• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • ‘জলের উপর পানি’ — ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বর্তমানের বীক্ষণ : মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়

    জলের উপর পানি; — স্বপ্নময় চক্রবর্তী; প্রচ্ছদ— দেবব্রত ঘোষ; প্রকাশক— দে'জ পাবলিশিং; কলকাতা ৭০০০৭৩; প্রথম প্রকাশ— ডিসেম্বর ২০২১; ISBN: 978-93-92453-87-8

    “আহা পাকস্থলীতে ইসলাম নেই, নেই কো হিন্দুয়ানী, তাতে যাহা জল তাহা পানি”

    (কবীর সুমন)

    ‘জলের উপর পানি’ উপন্যাসটি লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর বাস্তবের মাটিতে নোঙর ফেলা আশ্চর্য স্বপ্নকথন। মূলত হিস্টরিক্যাল ফিকশন; এর পরতে পরতে জমে থাকা ইতিহাস এক ধারাবাহিক সময়ের চালচিত্র অঙ্কন করেছে নানা রঙের তুলির টানে। সময়ের ফসিল থেকে ইতিহাসকে খুঁজে বার করার জন্য ঐতিহাসিক উপন্যাসের চেয়ে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাসপাঠ অনেক শ্রেয়। তবে স্বপ্নময়ের কলম ইতিহাসের সঙ্গে উপন্যাসিক কথনের যে সাবলীল মেলবন্ধন এই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে তুলে ধরেছে তা তাঁর একনিষ্ঠ গবেষণার সুগভীর ফসল, তাতে সন্দেহ নেই। এই লেখকের প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠীর’ বিস্তার। ‘চতুষ্পাঠী’র চরিত্রদের বিস্তারিত উপস্থিতি ছড়িয়ে রয়েছে এই উপন্যাসে। পাশাপাশি অসংখ্য নতুন চরিত্রেরও আনাগোনা লক্ষ করা যায় ‘জলের উপর পানি’ উপন্যাস জুড়ে। মূল চরিত্রদের সঙ্গী হয়ে অগণিত পার্শ্ব চরিত্রের আগমন ঘটেছে কাহিনির সূত্র ধরে, আবার স্বাভাবিক নিয়মে গল্পের বাঁকে বাঁকে তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে মহাকালের পর্দার অন্তরালে। বিরাট পরিসরের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে, চরিত্রগুলির চাহিদা, সঙ্কট, প্রেম, বিরহ, বেদনা সব একাকার হয়ে শেষপর্যন্ত উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে ‘সময়’।

    ‘চতুষ্পাঠী’র শেষ থেকে ‘জলের উপর পানি’-র কাহিনি শুরু হলেও মূলত দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, তেভাগা আন্দোলন ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন স্থান করে নিয়েছে এই উপন্যাসের কাহিনি শরীরে। মূল কাহিনির ভিত্তি দেশভাগ ও তার পরবর্তী দেশ ও মানুষের জীবন। ভিটেমাটি ছেড়ে আসার স্মৃতি মনের মধ্যে জমাট বাঁধা পাথরের মতো চাপিয়ে নতুন করে জীবন শুরুর লড়াই লড়তে গিয়ে, জীবনকে নতুন ভাবে জেনেছিল যে মানুষেরা তাদের সরকারি নাম উদ্বাস্তু। এইসব সব-হারানো মানুষের টিকে থাকার লড়াই-সংগ্রামের সাদাকালো ছবি উপন্যাসটিতে আঁকা হয়েছে অত্যন্ত নির্মোহ ভাষায়। দেশভাগ পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ইতিহাস, দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও ছিন্নমূল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটের এক অদ্ভুত মিশেল স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ক্লাসিক সৃষ্টি ‘জলের উপর পানি’।

    ।। ২ ।।

    দেশভাগ ও তার যন্ত্রণা বাংলা সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ জুড়ে ছড়িয়ে রেখেছে তার বিষাদমাখা দলিল। চেনা মানুষেদের হঠাৎ একদিন অচেনা হয়ে যাওয়া, বিশ্বাসের বিলীয়মানতা আর তার সঙ্গে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট এবং নিজেদের ঘরবাড়ি, সম্পর্ক, সমাজ, কথ্যভাষা, সংস্কৃতি, লোকাচার সবকিছুকে পিছনে ফেলে অনিশ্চিত অজানার পথে হেঁটে চলা বড়ো সহজ কথা নয়। এত কিছুর পরেও আবার জন্মায় বিশ্বাস, আস্থার জলসিঞ্চনে আবার গড়ে ওঠে নতুন সম্পর্ক। ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষের দল নতুন মাটিতে আবার ছড়িয়ে দেয় শেকড়। আবার তারা বাসা বাঁধে। মাথার উপর উন্মুক্ত আকাশ থেকে হোগলার আচ্ছাদন, সেখান থেকে ঢেউ টিনের চাল, তার থেকে পাকা ছাদ, নতুন দেশের নাগরিকত্ব, নতুন কথ্য ভাষা, নতুন আশায় বুক বেঁধে দাঁড়াতে শেখা — এ এক আশ্চর্য জীবন পরিক্রমা। যে সমস্ত পরিবার ও মানুষ এই অনিশ্চিত সময়ের স্রোতে ভেসে গিয়ে খড়কুটোর মতো জীবনকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের জেদ ও সংগ্রামকে আশ্রয় করে শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন, একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কলমের খোঁচা, তাঁদের জীবনকে তছনছ করেছে কিন্তু দমাতে পারেনি। এই উপন্যাস বড়ো বাস্তবোচিত ভঙ্গীতে সেই সব-হারানো মানুষেদের এগিয়ে চলার কথকতা শুনিয়েছে।

    ।। ৩ ।।

    ‘জলের উপর পানি’ ভারতীয় ভূখণ্ডের সেই উল্লেখযোগ্য সময়কে গল্পের মোড়কে উপস্থিত করেছে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটে ছাড়ার যন্ত্রণাকে বুকে নিয়ে অনিশ্চিতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল কেবলমাত্র প্রাণের তাগিদে। গুটিকয়েক মানুষের কথায়, কলমের অভিঘাতে ছিন্নমূল হল যে লক্ষ লক্ষ মানুষের দল, তারা একটা ভাগ হয়ে যাওয়া স্বাধীন দেশের মাটিতে চরম দিশাহারা হয়ে পড়ল। স্বাধীনতার রাত পোহালেই তারা আবিষ্কার করল, তাদের মাথায় ছাদ নেই, ভিটেমাটি নেই, চাষের জমি নেই, পুকুর নেই, নারকেল গাছের সারি নেই, খেজুর গাছে রসের হাঁড়ি নেই, লক্ষ্মীর আসন নেই, বারব্রত নেই, কথ্যভাষা নেই, লোকাচার নেই। এই অসংখ্য ‘নেই’-এর ঘূর্ণির মধ্যে এক চরম সঙ্কটাপন্ন সন্ত্রস্ত জীবনের সামনে এসে দাঁড়ালো গণনাতীত অসহায় মানুষ। শুধু দাঙ্গা ও দেশভাগ, ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় উদ্বাস্তু মানুষের স্রোত, বেঁচে থাকার জন্য তাদের অবিরাম সংগ্রাম, সঙ্গে বিহারের দাঙ্গাই নয়, এই উপন্যাস আরও বিস্তৃত সময়ের মানচিত্র। মুক্তিযুদ্ধ, জরুরী অবস্থা, নকশাল আন্দোলন, বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা, মরিচঝাঁপি, বাবরি মসজিদের ধ্বংস — এই বিরাট টাইমফ্রেমটি ‘জলের উপর পানি’ উপন্যাসটির চরিত্রগুলির মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠে জমিয়ে তুলেছে এক নিটোল গল্পকথার আসর।

    ।। ৪ ।।

    উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র অনঙ্গমোহন চক্রবর্তী ছিলেন এক টুলো পণ্ডিত। ওপার বাংলা থেকে দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে বয়ে এনে, এপারে আচার্য থেকে হয়েছিলেন চায়ের দোকানদার। ভাগ্যের পরিহাসে টুলো পণ্ডিত চায়ের দোকানী হয়েও ভোলেননি তাঁর অধিগত বিদ্যা। কথায় কথায় আওড়াতে থাকেন সংস্কৃত শ্লোক। অভিমানে নিজের বাণভট্ট, কলাপ, পানিনি স্বহস্তে ছিঁড়ে চায়ের স্টোভ ধরান আর বলতে থাকেন, “নে অগ্নি, নে আমার কলাপ, পানিনি, আমার কাব্য, ব্যাকরণ, অলঙ্কার — আমার অহঙ্কার খা। আমি সমিধস্বরূপ এইগুলি দান করতাছি।” বাগবাজারের ভাড়াবাড়িতে আট-দশ ঘর ভাড়াটের সঙ্গে বিধবা বউমা অঞ্জলি, বিধবা নাতনি ও নাতি বিলুকে নিয়ে অতিকষ্টে দিন গুজরান করেন অনঙ্গমোহন। মিত্তিরদের রোয়াকে কোনোরকমে একটি চায়ের দোকানের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। দেশকালের অবস্থা আবার উত্তাল। খাদ্য আন্দোলনে অকস্মাৎ শহিদ হয়েছে নাতজামাইটি। কমিউনিস্ট আন্দোলন দানা বাঁধছে। অনঙ্গমোহনের মনে আশা, ফেলে আসা দেশে একদিন ফিরবেন, দিন বদলাবে। অনঙ্গমোহনের ভাষায়, “এখনো ছিপ ফালাইয়া বৈস্যা আছি আমার গাছপুকুরে। আমার পিতা কানে কানে কয়, ছিপ উডা, ফাতনা নড়ে। আমার হাত বান্ধা, উঠাইতাম পারি না। কী যে কই, দ্যাশের কথা বাইর হয়। এখন ঘরের দেওয়ালে মানচিত্র, নাতি ভূগোল পড়ে। সবুজ রঙ্গের পূর্ব পাকিস্তান। রক্ত পড়ে। ম্যাপের ভিতর থিক্যা রক্ত পড়ে। মাংস খুবলানো রক্ত। আমি মুছি। পানি দিয়া না জল দিয়া?” অনঙ্গমোহনের দেশের জন্য মায়া বেঁচে আছে। স্মৃতিকীট এখনো তাঁকে দংশায়। অনঙ্গ ভাবেন বর্ষার বাতাসে ভেসে বেড়ানো কামিনী ফুলের গন্ধের কথা, কচি লাউলতার বাঁশের কঞ্চির অবলম্বনকে আশ্রয় করে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা, বাড়ির উঠোনে বেল পড়ার শব্দ, খেজুর গাছে হাঁড়ি লাগিয়েছে আমিনুদ্দিন, একটা ইষ্টিকুটুম পাখি গায়ে কুয়াশা মেখে বাঁশের নলি থেকে রস খাচ্ছে। আহা এ সব আর সত্য হবে না কোনোদিন। জীবন তাঁকে এনে এ কোথায় দাঁড় করিয়ে দিল! দীঘির জলের বদলে চৌবাচ্চার জলে কাকস্নান, নৌকার বদলে ট্রাম, চতুষ্পাঠীর বদলে চায়ের দোকান। শুধু জলের পরিবর্তে পানি বলতে না পারার জন্য! মনুষ্যনির্মিত এক প্রাচীর যা তাঁর মতো অগণিত মানুষের কষ্টের মূল, তার নাম ধর্ম।

    ।। ৫ ।।

    ভাগ্যবিড়ম্বিত অনঙ্গ আবার বাস্তুহারা হন। ভাড়াবাড়ির পাট চুকিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন দমদমের এক উদ্বাস্তু কলোনিতে অন্যসব ভিটেহারাদের মতো। উদ্বাস্তু কলোনি জীবনে অনঙ্গমোহনের পরিবার সাক্ষী থাকে তীব্রভাবে বেঁচে থাকার এক অদম্য লড়াইয়ের। প্রফুল্লনগর কলোনির অন্যতম সদস্য দেবনাথের মুখে আমরা শুনতে পাই কলোনির বারমাস্যা। দেবনাথ বলেন, “দ্যাখেন, আমরা কলকাতার শ্যামবাজারে থাকি না। আমরা হইলাম বাস্তুহারা। ছাগল, কুত্তা, মশা, মাছি, কলেরা, বসন্ত এইসব আমাগোর থাকবই। স্বাধীনতাটা তো উপঢৌকন। একখানা মোয়া ধরাইয়া দিসে হাতে। মোয়ার লগে চিটাবালি, কাঁকর, ডোমা সবই থাকে। কারোর যদি আপিত্য হয় কলোনি ছাড়বার পারেন।” হোগলার ছাউনি, কাঁচা নর্দমার পূতিময় গন্ধ, স্যাঁতসেঁতে ঘর আর কাঁচারাস্তা, সব মিলিয়ে একদল মানুষের জীবনে জীবন যোগ করে বেঁচে থাকার নাম হল এই কলোনি জীবন। দেশভাগের অদৃশ্য অথচ অনিবার্য স্রোত এই শহুরে খুপরিতে এনে ফেলেছিল ভিটেচ্যূত মানুষগুলিকে। এখানেই তাদের প্রথম ফুলুরি দর্শন, বেগুনি দর্শন, ছাতু ভক্ষণ, ভোজপুরি ভাষায় হোলি সংগীত শ্রবণ এবং ‘বাঙাল’ সম্ভাষণ উপভোগ। প্রফুল্লনগর কলোনিতে এসে অনঙ্গমোহন যখন দেশের কথ্যভাষায় কথা বলা মানুষদের পেলেন, রয়ানি গানের সুরে শ্রবণ সুখ উপলব্ধি করলেন, তখন অনঙ্গমোহনের অনুভবে জেগে ওঠে তাঁর ফেলে আসা দেশ। তাঁর মনে হয় “এই তো ফালাইয়া আসা দ্যাশ। এইখানেই তো টুকরা টুকরা দ্যাশ।”

    ।। ৬ ।।

    ‘জলের উপর পানি’ উপন্যাসটি অনঙ্গমোহন, তাঁর পুত্র এবং তাঁর প্রপৌত্র বিপ্লব ওরফে বিলুর জীবনকাহিনি শুনিয়েছে এক ধারাবাহিক অস্থির রাজনৈতিক আবহে। সংস্কৃত শিক্ষক অনঙ্গমোহন ছেলের মৃত্যুর পর বিধবা পুত্রবধূর শ্লেষ হজম করেও টিকে থাকেন চায়ের দোকান চালিয়ে। অপর দিকে পুত্রবধূটি স্বামীর চাকরি পেয়ে নিজের সম্মান উপেক্ষা করেও কায়ক্লেশে সংসারকে এগিয়ে নিয়ে চলে সুদিনের প্রতীক্ষায়। অনঙ্গমোহনের নাতি বিলুর চরিত্রটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমকালীন কমিউনিস্ট আন্দোলন ও নকশাল আমলের পটভূমিতে বিলুর বেড়ে ওঠা। এই অস্থির সময় ও দিনবদলের ডাককে উপেক্ষা করে, যেকোনো রাজনৈতিক আদর্শ ও বিলাসিতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে বাধ্য হয়েছিল বিলু, নিজের পরিবারের দিকে তাকিয়ে। কেবলমাত্র জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার লক্ষ্যে সে এগিয়ে গিয়েছে ঠুলি-পরা ঘোড়ার মতো। পরবর্তী সময়ে আবহাওয়া দপ্তরে তার উচ্চপদের চাকরি লাভ, কলোনির অভাবী জীবন থেকে উঠে আসা এক লড়াকু যুবকের তৃপ্তির ঢেঁকুর বলা চলে। অভাব ও নিত্যদিনের সমস্যাবলীর রোজনামচাকে সঙ্গী করে বহু কলোনি থেকেই উঠে এসেছিল বিলুর মতো সাফল্যের নিশান ওড়ানো যুবক-যুবতীরা। প্রতিকূলতা তাদের দমাতে পারেনি, জীবনের কাছে তারা হার মানেনি, বিলু সেই অদম্য, জেদি বাঙালের প্রতিনিধি। আবহাওয়া দপ্তরে বিলুর কাজের সূত্রে এই দপ্তরের কার্যপ্রণালীর এক বিস্তারিত বিবরণ এই গ্রন্থে উঠে এসেছে লেখকের কলমে। এই চাকরির সূত্রে বিলুর জীবনে প্রেম আসে। এক অবাঙালি মুসলিম পরিবেশবিদ উজমার সাথে পরিচয় হয় বিলুর। উজমার পরিবার বিহারের দাঙ্গার বলি হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ একটি ধর্মান্ধ দাঙ্গায় বিধ্বস্ত হয়ে পারিবারিক উত্তরাধিকার বহন করে দেশ বিনিময় করে, তবে সময় আবার ঘটকের মতো তাদের প্রেমের ঘটকালি ঘটায় মানবতার শাশ্বত সুরের সপ্তকে। বিলুর মায়ের পক্ষে পূর্ববর্তী দাঙ্গার বিধ্বস্ত ও উদ্বিগ্ন দিনগুলোর স্মৃতির কারণে একজন মুসলিম পুত্রবধূকে মেনে নেওয়া কঠিন মনে হলেও, ধর্মীয় সত্ত্বা বাদ দিয়ে উজমাকে একজন দরদী মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়ে তিনি তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন।

    ।। ৭ ।।

    এই উপন্যাসে বিশদে এবং বিষাদে বর্ণিত হয়েছে বাংলার ‘নাথ সম্প্রদায়'-এর ব্যথা ও নমঃশূদ্রদের মনঃকষ্ট। কৈলাশ দেবনাথ নামের চরিত্রটি উপন্যাসের এক সমান্তরাল আকর্ষণ হয়ে পাঠককে মুগ্ধ করে রাখে। তিনি হলেন দেশভাগের পটভূমির কথকঠাকুর। পাঁচালির ঢঙে পয়ার ছন্দে তিনি লিখে চলেন তাঁর ‘ছিন্নমূল’ কাব্য। ৪৬-এর নোয়াখালির দাঙ্গা, কংগ্রেস থেকে কমিউনিস্টদের উত্থান, নেহেরু ও জিন্নার নিজের নিজের রাজনৈতিক উচ্চাশা প্রতিষ্ঠার অস্বাস্থ্যকর লড়াইয়ের এক জীবন্ত দলিল কৈলাশের লেখা এই কাব্যটি। আপাতভাবে অসংলগ্ন, ক্ষ্যাপা এই চরিত্রটিকে বাদ দিয়ে এ উপন্যাস অসম্পূর্ণ।

    উপন্যাসের শেষ পরিধিতে, বিলু ও উজমা বাবরি মসজিদের ভাঙনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া দাঙ্গার মধ্যে নিজেদের অনাগত সন্তানকে হারায়। এই পরিস্থিতিতে বিলু ও উজমার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন উপন্যাসটির নামকরণকে সার্থকনামা করেছে। নামগোত্রহীন এক অনাথ শিশুকে বিলু ও উজমা গ্রহণ করে সন্তান হিসেবে। বিলুর মা শিশুটির মধ্যে সাক্ষাৎ নারায়ণকে উপলব্ধি করে বাড়ির নারায়ণ শিলাটি গঙ্গায় বিসর্জন দেন। বিলুর মায়ের এই সিদ্ধান্ত কাহিনিতে এক অসাধারণ মানবিক দ্যোতনা সৃষ্টি করে। মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর আর ধর্ম হল সেই বোধ, যা সকলকে কর্তব্যে স্থির থাকতে শেখায় — প্রেম ও ভালোবাসার মোড়কে এই মানবিক স্লোগানটি স্বপ্নময়ের কলমে সোচ্চারে উঠে এসেছে। উপন্যাসের প্রতিটি কল্পিত চরিত্র পাঠক হিসাবে পাঠককে মুগ্ধ করবে। ইতিহাসের রঙে রাঙিয়ে চরিত্র চিত্রায়নের কঠিন কাজটি লেখক বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।

    ।। ৮ ।।

    স্বপ্নময়ের কলমে খল ও দুষ্ট চরিত্রদের ছাপিয়ে বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে কিছু উদার ও মানবিক মানুষ। নায়ক বিলু ও নায়িকা উজমা সংস্কারমুক্ত সেক্যুলার হিউম্যানিস্ট। ভারতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্রের পটভূমিতে লেখক উপহার দিয়েছেন একদল সুন্দর মনের মানুষের গল্প। এই উপন্যাস, নিপীড়িত মানুষ ও তাদের ফেলে আসা ভিটেমাটির স্মৃতি গন্ধমাখা এক মায়াবী আখ্যান। স্বপ্নময়ের এই কাব্যিক নির্মাণ এক আশার আলোয় ভরা আগামীর কথা শোনায়। এই উপন্যাস যখন পড়তে শুরু করেছিলাম তখন এ রাজ্য জুড়ে চলছে এসআইআর নামক সরকারি কার্যক্রম। লক্ষ লক্ষ নাগরিকের হঠাৎ করে কেবলমাত্র সংখ্যা হয়ে যাওয়া। এদের মধ্যে সকলেই যে আইন বর্হিভূত অনুপ্রবেশকারী নয়, অনেকেই যে আমাদের সহনাগরিক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একই সঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে মনিপুর দগ্ধ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় দু-বছর ধরে। একদিকে মনিপুরী জনতার দুর্বিষহ ক্যাম্প-জীবনের অভিজ্ঞতা, নারীদের সম্মান রক্ষার সংগ্রাম, শিশুদের শৈশব হারানোর অসহায়তা আর অন্য দিকে এনআরসি-র কারণে নাম হারানো মানুষের উদ্বিগ্ন মুখের সারি — ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষের সংকট ও আতান্তরিত দুর্বিপাক আবার ফিরিয়ে এনেছে দেশে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ধর্মের বাড়বাড়ন্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে না বসে, এই আশঙ্কার মেঘ মনে উঁকি দিলেও লেখক স্বপ্নময়ের আশাবাদের কাছেই ফিরতে ইচ্ছে করে বার বার।

    তাঁর দরদী কলম ছিন্নমূলের হৃদয়ক্ষত যেমন মরমী ভাষায় প্রকাশ করেছে, একইভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে শানিয়েছে তাঁর তরবারিসম কলমটিকে। ৪৩১ পাতার উপন্যাস কলেবরে স্ফীত, তবে ইতিহাসপ্রিয় পাঠকের কাছে এ এক মহা-আখ্যান।

    দেবব্রত ঘোষের করা বইটির প্রচ্ছদ ঢেউ টিনের ছাদ সম্বলিত ছিন্নমূল মানুষেদের নিরাভরণ আস্তানা ও কলোনি জীবনের সরল যাপনের নির্মোহ ছবি তুলে ধরে। বইটির বাঁধাই বেশ পোক্ত। ছাপার অক্ষর ও পাতার গুণগত মানও পাঠক-বান্ধব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ আমোদ পেয়েছি পূর্ববাংলার নোয়াখালি ও চট্টগ্রামের কথ্য ভাষার সংলাপগুলি পাঠ করে।

    ‘জলের উপর পানি’ বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বড়ো প্রয়োজনীয় এমন এক উপন্যাস, যা পাঠক মনে চারিয়ে দেয় বিরল অনুভবের রেশ।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments