• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • হিমিনবিয়রগ-এর গল্প : অ্যালডা সিগমণ্ডসডটির
    translated from English to Bengali by ছন্দা চট্টোপাধ্যায় বিউট্রা

    ভূমিকা

    বরফের দেশ আইসল্যান্ড। লোকের সংখ্যা খুব কম, দেশটা পাহাড়, গুহা, নদী, সমুদ্র, বাষ্পকুণ্ড, আগ্নেয়গিরি ইত্যাদিতেই ভরা। লম্বা, একটানা, অন্ধকার শীতের দিনে প্রাগৈতিহাসিক লোকেরা আগুনের ধারে জড়ো হয়ে, নানা রকম ভূত-প্রেত দত্যি-দানোর কাহিনী কল্পনা করতো। অনেকেই এখনও পাহাড়, গুহা এমনকি ছোট্ট টিলা বা পাথরের ঢিপিকেও দৈত্য বা রাক্ষস বলে কল্পনা করে। রাজা-রাজড়া, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব, রাক্ষস-খোক্কস, দুষ্টু বামন, ডাইনি, নানারকম উদ্ভট শেয়াল-বেড়াল, মানুষ-মাছ জাতীয় প্রাণী, আর অদৃশ্য আত্মা, এদের সবাইকে নিয়েই আইসল্যান্ডের রূপকথা।

    উনিশ শো শতকের মাঝামাঝি ইওরোপে বিভিন্ন দেশের রূপকথা, লোককথার ওপর খুব আগ্রহ জন্মেছিল। এপর্যন্ত গল্পগুলি মৌখিক ছিল। এখন সেগুলি লিখে ছাপানো হল, জার্মানিতে গ্রিম-এর রূপকথা সংকলন শুরু হল। আইসল্যান্ডে জন আরনাসন ও মাগনাস গ্রিমসন দুজনে ১৮৫২ সালে প্রথম দেশীয় গল্পগুলো প্রকাশ করেন। প্রথম প্রথম বেশি বিক্রী না হলেও ১৯৫০-৬০ থেকে গল্পগুলি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

    আমি কয়েক বছর আগে আইসল্যান্ডে গেছিলাম, দেখেছি অনেক শিক্ষিত লোকেদের মধ্যেও ভূতপ্রেতে বিশ্বাস এখনো আছে। এখনো, রাস্তা তৈরির সময় একটা ঢিপি দেখলে অনেকেই সেটা না সরিয়ে, ঘুরপথে রাস্তাটা বানায়। ঐসময় থেকেই আমার আইসল্যান্ডের রূপকথার সম্বন্ধে কৌতূহল জন্মায়। সম্প্রতি অ্যালডা সিগমণ্ডসডটিরের সংকলন পড়ে কিছু অনুবাদ করার ইচ্ছা হল। সব দেশেই রূপকথা প্রচলিত। আইসল্যান্ডের গল্পের সঙ্গে জার্মানি বা ডেনমার্কের গল্পের অনেক মিল দেখা যায়। তবে, পড়তে গিয়ে একটা জিনিশ লক্ষ্য করলাম, ইয়োরোপে এবং বাংলাদেশেও রূপকথায় সৎ-মাদের খুব নিষ্ঠুর ও কুটিল দেখানো হয়, কিন্তু আইসল্যান্ডের সৎমারা তুলনায় অনেক ভালো ও সৎ-ছেলেমেয়েদের বেশ যত্ন-আত্তি করেন। হিমিনবিয়রগের গল্পটি তারই একটি উদাহরণ।

    --লেখক

    হিমিনবিয়রগের গল্প

    এক যে ছিল রাজা। তার ছিল এক রানি, এবং এক বিশা-আ-আ-আ-ল সাম্রাজ্য। আমরা রাজা আর রানির নাম জানি না। তাদের ছিল এক ছেলে, রাজপুত্র। সে ছিল বাবা ও মায়ের চোখের মণি। তার নাম আমরা জানি, সিঙ্গুইন্দুশ। সিঙ্গুইন্দুশ খুব মিষ্টি ছেলে। অসাধারণ প্রতিভাধরও বটে। সবাই তাকে ভালবাসে। সে-ও তার বাবা-মাকে খুব ভালোবাসত।

    সিঙ্গুইন্দুশ যখন বড়ো হয়ে উঠেছে, সেই সময় হঠাৎ একটা কঠিন অসুখে রানির মৃত্যু হল। সারা রাজ্যে হাহাকার পড়ে গেল। রাজা ও রাজপুত্র তো এতই শোকাহত যে খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত ভুলে গেছেন। সবাই তাঁদের সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে বিফল হল। অবশ্য সময়ের সঙ্গে, ধীরে ধীরে রাজা শোকটা কাটিয়ে উঠতে পারলেন কিন্তু রাজপুত্র সিঙ্গুইন্দুশ তখনো মায়ের শোকে মনমরা। রাতের বেলা সে মায়ের কবরের ওপর শুয়ে থাকে, নিঃসঙ্গ, হতাশ। কেউ তাকে ওঠাতে পারে না। এভাবে কয়েক মাস কাটল।

    একদিন যখন রাজা ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ শহরের বাইরে একটা খেলা দেখতে গেছেন, একটা ধোঁয়াটে মেঘ ঠিক রাজার মাথার ওপর দেখা দিল, দেখতে দেখতে মেঘের পর্দা সরিয়ে একটি মেয়ে মাটিতে নেমে এল। দেখতে সে অপূর্ব সুন্দরী। সবাই একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি সোজা রাজার সামনে এসে সশ্রদ্ধে অভিবাদন করল। রাজা অবাক হয়ে তার নাম জিগ্যেস করতে সে জানাল তার নাম হিমিনবিয়রগ এবং সে রাজার সভায় যোগ দিতে চায়। রাজার মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা তো ভীষণ সন্দেহপ্রবণ। এই উটকো মেয়েটার মনে কী আছে কে জানে। হয়তো ছদ্মবেশী কোনও ডাইনি বা রাক্ষসী, তুকতাক করে কোনো দুর্বিপাক বাধিয়ে বসবে। কিন্তু রাজা ততক্ষণে মেয়েটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েছেন। উপদেষ্টাদের পরামর্শ তাঁর কানেও গেল না। তিনি তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে নিজের সভায় আমন্ত্রিত করে নিলেন।

    হিমিনবিয়রগ তার মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে খুব অল্পসময়ের মধ্যেই রাজসভায় সবার মন জয় করে নিল। রাজা তো প্রথম থেকেই তার প্রেমে মজেছেন। যখন বিবাহপ্রস্তাব এল, রাজমন্ত্রীদের কেউই আর আপত্তি করল না।

    যথাসময়ে, খুব ধুমধাম করে রাজা আর হিমিনবিয়রগের বিয়ে হয়ে গেল। সারা রাজ্য জুড়ে বিরাট ভোজের আয়োজন হল। সবাই দেখল রাজা তাঁর আগের রানির শোক পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছেন। সবাই খুব খুশি, শুধু সিঙ্গুইন্দুশ ছাড়া। সে কোনো উৎসব আয়োজনে যোগ দেয়নি। একা একা মা’র কবরের পাশে সারা দিন কাটিয়েছে। রাজা ও তাঁর মন্ত্রীবর্গ এতে মোটেই খুশি হননি কিন্তু তাঁরা কেউই রাজপুত্রকে এক চুল নড়াতে পারলেন না।

    এক রাত্তিরে, যখন সিঙ্গুইন্দুশ তার মায়ের কবরের ওপর শুয়ে, শ্রান্তিতে হাত পা অবসন্ন, ঘুমের মধ্যে সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। সে দেখল তার মা’কে। মা খুব রেগে আছেন মনে হল।

    “এই ভাবে এখানে শুয়ে আছো তুমি?” মা রাগতভাবে বললেন, “এই রকম রোজরোজ কান্নাকাটি, হা-হুতোশ, এসব আমার একটুও পছন্দ নয়! এর শাস্তিস্বরূপ তোমায় একটা কাজ দিচ্ছি। এক অভিশপ্ত, রাক্ষসীবেশী রাজকন্যাকে শাপমুক্ত করে উদ্ধার করতে হবে, নইলে তুমি এক দিনের জন্যও শান্তি পাবে না।”

    মা তো মুখ ফিরিয়ে গটমট করে চলে গেলেন। সিঙ্গুইন্দুশ জেগে উঠল, তার মনে হল মা যেন কবর থেকেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মনমরা হয়ে সে বাড়ি ফিরে আবার শয্যা নিল। আবারও সবাই তাকে ওঠাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল।

    এবার রাজা নতুন বউ হিমিনবিয়রগের কাছে সাহায্য চাইলেন। যদি সে কোন উপায়ে রাজপুত্রর মনোব্যথা সারিয়ে তুলতে পারে। হিমিনবিয়রগ খুব যত্ন নিয়ে, কোমল কিন্তু বিচক্ষণভাবে প্রশ্ন করে করে সিঙ্গুইন্দুশের স্বপ্নের ব্যাপারটা জেনে নিল, বুঝে নিল ওর মানসিক সমস্যাটার মূল কারণ।

    “এটা তো ভারী মুশকিলের ব্যাপার,” হিমিনবিয়রগ বলল, “জাদুবল জিনিশটা ভীষণ শক্তিশালী, আর এই অভিশাপের তো কোনো ছাড়ান নেই। একমাত্র উপায়, আমার এক পালিতা মা, সে ছাড়া আর কেউ তোমায় সাহায্য করতে পারবে না। আমি বলি কি, যত তাড়াতাড়ি পারো তোমায় তার কাছে যেতে হবে। আমার এই বেল্ট আর ছুরিটা সঙ্গে রাখো, এগুলো প্রমাণ যে আমি তোমার জন্য সাহায্য চাইছি। আর এই সুতোর গুটলিটাও নাও। এটা সামনে ছড়িয়ে দাও, আর সুতোটা ধরে পেছন পেছন হাঁটলে ঠিক আমার সৎমা’র বাড়ি পৌঁছে যাবে। আরেকটা কথা, রাস্তায় যাদের সঙ্গে দেখা হবে, সবাইএর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে আর দরকার পড়লে সাহায্যও করবে। অবশ্য আমার মনে হয়, তুমি যাবার পর তোমার বাবা ও তাঁর বন্ধুরা তোমায় তাড়াবার জন্য আমার ঘাড়ে সব দোষ চাপাবে। তোমায় কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। তুমি সাহায্য না করলে আমার ফাঁসিও হতে পারে।”

    হিমিনবিয়রগ আর সিঙ্গুইন্দুশ দুজনে দুজনের গলা জড়িয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নিল।

    পরদিন থেকে সিঙ্গুইন্দুশের আর খোঁজ পাওয়া গেল না। কেউ জানে না কোথায় সে হারিয়ে গেল।

    এবার আমরা দেখি সিঙ্গুইন্দুশের যাত্রার কী হল। সে পায়ে হেঁটে চলেছে, বন জঙ্গল পেরিয়ে, পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে। তার খিদে-তেষ্টা নেই, কারণ সৎমা হিমিনবিয়রগ তাকে দিয়েছে একটা জাদুর থলিভরা খাবার, যা কখনোই ফুরোয় না। সুতোর গুটলিটা গড়িয়ে চলেছে আগে আগে, সে তার পেছনে পেছনে। একটা সমুদ্রতীর পৌঁছে সে তীর ধরে ধরে চলতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে একটা টিলার ওপর দেখল একদল দাঁড়কাক। প্রায় পঞ্চাশটা পাখির দল টিলার ওপর বসার জায়গা নিয়ে ঠেলাঠেলি, চ্যাঁচামেচি করছে। একটা দুর্বল কাক মাটির ওপরেই শুয়ে পড়ল। সিঙ্গুইন্দুশ অবাক হয়ে এইসব দেখছে, হঠাৎ সৎমা’র উপদেশ মনে পড়ায় সে কুড়ুল দিয়ে টিলার ওপর খাঁজ কেটে কেটে সব পাখিগুলোর বসার জায়গা করে দিল, এমনকি সেই দুর্বল কাকটাকেও। তারপর সবাইকে কিছু দানাপানি দিয়ে যখন সে যাবার জন্য তৈরি, কাকরা সবাই তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, ‘যদি কখনো দরকার পড়ে, আমাদের ডেকো।’

    সিঙ্গুইন্দুশ আবার চলতে শুরু করল। এবার পথে পড়ল আরেকটা পাথুরে টিলা, তার ওপর পঞ্চাশটা সী-গাল পাখি বসার জন্য ঠেলাঠেলি করছে। আবার সে আগের মতো সবাইকে বসার জায়গা করে দিল। এরাও তাকে ভবিষ্যতে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিল।

    তৃতীয় টিলায় এবার সে দেখল পঞ্চাশটি ঘুঘু পাখি। এদেরও কাক আর সী-গালদের মতো সাহায্য করে সিঙ্গুইন্দুশ হাঁটা লাগাল। এবারে আর কোন পাখি নয়, সে এসে পৌঁছল একটা ছোট্ট কুটিরের সামনে। সুতোর গুটলিটা কুটিরের আধখোলা দরজার সামনে এসে থামল। সিঙ্গুইন্দুশ দরজার কড়া নাড়তেই দেখে এক থুত্থুরে বুড়ি, বয়সের গাছপাথর নেই। নাম জিজ্ঞাসা করতে একটু ইতস্তত করে বলল ‘ব্লাকাপা’, কিন্তু থাকার কথা বলতেই বুড়ি দোনামনা করতে লাগল, ‘আমার কুটির ভীষণ ছোট, তোমার জায়গা হবে না। তাছাড়া, আমি তো তোমার নামও জানি না।’ এবার সিঙ্গুইন্দুশ হিমিনবিয়রগের নাম করতেই বুড়ির মুখে হাসি আর ধরে না। ‘আহা আমার পালিতা মেয়ে, সুখে থাক, ভালো থাক। কী খবর তার?’

    সিঙ্গুইন্দুশ বলল, ‘সে আমায় পাঠিয়েছে তোমার সাহায্য চাইতে।’ বলে সে হিমিনবিয়রগের বেল্ট আর ছুরিটা বুড়িকে দেখাল। বুড়ি বলল, ‘তাই বটে! তাই বটে! আচ্ছা, তুমি আজ রাতটা এখানে থাকতে পারো।’

    ভেতরে ঢুকে সিঙ্গুইন্দুশ দেখল পরিপাটি করে সাজানো টেবিল, থালাভরতি খাবার, পেট ভরে খেয়ে সে নরম বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।

    পরদিন ভোরে উঠেই বুড়ি সিঙ্গুইন্দুশের পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে পড়ল। সিঙ্গুইন্দুশ যথাসম্ভব তার কাহিনীটা জানিয়ে তার যাত্রার কারণটাও খুলে বলে দিয়েছিল। শুনতে শুনতে ব্লাকাপার মুখে চিন্তার বলিরেখাগুলো আরও গভীর হয়ে উঠল।

    “তোমার সমস্যাগুলো বেজায় কঠিন, সিঙ্গুইন্দুশ, যেভাবেই দেখো না কেন।” ব্লাকাপা বলল, “আমি জানি তোমায় কোথায় যেতে হবে। ওখানে কাছেই এক বীর রাজার প্রাসাদ আছে। তার রাজকন্যা ইঙ্গিগেরদুর, তার পরিচর্যা করে আঠারোটি সুন্দরী—প্রত্যেকেই অভিজাত বংশের কন্যা। কয়েক বছর আগে, তার মা, রাজরানির মৃত্যুর পর, কেউ জানে না কোথা থেকে, প্রাসাদে এক অপরূপ সুন্দরীর আবির্ভাব হয়। সে কিন্তু আসলে এক ভয়ঙ্কর রাক্ষসী। রাজা তো তার রূপের ফাঁদে পড়ে তাকে রানি করে নিলেন। ব্যাপারটা কিন্তু ইঙ্গিগেরদুরের মোটেই পছন্দ হয়নি। ছদ্মবেশী সৎ মায়ের সঙ্গে তার একেবারেই বনিবনা হয়নি বরং শত্রুতাটা ক্রমশই বেড়ে চলছিল। একদিন রাক্ষসী রানি ইঙ্গিগেরদুরের কামরায় গিয়ে, ঘুমন্ত রাজকন্যাকে এমন জাদু করে দিল যাতে রাজকন্যা ও তার আঠারোটি সেবিকারা সবাই কুৎসিত রাক্ষসে পরিণত হয়ে যায় আর রাজাকে মেরে ফেলে সমস্ত রাজ্য ধ্বংস করে দেয়।

    “রানির রূপে রাক্ষসী তো জাদু করেই হাওয়া, কিন্তু রাজকন্যা ও তার সেবিকারা এখন এক একজন ভয়ঙ্করী রাক্ষসী, সমস্ত রাজ্য ছারখার হয়ে গেছে। এখন এর কাছেই তোমায় যেতে হবে। এরা অতি ভয়ানক। এর আগে অনেকেই চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউই জীবিত ফিরে আসেনি। কপালে অশেষ ভাগ্য না থাকলে তুমিও ফিরবে না।

    “কিন্তু, তোমার ওপর আমার মেয়ে যে জাদুটা করেছে সেটাও খুব শক্তিশালী। তাই আমি তোমাকে বেশি নিরুৎসাহ করব না। বরং তোমায় যথাসাধ্য সাহায্য করব, আমার পালিত কন্যার ইচ্ছাও তো তাই। যাও, আজই গিয়ে ঐ রাক্ষসীটার মোকাবিলা করো। সভায় সদর্পে ঢুকবে কিন্তু বসবে একেবারে পিছনে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সব প্রশ্নের উত্তর দেবে। ভয় পেলে চলবে না কিন্তু।”

    সিঙ্গুইন্দুশ চলল রাক্ষসীর প্রাসাদে। প্রাসাদের দরজা খোলাই ছিল, তাই ওর ঢুকতে কোনো অসুবিধা হল না। ব্লাকাপার উপদেশ মতো সে সভায় সবার পেছনে দাঁড়াল। একটু পরেই সারা প্রাসাদ কাঁপিয়ে এক বিরাট কিম্ভুতকিমাকার রাক্ষসী সভায় ঢুকল, তার পেছন পেছন আঠারোজন বিকটাকার রাক্ষসী। সিঙ্গুইন্দুশ এত বিকট রাক্ষস আগে কখনো দেখেনি। সবথেকে ভয়ঙ্কর রানি রাক্ষসী। সে সিঙ্গুইন্দুশের দিকে তার লোমশ দুই ভুরু কুঁচকে তাকাল, “কে তুমি? এখনে কেন এসেছ?”

    সিঙ্গুইন্দুশ খুব শান্তভাবে উত্তর দিল যে সে নিজেই জানে না, ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছে, ভেবেছে এখানে একটু বিশ্রাম নিতে পারবে।

    “এখানে থাকতে হলে তোমায় খাটতে হবে, মাগনা থাকা চলবে না।”

    রাক্ষসী সিংহাসনে বসে একটা পুরো সোনা দিয়ে তৈরি দাবার ছক টেনে নিল, “এখানে থাকতে হলে, অবিকল এই রকম আরেকটা দাবার বোর্ড নিয়ে এসো, ঠিক এইরকম সুন্দর চাই কিন্তু।”

    “কিন্তু, কোথায় পাব এরকম জিনিশ?”

    “তা আমি বলব কেন? তোমায় খুঁজে বার করতে হবে, আর মনে রেখো, তিন সূর্যোদয়ের আগে চাই কিন্তু।”

    সিঙ্গুইন্দুশ ফিরে গিয়ে ব্লাকাপাকে জানাল তার সমস্যা। ব্লাকাপা সব শুনে বলল, “সহজ কর্ম নয়। এরকম দাবার ছক শুধু একটিই আছে, দুই বামন সেটা প্রাণ দিয়ে আগলে রাখে। সেটা নিতে গেলে প্রথমে বামন দুটোকে মারতে হবে। তোমার তিন দিন সময় তো। তাহলে চলো। এক্ষুনি বেরুই।”

    দুজনে একটা ছোটো নৌকোয় সমুদ্রের ধার ঘেঁষে চলল। একটু পরেই দেখল একটা বিরাট পাথর, জল থেকে সোজা উঠে গেছে। তার ভেতরেই বামনদের বাস। চতুর ব্লাকাপা বামনদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাইরে ডেকে আনতেই সিঙ্গুইন্দুশ তলোয়ারের ঘায়ে দুজনকেই একসঙ্গে সাবাড়। ব্লাকাপা চটপট দাবার ছকটা বার করে নিল আর রাক্ষসীর প্রাসাদে পৌঁছে সিঙ্গুইন্দুশ ছকটা লুকিয়ে কোলে করে আগের মতো সভার একেবারে পেছনে বসে পড়ল।

    রাক্ষসী এসে সিঙ্গুইন্দুশকে দেখে একটু অবাক, “আবার তুমি? দাবার বোর্ডটা এনেছ?”

    যখন সিঙ্গুইন্দুশ বলল যে সে আনেনি কেননা তাকে তো কেউ বলে দেয়নি যে সেটা কোথায় পাবে, রাক্ষসীর হাঁড়িমুখ আরও হাঁড়ি হল। তার আঠারোজন সঙ্গীদের হুকুম দিল সিঙ্গুইন্দুশকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে। কিন্তু তারা সিঙ্গুইন্দুশকে ধরবার আগেই সে চট করে ছকটা বের করে ফেলল। রানি তো একেবারে অবাক।

    “তুমি পেরেছ দেখছি। কিন্তু তোমার কাজ এখনও পুরো হয়নি।” বলে রানি সিঙ্গুইন্দুশকে পাশের ঘরে নিয়ে দেখাল, চারটা মোটা মোটা সোনার থাম, মাথার ওপর কাঁচের ছাদটা ধরে আছে। “আমার ঠিক এইরকম আরেকটা থাম চাই, আগাগোড়া সোনার, আর ঠিক এইরকম কারুকার্য করা। তিন সূর্যোদয় সময় দিলাম। নইলে তোমার কপালে মরণ।”

    সিঙ্গুইন্দুশ অবশ্য জিগ্যেস করেছিল, এমন থাম কোথায় পাওয়া যেতে পারে কিন্তু রানি আগের মতই ঠোঁট উলটে বলে দিল, “আমি কি জানি, সে তোমার কাজ।”

    সিঙ্গুইন্দুশ আবার গেল ব্লাকাপার কাছে। ব্লাকাপা বলল, “বাপ রে, তোমার তো দেখছি সমস্যার শেষই নেই! তবে এটা কিন্তু আগেরটার থেকেও বেশি কঠিন।” বলে তাকে নিয়ে সারাদিন হেঁটে একটা দূর শহরে পৌঁছল। সেখানে প্রাসাদে ঢুকবার আগে ব্লাকাপা সিঙ্গুইন্দুশকে একটা ম্যাজিক পাথর দিয়েছিল, সেটা হাতে রাখলে একেবারে অদৃশ্য হওয়া যায়। দুজনে অদৃশ্য হয়ে প্রাসাদে ঢুকে পড়ল। তারপর রাত্তিরে যখন প্রহরীরা ঘুমে অচৈতন্য, ওরা দুজনে সোনার থামের খোঁজে বেরুল। ব্লাকাপার জাদুবলে বন্ধ দরজাগুলো খুলে দেখতে দেখতে একটা ঘরে ওরা পেল সেই সোনার থাম। কিন্তু হাজার চেষ্টাতেও সিঙ্গুইন্দুশ থামটা একচুলও নড়াতে পারল না। আবার ব্লাকাপা তার ব্যাগ থেকে একজোড়া দস্তানা বের করে পরে নিয়ে এক ঝটকায় থামটা তুলে নিল কাঁধের ওপর। সিঙ্গুইন্দুশ তো একেবারেই কাহিল হয়ে পড়েছিল। তারপর তারা অদৃশ্য অবস্থাতেই রাক্ষসীর প্রাসাদে পৌঁছে সোনার থামটা ছাতের নিচে বসিয়ে দিল। তারপর ব্লাকাপা ফিরে গেল নিজের বাড়ি আর সিঙ্গুইন্দুশ সভার পেছনের আসনে বসে পড়ল রাক্ষসী রানির অপেক্ষায়।

    রাক্ষসী তো সিঙ্গুইন্দুশের সাফল্যে স্তম্ভিত। “তুমি তো অবাক করলে দেখছি। এত অল্প বয়সেই এত চাতুরি? তুমি নিশ্চয়ই একা নও, কারুর কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছ। তাই না? তবে তোমার কাজ এখনও শেষ হয়নি। জঙ্গলে আমার একটা বলদ আছে, তোমাকে সেটা মারতে হবে, তারপর আমার টেবিল ক্লথে তার রক্ত মাখিয়ে, সেটা কেচে একেবারে ফুটফুটে সাদা করে ফেলবে, তার চামড়া দলাইমলাই করে উলের মতো নরম করতে হবে, আর তার শিং পালিশ করে সোনার মতো ঝকঝকে করে দেবে। এসব তোমায় তিন সূর্যোদয়ের আগেই সারতে হবে, নইলে তোমার মুণ্ডু আর তোমার ঘাড়ে থাকবে না।” বলে রানি গটমট করে সভা থেকে বেরিয়ে গেল।

    সিঙ্গুইন্দুশ আবার ছুটল ব্লাকাপার কাছে। গিয়ে সব খুলে বলল। শুনে ব্লাকাপার মুখ কালো। “এবার তোমার কপালে মরণ দেখছি! ঐ বলদটা এক ভয়ঙ্কর জন্তু। তোমাকে জীবন্ত খেয়ে ফেলতে পারে। এবার আর আমি তোমায় বাঁচাতে পারব না। তোমার সঙ্গেও যেতে পারব না কিন্তু একটা কৌশল শিখিয়ে দিচ্ছি। এই ওষুধটা সঙ্গে নাও। যখন বলদটা দেখতে পাবে, মাটিতে ঐ টেবিল ক্লথটা বিছিয়ে তার ওপর এই ওষুধের গুঁড়ো ছড়িয়ে দাও। যখন বলদটা গুঁড়ো শুঁকবে তুমি চট করে ওর কাঁধে চড়ে এই ছোরাটা কাঁধের ঠিক মাঝখানে বিঁধিয়ে দেবে। জন্তুটা খুব দৌড়োদৌড়ি করবে, তোমায় ফেলে দেবার চেষ্টা করবে কিন্তু শক্ত করে ধরে থেকো। খুব বিপজ্জনক। এখন যাও, আশীর্বাদ করছি, সফল হও।”

    সিঙ্গুইন্দুশ ব্লাকাপার কথামতো বলদটা মেরে ফেলল। তারপর চামড়া আর শিং ছাড়াবার পর একেবারে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল। সময় আর বেশি নেই, এত সব কাজ কী করে শেষ করবে সে, আর না পারলে তো নির্ঘাত মৃত্যু। ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে পড়লো বন্ধু কাক, সী-গাল আর ঘুঘুর কথা। তাদের সাহায্য চাইবার এই তো সময়! মনে করতে না করতেই মাথার ওপর এক ঝাঁক পাখি—তারই বন্ধুর দল। তারা চটপট তিন দলে ভাগ হয়ে টেবিল ক্লথ, চামড়া আর শিঙটা নিয়ে উড়ে গেল। সিঙ্গুইন্দুশ বাড়ি গিয়ে ব্লাকাপাকে সব জানিয়ে দিতেই দুজনে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

    পরদিন সকালে তারা দেখল দরজার সামনে ফুটফুটে সাদা টেবিল ক্লথ, মাখনের মত নরম চামড়া আর উজ্বল পালিশ করা শিঙ, ঠিক যেমনটি রাক্ষসী চেয়েছিল। ব্লাকাপা বলল, “যাও, এসব রানিকে দিয়ে এসো। সে নিশ্চয়ই খুব চমকে যাবে। যদি দেখো তার চেহারাটা বদলে যাচ্ছে, এইটা ওর ওপর ছিটিয়ে দিয়ো।” বলে ব্লাকাপা সিঙ্গুইন্দুশকে একটা শিঙ ভর্তি তরল ওষুধ ধরিয়ে দিল। “অন্যদের ওপরও ছিটিয়ে দিতে পারো। তারপর তোমার যাকে পছন্দ তার সঙ্গে চলে এসো।”

    সিঙ্গুইন্দুশ আগের মতো সভায় গিয়ে পেছনে কোনায় বসল। প্রাসাদের সভায় রানিকে সেদিন আরও বেশি কুৎসিত দেখাচ্ছিল। সিঙ্গুইন্দুশ তার দিকে তাকাতেও পারছিল না। রানির প্রশ্নের উত্তরে সে কোনোরকমে মাথা নেড়ে জানাল যে কাজটা সে শেষ করতে পারেনি। শুনে রানি রেগেমেগে হুকুম দিল সিঙ্গুইন্দুশকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হোক। সবাই যখন কুড়ুল, তলোয়ার নিয়ে উদ্যত, সিঙ্গুইন্দুশ ঝট করে জিনিশগুলো রানিকে দেখিয়ে দিল। দেখামাত্র রানি এবং সাথিদের চেহারা বদলে যাচ্ছিল। সবাই অজ্ঞান হয়ে পড়তেই রাক্ষসীর ছদ্মবেশগুলো একে একে খসে পড়ল। আর তার জায়গায় দেখা দিল অপূর্ব সুন্দরী কুমারী।

    ওদের জ্ঞান ফিরবার আগেই সিঙ্গুইন্দুশ প্রাসাদের বাইরে একটা আগুনের কুণ্ড তৈরি করে সব রাক্ষসীবেশগুলো পুড়িয়ে দিল। তারপর ব্লাকাপার দেওয়া তরল জিনিশটা সবার গায়ে ছিটিয়ে দিতেই সবাই ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে উঠে বসল। রাজকন্যা ইঙ্গিগেরদুর অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছিল, “এ লোকটি কে? আমাদের সবার প্রাণ বাঁচিয়েছে?”

    সিঙ্গুইন্দুশ বলল তার নামধাম। কীভাবে ও কেন সে এতদূর এসেছে তাও জানাল। ইঙ্গিগেরদুর বলল, “তুমি আজ আমাদের এক বিরাট উপকার করলে। বলো কী পুরস্কার চাও। আমি কোন কিছুতেই না বলব না।”

    সিঙ্গুইন্দুশ নম্রভাবে জানাল যে সে রাজকন্যাকে বিয়ে করতে চায়। ইঙ্গিগেরদুরও অরাজি নয়, “কিন্তু তার আগে তুমি তোমার রাজ্যে ফিরে গিয়ে তোমার বাবা ও সৎ-মাকে তোমার সব খবর জানাও। তাঁরা নিশ্চয়ই তোমার চিন্তায় ভীষণ অস্থির। তোমার সৎ-মায়ের অবস্থা নিশ্চয়ই আরও সঙ্গীন।”

    সিঙ্গুইন্দুশও সেই চিন্তাই করছিল। সে তক্ষুনি ফিরতে রাজি। ঠিক হল ইঙ্গিগেরদুর তার জন্য এখানেই অপেক্ষা করবে।

    এবার আমরা সিঙ্গুইন্দুশের রাজ্যে ফিরে দেখি সিঙ্গুইন্দুশ দেশ ছাড়ার পর সেখানে কী হল। হিমিনবিয়রগ ঠিক যা ভয় করেছিলো, তাই হয়েছে। সবাই তাকে সিঙ্গুইন্দুশের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। শুধু রাজা তাকে তিন বছর সময় দিয়েছে, সিঙ্গুইন্দুশ তার মধ্যে না ফিরলে হিমিনবিয়রগকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হবে।

    আর এখন সব কিছু একসঙ্গে ঘটল। চিতার আগুন তৈরি। হিমিনবিয়রগকে নিয়ে যাবার মুহূর্তেই সিঙ্গুইন্দুশের আবির্ভাব! সবাই অবাক আর আনন্দিতও। সারা রাজ্যে হইচই পড়ে গেল। বিরাট ভোজ, প্রভূত নাচগান। সিঙ্গুইন্দুশ সবাইকে খুলে বলল তার দুঃসাহসিক অভিযানের কাহিনী। হিমিনবিয়রগও জানাল যে সে-ই সবকিছুর বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল যাতে সিঙ্গুইন্দুশ ইঙ্গিগেরদুরকে অভিশাপমুক্ত করতে পারে কারণ ইঙ্গিগেরদুর হিমিনবিয়রগেরই ছোটবোন। সিঙ্গুইন্দুশের বন্ধু পাখিরাও তাদেরই আত্মীয়স্বজন। তারাও মন্ত্রজালে পাখি হয়ে গেছিল। সব শুনে রাজা ও সাঙ্গোপাঙ্গরা আরও উল্লসিত। সবাই মিলে এক বিরাট শোভাযাত্রা করে চলল ইঙ্গিগেরদুরকে ঘটা করে বাড়ি নিয়ে আসতে। খুব ধুমধাম করে ইঙ্গিগেরদুর আর সিঙ্গুইন্দুশের বিয়ে হয়ে গেল। তাদের পাখি-আত্মীয়রাও সবাই মহানন্দে উৎসবে যোগ দিয়েছিল। বিয়ের পর নতুন রাজা ও রানি মনের সুখে রাজত্ব করতে লাগলো। আর

    আমার কথাটি ফুরোলো,
    নটে গাছটি মুড়োলো।



    প্রচলিত রূপকথাটি, The Story of Himinbjorg, Alda Sigmundsdotir-কর্তৃক Icelandic Folk Legends: Tales of apparitions, outlaws and things unseen (Little Books Publishing, March 20, 2016) বইতে পুনর্বণিত ও সংকলিত হয়েছে। সেখান থেকে অনুমতিক্রমে এর অনুবাদ পরবাস-এ প্রকাশিত হল।
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments