



অবিকল্প ও অন্যান্য গল্প; — দিবাকর ভট্টাচার্য; প্রকাশক—পরবাস; প্রচ্ছদ- রঞ্জন ভট্টাচার্য; প্রথম প্রকাশ— জানুয়ারি ২০২৬; ISBN:978-1946582591 দিবাকর ভট্টাচার্য (১৯২৮-?) রচিত কোনও গ্রন্থ বা গল্প আগে পড়িনি। গ্রন্থ-পরিচিতি থেকে জানতে পারা যাচ্ছে ১৫ বছরের আগে এই লেখকের লেখা পাঠকের কাছে পরিবেশিত হয়নি। এবং যা আরও অন্যরকম, তা হল লেখক, তাঁর রচনা প্রকাশে আগ্রহী হওয়া দূরে থাক্, চেয়েছিলেন তাঁর লেখাপত্র সব যেন ভস্মীভূত করা হয়। তাঁর সেই ইচ্ছা কার্যে পরিণত করা হয়নি বলেই আমরা আজ এখানে দাঁড়িয়ে।
এগারোটি ছোটগল্প, ৫ থেকে ১৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের, নিয়ে সঙ্কলিত এই বইটি তাই অনেক অর্থেই অন্যরকম।
লেখক-পরিচিতি জানাচ্ছে দিবাকর ভট্টাচার্য প্রথমজীবনে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ এবং মহাত্মা গান্ধীর ‘দর্শনে স্থিত’। অহিংসার সোচ্চার সমর্থক দিবাকর যে সমস্ত গতানুগতিক পন্থার বিরোধী, এই সঙ্কলনের যে কোনও একটি গল্প পড়লেই সেটা খানিকটা ধারণা করা যায়। তাঁর ব্যতিক্রমী মানসিকতার প্রকাশ কমবেশি প্রতিটি গল্পেই।
এগারোটির মধ্যে অন্তত তিনটি গল্পে আমরা পরিচিত/প্রচলিত কাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উল্লেখ পাই। কবি ও নৌকো-তে পাই সেই কুঠার ও জলদেবীর গল্পকে; একটি হালফিল সময়ের গপ্পো...-তে পাই পঞ্চতন্ত্রের সেই এক ব্রাহ্মণ এবং তিনটি ঠগের কাহিনীটি; আর দশম গল্প অলীক আবর্জনাতে পাই তিনটি বিদেশি গল্পের উল্লেখ: শেখভের Overcoat, মপাঁসার Necklace আর কাফকার Metamorphosis! কখনও ছায়াপাত হলেও লেখক আপন অভিরুচিমতন কাহিনীকে মুচড়ে অন্যদিকে নিয়ে গিয়েছেন — প্রচলিত উপাখ্যানগুলির ওপর ভর করে দাঁড়ায়নি তাঁর কাহিনীরা। এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করা যেতে পারে ৬ নম্বর গল্পটির; আমার মতে সঙ্কলনের শ্রেষ্ঠ, একটি হালফিল সময়ের গপ্পো ...।
লেখক পরিচিতিতে তাঁর জন্মসাল দেওয়া আছে, কিন্তু তিনি কবে গত হয়েছেন সেই তথ্য নেই। আর বইটিতে যা নেই, তা হল গল্পগুলির রচনাকাল। এই তথ্যের অভাবে রচনাগুলির প্রাসঙ্গিকতা বা temporal relevance আন্দাজ করতে কিঞ্চিৎ অসুবিধা হয় বৈকি! “হালফিল সময়” শিরোপায় যদি ধরি এইটি লেখকের জীবদ্দশার শেষ দিকেই রচিত, তাহলে চূড়ান্ত বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে, যে আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগে বসে শাসক ও শাসিতের এমন নিখুঁত প্রতিচ্ছবি তিনি কি করে এঁকেছিলেন? নিজেকে বিশাল ভাবা-র, কিম্বা ভাষার বাহারে আপামর জনসাধারণকে হতবুদ্ধি করে দেবার, তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’ হয়ে সবথেকে উঁচু চেয়ারে বসার যে ঘোষণা-ঘর্ঘর — তার সঙ্গে আমরা আজ ভারতবর্ষে ও তার এক অঙ্গরাজ্যে অতি পরিচিত। দিবাকর কি তাহলে কোনো অলৌকিক দিব্যদৃষ্টির অধিকারী ছিলেন? না কি দেশ-কাল নির্বিশেষে শাসক-চরিত্র একই ছাঁচে ঢালা? পঞ্চতন্ত্রের বিষ্ণুশর্মাকে আবার গল্পের মধ্যে ফিরিয়ে এনে চমৎকার মুন্সিয়ানায় যবনিকা টেনেছেন গল্পটির।
৫ নম্বর কাহিনীটি: মায়ার খেলা বইটির দীর্ঘতম গল্প। অতিদ্রষ্টা, অতিস্রষ্টা এবং অতিজীবক নামের তিন বন্ধুর এই কাহিনীটিতে চতুর্থ একটি চরিত্র: মায়ামোহন; যে ক্ষমতারূপী একটি বিশাল বাঘের পিঠে চড়ে রাজ্যজুড়ে ত্রাসের সাম্রাজ্য চালায়। সেই সাম্রাজ্যে তার কথাই শেষ কথা, অথচ তার ফরমান: প্রজারা যেন সকলে আনন্দে থাকে! সেই তিনবন্ধু, যারা একটি কঙ্কালে প্রাণসঞ্চার করে মায়ামোহনকে জীবনদান করেছিল — তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে তাদের প্রার্থিত পরিবর্তন দান করল সেই ক্ষমতামত্ত অপশাসক। পরিশেষে সেই ক্ষমতারূপী বাঘটিই স্বমূর্তি পরিগ্রহ করে তার সাময়িক প্রভুকে অন্ধকারে পরিত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল — কাহিনী সেইটুকু বলেই থেমে গেল। বাকিটা লেখক ছেড়ে দিলেন পাঠকের কল্পনার ওপরে।
গুণমানের বিচারে এই দুটি গল্প যেমন মনে দাগ কাটে বা ভাবায়, একাধিক গল্প, যেমন আকার-বিকার বা অলীক আবর্জনা বা অতিকল্পিত তার কাছাকাছিও পৌঁছোয়নি। “আজীবন নিঃসঙ্গ ও ব্যতিক্রমী” লেখকের মনোজগতের কিছু ধোঁয়াশা, কিছু জটিলতাই কি রূপ পেয়েছে এই গল্পগুলিতে এবং অন্য কয়েকটিতে?
আবার কয়েকটিতে দেখি তাঁর গভীর ঈশ্বরবিশ্বাস এবং রাবীন্দ্রিক দর্শনেরও প্রতিফলন। কবি ও নৌকা কাহিনীর শেষ অংশ অবশ্যম্ভাবীভাবে মনে করিয়ে দেয় ‘সোনার তরী’র সেই পঙ্ক্তি “ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী/ আমারই সোনার ধানে গিয়াছে ভরি।” আর শেষ গল্প দীনবন্ধু কিম্বা ঈশ্বরের কাহিনী মনে করিয়ে দেয় সেই অমোঘ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি, সেখানে কবি উচ্চারণ করছেন এক চিরায়ত বাণী — “আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে”। এই গল্পে যে ঈশ্বর অনন্তকাল ধরে বসে আছেন, সেই ঈশ্বরই ঈশ্বরের গতিপথ গল্পে বিশ্বাসের রূপে আবির্ভূতা ৮ নম্বর কাহিনী অনন্ত বিপথের শেষেও দেখি ভক্তকে কোলে নিয়ে ঈশ্বর বসে। গল্পের কুশীলবদের মধ্যে শয়তান আছে অনুচরসহ, এক তিরন্দাজ আছে, আছে মহাকাল বা দৈব; কিন্তু ভক্তের মৃত্যুর পরে সেই মৃতদেহ কোলে নিয়ে সাশ্রুনয়নে বসে থাকেন সেই ঈশ্বর — আর ভক্তের অভিশাপের তীর তাড়া করে চলে শয়তানকে।
দ্বিতীয় কাহিনী শাশ্বত বিনায়কের অপেক্ষায়: এখানে ঈশ্বর না থাকলেও আছে দৈব বা ভবিতব্য, যার প্রভাবে একের পর এক দুর্ঘটনায় এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরাঙ্গের জীবন বিধ্বস্ত হয়ে চলে। তিন প্রজন্ম ধরে এই অনির্দেশ্য অভিশাপে বিদ্ধ গৌরাঙ্গ বিঘ্নবিনাশক গণপতির আশীর্বাদের প্রত্যাশায় যে দৌহিত্রের নামকরণ করেছিলেন বিনায়ক, এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সন্ধ্যায় তার প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতেই তিনি ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। আর তাই সেই কালজয়ী চিরায়ত বিনায়কের প্রতীক্ষাই প্রবহমান হয়ে গেল।
এ বইয়ের প্রথম গল্পটির নাম অবিকল্প, আর তার নামেই বইটির নামকরণ - অবিকল্প ও অন্যান্য গল্প। এ গল্পটি পড়তে গিয়ে হঠাৎই মনে পড়ে গেল বিভূতিভূষণের মেঘমল্লার কাহিনীটির কথা। সেই বাঁশি, সেই যুবকযুবতীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রেম, সেই আরণ্যক পটভূমি! কিন্তু গল্প যেই গতি পেল, তার অভিমুখ গেল পাল্টে। প্রথম প্রজন্মের প্রেমের যে পটভূমিতে দ্বিতীয় প্রজন্মের আবির্ভাব — তার মধ্যে প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা প্রবেশ করে গল্পটিকে নিয়ে গেল অন্য এক জগতে। মেঘমল্লারে প্রেমিক যুবকটি পাষাণমূর্তি হয়ে রয়ে গিয়েছিল বনান্তরালে; আর এখানে সে রূপান্তরিত হল একটি বৃক্ষে, আর যুবতীটি এক সাপিনী হয়ে হারিয়ে গেল বনপথে। ছোটগল্পের আবশ্যক শর্তানুসারে “শেষ হয়ে হইল না শেষ” বটে, কিন্তু পাঠককে রেখে গেল এক অনির্দেশ্য অন্ধকারে। অবিকল্প? হয়তো তাই!
মোটের ওপর পরীক্ষামূলক আঙ্গিকে লেখা গল্পগুলি নিঃসন্দেহে অন্যরকম, ব্যতিক্রমী তো বটেই। এগারোটির মধ্যে তিন-চারটি গল্প তো পাঠককে ভাবায়, দ্বিতীয়বার ফিরে দেখতে প্ররোচিত করে, নিঃসঙ্গ লেখকের মনোজগতের বাতায়নদ্বারও কিছুটা খুলে দেয়।
কিন্তু এ যেন প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী ভীমসেন যোশীর বা অজয় চক্রবর্তীর অতুলনীয় তানকর্তব; উস্তাদ রশিদ খাঁ বা পালুসকরের রস-স্নিগ্ধতা যেখানে অনুপস্থিত।
ধৃষ্টতা মার্জনীয়।