• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | নাটক
    Share
  • গাড়ল গীতা : ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত





    || ১ ||


    স্থান: আর্যাবর্তের একটি রমণীয় পাহাড়ি উপত্যকা। কাল: বেলা দ্বিপ্রহর। যুগ: দ্বাপরের শেষ দিক। পাত্র: ঋষিসুলভ আবক্ষ গোঁফদাড়িযুক্ত গেরুয়া ধুতি পরা একজন প্রৌঢ় পুরুষ। ব্যাকরণ-শিক্ষার আশ্রম সংলগ্ন একটি খাবারের বিপণিতে (পরে যে ধরনের ব্যবসার নাম হয়েছিল চট্টি), ঋষিটি বসে পুরী-তরকারি খাচ্ছিলেন। হঠাৎ আকাশে রুপোর মতো উজ্জ্বল এবং অতিকায় একটি আকৃতি উড়ে আসতে দেখা গেল। চট্টির হালুইকর এবং অন্যান্য ক্রেতারা কেউ বিস্মিত এবং কেউ কেউ ভয় পেয়ে গেছে।

    প্রথমজন: এটা কি পাখি?
    দ্বিতীয়জন: এটা কি বিমান?
    তৃতীয়জন: এটা কি কোনো প্রেতযোনি পুরুষ?

    শ্মশ্রূধারী ঋষি তাড়াতাড়ি খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। চট্টির সম্মুখের শকটপ্রাঙ্গণে শ্বেত আকৃতিটি অবতরণ করলে দেখা গেল সেটি যেন এক তৃতীয়াংশ আকাশযান, এক তৃতীয়াংশ পাখি, এবং এক তৃতীয়াংশ কোনো প্রেতযোনি পুরুষ। তার পাখির মতো ক্ষুরধার চঞ্চু এবং পালক আছে, বিমানের মতো ডানা এবং চারটি বসার আসন আছে পিঠে, আবার মানুষের মতো আছে বুদ্ধি এবং বাক্‌শক্তি। ঋষি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তার ভিতর থেকে একটি নভশ্চর মূর্তি বেরিয়ে এসে অভিবাদন করল।

    নভশ্চর: জয়তু নারদ! আসতে একটু দেরি হল বলে দুঃখিত। আরেকটু উত্তরে আবহাওয়া অনুকূল নয়, বাতাসে এত গর্ত হয়ে আছে যে আমার নামতে অসুবিধে হচ্ছিল। ধরিত্রী মায়ের নিরাপদ বুকে পা রেখে বাঁচলাম।

    দুঃখের বিষয়, কথাগুলো মুখ দিয়ে বেরোতে না বেরোতেই নভশ্চর কোনো খানাখন্দে হোঁচট খাবার পর এক ব্যাঙলাফে শূন্যে উঠে ঊর্ধ্বপদ ও ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে পড়েছে ভূমিতে।

    নারদ: এসো এসো বৎস গরুড়! যে কোনো মা-ই সন্তানের মুখে প্রশংসা শুনলে আদর করার জন্য বুকে টেনে নেবে। মায়ের মন, তোমার দোষ নেই। (হাত ধরে আগন্তুককে তুলে) বাতাসের গর্তের জন্যও ক্ষোভ রেখো না, গোদাবরীর দিকে যদি যাও তো দেখবে মেঘের উপর টাটকা গোবর ভাসছে। কতবার তাড়াহুড়ো করে ঢেঁকি চালাতে গিয়ে পিছলে ডিগবাজি খেয়েছি। তুমি যে মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় পৌঁছে গেছ সেটাই প্রধান। যাহোক, সামান্য বিলম্বে আমার কোনো ক্ষতি হয়নি। চমৎকার খাবার পাওয়া যায় এখানে। তোমার নিশ্চয়ই এখন কয়েকটা ইঁদুরভাজা চাই।

    গরুড় (একটু সুস্থ হয়ে): রাম, রাম! গেরুয়া নেওয়ার পর আমি কি আর আগের মতো আছি? খাঁটি নিরামিষ খাই। এখন আমার কিচ্ছু লাগবে না, তবে আপনি স্বচ্ছন্দে খাবার সঙ্গে নিয়ে বসতে পারেন। শুধু মনে রাখবেন আকাশপথে ধূম্রপান নিষিদ্ধ।

    গেরুয়া শুনে নারদের চোখে মুখে একটা সম্ভ্রমের ছাপ এসে গিয়েছিল। গলাটাও এক-দু খাদ নেমে গেল।

    নারদ: গেরুয়া? বলো কী? মালিকের জন্য যে মাসে দু-একটা লাশ গায়েব করতে? সেটাও কি ছাড়লে এবার?

    গরুড় (ব্যাজার হাসি দিয়ে): গুজব কি বিশ্বাস করা উচিত? বা ছড়ানো উচিত? আপনাকে ছেলেধরা বলে অপবাদ দিয়ে বিদর্ভের গাঁওওয়ালারা কি পেটান পিটিয়েছিল এরই মধ্যে ভুলে গেছেন?

    নারদ (জিভ কেটে ও কান ছুঁয়ে): তা কি ভুলি? ভাগ্যিস সেদিন গোটা পাঁচেক সত্যিকারের ছেলেধরাও ছিল আশে পাশে। তারা নিজের ভাইয়া ভেবে বুক দিয়ে বাঁচায়। তারপর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাদের সঙ্গে কিছুদিন ছেলে ধরে বেড়াতে হয় অবশ্য। মন্দ লাগছিল না। এমন সেয়ানা হয়ে গিয়েছিলাম যে ধরাও পড়তাম না। যাহোক, ভুলচুক ক্ষমা করো ভাই। বয়স হয়ে যাওয়ার লক্ষণ। তোমার চঞ্চু যেরকম কঠিন, মন যে সেরকমই পেলব সেটা স্মরণে ছিল না। এই আমি মুখে তালা দিলাম। চলো বেরিয়ে পড়ি।

    নারদ আর বাক্যব্যয় না করে নিজের একতারাটি হাতে গরুড়যানে আসন গ্রহণ করলেন এবং পশমের আসনবন্ধনীটি কিলিকধ্বনির সঙ্গে দক্ষভাবে বেঁধে নিলেন। গরুড়ও সারথির আসন অধিকার করল।

    গরুড়: নারদজী, যতক্ষণ আরোহ চলছে দয়া করে বন্ধনী খুলবেন না, এবং কোনো বেতারবার্তাও আদানপ্রদান করবেন না। আরোহ সম্পূর্ণ হলে বন্ধনী আপনিই খুলে যাবে। ও কী? পাশে কী দেখছেন?

    নারদ (করুণ ভাবে): ভাইটু কিছু মনে কোরো না, পাশের আসনে একটা কাপড়ে ঢাকা লোক ঊর্ধ্বচক্ষু হয়ে পড়ে আছে। গা থেকে একটু একটু পচা গন্ধও বেরোচ্ছে। আজই খালাস করলে নাকি? ভুল করে কাপড় তুলে দেখে ফেললাম যে। এবার আমার কী হবে?

    গরুড়: কী যে বলেন প্রভু? ওটা ইন্দ্রের শালা। বেশি টেনে গর্দভটা তূরীয় ধামে পৌঁছে গেছে।

    নারদ: ইন্দ্রের শালা? কই চিনতে পারলাম না তো! শচীর মা অবশ্য কিছুদিন যাবৎ সন্তানসম্ভবা ছিলেন। সেই বাচ্চাটা এরকম বড়সড় হয়ে জন্মেছে নাকি? নাঃ, আশ্চর্য কিছু নয়। ভদ্রমহিলা খেতে পারতেন বটে।

    গরুড়: না গুরুজী, না। শচীর ভাই নয় এটা। শালাও নয়, আসলে উপশালা।

    নারদ: উপশালা!! সেটা আবার কোন শালা?

    গরুড়: হুম্‌। বুঝিয়ে বলতে হবে এটা। আসলে মর্ত্যে ইন্দ্রের বিবাহগুলো যাকে বলে ঠিক অনুলোম নয়। যাজ্ঞবল্ক্য বলেন উৎপাটিত-লোম। মনু আর পরাশর বলেন বেয়াদবি। একমাত্র গৌতম এখনো রায় দেননি, উপবিবাহ বলে একটা অস্থায়ী খাতায় ফেলে রেখেছেন। তো সেই বিধানে কালে কালে বহু উপকুটুম্বের সৃষ্টি হয়েছে। এটাকে তো ইন্দ্র নিজেই চেনেন না। অর্থাৎ উপশালার বদলে উপদ্রবও বলা যায়। আপনি এই প্রাণীটাকে একদম পাত্তা দেবেন না। বরং পাশের শীতলপেটিকা খুলে দেখুন, যদি কিছু ছেড়ে থাকে তাহলে সেটা পান করতে পারেন। উৎকৃষ্ট আসব আমাদের। সৌরাষ্ট্র থেকে আসে।

    নারদ: লোভনীয় প্রস্তাব! কিন্তু থাক। ষাটের পর বুঝলে, সব ছেড়েছুড়ে আবার একটা সদ্যোজাত হরিণশিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যেতে মন করে। আজকাল তো স্নান পর্যন্ত করি না, ইচ্ছে হয় কোনো হরিণ মা এসে গা-টা চেটে দিক। একমাত্র স্বর্গবণিতা রম্ভা স্বয়ং নিজের ছিলিমটা যখন বাড়িয়ে দেয় তখন বাধ্য হয়ে দু-একটা টান দিতে হয় কারণ নইলে সে নেশার ঘোরে ‘দেব তোর পিকলুটা মটকে’ বলে নাক মুলে দিতে আসে।

    গরুড়: ছি, ছি, ছি। আপনাকেও রেয়াত করে না?

    নারদ: সবই ভাগ্য! দোষ দিই না। জানো, আগে সে এমন ছিল না। বছর তিনেক আগে দলবল সহ ইন্দ্রের সভা ছেড়ে অসুরদের চারগুণ বড় রঙ্গশালায় যাবার কথা ছিল তার। সব ঠিকঠাক, এমন সময় জানা গেল আগের চুক্তির মেয়াদ ফুরোয়নি। শুনে রম্ভার মাথায় তো বাজ ভেঙে পড়ল। এত বড় সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাবে সে ভাবেনি। রাগে, দুঃখে উন্মাদ হয়ে গিয়ে সে তখন অশ্বারোহিণী নৃত্য বলে একটা মহা পরাক্রমশালী নাচ শুরু করেছিল। সেটার মাঝখানে ইন্দ্র সমেত সমস্ত সভাসদদের সপাং সপাং করে কশাঘাত করার বিধি। তারপর কী হল বলো দেখি?

    গরুড়: দেবতারা সবাই হাতজোড় করে তাকে বিদায় হওয়ার জন্য মিনতি করল?

    নারদ: সে খুব আশা করে ছিল দু-চার বার মজাটা দেখালে তাই হবে। কিন্তু উলটে চাবুকের ঘা খেতে সবার এমন ভালো লেগে গেছে যে এখন শুনছি রোজ দুবার তাকে দিয়ে নাচটা নাচায়। এমনকী অসুররাও নিজেদের চারগুণ বড় রঙ্গশালা ছেড়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে চলে আসে রম্ভার চাবুক খাওয়ার লোভে। সেই থেকে বেচারার মেজাজ সহিসদের মতো টঙ। যাক সে সব দুঃখের কথা। সৌরাষ্ট্রে যে আসবপান নিষিদ্ধ শুনেছিলাম, সেটা কি তবে ভুল?

    গরুড়: সেটা ভুল নয়। তবে আসব-নির্মাণ তো নিষিদ্ধ হয়নি! বুক চিতিয়ে ব্যবসা করছে সবাই। খেতে চাইলে একটু কষ্ট করতে হয়। দ্বারকায় বিকেলের দিকে এত লোক কোত্থেকে এসে উপস্থিত হয় ভেবে দেখেছেন?

    নারদ: ও হরি! কীর্তন শুনতে আসে না?

    গরুড়: সৌরাষ্ট্রীরা আসবের পিপে নিয়ে আসে। কিছু বিক্রি হয়। বেশিরভাগ নিজেরাই খেয়ে মাথা ফাটাফাটি করে। কীর্তনটা লাগানো হয় তাদের আর্তনাদ আর হাহাকার চাপা দেওয়ার জন্য।

    নারদ: বোঝো। আচ্ছা, আজ কোন্‌ আপৎকালীন সমস্যার জন্য হঠাৎ ডাক পড়ল তার একটা আভাস দাও। দারুণ কৌতূহল হচ্ছে আমার।

    গরুড়: পরিস্থিতি বিলক্ষণ সঙ্গীন। দ্বিতীয় মহাভারত লাগল বলে। চলুন ওড়া যাক।

    আর কিছু না বলে গরুড় আকাশে উঠে পড়ার প্রস্তুতি নিল। গোঁ গোঁ করে যানের অভ্যন্তরে একটা যন্ত্রদানব ডাকতে শুরু করেছে। সেই শব্দে নারদের পাশে শোয়া লোকটার ঘুম ভেঙে গেছে বোধহয়। অস্ফুট কিন্তু জাঁহাবাজ গলায় হেঁকে উঠেছিল সে হঠাৎ।

    লোকটা: কে রে তুই মাঠের ছাগল? এবার নামতে হবে এখান থেকে! ঢের লপচপানি সহ্য করেছি।

    নারদ প্রথমে চমকে প্রায় আসন থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন। লোকটা জ্যান্ত আছে দেখে পরে অবশ্য স্বস্তিই পেলেন খানিকটা।

    নারদ: শান্ত হও বালক। আমি গদাধরের জ্যাঠা। তোমারও গুরুজন হই।

    লোকটা: চোপ! শালা মুখে মুখে জবাব দিচ্ছে। জুতিয়ে থোঁতাদুটো ছিঁড়ে নিতে হয়। তুই কার জ্যাঠা তার প্রমাণ কী?

    নারদ: সেটাই তো দেখাতে যাচ্ছি।

    অত:পর নির্বিকার নারদ তাঁর একতারার ডাণ্ডার এক ঘায়ে তাকে আবার শুইয়ে দিলেন।

    গরুড় (সারথির আসন থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে): সব ঠিক আছে? একটা আওয়াজ পেলাম যেন।

    নারদ: আওয়াজ? কই না তো!

    নারদের বাক্য শেষ হবার আগেই ইন্দ্রের উপশালা হাঁ হাঁ করে ঊর্ধ্বশ্বাস তুলতে তুলতে উঠে বসেছিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে নারদ দ্বিতীয়বার ডাণ্ডাটা তাক করে তার নাকে মারলেন এবং এবার লোকটা সত্যিই দড়াম করে শয্যা নিয়ে আর উঠল না।



    || ২ ||


    প্রায় দুদণ্ড পরে গরুড়যান যেখানে অবতরণ করল সেটি ইন্দ্রপ্রস্থ নগরের উপকন্ঠস্থ একটি মনোরম তপোবন। বিকেল হয়ে গেছে। পাখিরা ফিরছে কুলায়। আর্যাবর্তের এই অংশের বনেজঙ্গলে তেঁতুল আর কাঁটাযুক্ত বাবলা গাছেরই প্রাধান্য। জলাশয়ের আশপাশে বট, অশ্বত্থ, কালোজাম, নিম, অর্জুন, কৃষ্ণচূড়াও দেখতে পাওয়া যায়। তপোবনটি নদীর নিকটে এবং এইসব মহীরুহে শোভিত। তপোবনের প্রান্তে আকাশযান অবতরণিকা। সেখানে এক যুবক ঋষিপুত্র নারদের জন্য অপেক্ষা করছিল। নারদ সহাস্যে গরুড়যান থেকে অবতরণ করলেন।

    নারদ (ফুক ফুক করে যুবকটির গা শুঁকে): ধন্য ব্যাসদেব, ধন্য! চমরী গাইয়ের দুধ খেয়েও এমন নির্মেদ শরীর! আপনার বয়স তো মনে হচ্ছে চল্লিশ বছর কমে গেছে। গায়ের পূতিগন্ধটাও নেই। কোন অপ্সরার শুশ্রূষায় এটা হল বলুন তো! আমাকে তার হাওয়ালে করে দেওয়া যায় না?

    যুবক (ধাক্কা মেরে নারদকে সরিয়ে দেবার পর গম্ভীরভাবে): আমার নাম শুক। ব্যাসদেব আমার পিতা হন। আমাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান প্রায় চল্লিশ বছরই হবে। আর হাওয়ালে কথাটার মানে কী? আমি চ্যাংড়াদের ভাষা বুঝি না।

    নারদ (জিভ কেটে): এই রে! ভুল হয়ে গেছে আবার। ক্ষমা করো ভাই। কিছু মনে কোরো না, বয়সের দোষ। অন্ধকারে ভালো দেখি না আজকাল। তারপর? অপি কুশলী ত্বম্‌?

    শুক: নিরুপায় না হলে কী আপনাকে স্মরণ করে কেউ? আশা করি অবগত আছেন যে কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ নিয়ে ব্যাসদেব সম্প্রতি একটি মহৎ গ্রন্থ রচনার কাজে হাত দিয়েছিলেন। বিপুল এই আখ্যানের ছয়টি পর্ব লেখা সমাপ্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি গুরুকুলের পাঠ্যের অন্তর্গতও হয়েছে।

    নারদ: নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। গ্রন্থটির বিষয়ে বিলক্ষণ অবগত আমি। ব্যাসদেবের এই অক্ষয় কীর্তির খ্যাতি স্বর্গ পর্যন্ত ছড়িয়েছে। স্বয়ং ব্রহ্মাকে একটি ক্ষুদ্র ও চৌকো সংস্করণ লুকিয়ে বগলদাবা করে নিয়ে যেতে দেখেছি। ব্যাসদেবের শ্লোক এত কূট যে জট ছাড়াবার জন্য সন্ধ্যেবেলা মুখ ঢেকে সরস্বতীর কাছে পড়তে যেতে হচ্ছে বৃদ্ধকে। যদিও চারখানা মুখ ঢাকা একটা দো-পেয়ে প্রাণীর আকৃতি দেখলে এমনিতেই বেচারামকে চেনা যায়।

    শুক (চমকে উঠে): চৌকো সংস্করণ? আচ্ছা, কালির রং কি লালচে?

    নারদ: হ্যাঁ, সেটা একটু অদ্ভুত ঠেকেছিল বটে। লঙ্কাফোড়ন দেওয়া আছে একটু, তাই না?

    শুক (নারদের প্রশ্ন উপেক্ষা করে): এই লেখাটা ধরার পর থেকেই যত গণ্ডগোল। ভালো কথা, পারলে অন্যান্য আশ্রমগুলিকে জানিয়ে দেবেন যে পুস্তকটির সঙ্গে দুটি করে মদ্রের মোটাতাজা মোরগ বিনামূল্যে দিচ্ছি। বাজখাঁই গলা। ভোর বেলা ব্রহ্মচারীদের কানের পর্দা ফাটিয়ে শয্যাত্যাগ করায়। পাঠ্যতালিকা থেকে আমাদের গ্রন্থ কাটা পড়লে অবশ্য মোরগ ফেরত নেওয়া হবে।

    নারদ: (গলা নামিয়ে) আশ্রমে মুরগি-টুরগিও রাখছ এবার? বাহবা, শুকদেব, বাহবা। মাঝে মাঝে হাওয়া বদলের জন্য এলে কি স্বাস্থ্য ফিরতে পারে?

    শুক: কী যে বলেন? আশ্রমে মুরগির প্রবেশ নিষেধ।

    এমনই ভাগ্য যে তখনই এক ঝাঁক কুক্কুট কঁ কঁ রবে যেন শুকের কথাটার প্রতিবাদ করতে করতে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। নারদ দাঁত বের করে হাসতে লাগলেন।

    শুক (গলা খাঁকরে): ওগুলো মোটেও মুরগি নয়, মোরগ। মোরগ আছে অগুনতি, কিন্তু জানবেন এখানে তারা অবধ্য। শুধু ভোরের ডাক শোনার জন্য রাখা হয়। তা প্রত্যুষকালে ওঠা তো শুনেছি স্বাস্থ্যের জন্য ভালোই।

    নারদ (নিরাশ হয়ে): অ। তাই বলো। সাধু, সাধু।

    আবার একটা অশোভন কাণ্ড ঘটে যায়। দুটি অল্পবয়সী ঋষিপত্নী গল্প করতে করতে চলেছে। সদ্য জবাই করা মোরগ তাদের কাঁধ থেকে উলটো হয়ে ঝুলছিল। শুকের দিকে তাকিয়ে তারা হাসতে হাসতে হাত নাড়ল। শুক বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে দেখলেন নারদ আহ্লাদে পালটা হাত নাড়াচ্ছেন।

    শুক (একটা ফ্যাকাসে হাসি দিয়ে): অবধ্য মানে অমর নয়, এ দুটো শব্দকে গুলিয়ে ফেলবেন না। নিজেদের মধ্যে মারামারি করে রোজই কুক্কুটদের বেশ কিছু পঞ্চত্ব পায়। তাদের আত্মার সদ্গতির জন্য দেহগুলোকে বিশিষ্ট ঋষিশরীরের অন্তর্ভুক্ত করা শাস্ত্রসম্মত।

    নারদ (উৎফুল্ল হয়ে এবং দুহাত জোড় করে): একটা পরোপকারী প্রাণীর আত্মার সদ্গতি করার চেয়ে অধিক পুণ্যের কাজ কী শুকদেব?

    সহমতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর দুজনে মাথা নাড়তে নাড়তে একটি বৃহৎ আটচালার সামনে এসে উপস্থিত হলেন। ভিতরে পাঁচ-ছ-জন প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ ঋষি বসে কী একটা বিষয় নিয়ে উত্তেজিতভাবে কথা বলছিলেন। নারদ ও শুককে আসতে দেখে আজানুলম্বিত শ্মশ্রূধারী ও বদখত চেহারার এক বৃদ্ধ তড়াক করে উঠে পড়েছেন। দূর থেকে নারদ যেভাবে নাক টিপলেন তাতে স্পষ্ট বোঝা গেল ইনিই কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস।

    নারদ: অহো! কী সৌভাগ্য, সেই মহাপুরুষের শত্রুপীড়নকারী অঙ্গসৌরভের কাছে পরাস্ত হয়ে নিজেকে আবার ধন্য মনে করছি। মহর্ষি ব্যাসের জয় হোক! বলুন কী বার্তা। কে আপনাদের উৎপীড়ন করছে নির্ভয়ে ও খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করুন। সমস্ত সংবাদ গোপন থাকবে। ফেরার আগে আমাকে দিয়ে গোপনীয়তার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে ভুলবেন না।

    ব্যাস (নমস্কারান্তে ও কুশলপ্রশ্নাদির পর): ঘোর সঙ্কট আমাদের মহামুনি নারদ। মহাভারত নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করছি। নিজের মুখে নিজের বেশি বড়াই করব না, বাল্মিকীজীও নমস্য মানুষ, কিন্তু এরকম গরমাগরম গল্পের পোলাও উনুন থেকে নামাবার আগে তাঁর হাত পুড়ে যেত। যাহোক, প্রকাশিত পর্বগুলি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল। সেগুলি ভাঙিয়েই আশ্রমের এতগুলো পেট চলেছে। হায়, আজ মনে হচ্ছে এতদিনের সাধনা সব জলে যাবে।

    নারদ: কেন? পরীক্ষিৎ কি দেবত্র সম্পত্তি অধিগ্রহণ করছেন? না রাক্ষসের উপদ্রব হয়েছে? নাকি বৃদ্ধ ঋষিদের পূর্বাশ্রমের গৃহিণীরা পাড়ার অবলা উদ্ধারিণী সমিতির মদত নিয়ে অভিসন্ধিমূলক খোরপোশের মামলা করেছে?

    ব্যাস (বিমর্ষ হয়ে): শেষেরটা আছে। প্রকৃত সমস্যা হয়েছে মহাকাব্যটিকে নিয়ে। ব্যাস এবং ব্যাস বলে যে প্রতিষ্ঠানটি আজ ভূভারতে প্রসিদ্ধ, তার সমৃদ্ধির মূলে এই গ্রন্থের প্রতিলিপি অধিকার। নিশ্চয়ই জানেন যে মহাভারতের অনুমোদিত সংস্করণ কেবল আমাদের গ্রন্থাগার থেকেই পাওয়া যায় এবং অভিজ্ঞান স্বরূপ প্রথম পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষর থাকে। সম্প্রতি মহামারীর মতো তালপাতার মণ্ড থেকে প্রস্তুত বর্গাকৃতি পত্রের শত শত চোরাই পাণ্ডুলিপি হঠাৎ উদয় হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। নাম মহাভারত হলে কী হবে, গল্পটা একেবারে উলটো। অত্যন্ত আশ্চর্যের কথা, এই প্রতিলিপিগুলি অবিকল একরকম দেখতে। লালচে অক্ষরে লিখিত। প্রতিটি মাত্রা, প্রতিটি বিন্দু পর্যন্ত একরকম। প্রথম পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষরের হুবহু নকল তো আছেই, আমার নাম করে একটি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের ছাপও রয়েছে।

    নারদ (কপালে করাঘাত করে): আপনার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ? হায় হায়! আপনিও কি কাউকে বিশ্বাস করে সেটা ধরতে বা চুষতে দিয়েছিলেন?

    ব্যাস (অবাক হয়ে): চুষতে?

    নারদ: বৃদ্ধ বয়সে স্বয়ং হনুমান আমায় সাবধান করে বলেছিলেন আঙ্গুল, টাঙ্গুল, আর লাঙ্গুল, এই তিনটে জিনিস কখনো অন্যদের হাতে দিতে নেই। ও-হো-হো-হো! আপনার মতো আমারও বহু বহু আঙ্গুল হয়েছিল কিন্তু হিংসুটেদের নজর পড়ে যায়। এই বাঁ হাতেই তো তিন-তিনখানা বুড়ো…, এই দেখুন এখন একটিও অবশিষ্ট নেই। (নারদ বুড়ো আঙুল গোপন করে হাতটা দেখালেন। ঋষিপুত্ররা নারদের নির্লজ্জ আচরণে লজ্জা পেয়ে নিজেরাই চোখ সরিয়ে নিল।) আর টাঙ্গুল যা একখানা ছিল না…

    ব্যাস (খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর ভাষা খুঁজে পেয়ে): আরে দূর! শান্ত হন। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ আমার কাছেই আছে। কারো কাছে রেখে আসিনি। বুঝছেন না? এটা আমাকে অপদস্থ করার জঘন্য প্রচেষ্টা। আমারই বুড়ো আঙুল আমাকে দেখাচ্ছে কোনো পাষণ্ড। উপরন্তু এই পুঁথিগুলো এত সস্তা যে প্রকৃত মহাভারতের ব্যবসা লাটে উঠতে চলেছে। আমাদের বিশ্বাস এর পিছনে কোনো শক্তিশালী মায়াবী পুরুষের হাত আছে। কিন্তু কীভাবে এর প্রতিরোধ হবে তা ভেবে পাচ্ছি না।

    নারদ (অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে): শত শত অবিকল সদৃশ পাণ্ডুলিপি! কী আশ্চর্য! এ তো গণেশেরও অসাধ্য কাজ।

    উপস্থিত শিষ্যমণ্ডলীর মধ্যে একজন এক পাঁজা চৌকো কাগজ এনে প্রথম পর্বের ষোলটি প্রতিলিপি দেখাল। সবকটি যমজ ভাইয়ের মতো অবিকল এক।

    শুক: বিস্তর বাজেয়াপ্ত হয়েছে। বহু পুড়িয়েছি। কিন্তু কিছুই লাভ হয়নি। যাদবগণ হাল ছেড়ে দিয়েছে। কৃষ্ণের কূটবুদ্ধি হার মেনে গেছে। একমাত্র যুধিষ্ঠির এখনো আশাবাদী যে অপরাধী ধরা পড়তে পারে।

    ব্যাস: কিন্তু সে উল্লুক তো দিবাস্বপ্ন দেখে যে একদিন মানুষ গোহত্যা না করেই নিরামিষ উপকরণ দিয়ে সুস্বাদু গোমাংস প্রস্তুত করতে পারবে। সূর্যের কিরণ দিয়ে রান্না হবে। মাটি ফুঁড়ে তেল বেরোবে। জামা-কাপড় কাচবে স্বয়ংচালিত ঘানি।

    নারদ: তাহলে উপায়?

    ব্যাস: আপনিই ভরসা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সংবাদ আদানপ্রদান আপনার নেশা। প্রতিপত্তিশালীদের প্রমোদভবনেও অবাধ গতি। কুৎসা আর কলঙ্কের আপনি একনিষ্ঠ তাপস। কে কাজটা করছে জেনে দিন, বাকি আমি সামলে নেব। একটা কথা মনে রাখবেন, আর কয়েক মাসের মধ্যে যদি অপরাধী ধরা না পড়ে এবং এই চক্রান্ত পণ্ড না হয়, তাহলে ব্যাস এবং ব্যাস তো বিনষ্ট হবেই, উপরন্তু আর কোনো ঋষি কষ্ট করে মহাকাব্য প্রণয়নের চেষ্টা করবেন না।

    নারদ (চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে): অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা। দেখি কী করা যায়। আচ্ছা ব্যাস এবং ব্যাসের দ্বিতীয় ব্যাসটি কে? কোনো লুকোনো ভাইটাই? সত্যবতীজী আপনার পিতাকে একবার মাত্র পার করাননি নদী?

    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন চুক চুক করে ডাকতেই পিছনের উপবন থেকে একটি অতিকায় গিরগিটির মতো সরীসৃপ গুঁড়ি মেরে এগিয়ে এল। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে কুমিরের সমান, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গীতে ক্ষিপ্রতা আছে। দাঁড়ালে কুমিরের চেয়ে একটু উঁচু, গায়ের রং কুচকুচে কালো।

    ব্যাস (সস্নেহে): আমার পোষ্য অনুচর ও দেহরক্ষী। গল্প লেখা ছাড়া আমি যা পারি এই অনুচরটিও অনায়াসে করে দেয়।

    নারদ (ভড়কে গিয়ে): এই বিচিত্র জন্তুটি কোত্থেকে এল?

    ব্যাস: জম্বুদ্বীপের মকর। এক ঘা’য়ে মহিষ বধ করে। যোগাসনে নিপুণ। বাবা ব্যাস, নারদ-মামাকে একটা যোগাসন করে দেখাও।

    মকরটি পটাপট শীর্ষাসন, ভূজঙ্গাসন ইত্যাদি করে দেখায়। শুক গর্বসহকারে নামগুলো বলে যাচ্ছিলেন। তারপর দ্বিতীয় ব্যাস সুপ্তপবনমুক্তাসনের জন্য প্রস্তুত হলে ব্যাস হঠাৎ চঞ্চল হয়ে তাকে বিরত করেন।

    ব্যাস: থাক, থাক, বাবা। আর দরকার নেই। তো যা বলছিলাম, মহাভারত জনপ্রিয় হবার আগে একটি দেহরক্ষী সরবরাহের দোকান ছিল আমার। সেটা এই মকর চালাত। ও না থাকলে তো আমি ব্যাসার্ধও নই।

    নারদ (মহাশ্চর্য হয়ে): দেহরক্ষীর ব্যবসা? ঋষিপুত্র হয়ে...?

    ব্যাস: হ্যাঃ, এতো কিছুই নয়। কী না করেছি জীবনে? আপনি কি ভুলে গেছেন এককালে কুরুদের অস্ত্রাগারের জন্য যা কেনা হত তাতে আমার দু-আনা বাট্টা থাকত? প্রত্যেকটা ঠিকে ঝি আমি পাঠাতাম। বেজন্মা ধৃতরাষ্ট্র, নিজের ছেলে হলে কী হবে, আমাকে কেটে ঠিকাদারীটা ভীষ্মকে দিয়ে দেয়। ভীষ্মের মৃতুর পর সেটা দ্রৌপদীর বাপের বাড়ির লোকেরা হাতিয়ে নিয়েছে।

    নারদ: কিছু মনে করবেন না, কিন্তু কাজটা তো ক্ষত্রিয়দেরই। আপনি আদৌ পেলেন কী করে ভেবে পাচ্ছি না।

    ব্যাস (হাস্য করে): ক্ষেত্রজ উৎপাদনের ঠিকা যে পায় তার কাছে বাকিগুলো কঠিন কীসের? তাছাড়া মুনিবর, ভুলে যাবেন না যে আমার মাতৃকুল ধীবরের বংশ। ছেলেবেলা আমি তাগড়া তাগড়া জেলের ছেলেদের সঙ্গে খেলা করে বড় হয়েছি। ক্ষত্রিয়রা মুখে যতই আস্ফালন করুক, জলে-জঙ্গলে, পথে-বিপথে যেতে হলে আগু-পিছুতে দুটো মুশকো ধীবরসন্তান না থাকলে তারা বেড়ালছানার মতো অসহায় বোধ করে। তো সেইভাবে দু-পয়সা কামিয়েছি কিছুদিন। এখন সে ব্যবসায় এত প্রতিযোগী এসে গেছে, যে আর বিশেষ আয় হয় না। তাই এইসব লেখালিখি ধরতে হয়েছে।

    নারদ: ধন্য, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, ধন্য! এতগুলো ব্যবসা ডুবে যাবার পরেও হাল ছাড়েননি। আশ্রমটি তো আগের চেয়েও মনোরম হয়েছে।

    ব্যাস: হ্যাঁ। আপনার মনে পড়ে আগেকার সেই অহর্নিশ শিয়ালের ডাক…? এখন কান পেতে শুনে দেখুন…।

    নারদ শোনার চেষ্টা করলেন। দূর থেকে যে শব্দগুলো আসছিল তা ভয়াবহ কাশি আর শেষ নিঃশ্বাস ওঠার।

    নারদ: সত্যি, তখন মাঝে মাঝেই শুনতাম ভোররাতে খট্টাশ এসে কোনো তপোজীর্ণ মুনিকে টেনে নিয়ে গেছে। এখন শুধু শুনছি হুঁকোর ভ্রাতৃসঙ্ঘের মতো এক কুড়ি শ্লেষ্মা আর কফযুক্ত ঋষিবক্ষের মধুর ঘড়ঘড় ধ্বনি।

    ব্যাস (উদাত্তকন্ঠে হেসে): তার জন্যে আমার ভোজন-রসিক মকরটিকে ধন্যবাদ দিন। শৃগালদের শেষ প্রহর আগত বলে। ভালো কথা, দক্ষিণ দিকে আশ্রমের জমি আরো বাড়ানো হয়েছে। নিভৃত বাগানবাড়ির জন্য দশ-কাঠা করে কয়েকটি ভূমি রক্ষিত আছে, কেবলমাত্র উচ্চতম কুলীন ক্রেতাদের দেখাচ্ছি। আরে, আরে! ওই দেখুন, বোধহয় একটা শেয়াল কি খট্টাশ দেখেছে।

    ব্যাস এবং ব্যাসের দ্বিতীয় ব্যাস হঠাৎ তার বিরাট দেহ নিয়ে মত্ত হস্তীর মতো আশ্চর্যরকম ক্ষিপ্র গতিতে উপবনের দিকে ধাবিত হয়েছিল। প্রথম ব্যাসও ততোধিক ক্ষিপ্রতায় নারদকে তার পথ থেকে সরিয়ে না দিলে একটা অঘটন ঘটতে পারত। নারদ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলেন। শুকদেব তাড়াতাড়ি একটা ঘটি থেকে খানিকটা জল ঢেলে দিলেন তাঁর মুখে। ইত্যবসরে ব্যাস নারদকে ধরে বেলগাছের মতো ঝাঁকাচ্ছিলেন, যেন তাতে মনের সমস্ত ভয় তুলো হয়ে উড়ে যাবে, কিন্তু ফলস্বরূপ নারদের মুখ থেকে সমস্ত জলটা বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে গেল। নারদ ব্যাসের খপ্পর থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য চটপট মুখে একটা স্বাভাবিক হাসি ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হলেন।

    নারদ: বলুন, বলুন। থেমে গেলেন কেন?

    ব্যাস: আরে অত উতলা হবেন না। জমি পালিয়ে যাচ্ছে না। তো কী বলছিলাম? বাগানবাড়ির জায়গা উচ্চতম কুলীন ছাড়া কাউকে দেখাব না ঠিক করেছি। অর্ধেকের বেশি বিক্রিও হয়ে গেছে। অর্জুনের মণিপুরবাসী শ্বশুর-শাশুড়ি একটা নিয়েছেন…।

    নারদ: মণিপুরবাসী শ্বশুর-শাশুড়ি? তাহলে কুন্তীপুত্র এতদিন ধরে যে মণিপুরে হাজতবাসের গপ্পোটা বলে এসেছে সেটা সত্যি?

    ব্যাস (বিস্মিত): সত্যি না তো কী? নইলে সে বারো বছর কোথায় ছিল?

    নারদ (লজ্জিত হয়ে): মানে আমরা অনেকেই শুনেছি যে সে হিজড়েদের সঙ্গে নাচবে বলে ঘর ছেড়েছিল। তারপর হাঁটুর ব্যথায় যখন সেটা আর পারত না তখন হিজড়েরা বাতিল করে দেয় আর সেও ‘যাই তবে কৌরবদের ধ্বংস করি গিয়ে’ বলে গাণ্ডীব ঘাড়ে করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফিরে আসে।

    ব্যাস: হুম্‌। আচ্ছা, মণিপুরীদের ছাড়ুন। এমনিতেও তাদের অবস্থা ভালো না। (গলা নামিয়ে) চিত্রাঙ্গদার সখিরা মৃগয়ায় গিয়ে দুমদাম তীর ছোঁড়ে তো, তখন বহু মৃগেতর প্রাণীও সংখ্যায় কমে যায়। সব মিলিয়ে ওঁদের রাজত্বে এখন সাকুল্যে শ-দেড়েক লোক, এগারোটা তলোয়ার, আর দুটো পালকি অবশিষ্ট আছে।

    নারদ (তাজ্জব হয়ে গিয়ে): ঠাট্টা করবেন না গুরুজী! এটাও সত্যি নাকি?

    ব্যাস: ঘটনা। অর্জুন শুধুমাত্র প্রতিবিম্ব দেখে লক্ষ্যভেদ করেছে বলে নিজেকে তালেবর ভাবত। মণিপুরে গিয়ে আবিষ্কার করল তাদের প্রতিবিম্বও লাগে না, কারণ সবাই দুচোখ বুজে তীর চালায়। এখন এমন অবস্থা অর্জুনের শাশুড়ি দুঃখ করে লিখেছেন দুটো পালকির একটা মাত্র ডাণ্ডা, যদি আরেকটা পাঠাই তাহলে দুজনেই আসতে পারবেন, নইলে আসা হবে না।

    নারদ: শুনে মনে আঘাত পেলাম। ডাণ্ডাটা পাঠিয়ে দিয়েছেন তো?

    ব্যাস: যথার্থ বলেছেন, মর্মস্পর্শী চিঠি, মহাভারতে উদ্ধৃত করব। ডাণ্ডাও একটা পাঠাতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু শোনা গেল যে ওদের কয়েক হাজার ক্ষ্যাপা গণ্ডার আছে, তাদের গায়ে তীর লাগলে ঠিকরে যায়। সেগুলো নাকি মহারাজের ভীষণ ন্যাওটা। শুকাদিরা বললেন গণ্ডারের দল আবার সঙ্গে না চলে আসে। সব দিক ভেবে তাই টাকাটা নিয়ে ফেললেও আসলে ওঁদের জন্য কোনো বাড়িটাড়ি বানানো হচ্ছে না। লিখে দিয়েছি আমাদের একটাই ডাণ্ডা ছিল। সেটা হাতে নিয়ে এখন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র হাঁটে এবং রাতে গান্ধারী আর সে পালা করে সেটাকে পাহারা দেয়। ফলে তাদের অন্তত একজন না মরলে ওটা পাঠানো মুশকিল।

    নারদ: হুম্‌। ভালোই লিখেছেন। গণ্ডাররা তো তোতাপাখির মতো সুন্দর প্রাণী নয় যে দাঁড়ে বসিয়ে পুষবেন। তাদের পুরো পল্টন এসে পড়লে কুক্কুট ছেড়ে চার বেলা গণ্ডার খেতে হবে, নইলে অতগুলো মাংসের পাহাড় রাখবেন কোথায়? যাহোক, একটা ব্যাপার কিন্তু সাফ হল না। মণিপুরীরা না এলে বাগানবাড়িগুলোতে থাকবে কে?

    ব্যাস: চিন্তা নেই, নৃত্য-গীত-শিল্প ইত্যাদির বিত্তশালী নামজাদারা প্রচুর জমি কিনছেন। অবসর গ্রহণ করার পর অপ্সরা মেনকার বেদান্ত অধ্যয়নে আগ্রহ হয়েছে – সে একটা নিয়েছে। আপনি এই বেলা নিজের জন্য একটা পছন্দ করে রাখবেন নাকি? দাম তো হু-হু করে চড়ে যাচ্ছে।

    নারদ: লোভ খুবই হচ্ছে। কিন্তু বছরটা ভালো যাচ্ছে না বুঝলেন? হাত একেবারে খালি। দেখি, আগামী বছর যদি অবস্থা একটু ফেরে। আচ্ছা চলি তাহলে? (গলা উঁচু করে) বৎস গরুড়, কোথায় গেলে তুমি বাবা?




    || ৩ ||


    ফেরার পথে আকাশযানের আসনে বসবার আগেই গরুড়ের কাছে আরো একটা ঝটকা খেলেন নারদ। এবারেরটা দেহে নয়, মনে।

    গরুড়: একটা দুঃসংবাদ আছে নারদজী। আপনার অনুমানই নির্ভুল ছিল। ইন্দ্রের সেই উপশ্যালকটি দেখছি আমার যানের ভিতর দেহ রেখেছে।

    নারদ (টলে গিয়ে): দেহ রেখেছে? না, না, তা কী করে হয়? সে তো তূরীয় ধামে ছিল।

    গরুড়: তূরীয় ধাম থেকে যমের বাড়ি আর কতদূর পথ? দু-চারটে গলি ছাড়ালেই তাঁর দরজা। দূতগুলোকে তো ওই পাড়ায় হামেশা টহল দিতে দেখা যায়। আচ্ছা, আপনি কি লোকটার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার দেখেছিলেন?

    নারদ (অনেকক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকার পর): অস্বাভাবিক ব্যাপার?

    গরুড়: মাথায় বাড়ি-টাড়ি লাগার লক্ষণ। বমি-বমি ভাব?

    নারদ (এদিক ওদিক তাকিয়ে): মাথায় বাড়ি? উম্‌ম্‌ম্‌ না। সেরকম কিছু তো দেখিনি।

    গরুড় (চিন্তিত মুখে): বেচারার কপাল থেকে গলগলিয়ে রক্ত পড়েছিল। মনে হয় আসার পথে ঝাঁকুনিতে কোথাও ঠুকে গেছে। গা’টাও দেখি কনকনে ঠান্ডা। নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এই নিয়ে আবার একটা ফ্যাচাং না হয়।

    নারদ (শুকনো মুখে): ফ্যাচাং?

    গরুড়: ওই, হত্যাকাণ্ড ভেবে অনুসন্ধান-টন্ধান করে যদি কেউ।

    নারদ: স-র্ব-না-শ! আমাদের সন্দেহ করবে নাকি?

    গরুড়: আপনি বোধহয় শেষ জীবিত দেখেছেন। আর আমি প্রথম মড়াটা আবিষ্কার করি। মাঝখানে কিছু ঘটে গিয়ে থাকলে আমাদের মধ্যে একজনের উপর সন্দেহটা পড়াই স্বাভাবিক।

    নারদ: দুজনের উপরেও পড়তে পারে। একটা কিছু করা উচিত না? তুমিই তো এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ ভাবতাম। ব্যাপারটাকে, একটু ইয়ে করে দাও না?

    গরুড়: ইয়ে মানে?

    নারদ (ফিসফিস করে): ইয়ে মানে বুঝলে না? ধামাচাপা। গুম। হাপিশ। একটু এলোমেলো করে দাও না? ভক্তদের মধ্যে আমার যৎসামান্য নামযশ আছে। সেটা রাখতে হবে না?

    গরুড় (আরো চিন্তিত হয়ে গিয়ে): লাশটা গায়েব করে দিতে বলছেন?

    নারদ: আস্তে বলো। এত বিশদ করারই বা কী আছে? শালা তো নয়, উপশালা। মানে ঠিক লাশও নয়, একটা উপলাশ বলা যায়। ইন্দ্র চেনেনই না। আমাদের সঙ্গে মাতালটাকে কেউ দেখেনি। এখন যদি তাকে আর পাওয়া না যায়, তাহলে কি গায়েব করা হয়েছে বলা উচিত?

    গরুড় (চিন্তা করে): এক্ষেত্রে উপগায়েব বললেই ভালো শোনাচ্ছে।

    নারদ: সাধু, সাধু।

    গরুড় (নারদের কাছে সরে এসে): গুরুজী একটু হাত লাগাতে হবে তাহলে। আপনি কি উপলাশের পাদুটো ধরে টানতে পারবেন?

    নারদ (ক্ষুব্ধ হয়ে): আমি? আমি একটা মড়া ধরে টানব?

    গরুড়: শুধু জঙ্গলের সীমানা অবধি। বাকিটা শিয়ালেরা দেখে নেবে। নিন, এই দড়ি দিয়ে ওর পায়ের বুড়ো আঙুলদুটো বেঁধে ফেলুন। তারপর ফাঁসটা ধরে…।

    নারদ: গরুড় তুমি সত্যিই ভাবছ আমি একটা লম্পট মাতালের পা ধরে টানব?

    গরুড়: জিভ ধরে টানলে কি সুবিধে হবে প্রভু? এ সব জিনিস পা ধরেই টানতে হয়, কোনো দোষ নেই। শাস্ত্রে কী বলেছে? মৃতদেহের জাত থাকে না, অহঙ্কার থাকে না, স্থূল অনুভূতিগুলো লোপ পায়। যদিও চার্বাক বলেছেন মতামত থাকে, পরশ্রীকাতরতা বৃদ্ধিও পায়, কিন্তু সেগুলি প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট স্ফুর্তির বিলয় ঘটে। সমস্যা হল বৃহস্পতি বলেছেন অপঘাতে মরা মানুষের বুকের লোমে গোটা সাতেক গিরগিটি এসে সুড়সুড়ি দিলে সে ডান হাত তুলে আততায়ীকে দেখিয়ে দেয়। আপনি কি চান দেহটা ইন্দ্রের গোয়েন্দাদের হাতে পড়ুক?

    নারদ (তাড়াতাড়ি): না, না। এটাকে তো আমরা সরাবই। কিন্ত ব্যাপারটা অদ্ভুত দেখাচ্ছে না, যে আমি পায়ের বুড়ো আঙুল ধরে একটা লাশ বা উপলাশ টেনে নিয়ে চলেছি আর তুমি এত বড় একটা জোয়ান হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ?

    গরুড়: এইটে আপনার সমস্যা? আরে, আমি হাতে একটা বাটালি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি কেন? চারদিকে নজর রাখবে কে? যদি কেউ এসে পড়ে তাহলে সাক্ষী রেখে দেওয়ার চেয়ে আরেকটা লাশ গায়েব করাই নিয়ম। অবশ্য আপনি যদি বাটালির কাজটা করতে চান তাহলে আমি লাশ টানছি।

    গরুড় বাটালিটা নারদকে ধরাবার চেষ্টা করছিল। নারদ ধাক্কা মেরে তাকে সরিয়ে দিলেন।

    নারদ: থামো! আমি টেনে দিচ্ছি। কোনো কাজের নয় তোমরা।

    শান্তশিষ্ট দেখতে হলে কী হবে, দড়িটা হাতে নিয়ে নারদমুনি বেশ চটপটই পায়ের বুড়ো আঙুলদুটো বেঁধে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেটা ধরে টানতে গিয়ে অভাবনীয় বিপদ। আধ হাত যাওয়ার আগে লাশটা নড়ে উঠেছে। নারদ আঁতকে পিছু হটার সময় হোঁচট খেয়ে পড়লেন।

    গরুড়: হা ভগবান! ব্যাটা বেঁচে আছে নাকি? (ছুটে এসে মড়ার নাড়ি ধরার পর সেও প্রায় ছিটকে যায়)। নাড়ি চলছে অথচ গা একেবারে তুষারের মতো ঠান্ডা!! পুরোদস্তুর ভূতুড়ে ব্যাপার!

    নারদ: এত ঠান্ডা হল কী করে? মানুষের বেশে সাপ নয় তো? বা কোনো যক্ষ?

    গরুড়: গুরুজী, সবাই জানে সাপ আমার খাদ্য। সাপ হলে এই আপদটা আমার ধারে কাছে ঘেঁষত না। এটা বোধহয় বিন্ধ্যপর্বতের মায়াতক্ষক, যার অন্য নাম খোক্কস। শুনেছি তারা রঙের সাথে সাথে চেহারাও পালটাতে পারে। শুধু পাখিদের ভয়ে কোনোদিন উড়তে শেখে না।

    নারদ: সে না হয় হল, কিন্তু বিন্ধ্যপর্বত ছেড়ে এখানে কী করছে হতভাগা?

    গরুড়: আমার মনে হয় আপনাকে অনুসরণ করছে।

    নারদ: আমাকে অনুসরণ? কী যা তা বলছ? দরিদ্র ব্রাহ্মণ আমি। আমার কাছে কী পাবে?

    গরুড়: সংবাদ। বিভিন্ন মহলে আপনার যাতায়াত। এদিকের মাল ওদিকে পাচার করা আপনার কাজ। এর আগেও আমি নানাধরনের গুপ্তচরকে আপনার আশপাশে ছোঁকছোঁক করতে দেখেছি। এ ব্যাটা অবশ্য গুপ্তঘাতকও হতে পারে। হয়তো আপনার মাধ্যমে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কাছে পৌঁছতে চায়।

    নারদ (শিউরে উঠে): বাবা রে! একজন অত্যন্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কাছে তো আজই চলেছি আমরা। কী হবে গরুড়?

    গরুড়: কিছু যদি মনে না করেন তো দুটো ঘটনার দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এক: মাথায় বাড়ি দিয়ে কেউ অর্ধেক কাজ করেই রেখেছে। দুই: আরো কিছুক্ষণ ঘুমোবে জন্তুটা।

    নারদ (মাথা চুলকে): হুম্‌, তুমি বলছ যে অর্ধেকটা কাজ এখনো বাকি। এবং লোকটার হুঁশ নেই।

    গরুড়: তার উপরে প্রাণীটা বোধহয় খোক্কস। অর্থাৎ আমরা আকাশে উড়ে গেলে ও অসহায়।

    নারদ (আশার আলো দেখতে পেয়ে): ও হ্যাঁ, তাই তো। চ্চু-চ্চু-চ্চু। বেচারা যে উড়তে পারে না…।

    গরুড়: গুরুজী, আমি যা ভাবছি যদি আপনিও সেটা ভাবতে পারতেন…।

    নারদ: হতে পারে আমিও সেটাই ভাবছি গরুড়। আশ্চর্যের কিছু নেই। তোমার আর আমার মন যেন এক সুরে বাজছে আজ।

    গরুড়: তাহলে কি আমরা উড়ব প্রভু?

    নারদ: শুভ কাজে বিলম্ব করতে নেই। ওড়ো বন্ধু, ওড়ো! আর শোনো, যানের ভিতরের আলোটা নিভিয়ে দাও না? খোক্কসটা শান্তিতে ঘুমোক। বড় কষ্ট পেয়েছে জীবনে। কী বলো?




    প্রীত হয়ে নারদ ও গরুড় স্ব-স্ব আসন গ্রহণ করলেন। গোঁ গোঁ আর্তনাদ করে গরুড় যানটি আকাশে উড়ল। জানালার বাইরে নীল নভোমণ্ডল। দূরে কয়েকটা মেঘ দেখা যাচ্ছে। পরে যখন আরোহ সম্পূর্ণ তখন যানের ভিতরে ক্রমশ অন্ধকারও হয়ে গিয়েছিল। সেই শ্বাসরুদ্ধ নৈঃশব্দের মধ্যে আসনবন্ধনী খোলার একটি অস্ফুট কিলিকধ্বনি ভেসে এল কি? বাতাবরণ কোনো অজানা অপরাধের সম্ভাবনায় ঘন হয়ে এসেছে। যেন একটা অঘটন ঘটবে এবার।

    একজন ছায়ামূর্তি উঠে দাঁড়িয়েছে। ফিস ফিস করে করে নিশির ডাক শোনা গেল সেই অশুভ অন্ধকারে।

    নিশির ডাক: গ-রু-ড়! গ-রু-ড়!

    সহসা আরেকটি ছায়ামূর্তি চলে এসেছে যানের ভিতর। একটু বিরতি। দুই ছায়ামূর্তি মিলে একটি কাপড়ে জড়ানো ভারী ছায়াদেহ তুলে যানের দরজা পর্যন্ত নিয়ে চলেছে। খুটখাট করে কীসের যেন শব্দ। অকস্মাৎ যানের দরজা দমাস্‌ করে খুলে যায়। বাইরে থেকে হু-হু করে বাতাস ঢুকে পড়ছে। দরজা আর হাতলগুলো ধরে দুই ছায়ামূর্তি তাদের টাল সামলাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। যে কোনো মুহূর্তে তাদের একজন পড়ে যাবে বাইরের নিরালম্ব মহাশূন্যে।

    নাঃ। ছায়ামূর্তিরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের সামলে নিয়েছে। পরে তারা ছায়াদেহটাকে চ্যাংদোলা অবস্থায় এদিক ওদিক দোলাতে দোলাতে একসময়ে ‘এক-দুই-তিন-হুশ্‌’ বলে সেটাকে মেঘের অনেক উপরের নিঃসীম শূন্যতায় নিক্ষেপ করে।


    *****


    এরও খানিকক্ষণ পরে গরুড়যানে যখন আলো আবার জ্বলেছিল, দেখা গেল সব স্বাভাবিক। দরজাটা পুনরায় বন্ধ। নারদ নিজের আসনে বসে ঘুমোবার প্রযত্ন করছিলেন। এইভাবে অর্ধদণ্ড চলার পর টিং টিং শব্দে নারদের চোখ খোলে। কোমর থেকে করতালের মতো একটি যন্ত্র বের করে তার এক দিক কান এবং আরেক দিক মুখের সামনে ধরে একটি শ্লোক উচ্চারণ করেন তিনি। এবার সেই করতাল থেকে একটি পরিচিত কন্ঠস্বর শোনা যায়।

    কন্ঠস্বর: হংহো! কৃষ্ণ যাদব বলছি।

    নারদ: হংহো! আমি নারদ।

    কৃষ্ণ: বলুন তাতশ্রী। কী সমাচার?

    নারদ: তাতশ্রী নয়, হতশ্রী বলো। ব্যাসের আশ্রমে নেমেছিলাম।

    কৃষ্ণ: এবং?

    নারদ: ষোলটা মুদ্রিত পাণ্ডুলিপি বিলক্ষণ দেখলাম। আরো কয়েকশো নাকি ধরা পড়েছে।

    কৃষ্ণ: উত্তম। আবহাওয়া কীরকম?

    নারদ: কবোষ্ণ। যুধিষ্ঠির এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে অপরাধীকে ধরার। তবে ব্যাসকে নিয়েই বেশি ভয়। দেবতাদের সাথে তার বড্ড দহরম-মহরম কিনা।

    কৃষ্ণ: অর্থাৎ?

    নারদ: বদরিকাশ্রমে আমার ডেরা থেকে এসব চোরা-গোপ্তা কাজ করা আর নিরাপদ নয়। এই বেলা মুদ্রণযন্ত্রটিকে সরিয়ে ফেলা প্রয়োজন।

    কৃষ্ণ: আরে, দাঁড়ান, দাঁড়ান! অত ভয় পেলে হয়?

    নারদ: ভয় অনুচিত নয়। ব্যাস আমাকে হঠাৎ ডেকে পাঠালেন কেন? কোনো কূট সঙ্কেত নয় তো?

    কৃষ্ণ: অত কূট শ্লোক পড়বেন না। বায়ু কুপিত হয়ে গেলে পিত্তের সঙ্গে ঘর করতে চাইবে না। বরং মন দিয়ে শুনুন…

    হঠাৎ নেপথ্যে শোঁ-শোঁ ভোঁ-ভোঁ করে আওয়াজ। কৃষ্ণের গলা চাপা পড়ে গেছে তাতে।

    নারদ: হংহো যাদব! হংহো! হংহো! এই যাঃ। কেটে গেল!

    তারপর আর কিছুতেই যোগাযোগটা করা যায়নি। নারদ বাকি পথটা ঘুমোতে পারলেন না। আসনে বসে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় উসখুস করে গেলেন।



    || ৪ ||




    স্থান: বদরিকাশ্রমের একটি চোরাকুঠুরি। কাল: প্রভাত। ঘটাং ঘটাং করে ছাপাখানার আওয়াজ। দূরে একটি কাঠ ও লৌহের যন্ত্রের মধ্যে থেকে লাল অক্ষরে ছাপা হয়ে তাড়া তাড়া চৌকো কাগজ বেরিয়ে আসছিল। নারদকে দেখে যাদব কৃষ্ণ হাসতে হাসতে একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে এগিয়ে এলেন।

    কৃষ্ণ: গরম গরম মহাভারত ছেপে বেরিয়েছে। দেখুন হাতে নিয়ে একখানা!

    নারদ চট করে সরে গেলেন।

    কৃষ্ণ: ও, গন্ধ বলে। প্রথম প্রথম একটা জান্তব গন্ধ বেরোয় বটে। কালিতে যে কী মেশায় কে জানে। কিন্তু কয়েকদিন পরে উড়ে যায়।

    নারদ (মুখ বিকৃত করে): এই নারকীয় আবিষ্কারটা কার বলোতো?

    কৃষ্ণ: গুবগাবদের।

    নারদ: গুবগাব!! সেডা আবার কী? নাম শুনলে মনে হয় আফিংয়ের ডেলা জাতীয় কিছু।

    কৃষ্ণ: গুবগাব হল সমতটের অনার্যদের নাম। সেখানকার মৎস্যভাজা খুবই উপাদেয় হলে কী হবে, মাঠে কুমির কিলবিল করে। তারা নৌবাহিনীও গড়ে তুলেছে শুনলাম।

    নারদ: কুমিররা নৌবাহিনী গড়ে তুলেছে? এ কী অশৈলী কাণ্ড! দরজা ভেঙে কলি এসে গেল নাকি?

    কৃষ্ণ: না, না, দ্বাপরই চলছে। নৌবাহিনী গড়েছে সমতটীরা, মানে যাদের নাম গুবগাব। যন্ত্রটা নাকি তাদের আবিষ্কার। আমি ওই কুমিরদের মাধ্যমে কিনেছি।

    নারদ: এই রে! আবার ভুল করে কুমির এনে ফেললে। যন্ত্রটা ওই গাবগুবদের কাছ থেকে কিনেছ, তাই তো?

    কৃষ্ণ: ওফ্‌ফো! ঠিকই শুনেছিলেন তাতঃ। কুমিররা জাহাজটাহাজ বানাতে পারে না, কিন্তু টাকাকড়ির লেনদেন আর ব্যবসা করতে গেলে তাদেরই বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করাতে হয়। গুবগাবদের আমরা পাব কোথায়?

    নারদ: অ্যাঁ!! সব গুবলেট করে দিচ্ছ হে। এই তো বললে গুবগাবরা সমতটী। সমতটীদের লোকে পায় কোথায়? সমতটে!

    কৃষ্ণ: ও, আপনি জানেন না তার মানে। সমতটীরা একজনও এখন সমতটে থাকে না।

    নারদ: আমার ঘিলুও বোধহয় আর এই দেহে থাকে না বুঝলে? কারণ আমি কিস্‌সু বুঝতে পারছি না। সমতটীরা সমতট ছেড়ে গেল কোথায়?

    কৃষ্ণ: কেউ সেটা জানে না। হয় গুবগাবরা কোথাও লুকিয়ে থাকে, নয় কোনোকালে ছিলই না। যদিও তাদের যশের কীর্তন ভারতের ঘরে ঘরে। সমতটে গেলে শুধু দেখা যায় চারদিকে কুমির আর কুমির।

    নারদের মাথা ঘুরে গিয়েছিল। টলতে টলতে একটা আসন দেখে বসে পড়লেন তিনি। কৃষ্ণ এক পাত্র আসব বা অন্য কোনো পানীয় বাড়িয়ে দিয়েছেন। নারদ যেন আকাশ থেকে কারো একটা অনুমতির জন্য উপরে একবার তাকিয়ে সেটা মেরে দিলেন এক নিঃশ্বাসে। কৃষ্ণ কাপড়ের খুঁট দিয়ে বাতাস করছেন। নারদ দুটো দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ব্যাপারটা আরেকবার তলিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন।

    নারদ: দেখো বাসুদেব, মানুষগুলো যদি না থাকে তাহলে তাদের যশের কীর্তন ঘরে ঘরে হচ্ছে কী বলে? কীর্তি-যশ এসব কি হাওয়া থেকে আসে?

    কৃষ্ণ: গুরুজী, সেগুলো তারা নিজেরাই লিখে প্রচার করে। দুটো বই ওদের, গুব আর গাব। আমরা বলি গুববেদ আর গাববাদ। তাতেই সমস্ত কিছু লেখা আছে। এত প্রকাণ্ড আর শক্ত যে আজকাল পড়ে না কেউ। সত্যি বলতে কি, গুবগাবদের মতো তাদের বইগুলোও পাওয়া যায় না কোথাও। এই গুবগাবদের মারাত্মক দোষ হল যে তারা আমাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তাদের বইদুটোতে লিখেছে যে আর্যাবর্তে গেলে শুধু গরু আর ছাগল দেখতে পাওয়া যায়।

    নারদ: আশ্চর্য! যারা আমাদের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না আমরা তাদের যশোগান করে যাই। আমাদের কি পাগল কুত্তায় কেটেছে?

    কৃষ্ণ (নিজেও এক পাত্র পানীয় নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে): তাতঃ, গুবগাবরা অন্ধ বলে কি আমরাও নিজেদের চোখ গেলে নেব? গুবগাবরা কোথাও না কোথাও আছে বিশ্বাস করি বলেই তো কুমিরগুলোকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে গুবগাবদের তৈরি এই কলটা আনাতে পেরেছি। নইলে তারাই বা গুবগাবদের অস্তিত্বের কথা মানবে কেন? তারাও তো কোনোদিন গুবগাব দেখেনি।

    নারদ (হাল ছেড়ে): কুমিররাও গুবগাব দেখেনি? কী গেরো! আচ্ছা যাহোক, আমি তোমাকে কালিটার কথা জিজ্ঞেস করছিলাম। সেটা কোত্থেকে আনাও?

    কৃষ্ণ: কালি গৌড়ের আবিষ্কার। কুরু পাণ্ডবের যুদ্ধে তারা সৈন্য-সামন্ত পাঠায়নি কিছু। সেই নিয়ে যাদবরা মৃদু ভর্ৎসনা করেছিল। তো উত্তরে পাঁচ জালা লাল কালি পাঠিয়ে দিয়েছে।

    নারদ: লাল কালি? হুম্‌। এর পিছনে কি কোনো উদ্দেশ্য আছে?

    কৃষ্ণ: সেটা জানার জন্য যাদবরা দূত পাঠিয়েছিল। তারা গিয়ে দেখে প্রেরকের ঠিকানা যে গ্রামে সেই পুরো রাজ্যটাই মশার কামড়ে উজাড়। ফলে রহস্য ভেদ হয়নি। তবে আমার ধারণা কালিটা আসলে বলাধানকারী ঔষধ। তিন্তিড়ির চাটনি ভেবে পাচকের স্ত্রী খানিকটা চেটে ফেলেছিল। তারপর এক প্রহরের জন্য তার দেহে মত্ত হস্তীর বল চলে আসে। সে আমার চারটি বাছাই করা দেহরক্ষীকে অকারণে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করে এবং একসঙ্গে চারজনকেই প্রাসাদের পাঁচিলের ওপারে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ভাগ্য ভালো এ জিনিস কৌরবদের হাতে পড়েনি।

    নারদ: তাহলে পুঁথি ছাপিয়ে এই মূল্যবান ওষুধের অপচয় কেন?

    কৃষ্ণ: উপায় নেই। সমতটের যন্ত্রে আর কোনো কালি দিলে জং ধরে যায়। সমস্ত নষ্টের মূলে পিতামহ ব্যাস। প্রতি বছর মহাভারতের একটি করে নতুন পর্ব প্রকাশিত হচ্ছে। কোথায় গিয়ে থামবে তার ঠিকানা নেই। তাই আমাকেও দ্বিগুণ বেগে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ব্যাসদেব তো দেবতাদের বরে অমর। অপেক্ষা করে বসে আছেন কবে পাণ্ডবরা এবং আমার মতো বয়স্ক যাদবরা পঞ্চত্ব পায়, তারপর যা ইচ্ছে ঢোকাবেন। যাহোক, নতুন পর্বে কী আসছে কিছু খবর পেলেন?

    নারদ: কণামাত্র না। পর্ব প্রকাশের আগে ব্যাসদেব অসম্ভব গোপনীয়তা অবলম্বন করছেন। তবে কৌরবরা বিনষ্ট। পাণ্ডব ও পাঞ্চালরা ক্ষমতায়। সত্য ঘটনা প্রকাশে ব্যাসের কোনো বাধা নেই। তোমার কি কোনো গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাবার ভয় আছে?

    কৃষ্ণ (ব্যথিত হয়ে): গোপকন্যাদের সঙ্গে ছেলেবেলা এক্কাদোক্কা খেলতাম। বলরাম পইপই করে বারণও করেছিল – ‘খেলছিস খেল পীতু, বাঁশিটাকে সামলে রাখিস। স্বপ্নেও যেন বাঁশিতে কেউ ফুঁ না দেয়’। কথাটা তখন শুনেও শুনিনি। কী ভুল যে হয়েছে! আমি তো ছিলাম সবচেয়ে ছোট আর রোগা। হৃষ্টপুষ্ট গোপকন্যাদের যখন বলপ্রয়োগের প্রবৃত্তি হত তখন তারা জোর করে বাঁশিটা কেড়ে নিয়ে…

    নারদ: বুঝে গেছি, বুঝে গেছি। থাক আর বলতে হবে না।

    কৃষ্ণ: তো সেই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পঞ্চবটীতলা থেকে কিছু সদ্বংশীয়ের অপাঠ্য পুস্তিকা বেরিয়েছিল। অবাস্তব সব গল্প। দ্বারকায় নিষিদ্ধ। কিন্তু ব্যাসের আশ্রমে নাকি সেগুলোই গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হয়। মহাভারতে ঢুকবে কিনা জানি না, তবে ব্যাস বলে বেড়াচ্ছেন আমি দেহ রাখার পর আমার নামে একটি পুরাণও রচনা হবে। সেই থেকে বিকৃত রসসাহিত্যের লোলুপ ভারতবাসী অধীর অপেক্ষায় আমার মৃত্যুর দিন গুণছে।

    নারদ: অকারণে ভয় পাচ্ছ। ভুলে যেও না ব্যাস তোমার দাদুর মতো। এমনকি সত্যিকারের দাদু হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

    কৃষ্ণ: শুধু আমার কেন, আমার বাবারও দাদু হতে পারেন। যেদিকে তাকাই ব্যাসের গ্রন্থ আর ব্যাসের গুষ্টি। কংসমামার মাঝে-মধ্যে খিঁচুনি হত। তখন মুখটা অবিকল ব্যাসের মতো দেখাত। অর্জুনের সঙ্গেই বা আমার মেজাজ এমন মেলে কী করে? কিন্তু এতে ভয় বাড়ে বই কমে না। চিন্তা করে দেখবেন, নিজের বংশের উপর ব্যাসের আক্রোশ চতুর্গুণ। ধৃতরাষ্ট্রপুত্রেরা কি তাঁর পৌত্র ছিল না? মহাভারতে তাদের নাম অবধি পালটে দেওয়া হয়েছে। সবাই জানে ঘনিষ্ঠদের মধ্যে উনি যুধিষ্ঠিরকে বলেন পরাঙ্মুখ, অর্জুনের নাম দিয়েছেন ঘাঘরাওয়ালি। এখন শুনি বলদরাম বলে ডাকেন কাউকে। সেটা কি আমার নিজের দাদা? ভয়ে ভয়ে থাকি।

    নারদ: অকালকুষ্মাণ্ডদের ছাড়ো। নিজের কথা বলো। তোমার আসল ভয়টা কী?

    কৃষ্ণ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে আসন থেকে উঠে পদচারণা শুরু করলেন। আবহও চঞ্চল হয়ে আসছিল।

    কৃষ্ণ: একথা হয়তো জানেন যে যুদ্ধের প্রথম দিন অর্জুন নিজের হাতে ভাইদের মারতে হবে বলে বড্ড মুষড়ে পড়েছিল। মণিপুরের রাজবাড়িতে মদ আর মৃগমাংস ধ্বংস করে তখন তার উদর যা বৃদ্ধি পেয়েছিল, সাহস আসবে কোত্থেকে? আমাকে দুঃখ করে বলেছে চিত্রাঙ্গদার সখিদের কাছে কুস্তিতে নাকি প্রায়ই ধোলাই খেত।

    নারদ: তাদের সঙ্গে তুমিও এঁটে উঠতে না যাদু। এ কোনো বৃন্দাবনের ঘুঁটেসুন্দরী নয় যে হাত মুচড়ে ছেড়ে দেবে।

    কৃষ্ণ (গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে): কে কার কী মোচড়াত… সে সব পুরোনো কাসুন্দি যাক, সারথি হিসেবে আমার কর্তব্য ছিল অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করা। দূর থেকে ভীমাদিরা স্থুল ও দুর্বোধ্য সব ইঙ্গিত করছিলেন। আমি কি ছাই কোনোদিন ঘোড়া চালানোর কাজ করেছি? অনেক করে বলেছিলাম রথে দুটো গরু যুতে দাও ভাই, গরুরা খুব কথা শোনে, যখন তখন লাফিয়ে ওঠে না। ‘এই দিচ্ছি, এই দিচ্ছি’ বলে সব শালা পালিয়ে যায়। তো কী করি? ভাবলাম দ্রৌপদীর লাঞ্ছনার ঘটনাটা সবিস্তারে পুনরাবৃত্তি করে মধ্যম পাণ্ডবকে উদ্দীপ্ত করা যাক। এমন সময় একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে।

    এই পর্যন্ত বলে কৃষ্ণ নারদের দিকে চাইলেন। নারদের কোনো ভাবান্তর নেই।

    কৃষ্ণ (পদচারণা করতে করতে দুই বাহু নেড়ে নাটকীয়ভাবে): হঠাৎ দেখলাম আকাশটা কালো মেঘে অন্ধকার। হু-হু করে একটা শীতল হাওয়া দিচ্ছে। বিশ্বচরাচর কেমন যেন ভাঙের নেশায় ঝিমিয়ে পড়েছে। ভীমসেন গদা তুলে রথ থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়েও থেবড়ে বসে পড়লেন। কৌরব আর পাণ্ডবদের সমস্ত সৈন্য ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে নাইকুণ্ডলীর মধ্যে থেকে একটা ভূতের মতো নীল আলোকচিত্র বেরিয়ে বড় হতে হতে আকাশ ছেয়ে ফেলল। তারপর সেই ভূতুড়ে আলোকচিত্র আমার গলা নকল করে একটার পর একটা তত্ত্বকথা বলতে শুরু করে।

    কৃষ্ণের নাটকীয়তায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়ে নারদও যেন কোনো ভূতুড়ে আলোকচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে গুরুগম্ভীর আকাশবাণী শুনতে পাচ্ছিলেন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল দুজনেরই।


    ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ
    নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
    অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
    ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।।



    নারদ (সংবিৎ ফিরলে পরে): তত্ত্বকথা! কীরকম বলোতো? তোমার মনে আছে কিছু?

    কৃষ্ণ: বিশেষ কিছুই মনে ছিল না। তবে মহাভারতের ষষ্ঠ পর্বের অংশবিশেষে দেখি সেগুলোই হুবহু লেখা আছে।

    নারদ: অ্যাঁ?

    কৃষ্ণ: দেখাচ্ছি, দাঁড়ান।

    কৃষ্ণ ঘরের লুকোনো প্রকোষ্ঠ থেকে একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি বের করে নারদের হাতে দিলেন। নারদ পাণ্ডুলিপিটি উলটে পালটে দেখছিলেন।

    কৃষ্ণ (একটা পাতা দেখিয়ে): হ্যাঁ, হ্যাঁ। বিশেষ করে ওই জায়গাটা। ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ...। কী মনে হয় তাতঃ, ব্যাস এটা জানলেন কী করে? আমি তো বলিনি। শ্লোকগুলো কার এবং কবেকার লেখা?

    নারদের মুখখানা শুষ্ক বদরিকার মতো চুপসে গিয়েছিল। মুখে কোনো কথা যোগাচ্ছিল না।

    কৃষ্ণ (সগম্ভীর গলায়): আমার গুপ্তচররা ব্যাস এবং ব্যাসকে ভেদ করেছে। ওই পাণ্ডুলিপি লেখা হয়েছিল আমার জন্মের আগে!

    নারদ: তোমার জন্মের আগে?

    কৃষ্ণ: আমার তো ছোঃ, পাণ্ডুরও জন্মের বহু আগে। এতে সেই কথাগুলোই রয়েছে যা যুদ্ধের প্রথম দিন অর্জুনের প্রতি আকাশবাণী হয়েছিল! অথচ বহুকাল আগের কঠ বলে একটা উপনিষদেও দেখবেন প্রায় অবিকল একই মালগাড়ির ডিব্বা ঢুকে বসে আছে।

    নারদ: কী আশ্চর্য! উপনিষদগুলো তো ব্যাসই যখন যা পারেন আনতাবড়ি লিখে বিক্রি করেন। নিজের মাল থেকে নিজে চুরি করছেন কেন?

    কৃষ্ণ: কারণ সেই উপনিষদে যাজ্ঞসেনীর বস্ত্রহরণ ছিল না, ভীমের কীচক বধও ছিল না। না ছিল অবলার অত্যাচার, না গা ছমছমে রোমাঞ্চ। বাচ্চারা ভাবে বুড়োদের জন্য লেখা। বুড়োরা ভাবে শিশুসাহিত্য। কোত্থাও চলেনি। তাই অচল ডিব্বাটাকে খুলে নিয়ে মহাভারত নামের এই রগরগে উপন্যাসে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

    নারদ: কী বলতে চাও একটু ঝেড়ে কাশো তো কৃষ্ণ।

    কৃষ্ণ: ব্যাসের বহুদিন আগের লেখা আকাশ থেকে আমার গলা নকল করে বলল কে? আপনার মনে হয় না পুরো ঘটনাটাই সাজানো? আগে থাকতেই ফন্দি আঁটা? অর্জুন আর আমাকে শ্লেষ্মার ন্যাতার মতো ব্যবহার করার পর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে?

    নারদ: না, না! তার চেয়ে অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলো। ফুস্কুড়ির মামড়ির মতো খুঁটে ফুঁ দিয়ে ওড়ানো হয়েছে বলো। ব্যবহার করা হয়েছে বোলো না। উদ্দেশ্য-প্রণোদিত শোনায়। কে ব্যবহার করবে তোমাদের?

    কৃষ্ণ: সেটাই তো এককোটি স্বর্ণমুদ্রার প্রশ্ন। এর পিছনে যে একটা বিরাট ষড়যন্ত্র রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আচ্ছা, তাতশ্রী, আপনার তো স্বর্গে, মর্ত্যে, অবাধ গতি। আপনার কি মনে হয়, দেবতাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস চলে যাচ্ছে?

    নারদ: অ্যাঁ? তার মানে?

    কৃষ্ণ: মানে এই যে পুষ্পক রথ, ব্রহ্মাস্ত্র, দৈববাণী – এসবের পিছনে যে কোনো ইন্দ্রজাল নেই, শুধুই পদার্থবিদ্যা আর যন্ত্রবিজ্ঞান। এটা কি মানুষ ধরে ফেলছে?

    নারদ: কৃষ্ণ তোমার কি মাথার ব্যামো হল? না কি চুলকুনির ওষুধটা ফুরিয়ে গেছে?

    কৃষ্ণ: আপনাকে যে উড়ন্ত ঢেঁকিটা ওরা দিয়েছে – যেটা মাঝে মাঝেই খারাপ হলে ওরা সারাতে নিয়ে যায়, সেটার ভিতর একটা সামান্য মাধ্যাকর্ষণবিরোধী যন্ত্র আছে তাও ধরতে পারেননি? ব্রহ্মাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে কী? পরমাণু সংগঠন। পাশুপতগুলোতে পরমাণু বিগঠন – তাই ধামাকা একটু কম হয়। লোক অবশ্য দুটোতেই মরে বিস্তর। দৈববাণী কী? লুকোনো নির্ঘোষযন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি একাই অনুসন্ধান করে অনেক রহস্য ভেদ করে ফেলেছি। অন্যরাও কি আর পারছে না?

    নারদ: কুরু পাণ্ডবের যুদ্ধটা শেষ হয়ে যাওয়াতে তোমার হাত একেবারে ফাঁকা। কোথাও কোনো ষড়যন্ত্র নেই, চক্রান্ত করে উলটে দেবে এমন কোনো রাজত্ব নেই। তাই এই সব উদ্ভট্টি চিন্তা ঘুরছে মাথায়। আগে একটা ভালুক টালুক খুঁজে নিয়ে মাসের পর মাস কিলোতে। মনটা হালকা হয়ে যেত। (দীর্ঘশ্বাস মোচন করে) সে দিনগুলো কোথায় চলে গেল।

    কৃষ্ণ: তাতঃ, আপনি প্রসঙ্গ পালটাবার চেষ্টা করবেন না। তাও বলে রাখি, যা শুনেছেন সব ভুল। দুর্জনে রটিয়েছে জাম্ববানকে কিলিয়ে নরম করে আমার সঙ্গে জাম্ববতীর বিবাহে রাজি করাই। নিজের বুদ্ধি লাগিয়ে ভাবুন, শ্বশুরকে কেউ একুশদিন ধরে পেটায়? প্রকৃত ঘটনা অন্যরূপ।

    নারদ: অন্যের ব্যক্তিগত খবরে আমার এমনিতে কোনো রুচি হয় না, কিন্তু তুমি যখন দুঃখ করে বলছ তখন শুনতে আপত্তি নেই।

    কৃষ্ণ: জাম্ববানজী আমাকে দেখে ‘বোসো বাবা, এই এলুম’ বলে পাঁই পাঁই করে একটা মহুয়ার গাছে উঠে যান। দণ্ডখানেক বাদে নেশার ঘোরে প্রায় চল্লিশ হাত উচ্চতা থেকে ধপাস। একুশ দিন পর মহাত্মার নেশা যখন কাটে তখন আমি জাম্ববতীকে লঙ্কাবাটা দিয়ে কচুর ঘন্ট বানানো শেখাচ্ছি, বেচারি সারাজীবনে একটা ভালো রান্না খায়নি।

    নারদ: আর স্যমন্তক মণি? সেটাও মিথ্যে?

    কৃষ্ণ: মণি না ছাই! জাম্ববতীর কাছেই ছিল। একেবারে শস্তা ঘষা-কাঁচের গুলি একটা। জাম্ববতী গর্ব করে বলল – বাবা রেকেচেন আমার বিয়ের যৌতুক হিসেবে। তখন বুঝলাম কেন তার বিয়েটা হচ্ছে না। আমি তাকে বললাম – হে সুন্দরী, এই ধূসর ঢেলাটা ছোট ভাইকে গছিয়ে তার ছটা নতুন কাঁচের গুলি হাতিয়ে নাও না কেন? এই কাজটা যদি পারো তো নিজগুণেই বিয়ে হবে তোমার। পরে সত্রাজিতের হাতে সেই ছটা নতুন কাঁচের গুলি দিয়ে বলি – দ্যাখো তো সেয়ানা, তোমার স্যমন্তকটা চিনে নিতে পারো কিনা। আর কী? গুলিগুলো দেখে লোভে তার চোখ চকচক করে ওঠে।

    নারদ: বলো কী? কাঁচের গুলি নিয়ে নিল সে একটা?

    কৃষ্ণ: একটা? সে গম্ভীর ভাবে বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না দাদা। মকর সংক্রান্তি হলে খপ করে ধরে ফেলতাম, ঝিলিক মারে তো সেদিন। আপনি ছটাই রেখে যান বরং। সময় করে চিনে নেব। (হাত নাড়িয়ে) ছাড়ুন সেই হাঘরের কথা। আপনার চালাকিতে প্রসঙ্গ ভুলে যাব না আমি। আলোচনা হচ্ছিল দেবতাদের ভাঁওতাবাজি নিয়ে। শুনুন গুরুদেব, তাদের কারচুপিগুলো আমি একা নয়, অনেকেই ধরে ফেলেছে। আচ্ছা, আপনি কি অবগত আছেন, হিমালয়ের কিছু কিছু অঞ্চলে ঈশ্বরে মানে না? মিশরে কারা যেন একেশ্বরবাদী হয়েছে, তাদের ঈশ্বরের কোনো অবয়ব নেই।

    নারদ: আবার খুলেছ গাঁজার পেটি? কানে আঙুল দিচ্ছি আমি। আরে বাবা, তেত্রিশ কোটি জলজ্যান্ত দেবতা, আর তাদের পঁয়ত্রিশ কোটি দুর্বল ও ক্ষুদ্রকায় ইতর পশুপাখির বাহন থাকতে...

    কৃষ্ণ: যারা আর কিছুই না, গ্রহান্তরের মানুষ...

    নারদ: কিন্তু অমর!

    কৃষ্ণ: ছোঃ! ওষধি খেয়ে জরার হাত থেকে সাময়িক ত্রাণ পেয়েছে। তাই বলে কি সত্যি অমর? ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দিলে আবার ফিরে আসবে? তাছাড়া এই বিশ্বে অমর কিছু হয় না। এই যে সূর্য দেখছেন, আমার এক পারিষদ অঙ্ক কষে দেখেছে যে এর পাকস্থলীতে কেবল পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে। একদিন সেই চুল্লিও নিভে যাবে। তখন ইন্দ্রজালের দোকান বন্ধ!

    নারদ (ক্ষেপে গিয়ে দাড়ি নাড়াতে নাড়াতে): পাগলের প্রলাপের মতো শোনাচ্ছে না? এরপর তুমি বলবে চন্দ্র একটা উপগ্রহ যা পৃথিবীর চারদিকে পাক দেয় আর রাহু-কেতু শুধু মানুষের কল্পনা।

    কৃষ্ণ (সহাস্যে): ধরেই ফেলেছেন তাহলে! বাকিটাও বলে দিন না – আমার কাছে আর গোপন কী?

    নারদ (ফ্যাকাসে হয়ে গিয়ে): গ্রহণ হল পৃথিবীর ছায়া...

    কৃষ্ণ: একেবারে লক্ষ্যভেদ! দুধ জমে দই হয় কারণ...

    নারদ: একধরনের জীবাণু তাতে তন্তুজাল বোনে...

    কৃষ্ণ: চমৎকার! আকাশের রং নীল কেন?

    নারদ (আতঙ্কিত হয়ে): নীল আলোর বিচ্ছুরণ হয় বেশি, লাল আলোর সবচেয়ে কম, কারণ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য...

    নারদ আর সহ্য করতে না পেরে দুহাতে মুখ ঢেকে হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেললেন।

    কৃষ্ণ: সব জেনেও এতদিন নিজেকে ঠকিয়েছেন তাতঃ। কানে আঙুল, চোখে ঠুলি। বড় দুর্বল আপনার আত্মবিশ্বাস। সামান্য অঙ্কের ব্যাপার – আমি গরু চরিয়ে যেটা পারি সেটা আপনার মতো পণ্ডিতের পক্ষে তো জলভাত! দেবতাদের সর্দি কেন হয় জানেন?

    নারদ: কারণ ওই অর্ধজড় জীবাণুর প্রতিষেধ ওরা বার করতে পারেনি।

    কৃষ্ণ: কেন তবে এই অমরত্বের ব্যাপক ভণ্ডামি?

    নারদ (কাঁদতে কাঁদতে): কারণ ওরা আমাদের উপর অনুসন্ধান চালাতে চায় – নিজেদের প্রতি পালটা অনুসন্ধানের সুযোগ না দিয়ে। যতদিন না ওদের কাজ ফুরোচ্ছে ততদিন বিশ্বাসের ঠুলি পরিয়ে আমাদের অন্ধ করে রাখবে। ও হো হো হো হো – একটা তড়িৎচৌম্বকীয় করতাল আর একটা মাধ্যাকর্ষণবিরোধী ঢেঁকি দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করে রেখেছে।

    কৃষ্ণ (হতাশ ও বিরক্ত হয়ে): মাত্র এই দুটো জিনিস আদায় করতে পেরেছেন?

    নারদ (আরো মুষলধারায় অশ্রুবর্ষণ ও পর্যাপ্ত গড়িমসি করে): আর কিছু গর্ভনিরোধক বড়ি। বিশ্বাস করো, নিজের জন্য নয়। ভক্তদের দিতে হয়।

    কৃষ্ণ: ওই বড়ির প্রসঙ্গটা বাদ দিয়ে, বন্ধ মুখ এবার খুলতে হবে প্রভু। অশ্রু মুছুন। সোজা হয়ে দাঁড়ান।

    নারদ আসন পরিত্যাগ করে সত্যিই সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং চেটোর পিছনদিক দিয়ে চোখ মুছে ফেললেন।

    নারদ: কী করব বলে দাও বৎস।

    কৃষ্ণ: শুনুন তাতঃ, মুষ্টিমেয় যে কটি মানুষের সহযোগিতায় দেবতারা পুরো পৃথিবীটাকে চালাচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন পিতামহ ব্যাস। ওনার দেহকোষে ওষধি আর রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে কিছুটা আয়ুবৃদ্ধি হয়েছে কিন্তু দুর্গন্ধ বেড়ে গেছে অনেকগুণ। অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোও বহুবার শল্যচিকিৎসা করে পালটানো। গুপ্তচররা বলে ভোঁদড়ের হৃৎপিণ্ড, গোসাপের যকৃত। তাই ওরকম বেঢপ দেখায়। ষণ্ডের সেই অংশটি নাকি আছে যার জন্য বিশেষ কিছু কাজে ক্ষত্রিয়দের যুবাপুরুষরাও তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না। একটা জম্বুদ্বীপের মকর ঘুরে বেড়ায় আশ্রমে, সেটা কি দেখেছেন? জন্মের সময় তাদের শরীরে আটটা অণ্ডকোষ থাকে। এই নমুনাটির আছে মাত্র দুটো। বাকিগুলো গেল কোথায়?

    নারদ: ক্‌-ক্‌-ক্‌-ক্‌-কী বলছ চ-চ-চ-চক্রপাণি? এ কী অত্যাচার! মানুষের দেহ তো নয়, যেন একটা আমিষ বাজারের থলে!

    কৃষ্ণ: অত্যাচার তো বটেই। শরীরে এবং মনে। বেচারার ধারণা হয়ে গেছে উনি অমর। আসলে এসব ওষধির মেয়াদও একদিন ফুরোবে। তার আগে ওঁকে দিয়ে ভারতবর্ষের একটা বিকৃত ইতিহাস লিখিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার সব মিথ্যে।

    কৃষ্ণের উদ্দীপনা থেকে একটা শক্তি বিকীরণ হচ্ছে। নারদ সেই উত্তাপে নিজেকে সেঁকে নেবার পর খানিকটা চাঙ্গা বোধ করছিলেন।

    নারদ: কিন্তু এ যাবৎ মহাভারত যতটা বেরিয়েছে তা মোটামুটি নিমসত্যিই বলা যায়। একটু অতিরঞ্জন আছে, বিশেষ করে ভীমকে পাতালে পাঠিয়ে দেবার ঘটনাটা। আর বস্ত্রহরণের সভায় তুমি ছিলেই না যেকালে সেখানে তোমাকে পুরো কৃতিত্ব দেওয়াটা বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।

    কৃষ্ণ: তাহলে সেদিন আসলে কী হয়েছিল এইখানে বসে খোলাখুলি বলুন তো! কেউ সত্যি কথাটা ফাঁস করতে চায় না। আমি যা শুনেছি তা বিশ্বাস করি না।

    কৃষ্ণ আবার কোনো একটা পানীয় নিয়ে জাঁকিয়ে বসেছেন। নারদও একটা পাত্র গ্রহণ করে আসন নিলেন মুখোমুখি।

    নারদ: শোনো তাহলে। কারো মুখ আছে নাকি বলার? সে এক কেলোর কীর্তি। যুধিষ্ঠির তো যথারীতি পণ্ডিতমশায়ের ছপটির ভয়ে মাথা নিচু করে টোলের সুবোধ বালকের মতো বসে। তার দেখাদেখি অন্য পাণ্ডবরাও রা কাড়ছে না। কিন্তু দ্রুপদ কোনোদিন এই অপোগণ্ডদের ভরসায় থাকেননি। তাঁর পাঠানো ডজনখানেক গাঁট্টাগোট্টা চর সেখানে উপস্থিত ছিল। তারা সবার ধুতিতে জতুচূর আর তিলের তেল ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়।

    কৃষ্ণ (প্রায় বিষম খেতে খেতে হাতের পিছন দিকে দিয়ে ঠোঁট মুছে): ফাটাফাটি! তারপর?

    নারদ: তারপর? প্রাণ বাঁচাবার জন্য মরিয়া হয়ে একজন আরেকজনের কাপড় খুলে দিচ্ছে। দেখতে দেখতে সবাই বাঁদরছানার মতো দিগম্বর। বৃকোদর তো নামেই। আসলে চর্বি জমে জমে যেমন বিরাট তাদের বপু তেমনই বিপুল পশ্চাদ্‌দেশ। সে দৃশ্য শুনি সুবিধের হয়নি। নিজেদের চেহারা দেখে লজ্জায় নিজেরাই চোখ বুজে ফেলে নাকি। শুনেছি ক্ষত্রাণী দ্রৌপদী জীবনের পরোয়া না করে স্বামীদের বাঁচাবার পর কৌরবদেরও যতগুলোকে পারে বস্ত্রবিয়োগ করতে সাহায্য করেছিল। তারপর সে কখন জিভ কেটে সরে পড়েছে কেউ জানতেও পারেনি।

    কৃষ্ণ: দুর্দান্ত ব্যাপার তো!! ব্যাস এটা লিখলেন না কেন? কেউ জানায়নি বুঝি?

    নারদ: ব্যাসদেব ঘটনাটা শোনেননি হতে পারে না। তবে পাণ্ডব-কৌরব কেউ চায়নি তিনি সব সত্যি লিখুন। একটু আধটু তো বানাতেই হয়। বাল্মিকীর কাব্যে রাবণের দশটা মুণ্ডু, কুড়িটা হাত। হনুমান অবলীলায় গন্ধমাদন তুলে নিচ্ছে। অথচ রাক্ষসরা তাকে যখন ঠেসে ধরে লেজ মুচড়ে দিচ্ছিল তখন সে অসহায় বালকের মতো ছটফট করে গেল। ব্যাস অতদূর যাননি। তিনি পাঠকদের ঘেন্নার কথা ভেবে ওই চর্বির পাহাড়দের খোলামেলা হওয়ার দৃশ্যটা কেটে তার বদলে একটা রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিলেন।

    কৃষ্ণ: রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা? মানে, কে আগে বস্ত্রহরণ করতে পারে এই নিয়ে কৌরবদের মধ্যে কাড়াকাড়ি?

    নারদ: না, না। কৌরবদের সঙ্গে তোমার প্রতিযোগিতা। একদিকে তারা প্রাণপণে কাপড়ের লাটাই গোটাচ্ছে তো অন্যদিকে তুমি পাইকারদের মতো লাটাই ছাড়ছ। মাঝখানে ছিপছিপে পাঞ্চালী বাঁই বাঁই করে ডালের কাঁটার মতো ঘুরে চলেছে। মানতে হবে বুড়োর কল্পনাশক্তির জোর। কারো অজ্ঞাত নয় যে ভারতবর্ষের জনগণের মধ্যে মহাভারতের ওই খণ্ডটার দ্বিগুণ চাহিদা। ব্যাসের কাছে অনুযোগ করতে গেলে উনি দাঁত বের করে বলেন ‘বস্ত্রহরণের বিক্রী থেকেই তো আশ্রমের ঋষিকন্যাদের বল্কল ছাড়িয়ে খদ্দর কিনে দিয়েছি’।

    এতটা বলার পর নারদেরও চারটে দাঁত বেরিয়ে এসেছিল। কৃষ্ণের অপ্রসন্ন মুখ দেখে সেগুলো চটপট স্বস্থানে ফিরল।

    কৃষ্ণ (ক্ষুব্ধ হয়ে): তামাশা নয় জেঠু, এটা একটা গুরুতর অপরাধ। কৃষ্ণা আর আমাকে একত্রে কীরকম শোষণ করা হয়েছে বুঝতে পারছেন না? তাও এসব ছোট মিথ্যে। বড় মিথ্যে হল যন্ত্রবিজ্ঞানকে মায়া বলে চালানো। পাঠককে কুসংস্কারে প্রবৃত্ত করা। জঘন্যতম মিথ্যে হল মামুলী ঘটনার অলৌকিক ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে অবতার বানানো। আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি ওরা আমাকে বিষ্ণুর অবতার সাজাবার ছক কষে রেখেছে।

    নারদ: বলো কী? যাত্রায় নাচাবে নাকি? অর্জুনকে বলল না কেন? সে কবে থেকে চুল-টুল বেঁধে তৈরি।

    কৃষ্ণ: যাত্রাই বটে। মানুষের অন্ধ বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছুদিন অন্তর পৃথিবীতে একটা নতুন অবতারের নাটক অভিনয় করতে হয়। এবার আমার নাম ব্যবহার করে সাত পুরুষ ধরে লুটপাট চালানো হবে। খেয়াল করবেন যুদ্ধের সময় নিরস্ত্র হয়েও পুরোভাগে ছিলাম। ভীতু বলতে পারবে না কেউ। রাজকার্যও ভালোই চালাই। শিশুপাল, জরাসন্ধ প্রভৃতি দুষ্ট রাজাদের যমালয়ে পাঠিয়েছি। ভারতবর্ষে বলতে গেলে এখন আমিই সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্ষত্রিয়। অবতারত্বের কী প্রয়োজন আমার? উলটে কৃষ্ণের লোকপ্রিয়তাকেই ওরা ভাঙাবে। ঠিক যেমনভাবে ত্রেতায় রামচন্দ্রকে ভাঙিয়ে খেয়েছে। সেই জন্য আমার প্রতি মানুষের যেটুকু আন্তরিক ভালোবাসা আছে সেটাকে এই দ্বাপরে বিষ্ণুভক্তির বিকৃত রূপ দেওয়া হচ্ছে।

    নারদ: তাহলে উপায়?

    কৃষ্ণ: উপায় এই পোকযন্ত্র!

    নারদ: পোকযন্ত্র?

    কৃষ্ণ: গৌড়ের লোকেরা কোনো কারণে এটাকে পোকযন্ত্র বলে। যন্ত্রটা চালালে অক্ষরগুলো পাতার উপর পোকার মতো গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসে বলে বোধহয় এই নাম। যাহোক, এতে আমি মিথ্যে গল্পের বদলে সত্যিকারের ইতিহাস ছাপাব। ভারতের প্রকৃত ইতিহাস পড়বে লোকে। এর মধ্যে কোনো ইন্দ্রজাল নেই, অতিশয়োক্তি নেই। একশো’কে এক অক্ষৌহিনী বানাইনি। অনার্যদের রাক্ষস বলা হয়নি, সু্যোধনের নাম পালটে দিইনি। দিনক্ষণের সঠিক উল্লেখ থাকছে। গাড়ল গীতা বলে একটা চাঞ্চল্যকর পর্ব লিখছি যাতে দেবতাদের সমূহ কুকীর্তি ফাসঁ করে দেখিয়ে দেব যে তারা এতদিন মানুষকে কীভাবে বোকা বানিয়েছে।

    নারদ: সাধু, সাধু!

    কৃষ্ণ: শুধু কি তাই? ওরা যতদিনে একটা পুঁথি নকল করে বার করে ততদিনে পোকযন্ত্রে আমি একশো বই ছাপিয়ে ফেলি, এবং নামমাত্র মূল্যে বিলিয়ে দিই। এই লাল কালির বন্যায় ভারতবর্ষকে ভাসিয়ে দিতে হবে। ব্যাস এবং ব্যাসের কথা কেউ জানতেও পারবে না। এই দেখুন একবার চাকা ঘোরালেই কেমন একসঙ্গে বত্রিশটা পৃষ্ঠা বেরিয়ে আসে।

    কৃষ্ণ ছাপাই যন্ত্রের চাকা ঘোরাতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় দড়াম করে দরজা খুলে দুটি শীর্ণকায় মূর্তি প্রবেশ করল। তাদের গায়ে চামড়ার সঙ্গে সেঁটে থাকা কালো পোষাক। চোখে কালো স্ফটিকের আচ্ছাদন। পরবর্তী যুগের লোকেরা দেখলে বলত – কোট-প্যান্টালুন আর সানগ্লাস।

    কৃষ্ণ: সর্বনাশ! দেবতারা এখানে এল কী করে?

    নারদ (আর্তনাদ করে): গরুড় ঠিক বলেছিল!! আমার পিছনে গুপ্তচর…

    নারদের বাক্য সম্পূর্ণ হয়নি। কৃষ্ণ হুঙ্কার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেই আক্রমণও সফল হল না। আগন্তুকদের একজন কৃষ্ণ আর নারদের দিকে তাক করে একটা ছোট শলাকার মতো অস্ত্র চালিয়ে দিয়েছিল। এক ঝলক আলোর স্পর্শে দুজন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

    দেবতারা একজন আরেকজনের দিকে চাইল।

    প্রথম দেবতা: ইস্কুবিস্কুর আলো কি বেশি হয়ে গেল কালোবাবু? স্মৃতিভ্রংশ হবে না তো?

    দ্বিতীয় দেবতা: হলে হোক, সাদাবাবু। গত দুবছরের সব স্মৃতি তো মুছে দেওয়াই চাই।

    নারদ এই গলার স্বর শুনলে বুঝতেন দ্বিতীয় দেবতা আর কেউ নয়, ইন্দ্রের সেই তথাকথিত শ্যালক যে গরুড়যানে তাঁর সঙ্গে দুবার যাতায়াত করেছিল।

    প্রথম দেবতা: আর এই পুঁথি? ছাপার কল?

    দ্বিতীয় দেবতা: পুঁথিগুলো পুড়িয়ে ফেলা যাক। কলটা তুলে নাও। গেঁড়ে ঋষি আর ধেড়ে কেষ্টকে আমি তুলছি। ওদের সুস্থ হতে এক পক্ষ লাগবে। ব্যাসের আড্ডায় থাকুক পড়ে, কাকপক্ষীতে টের পাবে না। গেঁড়ে আমার মাথায় নির্দয়ভাবে ডাণ্ডা মেরেছিল। তারপর গুণ্ডা গরুড়টার সঙ্গে ষড় করে পঁয়তিরিশ হাজার হাত উচ্চতায় আকাশযান থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

    প্রথম দেবতা: কী সাঙ্ঘাতিক! হাড়গোড়গুলো আস্ত আছে কী করে?

    দ্বিতীয় দেবতা: ভাগ্য ভালো সোজা একটা মাদী জলহস্তীর হাঁ করা মুখে গিয়ে পড়ি। সে আমাকে দুধ-টুধ খাইয়ে সুস্থ করে তবে ছেড়েছে। এই বদের বাসাটাকে পিছমোড়া করে ছালায় পুরে নিয়ে গেলেও উপযুক্ত শাস্তি হবে না।

    প্রথম দেবতা: ব্যাসকে কী বলা হবে?

    দ্বিতীয় দেবতা: কেন? বাঁধা গল্প! রাক্ষসেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের গাঁট্টায় বাপের নাম খগেন হয়ে গেছে।

    নারদ আর কৃষ্ণ ভূমিতে মূর্ছিত হয়ে পড়ে রইলেন আর দুই দেবতা একে অপরের পিঠ চাপড়ে উজবুকের মতো হ-হ করে হাসতে থাকল।



    || ৫ ||


    স্থান: ব্যাসের আশ্রম। কাল: পরের দিন সন্ধ্যা।

    একটি আকাশযানে দেবতারা নামছে। উপর থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছিল – যা আসলে আলোর ঘন চলচ্চিত্র বই আর কিছু নয়। ব্যাস, শুক ইত্যাদিরা দাঁড়িয়েছিলেন। দেবতাদের একজন ছাপার কলটা মাটিতে নামিয়ে দিল।

    প্রথম দেবতা: এই সেই মায়াবী রাক্ষস-যন্ত্র। নারদ আর বাসুদেব এটাকে রাক্ষসদের আড্ডা থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে তাদের হাতে ধরা পড়ে যান। ব্যাসদেব, আপনি এটার যা ভালো ব্যবস্থা বোঝেন করুন।

    শুক: শুনলাম রাক্ষসগুলো নারদ আর কৃষ্ণকে বধ করতে চেয়েছিল? তাদের কী হল?

    দ্বিতীয় দেবতা: দুর্বৃত্তগুলো অক্কা পেয়েছে। যাদব-কৃষ্ণ আর নারদের সঙ্গে ডাণ্ডা-ফাণ্ডা নিয়ে বহুক্ষণ যুঝেছিল অবশ্য। ফলে তাঁরাও মস্তিষ্কে চোট পেয়ে একটু চুপচাপ হয়ে গেছেন। ভাগ্যিস আমরা গলির মোড়ে একটা পান-সুপারির দোকান পেয়ে থেমেছিলাম।

    শুক: দোকানদার অপহরণের খবরটা দিল বুঝি?

    প্রথম দেবতা: আরে না। দেখলাম আধখানা পান আর একটা মাত্র সুপারি অবশিষ্ট তাদের। দোকানি সুপারিটাকে পান দিয়ে মুড়ে তার সঙ্গে একগোছা টাকা হাতে গুঁজে বলল ‘গলিতে রাক্ষস ঢুকে বসে আছে, যাওয়ার আগে সেগুলোকে নিকেশ করে যাও, নইলে এটাও পাবে না’। অগত্যা কাজটা করতে গিয়ে দেখি ছাল ছাড়াবার জন্য এই দুই বীরকে রান্নার থলে থেকে বার করে ধোওয়া হচ্ছে। হলুদ আর জিরেবাটা তৈরি। সেই কারণে এঁদের গায়ে একটু মশলার গন্ধ এখনো পাবেন। ভাগ্যিস নারদের সর্বাঙ্গে প্রচণ্ড ময়লা ছিল! বেচারারা তো ধুয়ে ধুয়ে নাজেহাল। সেই ফাঁকে আমরা গিয়ে হাজির হই।

    শুক: কী সর্বনাশ! তারপর?

    প্রথম দেবতা: চুপিসাড়ে রান্নাঘরের তাক থেকে দুটো প্রকাণ্ড দা অস্ত্র হিসেবে তুলতে গিয়েছিলাম। কপাল মন্দ। ধরা পড়ে যাই। ওরা অবশ্য আমাদের চিনতে না পেরে বলেছিল – আরে ভোঁদুমল, ওগুলোতে ধার নেই। আমাদেরটা নাও। তারপর আমাদের হাতে দুটো আরো প্রকাণ্ড আর ধারালো দা ধরিয়ে দিয়ে বলে – ঠিক সময়ে এসে পড়েছ হে। এবার এই ফড়িং দুটোকে চটপট কুটে দাও দেখি। সেই ফাঁকে আমরা একটু ধোঁয়া ফুঁকে আসি।

    শুক: বাপরে, বাপ! অকল্পনীয় সব ঘটনা! গল্পকে হার মানায়।

    প্রথম দেবতা (শুকের মন্তব্যে প্রচুর আমোদিত হয়ে): আশ্চর্য! সত্যিই আগাগোড়া গল্পের মতো। আপনি বলার পর বুঝতে পারছি। যা হোক, সব ভালো যার শেষ ভালো। নারদমুনি আর বাসুদেবকে আপনাদের কাছে নামিয়ে দিয়ে যাই। কিছুদিন এখানেই দেখভাল হোক। নিরামিষ ভিন্ন কিছু দেবেন না। মাঝে মাঝে যোগাভ্যাস করাবেন। আত্মপরিচয় এবং নিজের কীর্তির কথা স্মরণ করতে না পারলে সকাল বিকেল মহাভারত পাঠ করে শোনানো অতি আবশ্যক। আশা করি কিছুদিনের মধ্যেই দুজনের স্মৃতি ফিরে আসবে।

    ব্যাস: ভারি চিন্তার কথা। মুষলপর্ব অবধি মাথাটা বাঁচিয়ে রাখা যাবে তো?

    দ্বিতীয় দেবতা: মাথা মুড়িয়ে প্রত্যহ ঘোল ঢালাতে থাকুন, এ যাত্রা দুজনেই বেঁচে যাবেন। এবার চলি আমরা। সমতটে আরো কিছু রাক্ষস বধ করা বাকি – তারাই এই বদ-যন্ত্রের যোগানদার এবং সমস্ত নষ্টের গোড়া। ঋষিগণ আপনাদের জয় হোক।

    এই বলে দুটি ঘুমন্ত পুরুষকে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে দেবতাদের প্রস্থান। মকর ব্যাস এসে মানুষ দুটির মুখ চাটতে শুরু করেছিল।


    *****


    ব্যাস (উদ্বিগ্ন ভাবে): বাবা গোবর্ধন! তুমি বেঁচে আছো তো?

    কৃষ্ণ (জড়ানো গলায়): মামাজী, আপ ইয়াহাঁ?

    ব্যাস: হা ভগবান!

    নারদ (হঠাৎ ধড়মড় করে ওঠার পর ব্যাসকে দেখিয়ে): কংসমামা নাকি? বাসুদেব, তুমি এঁকে ঠিক চিনেছ?

    কৃষ্ণ (মুগ্ধের মতো ব্যাসের মুখ থাবড়ে): আলবাৎ! সেই মুখ, সেই অশ্বতরের মতো কান, সেই যাদবদের মারে ছিরকুটে যাওয়া দন্তপঙ্‌ক্তি! অঙ্গসৌরভও অটুট। কেবল বয়েসের জন্য একটা চোখ দেখছি ছানিতে শাদা হয়ে গেছে। আর কপালের উপর আঁবটা নতুন। দেখি কানের ভিতরটা দেখি…!

    ব্যাস: ছাড়, ছাড়!! (কৃষ্ণের হাত ছাড়াবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলেন)।

    নারদ (ব্যাসের পা আঁকড়ে ধরে): অহো কী সৌভাগ্য, চক্ষু সার্থক হল! দিন, পদধূলি দিন কংসবীর। বর্বরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। পাষণ্ডদের রাজাধিরাজ। বাচ্চারা রাতে ঘুমোতে না পারলে এখনো মায়েরা বলে – ঘুমিয়ে পড় খোকা, নইলে কংস-মামা এসে তোর বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে।

    শুক (ব্যাসকে নারদ-কৃষ্ণের কবল থেকে মুক্ত করে একান্তে টেনে নিয়ে গিয়ে): আপনাকে চিনে ফেলেছে, তাই না? আমিও সন্দেহ করেছিলাম।

    ব্যাস: আরে দূর হতভাগা! রাক্ষসের মারে এদের ঘিলু গুবলে গেছে।

    ব্যাস (কৃষ্ণের কাছে ফিরে এসে): বাসুদেব, শান্ত হয়ে উঠে একটু জল-টল খাও। কংসরাজ বহুকাল আগে তোমার পুণ্যহাতে পঞ্চত্ব পেয়ে অক্ষয় স্বর্গলাভ করেছেন। এখন তুমিই দ্বারকার রাজা।

    কৃষ্ণ (কাঁদতে কাঁদতে): অ্যাঁ! মামা নেই? মুদ্‌গরের প্রহারের মতো এ কী সংবাদ দিলেন? মাথাটা আমার ঝিম ঝিম করে উঠল!

    ব্যাস: সে তো করবেই। রাক্ষসের সঙ্গে একা লড়তে গিয়েছিলে কিনা। পই পই করে তোমাদের বলেছিলাম যে আর্য বীরদের সারাক্ষণ দুটো ধীবর কি শবর দেহরক্ষী রাখতে হয়। যাহোক, তুমি কার্য উদ্ধারে সফল হয়েছ। যে মায়াবী রাক্ষসটি আমার মহাভারত ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিল, সেটি নাকি তোমার হাতে বিনষ্ট হয়েছে।

    হাতে মোটা পুঁথি নিয়ে মেনকার প্রবেশ। মাথায় কয়েকটা মাত্র পাকা চুল। কৃষ্ণকে দেখে হাত থেকে পুঁথিটা খসে গেল।

    মেনকা (আর্তনাদ করে): এ কী! দ্বারকার রাজা কৃষ্ণ বাসুদেব! এত বড় একটা রঈস আদমী আশ্রমে আর আপনারা আমায় জানাননি? ইশ্‌, কয়েকটা ভালো গয়না তো পরে আসতে পারতাম।

    ব্যাস: মেনু-মা, সে সুযোগ চলে যাচ্ছে না। কৃষ্ণ ও নারদমুনি দুজনেরই সাময়িক স্মৃতিলোপ হয়েছে। ভাবছি তোমার বাগানবাড়ির সঙ্গে যে ভৃত্যের কুটির রয়েছে তাতে এঁদের কিছুদিন রেখে দেওয়া যাক। মাথায় ঠান্ডা ঘোল ঢেলে প্রহরে প্রহরে শুশ্রূষা করা যাবে। সেই সঙ্গে তুমি মহাভারত আর পুরাণ থেকে এঁদের কীর্তির গল্পগুলো কানের কাছে পাখি পড়াবার মতো পড়িয়ে যাও। অচিরেই পূর্বজীবনের স্মৃতি উদ্ধার হবে, এবং তুমিও একটি লোকপ্রিয় তারকার সঙ্গলাভ করবে।

    মেনকা (গলা নামিয়ে): ভৃত্যের কুটিরে রাখা উচিত হবে?

    ব্যাস: বাগানবাড়ি একখানা খালি আছে অবশ্য। এক কাজ করা যাক। খানিকটা সুস্থ হলে তুমি বাসুদেবকে দিয়ে তার কাগজপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নাও। ওর গলায় আর হাতে যে মণিমুক্তোর অলঙ্কারগুলো আছে সেগুলো বন্ধক রেখে বাড়িটা আমি সস্তায় ছেড়ে দেব। ভয় নেই, তোমার পাওনা তুমি পাবে।

    মেনকা (একটু গলা তুলে): আমাকে যে দামে দিয়েছেন তার চেয়ে এক কড়ি শস্তায় একটা বাড়ি যদি ছেড়েছেন দেখি তাহলে কিন্তু আমি একটা ডাণ্ডা নিয়ে…একটা ডাণ্ডা নিয়ে…।

    ব্যাস (আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখ করে): মণিপুরে পাঠিয়ে দেবে?

    মেনকা (কী বলবেন ভেবে না পেয়ে): আপনার ঠ্যাং ভাঙব।

    ব্যাস (স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে): শুধু ঠ্যাং কেন, আমার যদি এমন ভীমরতি হয় তো যে হাতে আমি সেই বাড়ির দলিলে সই করব সেই হাতটাও ভেঙে দিও তুমি। শুক যদি আমাকে বাধা না দেয় তো তার ঘাড়টা মটকে দিতে ভুলো না। আর এই যে অপোগণ্ড ঋষিরা আমার আশ্রমে খায় আর সারাদিন আমার নাতনিদের দিয়ে উকুন বাছায় এগুলো যদি আমাকে আটকাতে না পারে তো কথা দাও যে এদের দাড়িগুলো… উকুনগুলোকে রেখে শুধু দাড়িগুলো… স্বহস্তে উপড়ে দেবে। তুমি তো প্রথম খেপে কিনেছো? সূচাগ্র ভূমিও তার চেয়ে শস্তায় যাবে না। এখন আগে এঁদের ভৃত্যের কুটিরে ঢোকাও গিয়ে। মাথায় ঘোল ঢালা শুরু হোক।

    ‘উঠুন, উঠুন’ বলে প্রীত মেনকা বাসুদেব ও নারদকে দু-হাত ধরে ভূমি থেকে তুললেন।


    *****


    কৃষ্ণ (উঠতে উঠতে ভ্যাবলার মতো): কীরকম ভাবে আপনার সেবা করব বলুন তো? আপনি আমার গুরুপত্নীর মতো না জ্যেষ্ঠা ভগ্নীর মতো?

    মেনকা (আঁচল দিয়ে কৃষ্ণের চোখ মোছাতে মোছাতে): সম্পর্কে আমি মাতামহী-গোছের কিছু হব। কিন্তু আপনি বিষ্ণুর অবতার, আর নারদমুনিও বিষ্ণুর প্রসিদ্ধ ভক্ত। সেই সুবাদে আপনারা কম শ্রদ্ধার পাত্র নন। উপরন্তু আমার দৃষ্টিভঙ্গী একটু আধুনিক। তাই আপনি আমাকে বান্ধবীর মতো দেখবেন। শাস্ত্রে আছে – অপ্সরাং প্রাধুনিকাঞ্চ সদা, বান্ধবীবৎ সমাচরেৎ। তাই আপনি আমাকে মেনকা-জী বলেই ডাকবেন।

    কৃষ্ণ (উৎফুল্ল হয়ে): বান্ধবী? ফাটাফাটি! কিন্তু তার আগে কী বললেন মেনকা-জী? শুধুই রাজাই নয়, বিষ্ণুর অবতারও আমি? তার মানে বেশ কেউকেটা নাকি?

    মেনকা (খিলখিল করে হাসতে হাসতে): বিলক্ষণ কেউকেটা! আমরা দুজনেই নিঃসন্দেহে নামকরা তারকা, কারণ আমাদের নিয়ে পৌরাণিক পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত রোজনামচা বেরোয়। দ্বারকার জলাশয়ের ধারে আমাদের সাঁতারের উপযোগী হীরে-জড়োয়া কৌপীন পরা ছবি তো মধ্যবিত্ত গৃহস্থদের ঘরে বিশেষ সমাদৃত।

    নারদ (এক গাল হেসে মেনকাকে): আচ্ছা আপনি কি বিগত দিনের অভিনেত্রী?

    মেনকা (নারদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং কৃষ্ণের দিকে মুখ ঘুরিয়ে): আমার বাগানবাড়ির পাশেই আপনারও হবে একটা। তারপর দেখবেন জমির কী আকাশছোঁয়া দাম হয় এখানে। দুটো আরো খালি জায়গা আমাদের কিনে রাখা উচিত।

    কৃষ্ণ (নারদ ও মেনকার সাথে প্রস্থান করতে করতে): অপূর্ব! রোমাঞ্চকর হবে। কিন্তু ইয়ে, মানে, একটা ব্যাপার এখনো পরিষ্কার হল না...।

    নারদ (আবার মেনকাকে সম্বোধন করে): আমাদের পাড়ায় আপনার একটা নাচের শিক্ষায়তন ছিল, তাই না? চৌধুরিদের হাঁসবাড়ির পাশে? মনে আছে, নাচ আরম্ভ হলেই হাঁসেরা গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করত আর তাদের পেটে যত লুকোনো ডিম সব হড়হড় করে পেড়ে দিত? চৌধুরিরা সেইজন্য কম ভাড়ায় রেখেছিল আপনাদের, তাও ভাড়া বাকি রেখে শেষে উঠে গেলেন আপনারা।

    মেনকা (আবার নারদকে অগ্রাহ্য করে এবং কৃষ্ণের দিকে ঝুঁকে): লজ্জা কী? বলে ফেলুন, বলে ফেলুন।

    কৃষ্ণ (ফিসফিস করে): সবই জল হয়ে যাচ্ছে, শুধু এই একটা খটকা...। আপনি বারবার বিষ্ণু বিষ্ণু করছেন। তো এই বিষ্ণু মালটা কী? এটা কোনো মথুরার পাকওয়ান, না কিষ্কিন্ধ্যার গাড়োয়ান?

    মেনকা: লাও হালুয়া! হুম্‌। গাড়োয়ান বলতে পারেন, তবে গাড়ি নিজের থেকেই চলে, লোকটা সারাদিন মাধ্বী খেয়ে ঘুমোয়।


    *****



    কৃষ্ণ, নারদ ও মেনকা এইভাবে কথা বলতে বলতে প্রস্থান করার সময় শুক আর ব্যাস ছাপার কলটার দিকে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন।

    শুক: বাবা, কলটা তো পাওয়া গেল, কিন্তু অজস্র নকল মহাভারত এখনই ভারত ছেয়ে ফেলেছে। সেগুলোর কী করবেন? বাছাই করা কিছু ঋষিপুত্র ও কন্যাকে এরকম বিপদকালের জন্যই তৈরি করে রেখেছিলাম। রাত্রিবেলা গৃহস্থদের ঘরগুলোতে আগুন দিয়ে আসতে পারদর্শী। (গলা নামিয়ে) পুঁথি হাতে কেউ পালাতে চাইলে অন্ধকারে কুপিয়ে দেবে। অনুমতি করেন তো লেলিয়ে দিই।

    ব্যাস: লেলাও বৎস, লেলাও! নইলে ব্যাটারা কুঁড়ে হয়ে যাবে। তবে নকল মহাভারতগুলোকে ধ্বংস করার ব্যবস্থা তৈরি আছে। এই দুর্গন্ধময় লাল কালিটা লক্ষ্য করেছ? দেবতাদের চরেরা আগেই খবর পেয়েছিল সমতট থেকে ছাপার কল আনানো হচ্ছে আর্যাবর্তে, সঙ্গে গৌড়ের কালি। তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ষড় করে কালো কালি বদলে লাল কালি পাঠাবার ব্যবস্থা করে। এই দুষ্প্রাপ্য ও উৎকৃষ্টতম কালির নাম মোক্ষদা।

    শুক: বড়ই সাত্ত্বিক নাম। পূজার সামগ্রী বলে মনে হয়।

    ব্যাস (হাসতে হাসতে শুকের মাথায় হাত বুলিয়ে): পাগল ছেলে! তল্পকীট, মানে ছারপোকার রক্ত দিয়ে তৈরী! তার মধ্যে জারানো আছে অসংখ্য ছারপোকার ডিম। পুজোয় দেবে এটা? তার চেয়ে অর্ঘ্যের থালায় দুটো শান্তশিষ্ট গণ্ডারের বাচ্চা বসিয়ে দাও না কেন?

    শুক: ওয়াক্‌ থুঃ! কোথায় মোক্ষদা আর কোথায় তল্পকীট! দেবতারা এ জিনিসের বায়না দিলেন কোন আক্কেলে? তাঁদের পেটের ভিতর থেকে বুদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী ফিতে কৃমিরা নিজেদের জন্য চারা আনাচ্ছে না তো? নাকি অন্য কোনো তন্তর?

    ব্যাস: তন্তরের বাবা যন্তর। কালিটা শুকিয়ে গেলেও ডিমগুলো তো পুঁথির ভিতর থেকে যাচ্ছে। গ্রীষ্মকালে তার থেকে ছানা বেরিয়ে এসে রক্তের গন্ধে পুঁথির সমস্ত অক্ষর চেটেপুটে খেয়ে নেবে। স্বয়ং ব্রহ্মাও তাদের হাত থেকে পাতাগুলো বাঁচাতে পারবেন না। গৌড়ের গন্ধবণিকদের জিনিসপত্র এমনিতে খুবই সমস্যাজনক, তবে ওদের এই আবিষ্কারটা একেবারে অনবদ্য!

    শুক: হা ঈশ্বর! ক্ষুদ্র তঞ্চক নয়, তঞ্চযোগী! এ তো সিদ্ধপুরুষের কাজ! বাগানবাড়ির পয়সা নিয়ে হাওয়াবাড়ি দেওয়ার মতো বড়বিদ্যার গগনচুম্বী নিদর্শন। সেইজন্যই অনবদ্য আবিষ্কার বলছেন?

    ব্যাস: বৎস, এ বস্তুটা তৈরিই হয়েছে বড়বিদ্যার ওস্তাদদের জন্য। চোরের সঙ্গে চোরের লেনদেনে তিলমাত্র তঞ্চকতা নাস্তি। কালিটা দানপত্র আর প্রেমপত্রের কার্যে অপরিহার্য। যে কেনে সে জেনেশুনে কেনে। নামের ভিতরেই কি গুণাবলির কথা খোলাখুলি বলা নেই? মোক্ষদা মানে বুঝলে না? যে সৌভাগ্যশালী গ্রন্থ এই কালির পরিচর্যা পায় তা অচিরেই পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে মোক্ষলাভ করে।

    শুক: এই, এই! আরে রোককে, রোককে!

    ব্যাস আর শুকদেব যখন আলোচনা করছিলেন তখন গৌড়ের দিক থেকে একটা পুবালি বাতাস ধীরে ধীরে বইতে শুরু করে। এবার সেটা একটু জোরে হয়ে যাওয়ায় গুবগাবের কলটা হাওয়ার ধাক্কায় নড়ে উঠেছিল। হঠাৎ কোত্থেকে ব্যাস এবং ব্যাসের দ্বিতীয় ব্যাস সেটাকে লম্ফ দিয়ে আক্রমণ করতে তেড়ে এসেছে। শুকদেব এক ঝটকায় পিতাকে সেই মহিষাসুরের গতিপথ থেকে সরিয়ে নিলেন।

    ব্যাস: আরে আরে, ধর ব্যাটাকে! ছাপার কলটা যাবে তো! বোকাটা ভেবেছে নীলগাই। হায়, হায়! অমূল্য জিনিস!

    ধরা তো দূরের কথা, সবাই এদিক ওদিক ছিটকে গিয়ে দ্বিতীয় ব্যাসকে পথ ছেড়ে দিল। দেখতে দেখতে কুড়মুড় আওয়াজের সঙ্গে গাড়ল গীতার পোকযন্ত্রও কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।



    || ৬ ||


    স্থান: ব্যাসের আশ্রমে একটি কুটির। কাল: প্রভাত। কৃষ্ণ ও নারদকে ফলাদি প্রাতঃরাশ দিয়ে একটি ঋষিপুত্র নিষ্ক্রান্ত হল। নারদ ও কৃষ্ণ পাশাপাশি বিছানায় শুয়েছিলেন। নারদ বেশ খানিকক্ষণ ধরে উশখুশ করার পর আর থাকতে না পেরে উঠে কৃষ্ণের মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।

    নারদ: কেষ্টা তোমার মাথাটা কি সত্যিই গুবলে গেল? হায়, হায়। এত ধুরন্ধর হয়েও তুমি এটা ধরতে পারোনি যে দেবতারা যখন ইস্কুবিস্কু বলে ওই স্মৃতিলোপাই অস্ত্রটা মানুষদের তাক্‌ করে চালায়, তখন আলোর ঝলক দেখে ফেলার আগে দুচোখ বুজে ফেলতে পারলে সেটা কাজ করে না?

    শুনেও কৃষ্ণের কোনো বিকার নেই, ফ্যালফ্যালে চোখের দৃষ্টিও পুর্ববৎ।

    নারদ (একগুচ্ছ দ্রাক্ষা তুলে নিয়ে এবং দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে): তাহলে আর কি। একাই মানে-মানে সরে পড়ি। পাঁচবার করে মাথায় ঘোল ঢালানো কি আর এই বয়সে সয়? সেই জোয়ান কালে মন্দোদরী বাজি রেখে আমাকে রোগা করে দেবে বলে ছমাস ধরে রোজ এক ঘটি ঘোল দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে যেত; আমি খিদের জ্বালায় বিছানার তোষকটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতাম আর সেই অখাদ্য ঘোলের ঘটি সন্ধ্যের আগে খালি করার জন্য সেটা দিয়ে চান করতাম। তার পর থেকে ঘোলের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। যা হোক ভালো থেকো বাসুদেব। বড়ই কষ্ট হল তোমার দশা দেখে। তোমার ভিতরে যে বিজ্ঞানী আত্মাটি ছিল সেটিকে জীর্ণ শরীর থেকে মুক্ত করে দিয়েছে বদমাইশরা! রয়ে গেছে ভ্যাবা-গঙ্গারাম। ইশ্‌শ্‌শ্‌…! কীসের জন্য যে তুমি ড্যাব ড্যাব করে ইস্কুবিস্কুটার দিকে তাকিয়ে রইলে? (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) সাধে কি আর ব্যাসদেব বলদরাম বলেন? ও হ্যাঁ, দুঃখ পাবে বলে বলিনি, সে উপাধিটাও তোমার দাদার জন্য ছিল না।

    আরেকটি দ্রাক্ষার গুচ্ছ নিয়ে নারদ যেতে উদ্যত।

    কৃষ্ণ (নড়ে চড়ে উঠে): উঁ-হুঁ-হুম্‌। তাতঃ, চুলকুনির ওষুধটা সত্যিই ফুরিয়ে গেছে। ওটা কিন্তু এনে দিতে হবে। আগে শুধু মহিষীদের দিতে হত, এখন যা ছড়িয়ে পড়েছে, চাকর-বাকররাও চায়।

    নারদ: অ্যাঁ!! কী বললে?

    কৃষ্ণ: শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌। আস্তে বলুন। দেওয়ালেরও কান থাকে। আর এখানে তো খড়ের ছাত, তায় বড় বড় ফুটো। কান, চোখ, ইস্কুবিস্কু সবই লাগানো থাকতে পারে।

    নারদ (উল্লাসে প্রায় চেঁচিয়ে ফেলে): কেষ্ট, তুমি কেলিয়ে যাওনি তাহলে?

    কৃষ্ণ: একেবারে কেলিয়ে গেছি। শুধু আমি নয়, আপনিও। টুঁ শব্দ না করে পাঁচবার করে মাথায় ঘোল ঢালাব কিছুদিন! যদি মনে করেন তোষক খেলে আপনার কষ্ট লাঘব হয় তাহলে আমারটাও আপনাকে খেতে দেব। কিন্তু কিছুতেই যেন ওরা জানতে না পারে আমাদের চোখ বন্ধ ছিল।

    নারদ: পালাব না?

    কৃষ্ণ: ভুলেও ও কাজ করবেন না। জানতে পারলে জোর করে চোখ খুলিয়ে কাছ থেকে ইস্কুবিস্কু চালিয়ে দেবে। তারপর বিজ্ঞান তো দূর, বাপের নামও মনে থাকবে না। তার চেয়ে ওদের ভাবতে দিন যে আমাদের স্মৃতি বিনষ্ট হয়েছে। আমার কাছ থেকে আর কোনো ভয় নেই ভেবে যেই ওরা নজরদারী সরিয়ে নেবে, অমনি আমরা গ্রন্থের প্রকাশ শুরু করে দেব।

    নারদ: কিন্তু কী দিয়ে ছাপা হবে? পোকযন্ত্রটা তো গেছে শুনছি।

    কৃষ্ণ: যন্ত্র যোগাড়ের কাজ চলছে। গুবগাবদের উপর বিশ্বাস রাখুন। দেবতারা বহু সন্ধান করেও তাদের দেখা পায়নি। যাদের খুঁজেই পাওয়া যায় না তাদের বিনাশ হবে কী করে? গুবগাবরা থাকতে গাড়ল গীতার আত্মপ্রকাশও কেউ আটকাতে পারবে না। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ জানবে চন্দ্রগ্রহণ কেন হয়।

    নারদ: দুধ কেন জমে।

    কৃষ্ণ: সূর্য কেন আলো দেয়।

    অকস্মাৎ পিছন দিক থেকে মেনকার প্রবেশ। নারদ সেটা দেখতে পাননি। মেনকা মন দিয়ে বিপুল কোনো গ্রন্থের পাতা ওলটাতে ওলটাতে হাঁটছেন।

    নারদ: বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তর কেন ঠান্ডা?

    মেনকা (নিজের মনে): সুর্যের রশ্মি মাটিকে গরম করে। তা থেকে বায়ুর নিচের স্তর গরম হয়। উপরের স্তরের ঘনত্ব কম তাই সেখানে তাপ পরিবহন সহজে হয় না।

    বলে ফেলেই মেনকার সম্বিৎ ফিরেছে এবং তিনি জিভ কেটেছেন। কিন্তু নারদকে আর পায় কে?

    নারদ: আকাশগঙ্গা কী?

    মেনকা (মন্ত্রমুগ্ধের মতো অসহায় ভাবে): কোটি কোটি তারকা ও জ্যোতিষ্কের চ্যাটালো চক্রাকৃতি সমষ্টি।

    কৃষ্ণ: শুকতারা আর সন্ধ্যেতারা একসাথে দেখা যায় না কেন?

    মেনকা (আরো মড়ার মতো শাদা হয়ে গিয়ে): কারণ ও দুটো একই বস্তু যে। সূর্যের কাছের একটা গ্রহবিশেষ।

    মেনকা ইঁদুরের মতো পালাবার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু একদিকে কৃষ্ণ আর একদিকে নারদ তাঁর পথ আটকে দিয়েছেন। তিনি একবার এদিক, একবার ওদিক ছুটেও কোনো ফাঁক না পেয়ে হাল ছেড়ে দিলেন।

    নারদ: আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে আছে কী?

    মেনকা (ভয়ার্ত কন্ঠে): এটাও বলতে হবে? আছে অনেকগুলি অতি-মাধ্যাকর্ষণবাহী কৃষ্ণপিণ্ড। যারা আলো পর্যন্ত শুষে নেয়, যাদের কাছে গেলে অবধারিত বিলোপ, কোনো মুক্তি নেই।

    কৃষ্ণ: দেবদ্রোহীদের চক্রেও একবার ঢুকলে অবধারিত বিলোপ। কোনো মুক্তি নেই। আর কতদিন মিথ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকবেন মেনকা-জী? এই বাঁচাটা একটা বাঁচা?

    মেনকা (কাঁদো কাঁদো হয়ে): আমি ইন্দ্রের নুন খেয়েছি সারাজীবন। আর আমাকেই আপনারা ফুসলিয়ে রাজদ্রোহী বানালেন?

    কৃষ্ণ: আপনার নিজের পরিশ্রমের নুন সেটা। ইন্দ্র অবৈধভাবে ভাগ বসিয়েছে এতদিন। আমি আপনার জায়গায় হলে ব্যাটাকে রোজ বেঁধে চাবকাতাম।

    বিস্ময়ের ধাক্কায় মেনকা সবেগে ঘুরে তাকালেন। একটা তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর বেরোল তাঁর গলা দিয়ে।

    মেনকা: অ্যাঁ! কথাটা আপনার মাথায় এল কী করে? আহাম্মকটা সিদ্ধির নেশায় ফর ফর করে সব বলে দিয়েছে?

    কৃষ্ণ: চিন্তা করবেন না, আমি কোনোদিন ইন্দ্রের সঙ্গে বসে সিদ্ধি খাইনি। তবে আপনি যদি রোজ চাবকে থাকেন তো একদম ঠিক কাজ হয়েছে।

    মেনকা (দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে বলবেন কিনা ভাবতে ভাবতে): হ্যাঁ, মানে… না, মানে … হপ্তায় দুদিন মাত্র। রোজ রোজ সে জিনিসের বায়না পাওয়া যায় নাকি? বোঝেনই তো, সেটা করার জন্য আমরা ভালো টাকা নিই। যা হোক, এখন রাজদ্রোহের খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে কী কেলেঙ্কারি হবে ভাবুন তো?

    কৃষ্ণ: চাকরি তো ছেড়েছেন। ওরা করবেটা কী?

    মেনকা: আঃ, অবসরের পরেও মুখ বন্ধ রাখার একটা মোটা মাসোহারা থাকে আমাদের! বাড়িটাড়ি কেনার জন্য সহজ কিস্তিতে ঋণ দেয়...। বছরে একবার করে জম্বুদ্বীপের সম্মেলনে ডাক পাই…। সমিতি-টমিতিগুলোতে সভাপতি বা খাজাঞ্চি হয়ে ঢুকে যাব এই আশাও আছে…।

    কৃষ্ণ: ভয় নেই, কেউ আপনাকে ধরিয়ে দিচ্ছে না। যতদিন না দেশের মানুষ জেগে ওঠে যেমন আছেন তেমনই বোকা সেজে থাকুন। একদিন যখন দিকে দিকে আগুন জ্বলে উঠবে তখন নিজেই বুঝে যাবেন গাড়ল গীতার ঘৃতাহুতি পড়েছে তাতে।

    মেনকা: গাড়ল গীতা?

    কৃষ্ণ (নতমস্তক হয়ে): একটা সামান্য গরুচরানো ছাগলের প্রণীত বই, যা পাঠ করলে অন্য ছাগলের চক্ষূদয় হয়। দেবতাদের সমস্ত চালাকি আর জারিজুরি ফাঁস করে দিয়েছি। তথ্যে ও তত্ত্বে ঠাসা একটি বিজ্ঞানের উপক্রমণিকা। এর লক্ষ লক্ষ পাণ্ডুলিপি ছাপিয়ে আমি ভারতবর্ষ ছেয়ে ফেলব।

    নারদ: কিন্তু সেটা হবে কী করে কেষ্ট? শুনলে তো, ওরা সমতটে হানা দিয়েছে। ছাপাইয়ের যন্ত্র আনালেও ওদের চররা সব ধ্বংস করে দেবে।

    মেনকা: হায়, আমার জীবদ্দশায় কিছু হবে না তাহলে? একটা সামান্য দূরবীন লুকিয়ে রাখার জন্য জালিয়াত ব্যাস বুড়োটার কাছ থেকে শেয়াল ডাকা জঙ্গলে বাড়ি কিনতে হবে?

    কৃষ্ণ: হাঃ হাঃ। আপনি কিছুদিন স্বর্গে গিয়ে কাটিয়ে আসুন বরং। ততদিনে মর্ত্যে কয়েক যুগ অতিক্রান্ত হবে। মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখবেন। যদি দেখেন মানুষ দেবতাদের ছাড়িয়ে গ্রহান্তরের পথিক হয়েছে তো বুঝবেন সরল গীতার দিন শেষ, গাড়ল গীতার দিন শুরু।

    নারদ: আর তার আগেই তোমার মৃত্যু হয় যদি?

    কৃষ্ণ: আবার ফিরে আসতে হবে। বার বার জন্মাতে হবে। ভগবদ্গীতার দাসত্ব থেকে দেশকে উদ্ধার না করে আমার মুক্তি নেই। কিন্তু আমার হাতে হাত রেখে আজ আপনারাও শপথ করুন, বার বার ফিরে আসবেন। গাড়ল গীতাকে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে না দেওয়া পর্যন্ত শুধু আমি একা কেন, যেন আমরা সবাই সম্ভবামঃ যুগে যুগে!

    (কৃষ্ণের বাড়ানো হাতে হাত রেখে নারদ ও মেনকা মন্ত্রমুগ্ধের মতো একসাথে): তথাস্তু!







    [কল্পিত, আজগুবি কাহিনী। স্থান, কাল, বা পাত্রের সঙ্গে মিল অনভিপ্রেত।]


    [এই নাট্যকাহিনীকে নাটক হিসেবে অভিনয় করা সম্ভব হতে পারে বলে ভয় করছি। কাহিনীতে যন্ত্র, জন্তু, এবং আকাশচিত্র জাতীয় এমন সব উপকরণের উল্লেখ আছে যা আক্ষরিকভাবে মঞ্চে উপস্থাপিত করা সহজ নয়। এই উপাদানগুলি কীভাবে ও কতটুকু রাখা উচিত তার ভাবনা পরিচালকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইচ্ছাকৃত। -লেখক]



    অলংকরণ (Artwork) : পরবাস ডিজিটাল আর্ট
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)