




এখনও সন্ধে নামতে দেরি আছে। নদী ভরা জল। জল আরও বাড়ছে। জলের চাপ প্রবল থাকায় জল বৃদ্ধির চাপ অতটা চোখে পড়ছে না। কিন্তু টইটুম্বুর গঙ্গাকে দেখলে কে বলবে এটা চৈত্র মাস, বর্ষা নয়।
চারিদিক সিক্ত হয়ে আছে। গত দুদিন ধরে টানা বৃষ্টি হয়ে চলেছে। বিকেল থেকে শুরু হচ্ছে, সঙ্গে প্রবল কালবৈশাখী ঝড়। গাছে গাছে যা আম ছিল, সব পড়ে যাচ্ছে ঝড়ের দাপটে।
এই ভাঙা ঘাটের পাড়েও একটি আমগাছ আছে। বহু প্রাচীন আমগাছ। এবছর প্রচুর আম এসেছিল। মাঘ মাসেই প্রতিটি গাছে ঝেঁপে বউল এসেছিল। এমন বউল যে গাছের পাতাই গিয়েছিল অদৃশ্য হয়ে। তারপরে গুটি ধরল, আম এল। আম বড় হতে থাকল। শীত গিয়ে বসন্ত এল। তারপরে পর পর কালবৈশাখীতে সেইসব আম প্রায় নিশ্চিহ্ন। আমহীন শিষগুলো আকাশের দিকে মুখ উঁচিয়ে তার ফল ভিক্ষা চায়।
ভাঙা ঘাটে আমি আছি, সেই খোঁড়া লোক আর অচেনা একজন, বয়স্ক মানুষ—খুব সম্ভবত কারও জন্যে অপেক্ষা করছে। আমার আর খোঁড়াটির কারও জন্যে অপেক্ষা নেই। সব অপেক্ষা শেষ হয়ে গেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি জীবন শেষ হয়, এই সন্ধে নামার মতন—ততই মঙ্গল।
আজ আমার ছেলে আমাকে ধমকেছে। সে এখন ক্লাস সেভেনে উঠেছে। এই বয়স থেকেই ছেলেরা মনে করতে থাকে, বাবা আর কী জানে! বাবা বোঝে কম, বাবাদের বুদ্ধি নেই। বাবা পড়েছে ম্যাদামারা সরকারি স্কুলে, বাংলা মাধ্যম; আর আমার ইংরেজি মিডিয়ম, ঝাঁ-চকচকে স্কুল। আমাদের ইস্কুল, আর ওদের হল স্কুল। বাবা তেমন বড় চাকরিও করে না যে একটানা সম্মান করে যেতে হবে। এই সময় থেকেই সম্মানের ক্ষয় হয়। আমার ছেলেও সেই দিকেই এগোচ্ছে। সবাই হয়ত এভাবেই বড় হয়। ওর সাধ, ও বড় হয়ে আমেরিকা চলে যাবে।
ভাঙা ঘাটের একটি সিঁড়ি আছে, যা এখনও আস্ত রয়ে গিয়েছে। খোঁড়া লোকটি সেখেনে বসে ক্রাচ দুখানা পাশে রেখে দিয়েছে। তার পরনে হাফপ্যান্ট, গায়ে টি-শার্ট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। সে মাঝে মাঝে মুখ তুলে আমাকে দেখছে। সেও আমাকে চেনে, আমিও; ওই—কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলিনি কোনোদিন। বলার প্রয়োজন হয়নি, কেউ কারও নামও জানি না।
একদা এই ঘাট গমগম করত নিশ্চয়। অনেকে স্নান করত, পুজোর জন্যে জল তুলত। আজ তা ভাঙা হাট। ভাঙা ঘাট চাপা পড়েছে আবর্জনায়। একদিকে মৃতের জামাকাপড় পড়ে আছে। এই ভাবেই সবকিছু একদিন শেষ হয়। ঘাট ভাঙতে থাকলে ঘাটের মন ভেঙে যায়। এই ঘাট কি এখনও বেঁচে আছে?
আমি চারিদিকে তাকাই। খোঁড়াটি জলের দিকে তাকিয়ে আছে। এই একটিই লোক, ঘাটটিকে মনে রেখেছে।
ভাবলাম, আজকে অনেকটা হাঁটব। সুগার লেভেল বেড়েছে। এখন বাদুড়ের আকাশভ্রমণ দেখতে দেখতে মনে হল, কী হবে হেঁটে? সুগার নিঃশব্দ ঘাতক; তাকে বাড়তে দাও।
ওই দূরে একটা নৌকা ভাসছে দেখা গেল। গঙ্গা এই টানা হাওয়ায়, রাশিকৃত জলের দাবিতে উত্তাল! ওই একটি নৌকা ছাড়া আর কোনো নৌকা নেই। নামেনি।
খোঁড়াটা আবার আমার দিকে মুখ তুলে দেখল। আমি পিছন ফিরে দেখলাম, অচেনা যে লোকটা এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, সে নিঃশব্দে চলে গেছে।
মেঘে ভরা, বিশাল, মেদুর রঙের আকাশের মাঝখানে হঠাৎ একটা বিন্দু ফুটে উঠল। সেটি ক্রমে স্পষ্ট হল। একটি বাদুড়। বিশাল এই আকাশে সে একাই উড়ে চলেছে।
এমনি করে আরও কিছু বাদুড়ের আবির্ভাব একইভাবে হল। তারাও এদিক-ওদিক উড়ে তাদের গন্তব্যে যেতে লাগল। কেউই একজন অপরজনকে অনুসরণ করল না।
তখন ঘাটে একটি লোক এল। বছর তিরিশ বয়স হবে তার, আন্দাজে মালুম হল। সে রোগা, লম্বা, ফর্সা। পরনে লাল গেঞ্জি ও চোঙা প্যান্ট। কাঁধে ঝুলছে সরু একটি ব্যাগ। যেমন ব্যাগ টোটোওলারা রাখে।
সে এসে খোঁড়া লোকটার পাশে বসে পড়ল। খোঁড়াটা কথা বলার জন্যে উদগ্রীব ছিল। বলল, গাড়ি কোথায়?
—আজ আর বের করিনি।
—ভালো করেছিস। কাল রাত দুটোর সময় কী বৃষ্টি! আর ঘনঘন বাজ পড়ছে। ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে এসে দেখি আমার দুয়ারে দুজন মাঝি বসে আসে।
—মাঝি!
—আরে যারা রাতে নৌকা নামায়।
—বুঝলুম! তা তোমার কাছে কেন?
—জলের কারণে আর নদীর দিকে যেতে পারছে না, দাঁইড়ে গেছে আমার দুয়ারে। এত্ত ঝাপটা আর বৃষ্টি!
এইভাবে তারা কথা বলে যেতে লাগল। বৃষ্টির কথা, জলের কথা, নদীর কথা। আর মাঝিদের কথায় তারা বার বার ফিরে যেতে লাগল। এদিক-ওদিক থেকে কোকিল ডাকছে। সন্ধে নেমে আসছে দ্রুত। ভাঙা ঘাটের ধারে যে গাছ আছে, সেখানে একটি নৌকা বাঁধা রয়েছে। নৌকাটা থাকে ওখানে। কাউকে কখনও চড়তে দেখিনি।
ভাঙা ঘাটের ওদিকে প্রবল বুনো জঙ্গল। নদীর উর্বর পলিমাটি আর জল পেয়ে দুর্বারভাবে বেড়েছে। যত অন্ধকার ঘনাচ্ছে তত সেখান থেকে নানান বন্য জন্তুদের ডাক ও হুটোপাটির আওয়াজ ভেসে আসছে। কে জানে তারা কারা যারা ওখানে গর্ত করে, ভাঙা ঘাটের ফোকরে বাস করে। রাত হলেই ওদের বিচরণ সময় আসে। তখন আকাশে ফটফট করে দৃশ্যমান হল আরও কয়েকটি বাদুড়।
ব্যাগ ঝোলানো লোকটা যেমনি চটি ফটফট করতে করতে এসেছিল তেমনি করেই চলে গেল। তখন জ্বলজ্বলে চোখে খোঁড়াটা আমার দিকে তাকাল। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। রাস্তার ওদিকে আলো জ্বলে উঠেছে। নদীতে যে একমাত্র নৌকাটা ছিল, সেটাকে আর চোখে পড়ছে না। আকাশ একেবারে কালো হয়ে গেছে। বাদুড়ের ওড়াও নজরে পড়ল না।
খোঁড়া লোকটা বলল, বাদুড়গুলো ওদিকে যায়।
—কোনদিকে?
—যেদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া চটকল আছে, সেদিকে।
—ওরা কি বন্ধ চটকল পছন্দ করে?
—ওখানে আমি কাজ করতুম।
—পাটের গন্ধ ভালোবাসে তারা?
—এক্সিডেন্টে একটা পা নুলো হয়ে গেল।
—আর চটকল?
—বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু গাছগুলি আছে। চটকলের আশপাশে প্রচুর পুরানো গাছ, বটবৃক্ষ আছে। এই সন্ধের অন্ধকারে ওরা সেখানে উল্টো হয়ে ঝোলে।
—ঝোলে কেন?
—কেন, আপনি জানেন না ওরা মুখ দিয়েই বিষ্ঠা ত্যাগ করে?
চুপ করে যাই।
—আপনি এদিকে নতুন এসেছেন?
—হ্যাঁ।
—ফ্ল্যাট?
—হ্যাঁ।
—আমার হাতটা ধরে তুলে দিন। ফিরি।
তারপরে লোকটা ক্রাচ ঠুকঠুক করতে করতে ফেরে আলোর দিকে।
আমি তেমনি করে বসে পড়ি সেই অন্ধকারের ভেতরেই। যেখানে খোঁড়াটা বসেছিল, সেখানে। বন-জঙ্গল থেকে নানা জন্তুর কিম্ভূত সব নানান ডাক ভেসে আসে। অন্ধকার, তবুও যদি দু-একটি বাদুড় দেখা যায়—তাই বসে থাকি।
আমি কেন বাদুড় ভালবাসি, জানি না।
এখন মনে হল, আমিও বাদুড় হয়ে উড়ে যাই। কোনো এক বটগাছের ডালে পা-আঁকড়ে ঝুলে পড়ি। মুখ দিয়ে জীবনের যা কিছু সঞ্চয় সব ত্যাগ করে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলি।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা শিয়াল ডেকে উঠল।
————————————————————