• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | রম্যরচনা
    Share
  • হাত বাড়ালেই এ-আই : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

    অনন্ত মুম্বাই থেকে ভিডিও কল করেছিল। বলছিল—মেঘ আসছে আর উড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি-বাদল নেই। নদী-নালায় জল শুকিয়ে যাচ্ছে। হ্রদে জল তলানিতে। কেবল কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো সারা শহর জুড়ে সেজেগুজে বসে আছে। মনে হয় বৃষ্টির অপেক্ষায়।

    আমি পচা আর বঙ্কুদা সকাল সকাল চায়ের গুমটির সামনে বেঞ্চিতে বসে গুলতানি করছিলাম। পচা বলল—নন্তু, ছবি পাঠা। অনন্তর পাঠানো ছবিটা দেখে মন ভরে গেল। আকাশ আলো করে কৃষ্ণচূড়া ফুটে আছে। অনন্ত লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল—চার লাইন কবিতাও লিখেছি। শুনবে নাকি?

    পচা আতঙ্কিত গলায় বলল—এই গরমে কবিতা!

    বঙ্কুদা গলা বাড়িয়ে ক্যামেরার ফ্রেমে ঢুকে বলল—বলো বলো, শুনি…

    অনন্ত উদাত্ত গলায় আবৃত্তি করল—

    কৃষ্ণচূড়ার কাণ্ডটি যেন ছোট নদী আঁকাবাঁকা
    ফুলগুলি সব স্থানীয় রমণী, গা ধুতে এসেছে ঘাটে
    দুটি ডাল ভরে ফুটে আছে লাল… নদীটির দুটি শাখা
    ফুল ফোটাবার দায় যেন আর কারও নেই তল্লাটে!

    পচা বলল—এ তো ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাওয়ার যোগাড়!

    বঙ্কুদা ঘাড় নেড়ে বলল—পচার কথায় কান দিও না। নদী-ফুল-পাখি ছাড়া কবিতা হয় নাকি? নন্তু, তোমার কাব্য-ভাষার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে দেখছি।

    আমি বললাম—নদী-ফুল তো শুনলাম, পাখি কোথায়?

    পচা বলল—উড়ে গেছে।

    বঙ্কুদা বলল—রসিকথা রাখো। কবিতার ভাষা নিয়ে কী যেন বলছিলে…

    পচা বলল—এই সব আদ্যিকালের ভাষায় আজকাল আর কেউ কবিতা লেখে না। আধুনিক কবিতার শরীর হবে ঋজু। ভাষা হবে মেদহীন। আমরা যে ভাষায় কথা বলি সেই ভাষায় কবিতা লেখা দরকার। সাধু-চলিত মেশাতে হবে, শব্দ-সন্ধানে বিলকুল শুচিবায়ু করলে চলবে না।

    বঙ্কুদা বলল—উদাহরণ দিয়ে বোঝাও দেখি।

    পচা বলল—ক’দিন আগে চোখে পড়ল রাস্তার ধারে উজ্জ্বল কমলা রঙের বুগেনভেলিয়া ফুটে আছে। মনে পড়ে গেল, আমাদের পুরনো বাড়ির সামনে একটা বাগান ছিল। দাদু বুগেনভেলিয়া লাগিয়েছিল। সেই বুগেনভেলিয়া তড়বড় করে গেটে বেয়ে উঠে পড়েছিল। সেই নিয়েই চার লাইন।

    কমলা বুগেনভেলিয়া
    পড়েছিল পথে হেলিয়া
    উঠিত সে হায় কত অনায়াসে গেটে
    এখন কি তার বাত হইয়াছে গেঁটে?

    আমি অসহিষ্ণু হয়ে বললাম—

    বাধা নেই, যদি বলি লিখেছিস খেটে
    তবুও কবিতা ‘ঘ’ হয়ে গেল ঘেঁটে।

    বঙ্কুদা বাঁ-ভুরু তুলে, কপাল কুঁচকে সন্দিগ্ধ গলায় বলল—আধ মাত্রা যেন কম লাগল।

    আমি বললাম—কৃষ্ণচূড়া ফুটলে কার-ই বা মাত্রাজ্ঞান থাকে?

    বঙ্কুদা বলল—তবু…

    আমি বললাম—আচ্ছা তাহলে একটু পাল্টে দিই।

    পচার কবিতা গুরুচণ্ডালী, পুরোটাই ঘেঁটে ‘ঘ’
    বাইরে দেখলে ‘পাঁচতলা মল’, ভিতরে সে মেটে ঘর।

    বঙ্কুদা মুখ ঝুলিয়ে বলল—এক আধ মাত্রা এদিক ওদিক না করলে কি তোমার সন্তোষ হয় না?

    আমি বললাম—আমি কোন ছার। সংস্কৃত মন্দক্রান্তা ছন্দে পঙক্তির শেষে ভাঙা পর্বে স্বর বা মাত্রার সামান্য এদিক ওদিক কালিদাস নিজেই সম্ভবত করে গেছেন।

    বঙ্কুদা হাত ওলটাল—ব্যাস! তাহলে আর কী! তোমার সাত খুন মাপ। বাপা আগে ছন্দ মেপে লিখতে শেখো। তারপর না-হয় মামদোবাজি করবে।

    অনন্ত অনেক ক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার মোবাইল ফোনের মধ্যে থেকে তার ভঙ্গুর গলা শোনা গেল, “মাত্রা না গুনলে সত্যিই কি কোনও সিরিয়াস খাতরা আছে?”

    মাত্রা নিয়ে কথা উঠলেই বঙ্কুদা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তার ওপর অনন্তর বিজাতীয় ‘খাতরা'! হাতমুখ নেড়ে অনন্তর কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল। পচা বঙ্কুদাকে থামিয়ে দিয়ে বলল—আরে দাদা, মাত্রাকে বাঙালি কবিরা কবেই অগস্ত্য যাত্রায় পাঠিয়ে দিয়েছে। পাঠকরাও আজকাল বেমালুম ছন্দপতন বরদাস্ত করে নিচ্ছে। ওই নিয়ে ঝগড়া করে লাভ নেই। তুমি বরং আধুনিক কবিতা-ভাষা নিয়ে কিছু বলো।

    বঙ্কুদা বলল—ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম। তাই তাকে যুগোপযোগী হতে হয়। কবিতার ভাষা আলাদা হতে যাবে কোন দুঃখে? কবিতারও তো পাঠকের কাছে পৌঁছোবার দায় থাকে। পাঠক যে ভাষা বোঝে সেই ভাষাতেই কবিতা লেখা হবে। তবে তোমার ‘গেটের’ সঙ্গে ‘গেঁটের' অন্ত্যমিলটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের আধুনিক। আলটিমেটলি কবিতা তো একটা পরিশীলিত শিল্প। সেটা মাথায় রাখা দরকার।

    পচা মুখ গোঁজ করে বলল—এমন কি আর আধুনিক?

    অনন্ত আবার মুঠোফোন থেকে মুখ বাড়াল—আচ্ছা, এমন করলে হয় না? কবিরা যে যার ইচ্ছা মতো লিখল। পাঠকরা নিজেদের বোধগম্য ভাষায় অনুবাদ করে নিল। আর কোনও সমস্যাই রইল না। আজকাল তো হাত বাড়ালেই এ-আই...

    আমি বললাম— ঠিক, ঠিক…

    হাত বাড়ালেই এ-আই
    নেই কারোরই রেহাই।

    অনন্ত থতমত খেয়ে বলল—না না, মানে আজকাল শুনছি পশ্চিমবঙ্গে পটাপট বাংলা ইসকুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজেদের ছেলেমেয়েদের ইংরিজি মাধ্যমে পড়াশুনো করাতে চাইছে। এই দেখো না, মুম্বাইতে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিরা ভাঙা ভাঙা বাংলা বলে, লিখতে পড়তে পারে না। প্রথম প্রজন্মের বাঙালিরাও যে সাংঘাতিক বাংলা চর্চা করে সে কথা হলপ করে বলা যায় না। তাই বলছিলাম আর কী!

    বঙ্কুদা বিমর্ষ গলায় বলল—

    সন্ধেবেলায় অন্ধ
    পেলে অন্য রকম গন্ধ
    ভাবে, পুজো নাকি আজ? চন্দন
    কে ঘষে! বোঝে না বাতাসে ভাসছে গন্ধক…

    পচা বলল—বঙ্কুদা, ক্ষমা দাও। সকাল সকাল এত ভারী ভারী শব্দ সহ্য হবে না।

    বঙ্কুদা হতাশ গলায় বলল—হায়,

    রূপ ও রক্তে দ্বন্দ্ব
    বুঝতে পারে না অন্ধ!

    পচা বলল—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন করে হ্যাটা কোরো না। এ-আই বলে কি মানুষ নয়!

    বঙ্কুদা বলল—এ-আইকে তো হ্যাটা করছি না। যারা এ-আইকে ভজহরিবাবুর বেয়াইয়ের মতো ব্যবহার করছে তাদের নিন্দে করছি।

    অনন্ত বলল—ইয়ে, ভজহরিবাবু আবার কে?

    পচার আর সহ্য হল না। মোবাইলটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে অনন্তর দিকে কটমট করে তাকিয়ে কট করে ফোন কেটে দিল। আমায় বলল—তাড়াতাড়ি চা শেষ কর। বাড়ি ফিরতে হবে। চাপ আসছে।

    আজকাল সবাই সদা-সর্বদা চাপে থাকে। বাংলা কবিতার ধারক-বাহকদের আর কী দোষ! কাপ উল্টে এক চুমুকে চা শেষ করে বললাম—চল।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments