




লোকটা কোত্থেকে এল, এই প্রশ্ন এখন আর কেউই করছে না। উল্টে ওর কোলের মধ্যে রাখা চকচকে টাকার বাণ্ডিলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। একজন জিজ্ঞেস করল,“এগুলো কি ওরিজিনাল কারেন্সি?”
লোকটি একটা বাণ্ডিল খুলে তার থেকে কিছুটা নোট বাইজিবাড়ির বাবুর মতো উৎসুক জনতার মুখের ওপরে উড়িয়ে দিল। মেয়েরা যারা জড়ো হয়েছিল, তারা আব্রু ও ইজ্জত ঢেকে সরে দাঁড়াল। ওদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী আর সবজান্তা গোছের একজন মহিলা বাণ্ডিল থেকে একখানা নোট বার করে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখল। এবং আলোর দিকে উল্টোপিঠ রেখে একটুখানি নিরীক্ষণ করেই জনান্তিকে আদেশ করল,“মনে হচ্ছে এগুলো ভাঁড়ের না। ভানুদের খবর দে!”
এখন হাঁপাতে হাঁপাতে মিডিয়ার লোক আসছে। সামনে পেছনে দুই গাড়ি পুলিশ। মধ্যে আয়কর দফতরের বেশ কয়েকজন আধিকারিক।
ওঁদের মধ্যে থেকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, “এই টাকা সব আপনার?”
“ইয়েস স্যার!”
“আর আছে?”
লোকটি এবার একটা টাওয়েল উঁচু করল।
প্রধান যিনি আধিকারিক তাঁর তো চোখ কপালে উঠবার উপক্রম, “এই টাকার উৎস কী?”
লোকটি এবার একখানা চিরকুট দেখাল।
সমবেত জনতার সাথে মিডিয়াও সমস্বরে চিলচিৎকার জুড়ে দিল, “চিরকুটে কী লেখা আছে? কী লেখা আছে?”
কোনও উত্তর এল না। উল্টে সবাই দেখল, ওঁরা প্রত্যেকেই জুতো খুলে হাঁটু মুড়ে লোকটিকে প্রণাম করলেন। এবং অহেতুক বিরক্ত করবার জন্যে করজোড়ে ক্ষমা ভিক্ষাও চাইলেন।
এমন এক আজব দৃশ্য দেখে ছোটবড় সমস্ত মিডিয়ার ধারাভাষ্যকার একত্রে ছিনেজোঁকের মতো ছেঁকে ধরল, “স্যার, বলুন ওই রহস্যময় কাগজটাতে কী এমন লেখা আছে?”
এমন সময় সেখানে এসে দাঁড়াল আঠারো ঊনিশের একটি মেয়ে। সে নিজেকে নরক নামেই চেনে। সবাই বলে সে নাকি এক নষ্টা কাগজকুড়ুনির মেয়ে। মেয়েটি নিজের সহজাত চেষ্টা দিয়ে যতটা পারল ব্যুম আর বাইটের ছ্যাবলামিকে হটিয়ে দিল। এবং যেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টাকার হুণ্ডি দেখে উৎসুক জনতা আহাম্মকের মতো থুতু ছেটাচ্ছিল, সেই বরাবর অনেকটা পথ ঝাঁট দিয়ে গোবরজল ছেটালো। এ দেশের একটা দিক ভালো, মিডিয়াকে কোনও মতে সরাতে পারলেই বাকি সব অবাঞ্ছিত বন্যার জলের মতো সড়াৎ করে সরে যায়! এবার মেয়েটি লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটি কোনও রকম কথায় কেয়ারি না করে একটা একটা করে টাকার বাণ্ডিল মেয়েটির হাতে তুলে দিল। মেয়েটিও কোনো প্রশ্ন করল না। শুধুমাত্র ঘরহীন ঘরণীর মতো টাকার বাণ্ডিলগুলো ভাগে ভাগে অনেকটা দূর অব্দি পথের দুইধার জুড়ে ইটের টুকরো আর পাথর চাপা দিয়ে সাজিয়ে রাখল।
সন্ধ্যায় দুই ঊরুর মাঝখানে একখানা আয়নার কুচি রেখে কাজল পরছিল মেয়েটি। লোকটি ওর মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, “তোর নাম কী বললি না তো?”
মেয়েটি কাজলকে তরবারির মতো বাঁকিয়ে বলে উঠল, “নরক!”
“ইস! নরক আবার নাম হয় নাকি?”
মেয়েটির সহজ সলজ্জ উত্তর, “আমি এটাই তো শুনে আসছি। আমার মায়ের গল্প, আমার বাপের গল্প, আমাদের ঘরবাড়ির গল্প সব শুনে শুনে মুখস্থ করেছি কিনা। লোকের থেকে যা শুনেছি, তাই বললাম!”
“তাহলে তুই তো শ্রুতি। আজ থেকে তোর নাম হল শ্রুতি!”
নতুন একখান নাম পেলে মেয়েদের মধ্যে মিনিমাম যে উচ্ছ্বাসটুকু ফুটে ওঠে, তার কিছুই দেখা গেল না। অতএব লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, “কী রে, বুঝেছিস মানে কি?”
আয়নার কুচিটা বুকের ওপরে চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “হুম বুঝেছি। শ্রুতি তোর মাথায় মুতি!”
“মা বাবা কোথায় থাকে বললি না তো?”
“সেই গল্পই তো আজ করব।”
“কী? গল্প বলবি?” লোকটি নড়েচড়ে বসল।
ঠোঁট থেকে থুতু নিয়ে মেয়েটি কপালে একটা কাঁচের টিপ পরল। আর ঠিক এইসময় পশ্চিম আকাশের এককোণ থেকে একটুখানি আলো এসে মেয়েটির কপালের ওপর পড়ল।
মেয়েটি গল্প শুরু করল।
“সে অনেক কোটি টাকার গল্প। সাত সমুদ্রু তেরো নদী পার করে এসে শুলেও এ কাহিনী শেষ হবে না।”
লোকটি একটা টাকার বাণ্ডিল রেখে কাৎ হল। মেয়েটি পিকদানির মতো ওটাকে পেছনে সরিয়ে রেখে বলতে লাগল, “আমার বাবার ছিল টাকার আড়ত। লোকে যেখানে ধান পাট রাখে, আমার বাবা সেখানে রাখত টাকা! সবাই এক বাক্যে চিনত আলাদীন স্যার বলে। উনি হাতের তালুতে ঘষা দিলেই হাজার টাকার নোট উড়ত! একবার হাতে ঘষা দিতে ময়লা ছেঁড়া ফাটা কয়েকটা একশো টাকার নোট উড়েছিল, সেই শোকে বাবা কী করেছিল শুনবে? সিগারেটের সেঁক দিয়ে নিজের হাতকে আচ্ছা করে পুড়িয়ে দিয়েছিল!”
“অবশ্যই। অপৌরুষের হাত পুরুষ কখনোই রাখতে চায় না। আচ্ছা সে নাহয় বুঝলাম। সোর্স?”
“মাথা কিনত। মেধাশূন্য স্বপ্নশূন্য যেসব মাথাগুলো ঘুরে বেড়াত, দালাল মারফত সেগুলো কিনে সরকারের হয়ে কাজের বাজারে কনভার্ট করত! এতে বাবা আর বাংলা গরমেন্টের মধ্যে ফিফটি ফিফটি বখরা ছিল। কিন্তু একদিন ধরা পড়ে গেল। মা সিঁথির সিঁদুর মুছতে মুছতে বলল, মনে কর আমি মরে গেছি। তোর কেউ নেই। যা কাগজ কুড়িয়ে খা! আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, ‘আমি একা কোথায় যাব?’ মা আমার কোনও কথাই শুনল না। ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দিল! সেই যে আমি একটা বস্তা নিয়ে বেরিয়ে এলাম, আর ফিরে তাকাইনি!”
“বাড়ির কথা মনে পড়ে না?”
“ঘুমের মধ্যে যেদিন খুব ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে। দেখি আমাদের বাড়ি ঘেরাও হয়ে আছে। মা গায়ে আগুন দিয়ে উঠোনে ছটফট করছে! কিন্তু কেউ জল দিয়ে জুড়িয়ে দিচ্ছে না! বাবা একটা দড়ি নিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে বাঁধছে। কিন্তু বার বার গিঁট খুলে যাচ্ছে!”
“যারা তোমাদের বাড়ি ঘেরাও করে তাদের চেনো?”
“ওরা তো স্বপ্নের লোকজন! সরকারের কাজের বাজারের ভুয়ো ক্লায়েন্ট।”
“সেই স্বপ্ন দিয়েই ওদের চিনবে। যদি পার কালই ওদের খোঁজ নেবে। আমি আরও টাকা রেখে দেবো। যার যতটা ক্ষতি হয়েছে, সে ততোটাই হিসেব করে তুলে নেবে।”
“তুমি টাকা দিতে যাবে কেন?”
“কী করব! এতগুলো প্রাণ একসাথে মারা পড়বে তো! আমাদের বাস্তুবাসা ভেঙে যাবে না?”
“ওরা মরলে অন্যের বাসা ভাঙবে কেন?”
“পাহাড় থেকে একটা পাথর গড়িয়ে এলে সে প্রাসাদের দিকে যাবে, নাকি পাতার কুটিরকে ভাঙবে, সেটা তুমি আমি নিক্তি নিয়ে বলে দিতে পারি কি?”
“এই টাকা দিয়ে ওরা কি আবারও চাকরি কিনবে?”
“না। ঘর বাঁধবে। যে তার মায়ের হাত খালি করেছিল, সে মায়ের জন্যে কাঁকন গড়াবে। বোনের বিয়ে দেবে। বাপের বিক্রি হয়ে যাওয়া জমির দলিল ফিরিয়ে আনবে। আর বাকি যেটুকু থাকবে নিজের জন্যে একখান বাসর সাজাবে। সম্ভোগের সুখ নেবে। সন্তানের জন্ম দেবে! আর এই কমিউনিকেশনের কাজটা তুমি ধারাবাহিকভাবে করে যাবে।”
“আমি ধরা পড়ে যাব তো!”
“কেন ধরা পড়বে? তুমি তো কাগজকুড়ুনির মেয়ে। ময়লা কাগজের মতো করে মুহ্যমান মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে আসবে, ব্যাস!”
“এর বিনিময়ে তুমি আমাকে কী দেবে? না না ওইসব নোটফোট কিন্তু আমি নিতে চাইছি না!”
লোকটি শ্রুতির কপাল থেকে কাঁচের টিপটি খসিয়ে নিয়ে দূর আকাশের একটা তারাকে দেখিয়ে বলল, “আগে কাজটা করে দাও এটা তোমার কপালে বসিয়ে দেব!”
এখন আর ঘুমোতে পারে না শ্রুতি। মাথাটা এলোমেলো হয়ে আছে ওর। অনেক দায়িত্ব। আজকাল অনেকটা রাস্তা ওকে হাঁটতে হয়। পথের দুই ধারে রাখা টাকার বাণ্ডিলগুলো ধুলো ঝেড়ে গুছিয়ে আসতে আসতে অনেকটা রাত হয়ে যায়। কোনও কোনও দিন বৈঁচিফলের বীজ ছড়িয়ে রাখে পথে। ইচ্ছে হলে আঁচল ভরে বুনো ফুল তুলে রেখে দেয় পান্থশালায়। লোকটি যেখানে শোয়, ঠিক তার মাথার কাছে।
সকাল হতে না হতে লোকটি খোঁজ নেয়, “পেলে কাউকে?”
শ্রুতি চোখের কালি মুছে, মুখ ব্যাজার করে বলে ওঠে, “বালগুলোর এট্টারও চোখ নেই মনে হল। মিডিয়া যেই দিকে নিয়ে যাচ্ছে, ওরা সেইদিকে দৌড়াচ্ছে!”
“বলো কি?”
“সেদিন অনেক কষ্টে ওদের অনেককেই পটিয়ে ফেলেছিলাম।”
“ওরা কারা?”
“ওই তো হাইকোর্ট যাদের ভাগিয়ে দিল! টিচার ফিচার হবে হয়তো। ভুয়ো আইপিএস আর কোয়াক ডাক্তার করনিকও ছিল কিছু!”
“এল না কেন? আমি তো ওদের জন্যে নতুন জীবনের রসদ নিয়ে বসে আছি!”
“আসছিল। যেই না শুনল, দ্বন্দ্বেশ দ্বীপে এনআইএ নেমেছে! অমনি ওই দিকে দৌড় দিতে শুরু করল!”
“এনআইএ? বলো কি? যুদ্ধ লেগে গেল নাকি?”
“এসব ঝুটামুটা ফুটেজ খেয়ে আর কদ্দিন?”
“আসবে নিশ্চয়ই? আমাদের ওয়েট করতে হবে।”
এবার মেয়েটি তার বটুয়া থেকে একটা পুরনো পঞ্জিকার পাতা বার করে পড়ার ভান করে এক নিঃশ্বাসে অষ্টাদশ অধ্যায়ের অনেকটাই বলে দিল, “সামনের মাসে আরেকখান সীতাসৌধ উদ্বোধন হবে। ওর পাশের প্লটেই আকাশ ফুটো করে উঠে দাঁড়িয়েছে আরেকখান বাহারি মসজিদ। সেখানেও আরব কান্ট্রির বিনিয়োগ এমনভাবে আসছে, দুদিন বাদে দেশের ঘুম উড়িয়ে দেবে! এর পরের দুই মাসে পর পর দক্ষিণ ভারতের সিনেমা রিলিজ হবে। দশেরায় দমদমে বুড়ির ঘর পুড়বে একগাদা। সেই আগুনে বস্তিও যাবে কিছু। মিডিয়া এখন থেকেই পাবলিকের নজর কেড়ে নেবার কাজ শুরু করে দিয়েছে। দুটো মাত্র তো চোখ নিয়ে বাঁচে পাবলিক। আর কতদিকে দৌড়াবে বলো দিকিনি?”
রাস্তা চওড়া হচ্ছে। শ্রুতি শুনেছে সরকার নাকি ওটাকে ফোর লেন করবে। ইদানীং বিকাল হলে একজন দুজন শৌখিন লোক আসে। ছাতার নিচে প্রিয়জনকে রেখে কুটুসকাটুস করে বাদাম খায় আর খুটখুট করে হাটে। শ্রুতি টাকার বাণ্ডিলগুলো উল্টেপাল্টে রোদে দেয়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা বাণ্ডিলের রোদেজলে নাম্বার ও তাদের ছবি জ্বলে গেছে। পাবলিকের সেদিকে কোনও উৎসাহই নেই। বরং উল্টে অনেকে শ্রুতিকে ডেকে উড়ে যাওয়া নোটগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে যেতে পরামর্শ দেয়।
পান্থশালার একপাশে একটা তাঁবু খাঁটিয়ে তার নিচে একখানা খাটিয়া পেতে নিয়েছে লোকটি। আর শ্রুতি থাকে পাকা শেডের নিচে।
সেদিন আষাঢ়ের রাত। মেঘ ডাকছিল খুব। অন্ধকারে উঠে গুটি গুটি পায়ে লোকটির বিছানার কাছে এসে দাঁড়াল শ্রুতি। এবার বুকের ওপর হাত রাখল শ্রুতি, “দেখো, একটা ঘোড়া কিনেছি।”
লোকটি ঘুমচোখে ধড়মড়িয়ে ঠেলে উঠল, “কোথায় ঘোড়া?”
শ্রুতি অন্ধকারে আঙুল উঁচু করল।
লোকটি দেখল পান্থশালার পেছনে অদ্ভুতদর্শন একটা সাদা ঘোড়া। বেচারা অন্ধকারের মধ্যেও ঘুরে ঘুরে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে।
এবার চোখের কালি টিপে লোকটি সংশয় প্রকাশ করল, “এত টাকা কোথায় পেলি?”
এবার শ্রুতি লোকটির বুকের ওপর অনেকটা এলিয়ে দিল, “টাকাগুলো কি আসল?”
উষ্ণ উদ্বেগ উগরে দিয়ে লোকটি বলে উঠল, “কেন কোনও সন্দেহ আছে?”
শ্রুতি ঘোড়ার ঝুঁটি ধরে টেনে নিয়ে এল, “এ হল নেপোলিয়ান। কানা ঘোড়া কেউ কেনে? মাছ বাজারের মাসি ওকে ছোলা আর গুড় খাওয়ায়। আমি বলি, মাসি তুমি পাগল! কানা ঘোড়া পুষে কী পাও?”
মাসি বলল, “এতে অনেককিছু আছে রে!”
মাসি একদিন আমাকে নেপোলিয়ানের গল্প বলল। আমি তো বিশ্বাস করতাম না এসব গল্প। কিন্তু সত্যি সত্যি মাসি আমাকে অবাক করে দিলো। মাসিকে এতদিন ধরে যারা ঠকিয়েছে, কিম্বা ওর সাথে যারা খারাপ ব্যবহার করেছে, ওদের নাম নিয়ে নেপোলিয়ানের কানের কাছে তিনবার উচ্চারণ করে ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দিলেই তাদের দোকানপাট সব ধুলিস্যাৎ করে ছেড়ে দেয়!”
“সত্যি?”
“নয় তো কী? উঠবে এসো!”
লোকটিকে একপ্রকার ঠেলেই উঠিয়ে দিল শ্রুতি।
এবার জিজ্ঞেস করল, “তোমার শত্রু আছে এমন একজনের নাম করো।”
“আচ্ছা করলাম!”
এবার শ্রুতি নেপোলিয়ানের কানে ফুঁ দিতেই নেপোলিয়ান দৌড় লাগাল।
কিন্তু এ কী? পার্কের একটা পাথুরে মূর্তির ওপর এসে নেপোলিয়ন ধাক্কা মারতেই মূর্তিটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল!
শ্রুতি জিভ কেটে অন্ধকারে হায়েনার মতো হিহি করে হেসে উঠল, “এই পাথরটা তোমার শত্রু? লোকটা কে? চেনো?”
“গুঁড়িয়ে গেল তো। কী করে বলব? নেপোলিয়ান ভেঙেছে যখন নিশ্চয় আমার শত্রুটত্রু হবে!”
এখন রাত হলেই নেপোলিয়ানকে দিয়ে শ্রুতি একের পর এক পুরাতন স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। শ্রুতি লোকটিকে গায়ে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিল।
“খুব বৃষ্টি হচ্ছে। নোটগুলো ভেসে যাবে তো! ওঠো।”
“যাক বৃষ্টি থেমে গেলে ওর দ্বিগুন দেব তোকে!”
শ্রুতি লোকটার বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ল, “তাহলে এর উৎস বলো?”
আর তখনই মেঘের আড়াল থেকে একফালি চাঁদ উঁকি দিল। লোকটি চাঁদটাকে মুঠোর মধ্যে বাগিয়ে নেপোলিয়নের কপালে ঠেকিয়ে দুবার ফুঁ দিল! আনকা আলোয় সেই যে নেপোলিয়ন আনমন হল, আর তাকে ধরে রাখা গেল না। নেপোলিয়ান পাগলের মতো দৌড়াতে লাগল। শ্রুতিও সেই যে নেপোলিয়নের পিছু নিল আর ফিরল না!
সঠিক সঙ্গিনীকে পাবার জন্যে বাঘ যেমন একটা দেশের জঙ্গল পার হয়ে আরেক দেশের জঙ্গলে ঢুকে যায়, লোকটিও তেমনি শ্রুতিকে খুঁজে, নেপোলিয়ানকে খুঁজে বাজার ঘাট সিনেমা হল শপিংমল ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলল! যেখানেই ঢোকে অচেনা আওয়াজ। কী যেন এক কলবলানি। প্রতিটা দোকানে লাইট বাল্বের সাথে ঝোলানো আছে এফএম। যেন রসালো আনারস। অলটাইম ওসব থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রসদ, ননস্টপ ধারাভাষ্য, “এইমাত্র দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এরেস্ট হল কাৎলা কাৎলা! একপাহাড় টাকা ফেলে পালিয়ে গেল প্রেমিকা, লিচু ভাঙলেই দারুণ রস! পচা চিংড়ি দেখে পাশ ফিরে দাঁড়াবেন না, পুরো প্যানেল ধরে বাতিল! নিটে সাকসেস হতে চাইলে আগে ইট পাতুন! হাজার কেজির হাঙ্গর হাইকোর্ট হাইকোর্ট হাইকোর্ট!”
দিনে বার হওয়া দুষ্কর! প্রচণ্ড দাবদাহ। বালিতে ফুঁ দিলে আগুন ফুঁসলে ওঠে এমন প্রবাহ! শ্রুতির নাম নিয়ে দোরে দোরে ঘুরে ঘুরে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। আর রাত হলে অসম্ভব রকমের শরীর জাগে। ঠিক যেন ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো!
একসময় টাকাগুলোয় পচন ধরল। ওর ওপর ঘাস জন্মালো। যাদের আসবার জন্যে পথের দুইধার জুড়ে থরে থরে টাকা সাজিয়ে বসেছিল, তারা কেউই এল না।
রাজ্যের যত মোয়াজ্জেন মৌলবি, ভাতাজীবী ব্রাহ্মণ, লক্ষ্মীর ভাঁড়ের মা খুঁড়ি সবাই একবাক্যে লোকটাকে তিরস্কার করতে লাগল, “এইভাবে নষ্টতামি করে কেউ?”
“আপনারা নেবেন?”
“আহা বাপু! সরকারের ভাঁড় থাকতে রাস্তার দান নেব কোন দুঃখে শুনি?”
টাকার জন্যে নয়, এখন পান্থশালায় এলেই শ্রুতির জন্যে মন অস্থির হয়ে ওঠে!
অতএব লোকটি চলে যাবে মনস্থির করল। বোঁচকাবুঁচকি বাঁধাছাঁদা চলছে, এমন সময় ধুলোর উড়নি উড়িয়ে এসে দাঁড়াল শ্রুতি। সাথে দুজন পুলিশ। লোকটি দেখল শ্রুতির পেটটা অনেকটাই উঁচু।
“এসব কী দেখছি শ্রুতি? তোমার এই অবস্থা কে করল?”
শ্রুতি একখান চিরকুট এগিয়ে দিল।
লোকটি জানতে চাইল, “এটা কী?”
“আমি কী জানি কোর্ট থেকে দিয়েছে!”
“আরে বলবে তো আসল ঘটনাটা কী?
“সে লক্ষ বিলিয়ন লোকের গল্প।”
সবাই বলল, “বলো বলো। আস্তে-সুস্থে বলো।”
এবার শ্রুতি থপ করে মাটিতে বসে পড়ল। সে ভাবতে বসল, “এইভাবে সবার সামনে সবকিছু বলা কি ঠিক হবে?”
পুলিশের লোক যারা এসেছিলেন, ওরা লজ্জা পেলেন, “না না। আপনি সময় নিন। দরকারে নির্জনে বলুন। আমরা এখন চলে যাচ্ছি।”
প্লট ফাঁকা হয়ে গেলে শ্রুতি গল্পের ঝাঁপি খুলে দিল।
“যেদিন রাতে তুমি যখন নেপোলিয়নের কপালে আস্ত একখানা চাঁদের টিপ বসিয়ে ওর কানে ফুঁ দিয়েছিলে, আমি অনেকটা পথ দৌড়ে ওর পিঠে চড়ে বসেছিলাম। ও যখন দৌড়াচ্ছিল, আমি সব দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার বাবা যাদেরকে ঠকিয়েছিল, আর তুমি যাদেরকে খুঁজে বেড়াচ্ছ। যেন এক নতুন গল্পের গ্রহ। যেখানে লক্ষ লক্ষ লোক। সবারই একটাই পরিচয় তারা ভিক্টিমস। ওখানকার রাস্তাঘাট নদী নর্দমা দোকান বাজার সবই নরকের নামে নামকরণ! তুমি আসবার আগে যেমনটা আমার নাম ছিল!”
“কে করল এমন নামকরণ?”
“কে করল জানি না। তবে ওরা যখন উচ্চারণ করে, সবই নরকের মতো শুনতে লাগে!”
“আর ওদের শিক্ষাদীক্ষা?”
এবার শ্রুতি খণ্ডিত সামবেদের মতো সুর করে করে তার নতুন খননকার্যের খতিয়ান বর্ণনা করতে লাগল, “ওদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে যারা দিনে দুইবার মানুষের রক্ত দেখতে না পেলে উন্মাদ হয়ে ওঠে! কেউ কেউ পুরোটাই পাগল হয়ে গেছে। কেউ কেউ নিজের হাত-পা কেটে ফেলেছে। কারো কপালে অনেকগুলো কাটা দাগ। কারো বা নাকের জায়গায় নাক নেই। কারও কান গেছে কাটা! অধিকাংশের যৌনাঙ্গ আছে বটে, কিন্তু তাদের মধ্যে যৌনতা বলতে যা বোঝায়, তার নামগন্ধ নেই। তবু কেউ কেউ সাহস করে জীবন শুরু করে দিচ্ছে। আমি যতটা পারি ওদেরকে উৎসাহিত করি। নইলে সৃষ্টি বলে তো একটা কথা আছে, তাই না? এই দেখো আমার পেটে বাচ্চা!”
শ্রুতি লোকটার হাতখানা ধরে নিজের পেটের ওপরে টেনে নিল।
লোকটি শিউরে উঠল,“বলিস কী রে? কে সে?”
“একটু বয়েস বেশিই। তোমারই মতো আর কী! প্রথম প্রথম অবশ্যি অনেকেই চোখ টিপে ঝাট মেরেছিল, “বাপ বয়েসি লোক পারবে তো? আগে টেস্ট করে নে। তারপর নাহয়…! আমি বাপু ঝুঁকি নিতে বরাবরের জন্যে ওস্তাদ! কী বলো, ভালো করিনি?”
“ওরা আর ফিরবে না?”
“না। যেহেতু এই পৃথিবী তাদের ধনেপ্রাণে নিঃস্ব করে ছেড়েছে, তাই তারা আর ফিরবে না! আর সেই জন্যেই তোমাকে যেতে হবে।”
“কেন? আমি কেন যাব?”
“আমার পেটে বাচ্চা, অথচ আমার স্বামী সে আজও দেখতে পাচ্ছে না আমার পেট কতখানি উঁচু হল। আমি সবার সবটুকু দেখতে পাই। কিন্তু ওরা আমাকে কেউ দেখতে পায় না। তুমি সবার কপালে চাঁদ-তারা এঁকে দেবে!”
“এও কী সম্ভব? কী পাগলের মতো যা তা বকছিস?”
“পাগল নয়! সবাই বলাবলি করছে তোমার কাছে একখান চিরকূট আছে। ওতে যা লেখা আছে ওর গোপন কথাগুলো নেপোলিয়ানের কানে দিয়ে ফুঁ দিতে হবে! ফুঁ দিলেই কেল্লা ফতে!”
লোকটা শ্রুতির কথা শুনে শিউরে উঠল, “ওটা তো এই শতকের একটা অভিশপ্ত গল্পের শিরোনাম!”
“আপাতত ওই গল্পের মধ্যে দুর্বোধ্য যে দুর্গটা ওটাকেই ভেঙে দিতে হবে!"
"দুর্গ ভাঙ্গতে হবে? কেন?"
"ওটাই তো আসল কার্টেন! পচা একখান কপাটের আড়াল থেকে পিলপিল করে বের হচ্ছে! ওর আড়ালে থাকা সত্যটাকে সামনে আনতে হবে না?"
"আমি ভাঙ্গতে যাব কোন দুঃখে? কী দায় পড়েছে আমার?"
এবার শ্রুতি হাহাকার করে উঠল, তুমি কি চাও না আমার পেটের সন্তানটি মানুষের মতো হয়ে ভূমিষ্ঠ হোক?"
"আমি চাইলেও হবে। না চাইলেও হবে!"
"না! হবে না! যেদিন থেকে তুমি তোমার এই পুঁজি নিয়ে পৃথিবীতে পা রেখেছিলে সেদিন থেকেই সমস্ত সিস্টেম পুঁজ রক্তে পর্যবসিত হয়ে গেছে! অতএব তোমাকে যেতেই হবে!"
আগন্তুক জনতার মধ্যে এখন মুহুর্মুহু উচ্চারিত হচ্ছে, "যেতেই হবে! যেতেই হবে!" কেউ হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ছে কেউ অনিয়ন্ত্রিত হাহাকারে লুটোপুটি খাচ্ছে! এমন সময় অর্ধ উন্মাদ গোছের একটি লোক জোর করে একটা জরির টুপি লোকটার মাথায় পরিয়ে দিতে দিতে অনুনয় করলেন, “দেশের যুবসমাজের স্বার্থে আস্ত একখান বাস্তিল যদি উড়িয়ে দিতে হয়…”
সাথে সাথে লক্ষ কণ্ঠে কাতর আর্তি উঠল, "কপাটের আড়ালে কারা আছে, জানাটা অত্যন্ত জরুরি! নইলে পুরো পৃথিবীটাই পোকামাকড়ে ছেয়ে যাবে!"
শ্রুতি একটা ঝাঁটা হাতে রাস্তার দুধারে রাখা ময়লা নোটগুলো ঝাঁট দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে। পেছনে একটা অন্ধ ঘোড়া। আর তার ওপর জরির টুপি পরা সোয়ারি সেই লোকটা…