




রাত এগারোটা নাগাদ সুধন্য বাইরের ঘরে টিভি বন্ধ করলেন। অভ্যাসমতো দরজার লক, ঘরের আলো-টালো ইত্যাদি চেক করলেন। এবারে রাতের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়বেন।
শোওয়ার ঘরে এসে অবাক হয়ে দেখলেন দীপ্তি এখনও শোননি, খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন। দৃষ্টি সামনে স্থির৷ সুধন্য প্রমাদ গণলেন। তিনি মিহি গলায় বললেন—আজ এখনও ঘুমোওনি?
দীপ্তি একইভাবে বসে রইলেন যেন কথাটা শুনতেই পাননি। সুধন্য আর ঝুঁকি না নিয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে কৌটো নিয়ে ওষুধ খেলেন, হাত বাড়িয়ে আলো নিভিয়ে দিলেন। বাইরে থেকে আসা আবছা আলোয় দেখলেন দীপ্তি একইভাবে বসে আছেন। কাল সকালে মাথা ঠান্ডা হলে ব্যাপারটা বুঝতে হবে। তিনি চোখ বুজলেন।
কিন্তু পাশে একজন এভাবে বসে থাকলে ঘুমানো মুশকিল। কী হতে পারে? কিছুক্ষণ আগেও তো হাসি-গল্প হচ্ছিল। অবশ্য হাঁটুর সমস্যায় দীপ্তি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় শয্যাশায়ী, মাঝেমধ্যে অকারণেও মেজাজ গরম করে ফেলেন।
“আজ আবার খেয়েছো?”
দীপ্তির তীক্ষ্ম কন্ঠস্বরে সুধেন্দুর চিন্তাজাল যেন টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে গেল।
প্রবল বিস্ময় এবং ভয়, এই দুটোর ধাক্কা সামলে সুধন্যর গলা দিয়ে যে ক্ষীণ প্রতিবাদটা বেরল তাঁর নিজের কাছেই সেটা প্রায় স্বীকারোক্তির মতই শোনাল।
পরের দিন সকালে রোজকার মতো সাড়ে ছটা নাগাদ কৃষ্ণা বেল বাজাল। কাল বিস্তর বকাঝকা ও সতর্কবাণীর পর অনেক দেরিতে ঘুমিয়েছেন। উঠে বেজার মুখে দরজা খুলতে যেতে যেতে সুধন্যর মনে হল তা হলে কি এই মেয়েটিই? কৃষ্ণা অনেকদিন থেকে তাদের বাড়িতে কাজ করে। দীপ্তির বিশেষ প্রিয়পাত্রী। রোজ কাজ সেরে ফেরার আগে দেখা করে খানিকক্ষণ গল্প-টল্প করে যায়।
হাত-মুখ ধুয়ে সুধন্য রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ালেন। কৃষ্ণা তার জন্য চা বসিয়েছে। তাকে দেখে বলল—কাকু তুমি বোসো, আমি দিয়ে আসছি।
সুধন্য না গিয়ে টুকটাক গল্প জুড়ে দিলেন। কৃষ্ণার সঙ্গে কথা হয় না এমন নয়, বিশেষ করে কী রান্না হবে না হবে, দীপ্তি তাঁকে দিয়েই বলে পাঠান। আজ একটু বেশি সময় ধরেই চলল। সুধন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসল কথায় আসার চেষ্টা করছেন। এক সময় কৃষ্ণা তাঁকে আড়চোখে দেখল, সুধন্যর চোখ এড়িয়ে গেল।
চা হয়ে গেছে। কৃষ্ণা তাকে চায়ের কাপ, সঙ্গে দুটো বিস্কুট এগিয়ে দিল। তারপর বলল—কাকু শরীর ঠিক আছে তো? ওষুধ-টষুধ ঠিকমত খাচ্ছ তো?
সুধন্য একটু অবাক হয়ে বললেন—হ্যাঁ, সে তো খাই-ই।
কৃষ্ণা ঠোঁট টিপে হেসে বলল—সেই সঙ্গে খাওয়া-দাওয়াও বুঝেশুনে কোরো। কাকিমাকে আমি কিছু বলি না, তবে রক্তে চিনি ধরা পড়েছে যখন, বাইরে থেকে মিষ্টি-টিস্টি এনে আর না খাওয়াই ভালো।
সুধন্য চা নিয়ে পালিয়ে বাঁচলেন। সোফায় বসে ভাবতে লাগলেন। আর কে হতে পারে? অনেক ভেবে তাঁর মনে হ'ল মিষ্টির দোকানের অর্জুন বলে ছেলেটি নয়তো? দীপ্তির কাছে হয়ত ওর ফোন নম্বর আছে, খবর পান। দোকানটি বহু পুরনো, সুধন্য ছোটোবেলা থেকে দেখছেন। তখন অর্জুনের বাবা চালাতেন। এখন সুইগি-জোম্যাটোর জমানাতেও দিব্যি চলছে। সকালে হিং দেওয়া কচুরি আর বিকালে গরম ফুলকপির সিঙ্গাড়ার জন্য খদ্দেরের অভাব নেই।
সুধন্য সন্ধ্যাবেলা হাঁটতে বেরিয়ে উঁকি দিলেন। অর্জুন বসেই ছিল, তাঁকে দেখে হাসিমুখে বলল— আজ টাটকা মাখা-সন্দেশ আছে, নিয়ে যান।
ব্যাপারটা না বুঝে ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। সুধন্য ‘আজ থাক’ বলে সকালের মতোই গল্প জুড়ে দিলেন। বরাত জোরে অর্জুন নিজেই দীপ্তির কথা তুলল, বলল— কাকিমাকে অনেকদিন দেখি না।
সুধন্য সুযোগ পেয়ে বললেন—ও তো হাঁটুর সমস্যায় খুব কষ্ট পাচ্ছে, প্রায় শয্যাশায়ী। তবে সেদিন তোমার কথা বলছিল, ওর কোন বন্ধুর মেয়ের বিয়ের তত্ত্বের মিষ্টির ব্যাপারে খোঁজ নেবে।
অর্জুন আগ্রহ দেখিয়ে বলল— আমরা তো অর্ডার নিই। আমার নম্বরটা নিয়ে যান, কাকিমাকে দেবেন।
সুধন্য তার নম্বর সেভ করে বিরস মুখে বাড়ি ফিরে এলেন৷ এদের দুজনের একজন মিথ্যা কথা বলছে, কিন্তু ধরবেন কী করে?
মাসের প্রথম শনিবার। কৃষ্ণা সন্তোষী* মায়ের ব্রত করার জন্য ছুটি নিয়েছে। আগের দিন রান্না করে ফ্রিজে রেখে গেছে, বাকিটা সুধেন্দু ম্যানেজ করবেন।
দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী কিছুক্ষণ গল্প-টল্প করলেন। ছেলে স্পন্দন বিদেশে মোটামুটি থিতু হয়ে গেছে এবারে বিয়েটা দিয়ে দিতে হবে৷ ওর পছন্দ কেউ আছে কিনা জিগ্যেস করলে এড়িয়ে যায়, এবারে কল হলে চেপে ধরতে হবে। নয়ত ম্যাট্রিমনি সাইটে দেখা শুরু করতে হবে।
এবার কিঞ্চিৎ দিবানিদ্রা। তারপর সুধেন্দু উঠে চা বানিয়ে আনলেন৷ চা খেয়ে দীপ্তি কটা জিনিষ বললেন, সুধেন্দু মোবাইলে লিখে নিলেন। হেঁটে ফেরার সময় নিয়ে আসবেন।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি পাশের পাড়ায় গেলেন৷ সেখানকার জয়দুর্গা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের রসমালাই তাঁর খুব প্রিয়। দূরে বলে আসা হয় না৷ বাড়ি ফিরে রসমালাই-এর প্ল্যাস্টিকের কৌটোটি সুধেন্দু সন্তর্পণে ফ্রিজে রেখে দিলেন৷
আজ নিশ্চিন্তে খাওয়া যাবে।
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সুধেন্দু রান্নাঘর ঠিকঠাক করে রাখলেন। শোওয়ার ঘরে উঁকি মেরে দেখলেন দীপ্তি মোবাইল নিয়ে খুটখুট করছেন। ছেলে বলেছে পরের বার মা'র জন্য একটা ছোটো টিভি নিয়ে আসবে।
রসমালাইয়ের বাটি নিয়ে সুধেন্দু এসে আরাম করে বসলেন। আজ প্রিমিয়াম লিগের খেলা আছে৷ একটু দেরি করে শোবেন।
*****
পরের দিন সকালে সুধেন্দু দরজা খুলে দিলে কৃষ্ণা মনে মনে হাসল। কাকুর মুখ যেন কালচে মেরে গেছে। নিশ্চয়ই আবার ধরা পড়ে ঝাড় খেয়েছেন।
আরও কয়েকদিন পরের কথা। দুপুরবেলা দীপ্তি দিবানিদ্রা দিচ্ছেন, সুধেন্দু খবরের কাগজ নিয়ে খাটে হেলান দিয়ে বসে৷ ক'দিন দুজনের কথাবার্তা কমই হচ্ছে। দীপ্তির অবশ্য বিশেষ হেলদোল নেই।
দীপ্তির মোবাইলে মৃদু একটা শব্দ হ'ল, কোনও নোটিফিকেশন ঢুকেছে। শব্দটা আলাদা। সুধেন্দু কৌতূহলবশে তুলে নিলেন। স্ক্রিনে একটা বিচিত্র মেসেজ ভাসছে, টেকনিক্যাল কিছু শব্দ, তলায় লেখা, ক্লিক হিয়ার ফর ইমেজেস। সুধেন্দু ক্লিক করলেন।
একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠছে। সুধেন্দু প্রথমে বুঝতে পারলেন না। একটা স্টিলের রড বসানো তাক, পাশে সাদা দেওয়াল, তাকে কিছু বাটি, প্যান ইত্যাদি ঢাকা দেওয়া আছে৷ একটা হাত কোনও পাত্র রাখছে বা বার করছে৷
ওটা তাদের ফ্রিজ।
সুধেন্দু দ্রুত শেষ ছবি অবধি গেলেন। বোধহয় আজ সকাল থেকে দুপুর অবধি আছে। কেউ রান্না করে খাবার ঢুকিয়ে রাখছে। শেষ ছবিটিতে বোধহয় তিনি নিজেই বেঁচে যাওয়া খাবার ঢুকিয়ে রাখছেন।
তিনি উঠে প্রায় দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুললেন। উপরের তাকে একেবারে ডানদিকে কোনায় ছোটো কালো পোকার মত ওটা কী লাগান আছে? নীচের তাক দুটিতেও তাই।
সুধেন্দু দরজা বন্ধ করে শ্বাস ফেললেন। ছেলে মাস-দুয়েক আগে এসেছিল। ওরই কাণ্ড।
স্মার্ট ফ্রিজ।
ভাবতে ভাবতে একসময় তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। তাঁর প্রাক্তন অফিসের একটি ছেলে এ সব কাজ ভালো জানে। কাছেই থাকে। ক্যামেরাগুলি না সরিয়েই দীপ্তির কাছে মেসেজ যাতে না পৌঁছয় তার ব্যবস্থা করে দেবে। টেকনোলজির লড়াই তিনি টেকনোলজি দিয়েই জিতবেন।
সুধেন্দুর মুখ এখন আনন্দে ঝলমল করছে৷ চোখ বন্ধ করলে থরেথরে সাজানো রংবেরঙের লোভনীয় মিষ্টি দেখতে পাচ্ছেন। ডিগবাজি খাওয়ার বয়েস আর নেই, না হলে সেটাও খেয়ে নিতেন।