা – তুমি বাঁশির সুর (উপমান)স্বরূপ। দ্বিতীয় স্তবকে ─ (আমাঃ─ তোমার) লেমেঞ লুটি ─ নরম ঠোঁট, লাডাঃ লিটাঃ’ ─ কম্পিত কণ্ঠ (উপমেয়); ঞুতাত্‌ রাহলা - রিমিল সাহা ─ এতাং সিতুং রিলা’মালা লাঁদায় লেকা (উপমা বাচক শব্দ) মুলুজ আহলা (উপমান) ─ মেঘ কেটে গেলে টুকরো টুকরো রৌদ্রোজ্জ্বল মেঘমালাকে হাসির ফোয়রার মতো মধুময় (সাধারণ ধর্ম) মনে হয়। এই অংশে উপমার চারটি উপাদানই বিদ্যমান, তাই পূর্ণোপমা অলঙ্কার। তৃটিয় স্তবকে ─
    কথক প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ‘অনড়হে ডা’লী’─ কবিতার ডালী ভেবে নিজেকে ‘কবি’র সাথে অভিন্ন ভেবেছেন। এতে রূপক অলঙ্কারের সজ্জা সম্পূর্ণ হয়েছে। চতুর্থ স্তবকে─ প্রেয়সীকে ‘গালাং মালা’ ─ গাঁথা মালা, আর ‘লুতি তেরম রাহা’─ মৌমাছির গুন গুন স্বর; ‘লিবয় লবয় কাসো কলসা’ ─ ময়ূর-পঙ্খী (শাড়ির) কুঁচির গোছে (তোমার) চলন মধুর─ ‘টড়ঃ টড়ঃ জজ রাসা’ ─ টস টস রসে ভরা তেঁতুল! পঞ্চম স্তবকে─ ‘আম কি ইঞাঃ লিল সেরমা বাহার’ ─ তুমি কি আমার নীল আকাশের সৌন্দর্য! ‘লাঁদায় লেকা মহে বাহা’─ হাসির ফোয়ারার মতো (উপমা) ফুটন্ত ফুল! এই ভাবেই কবি রূপক অলংকারের পসরায় মণ্ডিত করেছেন মনের মানসীকে।
    উত্তর-ভাবনাঃ
    সান্তাড়ী কবিতা নিয়ে বর্তমান লেখকের এই ধরণের প্রয়াস চলতেই থাকবে। এর পেছনে যে উদ্দেশ্য তা পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছে পরবাস-৭২-এ ‘সাঁওতালী কবি সারিধমের সাতটি কবিতা’-য়। এখানে আর তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। এই লেখায় কবি গুরাই কিস্কু ছাড়াও কন্যাকল্প শ্রীমতী রাধারাণী মুর্মুর সহাতার ঋণ স্বীকার না করলেই নয়। পরিশেষে পরবাস-পরিবারবর্গকে সাধুবাদ জানাই লেখাটি নির্বাচিত করার জন্য।
  • বাংলা অনুবাদ | কবি/অনুবাদক পরিচিতি ও ভাষা ভাবনা (বিশ্বেশ্বর কুণ্ডু)
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)