




মুম্বাই শহরের প্রভাতী যানজট সামলে প্রভাতরা যখন চেক ইন কাউন্টারে পৌঁছল তখন যাত্রী নেওয়া বন্ধ হয়-হয়। কোনোমতে চেক ইন, ব্যাগ ড্রপ, সিকিউরিটি সেরে তাদের দৌড়তে হল, বিমানের দরজা বন্ধ হবে, লাস্ট এ্যান্ড ফাইনাল কল চলছিল।
যেমন হয়, বিমানে চড়ার পরে মনে হয় বিমানকর্মীদের কোনো তাড়া নেই। গ্যালিতে দাঁড়িয়ে খুটখাট করেই যাচ্ছে। মাথার উপরের বিনগুলি বন্ধ হল কিনা দেখছে, গ্রাউন্ড স্টাফদের থেকে কিছু বুঝে নিচ্ছে। মোটের উপর উড়লেও হয়, না উড়লেও হয় ভাব।
রীনা ততক্ষণে এয়ারবাস ৩২১-এর জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত। বিরক্ত হয়ে প্রভাত ফোন খুলে বসল। মিডল সীটে বসে সময় নষ্ট করার জন্য এর চেয়ে ভাল রাস্তা আর কই?
তখনই সে দেখল পোস্টটা। কাল রাতেই রীনা করেছে, ফেসবুকে। দেখতে দেখতেই সে রীনাকে বলল, শুনছো?
—উঁ। রীনার মনপ্রাণ তখন লাগেজ লোডিং দরশনে নিমগ্ন।
—আরে, উল্টাপাল্টা কী সব পোস্ট করেছো। আমি আবার ন্যানো-টেকনোলজিস্ট কবে হলাম! কালকেই আবার লিখে বসবে, আমি নাকি এ আই এক্সপার্ট। বলতে বলতেই রীনার কনুই ধরে টানে।
বাধ্য হয়ে এদিক ফেরে রীনা, তার মুখে একটা মজারু মার্কা হাসি ফুটে ওঠে। মুখে বলে,
—ও ঠিক শিখে যাবে। আমিও...
—মানে!
—কেন! তুমি না সুদূরের পিয়াসী! নূতন...আরো কত কী!
প্রভাত খোঁচাটা হজম করল চুপচাপ। আসলে এটা শোধবোধ হল।
পনেরো দিন আগের একটা সাত-সকাল ছিল জর্জ বিশ্বাসের ডিপ ব্যারিটোনের মত গাঢ় মেঘে অন্ধকার...শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে প্রভাত সেই দৈব-কন্ঠের অনুকরণের অক্ষম প্রচেষ্টায় গাইছিল, আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী। অবশ্য ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওই একটিই লাইন, কারণ পরের লাইনটা ধরলেই গাঢ় চায়ের লিকারে যেমন দুধ মিশে ফিকে করে দেয়, তেমনি তার নকল ব্যারিটোন ফ্যাঁসফেসে টেনরে বদলে যেত।
রীনা খানিকক্ষণ সহ্য করেছিল, তারপর বাথরুমের দরজায় নক করল। ভিতর থেকে প্রভাত বলল, আবার কী হল? ছুটির দিনে শান্তিতে একটু চান করব, তার জো নেই?
—চান করলে করো যতক্ষণ খুশি। কিন্তু সুদূরের তেষ্টায় থাকলে আরো দূরে যেতে হবে। বাথরুম অব্দি গেলে হবে না।
তারও কদিন আগে ব্রেকফাস্টের সময় রীনা জানিয়েছিল, ব্যাঙালোর যাওয়া দরকার।
প্রভাত-রীনার মেয়ে-জামাই দুজনেই আই টি-তে, ব্যাঙ্গালোর। বার বার ফোন করে যেতে বলত।
প্রভাত প্রস্তাবটা অনেকবার কাটিয়ে দিয়েছে, মেয়ে ফোন করলেই বলত,
—ওরে বাবা, সেখানে অগুন্তি ব্যাঙ, আমার একদম না-পসন্দ।
মেয়ে বাবাকে বিলক্ষণ চেনে, চেনে টিপিক্যাল বাবা-জোকগুলিও। তবু বলে,
—তোমার তো মসলন্দপুর ছাড়া আর কোনও জায়গা পছন্দ না। কিন্তু ব্যাঙালোরে অনেক ব্যাঙ কে বলল?
—আরে তাই বলেই না শহরটার নাম ব্যাঙ-গ্যালোর।
মেয়ে ফেস-টাইমিং করতে করতে সোজা কপালে হাত ছোঁওয়ায়। রীনা বিরক্ত হয়ে বলে--টুসি, এখন রাখ। তোর বাবা বাজারে গেলে তখন ফোন করে নেব।
এবার রীনার বক্তব্য ছিল, মেয়ে আলটিমেটাম দিয়েছে, ব্যাঙালোরে পত্রপাঠ না গেলে মুখদর্শন করবে না।
খবরের কাগজের পড়ার ছলে প্রভাত যুতসই উত্তর খুঁজছিল। সে বলল—
—আমি জেমিনি, তুমি পিসী হে।
—কী আবোল-তাবোল বকছো, এ আই দিয়ে গান লিখছো নাকি? আমি আবার কোন পিসী!
—নাঃ, তা বলিনি। আমি জেমিনি, তুমি ফিশী হে।
—কী যে পিস-পিস, ফিশ-ফিশ করছো, বুঝিনি, আর আমার অত সময়ও নেই।
—মানে বলছি, আমার মিথুন রাশি, আর তোমার তো মীন।
—তাই তো জানি। তাতে হল কী?
—নাঃ, এই বছরের রাশিফল দেখছিলাম আর কী।
—কী বলে তোমার রাশিফল?
—বলছে অবিবেচকের মত ঘুরে না বেড়াতে। দুই রাশির রাশিফলেই। নিপাতন ভবিতব্য, ডেভিডের হাতে গোলিয়াথের মত। এর পরেও রিস্ক এক্সপোজ়ার নেওয়া কি ঠিক?
— তোমার সব ইয়ের মত...জানো, মেজদারা এবার জার্মানি যাচ্ছে?
মেজদা মানে প্রভাতের মেজশালা। প্রভাতের মুখে এসে গেল, যার মানি আছে সেই জার্মানি যেতে পারে, এ আর এমন কী? বলেই বুঝল লোপ্পা ক্যাচ তুলে দিয়েছে। রীনা সত্যিই যার পিসী, মেজদার সেই কন্যা বন শহরে পোস্ট ডক করতে গিয়েছে কিছুদিন হল।
মনে ছিল না এমন নয়, শুধু ফাজলামিটা ছাড়তে পারে না প্রভাত।
রীনা গম্ভীর হয়ে গেছিল। প্রভাত শুনতে পেল রীনা রান্নাঘরে গজগজ করছে, মানি তো অনেকেরই থাকে, মাইন্ডও লাগে মনে হয়। নইলে ব্যাঙালোর যাওয়াও হয়ে ওঠে না। বাক্যবাগীশ।
মেজশালা আসলে থাকে আমেরিকায়। এক মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে ডাঙর প্রযুক্তিবিদ। শহরটার নাম বোধহয় হার্টফোর্ড। কানেক্টিকাট রাজ্য। মেজ বলে কানেডিকাট। মেজ আরো অনেক কিছু বলে, স্কেজ়ুল, মাল্টাই-ন্যাশনাল। প্রথমবার আলাপের সময়ও প্রভাত ছড়িয়েছিল, যাকে বলে ছড়িয়ে ছত্রিশ। বিয়ের বাসরে কিছুক্ষণ মাল্টাই-পাল্টাই শুনে ঝালাপালা হওয়ার পর আস্তে আস্তে নিজের মনেই বলেছিল, কান একটি, কাট। হৈ-হৈ করে চলা আড্ডায় ক্ষণিকের নীরবতা নেমে এসেছিল। অবশ্য তাতে একটা লাভ হয়েছিল, নতুন বিয়ের পর-পর রীনাদের একান্নবর্তী পরিবারের অনেকগুলি শালাশালীর জামাই-ঠকানো উৎপাত তাকে পোয়াতে হয়নি।
বরং শাশুড়ি-মা পর্যন্ত বাসি বিয়ে থেকে কন্যা বিদায় অবধি যথেষ্ট ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছিলেন। শালা-শালীদের বেশি ঘেঁষতে দেননি, নতুন জামাই আবার কী মুখ-ফসকা নামিয়ে বসে! শালা শালীরা ঠিকঠাক বাসর না জমাতে পারা নিয়ে আজও আক্ষেপ করলে, প্রভাত কাঁধ ঝাঁকায়, বলে , জানব কী করে তোমাদের বাড়িতে ওরকম বন্দীশালা ছিল।
কেবল মেজদা সহাস্যে বলেছিলেন, আহা , কী মধুর শোনালে ভায়া, কান যদি একটি, তবে কাট। সেই থেকে মেজ কোথাও গেলে, প্রভাতকে একবার বাজিয়ে নেয়।
—বুঝলে প্রভাত, এবার তাইপেই চললাম।
—বুঝেছি দাদা। আপনাকে ভেবেই গুরুদেব লিখেছিলেন একদিন চিনে নেবে তারে।
—আরে এ চিন সে চিন নয়। তাইওয়ান।
—তাই বলুন, প্রথম পদক্ষেপ, এবার একে একে সব চিনে যাবেন, চিন, ইন্দোচিন, চিঞ্চপোখলি। তাই ওয়ান দিয়ে শুরু।
যেবার আপিসের কাজে প্রভাতকেই আমেরিকা যেতে হয়েছিল, সেবার তো খবর শুনেই মেজ-র ঢালাও আমন্ত্রণ— চলে এসো কানেডিকাট। কোন স্টেটে আসছো?
—হোয়্যার ডেসটিনি টেকস আস!
—এ্যাঁ! কী বললে?
—টেক্সাস। অস্টিন।
—ওঃ!
মানুষটা খারাপ না, শুধু বেজায় কুঁড়ে আর নির্বিরোধী। সেটা আড়াল করতেই কথার ঘনঘটা।
কিন্তু বিধি বাম, প্রভাতের অন্তত তাই মত। মেয়ের দিক থেকে তাগাদা ক্রমেই ভীষণ আকার ধারণ করছিল, টর্নাডোর মত রীনাকে এতটাই খেপিয়ে তুলছিল, যে প্রভাত ভাবছিল মেয়েকে বলে, বহোত হুয়া, অব ঘর কা শান্তি তোড় না দো। রীনাকে মিনমিন করে সে কথা বলতেই সে ফোঁস করে ওঠে।
—দুটো তিনটে নয়, একটা মোটে মেয়ে আমাদের। কী পাষাণ প্রাণ বাপ তুমি...ছিঃ!
অগত্যা প্রভাত টিকিটের জন্য নেট ঘাঁটতে বসে। রীনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে। গুনগুন করে গায়, ট্রিপমেকার ট্রিপমেকার মেক মি আ ট্রিপ, সেন্ড মি আ সেন্ড, লেস্ট পকেটস বার্ন।
—ওটা ট্রিপমেকার নয়। ম্যাচমেকার। শুদুমুদু গানটার পিন্ডি চটকে দিচ্ছো।
—আরে এ বয়সে ম্যাচমেকার দিয়ে কী হবে! মেয়ের তো বিয়ে হয়ে গেছে। নাতি নাতনির এখনও দেখা নেই। কাজেই নাতনির বিয়ে অব্দি থাকবো বলে তো মনে হয় না। বরং সস্তার টিকিট...
—যত্তসব বাজে কথা! থাকবে না কে বলল? রীনা রাগতে গিয়েও হেসে ফেলে।
যাই হোক, এই সবের মধ্যেই একদিন মেয়ে জানাল তারা টিকিট কেটে ফেলেছে। এখন না গেলে গুচ্ছের খানিক পয়সার অপচয় হবে। প্রভাত রাগতে গিয়ে বুঝতে পারল এতে রীনার প্রচ্ছন্ন মদত আছে। কী আর করা।
কাজেই তার বাথরুম সঙ বদলে গেল, ভেঙে মোর ঘরের তালা...কিন্তু রীনার জ্বলন্ত দৃষ্টির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সে শুধু সুরটা বজায় রেখেছিল। তালার সঙ্গে মিল দেওয়ার চেষ্টা আর করেনি।
—রিটায়ার করে পড়াশোনা করতে চললে ভায়া? কনগ্রাটস! মেজশালা লিখেছে।
—তাই বলে ন্যানোটেক! ওরে বাবা! ছোটশালীর উদ্বেগ প্রদর্শন, সঙ্গে ইমোজি।
এরকম আরো আত্মীয়স্বজনের অগুন্তি মন্তব্য।
রীনার পোস্টে শুধু তাদের চারজনের একটা ছবি, সঙ্গে এক লাইন লেখা, আওয়ার ট্রিস্ট উইথ ন্যানোটেকনোলজি কমেন্সেস ফ্রম টুডে।
প্রভাতের হঠাৎ বড় বিভ্রান্ত লাগে। এই প্রথম তার সিক্কা তাকেই ফেরত দিচ্ছে কেউ।
রীনা মায়া প্রকাশনীর সহায়িকার মত মুখ করে বলে, ন্যানোটেকনোলজি তেমন কঠিন কিছু নয়। আমরা পেরে যাবো মনে হয়।
—কী আজেবাজে বকছো, ঝেড়ে কাশলে হয় না?
—ন্যানো আর ননী। ওই একই কথা তো।
—মানে?
—মানে আমার মাথা আর মুন্ডু। ননী মানে দুধ। বেবি ফরমূলা। এখনও বুঝলে না!
প্রভাত মাথা নাড়ে।
—ওফ! আরে আমরা দাদু-দিদা হতে চলেছি।
বিমানবালিকার দেওয়া চরণামৃতর মাপের বোতল থেকে জল খাচ্ছিল প্রভাত, থেমে গেল। নইলে নির্ঘাৎ বিষম খেত। চোখগুলো ছানাবড়ার মত করে বলে
—সে কী! এতদিন বলোনি! ডেট কবে?
—পরের সপ্তাহে। টুসি বলতে মানা করেছিল তো। আজও, কী লিখব সে-ই তো বলে দিল, নইলে ওসব কি আমি জানি?
রীনার মুখে বিজয়িনীর মত হাসি।
টুসিরা তাকে সারপ্রাইজ় দেবে বলে আগে বলেনি। প্রভাতের মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। ন্যানো মানে নবাগত শিশু, ননী মানে ফরমূলা দুধ! বাপকা বেটি!
তখনই খেয়াল হয়, গাল বেয়ে জলের ধারা। এই প্রথম বোলতি-বন্ধ্ প্রভাতের।