




কাশ্মীরের রাজা অবন্তিবর্মা ভীষণ চিন্তায় পড়েছেন। তাঁর রাজ্যে দুর্ভিক্ষের অবস্থা হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই নদীপারের উর্বর কৃষিজমিতে জল ঢুকে যাচ্ছে, ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মরসুমের পর মরসুম ধরে। প্রজারা রাজার খাজনা দেবে কী, নিজেরাই খেতে পাচ্ছে না। ফলে সারা রাজ্যে হাহাকার নেমে আসছে। শুধু কৃষকের ঘরে নয়, কারিগর, শিল্পী, বণিক, রাজকর্মচারী, মন্দিরের পুরোহিত, সবার ঘরে অভাব। এই বিপদ রাজা কী করে সামলাবেন, অনেক শলাপরামর্শের পরও তার হদিশ কেউ দিতে পারছে না।
কয়েকবছর আগে এই রাজ্যে একবার বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পে বিতস্তা নদীর উপর পাহাড়ি ধস নামে। বিতস্তা নদীর নাম শুনেছ? এই নদীটিকে আমরা আজকাল ঝিলম বলি। ধস পড়াতে নদীর স্রোত জায়গায় জায়গায় অনেকটা বন্ধ হয়ে গেল। জলের স্রোত আটকা পড়ল। এরপর বর্ষা শুরু হতেই জল নদী দিয়ে বয়ে যাবার বদলে উপচে তীরের গ্রামগুলোকে ডুবিয়ে দিচ্ছে, ধানের উর্বর জমিগুলো নদীর পাড়েই, সেসব জমি ডুবে ধানগাছ পচে যাচ্ছে। পরপর কয়েক মরসুম ফসল তুলতে না পারায় মানুষের দুর্দশার সীমা নেই। বাজারে যা শস্য আছে তার অনেক দাম। গরিব মানুষ কিনতে পারে না, তাদের কাছে টাকা নেই। পাহাড়ি রাজ্য, এখানে বাইরে থেকে আমদানি করে এত লোকের পেট ভরানো অসম্ভব। অবন্তিবর্মা অবস্থা পাল্টাতে চাইছিলেন, কিন্তু তাঁর মন্ত্রীরা কেউ বুঝতে পারছিলেন না কী করলে এই দুরবস্থা থেকে রাজ্যের নিস্তার হবে।
রাজার চিন্তার কথা সবাই শুনেছিল, শ্রীনগরের পাড়ার মোড়ে, রাস্তায় ঘাটে লোকে বলাবলি করছিল, ঈশ্বর ছাড়া আমাদের আর উপায় নেই। রাজা কত চিন্তা করছেন, তবু বন্যা ঠেকানোর উপায় পাচ্ছেন না। তখন সেই জটলা থেকে একজন অতি সাধারণ যুবক বলল, আমি জানি কী করলে এই বন্যা ঠেকানো যাবে। সবাই তার দিকে তাকাল। ঢ্যাঙা রোগা, কমবয়সি, এখনো দাড়িগোঁফ ঘন হয়নি, ছেলেই বলা চলে, পরনে আধময়লা ধুতি, গায়ে একটা রংচটা রোঁয়াওঠা পুরোনো কম্বলের আংরাখা। হ্যাঁ, কী যে বলে সুয্যপণ্ডিত! ছোট ছোট ছেলেদের পড়াও, ঠিক আছে। কিন্তু রাজা জানে না, মন্ত্রী জানে না, সান্ত্রী জানে না, বাচ্চাদের ইশকুলের মাস্টার বলছে বন্যা ঠেকাবে। এত চিন্তার মধ্যেও সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
সুয্য বেশ জোর দিয়েই বলল, হাসির কথা নয়, আমি সত্যি উপায় জানি। কিন্তু আমার কাছে টাকা নেই।
সেখানে রাজার চরও ছিল। তার কাজ ছিল প্রজাদের সুখদুঃখের কথা শুনে রাজার কাছে রিপোর্ট করা। তখনকার দিনে তো আর ফোন ছিল না, খবরের কাগজ, রেডিও টিভি কিচ্ছু না, তাই রাজারা রাজ্যের অবস্থা জানতে চরদের নিয়োগ করতেন, চরদের রিপোর্ট শুনে সেই অনুসারে ব্যবস্থা করতেন। চর রাজার কাছে গিয়ে বলল মহারাজ, আজ একজন বলেছে সে নাকি বন্যা দূর করার উপায় জানে।
রাজার দিনরাত একই চিন্তা, তাই কথাটা শুনেই বললেন, তাহলে ডাক লোকটাকে।
ডাক পেয়ে সুয্য সঙ্গে সঙ্গে রাজসভায় চলে এল ।
রাজা বললেন, তুমি নাকি বন্যা রোধ করার উপায় জান?
সে বলল, মহারাজ, আমি উপায় জানি, করতেও পারব। কিন্তু আমার কাছে টাকা নেই।
রাজা বললেন, তুমি তোমার প্রয়োজনীয় টাকা পেয়ে যাবে। কিন্তু কী করে কাজটা করবে বল?
সে বলল, প্রভু, ক্ষমা করবেন। বন্যা রোধ করার জন্য কী কী উপায় করতে হবে, সেটা এখন বলব না। জায়গায় জায়গায় আলাদা আলাদা রকমে কাজ করতে হবে। সব করে উঠতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে, তবে কাজ করার পর দেখবেন।
রাজা বললেন, তাহলে তোমার ইচ্ছেমত টাকা নিয়ে যাও।
রাজার কথায় মন্ত্রী অমাত্য সকলে না না করে উঠলেন। মহারাজ, লোকটাকে দেখে মনে হয় না যে সে বন্যা রোধ করার উপায় জানে। কী করে এতবড় কাজটা করবে বলছেও না। এ তো মাত্র একটা ছোকরা মাস্টার, শহরের এক প্রান্তের মঠে থাকে। একে বিশ্বাস করে রাজকোষের টাকা দেওয়া উচিত হবে না।
রাজা বললেন, আমরা তো অনেক ভাবলাম, কিন্তু রাস্তা খুঁজে পাইনি। এবার একে বিশ্বাস করে দেখা যাক।
রাজা তাকে রাজকোষ খুলে দিলেন। সুয্য বেশ কটা দীনারের হাঁড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। পুরোনো দিনে কাশ্মীরের মুদ্রাকে দীনার বলত। রাজা তার পেছনে গোপনে চর পাঠালেন, সে কী করে তার খবর রাখতে।
সুয্য বন্যা বন্ধ করতে যাচ্ছে জেনে তার মা সূয্যা ছুটে এল। বাবা সুয্য, তুই কোথা যাচ্ছিস? তুই কী করে এই অসম্ভব কাজ করবি? কেউ পারে না বন্যা রুখতে, বৃষ্টি বন্যা ভগবানের ইচ্ছেতে হয়। তুই যাস নে বাবা, আমার বড্ড ভয় করে।
সূয্য বলল, মা, চিন্তা কোরো না। দেখো, আমি ঠিক পেরে যাব। রাজা আমাকে বিশ্বাস করেছেন। আমি কাজ সেরে ঠিক তোমার কাছে ফিরে আসব।
সুয্যের মায়ের এককালে কাজ ছিল শ্রীনগরের রাস্তা ঝাঁট দেওয়া। ঝাঁট দিতে দিতে একদিন একটি শিশুকে কুড়িয়ে পেয়েছিল, শিশুটিকে একটা হাঁড়ির ভেতরে করে রাস্তার ধারে কেউ ছেড়ে গিয়েছে। বাচ্চাটাকে দেখে তার তক্ষুনি কোলে নিতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু তার শরীর তো পরিচ্ছন্ন নয়, সারাটা সকাল ধরে নোংরা ঝেঁটিয়ে গিয়ে চান করে তবে পরিচ্ছন্ন হবে। তাই সে হাঁড়িসুদ্ধ বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে তার বান্ধবীর কাছে নিজের অনুপস্থিতিতে রাখতে দিল। রোজ সকালে নিজের কাজ সেরে পরিচ্ছন্ন হয়ে দুপুরের দিকে সে বান্ধবীর বাড়িতে বাচ্চাটির কাছে যেত, তাকে খাওয়াত, ঘুম পাড়াত। সে পালিত ছেলেটির নাম দিল সুয্য, তার নিজের নামে।
সুয্য মায়ের যত্নে বড় হতে লাগল, সে একটি মঠে কিছু প্রাথমিক লেখাপড়াও শিখল, তারপর নিজেই সেখানে কয়েকজন ছোট ছেলেকে পড়াত। তবে তার সবচাইতে ভাল লাগত নদী ও পাহাড় দেখতে। নদী পাহাড় থেকে এঁকেবেঁকে নামে, এ বাঁকে হারিয়ে আবার ও বাঁকে ফিরে আসে, পাহাড়ের সঙ্গে যেন লুকোচুরি খেলে। তার ধারে ধারে কত জনপদ গড়ে ওঠে, শস্যখেতে জল সেচ দিয়ে কত ফসল ফলে, সেই ফসলে মানুষের খিদে দূর হয়। আবার এই নদীতে যখন বন্যা আসে, তখন সব বাড়িঘর গ্রামের পর গ্রাম, খেতের পর খেত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যখন পাহাড় ভেঙ্গে নদীর উপর ধস পড়ে, তখন জলস্রোত রুদ্ধ হয়ে যায়, নদী হয়ে ওঠে জনপদের দুঃখ। এই দুঃখ কি দূর করা যায় না? পথ কি নেই?
আছে, তার মনে হল, আছে। তবে এই কাজে অনেকের সহযোগিতা লাগবে, বিশেষ করে, যারা বন্যাপীড়িত, তাদের, কিছু অভিজ্ঞ কর্মকারের এবং দেশের রাজার। নদী যেমন একক মানুষকে ফসল দেয় না, পুরো জনপদকেই দেয়, আবার বন্যা হলে সকলকেই ভাসায়, সেভাবে বন্যা রুখতেও সবার একসঙ্গে কাজ করা চাই। বিশেষ পরিকল্পনা করে সেই কাজে অগ্রসর হতে হবে, সুয্য ভাবে। কিন্তু, এই বন্যায় বিধ্বস্ত ক্ষুধার্ত মানুষগুলোকে দিয়ে কাজ কীভাবে করানো যায়? অথচ মূল কাজ তো তাদেরই করতে হবে!
হিতৈষী রাজা যখন তাকে তার ইচ্ছেমতো অর্থ সাহায্য করলেন, সে প্রথমে একখানা শক্তপোক্ত নৌকো যোগাড় করল। রাজার দীনারের ভাণ্ডগুলো নৌকোয় তুলে সে নৌকো ছাড়ল মড়ব রাজ্যের নন্দক গ্রামের দিকে। এই গ্রাম এককালে বর্ধিষ্ণু ছিল, ভাল চাষবাস হত, এখন সেখানকার লোকে উপবাসে দিন কাটাচ্ছে। সেখানে সে একটা দীনারভাণ্ড নদীর পাড়ের দিকে বন্যার জলে ফেলে দিয়ে চলে এল। গ্রামের লোকজন দেখে ভাবল, লোকটা পাগল নাকি? রাজার নিজস্ব ছাপওলা দীনারের ভাণ্ড জলে ফেলেছে! যাক, পাগলটা ভাল কাজ করেছে। এগুলো ওঠাতে পারলে খাবার কেনার জন্য কিছু টাকা পাওয়া যাবে।
সুয্য তারপর নৌকো ফেরাল উত্তরে, ক্রমরাজ্যের দিকে। সেখানেও ধস পড়ে প্রচুর বালিপাথর স্রোত বন্ধ করেছে, সেদিকেও জলের মধ্যে একটা দীনারের ভাণ্ড ফেলে দিল। তার অনুমান ঠিক ছিল। দু’দিকের দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকেরা যারা দীনার খুঁজবার জন্য এসেছিল তারা নদীগর্ভ থেকে ধসেপড়া পাথর নুড়ি ইত্যাদি তুলে জলের আটকে যাওয়া স্রোত ছেড়ে দিল। দীনার পাবার আশায় তারা প্রাণপণে কাজ করছিল। সেইসব পাথর নদীগর্ভে আড়াআড়ি সাজিয়ে সুয্য পাথরের সেতু বাঁধল। সেতু বাঁধাতে নদীর নিচের দিকে জল কমে গেল, তখন কয়েকজন কর্মকারকে সঙ্গে নিয়ে সূয্য পাথর দিয়ে নদীর একদিকের পাড়ে দীর্ঘ বেড়িবাঁধ বাঁধল। যেদিকের পাথর তুলে নেওয়ায় নদীখাত গভীর হল, স্রোতকে সেদিকে বইয়ে দিল। এবারে অন্যদিকের পাথর তুলে সেদিকের পার বাঁধা হল। সেদিকটাও গভীর হয়ে গেল। তখন সেতু অল্পে অল্পে ভেঙে দিলে নদীর জল তুমুল স্রোতে গভীর খাতে বইতে লাগল। দুধারের প্লাবিত জমি থেকে জল নেমে কাদা বেরিয়ে গেল। দীনারের ভাণ্ডগুলোও পাওয়া গেল। গ্রামের লোকেরা যারা পাথর তুলছিল, তারা দীনার পেয়ে এবারে খাবার কিনতে পারল, কাজেও উৎসাহ পেল। গ্রামে নতুন কৃষিজমি বেরোল, পুরোনো কৃষিজমি বন্যার থেকে রক্ষা পেল। আরো ভাটির দিকে বন্যায় যে সমস্ত স্থানে ভাঙনের সম্ভাবনা ছিল, সেইসব জায়গায় স্থানীয় লোকেরা সূয্যের উপদেশ মেনে নদীর ভেতরের পাথর তুলে ফেলল, এতে নদীখাতের গভীরতা বাড়ল, এবং সেইসব পাথর ব্যবহার করে পাড়ের দিকে দীর্ঘ বেড়িবাঁধ বাঁধা হল।
কাশ্মীরের পুরোনো রাজধানী পরিহাসপুরের নিকটে সিন্ধুনদী বিতস্তার সঙ্গে (সিন্ধু নদ নয়, এটি বিতস্তার উপনদী) মিলিত হত। সেই সঙ্গমের মধ্যে ত্রিগ্রামী নামে জনপদে দুই নদীর জলে গ্রাম ডুবে গিয়ে জলার আকার নিয়েছিল। সূয্য সিন্ধুনদীর জন্য নতুন খাত বানিয়ে ধারাকে আরো উত্তরে বইয়ে দিয়ে নূতন সঙ্গম তৈরি করল, নদীগর্ভের পাথর সাজিয়ে দুপাড়ে মজবুত করে বাঁধ দিয়ে খাত গভীর করে দিল, এতে ভাঙ্গনের সম্ভাবনা কমল। ত্রিগ্রামীর জমি জলামুক্ত হয়ে কৃষিজমি হল, বন্যার হাত থেকেও রক্ষা পেল। তবুও প্রতিটি গ্রামের চারপাশে বন্যা প্রতিহত করার জন্য আলাদা করে গোল বাঁধ দেওয়া হল, ফলে গ্রামগুলোকে কুণ্ডলের মত দেখাত। বিতস্তা আরো নিম্ন গতিপথে বিশাল মহাপদ্ম সরোবর দিয়ে বয়ে যেত। সূয্য সরোবরে পাখি ও মাছ শিকার করা নিষিদ্ধ করে দিল। ফলে মানুষের অতিরিক্ত নৌকা চালনা করলে বাঁধে যে ভাঙন ধরতে পারে, সেই সম্ভাবনা থেকে বাঁধগুলো রক্ষা পেল।
এরপর সুয্য আরো একটি বিজ্ঞানসম্মত কাজ করেছিল। সে প্রতিটি গ্রামের মাটি আনিয়ে সেই মাটি শুকিয়ে পরীক্ষা করল কোন মাটি কতদিনে শুকোয়। এতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের মাটির জলধারণ ক্ষমতা নির্ণয় হল, এবং বোঝা গেল কোন জমিতে কত জলসেচের দরকার। এই তথ্য জানার পর সে প্রতিটি গ্রামে কৃষির জন্য উপযুক্ত জলসেচের ব্যবস্থা করেছিল। সেচের প্রয়োজন অনুসারে নদী ও উপনদী থেকে গ্রামগুলো পর্যন্ত ছোটবড় নালা কাটা হল। এখন আর কৃষির জন্য বৃষ্টির উপর বেশি নির্ভর করতে হত না, ফলে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন অনেক গুণ বৃদ্ধি পেল। সূয্যের নদীসংস্কারের পর কৃষির উন্নতি হওয়ায় চালের দাম কমে গেল। যেখানে বিতস্তা নদী মহাপদ্ম সরোবর থেকে বেরিয়েছে, সেখানে সুয্য নিজের নামে সূয্যপুর (বর্তমান সোপোর) নামে নগর স্থাপন করল, মায়ের নামে একটি সেতু নির্মাণ করে নাম দিল সুয্যাসেতু, একটি গ্রামের নাম রাখল সূয্যাকুণ্ডল।
সূয্যের মাতৃভক্তি যেমন অতুলনীয়, তার মত প্রকৌশলী সেই প্রাচীন যুগে খুবই কম জন্মেছিল। ইতিহাসে সে সূয্যপণ্ডিত নামে খ্যাত।
<ব্র>