• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • সার্কাসের আলো-আঁধারি জীবন : সৃজা মণ্ডল

    যে জীবন সার্কাসের; — সৌম্য দেব; প্রকাশক— খোয়াবনামা, প্রান্তজনের কথা সিরিজ-৩; প্রচ্ছদ- কুশল ভট্টাচার্য; প্রথম প্রকাশ- পৌষ, ১৪৩২; ISBN: 978-93-94957-79-4

    শীতকাল। কলকাতা শহর, এমনকি মফস্‌সল ও গঞ্জে ফসলি শীতের অপরিহার্য এক দূত ছিল সার্কাস-পার্টি। ম্যাজিক-তাঁবুতে ভরেই তারা বয়ে আনত শীতের যাবতীয় উপকরণ, এলাকার শেষপ্রান্তের মাঠে তারা ঘাঁটি গাড়লেই প্রকৃতি গাছের পাতা ঝরিয়ে ঘোষণা করত— শীত এল। সারা অঞ্চলে পড়ত হলুদ-সবুজ-গোলাপি রঙে ছাপানো পোস্টার। এপাড়া-সেপাড়া ঘুরে বেড়াত জিপগাড়ি। গাড়ির তিনদিকে বড়ো বড়ো কাট-আউট— বাঘের দাঁত খিঁচোনো মুখ, কোমরে রিং ঘোরানো হ্রস্ববাস সুন্দরী তরুণীর নানারকম ছবি। জিপগাড়ির মাথায় বাঁধা দুটো চোঙা মাইক। ফ্ল্যাট ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে ভেসে আসত গমগমে আওয়াজ—
    “আপকে শহর মে পহেলি বাররর... সার্কাস স্কুল ময়দান মে... দেখিয়ে খতরনাক জানোওয়ার কা খেল। রোজানা এক বাজে, চার বাজে ঔর শামকো সাত বাজে। টিকিট পঁচিশ রুপয়া, পঁচাশ রুপয়া ঔর সত্তর রুপয়া। দেখনা না ভুলে এ এ এ এ, শারররকাআআআ শ শ শ শ...।”
    ষাট সত্তর দশক থেকে প্রায় নব্বই দশক পর্যন্ত বাঙালির জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য মনোরঞ্জন ছিল সার্কাস। লেখক সৌম্য দেব সার্কাস পার্টির মধ্যে কাটিয়েছেন অনেকটা জীবন। তাঁর লেখা ‘যে জীবন সার্কাসের’ আশি ও নব্বই দশকের সেই হারিয়ে যাওয়া জীবনের ব্যক্তিগত স্মৃতিকথন। কিন্তু স্মৃতি কি সত্যিই ব্যক্তিগত? ব্যক্তির স্মৃতির ভিতরে সমষ্টির ইতিবৃত্তের জলছাপই কি থেকে যায় না? সৌম্য দেব-এর লেখা এই বই আমাদের এমন এক জগতের সামনে দাঁড় করায়, যাদের দেখে আমরা বিস্মিত হই, হাততালি দিই, আনন্দ পাই, অথচ সেই মানুষদের ব্যক্তিগত জীবন, সংগ্রাম, বেদনা এবং স্বপ্ন সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। সার্কাসের ঝলমলে আলোর আড়ালে যে কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে, এই বই আমাদের হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দেয় সেই অজানা জীবনের সামনে।

    সাধারণ পরিবারের ছেলে সৌম্য দেব-এর জীবন নাটকীয়ভাবে মোড় নিয়েছে অন্য দিকে। এক বছরের মধ্যে মা-বাবাকে হারিয়ে, অনিশ্চয়তা আর একাকীত্বের ভারে রেলস্টেশনে বসে আত্মহত্যার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন তিনি। রেলস্টেশনে খবরের কাগজ বিছিয়ে শুয়ে থাকা এক দরিদ্র মানুষকে দেখে তিনি জীবনমুখী হন। ম্যাজিকের মতো বদলে যায় তাঁর জীবন। এক পরিণত দর্শনের ভাবনায় তিনি ঘুরে দাঁড়ান। “জীবনই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময়। নিজের জীবনের প্রায় শুরু থেকে আলো-আঁধারি পথজোড়া বিস্ময়ই আজও মুগ্ধ আবিষ্ট করে রেখেছে।”— লেখকের এই কথারই অনুরণন পাই তাঁর প্রতিটি লেখায়।

    সৌম্য দেব সার্কাসে যোগ দেন ১৯৮৭ সালে। প্রথম সার্কাস দল জেমিনি। তারপর রেমন, অলিম্পিক, অজন্তা, ফেমাস, মুনলাইট সার্কাসে গিটারিস্ট হিসাবে কাজ করেছেন। কখনো কখনো ম্যাজিশিয়ান হিসেবে রিং-এ ম্যাজিকও দেখিয়েছেন। সার্কাস দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। জড়ো করেছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা। একটানা লেখা কোনও গদ্য নয়। ৪৫টি ছোট ছোট গদ্যের সমাহারে সাজানো এই ব্যক্তিগত স্মৃতিকথন।

    সার্কাসের তাঁবুর ভিতরটা এক রহস্যের দুনিয়া। সার্কাসের টিনের বাউন্ডারির ভিতরে থাকে একটা ছোটো বাউন্ডারি। তার মধ্যে থাকে সার্কাসের অবিবাহিত মেয়েরা। মাঝের অংশে ছোটো ছোটো তাঁবু খাটিয়ে থাকেন ফ্যামিলি ম্যানরা। এই ছোটো তাঁবুগুলিকে ‘রৌটি’ বলে। ম্যানেজার ও অবিবাহিত ছেলেদের থাকার জন্য সার্কাসের তাঁবুর থেকে দূরে আশেপাশের এলাকায় বিভিন্ন গৃহস্থ বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। এক একটা গ্রুপ করে এক এক এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্টাফরা থাকে। সার্কাসে জাতপাতের বেড়া নেই। নেই ধর্মের বজ্র আঁটুনি। এই কথারই প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে রূপদর্শীর লেখাতেও—

    “তোমরা শুধু তো খেলার তাঁবুটাই দ্যাখ। কিন্তু তাঁবু কি একটাই ওঠে? আরো ওঠে। সেগুলো থাকে তোমাদের চোখের অন্তরালে। তাঁবুই আমাদের ঘর বাড়ী, বাসা না পেলে খেলোয়াড়রাও এই সব তাঁবুতে থাকে। এইতো ও হিন্দু, আমি খ্রিস্টান, ও মারাটি, আমি মালাবারী, ওই ট্রাপিজ-অলা বাঙ্গালী, ব্যালান্স-উলিটি চীনে। বল ছোঁড়ে যে সাহেব সে ইহুদী, হাতী-অলা মুসলমান। মোটর সাইকেল সাহাব ফরাসী। লেকিন উ সব, এই জাত আর ধরম আর চামড়ার সওয়াল সব নিজের নিজের পকেটে। তাতে কারোরই মাথাব্যথা নেই। সার্কাসের তাঁবুতে এসে সবাই সার্কাস-অলা, সবাই ইনসান, সবাই মানুষ, ভাই বেরাদর।”
    সৌম্য দেব-এর ‘যে জীবন সার্কাসের’ বইটি শুধু আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ নয়, বরং সার্কাসের নস্টালজিয়াকে ছুঁয়ে দেখা। এটি এমন একটি বই, যেখানে সার্কাস যেন নিজেই এক চরিত্র হয়ে উঠে আসে। স্মৃতির ধুলোমাখা পাতা থেকে জেগে ওঠে অতীতের সরণি দিয়ে হেঁটে যাওয়া নানান টুকরো টুকরো স্মৃতির মালা — যেখানে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রতম ঘটনাও আবেগ ও অন্তর্দৃষ্টির মিশেলে অনন্য।

    লেখক শুনিয়েছেন সার্কাসের জোকার— পটল মাস্টারের কথা। রঙিন পোশাক পরে, নাকে লাল রঙের টেনিস বল লাগিয়ে পটল মাস্টার যখন রিং-এ প্রবেশ করত তখন হাসির হুল্লোড় বয়ে যেত। কিন্তু কজন জানেন যে টেনিস বল লাল রং করে তার একদিকে একটা লম্বা মতো ছিদ্র করা হয়, আর সেটা নাকে চেপে বসিয়ে বানানো হয় জোকারের নাক। মুখে জিঙ্ক অক্সাইড ও সিঁদুর দিয়ে ডিজাইন বানানো হয়। এই লাল বল চেপে বসিয়ে রাখতে রাখতে নাকের দু’পাশে ঘা হয়ে যায়। সার্কাসের দর্শকদের আমোদ দিয়ে অর্জন করা রোজগারে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সাংসারিক খরচ নির্বাহ হয়। ধীরে ধীরে জানতে পারলাম, রঙিন পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জোকারদের জীবনটা আদপেই রংচঙে, উজ্জ্বল নয়, বরং এর বিপরীত মেরুতেই থাকে তারা। পরিচয়হীন-শিকড়হীন-বিত্তহীন-অসহায়।

    আছে মায়ার কথাও। দরিদ্র নেপালি পরিবারের মেয়ে। দালালের হাত ধরে মায়া ও তার মা-বাবা এসে পৌঁছোয় সার্কাসের তাঁবুতে। দালাল বোঝায় দু-তিন বছর খেলা শিখতে পারলে মেয়ের রোজগার হবে মাসে দশ হাজার টাকা। অবাক বিস্ময়ে ট্রাপিজের খেলা দেখতে দেখতে চুক্তিপত্রে টিপছাপ। মায়ার ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা— সব দায়িত্ব সার্কাস কোম্পানির। বিনিময়ে এক বছরের অগ্রিম বেতন। আট-নহাজার টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট মা-বাবা ফিরে যায় অজানা গ্রামে। বছর ঘুরতেই তারা আবার চলে আসেন তাঁবুতে, আগামী বছরের অগ্রিম বেতন নিতে। জানতে পারলাম এভাবেই প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা সার্কাসের মায়াজালে সম্মোহিত হয়ে আসতেই থাকে দিনের পর দিন। সার্কাসের এরিনার মধ্যে সাইকেলের চাকার মতোই পাক খেয়ে চলে সার্কাসের ছেলেমেয়েদের জীবন।

    সাথে আছে নিজের যৌনকর্মী পরিচয় লুকিয়ে ছেলেকে ও পুত্রসম অন্যদের পরম স্নেহে পালন করা মা-এর কথা। সার্কাসের সবচেয়ে নোংরা ঘাঁটা কর্মী বুধনের মধ্যে লেখক দেখতে পেয়েছেন কম্যান্ডার রক্ষাকারীসুলভ সাহস। লেখক পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সার্কাস কোম্পানির হোর্ডিং-এর ছবি আঁকার আর্টিস্ট, সার্কাসের পাহারাদার, ব্যান্ডের লিডার গোরখনাথ-এর সঙ্গে— বিভিন্ন বৃত্তির আড়ালে তাঁরা সবাই আসলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।

    এরকম নানান চরিত্রের মানুষের গল্পে সমৃদ্ধ সৌম্য দেব-এর এই বই। সার্কাসের এরিয়ার বাইরে বিস্তৃত অভিজ্ঞতাতেও তাঁর দেখা ঘটনা এবং চরিত্র অগণন। সার্কাসের প্রচার গাড়ির ড্রাইভারকে শরীর ভাড়া দিয়ে পুরো পরিবারকে সার্কাস দেখানোর টিকিট জোগাড় করা মেয়ে, মাতাল অবস্থায় টাকা চাইতে গিয়ে মার খেয়ে খুন হওয়া আদিবাসী যুবক— বঞ্চনা, লোভ, নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়া অজস্র মানুষের মুখ তিনি দেখেছেন। আবার ১৯৮৪ সালে দিল্লিতে যখন হিন্দুদের আক্রমণ নেমে আসছে শিখদের ওপর, তখন এক সর্দারজি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন লেখককে। এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে লেখক দেখেছেন আলোর করুণা— “যতদিন বাঁচো সবাইকে আপন করে বাঁচো, আনন্দে বাঁচো।” এই বই-এর মধ্যে দিয়ে লেখক অমরত্ব দিলেন এমন বহু মানুষকে যাঁদের জীবন অনাড়ম্বর। নানান প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির মধ্যে দিয়ে উঠে এল বিচিত্র জীবনের আখ্যান— যেখানে শুনতে পাওয়া যায় মানুষের বেঁচে থাকার গল্প, সংগ্রামের গল্প এবং শিল্পের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার গল্প।

    সার্কাসে সবাই ‘খেলওয়ালা’— তাদের না আছে কোনও ইনস্যুরেন্স, না কোনও মেডিক্লেম। এমনকি অ্যাপয়েন্টমেণ্ট লেটারও নেই। অশিক্ষিত মানুষ এসব জানেও না, বোঝেও না। সার্কাসের লাইট জ্বলে উঠলে, ব্যান্ড বাজলে, লোকজনের হাততালির আওয়াজে তাঁদের নীরব অশ্রুপাত ঢাকা পড়ে যায়।

    সার্কাসের আলো-ঝলমলে পরিবেশটিতে চোখ সয়ে যেতে যেতে একদিন দৃষ্টি যায় হাতির পায়ের দিকে। পায়ে লোহার শেকলের দগদগে ঘা। ওই অবস্থাতেই হাতিটি খেলা দেখাতে বাধ্য হয়। মাহুতের হাতের ছড়ির আস্ফালন বড়ো হয়ে ওঠে। সার্কাসের তাঁবুতে আগুন লেগে যাওয়ার বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসে। ঠিক তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, সার্কাস-পার্টির সচেতনতা নিয়ে। বাজার এলাকায় তাঁবু খাটিয়ে তারা কী করে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করতে পারে, তা নিয়ে এলাকাবাসী সরব হতে শুরু করে। বুঝতে শুরু করি, যে আলোয় ছোটবেলার দু’টি চোখ বুঁদ হয়ে থাকত, সেই আলোটুকুই সার্কাসের সব নয়, তার বিপ্রতীপে ঘনিয়ে আছে অজানা এক অনিবার্য অন্ধকার।

    ১৯৯৮ সালে মানেকা গান্ধীর করা মামলায় সার্কাসে জন্ত জানোয়ারদের খেলা বন্ধ করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। হাতির চিৎকার, সিংহের গর্জন চলে যেতেই সার্কাসের আকর্ষণও কমে গেল। শুধুমাত্র মানুষের খেলার ওপর নির্ভর করে সার্কাস দর্শক টানতে ব্যর্থ হল। তাই সার্কাস বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল কর্তৃপক্ষ। সব বন্য জন্তু সার্কাস থেকে চালান হয়ে গেল চিড়িয়াখানায়। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রায় তিনশো সার্কাস কোম্পানি। মুখ থুবড়ে পড়ল শতাব্দী প্রাচীন সার্কাস শিল্প। বেকার হয়ে বিকল্প কাজের সন্ধানে হারিয়ে গেল প্রায় ত্রিশ হাজার কলাকুশলী। একসময় গ্রাম ও শহরের জনপ্রিয় বিনোদন ছিল সার্কাস; কিন্তু টেলিভিশন, ডিজিটাল বিনোদন, প্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং আধুনিকতার অভিঘাতে আজ সেই শিল্পের অস্তিত্ব সংকটে, সংকটে একটি পেশাভিত্তিক সম্প্রদায়।

    সৌম্য দেব-এর এই বই বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতকে মনে করায়। আর জাগিয়ে তোলে এক মনকেমন করা উপলব্ধি, যেখান থেকে লেখকের আক্ষেপ বিদ্ধ করে পাঠকের চেতনাকে—

    “সার্কাসের যুগ শেষ হয়ে গেছে তাঁর সব সুখ দুঃখ আনন্দ বিষাদ, ন্যায় অন্যায় নিয়ে। তবু আমার মনের মধ্যে আজও জীবিত তার অসংখ্য স্মৃতি। যারা কখনও সার্কাস দেখবে না, তাঁদের কাছে এই গল্পগুলো বলতে থাকব। সার্কাসের লোকগুলোর তরফ থেকে বলব ‘মনে রেখো, আমরা ছিলাম। অনেক মানুষকে হাসি আনন্দ রোমাঞ্চ দিতে আমরা নিজেদের দিনগুলি দান করেছিলাম। সেই স্মৃতি আমাদেরও জীবন’।”
    সার্কাস মানে সাহস, ধৈর্য, কষ্টসহিষ্ণুতা। অক্লান্ত অভ্যাস, নিখুঁত সময়বোধ আর নিবিড় একতা— এককথায় এই হল সার্কাস। কিন্তু ‘যে জীবন সার্কাসের’ বইটি কেবল সার্কাসের গল্প নয়; এ যেন বেদনা ও ভালোবাসার এক অনাবিল আলিঙ্গন। এই বই আমাদের শেখায়, আলোয় যাঁরা আমাদের আনন্দ দেন, তাঁদের জীবনেও অন্ধকার থাকে। রূপদর্শীর লেখায় পাই—
    “দুঃখের কথা কি জানো বাবু সাহেব, তোমাদের চোখের উপর হরবখত আছি, কিন্তু দেখতে পাও না আমাদের একজনকেও। তোমাদের নজর তখন তারে, নাচনেওয়ালী জেনানার উপর। আমাদের ঘামে মাটি ভিজে সপসপ আর হাততালি কুড়োচ্ছে খেলোয়াড়রা। সেই অন্ধকারকে চিনে নেওয়াই প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়।”
    লেখকের প্রতিটি স্মৃতি যেন এক-একটি ছোটো গল্পের মতো গড়ে ওঠে। আয়তনে খুব বড়ো না হলেও একটা কালখণ্ডকে লেখক সৌম্য দেব বুনে দিয়েছেন অক্ষরে অক্ষরে। সহজ, সাবলীল নাগরিক গদ্যে বুনে যাওয়া জীবনের গল্পগুলির অনায়াস চলন, যেন সামনে বসে কেউ চমৎকার ভঙ্গিতে হারানো সময়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমরা পাঠকেরা তাঁর মুখোমুখি বসেছি, তাঁর জীবনের গল্প শুনতে।

    সার্কাসের ভিতরে ও বাইরের অদেখা, অজানা জীবনকে উন্মীলিত করার জন্য, সেই ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনার জন্য, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞ থাকব লেখিকা জয়া মিত্র-এর কাছে, যাঁর উৎসাহ ও প্রেরণায় লেখক তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার উজাড় করে আমাদের উপহার দিয়েছেন এই বই। প্রচ্ছদ নান্দনিক। সাধুবাদ জানাব প্রকাশক ‘খোয়াবনামা’কে, যারা অতি যত্ন ও নিষ্ঠায় এই মূল্যবান গ্রন্থটিকে পাঠকের কাছে নিয়ে এসেছেন।

    ব্যক্তিগত স্মৃতির ভিতরে এসে পড়া পুরোনো সময়ের ঝলকে থাকে লেখকের নিজস্ব মত, নিজস্ব বিশ্বাস। ‘যে জীবন সার্কাসের’ অতীত জীবন খুঁড়ে তুলে আনে সেই সব ঠিক-ভুল অঙ্ক! যে জীবনকে আমি দেখিনি, সেই জীবন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সৌম্য দেব-এর এই বই পাঠকের মনে জেগে থাকবে তার অন্তর্নিহিত সত্যের জোরে।

    তথ্য সহায়তাঃ

    রূপদর্শী। ১৩৬০। সার্কাস। কলকাতা: মিত্রালয়

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments