• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | Rabindranath Tagore | রম্যরচনা
    Share
  • অপপ্রয়োগী রবীন্দ্রনাথ : অংশুমান গুহ


    হেগ (The Hague)-এর লাইব্রেরিতে

    ভেঙে মোর ঘরের চাবি
       নিয়ে যাবি
          কে আমারে
    ও বন্ধু আমার!
    না পেয়ে তোমার দেখা,
       একা একা
          দিন যে আমার কাটে না রে॥

    যখন স্কুলে পড়তাম, তখনই ওই চাবি-ভাঙার প্রসঙ্গটায় খটকা লেগেছিল। চাবির বদলে তালা ভাঙলে ব‍্যাপারটা সহজ হত না? নাকি শব্দ-মিলের জন‍্য এই ছোট অপপ্রয়োগটা মেনে নেওয়া যায়?

    আমার বন্ধু, মানস, একটা প‍্যারডি করেছিল —

    ভেঙে মোর ঘরের তালা
       ওরে শ‍ালা
          কি পেলি রে?

    (প‍্যারডির কোনো একটা শব্দে যদি স্পর্শকাতর পাঠক আহত হয়ে থাকেন, তাঁকে জানাই যে আমি নজরুলের অনুমতি নিয়েই এই পরিবেশন করেছি —

    মোল্লা হাঁকিল,--“তা’ হলে শালা,
       সোজা পথ দেখ!” গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!)

    অন‍্যত্র নজরুলও তালা ভাঙার কথা লিখেছেন, চাবি ভাঙার কথা নয় –

    লাথি মার, ভাঙ্‌ রে তালা!
    যত সব বন্দী-শালায়
       আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা!

    ভেঙে মোর ঘরের চাবি – কাব‍্যিক অনুমতির (poetic license) এই আতিশয‍্য রবি ঠাকুরের লেখায় দেখলে আমার মত রবীন্দ্র-অনুরাগীর একটু অস্বস্তি হয়।

    কিম্বা ধরা যাক ’সোনার তরী’র শেষ স্তবক –

       শ্রাবণগগন ঘিরে
       ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
       শূন্য নদীর তীরে
          রহিনু পড়ি

    আচ্ছা, মেঘ তো একপাশ থেকে আরেক পাশে যায়। মেঘ কি কখনো প্রজাপতির মত এখানে ওখানে ঘোরাফেরা করে? এই সমালোচনা প্রথম করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় অথবা সুরেশচন্দ্র সমাজপতি।

    অবশ‍্য এ তো কিছুই নয়। ডি এল রায় বর্ষাকালে ধান কাটা নিয়ে আরো অনেক কঠোর কথা লিখেছিলেন –

    কৃষক আউস ধান কাটিতেছেন বর্ষাকালে, শ্রাবণ মাসে। বর্ষাকালে ধান কেহই কাটে না, বর্ষাকালে ধান্য রোপণ করে। ধান তিন প্রকার,
    ১) হৈমন্তিক, তাহাই কৃষকের আসল ধান্য কাটে হেমন্তকালে, অগ্রহায়ণ মাসে;
    ২) আউস (নিজে খাইবার জন্যই প্রায় করে) কাটে শরৎকালে, ভাদ্র মাসে;
    ৩) বোরো (উড়িষ্যা অঞ্চলেই অধিক হয়) কাটে গ্রীষ্মকালে, বৈশাখ মাসে।

    সোনার তরীর দ্বিতীয় স্তবক –

    একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
    চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
         পরপারে দেখি আঁকা
         তরুছায়ামসীমাখা
         গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
              প্রভাতবেলা--
    এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

    ডি এল রায় লিখলেন –

    ক্ষেত্রখানি তবে একটি দ্বীপ। তবে এ চর জমি। এ রূপ জমিতে ধান করে না।
    এ সব জমি শ্রাবণ ভাদ্র মাসে ডুবিয়া থাকে।

    ইত‍্যাদি।

    এই ব‍্যাপার আর কথা না বাড়িয়ে বরং সুনীল গাঙ্গুলিকে উদ্ধৃত করি –

    এ সমালোচনায় দ্বিজেন্দ্রলালকে একজন কৃষি বিশেষক হিসাবে অবশ্যই গণ্য করা যায়।
    কাব্য বোদ্ধা হিসাবে বোধহয় ততটা যায় না।

    যাই হোক। ওই চাবির ব‍্যাপারটায় ফিরে আসি।

    ’চাবি’ শব্দটা এসেছে পোর্তুগিজ chave থেকে। যেখানেই ইংরিজি key শব্দটা ব‍্যবহার হয়, এখন সমস্ত বাংলাভাষীই সেখানে ’চাবি’ বলে। কখনো কখনো তালা-ও-চাবি এই পুরো লকিং সিস্টেমটাকেই ’চাবি’ বলে নির্দেশ করা যায়, যেমন “গেটে চাবি লাগিয়ে দে।” কিম্বা, নজরুলের উক্তি –

    তব মন্দির মসজিদে প্রভু নাই মানুষের দাবি
    মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!

    এই সাধারণ প্রয়োগের উদাহরণটাতে কি আমার পূর্বোক্ত অস্বস্তি কাটবে? ঠিক বলতে পারছি না।

           বুঝি গো রাত পোহালো,
           বুঝি ওই রবির আলো
           আভাসে দেখা দিল গগন-পারে--
    সমুখে ওই হেরি পথ,
        তোমার কি রথ
         পৌঁছবে না মোর দুয়ারে॥

    চাবির কি আর কোনো মানে হয় যাতে আমার আরাম হবে? যেমন হারমোনিয়াম বা পিয়ানোর চাবি?

    না, তাতেও ওই চাবি ভাঙার ব‍্যাপারটার সুরাহা হচ্ছে না।

           আকাশের   যত তারা
           চেয়ে রয়    নিমেষহারা,
           বসে রয়    রাত-প্রভাতের পথের ধারে।
    তোমারি দেখা পেলে
         সকল ফেলে
             ডুববে আলোক-পারাবারে।

    আমার একটা বহু পুরোনো HMT Sona হাতঘড়ি আছে। তাতে quartzও নেই, ব‍্যাটারিও নেই। রোজ সকালে তাতে দম দিতে হয়। চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।

    রবি ঠাকুর কি সেই চাবির কথা বলছিলেন? ঘরের চাবি, ঘড়ির চাবি। যে চাবি ভাঙলে সময়ের দৈনন্দিন কাজের ঘানি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? সমাজের দম-বন্ধ-করা নিয়ম থেকে অথবা বেঁচে থাকার রুদ্ধ-দুয়ার কক্ষ থেকে রেহাই মেলে। অমলের জানলায় আসা দইওয়ালার কাছে যেমন থাকে ছুটির খবর। রাজার পাঠানো চিঠিতে যেমন থাকে অজানার নিমন্ত্রণ।

    হয়তো।

    কিম্বা হয়তো একটু বেশি ভেবে ফেলছি। প্র্যাক্টিকাল হতে গিয়ে কবিতার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –

    A mind all logic is like a knife all blade. It makes the hand bleed that uses it.
    [Stray Birds]

    ’ডাকঘর’ লেখার ৬ বছর পর, ১৯১৭ সালের অক্টোবরে শান্তিনিকেতনে নাটকের রিহার্সাল চলছিল। দইওয়ালার আসার কথা। রবীন্দ্রনাথের মনে হল একটা গান দরকার। উইংস থেকে বেরিয়ে গ্রীনরুমে টেবিলের সামনে বসলেন। একটা কাগজ নিয়ে এক ধাক্কায় গানটা লিখে ফেললেন। সুরটা নবনীদাস বাউলের “দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা”। গেয়ে শোনালেন। স্টেজে ড্রপ উঠলো। দইওয়ালার হাঁক শোনা গেল। [রবিজীবনী - প্রশান্তকুমার পাল]

         প্রভাতের    পথিক সবে
         এল কি   কলরবে—
         গেল কি   গান গেয়ে ওই সারে সারে
    বুঝি-বা   ফুল ফুটেছে,
        সুর উঠেছে
           অরুণবীণার তারে তারে॥

    ডি এল রায় মারা গেছেন তার চার বছর আগে। মৃত‍্যুর আগে জীবনীকারের কাছে বলেছেন, “সত্যিই আমার অত্যন্ত ভুল হয়ে গেছে, আমি আর এমন কাজ করব না।”

    রবীন্দ্রনাথ পরে ’ডাকঘর’‍-এ গানটা অন্তর্ভুক্ত করেননি।

    জীবনস্মৃতিতে লিখেছিলেন –

    মুশকিল এই যে, মানুষকে যে কথা দিয়া কবিতা লিখিতে হয় সে কথার যে মানে আছে। এইজন‍্য তো ছন্দোবদ্ধ প্রভৃতি নানা উপায়ে কথা কহিবার স্বাভাবিক পদ্ধতি উলটপালট করিয়া দিয়া কবিকে অনেক কৌশল করিতে হইয়াছে, যাহাতে কথার ভাবটা বড়ো হইয়া কথার অর্থটাকে যথাসম্ভব ঢাকিয়া ফেলিতে পারে।

    এই লেখাটার এত সুন্দর ইংরিজি তর্জমা করেছিলেন ভাইপো সুরেন্দ্রনাথ, যে উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না –

    That words have meanings is just the difficulty. That is why the poet has to turn and twist them in metre and verse, so that the meaning may be held somewhat in check, and the feeling allowed a chance to express itself.

    আরেক ভাবে ভাবলে – রবি ঠাকুর যেন এক্কা-দোক্কা খেলছেন। পেছনে পেছনে চলেছি আমি। মাটির ওপর খড়ি দিয়ে আঁকা ঘর নয়। ঘরের বদলে এক একটা টালি পাতা আছে, ছোট বড়। টালি থেকে টালি লাফ দিয়ে আমাদের খেলা। এক একটা টালি এক একটা শব্দ। রবি ঠাকুর যাচ্ছেন লাফিয়ে লাফিয়ে এক টালি থেকে আরেকটা টালিতে। পেছনে আমি। প্রত‍্যেকটা লাফে পেরিয়ে যাচ্ছি টালির ফাঁকে ফাঁকে টুকরো মাটির ফালি, যেখানে ফুটেছে বুনো ফুল। অনেক রকম রঙ তার। অনেক রকম আকার-আকৃতি। দুটো শব্দের মধ‍্যবর্তী নৈঃশব্দে অবাধ‍্য প্রাণ উঠেছে মাথা চাড়িয়ে।



    অলংকরণ (Artwork) : ফটোঃ শিঞ্জিনী পাল
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments