• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | রম্যরচনা
    Share
  • রকবাজির কোলাজ: কোলকাতা ও ছত্তিশগড় (৫) : রঞ্জন রায়

    নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান (কোলকাতা পর্ব ৩)

    আজ আড্ডা সরগরম। নতুন নায়কের জন্ম হয়েছে। কোথায়? কেন, আমাদের পাড়ায়। রিফিউজি কলোনির এলাকায় কি নায়ক জন্মায় না? খুব জন্মায়, নায়ক নায়িকা সবাই জন্ম নেয়। পুরাণে যত নির্জন দ্বীপে প্রেম আর রোম্যান্টিক প্রেমের গল্প আছে—ভেবে দেখুন, সব আসলে উদ্বাস্তু কলোনি।

    খুলে বলছি, সেই যে এক পরাশর মুনি ও মৎস্যগন্ধা নারীর প্রেম ও দ্বীপে সন্তানের জন্ম, গায়ের রঙ কালো এবং দ্বীপে জন্মেছিল বলে নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, তিনিই কি ব্যাসদেব নন? বেদ-পুরাণের রচয়িতা মানে সুপার হিরো!

    ধ্যাৎ, কীসের সঙ্গে কীসে? উনি এমন কুদর্শন এবং গায়ে বোটকা গন্ধ, যে মিলনসমুদ্র বেলায় দুই বোন এবং সম্পর্কে জা—অম্বিকা ও অম্বালিকা—ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে গেলেন। একজন তো চোখ বুঁজে রইলেন। ব্যাসদেব গেলেন খেপে, বললেন কুছ মজা নহীঁ আয়া! মুনিঋষির সঙ্গে মাজাখি! দিলেন শাপ; ফলে তাঁদের সন্তানেরা একজন অন্ধ অন্যজন পাণ্ডুরবর্ণ হয়ে জন্মালেন। অতএব, এই উদাহরণ অচল।

    বেশ, শকুন্তলা যে নায়িকাগুণ সম্পন্ন তা তো মানবে সুবীরদা? বড় হলেন কোথায়? কণ্বমুনির আশ্রমে। মানে সংসারের বাইরে আশ্রয়স্থল, রেফিউজ; সেটাই তো রিফিউজি কলোনি।

    ফালতু কথা ঘোরাচ্ছিস, নারাণ। পুরাণ-টুরাণ সত্য-ত্রেতা-দ্বাপরের কথা বলে। আমাদের এই ঘোর কলিকালে কেউ আছে? তাহলে বল।

    বলছি, আসল নাম বলে কি কেস খাব? তোমরা বুঝে নাও—একজন বিশ্বাস, আরেকজন মুখুজ্জে এবং তৃতীয়জন পাল। সব ডাকসাইটে অভিনেত্রী—রূপে, গুণে, অভিনয়ে। হাবভাব, গ্রীবাভঙ্গি, চটুল চাউনি, কেউ গজগামিনী, কেউ মরালগামিনী। একটা জেনারেশন পুরো পাগল। কিন্তু এঁরা সবাই উদ্বাস্তু কলোনিতে বড় হয়েছেন।

    আর নায়ক?

    খালি সিনেমা কেন? ফুটবলে কি স্টার হয় না? আরে পেলে, মারাদোনা, রোনালদিনহো ওদের দেশের কোন পাড়া থেকে এসেছেন? আমাদের দেশের অনেক নামকরা স্টপার, গোলকিপার এবং স্ট্রাইকারের দল?

    ধ্যাৎ সেই ভ্যাজরং ভ্যাজরং! আসল কথায় আয়। আমাদের পাড়ায় স্টার কই?

    কী যে বল, সুবীরদা? এখান থেকে গা তুলে বাঁশদ্রোণী বাজারের দিকে মুখ করে পা চালাও। বাসরাস্তা ধরে নয়, ভেতরের গলি দিয়ে। একটা সিগ্রেট ধরিয়ে নাও। নাকতলা স্কুল ছাড়িয়ে ডালগিজ বাংলো পেরিয়ে আর একটা ধরাও। তারপর একটা দোতলা বাড়ি, গায়ের শ্বেতপাথরের ট্যাবলেটে লেখা “ওঁ মদনমনমোহিনী”—সংগীতাচার্য সুখেন্দুবাবুর বাড়ি। এবার ডানদিকে মুড়ে খানপুর নির্মলা গার্লস স্কুল—

    —না, খানপুর গার্লস স্কুলে যাব না। অন্য রাস্তা থাকে তো বল। ওখানে আমার ভাইঝি পড়ে।

    —আঃ তোমার দেখি তর সইচে না! গার্লস স্কুলে যেতে বলিনি। ওইদিকে মুখ করে গুণে গুণে দশ পা চললেই দেখবে একটা দোতলা বাড়ি, সামনে একটু বাগান। বারান্দায় একটা সেগুন কাঠের নেম প্লেট। তাতে সাদা রঙ দিয়ে সুন্দর করে বাংলা কার্সিভ হরফে লেখা—ট্রায়ো ফিল্মস, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রত্না চট্টোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

    —গুরু! গুরু! কার কথা বলছ নারাণদা?

    আমাদের জুনিয়র আড্ডাবাজ বেলেঘাটার পচা একদম ইলেক্ট্রিফায়েড।

    — বিশ সাল বাদ! মেরে হুজুর! কোহরা! মায়ামৃগ, দুই ভাই, একটুকু ছোঁয়া লাগে! চৌরঙ্গী, গড় নাসিমপুর, অমরগীতি, বাবা তারকনাথ, রক্ততিলক—সেই বিশ্বজিৎ? উনি আমাদের নাকতলা এলাকার? গুল দিচ্ছ না তো! আচ্ছা, ট্রায়ো ফিল্মস কী?

    —যা না, নিজের চোখে দেখে আয়। দারোয়ানের গলাধাক্কাও খেতে পারিস। ট্রায়ো ফিল্মস হোল বিশ্বজিতের নিজের ফিলিম কোম্পানি। স্বামী-স্ত্রী-ছেলে মিলে তিন—তাই ট্রায়ো।

    —আমি ভাবতাম উনি বোধহয় বোম্বাইতে থাকেন।

    —আরে গোমুখ্যূ। সুপার হিরো হোল ভগবানের মত, সর্বত্র নিবাস। বোম্বাই কোলকাতা দিল্লি সব জায়গায় বাড়ি। যখন যেখানে কাজ।

    —আর প্রসেনজিৎ কে?

    —ওনার একমাত্র ছেলে, এখনও বাচ্চা। সুন্দর দেখতে। বুম্বা একদিন বড় হয়ে সুপার হিরো হবে। এ পাড়া থেকে আর একজন নায়ক।

    —বুম্বা?

    —প্রসেনজিতের ডাকনাম।

    —তুমি কী করে এতসব জানলে?

    —আমার সামনে উনি বাচ্চাটাকে বুম্বা বলে ডেকে আদর করছিলেন।

    —তোমাকে উনি চেনেন? তুমি ওনার বাড়িতে গেছলে? মানে, তোমার সঙ্গে আলাপ আছে? কীরকম আলাপ?

    আমাদের সমবেত প্রশ্নের সামনে নারাণদা কেমন ভেবলে গেল।

    —হ্যাঁ, ওনার বাড়িতে গেছি। আলাপ হয়েছিল।

    উরিব্বাস! আমাদের চোখে নারাণদাও আধা বা সিকি নায়ক হয়ে গেল। হাইট পাঁচ ছয় থেকে বেড়ে ছ’ফুট। তবে নারাণদা একা ফুটেজ খাচ্ছে দেখে বিজনের খার হয়ে গেল।

    —দূদ্দুর! সবটা ঝেড়ে কাশো দিকি! তোরা শোন। সে অনেকদিন আগের কথা, তোরা তখন হাফ প্যান্ট। সেবার আমিও সঙ্গে ছিলাম। গিয়েছিলাম নবারুণ সংঘের দুর্গাপুজোর চাঁদা নিতে। সেই সময় যতটুকু খেজুরে হয় আর কি! উনি আমাদের চেনেন না। ছাপা রসিদ বই আর গতবারের পুজোর ব্যালান্স শীট দেখে এক হাজার টাকা দিলেন।

    —মাত্তর?

    —দূর বলদা! সে সময় টাকার দাম ছিল। একহাজার টাকা মানে ফোর ফিগার। তখন লোকের মাইনে এর থেকে অনেক কম হত। কোন ছেলের স্যালারি ফোর ফিগার হলে তাকে জামাই করতে মেয়ের বাপ-মা হামলে পড়ত।

    শোন, সেবার একটা ড্রামা কম্পিটিশনে আমরা বম্বে গেছলাম। সেখানে দেখি নাট্যোৎসবের দুই মারাঠি কর্মকর্তা নিজেদের মধ্যে গসিপ করছেন—ভাউ, শুনলাম তুই নাকি এ বছর থেকে ‘থাউ’ হয়েছিস। তাহলে কথা চালাই?

    থাউ হোল থাউজ্যান্ডের অপভ্রংশ। আর কথা চালানো মানে বিয়ের জন্যে ঘটকালি করা।

    —উফ্‌ মাথা ধরে গেছে। যা পচা, অধীরের দোকান থেকে সবার জন্যে চা নিয়ে আয়, আর এক প্যাকেট চারমিনার। হ্যাঁ, আমার খাতায় লিখতে বল। গতমাসের বিল ক্লিয়ার করেছি। নো প্রবলেম।

    সুবীরদা জিন্দাবাদ! এই না হলে চেরো কলেজের কালচারাল সেক্রেটারি! সবাই কিচিরমিচির করে ওঠে।

    এবার সুবীরদা বেশ দার্শনিকের মত ঘ্যাম নিয়ে গলার আওয়াজ মোটা করে বলে—সেসব তো হোল। এবার নারাণ মেন পয়েন্টে আয়। কী যেন বলছিলি? হ্যাঁ, আমাদের পাড়ায় নায়কের আবির্ভাব হয়েছে। এবার তাকে সম্বর্ধনা দেয়ার জন্যে চাঁদা তুলতে হবে। কী কেস? কে সেই নায়ক?

    পচা খলবলিয়ে ওঠে—উত্তম কুমার! বাংলায় নায়ক বলতে একজনই। সত্যজিৎ ফিলিম বানিয়ে তাঁকে রাজপাট দিয়ে গেছেন।

    —এই তুই থাম তো! বিপুল খিঁচিয়ে ওঠে।

    —তুমি তো বলবেই বিপুলদা। সেবার উত্তমকুমার নবমীর দিন সকালে সুপ্রিয়াকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে নাকতলা ঘুরে গেছলেন। নিজে ড্রাইভ করছিলেন। গাড়ি চালাতে সুবিধের জন্যে পাঞ্জাবির একটা হাতা গুটিয়ে রেখেছিলেন। তুমি নাকি পরের দিন থেকে ওনার নকল করে একহাতা গোটানো পাঞ্জাবি পরে লক্ষ্মীপুজো অব্দি ঘুরে বেড়িয়েছিলে! আর তাতেই তোমার কল্পনাদি তোমায় বক দেখিয়ে কেটে গেল। ও নাকি সৌমিত্রের ফ্যান!

    বিপুল রেগে বেগুনি হয়ে ওর দিকে তেড়ে যায়।

    —তুই দেখেছিলি? এপাড়ায় এসেছিস ক’দিন হোল? এক থাপ্পড়ে গাল ঘুরিয়ে দেব।

    পচা নিরাপদ দূরত্ব থেকে মন্তব্য করে চা আনতে পালায়।

    বিজন সবাইকে শান্ত করে। এসব ছেড়ে কাজের কথা হোক। কে নতুন হিরো? আর তার জন্য আমরা কেন চাঁদা তুলব? এসব তো আউট অফ সিলেবাস।

    সুবীরদার ইশারায় নারাণদা মুখ খোলে।

    —হ্যাঁ, নায়ক আসছে নয়, এসে গেছে। আর সে কোন রাজাগজা নয়, আমাদেরই একজন। তাকে তোমরা চেন।

    আমাদের মুখের হাঁ বন্ধ হয় না। একজন আরেকজনের দিকে তাকাই। তারপর মাথা নাড়ি। কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না।

    সুবীরদা বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ে।

    —আর এই ভ্যান্তারা ভাল লাগছে না। নারাণ স্পষ্ট করে বলবি তো বলে ফেল। নইলে আমি চললাম। আজ কলেজে পি এন বি’র ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে।

    —আরে বাবা! এতবড় ঘটনা আর তুমি কলেজের বাহানায় কেটে পড়ছ! এই আচরণ কি তোমায় শোভা পায় তাতশ্রী?

    এবার আমরা সবাই বিরক্ত। কে আমাদের নতুন নায়ক যাকে আমরা নাকি চিনি? খুলে বল নইলে আমরাও উঠব, ঢের হয়েছে।

    —বলছি আমাদের সুদীপের কথা।

    সুদীপ! আমাদের সুদীপদা? এ যে পর্বতের মূষিক প্রসব! হা-হুতাশ, আর্তনাদ ইত্যাদি।

    বিজন বলে—যা খুশি বললেই হোল? খামোখা সময় নষ্ট। সুদীপ কীসের নায়ক? সাদামাটা ভাল ছেলে, নায়কোচিত গুণ কোথায়? অ্যাদ্দিনে তেমন কিছু দেখিনি তো।

    —এই তোদের সাহিত্য আর ইতিহাসবোধ? আরে মায়ের পেট থেকে কেউ নায়ক হয়ে জন্মায় না। অর্জুনও জন্মের পর কাঁথা ভেজায়, শুয়ে শুয়ে ওঁয়া-ওঁয়া করে কাঁদে। তারপর উপযুক্ত সময়ে এমন কিছু করে যা তাকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে নায়ক বানায়। চোখের সামনে এত্ত উদাহরণ তবু তোরা শিখবি না। হিটলার আর্ট স্কুলে ভর্তির পরীক্ষায় ফেল করেছিল। গান্ধীজি ব্যারিস্টারিতে বিশেষ সফল হননি। স্তালিন ছিল মুচির ছেলে, সেমিনারিতে পড়ার সময় টিসি পেয়ে লেখাপড়ায় ইতি। চ্যাপলিন ফুটপাথে নেচে গেয়ে পয়সা কামাতেন।

    —অ! তা সুদীপদা এমন কী করল যা তাকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে দিল? করছে তো বাটা কোম্পানিতে সেলসম্যানের চাকরি। লোকজনের পায়ে হাত দিয়ে জুতো পরানোর কাজ। বামুন-কায়েত-নমোশূদ্দূর কিছু দেখে না। সে হোল নায়ক? আর আমরা চাঁদা তুলে তাকে ফুলমালা দিয়ে বরণ করব? তুমি ডাক্তার দেখাও গে!

    —ধ্যেৎ, সুদীপ একটা রেভোলুশন করছে। মিত্তির পরিবারের ছেলে হয়ে চিত্ত ঘোষের মেয়ে রাধাকে বিয়ে করছে। এবং দুই বাড়ির অমতে। ওরা হোল মিত্র—কুলীন কায়স্থ, সেই বল্লাল সেনের সময় থেকে। আর চিত্তদারা গয়লা ঘোষ, দুধের ব্যবসা। কিন্তু ওদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভাল, আমাদের ফুটবল ক্লাবের পেট্রন। মাঠের শেষে বিধান পল্লীর বর্ডারে দোতলা বাড়ি। চিত্তদা কিছুতেই এমন জামাইয়ের হাতে মেয়েকে তুলে দেবে না যে কিনা নারী-পুরুষ সবার পায়ে হাত দিয়ে জুতো পরায়! এই হোল বেত্তান্ত।

    —হুম, তা সুদীপ কোথায়? দু’সপ্তাজ ধরে তার পাত্তা নেই। কেসটা ওর মুখে শুনতে চাই।

    —কী করে আসবে? ওর পেছনে পুলিশ লেগেছিল যে!

    —পুলিশ! কেন?

    —আরে চিত্তদা কেস টের পেয়ে রাধাকে মারধোর করেছিল। ওর গড়িয়া কলেজে যাওয়া বন্ধ। আর সুদীপের বিরুদ্ধে নাবালিকাকে ফুসলে অপহরণের চার্জ লাগিয়ে থানায় ডায়েরি করেছিল। সুদীপ ক’দিন গা ঢাকা দিয়ে রইল। বড় উকিল লাগালো আর ওর মাসতুতো দিদি গড়িয়া দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজের বাংলার প্রফেসর। বেশ সিনিয়র। ওনার সাহায্যে কলেজের অফিস থেকে রাধার সার্টিফিকেটের কপি বের করে যাদবপুর থানায় পেশ করা হোল। রাধার বয়েস কুড়ি। নাবালিকা নয়। এবার সুদীপের পক্ষ থেকে পালটা ডায়েরি করা হোল যে একটি সাবালিকা মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাবা-মা ঘরে বন্ধ করে রেখেছে। তাকে কলেজ যেতে দিচ্ছে না। জোর করে কোন বুড়োর সঙ্গে বিয়ে দেয়ার জোগাড়যন্তর চলছে। গয়লা ঘোষ হবু জামাইয়ের থেকে মোটা টাকা খেয়েছে!

    —এতসব হয়ে গেল? আমরা কিস্যু জানি না।

    —জেনে কী করে ফেলতি? ও ঠিক করেছে। চিত্তদা যে আমাদের ইয়ংবেঙ্গল ফুটবল ক্লাবের পেট্রন। আমাদের মধ্যে থেকেই কেউ না কেউ সুদীপের স্ট্র্যাটেজি চিত্তদাকে লিক করে দিত।

    বিজন উত্তেজিত। আরে তারপর কী হল?

    —থানার ওসির মধ্যস্থতায় একটা রফা হল। চিত্তদা মেনে নিল কিন্তু অদ্ভুত শর্তে।

    —কী সেই শর্ত?

    —শুনলে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবে।

    সুবীরদা ধমক দিল। —ন্যাকামি হচ্ছে!

    —চিত্তদা বলল সুদীপ যদি ওনার বাড়ির সামনে গিয়ে নীচের মাঠে দাঁড়িয়ে রাধা! রাধা! রাধা! বলে তিনবার ডাকতে পারে আর রাধা যদি সেই ডাক শুনে একবস্ত্রে বেরিয়ে আসতে পারে তাহলে বোঝা যাবে ওদের মধ্যে খাঁটি ভাব-ভালবাসা আছে—যাকে বলে টুরু লাভ! নাহলে বুঝতে হবে—প্রেমট্রেম সব বাল, শাঁসালো শ্বশুর পাকড়ে মালকড়ি হাতানোর তাল।

    ওসি বিষম খেলেন কিন্তু সুদীপ সেই শর্ত মেনে নিল। শিগগিরই এই স্বয়ংবর সভা হবে— সম্ভবত আগামী সপ্তাহের কোনদিন। চিত্তদা পাঁজি দেখে ওদের পুরুত ঠাকুরের সঙ্গে পরামর্শ করে দিনক্ষণ ঠিক করবে।

    —বেশ, এখানে আমাদের কী করার আছে জব মিঞা বিবি রাজি, তো কেয়া করেগা কাজি! সুদীপ যখন ঘটা করে টোপর পরে বিয়ে করতে যাবে, আমরা ওর বরযাত্রী হতে পারি। ওর বাড়ি থেকে কেউ আসুক বা না আসুক। আমরাও একরকম ওর পরিবার।

    পচা জুড়ে দেয়—তাছাড়া চিত্তদার বড় মেয়ে রাধাদি। ওদের বাড়ির প্রথম কাজ। চিত্তদা ভাল করে খাওয়াবে নিশ্চয়ই। খাঁটি দুধের রসগোল্লা সন্দেশ দিয়ে বরযাত্রীদের জলযোগ করাবে।

    —এখানে আমাদের কিছু করার আছে। আমাদের ঠেকে সবার সাহায্য চেয়ে সুদীপ অনুরোধ করেছে। কারণ চিত্তদার গয়লা বুদ্ধি, অমন প্রস্তাবের মধ্যে নিঘঘাৎ কোন প্যাঁচ আছে। দেখ, যদি তিন ডাকে সাড়া দিয়ে রাধা নেমে না আসে, তাহলে ধরে নেয়া হবে রাধা সুদীপের ব্যাপারে সিরিয়াস নয়।

    বিপুল অবাক। —বুঝলাম না, রাধা রাজি হবে না কেন? শেষ মুহূর্তে কেস গুবলেট করার চান্স আছে?

    —আরে রাধাকে তো কিছু সামনাসামনি জিজ্ঞেস করা হচ্ছে না। ও ডাক শুনে এককাপড়ে নেমে আসেনি মানেই রাজি নয়। আর আমাদের সুদীপ থানার ওসির সামনে কথা দিয়েছে যে অমন হলে ও আর কখনও রাধার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। হ্যারাসমেন্টের ঠান্ডা ফাইল আবার গরম হয়ে উঠবে।

    হতে পারে যে রাধা নেমে আসল। কিন্তু চিত্তদা বিধানপল্লীর ছেলেদের উসকে দিয়ে সুদীপকেই তুলে নেয়ার ব্যবস্থা করল। অলরেডি নাকি সবুজ সংঘের ছেলেদের বলছে—বেপাড়ার একটা হতচ্ছাড়া ছেলে এসে তোদের পাড়ার মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে আর তোরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবি?

    এইখানে আমাদের ভূমিকা।

    —ওকে, তোরা সবাই সাহায্য করতে রাজি তো? তাহলে তৈরি থাক। এ বিয়ে হবেই। আজ মঙ্গলবার, রোববার নাগাদ পাকা খবর পেলে প্ল্যান ফাইনাল হবে। আমি এখন কলেজ যাচ্ছি। একটা ক্লাস মিস হোল, সে ঠিক আছে।

    আড্ডার সান্ধ্যকালীন গোপন অধিবেশন

    সেদিনই বিজনের বাড়ির ছাদে আমাদের আর্জেন্ট মিটিং। সুদীপ আগেই এসে গেছে। সুবীরদা, নারাণদা, বিজন ও আমি আলাদা আলাদা এসেছি এবং একটু এগিয়ে পিছিয়ে। অবশ্য একজন অতিরিক্ত সদস্য এসেছে—সুবীরদা রেকো করায়—আমাদের পচা ওরফে শ্রীমন্ত। বাকিদের কিছু জানানো হয়নি।

    হঠাৎ এই আর্জেন্ট মিটিং? রাধার আর তর সইছে না?

    —ব্যাপারটা গুরুতর এবং বহুমাত্রিক। এক, ওর ছোটবোন বৃন্দা মহা পাকা। ওকে জ্বালিয়ে মারছে। সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে ‘বাঘিনী’ সিনেমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের একটা বিচ্ছিরি প্যারডি গুনগুন করছেঃ

      যখন ডাকবে সুদীপ রাধা এসে দাঁড়াবে জানলায়,

      জ্বলে পুড়ে মরল রাধা যৌবন জ্বালায়।

    —মহাবিচ্ছু তো!

    —বিচ্ছু বলে বিচ্ছু!

    দুই নম্বর, ওর বাবা ঠিক করেছে ওর ‘স্বয়ংবর’ পরশু দিন লক্ষ্মীপুজোর সময় হবে; এবং ওই স্বয়ংবর সভার সাক্ষী হিসেবে ওদের পাড়ার সবুজ সংঘের ছেলেদের ডাকা হয়েছে। একটি ছোট পাখির মুখে খবর পেয়েছি—সুদীপ মাঠে এসে হাজির হলে ডাকার আগেই ছেলেগুলো ওর সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধাবে, সেই ঝগড়া হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াবে। তবু যদি কোন ফাঁকে ও ডাকতে শুরু করে তখন প্ল্যান বি। রাধাকে তৎক্ষণাৎ ওর বাথরুমে বন্ধ করে দেয়া হবে এবং মা কাকিমারা উলু দিতে আর শাঁখ বাজাতে শুরু করবেন। আধঘন্টা পরে বাথরুমের দরজা খোলা হবে।

    সুবীরদা গম্ভীর। —ওই ছোট পাখিটি কে?

    —দেখতেই পাবে। ওর এতক্ষণে এসে যাওয়ার কথা। একটু বাদে সবার জন্যে চা নিয়ে একটি মেয়ে ছাদে এল। বোঝা যায় নতুন শাড়ি ধরেছে। বুকের উপর আঁচল টানার কায়দা এখনও রপ্ত হয়নি। একে তো বিজনের বাড়িতে কখনও দেখিনি।

    সুদীপ বলল—আলাপ করিয়ে দিচ্ছি। এ হোল সেই ছোট্ট পাখি—বৃন্দা ঘোষ। রাধার ছোট বোন।

    —আপনারা আমাকে টুসি বলতে পারেন। শোন সুদীপদা কাজের কথায় এস, প্ল্যান সি চাই। আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। কোচিং থেকে কেটে এসেছি আধঘন্টার জন্যে।

    উত্তেজিত কথাবার্তার মাঝে অনেকগুলো প্ল্যান নিয়ে কথা হল। কিন্তু সবগুলোতেই অনেক ফাঁকফোকর।

    টুসি ছটফট করছে। ঘড়ি দেখছে। শেষে বলল—আমাকে এবার যেতে হবে।

    —সে কী? এখনও তো কোন প্ল্যান ঠিক হোল না। আর তোকে বাদ দিয়ে? তাহলে রাধাকে খবরটা কে দেবে?

    —তোমাদের বাকতাল্লা অনেক শুনলাম। আমার ছোট মুখে বড় কথা ক্ষমা করে দিও। আমি একটা প্ল্যান দিচ্ছি—এটা কাজে আসবে। তবে সুবীরদাকে একটু অ্যাক্টিং করতে হবে। কি, পারবে তো? আরে, বন্ধুর জন্য এটুকু করতে পারবে না?

    সুবীরদা হকচকিয়ে গেল। আমি আর অ্যাক্টিং? তাও স্টেজে নয়, রিয়েল লাইফে?

    টুসি অন্য মূর্তি ধরল।

    —ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি, তবে যাবার আগে আমার প্ল্যানটা চটপট বলে দিচ্ছি। তারপর তিরিশ সেকেন্ড। যদি তোমাদের ঠিক মনে হয় তো থাম্বস্‌ আপ দেবে। নইলে যা ভাল বোঝ কর, আমি আর এর মধ্যে নেই।

    —আমার প্ল্যানের নাম সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। আচমকা হামলা। বাবার নিয়মে খেললে আমরা হেরে যাব। কাজেই সুদীপদাকে যেতে হবে পরশু নয়, কালকেই। আর রাত্তিরে নয়, সকাল সাড়ে আটটায়। দিদি ঠিক সেই সময়ে নীচে নেমে আসবে। আর দিদিকে দেখতে পেলেই সুদীপদা তিনবার ডাক দেবে, দিদি দৌড়ে এসে সুদীপদার হাত ধরবে আর তারপর সুদীপদা যদি ”বীর জারা” ফিল্মের শাহরুখ হয়ে যায়—।

    —সে কী রে! তুই তো স্ক্রিপ্ট বদলে দিলি! আগে আমি ডাক দেব, তবে তোর দিদি নীচে নামবে—কথা তো এরকম ছিল।

    —ধুস্‌ তুমি একটা—। বাবা ক্রিকেট খেলতে চায়, আমরা ডাংগুলি খেলব, তবে না? সবুজ সংঘের ছেলেরা পরশু রাতের জন্য তৈরি হচ্ছে, আমরা ওদের প্ল্যান এভাবে পাংচার করে দেব। তারপর সুদীপদা দিদিকে নিয়ে থানায় ওসির সংগে দেখা করবে। দিদি বলবে আমি সাবালিকা, কলেজে পড়ি। নিজের ইচ্ছেয় সুদীপকে বিয়ে করতে চাই। সুদীপদা বলবে ওনার তিনবারের ডাক শুনে দিদি নীচে এসেছে।

    —কিন্তু এটা তো সত্যি নয়!

    —ধেৎ তোমরা কোন দুনিয়ায় থাকো? আদালতে সাক্ষী সাবুদ নিয়ে যা প্রমাণ করা যায় সেটাই সত্যি, নইলে জেলগুলোতে জায়গা হত না।

    —তো সাক্ষী?

    —সেটাও আমি বলে দেব? বিজনদা, নারাণদা, শ্রীমন্ত সবাই সুদীপদার সঙ্গে যাবে, ওরা সাক্ষী দেবে—হ্যাঁ, আমাদের সামনে সুদীপের ডাক শুনে রাধা নীচে নেমেছে। ব্যস।

    সুবীর গম্ভীর গলায় বলে—এই প্ল্যানটা শুনতে ভাল, কিন্তু মস্ত ফাঁক। রাধা নীচে নামতে গেলে কেউ বাধা দেবে না?

    —না। মা কাকিমারা তো পরশু রাতের কথা ভেবে তৈরি। তবে বাবাকে আটকাতে একটা ডাইভার্সন চাই, একটু ঘুড়ি ওড়াতে হবে। সেটা সুবীরদাকে করতে হবে—অ্যাক্টিং!

    সুবীরদার ভুরু কুঁচকে যায়—কীসের অ্যাক্টিং?

    — সুদীপদা যাবে সাড়ে আটটায়, তুমি যাবে আমাদের বাড়িতে আটটায়। গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করে বলবেঃ আপনার ছোটমেয়েকে আমার খুব পছন্দ। আমি বৃন্দাকে বিয়ে করতে চাই। তাই আপনার অনুমতি চাইতে এসেছি।

    —অ্যাঁ!

    —অ্যাঁ নয় হ্যাঁ। ফলটা হল বিশাল কিচেইন হবে। চেঁচামেচি। আমাকে ডেকে আনা হবে। মা-কাকিমারা সব ড্রয়িংরুমে জড়ো হবেন। আমি ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদব, বলব —সব বাজে কথা। এর সংগে আমার আলাপ নেই। আর আমি কক্ষনোও বাবা মায়ের অমতে বিয়ে করব না।

    ভয় পেয়ো না। পাড়ায় তোমার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট একেবারে বাঁধিয়ে রাখা আছে। তারপর তুমি পড়াশোনায় ভালো—সুপাত্র।

    বাবা বলবে মেয়ে এখনও পড়ছে, উচ্চ মাধ্যমিক দেবে। তুমি বলবে—না না। ওর বয়েস আঠেরো হলে তবেই। আমি অপেক্ষা করতে রাজি। আর ততদিনে আমিও একটা ভাল চাকরি পেয়ে যাব। বুঝতেই পারছ সুবীরদা, তুমি হলে বাংলা সিরিয়ালের মেটেরিয়াল। এই সব করে আধঘন্টা পার করতে হবে। ঠিক সাড়ে আটটায় দিদি চুপচাপ নীচে নেমে যাবে।

    বিজন—কিন্তু বাবা মা যদি তোকে সুবীরের হাতে সম্প্রদান করতে চান?

    —দেখা যাবে। তখন বলে দেব আমি কোন চশমাওলা চারচোখোকে বিয়ে করব না। অনেক দেরি হল। এবার আমি পালাই।

    বিনা বাক্যব্যয়ে আমাদের সবার বুড়ো আঙুল উপরে উঠে যায়।

    সুদীপ ও রাধার বিয়ে ভালভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, দু’একটা হেঁচকি ছাড়া। এক বছর কেটে গেছে। এখন সুদীপ বাটার দোকানের চাকরি ছেড়ে শ্বশুরের পুঁজিতে শ্রীলেদার্স আর রাদুর ডিলারশিপ নিয়ে জুতোর দোকান খুলেছে। মালিকানা রাধার নামে।

    সুদীপ আড্ডায় বিশেষ আসে না। বড্ড ব্যস্ত। তবে আমাদের সবাইকে লেদারের পাম্পশু উপহার দিয়েছে।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments