• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share
  • কাছে দূরে: সিমিলিপাল : প্রদীপ্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়


    দেবী অম্বিকা মন্দির থেকে দেবকুণ্ড

    যাবই যখন তখন যাওয়ার মতো জায়গায় যাব—এইরকমই ইচ্ছে ছিল।

    বিশেষ করে চেনা চৌহদ্দির বাইরে না গেলে আর যাওয়া কী হল! এক্ষেত্রে আমার একটা সুবিধা ছিল—খুব বেশি নাম ঘাঁটার প্রয়োজন ছিল কম। তবু নিজের চেষ্টায় হল না। বন্ধুরাই ঠিক করল। প্রথমে ঠিক হল দেবকুণ্ড; পরে, ঘষেমেজে পরিচ্ছন্ন করে যোগ হল সিমিলিপাল।

    ১৯ চৈত্র, ১৪৩২

    বেরোনোর সময়টা ঠিক হয়েছিল ঘড়ি মিলিয়ে; বেরোনোর সময় ঘড়ি মেলানো হয়নি। আকাশ ছিল পরিষ্কার। বৃষ্টি ছিল না, সম্ভাবনাও ছিল না।

    আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল নিজেদের গাড়িতেই। গাড়ি চলতে শুরু করার কিছু বাদে সমস্যা হল ক্ষিদে নিয়ে; মনে টেনে আনতে কোলাঘাট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। পেট ভর্তির সঙ্গে মন খালির এক আশ্চর্য সমীকরণ। কোলাঘাট ছেড়ে রাস্তাও ক্রমে খালি হতে থাকল, ঘর-বাড়িও আসতে লাগল কমে। প্রতিদিনের দেখা দৃশ্যের বাইরে আসা আর্দ্র মন, খাপছাড়া হতে শুরু করল গোপীবল্লভপুরের মাঝামাঝি এসে। বেলা তখন একটা। গাছের কালচে-সবুজ পাল্টে ধূসর-সবুজ হতে হতে, মাঠের কাঁচা-সবুজ যখন পাকা-হলুদ হতে থাকল, খানিকটা অনুমান করা গেল যেতে যেতে ভূখণ্ডের অংশবিশেষ বদলে ফেলেছি। ভেজা মনের শুকিয়ে ওঠাও এই বদলের একটা লক্ষণ।

    গাড়ি তখন বারিপদা হয়ে সিমিলিপালের দিকে, লক্ষণ আরেকটু বদলাল শ্যামাখুন্টার কাছাকাছি।

    শ্যামাখুন্টার রাস্তার পাশ ধরে অসমান মাপের খোপ খোপ পীতবর্ণ ক্ষেত। ক্ষেতের শেষভাগে ঝোপঝাড়, বন ও ঘন বন। বনের মাথা টপকে দেখা যাচ্ছে বুনো পাহাড়—পাহাড়ের ছায়া এসে পড়েছে বনে। সেই পাহাড়ের ডান দিকে ও বাঁ-দিকেও পাহাড়, তারপরেও পাহাড়। নিচু হতে হতে যতদূর পারা যায় ছড়িয়ে পড়ে শেষটায় মিশে গেছে দিগন্তের ধূসর-নীলে। আরেক দিকে, রাস্তার কাছাকাছি, টুকরো টুকরো ক্ষেত জুড়ে কাটা ধানের নাড়ার হলদে খোঁচা খোঁচা রেখা। নাড়া পুড়িয়ে চলছে জমির প্রস্তুতি। পোড়া নাড়ার নিভে যাওয়া আগুন থেকে কালচে রং নিয়ে উঠে আসছে দু-হাত লম্বা ধোঁয়া—তদারকিতে উপস্থিত কিছু মানুষ। এই পোড়া ছাইয়ে হয়তো পুষ্টি পাবে জমি—ফলবে নতুন ফসল।

    গাড়ি থেকে এই দৃশ্য অনেকটা জুম চাষ পদ্ধতির সমতল সংস্করণের মতো লাগল। গাড়িতে বসে লাগল একটা একঘেয়ে ভাব। সেই ভাব কাটিয়ে আল-ঢাল পেরিয়ে দূরে যেতে চাওয়া মন—সিটবেল্ট টেনে কাছে আটকে রাখলাম। ঢেউ খেলানো প্রান্তসীমায় যে পাহাড় নীল আকাশে মাথা রেখে দাঁড়িয়েছিল তার সবটুকু পুরে নেওয়ার মতো জায়গা আমার ছিল না। শ্যামাখুন্টার রাস্তা ধরে চলতে চলতে, বেলা তিনটে নাগাদ, হঠাৎ এক দীর্ঘদেহী শৈলশ্রেণী গাছপালা নিয়ে অমন মুখ তুলে তাকাবে—কে জানত!

    প্রান্তরের প্রান্ত ধরে আরও এগিয়ে চলল গাড়ি, আরেক প্রান্তে গাঁটছড়া বেঁধে রইল বুনো-পাহাড়, বনস্পতির ভিড় আর চষা ক্ষেত। শহর না-হতে-পারা শহর পেরিয়ে, খণ্ড খণ্ড গ্রাম পেরিয়ে, ডান দিক বাঁ-দিক করে, ময়ূরভঞ্জের উত্তরাংশে প্রায় বসতিহীন গন্তব্য দেখে গাড়ি এসে যখন থামল, আলো তখনও যাব যাব করেনি।

    সিমিলিপালের যে নিবাসে থাকা ও খাওয়া ঠিক করা হয়েছিল সেখানে বয়ে আনা লোটা-কম্বল রেখে তড়িঘড়ি সীতাকুণ্ড যাওয়া স্থির হল। গাড়িতে কিমি দুয়েক গিয়ে শেষটুকু হাঁটা পথ। হাঁটাপথ বললেই পথ হাঁটার উপযোগী এমনটা নয়। রাস্তা জুড়ে অসমান মাপের পাথরের চাঁই। পাথরের থেকেও পাথরের ফাঁকে বেশি ভয়। ডিঙিয়ে লাফিয়ে বেশ কায়দা করে শেষটায় এসে দাঁড়ালাম সীতাকুণ্ডে। চৈত্রের গরমে তেজ হারিয়ে তিরতির করে কোনওরকমে পড়ে চলেছে ঝর্ণা। কতটুকু এই ঝর্ণা! তবু যেন সমস্ত আকর্ষণ ওখানেই। জনশ্রুতি ও লোকবিশ্বাস মতে সীতাকুণ্ড—সীতার স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র জলাশয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড় বা পুরুলিয়ার বাগানডি গ্রামের মতো, সিমিলিপালের এই অঞ্চলটিতেও এরকম একটি জলাশয় ও বিশ্বাস বর্তমান। সীতাকুণ্ডের এক কোণে গুহাপ্রায় অন্ধকারে হনুমান-পুজোর দৈনন্দিন আয়োজন বোধহয় সেই বিশ্বাসেরই দ্যোতক। বনবাসিনী সীতার এই ঘন বনে দিনাতিপাত, পাহাড় ঘেরা এই ক্ষীণ ঝর্ণা, পাথরের গায়ে গুটি গুটি পায়ে কমে আসা আলো—ভূগোল, বিজ্ঞান ও পুরাণ মিলে সীতাকুণ্ড তখন বেশ রোমাঞ্চকর। এই ভাবটা ফিকে হয়ে এল কমা আলোয় ফেরার পথটা মনে পড়ায়। বনবাসকালে দেবী সীতার স্নানের এই পবিত্র পুকুরের সৃষ্টি—দৈববলে না ঝর্ণার জলে—সে তর্ক শিকেয় তুলে, বিশ্বাসে বস্তু মিলিয়ে, পাথর ডিঙিয়ে তখন ফিরতে পারলে হয়। যাত্রার শুরু থেকেই সাপের ভয়টা কেমন পায়ে জড়িয়ে ছিল।


    সীতাকুণ্ড যাওয়ার পথে

    পাহাড়ে জঙ্গলে বোধহয় অন্ধকার ঝুপ করে নেমে পড়ে, নামি নামি করে না।

    সীতাকুণ্ড থেকে ফেরার পর সেই নেমে পড়া অন্ধকারে আমাদের নিবাসটির সঙ্গে বন-পাহাড়ের ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ নিবিড় হয়ে উঠল। অতিরিক্তের মতো লনে চেয়ার পেতে বসলাম।


    সীতাকুণ্ডে হনুমান-পূজো

    প্রকৃতির কোল ঘেঁষে নিবাসটির নিখুঁত অবস্থান। নিবাসের মাঝখান জুড়ে বিস্তৃত আয়তাকার সবুজ গালিচার মতো লন। লনের দৈর্ঘ্য বরাবর দু-দিকে সোজা লম্বা লাল সুঁড়িপথ। পথের শুরুটা নিবাসের ঢোকার মুখে আর শেষটা স্বাধীনভাবে মিশে গেছে ন্যাড়া-মাঠে, উঁচু-ঘাসে, ঝোপে-ঝাড়ে, জঙ্গলে। লন আর সুঁড়িপথের মাঝখানে সাজিয়ে গুছিয়ে করা বাগান। বাগানে আহামরি গাছ কিছু নেই। প্রয়োজনও নেই। বাগানের গাছ দেখতে কে কবে অরণ্যে এসেছে?

    সব মিলিয়ে নিবাসটির সৌন্দর্যের এত আতিশয্য নেই যা পাহাড়, বন আর উপুড় হয়ে আসা আকাশের সহাবস্থানকে অস্বস্তিজনক করে তোলে। কিন্তু যা আছে, যা যা নিয়ে আছে তা নিজের মতো করে সুন্দর—যা যত্ন করে তৈরি হলেও অযত্নে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতির ঐশ্বর্য নষ্ট হওয়ার ভয় নেই।

    আরেক ঐশ্বর্যের অধিকারী এই নিবাসের স্থানীয় কর্মীরা। তিন জনের সঙ্গে দেখা হল, কথা হল ওই তিন জনের সঙ্গেই। কোন কিছুতেই তাঁদের ‘না’ নেই। ‘...এটা পাওয়া যাবে?’—‘হুঁ’, '...এটা কি এখন দিতে পারবে?'—‘হুঁ’, ‘...ওটা রাতের মধ্যে পাঠিয়ে দিও কিন্তু’—‘হুঁ’। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। ধরুন আপনি জিজ্ঞেস করলেন ‘পাহাড়ের দিকে হেঁটে যাওয়া যায়?’, উত্তর পেলেন—‘হুঁ’, ‘যেতে যেতে জঙ্গলে সাপ থাকতে পারে তো?’, উত্তর পেলেন—‘হুঁ’, ‘সেই সাপে কাটলে মরেও যেতে পারি তো!’, উত্তর পেলেন—‘হুঁ’। ‘হুঁ’ শুনতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম কোথাও যে ‘না’ শুনব সেটা না হওয়ার আশঙ্কায়, মনের ছাগলছানার লাফটা কমিয়ে লন-বন্দী হয়ে রইলাম।

    সন্ধ্যে নেমে এলো প্রায়। আকাশে বেশ কিছু ভারী মেঘ স্থির হয়ে চেয়ে রইল নিচে। তাপমাত্রা কিছু কমেছিল। আরও কমার আগে অনেকক্ষণ আগের মতোই থাকল। নিবাসের ঘোষিত সীমানায় একে একে জ্বলে উঠল টিমটিমে আলো। আলো কমে এল আকাশে, মাঠে, জলে (নিবাসটির মাঠে একটা আনুমানিক চার ফুট ব্যাসার্ধের জলাশয় ছিল যেখানে বেশ কিছু রাজহাঁস সকাল বিকেল খেলা করত), জঙ্গলে। লন ছাড়িয়ে হাত পঞ্চাশ এগোলে দশ মানুষ উঁচু গাছের মিশমিশে অন্ধকার। সেই অন্ধকার পায়ে জড়িয়ে বিশাল আকৃতির কিছু একটা মিশে যেতে লাগল আকাশের শেষ আলোয়। অরণ্যের শত শত প্রাণ নিয়ে পাহাড় ডুবে গেল একরাত্রি অন্ধকারে। রাত বাড়লে বাড়তে থাকল দমকা হাওয়া। সেই হাওয়ায়, দূর থেকে, পাহাড়ি গাছগুলোর পাতা ঘষার শব্দ, একজোট হয়ে ভেসে এল কানে। বৃষ্টি মেঘেই রইল আটকে। ভিজিয়ে দিতে পারল না।

    ২০ চৈত্র, ১৪৩২

    ভোর ভোর দরজা খুলে লনে নামতেই টের পেলাম হাওয়ার বেগ বেড়েছে। আলো এসে পড়েছে বুনো-পাহাড়ের মাথায়। পাহাড়ের মাথা ছুঁয়ে সমতলে ধাক্কা খেয়ে ঢেউ খেলে খেলে গায়ে এসে লাগছে হাওয়া—গায়ে ধাক্কা দিয়ে আমাকেও নিয়ে যাচ্ছে টেনে। ন্যাড়া মাঠের ওপর উসকোখুসকো কিছু ঝোপ, সেগুলো এড়িয়ে, ধুলোমাখা কিছু ঘাস, সেগুলো মাড়িয়ে, কিছুটা এগোলেই কুলীন গুল্মলতার ভিড়। এঁকেবেকে আরও এগোলে ঘন রাজবংশীয় সবুজ। আর দু-পা, প্রৌঢ় সন্ন্যাসীর মতো দাঁড়িয়ে স্থির ধ্যানমগ্ন পাহাড়, মাথায় তার পাতলা মেঘের জটা।

    এই দেওয়া-নেওয়া সবে যখন শুরু হয়েছে কী একটা এসে মনে করিয়ে দিয়ে গেল আজ দিন-ক্ষণ মেপে বাঘ দেখতে যাওয়ার কথা। সব গেল ঘেঁটে। দিক পরিবর্তন করে আমার উল্টোদিকে বইতে থাকল বাতাস। আকর্ষণের সুতোটা গেল কেটে। গভীর অরণ্য, গম্ভীর হয়ে উঠল। কিছু অজানা পাখির অচেনা ডাক ছাড়া তখনকার মতো তেমন কিছু অবশিষ্ট রইল না। সিমিলিপাল অরণ্যের প্রায় তিনশ প্রজাতির পক্ষীকুলের কারা কারা তখন সেই বনপ্রান্তে ডেকে উঠেছিল, বলতে পারব না। হ্যাঁ, কাক ডাকা শুনিনি। অতটা অনাদর ছিল না।

    যে গাড়িতে করে সিমিলিপালের অরণ্যে ঢুকেছিলাম তার কথা একটু বলা যাক। দু-রকম গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। কোনটিতে যাওয়া হবে সেই নিয়ে গতকাল সন্ধ্যেয় একটা জরুরি বৈঠকও বসেছিল। মাথা ঘামিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনার পর শেষটায় একটি মধ্যবিত্ত গাড়ি ঠিক হয়।

    নির্ধারিত সময়ে সেই গাড়ি নির্দিষ্ট পথে নিয়ে চলল বাঘ দেখাতে। গাড়ি মধ্যবিত্ত হওয়ায় পথও হয়েছিল সংক্ষিপ্ত। এই গাড়ি বাছার অন্যতম একটা কারণ ছিল—খোলা গাড়িতে জঙ্গলে ঢোকার লোভ। সেই লোভে পড়ে বাদ গেল বিখ্যাত দুই জলপ্রপাত—বারেহিপানি ও জোরান্ডা। পাহাড় কাটা অসমান লাল রাস্তা দিয়ে গাছের আতিথ্য ছুঁয়ে ছুঁয়ে যখন যাচ্ছি প্রথমটায় নিজেকে মনে হল বুনো-শিকারি; অরণ্য গভীর হলে অজানা গাছের ভিড়ে হয়ে পড়লাম উদ্ভিদবিদ; আর শেষটায় কোনও দিকেই কোনও বৈচিত্র খুঁজে না পেয়ে ভোঁতা হয়ে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলাম বাঘ বা সেই জাতীয় কিছু।


    সিমিলিপালে ভোর, ঘরটিতে রাজহাঁসগুলো রাতে থাকত


    যে গাড়িতে করে আমরা বাঘ দেখতে বেরিয়েছিলাম

    পাহাড়ে অরণ্যে মিলেমিশে কল্পনায় যে রহস্যের জন্ম হয়েছিল রাতে; খররোদে, এই একফালি জংলি রাস্তায় যেতে যেতে দেখলাম তার রুক্ষ রূপ। পাহাড়ের ঢালুতে শাল শিমুলের বন। বেশিরভাগই শাল। রোদের তাপে অর্ধেকের বেশি পাতা গেছে খসে, তবু মাথায় ধরে আছে অনেকটা সবুজ। শাল শিমুলের ভিড়ে দু-একটা খাপছাড়া গাছ সব পাতা ঝরিয়ে নগ্ন কালো পোড়াকপালির মতো তাকিয়ে আছে মেঘের আশায়। বনভূমির বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে গাছের গোড়া ছেয়ে আছে খসখসে পাতায়। সূর্যের আলো পড়ে, সদ্য শুকিয়ে যাওয়া কিছু পাতা ধাতব তামার তৈরি বলে ভ্রম হয়। আর্দ্রতা হারিয়ে এই অরণ্য অঞ্চলটুকু একটা বিশ্রী ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তবু, মাঝে মাঝে শুকনো পাতা ঠেলে মাটি থেকে বুনোগাছ উঠেছে, অল্প কিছু বুনোফুলও ফুটেছে, বেশ কিছু বুনোফুল সুন্দর, ছোট-বড় ঘাসও গজিয়েছে কোথাও কোথাও।

    একদিকে এই রুক্ষ পাহাড়ে শিকড় বাকড় পুঁতে জীবনসঞ্চারের দায় নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই; আর একদিকে উঁচু গাছের ডালে ডালে লাফিয়ে চলা মোটা-লেজের কাঠবেড়ালি, চোখের পলকে পথ পেরোনো সম্বর, উঁকি মেরে লুকিয়ে পড়া ময়ূর আর হিল-ময়নার শিসে মেতে ওঠা অরণ্যের আনন্দের অভিব্যক্তি। দূরের কল্পনা আর কাছের বাস্তব মিলে মাইলের পর মাইল দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’–সিমিলিপাল–এক জীবন্ত প্রাণের আশ্রয়।

    যে অরণ্যভূমি এককালে ময়ূরভঞ্জ রাজাদের রাজকীয় শিকারক্ষেত্র ছিল, যা আজকের পরিমাপে প্রায় দু-হাজার সাতশ পঞ্চাশ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে আনুমানিক খান পঁচিশেক বাঘ নিয়ে বিস্তৃত, সেই অরণ্যের অংশভাগেরও অংশভাগে তখনও বেঁচে ছিল অন্তত একখানা বাঘের দেখা পাওয়ার অদম্য ইচ্ছা।

    বাঘ আমাদের দেখতে আসেনি।

    আশা ক্ষয়িষ্ণু ছিল কিন্তু মৃত নয়। পরদিন সকাল হতেই এক পরিচিত পরিবারকে জিজ্ঞাসা করায় তারা জানায়—বাঘ এসেছিল, তারা দেখেছিল। অরণ্যের এই অসমান আতিথ্যের কথা শোনামাত্র দেবকুণ্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

    ২১ চৈত্র, ১৪৩২

    সিমিলিপাল থেকে উদলা হয়ে দেবকুণ্ড যাওয়ার রাস্তা বেশ মনোরম ও কোমল। ঘণ্টা-খানেকের পথ। দেবকুণ্ডের জন্য নির্দিষ্ট রাস্তায় বাঁক নেওয়ার পর শহুরে ছবিটা বদলে মেঠো হতে লাগল। পথের দু-পাশে রুক্ষ সজীবতা। শুকনো মাটির গভীরে গিয়ে এখানকার গাছগুলো যে প্রক্রিয়ায় রস শুষে খায় বা শুষে খাওয়ার মতো রস পায় তা হয় সিমিলিপালের জঙ্গলে নেই বা সে খবর এখনও সেখানে পৌঁছায়নি। সেখানে গাছের পাতা বিবর্ণ হয়ে পড়ছে আর এখানে পাতা হয়ে উঠছে তৈলাক্ত সবুজ। রাস্তার দু-পাশেই দিগন্তবিস্তৃত ক্ষেতজমি। শ্যামাখুন্টার মতো এখানে জমি পাকা-হলুদ নয়, ন্যাড়া মাথায় চুল গজানোর মতো খোঁচা খোঁচা সবুজে ক্ষেত ভরছে। ক্ষেতের মাঝে মাঝে আল ঘেঁষে, একা একা দাঁড়িয়ে দুটো একটা জমকালো গাছ। কোথাও কোথাও গাছের ছায়ায় পোড়া মাটির টালির চালের ঘর। মাটির দেওয়ালের ঘরও সংখ্যায় গোনার মধ্যে পড়ে। ঘরগুলো একসঙ্গে অনেকগুলো নয়। প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিজের নিজের সংসার। সেই সংসারগুলোর মাঝে মাঝে ছবির মতো দাঁড়িয়ে একাধিক বাঁশঝাড় আর প্রান্তরের প্রান্ত শেষে—বনরাজি।

    এইরকম বেশ কিছু গ্রাম্য পাড়া ছাড়িয়ে এঁকে বেঁকে এগোতে এগোতে হালকা নীল আকাশে সীমানা জোড়া অস্পষ্ট পাহাড়, স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগল। রাস্তার দু-পাশে শাল, শিমুল, বাঁশের ঝাড় আর বয়রার ভিড়ে উঁকি মারতে মারতে পাহাড় যখন পর্দা তুলে বেরিয়ে এল দেবকুণ্ডের অনেক কাছাকাছি তখন পৌঁছে গেছি আমরা।

    দেবকুণ্ডের প্রবেশপথ বলে যেখানে দড়ি টানা হয়েছে সেখান থেকে নিজেদের গাড়িতে যাওয়ার নিয়ম নেই, অনেকের সঙ্গে ব্যাটারি গাড়িতে বাকি পথ যেতে হয়। দেবকুণ্ডের ভেতরের রাস্তা অনেক বেশি লাল, গাছ অনেক বেশি সবুজ। সিমিলিপালের রুক্ষতা এখানে নেই; এখানে ভিজে ভিজে চুলে নতুন বউয়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে এক-জানালা দৃশ্য। সারা রাস্তা জুড়ে একঘেয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সে ডাক বড়ই তীব্র বড়ই তীক্ষ্ণ। গাড়ি যেখানে এসে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলল—বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে, ঝিঁঝিঁ পোকা সেখানেও থামেনি। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ উঠে গেছে পবিত্র দেবকুণ্ডে। স্থানীয় বিশ্বাস মতে আশীর্বাদধন্য কুণ্ডের এই জলেই দেব-দেবীরা স্নানে নামেন।

    উঁচু হাঁটাপথে পড়ল একটা ছোট্ট সেতু। সেতুর তলা দিয়ে দায়িত্ব বুঝে জলের বয়ে যাওয়ার ব্যস্ততা। সেতু টপকে সরু মোটা পাহাড়ি রাস্তা। মাথার অনেক উপরে ঘন সবুজ পাতার রাশি। ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ। সারা পথ জুড়ে আলোছায়া তৈরি করেছে সারিবদ্ধ গাছ, বুনোলতা। পথের একদিকে বিরাট পাথরের চাঁইগুলো হেলে গিয়েও দাঁড়িয়ে আছে, আর একদিকে অগভীর খাদ দিয়ে উপলপথে বয়ে চলেছে মৃদু কলকল শব্দের কাকচক্ষু জল। বৃত্তাকারে অরণ্যে ঘেরা এই দেবকুণ্ডের পথ। এখানে আর ঝিঁঝিঁ ডাকে না। শুধু পাখি ডাকে।

    হুমড়ি খেয়ে পড়া একটা বিরাট শিলাখণ্ডের পাশ দিয়ে, পাহাড়ের ওপরের দিকের জঙ্গলে, সরু হয়ে মিশে গেছে একটানা কয়েক ধাপ সিঁড়ি। ডান হাতে সিঁড়ি রেখে একটু এগিয়ে বাঁ দিকে নেমে গেলেই, বাঘের দেখা না পাওয়ার ব্যথা-পূরণের জলপ্রপাত—অনুচ্চ পাহাড়ের মাথা থেকে, পাথর ভিজিয়ে, ধাপের গায়ে ধাক্কা খেয়ে, ঈষৎ বেঁকে, মোটামুটি ভাবে পড়ে চলেছে। পড়েই চলেছে। সীতাকুণ্ডের মতো দুর্বল নয়, উচ্ছ্বসিতও নয়, ভয়াল তো নয়-ই। তবে একথা বলতেই হয়—শতাব্দীপ্রাচীন এই বুনো-পাহাড়ে, এই চৈত্রেও, প্রাণসঞ্চার করে চলেছে এই ঝর্ণা। ঝর্ণার জলে পাহাড়ের বুকে পাথর গেছে ক্ষয়ে। প্রাণের আনন্দ, কতটা ক্ষয়ের মূল্য দিয়ে কিনেছে পাহাড়, তা সে-ই জানে।

    পাহাড়ের ঠিক মাথায় ঝর্ণার পাশে ছবির মতো দাঁড়িয়ে দেবী অম্বিকার মন্দির। ভক্তিভরে শ-খানেক সিঁড়ি উঠতে পারলেই সেই মন্দিরের প্রবেশ। মন্দিরের একপাশে মেঘচুম্বী পাহাড়। চত্বরে পড়েছে পাহাড়ি গাছের ছায়া। ঘন সবুজ গাছে কখনও কখনও ডেকে উঠছে পাখি। ডালের ফাঁক দিয়ে দিয়ে পাতা নাড়িয়ে বয়ে আসছে বাতাস। পরিমিত ব্যস্ততা নিয়ে, আড়াল থেকে ছুটে এসে, মন্দিরের গা ঘেঁষে, কুণ্ডে ঝরে পড়ছে ঝর্ণা। আদুড় গায়ে জনা তিনেক বালক পরম উৎসাহে খেলে বেড়াচ্ছে চত্বরে। মাঝে মাঝে ঝোলানো ঘণ্টাগুলো, ইচ্ছামতো এলোমেলো ভাবে দিয়ে যাচ্ছে বাজিয়ে। শুদ্ধ স্নিগ্ধ প্রশান্তি ব্যাপৃত হয়ে আছে দেবী অম্বিকার মন্দির ঘিরে।

    মন্দিরের ভেতরে ঢুকে পূর্বাবস্থা গেল কেটে। ঘন অন্ধকারচ্ছন্ন গুমোট গর্ভগৃহ। অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না। অবশ্য ঝকঝকে আলোময় গর্ভগৃহও কোথাও দেখিনি। যে আলো অন্ধকার বাড়ায় গর্ভগৃহে বরাবর সেইটুকুই আলো পেয়ে এসেছি। গর্ভগৃহেই শুনলাম এই মন্দির সতীর একান্ন পীঠের একটি। (হয়তো জনশ্রুতি, হয়তো বা স্থানীয় বিশ্বাস। সতীপীঠের বিভিন্ন প্রকাশিত তালিকায় এই স্থানের উল্লেখ আমি পাইনি; সব তালিকা দেখে এ কথা বলছি এমনটাও নয়।) আরও একবার নতজানু হয়ে প্রণাম করলাম। প্রথমবার না জেনে করেছিলাম। সতীপীঠের প্রসঙ্গে বিস্মিত হলেও, সেই মুহূর্তে, সেই গর্ভগৃহে, কোন অঙ্গ, কোন সূত্র, কতখানি পুরাণ আর কতখানি স্থানীয় বিশ্বাস—এসব নিয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন, সত্যতা যাচাই ও সম্ভাবনা পরিমাপের কোনও চেষ্টাই আমি করিনি।

    চরণামৃত যথেষ্ট মিষ্টি ছিল।


    দেবকুণ্ড যাওয়ার পথে

    মন্দির থেকে নেমে আরেকবার দাঁড়ালাম দেবকুণ্ডের সামনে। পাহাড়ের মাথায় যেখানে ঝর্ণার হইচই দেখতে পাচ্ছি সেখানে কোনও বিস্ময় নেই; ছেদহীন পাহাড়ের অংশগুলো, যেখানে কুণ্ডের জলে আংশিক ডুবে আছে সেখানে হইচই নেই, কিন্তু সব বিস্ময় যেন সেখানেই জমাট বেঁধে আছে। রাতের অন্ধকারে না জানি এই বিস্ময়, কোন স্তব্ধতার ইঙ্গিতে, শতগুণে বেড়ে ওঠে! রাতে তা প্রত্যক্ষের কোনও অবকাশ নেই। রাতের দেবকুণ্ড নিয়ে এক শব্দও বলা আর কল্পনার জাল বোনা, একই। কিন্তু মনের লোভ, বাধাহীন—তাই রাত নামে, জনহীন জঙ্গলে দেবকুণ্ডের মাথায় চাঁদও ওঠে, জ্যোৎস্নারাতে ফুটফুটে আলো এসে পড়ে জলে। নেমে হয়তো আসেন দেব-দেবীরা, করে যান স্নান। আর সেই মুহূর্তে, সেই অরণ্যগভীর নির্জনতায়, কোনও এক কুবো পাখি ভুল করে ডেকে ওঠে—‘কুপ’, ‘কুপ’, ‘কুপ’।

    দিনের আলোয় দেবকুণ্ডের চত্বরে বেশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যালে হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ছবি উঠল। ছবি তুললাম। ছবির মতো দাঁড়িয়ে রইল সবকিছু।

    বৃষ্টি নেমেছিল বাড়ি ফেরার পথে। গাড়ি নির্দিষ্ট বেগে নির্দিষ্ট পথে চলতে লাগল। স্পষ্ট মাঠ ও গাছ অস্পষ্ট হতে থাকল। চলন্ত গাড়ির কাঁচের ওদিকে পাহাড়-অরণ্য গেল পিছিয়ে, কাঁচের এদিকে দূরত্ব বাড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকলাম—দুটোই একসঙ্গে ঘটে গেল। কতখানি ভালোবাসা থাকলে অরণ্যের কাছে আসা যায় তার পরিমাপ আমার কাছে ছিল না, দূর থেকে উন্মাদনা ছিল প্রচুর। এই কাছে দূরের মাঝখানে পড়ে, অরণ্যের নির্ভেজাল নির্জনে খেই হারিয়ে ফেললাম। ভালোবাসা আর উন্মাদনার ব্যাপারটা আগে-পরে হয়ে গেল।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল। আশপাশ যা অস্পষ্ট ছিল তা অদৃশ্যপ্রায় হয়ে উঠল।



    অলংকরণ (Artwork) : ফটো: লেখক
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments