• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • কাগজ কি নাও : শ্রাবণী দাশগুপ্ত

    (নির্ভার বায়ুভুক্‌)
    লওটা দে মুঝকো বচপন কা সাওন—,

    গীতাঞ্জলির গানের কথাগুলো সুর বয়ে লম্বা জানালার লম্বা শিকের ফাঁক দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। অন্ধকার আকাশের পর্দায় স্তিমিত চাঁদের আলো লেপটে গেছে।

    কত যুগ এবাড়ির দরজা-জানালার কাঠে রঙ লাগেনি। ঘুনপোকা মৃদু কুরকুর শব্দ করে কাঠগুঁড়ো ঝরিয়ে দেয়। ছোপ-ছোপ দেওয়ালের ফাটল বাড়ে। বকুলের বয়সও বেড়ে গেছে, শরীর ভেঙেছে। পানজর্দার নেশাও বেড়েছে। তার ছেলে-ছেলেবৌ সংসারের চালক এখন। খুব সেয়ানা দু-টিতেই, বকুল ওদের বোঝে না। টাকা-পয়সা বকুলের কাছে এখন অতি সামান্যই থাকে। নাতিটা বছর খানেক আগে কাজের সন্ধানে গেছে বোম্বে। সকালে বকুলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মনোহর বাজার এনেছে, সঙ্গে রজনীগন্ধার গোছা। ফুলের নাকি অনেক দাম। আগে এই বাড়ির বাগানে কত গন্ধরাজ, কত রজনীগন্ধা ফোটাতেন মাঠা’ন। এখন সব হাঁটকানো শুকনো ঝোপঝাড়। কালেভদ্রে সাপখোপ গিরগিটি দেখা যায়।

    চারদিন ধরে চোখ আর শুকোচ্ছে না বকুলের, মুছে মুছে লাল। ছোড়দির চতুর্থীর কাজ। সকালেই পুরোনো ট্রাঙ্ক থেকে ফর্সা চাদর বের করে ছোড়দির খাটটায় পেতেছে। অ্যালবাম খুঁজে আইবুড়ো বয়সের সাদাকালো ছবি মনোহরকে দিয়ে এনলার্জ করে বাঁধিয়ে এনেছে। সেটা বালিশে হেলান দিয়ে রেখেছে। বাড়ির সব চেয়ার ঝেড়েমুছে এঘরে জড়ো করেছে। নিজের সরু তক্তপোশটাতেও পরিষ্কার চাদর পেতেছে। কে জানে কে আসবে? কেউ না এলেও জোগাড় রাখতে হয়। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকলেও আজও সে এবাড়ির পরিচারিকা।

    সন্ধের আগে সল্ট লেক থেকে এসে পৌঁছাল সুদীপ্ত, গীতাঞ্জলি আর সুদীপ্তর মা নমিতা। গাড়ি নিয়েই এসেছে। গীতাঞ্জলি বকুলকে জিজ্ঞেস করল,

    “আর কেউ আসেনি?”

    বকুল মাথা নাড়ল। নমিতা বললেন, “আর কে আসবে? আমিও আসতাম না, তুমি জোর করলে বলে—।”

    “ছোটোমাসী আপনারই আপন বোন মা। আমার কী?”

    গীতাঞ্জলি এরকমই, ঠোঁটকাটা। নমিতা বেশ ভয় পান ছেলের বৌকে, বিশেষ করে আত্মীয়দের সামনে। ফোটোর সামনে থালায় ধূপ জ্বালাল সে, নিজের আনা সব ফুল ঢেলে দিল কাঁসার রেকাবিতে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল প্রকাণ্ড ঘর, চৌখুপ্পি মোজেকের মেঝে। একতিরিশ বছর আগে নতুন বৌ প্রথম এসেছিল এই বাড়িতে— সুদীপ্তর মা-র বাপের বাড়ি। তারপর সম্ভবত এসেছে আর একবার, কবে ভুলে গেছে। গীতাঞ্জলি কলকাতার মেয়ে নয়। বিয়ের আগে পর্যন্ত লক্ষ্ণৌ, বিয়ের পর এরাজ্য, ওরাজ্য ঘোরা যাযাবর। বছর পাঁচেক হল থিতু হয়েছে পুনেতে।

    ফুলের গন্ধে ভুরভুর করছে ঘর। গীতাঞ্জলি বিছানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফোটো দেখতে লাগল। পেছনে শাশুড়ি। নমিতা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললেন, “সবার ছোটো ছিল, কত আদরের আমাদের—। চলে গেল।”

    “ভালোই তো হয়েছে—, একা একা পড়ে থাকত এখানে বকুলের ভরসায়।”

    গীতাঞ্জলি বলে উঠল। সে শান্তার ফোটো থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। নমিতা ঘামছিলেন, মেয়েটার জবাব বারবার তাঁর মুখ বন্ধ করে দেয়। গীতাঞ্জলি আপনমনে বলল, “কী নিখুঁত! অপূর্ব। কখনো দেখিনি এরকম কাউকে।”

    প্রতিবেশীদের অনেকে এসে ঘরে বসেছে। খানিক আগে সুদীপ্তর ছোটো মামা-মামী এলেন, মেজোমামার ছেলের সঙ্গে। নমিতা বুকে দম ভরে বললেন, “সে আমরা ভাইবোনেরা সবাই সুন্দর ছিলাম, শানুরই রঙ একটু চাপা। ঢ্যাঙাও বেশি।”

    গীতাঞ্জলি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। মুখের গোড়ায় এসে-যাওয়া জবাব সামলে নীচে সতরঞ্চিতে বসল। পুরোনো দিনের সতরঞ্চি, প্রায় কার্পেটের মতো মোটা। গীতাঞ্জলি ন্যাতানো, ছাইরঙা হ্যাণ্ডলুম শাড়ি পরেছে। কাঁচাপাকা চুলে যেমন-তেমন ক্লাচার, গভীর চোখ চশমার আড়ালে। চুরাশি বছরের নমিতা যথেষ্ট ফিটফাট। বকুল হাঁইহাঁই করে উঠল, “ওবউমা ওখেনে বইলে কেন?”

    “বাড়িতে হারমোনিয়ম আছে বকুলমাসি?”

    “ছেল, মাঠা’ন গাইতেন ঠাকুরের গান। একন সি হারমিনি চলবে বলে মনে হয়নে। তা মনুরে বলি বের কইরে ঝেড়ে দিক?”

    মাথা নেড়ে বারণ করল গীতাঞ্জলি। সে গজল গায়। রেওয়াজি স্বর, একটু ভাঙা, একটু খসখসে। সহায়ক যন্ত্র না হলেও অসুবিধা হয় না। ধরা-গলা পরিষ্কার করে বলল, “ছোটোমাসী আমার কাছে রোজ গান শুনতে চাইতেন। এখনও তাঁর জন্যই গাইব।”

    ‘রঞ্জিশ হি সহি দিল দুখানে কে লিয়ে আ’।

    যন্ত্রণা যতই হোক তবু তুমি এসো আমার মন ভেঙে দিতে…।

    প্রাণ নিঙড়ে গাইছিল গীতাঞ্জলি – একটা, দুটো, তিনটে। কথা না বুঝেও ঘষা গলার নির্ভুল সুর, দরদি মিড় শ্রোতাদের বুক মুচড়ে দিচ্ছিল। সতেরো বছরের অপরূপ তরুণী বুঝি অপার্থিব অস্তিত্ব নিয়ে হাজির ছিল। অনেক রাত্তিরে ফেরার গাড়িতে তিনটি প্রাণী, মাঝে-মাঝে নমিতার নাক টানার শব্দ। গীতাঞ্জলি গুনগুন করছিল, “আজ জানে কা জিদ না করো।”


    (কবেকার মেঠো কথা)
    সুদীপ্তর মামাবাড়িতে ছোটোমাসী শান্তা ছাড়া আর কেউ থাকে না। সুদীপ্তর দাদামশাই ডাক্তার সত্যজীবন মস্ত বাড়িটা করেছিলেন, স্টেশন থেকে রিক্সায় কিলোমিটার তিনেক ভেতরে। আগে হাঁটতে হত, এখন অবশ্য অটো, টোটো সবই মজুত। মিনিট দশেকে হুশ্‌ করে পৌঁছে যাওয়া যায়। জায়গাটা সেকালে প্রায় অজ-গাঁ ছিল। সন্ধে হলে শেয়াল ডাকত, কতরকমের পাখপাখালি। তিনি জমি কিনেছিলেন জলের দরে। খুব পসার ছিল। গ্রামের মানুষ চিকিৎসা পেয়ে ধন্য-ধন্য করত। পরে সুদীপ্তর বড়মামা ডাক্তার হলেন, কলকাতায় প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। সপ্তাহে একদিন এখানে রোগী দেখতে আসতেন। ক্রমে ব্যস্ততা বাড়ল, কলকাতায় বাড়ি করলেন, আসা-যাওয়া কমল। সত্যজীবনের অন্য তিন পুত্রও পাড়াগাঁ ছেড়ে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়লেন। তিন কন্যা সবিতা, নমিতা, ও শান্তাকে তিনি যোগ্য পাত্রে সম্প্রদান করলেন। সবচেয়ে রঈসি বনেদি পরিবারে বিয়ে হল শান্তার। সে বয়সে তিনি আশ্চর্য রূপসী ছিলেন। রাশভারি শ্বশুরমশাই দেখতে এসে এমন মুগ্ধ হলেন, নাম ছাড়া কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। এমনকী পরিবারের আর যাঁরা এসেছিলেন তাঁদেরও অনুমতি দিলেন না। মাসখানেক পর ক্লাস নাইন না-উতরানো ঊনিশ বছরের শান্তা ধুমধামে বর্ধমানে শ্বশুরবাড়ি গেলেন। বিয়ের পর নিয়মরক্ষা করতে মাত্র একবার স্বামী-সহ বাপের বাড়িতে এসেছিলেন। চার মাস পর দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো ছোটো দেওর পাকাপাকি তাঁকে পৌঁছে দিয়ে জানিয়ে গেল, দাদা শিগগীরই ম্যানেজমেন্ট পড়তে লণ্ডন চলে যাচ্ছে। তার আগে দাদার তরফ থেকে ডিভোর্স-পেপার পাঠানো হবে। সেখানে শান্তাকে দিয়ে যেন সই করিয়ে রাখা হয়। ক্ষতিপূরণের টাকা ব্যাঙ্কে থাকবে, সেই সুদে শান্তার জীবন চলবে। বিশেষ কিছু না বুঝে শান্তা কাগজে সই করলেন এবং বারকয়েক ‘শ্বশুরবাড়ি যাবো না?’ জিজ্ঞেস করে সদুত্তর না পেয়ে নীরব হয়ে গেলেন। সত্যজীবন জানতেন শান্তার মানসিক বয়স বারো-তেরোর বেশি নয়। আশা করেছিলেন, সন্তান জন্মালে সহজাত প্রবণতায় বুদ্ধি কিছুটা বিকশিত হবে। অন্তত সাধারণ সাংসারিক জীবন কাটাতে অসুবিধা হবে না।

    শান্তার বয়স বাড়তে লাগল, রূপ উপচে পড়ল, বুদ্ধি থমকে রইল। মৃত্যুর আগে সত্যজীবন তাঁর বাড়ি শান্তার নামে উইল করে দিলেন। প্রতিষ্ঠিত দাদা-দিদিরা অল্পবিস্তর অসন্তুষ্ট হলেও মেনে নিলেন। শান্তার দেখাশোনার জন্য বকুল সপরিবারে আগের মতো বহাল রইল।

    সত্যজীবন-সুরবালা যতদিন বেঁচে ছিলেন শান্তার দাদা-দিদিরা সন্তানদের দাদুর বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে আসতেন। শান্তা ভারি খুশি হয়ে তাদের সঙ্গে খেলাধুলো করতেন। বায়না সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। বাবা-মা’র মৃত্যুর পর বাড়ির টান কমল, তাঁদের আসা-যাওয়াও। শান্তা প্রায়ই সবাইকে ফোন করতেন, “ও মেজদি অনেকদিন আসোনি। কবে আসবে?”

    “বড়দা, বড়োবউদি আমাকে শাড়ি দেবে বলেছিল যে পুজোতে? পুজোর মোটে একমাস বাকি।”

    দাদা-দিদিরা একটুক্ষণ ঘ্যানঘান শুনতেন। বুঝিয়ে বলতেন, “এরকম করে না শানু। জানো না কত কাজ থাকে?”

    তারপর হয়ত বছরে একবার কী দু-বার প্ল্যান করে, হিসেব কষে, দল বেঁধে শান্তার বাড়িতে দু-দিন কাটিয়ে যেতেন। বাগানে বসে ছোটোবেলার গল্প করতেন। ছেলেমেয়ে, চাকরি, রাজনীতি, দুর্নীতি, জমি-বাড়ি, মূল্যবৃদ্ধি, খেলা, এবাড়ির ভ্যালুয়েশন নিয়ে আলোচনার ঝড় বইত। শান্তা দিদিদের গা ঘেঁষে বা বৌদিদের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে বেড়ালছানা কোলে চোখ বুজে শান্ত হয়ে বসে থাকতেন। বুকের খাঁচায় কবোষ্ণ তরল চলাচল করত। রাতেও ভালো ঘুম হত। সকলে ফিরে গেলে অতবড়ো বাড়িতে আবার গা-ছমছম করত। গরমকালেও শীত লাগত। প্রায় সমবয়সী বকুলকে পাশের সরু চৌকি থেকে নিজের বিছানায় টেনে নিতেন। দু-হাতে আঁকড়ে ধরে বলতেন,

    “আমাকে ফেলে যাবি না কিন্তু।”

    বকুল কোনকালে বিধবা। সে ও তার ছোট্ট ছেলের জন্য বাগানের দিকে একটা ঘর দিয়েছিলেন সত্যজীবন। ওখানে এখন ছেলে-বৌ আর ছোট্ট নাতি থাকে। বকুলের দাপট আছে, তবু তলে-তলে বুক ঢিপঢিপ করে! সে মরে গেলে তার ছেলে-বৌ ছোড়দিকে কোণের ঘরে ঠেলে পুরো বাড়ি বুঝি দখল করে নেয়! বকুল আশ্বাসের সুরে বলত, “আমার কি যাবার কুনো জাগা আছে গ ছোড়দি?”

    “আমারও নেই।”

    “সোয়ামীও নাই।”

    “আমারও নেই। একইরকম, বল? আমার গয়নাগুলো তুই পরবি?”

    “কী যে কও!”

    “সেগুলো কোথায় রে? তুই জানিস?”

    “না গো। বড়দিরে জিগাও।”

    “আমিও জানি না।”

    বাচ্চা মেয়ের মতো হাসতেন শান্তা। বকুলের গলা বুজে যেত। শান্তা তার ভারী বুকের ঘামে, কাপড়ের তেল-হলুদের গন্ধে নাক ডুবিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। কোলের কাছে পুঁটুলি হয়ে ঘুমোত ছোট্ট বেড়ালছানা মিনি। এমনি করেই শান্তা একদিন মধ্যপঞ্চাশে এসে পৌঁছালেন। ঋতুস্রাব বন্ধ হয়েছে আগেই। শরীরে আশ্রয় করছে আধি-ব্যাধি। বকুল বলে, “বড়বৌদিরে ফোনে কও না ছোড়দি। বড়দা নাই ত কী হল? তেঁয়ার ছেলে-বৌমাও ত ডাকতার।”

    শান্তা কতক্ষণ চুপ করে কী ভাবেন। তারপর উদাস গলায় বলেন, “ওরা আমায় ভালোবাসে না। শুধু তুই ভালোবাসিস।”

    অতঃপর বড়বউদিকে নিজেই ফোন করে বকুল, “ছোড়দি য্যান বড়ই ভুগতিছে বড়বৌদি’, ঝদি ওনারে কলকাতায় নিয়া ডাক্তার দেখাতেন!”

    বড়বৌদি অন্যমনস্ক গলায় বলেন, “আমার হাতে ক্ষমতা নেইরে বকুল, শরীরও ভালো থাকে না। তোদের বড়দার সঙ্গে সব গেছে। তাও বুকাইকে বলে দেখব। সময়ই পায় না ওরা, খুব ব্যস্ত। তোদের ওখানে ডাক্তারখানা আছে তো? নিয়ে দেখিয়ে আন না।”

    কোথাও যাওয়ার নেই শান্তার। বাড়ির চারটে মস্ত কামরা, বৈঠকখানায় পুরোনো বইয়ের আলমারি, ফাটলে চারা-গজানো ছাদ, অযত্নের বাগানের গাছে কাকের বাসা, সেখানে কোন এককালে আমগাছে ঝোলানো তক্তাবাঁধা দোলনা – তাঁর ঘর ও বাহির। ব্যাংকের টাকার সুদে খাওয়াদাওয়া, বকুলের মাইনে। হিসেব রাখেন স্থানীয় ইশকুলের ষাট পেরোনো প্রাক্তন মাস্টারমশাই যাঁর বাবা সত্যজীবনের চিকিৎসায় সেরে উঠেছিলেন। সেই থেকে আকণ্ঠ কৃতজ্ঞতা।


    (জ্যোছনা করেছে আড়ি)
    শান্তার দাদা-দিদিরা ছেলেমেয়েদের বিয়ে-টিয়ে হলে ক-দিনের জন্য নিয়ে যেতেন। রেখে আসতে আবার কাউকে যেতে হত। তাঁদেরও বয়স বাড়ছিল, কেউ-কেউ ঠাঁই নিলেন তারাদের সংসারে। পরের দিকে বাহনসমেত বাহকের কাজটা করত বকুলের ছেলে মনোহর। ভাড়ার গাড়ি চালিয়ে রোজগার মন্দ হয় না। মালিকের গাড়িতে শান্তা আর বকুলকে পৌঁছে দিয়ে আসত, ফোন করে দিলে ফেরত আনতে যেত। বছর দেড়েক আগে সুদীপ্তর দিদির নাতির অন্নপ্রাশনে গিয়েছিলেন শান্তা। সুদীপ্ত প্রথমে চিনতে পারেনি, প্রাচীন ভাঙা মন্দিরের গায়ে হতশ্রী যক্ষিণীর মতো চেহারা। কাছে বসে বলেছিল, “ভালো আছো ছোটমাসি?”

    শিখরদশনার মাড়িতে এখন কালো গর্ত, মাথা নেড়ে হাসলেন। শুকনো ডালপালার মতো আঙুল, নখের ভেতর ময়লা। গীতাঞ্জলির কবজি চেপে ধরে বললেন, “এটা কি তোর বউ দীপু? কেমন জানি – মোটা, কালো! আমাকে আগে দেখাসনি কেন? একটা নমস্কারিও দিসনি!”

    গীতাঞ্জলি হেসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলল, “চলুন আমাদের সঙ্গে। নমস্কারিও দেব।”

    সুদীপ্ত হতভম্ব! বাড়ির সকলের সমস্ত আপত্তি মেয়েটা একফুঁয়ে উড়িয়ে দিল। তর্ক সে করে না, কেবল দু-চারটে গোটা গোটা শব্দ উচ্চারণ করল। উড়ানের টিকিট ম্যানেজ হল অনেক গচ্চা দিয়ে, আকাশপথে জীবনের মতো উড়ে চললেন শান্তা। বকুল শুধু যাওয়ার আগে একচোখে জল, একচোখে হাসি নিয়ে চুপিচুপি গীতাঞ্জলির হাত ধরল, “অনেক অনেক পুণ্যি হবে বউমা তোমার।”

    তাদের প্রশস্ত লিভিংরুমে গুটিকয় ছাত্রছাত্রী সপ্তাহে একদিন গান শেখে। সে ঘরের লাগোয়া সুরম্য অতিথিঘরে শান্তার থাকার ব্যবস্থা করল। পরদিন সকালে গুটিসুটি গীতাঞ্জলির জামাটা মুঠোয় ধরে শান্তা বললেন, “আমি একা-একা ঘুমাতে পারিনি রে। ভয় লাগে।”

    গীতাঞ্জলি সস্নেহ হাসল। শান্তাকে হাত ধরে নিয়ে এল তাদের পাশের ঘরে, ছেলের ঘর। ছেলে আপাতত ছ-মাসের জন্য দেশের বাইরে। এঘরে বসে সে রেওয়াজ করে। শান্তাকে বলল, “এটা আপনার নাতির ঘর। এখানে থাকতে ভয় হবে না। আমি গাই, আপনি শুয়ে পড়ুন।”

    তানপুরা সঙ্গতে গজলে ডুবে যায় গীতাঞ্জলি। রাতের খেয়াল থাকে না, কোথাও প্রোগ্রাম থাকলে হয়ত সারারাতও চলে। সে রাতে গানের দেবী ঘুমের আরক ঢেলে দিল শান্তার স্নায়ুতে। তিনি নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। পরের দিন, তারও পরের দিন ঘটনাটা দেখল সুদীপ্ত। বউকে জিজ্ঞেস করল,“তোমার প্ল্যানটা কী?”

    গীতাঞ্জলি ঠোঁট ওলটাল, “কিছুই না।”

    দুপুরে খেতে বসে শান্তাকে বলল, “মাসি, একটু পরে একজন আপনার কাছে আসবে।”

    “কে রে?”

    “দেখবেন আপনাকে আদরযত্ন করবে। গা, নখ, চুল সব পরিষ্কার করবে। কত সুন্দর দেখাবে আপনাকে।”

    “সত্যি?” তিয়াত্তরেই নব্বইয়ের ছায়া পড়া মুখ সহসা অরুণ তরুণী হয়ে উঠল।

    সন্ধে সাতটার পর কাজ শেষ করে বিদায় নিল বিউটিশিয়ান। শান্তা তখন গভীর ঘুমে, নাক ডাকছে অল্প। রাতে যখন খেতে এলেন না, সুদীপ্ত চিন্তিতভাবে বলল, “তুমি কী করছ বলো তো? বুঝতে পারছি না!”

    গীতাঞ্জলির গলায় গানের গুঞ্জন, জবাব দিল না।

    শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেল শান্তার, শীত-শীত করছে কেমন। এই ঘরটায় প্রচুর হাওয়া, সাদা নেটের পর্দা উড়ছে রূপকথার পরীর মতো। শান্তা উঠে বাথরুমে গেলেন। ঘরে এসে খিদে বোধ হচ্ছিল। সাইড টেবিলে রাখা বিস্কিটের কৌটো, মোটে দু-খানা পড়েছিল। খেয়ে, ভেজানো দরজা খুলে লিভিংরুমে এসে দাঁড়ালেন। কাচের স্লাইডিং দরজার বাইরে নিস্তব্ধ, শান্ত, অন্ধকার আকাশ, নীচে ঘুমন্ত নগরী। তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকতে থাকতে ফুরফুরে ভাব এল। পা চুলকাতে নীচু হলেন। ঘরে পরার সাদা হাওয়াই চটির মধ্যে পা, তাঁর নিজের পা। শান্তা বিস্ফারিত চোখে পায়ের ফর্সা আঙুল দেখলেন, পরনের নাইটি তুলে নিলেন হাঁটু পর্যন্ত। শক্ত, নোংরা, কালো, বন্য পশুর বাঁকানো নখের জায়গায় সমান করে কাটা নখে লাল নেইলপালিশ ঝলসাচ্ছে। বকুল মাঝে-মাঝে নখের বিকৃতি ঢাকতে লাল নেইলপলিশ এনে পরিয়ে দিত। বলত, “কী আকখুটে কড়া নখ ছোড়দি – কুকুর-বিড়ালের মতন, মোটে কাটা যায়নে কো!”

    শান্তা পা তুলে ফুটিফাটা চেনা গোড়ালি পেলেন না। সেদুটোও হালকা গোলাপী। তপ্ত গ্রীষ্মের ক্ষেতের মতো কালচে পায়ের গোছ মোমের মতো মসৃণ। নিজের দু-হাত চোখের সামনে নিলেন। নোংরা, নখকুনি, কালচে ছোপ কোন ম্যাজিকে উধাও! ভোঁতা নখগুলো হালকা গোলাপী রঙ মেখে হাসছে। শান্তা তিল তিল করে অনুভব করতে লাগলেন গতকালের আরামের প্রক্রিয়া ত্বকের রন্ধ্র ভেদ করে গভীরে পৌঁছেছে। তাঁকে উপুড় করে শুয়ে জং-ধরা পিঠ ও কোমর অভ্যস্তহাতে সযত্নে ডলা হয়েছে, মাজা হয়েছে। স্নায়ুতে উষ্ণ সাবানজলের পিছল ফেনা, খরখরে কুটকুটে স্ক্রাবারের ঘর্ষণ, ভেষজ তেল ও ক্রিমের মৃদু, মোলায়েম গন্ধ। পিঁপড়ের চলনের শিরশিরে অনুভূতি সত্তরোর্ধ আদরহীন, শুকনো শরীরের অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে দিল। ঠিক কী কারণে নিজেও জানেন না বুক পেঁচিয়ে হু-হু করে কান্না এল। কীসের কল্পনা করতে করতে ছোটো মেয়ের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

    দরকার না থাকলে এরকম কাকভোরে গীতাঞ্জলি কদাচিৎ ওঠে। আসন্ন প্রোগ্রাম থাকলে অবশ্য ওঠে, রেওয়াজে বসে। সেদিন রাত শেষ না হতেই ঘুম ভেঙে মনে হল, কী এক উশখুশে চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুম ভালো হয়নি। টেলিপ্যাথি হোক কিম্বা কাকতালীয়ই হয়ত, গীতাঞ্জলি যেন জানত শান্তাকে দেখতে পাবে ওখানে। কাছে এসে একেবারে স্বাভাবিক গলায় বলল, “কাঁদছেন কেন? খিদে পেয়েছে? কফি করে আনছি, বসুন।”

    শান্তা জল-ভর্তি চোখ তুলে হেসে বললেন, “কাল একটা স্বপ্ন দেখেছি। আমার হাত-পাগুনো কেমন জানি বদলে গেছে!”

    “ওহ তাই? একটা আয়না আনি, দেখুন তো—।”

    নুনমরিচ চুলের দড়ি-পাকানো খোঁপা উধাও হয়ে কাঁধ পর্যন্ত ঝুলছে আধুনিক ছাঁটের কেশস্তবক। মুখের বলিরেখা তেমনটাই, কিন্তু চেপে-বসা ময়লা সরে গিয়ে আসল রঙ ফুটেছে। গীতাঞ্জলি মুগ্ধচোখে দেখছে, জুতসই গানের কলি মাথায় আসছে, মুখে আসছে না। মিনিট দুই পর অতি অবিশ্বাসে শান্তা বললেন, “ও দীপুর বউ, এটা কোন মাগী রে? আমি কই? তোর আয়নাটা কি তুকতাক করে?”

    “মাসি, ওটাই আসল আপনি!”

    মাসখানেক পর গীতাঞ্জলি গিয়ে রেখে এসেছিল শান্তাকে, ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়েছিলেন। বকুলকে না দেখে কষ্ট পাচ্ছিলেন।

    ফিরে গেলেন শান্তা বা ফিরে এলেন সখীর কাছে, সেই সখী যার শুধু বুকের উত্তাপটুকু সম্বল। ভালোই ছিলেন প্রথমদিকটা কিন্তু মাসকয়েকের মধ্যে চেহারা দ্রুত ভাঙতে আরম্ভ করল। খিদে নেই, জ্বর, বমি, পেটের অসুখ। স্থানীয় ডাক্তার দেখে বলল, “ভালো মনে হচ্ছে না। কলকাতায় নিয়ে গিয়ে স্পেশালিষ্ট দেখিয়ে একটা বায়োপ্সি করানোর ব্যবস্থা করো।”

    বকুল শান্তাকে একা ছাড়তে ভরসা পায় না। মনোহর দু-জনকে নিয়ে গেল কলকাতায়, ছোটদাদা-বৌদির কাছে। বায়োপ্সি হল। রোগ ভালোমতো জাল পেতেছে সারা শরীরে। ওঁরা রাখতে চাইলেন ওঁদের কাছে, বকুলও রইল। আচ্ছন্নের মতো কাটত দিন। জ্ঞান থাকলে হাসিমুখে ইশারায় বকুলকে ডাকতেন, “একটা স্বপ্ন দেখেছি বুঝলি? আমার হাত-পাগুনো সব বদলে দিয়েছে দীপুর বউ। ও দীপুর বউ, এটা কোন মাগী রে? আমি কই? তোর আয়নাটা কি তুকতাক করে? একটা গান গা’বি?”

    কে জানে কী গান শুনতে পেতেন? হয়ত পাখির ডাক অথবা আকাশের অন্তরের হাতছানি।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments