• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • অজ্ঞাত : রিঙ্কি দাস

    "নতুন রাঁধুনি বামুনটি বেশ রসিক মানুষ, শুনেছি! যেমন খাসা রান্না তেমন অন্য রসাস্বাদনেও পটু।" রামদয়াল একটু অতিরিক্ত রং চড়িয়ে কথাটা পাড়ে। "আজ একটু পোলাও, কাল ক্ষীরপুলি, পরশু মাছভাজা, এসব টুকিটাকি খাইয়ে অন্দরমহলের নতুন দাসীটিকে বেশ হাত করে ফেলেছে!"

    "নতুন দাসী? অন্দরে নতুন দাসী ঢুকেছে বুঝি? কই, আমায় তো কেউ বলেনি?" কসরত শেষ করে সরোবরের তীরে নিজের বিশ্বস্ত অনুচরদের হাতে তেলমালিশের আরাম উপভোগ করছিল কচি পালোয়ান, কথাটা শুনে ঠাণ্ডা চোখে রামদয়ালের দিকে তাকালো সে। "আমায় প্রণামী না ঠেকিয়ে কোনো দাসী কাজে ঢোকে না এই বাড়িতে, সেটা জানিস?"

    "আজ্ঞে আমি আজকেই এই নতুন জনের কথা জানলাম। নইলে আপনার কাছে এই খবর চেপে রাখবে এমন আস্পদ্দা কার?" রামদয়াল একটু দোনামনা করে। "তবে নিজের চোখে দেখে বলছি, সর্দার, এ শুধু নতুনই নয়, একেবারে যৌবনের রসে টইটম্বুর! এমন মেয়েছেলে এ অঞ্চলে আমি তো কোনোদিন দেখিনি, যেমন এক ঢাল চুল, তেমন চোখের মণিতে বিদ্যুৎ, আর বুক পিঠ কোমর যেন ..."

    "থাক, আর বলতে হবে না!" অঙ্গসংবাহনকারী ছোকরাগুলোকে মাঝপথে থামিয়ে তড়াক করে উঠে বসে কচি পালোয়ান। নামেই কচি, অল্পবয়সে আখড়ায় সবার চেয়ে ভালো কুস্তির মারপ্যাঁচ জানতো, তাই লোকে বলত কচি পালোয়ান। এখন মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না! কচি পালোয়ানকে রীতিমত চুল আর গোঁফের রুপোলি রেখার ওপর কাজল বোলাতে হয়। তবে রসনা ও রমণী - ওই দুটি ক্ষেত্রে বয়স তাকে ছুঁতে পারেনি। মহলে নতুন সোমত্ত দাসী ঢুকেছে শুনে সে বেশ নড়ে চড়ে বসলো। নতুন মেয়ে এসে রান্নার ঠাকুরের সাথে দিব্যি ভাব জমিয়ে ফেলল আর এই নিষ্কর্মা রামদয়াল কিনা আজকে প্রথমবার শোনাচ্ছে তার কথা?

    হিসহিসিয়ে কচি বললো "এসব বামুন ঠাকুর ফাকুরের সাথে বেশি দূর এগোনোর আগে আমার ওকে চাই। ঠাকুরটাকে বরং বিদেয় করার ব্যবস্থা কর!"

    "আজ্ঞে আপনিই তো বলেন এ বাড়ির খাবার মুখে তোলা যায় না, রাস্তার ধারে ছোট্ট শুঁড়িখানাগুলো পর্যন্ত এ বাড়ির মোটা মাইনের রাঁধুনিদের চেয়ে ভালো মাংস ভাজা বানায়, তাই তো আগের পাচককে হটিয়ে নতুন লোক আনালাম, আর মিথ্যে বলব না, লোকটার হাতে জাদু আছে। এই তো, খাস্তা কচুরি গুলো চেখে দেখুন একবার?"

    কচি পালোয়ান একটু গম্ভীর ভাবে সামনের থালা থেকে ক খানা কচুরি টুপটুপ মুখে ফেললো। স্বাদে চোখ বুঁজে এলো তার। কথাটা খুব ভুল বলেনি রামদয়াল, নবনিযুক্ত পাচকটির দক্ষতা প্রশ্নাতীত। এত বছরে অজস্রবার এ বাড়ির রাঁধুনী বদল করতে হয়েছে, সবার খাবারে কদিন পর পরই মুখ মেরে আসতো কচির, তবে এই ঠাকুরের রান্না চমৎকার। কচুরির সাথে রুপোর গেলাসে দুধ-বাদামের শরবতটিও খুব তরিবত করে পান করলো সে।

    অনেক ভেবে নিজের গলার থেকে একটা পাতলা সোনার হার খুলে রামদয়ালের হাতে দিয়ে কচি পালোয়ান বলল, "শোন ব্যাটা, আড়ালে মেয়েটাকে একা পেলে এইটে ধরিয়ে দিবি। বলবি, রাতে আমার ঘরে এলে আরো দেবো।"

    "আরে রাম রাম!" রামদয়াল আধ হাত জিব কাটে। "গিন্নীমায়ের অন্দরমহলে ঢুকে তার খাসদাসীকে ভেট দেবো আমি? ধরা পড়লে ক ঘা পড়বে তার ঠিক নেই, আমি রোগা ভোগা মানুষ!"

    "থাক, আর ন্যাকা সাজতে হবে না। যে ভাবে অন্দরমহলে না ঢুকেই ওই আগুনে রূপের ব্যাখ্যান করছিস, সে ভাবেই যাবি ওর কাছে। কাল সকালের মধ্যে জানাবি সে মেয়ে কী বলে।"

    ==========

    রামদয়াল জানত, কাজটা সহজ নয়। এই জমিদারবাড়িতে কোনো কাজই কি ছাই সহজ কাজ? দোজবরে গৃহকর্তা সতীসাধ্বী বড় রানিকে দরজা দেখিয়ে কমবয়সী ছোটগিন্নীকে ঘরে তুলেছেন, তারও প্রায় ষোলো সতেরো বছর হয়ে গেল, তবু সেই ছোটরানির স্বভাব বদলালো না এতটুকুও। অল্পবয়সে এত বড় মহল, গয়নাগাটি পেয়ে তাঁর গেল মাথা বিগড়ে! সারাদিন শুধু সাজগোজ, গয়নাশাড়ি, রূপচর্চা এই নিয়েই ব্যস্ত। এক ছেলে, এক মেয়েও আছে সংসারে, তাদের যত্নআত্তি করার ফুরসৎ কোথায় রানির? যৌবনের জোরে এই সংসারে ঢুকেছিলেন, তাই সর্বদা যৌবন গেল গেল ভয়! মাঝখান থেকে কর্তার কানে মন্তর দিয়ে বড় সতীন আর সতীনপুত্রকে ভাগিয়েছেন; ছোটগিন্নীর মেয়েটা কিন্তু বেশ লক্ষ্মীমন্ত, একেবারেই মায়ের ধাত পায়নি, তাকে নাচ গান পড়াশোনা শেখানোর জন্য একটা হিজড়ে মাস্টার রাখা হয়েছে ইদানিং; কারণ গিন্নী কিছুতেই অন্দরমহলে পুরুষ ঢুকতে দেবেন না। একমাত্র নিজের স্বামী, পুত্র আর ভাই ছাড়া।

    রামদয়ালের বাবা বড়গিন্নীর আমলে এ বাড়ির খাস চাকর ছিল। ছোট গিন্নী তাদের সবাইকে তাড়িয়ে নতুন লোক ঢুকিয়েছিলেন। সবাই হয় নিজের আত্মীয়, বা বাপের বাড়ির দেশের লোক, কিংবা ভাইয়ের চেনাশোনা। রামদয়াল জানে, এ বাড়িতে ছোটগিন্নীর ভাইয়ের খুব প্রতিপত্তি। বলতে গেলে প্রায় জমিদার মশাইয়ের সমান সমান। সেই ভাই-ই হলো গিয়ে কচি পালোয়ান। শক্ত গাছ দেখেই নৌকো বেঁধেছে রামদয়াল, সে ভালমতন বুঝে গেছে, যতদিন কচি পালোয়ানের নেকনজরে থাকতে পারবে, ততদিনই সে এই তল্লাটে কিছু করে খেতে পারবে। কচি পালোয়ানের গায়ে তেল মালিশ করা, ফাইফরমাস খাটা, মোসাহেবি, অল্পবিস্তর গুপ্তচরবৃত্তি, এসবই তার কাজ। তবে ক বছর হলো এই অন্যধরনের কাজটাও তাকে করতে হচ্ছে। কচির জন্য ভালো ভালো মেয়ে খুঁজে আনা। কচি এই জন্য তাকে অনেক বকশিস দেয়, তেমন কপালে থাকলে মেয়েগুলোর কাছ থেকেও উপরি জুটে যায়।

    সোনার হারখানা ঘুনসিতে বেঁধে একটু রাতের দিকে রান্নাঘরের কাছে এলো রামদয়াল। কুপির আলোয় উনুনের পাশে দেয়ালে দুজনের ছায়া দেখতে পেলো সে। পাচক ঠাকুর আর গিন্নিমার নতুন ঝি। ছায়া দেখেই দিব্যি চেনা যায় দুজনকে। পাচক ঠাকুরের বেশ লম্বা-চওড়া পেটানো স্বাস্থ্য, আর ঝিটা? আহা, যেন মন্দিরের থামে খোদাই করা অপ্সরা! ছোট গিন্নী বড় কিপটে, দাসীদের মোটা একরঙা কাপড় ছাড়া কিছু পরতে দেন না, তাতেই কি খোলতাই রূপ এই মেয়ের! কান খাড়া করে একটু দুজনের কথা শোনার চেষ্টা করলো রামদয়াল।

    "এই নে দুধ, এতে একটু মধু মিশিয়ে দিয়েছি, দেখিস তোর রানিমার ভালো লাগবে। আর জলটা মাটির কুঁজো থেকে গড়ানো, এতে কর্পূর দেওয়া আছে।"

    "আহা, রানিমার জলখাবারের কথা ভেবে তোমার দেখি চোখে ঘুম নেই!" রামদয়াল ভাবে, কি মিষ্টি গলা মেয়েটার! "বলি, আমার যে সারাদিন জড়িবুটি বেটে, শেকড় বাকড় সেদ্ধ করে গিন্নীর চুলে মাখার ভেষজ তেল বানাতে বানাতে কিছু খাওয়া হয়নি, সে খবর রাখো?"

    "সব খবর রাখি। তাই থালাবাটিও সাজিয়ে রেখেছি! ঘি ভাত, দাল, দুরকম তরকারি, আচার, মাছ ভাজা, তিতির পাখির ঝাল ঝাল মাংস। শেষপাতে চিনি দেওয়া দই। খেয়ে ফেল চট করে।"

    বাসনকোসনের শব্দ কানে আসে রামদয়ালের। বুঝতে পারে, সময় নিয়ে বেশ তৃপ্তি করে খাচ্ছে মেয়েটি। দেয়ালের ছায়া দেখে বোঝে, পাচক ঠাকুর এক খানা হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করছে তাকে। করতে করতেই একটু তাগাদা দেয় সে। "তাড়াতাড়ি যা। বেশিক্ষণ পাকশালায় বসে থাকলে তোর রানিমা সন্দেহ করবে।"

    রামদয়াল ঠিকই ধরেছিল। এদের মধ্যে সম্পর্কটা সন্দেহজনক দিকেই গড়াচ্ছে! কি বোকা মেয়ে রে তুই, রাজারাজড়াদের আঁচলে বেঁধে রাখার মতো রূপ নিয়ে ঘুরঘুর করছিস কিনা ওই আধ বুড়ো রাঁধুনির পিছনে!

    দুধের বাটি, জলের গেলাস, সামান্য ফল থালায় সাজিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে ঝি। কি চলার ভঙ্গি, অজগর সাপের মত পুরুষ্টু বিনুনিখানা কি সুন্দর দুলছে তার পায়ে পায়ে। একটু এগিয়ে অন্ধকার বাঁকে তাকে ধরে ফেলে রামদয়াল। সোনার হারটা দোলায় তার নাকের ডগায়।

    "অ্যাই ঝি, এইটা নিবি? গলা খালি, হাতে কটা কাঁচের চুড়ি ছাড়া কিছু নেই, এটা পরবি?"

    চমকে উঠে প্রায় থালা ফেলে দিচ্ছিল ঝি। গম্ভীরভাবে বলল "গলা খালি দেখছিস বুঝি? মঙ্গলসূত্রখানা চোখে পড়ছে না? যা ভাগ এখন থেকে!"

    "আহা চটছিস কেন?" একটু গলায় মধু আনার চেষ্টা করে রামদয়াল। "আমি তো সব খোঁজ নিয়েছি, তোর সোয়ামী বহুকাল নিরুদ্দেশ, তাই তোকে ঝি-গিরি করে খেতে হচ্ছে, এ কথা মহলের দাসীমাত্রই জানে। নে, এই হারখানা নে, কাল আমি এক জায়গায় নিয়ে যাব, চল আমার সঙ্গে, কচি পালোয়ানকে খুশি করতে পারলে সোনায় মুড়ে দেবে।"

    "মরণ! তোর মত তালপাতার সেপাই কিনা আমায় প্রস্তাব দিচ্ছে! যা ভাগ এখান থেকে! ওই একরত্তি সোনার জন্য নাকি তোর পিছন পিছন যাব!"

    রামদয়ালকে আর একটাও কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে দাসী দ্রুতপায়ে অন্দরমহলের দিকে চলে যায়। রামদয়াল মোহিত হয়ে তার চলে যাওয়াটুকু দেখে। তারপর হঠাৎ করে তার সংবিৎ ফেরে। পিছন পিছন ছুটতে থাকে সে।

    "ওরে, ভুল বুঝিসনি, থাম! আমি তো আর আমার কথা বলতে আসিনি রে, তোকে যে ডেকেছে, সে তোর আমার অনেক ওপরে! তেমনভাবে খুশি করতে পারলে দাসীর থেকে একেবারে রানি হয়ে যাবি রে!"

    ঝি-টা আর একটাও কথা খরচা করে না। শুধু একবার আগুনঝরা চোখে তাকায় রামদয়ালের দিকে। তারপর বড় বড় পা ফেলে সিধে অন্দরমহলে ঢুকে যায়।

    ________

    মধ্যাহ্ন ভোজনের পর বেশ লম্বা ঘুম দেন গিন্নিমা। নতুন মেয়েটি তাঁর ঘুমের মধ্যেই তাঁর মুখে রূপটান লাগিয়ে দেয়, ধূপের ধোঁয়ায় তাঁর চুল শোকায়। এই সময়টা রানির বড় আরামের, তার ওপর আজ নতুন পাচকঠাকুরের ভুনি খিচুড়ি খানাও বড় জম্পেশ হয়েছিল। একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিলেন রানি, ভাতঘুমটাও তাড়াতাড়ি এসেছিল।

    সবাই জানে, এই সময়টা রানির নিজস্ব, কেউ তাঁকে বিরক্ত করে না। খোদ রাজাও নয়, এমনকি তাঁর নিজের ছেলেমেয়েরাও নয়। তাই হঠাৎ করে এই অসময়ে কেউ দেখা করতে এসেছে শুনে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন তিনি। ঘুমের ঘোরেই বললেন, "পরে আসতে বল।"

    "পরে আসতে বলব?" দাসীটি যেন ভরসা পায় না। "আপনার ভাই, রাগ করেন যদি?"

    "আচ্ছা, বেশ, নিয়ে আয়," বলে রানি আড়মোড়া ভাঙেন। দাসীটি একখানা হালকা চাদর জড়িয়ে দেয় রানির আলুথালু শাড়ির উপর, নিপুণ হাতে তাঁকে এলোখোঁপা বেঁধে দেয়, ত্রস্ত পায়ে ভৃঙ্গার আর বস্ত্রখণ্ড এনে মুছে দেয় অর্ধশুষ্ক রূপটান।

    এসব শেষ হতে না হতেই গদাইলস্‌করি চালে ঘরে এসে ঢোকে কচি পালোয়ান। আজ বেশ যত্ন নিয়ে সেজেছে সে, সাদা ফিনফিনে রেশমের ধুতি চাদর, মাথায় মুক্তো বসানো লাল পাগড়ি, গলায় মুক্তোর হার, দুহাতে চুনিপান্না বসানো ভারী সোনার বাজুবন্ধ। দাসীটি তখনও রানির কপালে চন্দনকুঙ্কুম তিলক আঁকছে, কচি পালোয়ানের নজর এড়ায় না।

    কি অদ্ভুত সুন্দর এই মেয়ে! সমস্ত দেহের কোথাও এতটুকু খুঁত নেই, কি বিশাল কবরী, কি গভীর দুটি চোখ, কি তীক্ষ্ণ নাক, চিবুকের কি ডৌল! হাঁসের মত লম্বা গলা, শঙ্খের মত গ্রীবা বুঝি একেই বলে! আর বাহু? মৃণালভুজ শব্দটা শুনেছে বটে কচি সর্দার, এর আগে কোনোদিন দেখেছে কি? মেটে লাল রঙের মোটা সুতির কাপড়ে জড়ানো কি অপরূপ দেহ বিভঙ্গ! হাতে একখানা থালায় সাজানো চন্দন কুমকুমের বাটি, দিদিরানির কপালে সযত্নে টিপ পরিয়ে দিচ্ছে মেয়েটা, কত সাধারণ একটা কাজ, অথচ দেখতে যে কি অসাধারণ লাগছে বলে বোঝানো দায়। কচি পালোয়ানের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়, আসনের হাতল শক্ত করে চেপে ধরে সে। শুধু মনে হয়, এই সামান্য দাসীকে, এই, অলোকসামান্য নারীকে শয্যায় না পেলে সব প্রাপ্তি বৃথা, পৌরুষ বৃথা, মানবজন্ম বৃথা!

    "তা ভাইয়ের আমার এই ভরদুপুরে দিদিকে মনে পড়ল যে বড়?" পাশবালিশ কোলে হাই তুলতে তুলতে প্রশ্ন করেন রানি।

    "সে ভারি লজ্জার কথা গো দিদি!" কচি ইচ্ছে করে দিদির সামনে আদুরে আহ্লাদী ছেলে সাজার চেষ্টা করে। "আজ সকাল থেকে বড় বেশি তোমার চুর্মা লাড্ডুর কথা মনে পড়ছে। কতদিন খাইনি বলো তো? সারা জীবনে কত্ত মন্ডামেঠাই খেলাম, তবু ও স্বাদ পেলাম কই? একদিন যদি আবার সে লাড্ডু বানাও, তো প্রাণভরে খাই!"

    "শুধু এই আবদারের জন্য আমার কাঁচা ঘুম ভাঙালি? যা, নিজের ঘরে যা, কালকেই খান কতক লাড্ডু বানিয়ে পাঠাবো।"

    "আরেকটা আরজি আছে গো দিদিরানি। একটু গোপনীয়।"

    রানি ইশারায় নতুন দাসী আর চামরধারিণী প্রবীণা দাসীটিকে ঘর ছেড়ে যেতে বলেন। তারা বেরিয়ে গেলে কচি গলা নিচু করে বলে, "মিষ্টি যখন পাঠাবে, এই নতুন দাসীটির হাত দিয়ে পাঠিও।"

    এক মুহূর্ত ভুরু কুঁচকে যায় রানির। তবে কচির কাণ্ডকারখানা তিনি ভালই জানেন, তাঁর এই ব্যাপারে বিশেষ হেলদোল নেই, তিনি জানেন গায়ের জোরের জন্য স্বয়ং তাঁর নিজের স্বামীও এই ভাইটিকে সমঝে চলেন, তার ক্ষেত্রে সাত খুন মাপ। আর এ তল্লাটে কার ঘাড়ে ক-টা মাথা যে কচি পালোয়ানের নামে নালিশ করবে? ও পালোয়ান লোহার শিক বাঁকাতে পারে, ওকে ক্ষেপিয়ে কার কি লাভ! না, ন্যায়-অন্যায়ের মত শব্দ কচির ক্ষেত্রে খাটে না, আর শত দুষ্কর্ম করলেও তার বিচারের প্রশ্ন অবান্তর।

    তবু রানি মুখে বলেন, "দেখিস বাপু, যা করবি ভেবেচিন্তে করিস। মেয়েটার স্বামী আছে, তবে দূরদেশে থাকে... যেটুকু দেখেছি, এর স্বভাব চরিত্র ভালই মনে হয়। চট করে সব প্রস্তাবে রাজি হবে বলে মনে হয় না।"

    "আহা, সঠিক দাম হাঁকলে সবাই সব প্রস্তাবে রাজি।" শঠতার হাসি ফোটে কচির মুখে। "তুমি শুধু ওকে লাড্ডুর থালা হাতে কাল আমার কাছে পাঠিয়ে দিও।"

    ______________

    থালা ভর্তি লাড্ডু নিয়ে কচি পালোয়ানের মহলের দিকে যাচ্ছিল নতুন দাসী। বেশ একটু ভয় ভয় করছিল তার। কচি পালোয়ানের এক শাগরেদ যে তাকে একছড়া হার ভেট দিয়ে কুপ্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, সে কথা রানিকে জানাতে সাহস হয়নি তার।

    "ও মেয়ে, রোজ তো তুমি রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে অন্দরমহলে আসো, আজ অন্দর থেকে খাবার নিয়ে বার বাড়িতে যাচ্ছ যে বড়?" জমকালো কাঁচ-বসানো হলুদ লাল ঘাগরাা চোলি পরা এক দীর্ঘাঙ্গিনী দুপায়ে ঘুঙুর ঝমঝমিয়ে এসে দাঁড়ায় তার পাশে।

    "রানির আদেশে তার বানানো মিঠাই তার ভাইয়ের ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।" একটু গলা কেঁপে যায় দাসীর।

    “হুঁ। ওই ভাইয়ের সম্পর্কে কত কথাই তো কানে আসে! তুমি যেমন রূপসী, অমন লোককে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। আমি আসব নাকি তোমার সাথে?"

    "রানির আদেশ, একাই যেতে হবে আমায়। আশা করি ভরা দিনের আলোয় লোকটা কোনো অভব্যতা করবে না।" একটু হলেও গলা কেঁপে যায় দাসীর। "বেগতিক দেখলে এক ছুটে কর্তা রাজার দরবারে গিয়ে হত্যা দেব। আমি তাঁর মহলে আশ্রিতা, আমায় রক্ষা করা তো তাঁরও কর্তব্য, না কি?"

    হাসিতে ফেটে পড়ে হলুদ লাল ঘাগরা চোলি। "বোকা মেয়ে! সিংহাসনে বসলেই কি সবাই বিচক্ষণ রাজা বনে যায়! ভাবতাম তোমার মত বুদ্ধিমতী মেয়ে 'রাজা মাত্রই সুবিচার করবেন', এই আপ্ত বাক্যের ভরসায় এমন ঝুঁকি নেবে না! এই শিখেছো জীবনে?"

    "আমি জীবনে কি শিখেছি না শিখেছি, তাই নিয়ে তোমায় বাঁকা কথা শোনাতে হবে না।" থালা নিয়ে রাগত ভঙ্গিমায় চলে যায় নতুন দাসী।

    অদূরেই কচি পালোয়ানের মহল। খুবই উৎকৃষ্ট মহল, এক কালে বড় রানির বাস ছিল এখানে। ছোট গিন্নী স্বামীর কানে ভুজুংভাজুং দিয়ে তাঁকে বিতাড়িত করে সে মহল ভাইয়ের হাতে সঁপে দিয়েছেন। বাইরে ফোয়ারা, সরোবরে পদ্মফুল, তার তীর ঘেঁষে মনোরম ফুলের বাগান।

    কচি পালোয়ান প্রচুর সাজগোজ করে বসেছিল পালঙ্কের ওপর। গাঢ় বেগুনি রেশমের ধুতি, সোনালী জরির চাদর, সোনা হীরে নীলা চুনী পান্না ঝকমক করছে সর্বাঙ্গে।

    দাসীটি মিঠাইয়ের থালা নিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো। ইতস্তত করলো ভিতরে আসতে।

    "এদিকে আয়, পালঙ্কে বস। থালা থেকে খাইয়ে দে আমায়।" কচি কামাতুর স্বরে বলে ওঠে। "তোর মত মেয়েকে ওই একরত্তি সোনার হার দিয়ে যে কেনা যায় না, সে আমি বেশ বুঝেছি। এই দেখ, আমার কত সোনা মনি মকরতের অলংকার। এমনটা এদেশের রাজা রানিরও নেই। এই গয়নার মধ্যে যেইটা মনে ধরে, সেটাই তোর। তুই শুধু পালঙ্কে এসে বস।"

    "রানি আপনার ঘরে মিষ্টি পৌঁছে দিতে বলেছিলেন। পালঙ্কে বসতে নয়," মিষ্টির থালাটা চৌকাঠের পাশে ঠক করে নামিয়ে রেখে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে এলো মেয়েটি।

    এত স্পর্ধা? কচি পালোয়ান জোর না খাটিয়ে অনুনয় বিনয় করছে, তার এই প্রতিদান? রাগে জ্বলে উঠলো সে। খাটের থেকে তড়াক করে লাফ দিয়ে ছুটলো মেয়েটির পিছনে। মাথার চুল টেনে বুকে জাপটে ধরার চেষ্টা করল তাকে, তবে মেয়েটির গায়ে জোর আছে বলতে হবে। কচির হাতের বাঁধন কাটিয়ে এক ছুটে সে সোজা মহলের বাইরে। এদিক-ওদিক উদভ্রান্তের মত তাকিয়ে সে ছুটলো রাজার সদরে। যেখানে দরবার বসে।

    কচির হাসি পেয়ে গেল। মেয়েটার ধারণাই নেই যে তার সঙ্গে শলা না করে রাজা এক পাও চলেন না। কচি যদি রাজসভায় সবার সামনে থেকে মেয়েটাকে চুল ধরে হিড়হিড় করে টেনেও নিয়ে আসে, কেউ টুঁ শব্দটি করবে না। জোর যার, মুলুক তার!

    রগড়টা দেখার জন্য সে এবার দাসীর পিছন পিছন চলল।

    দিনের এই সময়টা রাজার সাক্ষাৎপ্রার্থী বিশেষ কেউ নেই সভায়। মোসাহেব পরিবৃত হয়ে গল্প করছিলেন প্রবীণ রাজা। রান্নাঘর থেকে ফল ফুলুরি, শরবত আসছিল দফায় দফায়, এক লোকশিল্পী কাঠের পিঁড়িতে বসে মাঝেমধ্যে গান শোনাচ্ছিল ফরমাস মতো।

    আলুথালু চুলে বিশ্রস্তবসনা রূপসী দাসীর প্রবেশ বড়সড়ো একটা ছন্দপতন ঘটালো সেই আড্ডার আমেজে।

    রাজার আসনের সামনে নতজানু হয়ে বসে পড়ল দাসী। করজোড়ে বলল, "রক্ষা করুন, রাজা। আমি রানিমার কর্মচারী, আপনাদের আশ্রিতা। বিবাহিতা, নিজের সম্মান বাঁচিয়ে রেখে আমার রোজকার কাজটুকু যথাসাধ্য করে যেতে চাই, আপনার রাজ্যের এক শ্বাপদের কুদৃষ্টি পড়েছে আমার উপর, আপনি বিচারক, সবার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, এখন আপনিই সহায়।"

    কচি পালোয়ান পিছন পিছন এসে দাঁড়ায় সভায়। অট্টহাসি হেসে বলে, "রাজা, এ আমার প্রাপ্য। দিদিরানির প্রচ্ছন্ন অনুমতিও রয়েছে। ভেবে দেখো, ওসব সুবিচার-টুবিচারের পাকেচক্রে জড়িয়ে আমার মুখের গ্রাস কেড়ে নেবে কিনা!"

    রাজা মাথা নিচু করেন। মিনমিন করে বলেন, "নিজের ঘরে ফিরে যাও, শ্যালাবাবু। আমি দেখব, কি করতে পারি।"

    "আপনি রক্ষা করবেন না আমায়? আপনার আশ্রিতা হিসেবে বড় বেশি কিছু চেয়ে ফেলেছি কি, রাজা?" কচি পালোয়ান প্রস্থান করলে আর্তকণ্ঠে প্রশ্ন করে দাসী।

    এ যেন সাধারণ দাসীমাত্রের প্রশ্ন নয়। যেন অজস্র নারীর, অজস্র নিপীড়িত মানুষের ন্যায়বিচারের দাবি!

    মাথা নত করে কিছুক্ষণ বসে থাকেন রাজা। তারপর বলেন, "চিরকাল গল্প শুনেছি, যত ক্ষমতাই থাকুক না কেন, প্রকৃত সতীর সতীত্ব হরণ করার সাধ্য কারুর নেই। তুমি যদি সত্যিকারের সতী হও, কেউ কিছু করতে পারবে না। আমার শ্যালকও নয়।"

    মোসাহেবের দল বলল, “সাধু! সাধু! ধন্য সতীত্বের মহিমা!”

    "এই আপনাদের বিচার?” রাগে, অভিমানে কেঁদে ওঠে দাসী। “একটা জানোয়ার নখ দাঁত নিয়ে আমাকে আক্রমণ করলে ওই সতীত্বের তেজ আঁকড়ে ধরে আত্মরক্ষা করতে হবে আমায়? আপনার বিধানে আর কোনো শাস্তি সম্ভব নয়?"

    "আহা, কাঁদছ কেন, দাসী?" রাজার অন্যতম প্রিয় মোসাহেবটি বলে ওঠে। "নারীকে রক্ষা করা রাজার চেয়েও বেশি তাঁর স্বামীর কর্তব্য, তাঁকে জানালে তিনিই নাহয় তোমায় রক্ষা করবেন?"

    “স্বামীর কর্তব্য! ঠিক বলেছ, ভায়া।” রাজা মোসাহেবের যুক্তি শুনে প্রসন্ন বোধ করেন। “সধবাকে রক্ষা করবে তার স্বামী, আমরা মাঝখানে নাক গলাই কেন?”

    "স্বামী? সেই গোত্রের প্রাণীরা যদি সত্যি তাদের দায়িত্ব বুঝত, তাহলে তো জল এতদূর গড়াতেই পারত না।" ক্লান্ত, অবসন্ন পায়ে রাজদরবার ছেড়ে চলে যায় দাসী।

    _______________

    সেজেগুজে নানা সুগন্ধী মেখে অভিসারে চলেছে কচি পালোয়ান। ভবি অবশেষে ভুলেছে, রাতের অন্ধকারে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাকে। অল্প কয়েকটা শর্ত দিয়েছে অবশ্য, এক, সে কচি পালোয়ানের শয়নঘরে আসবে না, তাদের দেখা হবে সদরের লাগোয়া নাটমন্দিরে। হক কথা, মেয়েমানুষ তেজ দেখিয়ে তাকে এত কথা শোনানোর পর সুড়সুড় করে তার মহলে ঢুকতে লজ্জা পাবে, সেটাই স্বাভাবিক। দুই, কোনো অনুচর, সাঙ্গোপাঙ্গ সাথে আনতে পারবে না কচি। এটাও সুপ্রস্তাব, কচির মত পুরুষশার্দুলের পর প্রসাদ পাবে রামদয়াল, এটা সব মেয়ে নাও মানতে পারে! কচি নিজেও চায় এ মেয়ে দীর্ঘদিন তার সেবা করুক, এ জিনিস একবার ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলার নয়। দাসীর শেষ শর্তখানা ভারি মজার-- কচি পালোয়ান যেন ওই চুনীপান্না বসানো মোটা সোনার বাজুবন্ধ দুটো পরে আসে! কচি ঠিক জানত, ন্যায্য মূল্য দিলে সব পাওয়া যায়! আর মেয়েটার বুদ্ধি দেখো, এত সতীপনার নাটকের মধ্যেও ঠিক কচির সবচেয়ে দামী গয়নাটার কথা মনে রেখে দিয়েছে!

    তিনটে শর্তই মেনে নিয়েছে কচি পালোয়ান। বাজুবন্ধ জোড়া নিয়ে একটু মন খুঁতখুঁত করছিল, তা সে যাক গিয়ে, এ রাজকোষের ওপর তার অবাধ অধিকার, আরও ভারী একখানা রত্নখচিত গয়না আবার গড়িয়ে নেওয়া যাবে খন, আপাতত এই রমণীরত্নটির গুমোর ভাঙতে এটুকু মূল্য দেওয়াই যায়!

    আকাশে দিব্যি থালার মত চাঁদ উঠেছে। নাটমন্দিরের জানালা দিয়ে চাঁদ দেখতে দেখতে খেলা ভালো জমবে। নাটমন্দির যাওয়ার পথে চাঁদের আলোয় দুজন চেনা লোককে চোখে পড়ে কচির। এরা রাজকর্মচারী, একজন আস্তাবলে কাজ করে, আরেকজন গরু চরায়। এত রাতে এ চত্বরে কি করছে এরা? মনে প্রশ্ন জাগলেও কচি বিশেষ পাত্তা দেয় না ব্যাপারটাকে।

    নাটমন্দিরের কাছাকাছি অন্য একটি পরিচিত মুখ দেখতে পায় সে। অন্দরমহলের ওই বিকট দেখতে লম্বা চওড়া ঘাগরা পরা মেয়েছেলেটা! আরিব্বাস, সঙ্গে আবার রাজার সেই মোসাহেবটাও আছে, কচি বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছে, এই ব্যাটা নাকি নতুন দাসীকে সেদিন রাজদরবারে অনেক উল্টোপাল্টা স্তোক দিয়েছিল! এত বুলি আওড়ানোর পর এ ব্যাটাও তলে তলে আর এক রাজদাসীর সাথে অভিসারে বেরিয়েছে! হুহ্, কেউ ধোয়া তুলসীপাতা নয়, লোকনিন্দার বেলায় শুধু কচি!

    এখন আর এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই কচির। নাটমন্দিরের ভিতরে তার অপেক্ষায় রয়েছে আগুনের মতো এক নারী; দাসী হয়েও সে রূপে, তেজে রাজরানিদের হার মানায়। এই প্রথম কোনো মেয়েকে বাগে আনার জন্য এত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে কচিকে, আজকে আর এতটুকুও সময় নষ্ট নয়।

    নাটমন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ায় কচি পালোয়ান। চাঁদের মৃদু আলোয় চোখে পড়ে, নৃত্যমঞ্চে তার আলিঙ্গনের অপেক্ষায় শায়িতা এক নারীমূর্তি। কচি ভিতরে প্রবেশ করে।

    ___________

    তালগোল পাকানো অস্থি রক্ত মাংসের বিশাল পিণ্ডটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছজন। করোটি খানা ভেঙে চুর্ণবিচুর্ণ, মুখ চেনার কোনো উপায় নেই। শরীরের কোনো অংশই কি চেনার উপায় রেখেছে আততায়ী? বীভৎস মাংসস্তূপের মধ্যে অদ্ভুতভাবে প্রোথিত রয়েছে রক্তমাখা এক জোড়া রত্নখচিত বাজুবন্ধ। শুধু ওইটুকুর মধ্যেই আটকে রয়েছে বিরাট রাজার শ্যালক ও সেনাপতি মহাবলী কীচকের অবশিষ্ট পরিচয়।

    ঘাম রক্ত মেখে সেই স্তূপের সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রাজবাড়ির পাকশালার প্রধান পাচক, বল্লভ। মৎস্যরাজ এখনো অবগত নন, ছদ্মবেশে ইনি দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম। কীচক হত্যাকাণ্ডের প্রধান হোতা। ভীমের বাহুবন্ধনে এই কাহিনীর কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র - দাসী, মহারানি সুদেষ্ণার সৈরিন্ধ্রী, ছদ্মবেশে পাঞ্চাল দেশের রাজকুমারী পাণ্ডবমহিষী দ্রৌপদী। কীচকের রক্তাক্ত দেহাবশেষ দেখে একটুও শিহরিত হননি তিনি, ভীমসেনকে জড়িয়ে ধরে সগর্বে বলছেন, "আজ সত্যিই বিশ্বাস হলো, তুমি পারবে! দুঃশাসনের অপমানের প্রতিশোধ যদি কেউ নিতে পারে তবে সে তুমি!"

    অদূরেই দাঁড়িয়ে রাজার প্রিয় অমাত্য কঙ্ক, ওরফে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির; পরনে ঘাগরা চোলি, হাতে রংবেরঙের কাঁচের চুড়ি, ঘুঙুর পায়ে রাজকুমারী উত্তরার নৃত্যগীতের শিক্ষক বৃহন্নলা, ওরফে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন; বিরাট রাজার গোশালা ও অশ্বশালার কর্মচারী গ্রন্থিক ও তন্ত্রিপাল, ছদ্মবেশে যাঁরা নকুল আর সহদেব।

    "চলো সবাই যে যার ঘরে ফিরে যাই।" অর্জুন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। "আমাদের ছজনকে একত্রে দেখলে অনেকেই দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলবে।"

    "সে বিপদের সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট বেড়ে গেছে।” মাথা নাড়েন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। “বিরাট রাজার যুক্তি অনুযায়ী সৈরিন্ধ্রীর সতীত্বের শক্তির কাছে হার মেনেছে কচি পালোয়ান, এ সংবাদ আমি রং চড়িয়ে রটিয়ে দেবো সভায়। তবে মহাবলী কীচককে এহেন কর্দমপিণ্ডে পরিণত করতে পারে, এমন লোক আর্যাবর্তে বেশি নেই। কৌরবদের চরেরা ব্যাপারটা ঠিকই আঁচ করে নেবে।"

    “তবে উপায়?” প্রশ্ন করে ভীম।

    "উপায়? এই মুহূর্তে আর উপায় ভেবে লাভ নেই। এবার কদিন শুধু গা ঢাকা দিয়ে থাকা আর শেষ সংগ্রামের অপেক্ষা।"



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments