




‘মিড ডে মিল’ শব্দগুচ্ছটির সঙ্গে তখনও আমাদের পরিচয় হয়নি। তবে সরকারি প্রাইমারী স্কুলে কিছু একটা টিফিন দেওয়ার প্রথা চালু ছিল আমাদের ছোটোবেলাতেও। আশির দশকের গোড়ার দিকের কথা। মনে আছে, আমাদের বলা হত স্কুলে আসার সময় একটা শিশি নিয়ে আসবে। স্কুলে ড্রাম ভর্তি দুধ আসত। ছুটির সময় শিশি ভরে দুধ দেওয়া হত ছেলেমেয়েদের হাতে। সে আমার ক্লাস ওয়ান-এর স্মৃতি। মাস কয়েক পরে দুধ বন্ধ করে শুরু হল পাউরুটি দেওয়া। টিফিন-এর ঘন্টা পড়ার আগেই চা-এর পেটির মতো বড়ো একটা কাঠের পেটি সাইকেলের পিছনে কালো টিউব দিয়ে বেঁধে পৌঁছে যেতেন এক ভদ্রলোক। তাঁর নাম কোনোদিন জানা হয়নি। সবাই তাঁকে পাউরুটি মামা বলতাম। আমি তখন ক্লাস টু। আমার বসার জায়গাটা ছিল দরজার ঠিক সামনে। বেঞ্চে বসে আমি সারাক্ষণ রাস্তা দেখতে পেতাম। মাটির রাস্তা। কী যে ভালো লাগত রাস্তায় লোকজন, টলমলে মাতাল, গরু, ছাগল, পালকি চড়ে নতুন বর-বউ, রিক্সায় হাত-মাইক নিয়ে যাত্রাপালার ঘোষণা, লিফলেট বিলি, বাজার ফেরত সাইকেল, ক্বচিৎ কখনো বাইকের চলাচল এবং আরও কত কী দেখতে! বাউন্ডারিহীন স্কুলের বাড়িটা একদম রাস্তার ধারেই। তাই পথচলতি সব কথারই ভগ্নাংশ স্কুলে ঢুকে পড়ে। আমি কান খাড়া করে শুনি। কখনো বা স্কুলের ভিতরের প্রকাণ্ড কোলাহলে ধাক্কা খেয়ে পথের শব্দ পথেই ফিরে যায়। পাউরুটি দেওয়া চালু হওয়ার পর আমার বাড়তি আকর্ষণ হল, পাউরুটি মামার জন্যে অপেক্ষা। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কখন মামা আসবেন। আমি যে পাউরুটি খেতে ভালোবাসি তা নয়। সব বন্ধুরা টিফিনে পাউরুটি পেয়েই খেতে শুরু করে দিত। কিন্তু আমার সে স্বাধীনতা ছিল না। না-সেঁকা পাউরুটি খাওয়ার অনুমতি ছিল না আমার। তাই আমার ভাগের পাউরুটি আমার সঙ্গে বাড়ি যেত। আমার উৎসাহ পাউরুটি নয়, পাউরুটি মামাকে নিয়ে এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ নিয়ে। ফরসা ছিপছিপে হাসি হাসি মুখ পাউরুটি মামা ব্যস্তসমস্ত হয়ে এসে সাইকেলটা স্কুলের দোরে ঠেসান দিতেন। তাঁকে আমিই প্রথম দেখতে পেতাম। কিড়িং করে সাইকেলের বেল বাজিয়ে জানান দিতেন। অমনি আমাদের দুই মাস্টারমশাই পালটে যেতেন। ওটাই ম্যাজিক। এতক্ষণ ক্লাসে যে বকাঝকা, মারধর, কান্নাকাটি, টেবিলে, হাতে বা পিঠে চাবুক পেটানো ইত্যাদি চলছিল সব মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেত। ক্লাসের ওরই মধ্যে বড়োসড়ো কয়েকটা ছেলেকে মাস্টারমশাই ডেকে নিতেন পাউরুটি নামিয়ে আনার জন্যে। তদারকিতে মাস্টারমশাইরা নিজেরা। ডাক পাওয়া সেই ছেলেগুলো বেশ গর্বের সঙ্গে দু তিনটে করে বড়ো লম্বা পাউরুটি দুহাত দিয়ে আঁকড়ে বুকের কাছে চেপে নিয়ে এসে মাস্টারমশাইয়ের টেবিলে রাখত। তারপর মাস্টারমশাই মাথা গুনে সেদিনের ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বুঝে নিতেন। যতগুলো মাথা, পাউরুটিকে ততগুলো টুকরো করতেন একটা লম্বা ছুরি দিয়ে। সে এক অংক বৈকি! তারপর এক এক করে প্রত্যেক ছেলেমেয়ের কাছে একটা করে টুকরো পৌঁছে দিত মাস্টারমশাইয়ের ডেকে নেওয়া বানর সেনারা। এই পুরো ব্যাপারটা সম্পূর্ণ হতে হতেই টিফিনের ঘন্টা পড়ে যেত। ব্যস। মহাসমুদ্রের কোলাহল মুহূর্তের মধ্যে লম্বা একটা ‘হো’ শব্দে ফেটে পড়ত। স্কুল ছাড়িয়ে আশপাশের পাড়াও জানতে পারত স্কুলে টিফিন হল। হাতে পাউরুটি নিয়ে সবাই হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়ত স্কুল ঘরের বাইরে। কিন্তু সেই ‘হো’ তে ‘হো’ মেলানোয় আমার মা’র কড়া নিষেধ ছিল। আমি তাই নিঃশব্দে ডুব দিতাম সেই মুক্তি সাগরে।
আসলে ছোটোবেলায় স্কুলে যেতে খুব ভয় পেতাম আমি। কারণ, স্কুলের দুই মাস্টারমশাই ছেলেমেয়েদের এত বকাঝকা আর মারধর করতেন, চোখ রাঙাতেন আর সেই সঙ্গে কঞ্চির চাবুকের লাগামহীন ব্যবহার করতেন, আমি ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে যেতাম। মনে মনে ভাবতাম ওই দুই রাগী মাস্টারমশাই কবে যে রিটায়ার করবেন! বাপীর মুখে শুনতাম বাপীর স্কুলের অমুক বাবু রিটায়ার করলেন, তমুক বাবু সামনের মাসে রিটায়ার করবেন। তাই রিটায়ার করা ব্যাপারটা বুঝতাম। কিন্তু রিটায়ার করতে কতটা বুড়ো হতে হয় তার কোনো ধারণা ছিল না। আমি তাই না-বুঝেই মধ্য-তিরিশের দুই মাস্টারমশাইয়ের রিটায়ারমেন্টের খোয়াব দেখতাম। অথচ ক্লাস ফোর-এর পর এই স্কুল ছেড়ে সব ছেলেমেয়েকেই হাইস্কুলে চলে যেতে হবে। আমিও তাই যাব। সেটা কেন যে আমার মাথায় আসত না কে জানে! স্বীকার করি, আমাকে তাঁরা যার-পর-নাই স্নেহ করতেন। কোনোদিন একটু বকুনিও দেননি। তবু সেই ভয়-তরাসীর দেশে তাঁদের স্নেহ, আতঙ্কের বর্ম পেরিয়ে আমার মনকে স্পর্শ করতে পারত না। আমি অপেক্ষায় থাকতাম, পাউরুটি মামা এলেই থেমে যাবে সব শাসন-তর্জন-গর্জন। মাস্টারমশাই পাউরুটি বাঁটোয়ারায় ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। পড়া বলতে না পারার জন্যে তরুণ, সুফল কিংবা মিনতির পিঠে আজ আর চাবুকের বাড়ি পড়বে না। আতঙ্ক থেকে আনন্দে ফেরানোর জাদু লুকোনো থাকত পাউরুটি মামার বাক্সতে। কেউ খেয়াল না করলেও সেটা আমি ঠিক টের পেতাম।
তাই বলে স্কুলে কি শুধু আতঙ্কই ছিল? মোটেই না। মজাও ছিল ঢের। মাস্টারমশাই নাম ডাকার সময় আমি কান খাড়া করে থাকতাম। রবীন কখন “উপুইটি” বলে চেঁচিয়ে উঠবে। হেমন্তর বাবা শহরে থাকতেন। আমাদের সবার “উপস্থিত” বলার মাঝে হেমন্ত “ইয়েস স্যার” বললে আমরা হেসে নিতাম একটু। অঞ্জনা যেদিন ওদের গাছের ডাঁশা কুল আর কাগজে মুড়ে নুন আনত, সেদিন ওকে রানী মনে হত। মিনতি একবার অন্ডাল বেড়াতে গিয়েছিল। সে গল্প প্রায় রোজই একবার করে বলত। ম্যাপ দেখতে শিখিনি তখনও, কিন্তু অন্ডাল নামের সেই জায়গাটা আজও আমার কল্পনার ম্যাপে জ্বলজ্বল করছে। সত্যিকারের অন্ডালের চেয়ে তা ঢের বেশি সুন্দর। ওর মাসতুতো দাদা ওকে ‘পেল্যাট্ফরম’ জুতো কিনে দেবে বলেছিল।
‘পেল্যাট্ফরম’ জুতোটা মিনতির স্বপ্নই থেকে গেল। আমিও সেটা কল্পনায় বাগে আনতে পারতাম না। অঙ্কে তুখোড় কেনারাম কুমোর বাড়ির ছেলে। ওদের পাড়ায় একবার স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাটির জিনিস তৈরি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন মাস্টারমশাইরা। সে দিন এত আনন্দ হয়েছিল কী বলব! আমাদের বন্ধু কেনারাম তার ছোট্ট হাতের জাদুতে চাকে ঘুরতে থাকা কাঁচা তলতলে কাদা দিয়ে মুহূর্তে গ্লাস বানিয়ে দেখাল। আমরা হাততালি দিয়ে উঠলাম। সারা পাড়া জুড়ে কেউ টালি বানাচ্ছে, কেউ হাঁড়ি, কেউ পুজোর ঘট, কেউ আগুনের ঢিপিতে সেই সব জিনিস পুড়িয়ে পাকা করছে। সে এক মস্ত কর্মকাণ্ড। ছোটোবেলায় আমি আকাশবাণীতে অনুষ্ঠান করতাম। যেদিন তা দুপুরে ব্রডকাস্ট হত আমাদের মাস্টারমশাইরা একটা রেডিও জোগাড় করে স্কুলদোরে চালিয়ে দিতেন। স্কুলের সব ছেলেমেয়েরা সেই রেডিওকে ঘিরে বসে অনুষ্ঠান শুনতাম। সেদিন বন্ধুদের কাছে আমার বাড়তি কদর।
কোনোদিন ক্লাসের মধ্যে হঠাৎ করে লক্ষ্মীকান্ত বলে উঠল, “মাস্টারমশাই, কানাই করে ফেলেছ।” আহা, কী আনন্দ! দুর্গন্ধ সামনের বেঞ্চ অবধি পৌঁছোনোর আগেই মাস্টারমশাই ঘোষণা করে দিতেন, “যাও, আজ তোমাদের ছুটি।” স্কুলে কোনো শৌচালয় ছিল না। ছোট্ট সব মানুষ! কী বা করে! তাই এমন হিসেব-বহির্ভূত ছুটি আমরা পেতেই থাকতাম। আর খুব যেদিন বৃষ্টি হত টালির ফুটো দিয়ে জল নেমে আসত ঘরে। টপ টপ করে পড়তে পড়তে বৃষ্টি দখল করে নিত সব বেঞ্চ। উপায়ান্তর না দেখে বৃষ্টির দাপট একটু কমলেই মাস্টারমশাই বলতেন, “যাও, ছুটি। বাড়ি চলে যাও।” সঙ্গে সাবধানবাণী, “সোজা বাড়ি যাবে, অন্য কোথাও না। কোনো পুকুরে নামবে না।” বৃষ্টির মধ্যে ছপছপ আওয়াজ করে আমরা মহানন্দে বাড়ি ফিরতাম। পুকুরে নামতে বারণ করেছেন মাস্টারমশাই, কিন্তু রাস্তায় জল ঘাঁটতে তো বাধা নেই! তাই মাটির রাস্তা বেয়ে গড়িয়ে আসা সব জলস্রোতকে ছোটো দু’পায়ে বাধা দিতে দিতে দু মিনিটের পথকে দশ মিনিটে দীর্ঘায়িত করে ফেলতাম আমরা। সব গাছপালা স্নান করে ঝকঝকে হয়ে গেছে। ব্যাঙগুলোও আনন্দে ভিজে রাস্তায় বেড়াতে বেরিয়েছে। যারা বেরোয়নি, তারা ঘরে বসেই গ্যাঁ গোঁ করে ডাকতে শুরু করেছে। বাঁশগাছের ঝাড়টা যেন আরও বিনয়ী হয়ে ঝুঁকে পড়েছে। বাঁশতলা পেরোলেই খিড়কি পুকুরের ঢালে কচুবন। শুকনো দিনে কেই-বা তাকায় তার দিকে। কিন্তু বৃষ্টির জল সাদা চকচকে মার্বেল হয়ে যেন আজ তাদের তালুর ওপর খেলা করছে। সে এক মজার দৃশ্য। রাস্তা থেকে একটু নেমে ওদের নাড়িয়ে দিই। টলমল করে ওঠে কচুপাতার ওপর জলের গুলি। আর আমাদের বন্ধু গোপীনাথ সঙ্গে থাকলে পুকুর থেকে উঠে আসা এক আধটা কইমাছ খপ করে ধরে ফেলবেই। মাছ ধরায় ওর অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। বৃষ্টির আনন্দে রাস্তায় উঠে আসে শামুকও। এক পুকুর থেকে পাশের পুকুরে যেতে তার হয়তো কয়েক ঘন্টা লেগে যাবে।
আমার দিদি যখন ছোটো ছিল প্রাইমারী স্কুলে তখন খিচুড়ি খাওয়ানো হত। হয়তো সকলকে নয়। যারা বাড়ি থেকে খেয়ে আসতে পারে, তাদের জন্যে নয়। তাই দিদি বাদ। শুনেছি স্কুলে খিচুড়ি খাওয়ার জন্যে দিদি নাকি একদিন বাড়িতে খুব বায়না করতে থাকে। বাপী হেডমাস্টারমশাইকে সে কথা বলায় উনি খুশি হয়েই ওঁর নয়নের মণি ফার্স্ট গার্লকে পরদিন খিচুড়ি খাওয়ার জন্যে থালা আনতে বলেন। দিদি পরদিন আনন্দে আটখানা হয়ে বইখাতার সঙ্গে একখানা থালা নিয়ে স্কুলে যায়। কিন্তু থালায় খিচুড়ি দেওয়ার পরেই বৃষ্টি নামে। স্কুলঘরের ফুটো চাল থেকে জল পড়তে থাকে। জল পড়ে দিদির গায়ে মাথায়, খিচুড়ির থালায়। আহা এত শখ! পূরণ হওয়ার পথে কী বিপত্তি! আমার ছোট্ট দিদি সেদিন নাকি মহার্ঘ্য খিচুড়ির থালাটি হাতে নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে বাড়ি চলে আসে। স্কুল থেকে আমাদের বাড়ি দৌড়ে এলে এক-দেড় মিনিট লাগে। স্কুলে রইল পড়ে তার বই খাতা, যা পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এসব আমার জ্ঞান হওয়ার আগের কথা। তবে শুনতে শুনতে মনে হত আমি দিদিকে খিচুড়ির থালা হাতে দৌড়তে দেখেছি।
আমাদের পাড়ায় মান্তাপিসি ছিল এক মজার মানুষ। ক্লাস থ্রি অবধি স্কুলে গিয়েছিল। তাও প্রতি ক্লাসে দু’বছর করে থেকে। জীবজন্তু আর পোষ্যদের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ছিল মান্তাপিসির। ওদের পোষা গরুর পিঠে ওকে শুয়ে থাকতে দেখেছি কতদিন। গরুটাও অনন্ত আস্কারা দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত মান্তাপিসিকে পিঠে নিয়ে। গাছে চড়া মান্তাপিসির কাছে হাঁটাচলার মতোই সহজ ব্যাপার। ওকে খুঁজে পাওয়া না গেলে সবাই আশপাশের গাছপালার ডালেও একবার চোখ বোলাত। গাছের ডালে শুয়ে কতবার মান্তাপিসি ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের ঘোরে গাছ থেকে পড়েও গেছে এক-দু’বার। এ হেন মান্তাপিসি নাকি একদিন ভোরে উঠে গলা ছেড়ে পড়া মুখস্থ করছে। ক্লাস থ্রি তখন ওর। ওর পড়ার শব্দে পাশের বাড়ির জ্যেঠুর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি উঠে তাঁর মেয়েদের ডেকে তুলে বকাঝকা শুরু করেন, “দ্যাখ, মান্তা কেমন ভোরে উঠে পড়তে বসেছে, আর তোরা ঘুমোচ্ছিস!” এমন কথা শুনে অবাক হয় তাঁর মেয়েরা। তারা জানলার ধারে গিয়ে কান পেতে শোনে মান্তা কী পড়ছে। মান্তাপিসির সেই পড়ার গল্প আমি ছোটোবেলায় পাড়ার সকলের মুখে এতবার শুনেছি, যে আমারও তা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। মান্তাপিসি দুলে দুলে সুর করে পড়া মুখস্থর ঢঙে বলেছিল “আমি আজ ইস্কুলে যাব। সঙ্গে একটা থালা নিয়ে যাব। ইস্কুলে খিচুড়ি দেবে। গরম গরম খিচুড়ি খাব। বাড়ি থেকে ডিম ভাজা নিয়ে যাব...।”
যে সময় গ্রামের বাবা-মা’রা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে বিশেষ একটা মাথা ঘামাতেন না, সে সময়ও আমার মা-বাপীর মাথা ঘেমেই থাকত। তাদের অতিসতর্ক অভিভাবকত্ব আমার স্বাধীনতায় বাধ সাধত। সেসব কথা কোনোদিন কাউকে বলতে পারিনি। ক্লাস ওয়ান-এর প্রথম পরীক্ষা। হাফ-ইয়ার্লি। বন্ধুরা বলত ‘হাপিয়ালি’। সেবার প্রশ্নপত্রেই উত্তর লিখতে হবে। এ কথা আগে কেউ বলেনি। লিখতে গিয়ে মনে হল এইটুকু জায়গায় কী করে লিখব! আর সেই অসন্তোষ থেকেই হয়তো একটু করে লিখি, পছন্দ হয় না, কেটে দিই। আবার পাশে নতুন করে লিখি। পরীক্ষার শেষে দেখলাম আমার খাতা জোড়া কাটাকাটির জঙ্গল। এই খাতা দেখলে মা তো খুশি হবে না! যাকগে, খাতা বেরোতে তো দেরি আছে। ততদিন নিশ্চিন্ত। বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। বিকেলে ঘুম থেকে উঠতেই মা বলল, “পরীক্ষার খাতায় অত কাটাকাটি করেছ কেন?” আমি অবাক! মা কী করে জানল! “জল আনতে গিয়েছিলাম, অলোকের সঙ্গে দেখা হল, অলোকই বলল!” আমাদের স্কুলের পাশে যে টিউবওয়েলটা ছিল ওখান থেকে গ্রামের এদিকের সবাই জল ভরে। মা-ও কলসী ভরে জল আনত রোজ বিকেলে। আর স্কুলের দুই রাগী মাস্টারমশাই বাপীর ছাত্র ছিলেন। তাঁরা তাঁদের গুরুকন্যার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে চলেছেন। বুঝলাম, সব খবর ঝড়ের গতিতে মা-বাপীর কাছে এসে পৌঁছোবে। অতএব আমার যা-খুশি-তাই ইচ্ছেগুলো সেদিন থেকে কিছুটা ডানা গুটিয়ে ফেলল।
রাগী রাগী অলোক মাস্টারমশাই আর বদ্যি মাস্টারমশাইকে ক্লাস থ্রি-এর জানলা থেকে একদম অন্যরকম লাগত। আমি তখন উঁচু ক্লাস। তাই অন্য ঘর। সেই ঘরের পশ্চিমের জানলার ধারে বসি। পাশেই রতনকাকাদের বাড়ি। ফাঁক পেলেই জানলা দিয়ে রতনকাকাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকি। সামনেই ওদের রান্নাশালা। বাঁশের খুঁটির ওপর টালির ছাউনি আছে, কিন্তু দেয়াল নেই। কাঠের উনুন গনগন করে জ্বলছে। মাটির হাঁড়িতে ভাত ফুটছে। কালো কুটকুটে কড়াইতে তেলে সবজি ছাড়ার চ্যাঁ করে আওয়াজ। কখনো ওদের মশলা ভাজার গন্ধে আমাদের ক্লাসসুদ্ধ সবার কাশি পায়। মাঝে মাঝে দেখতাম আমাদের দুই মাস্টারমশাই ওদের রান্নাশালের ধারে টুলে বসে রতনকাকা, তার ভাই মদনকাকা আর গোরা কাকার সঙ্গে গল্প করছেন। কোনোদিন দেখতাম উনুনের জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ বের করে মুখের কাছে এনে বিড়ি ধরাচ্ছেন, চা খাচ্ছেন, হেসে হেসে খোশগল্প করছেন কমলপিসির সঙ্গে। মাস্টারমশাইদের এ হাসি আমি স্কুলের মধ্যে তো কোনোদিন দেখিনি! স্কুলে ঢুকলেই সে হাসি কোথায় হারিয়ে যেত কে জানে!
রতনকাকাদের বাড়ি ছাড়িয়ে বিশাল দিঘির মতো আমাদের বড়ো পুকুর। তার পাড়ে হিজল আর করঞ্জার বন। আমি তাকিয়েই থাকি জানলা দিয়ে। রতনকাকা আমাদের কেউ নয়। তবু জ্ঞান হওয়ার পর থেকে জানি মা-বাপীর পর আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ রতনকাকা। মা-বাপী ছাড়া আমাদের এত ভালো হয়তো আর কেউ বাসেনি। স্কুলের গায়েই ওদের বাড়ি হলেও কোনোদিন স্কুলে যায়নি রতনকাকা। তাতে কী! হৃদয়খানা ছিল মস্ত বড়ো। চাষবাস করেই দিন চলত। আর নিজেকে উজাড় করে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসত আমাদের তিন ভাইবোনকে। কাকার কোলেপিঠে আমাদের বড়ো হওয়া। আমাদের সব সাফল্য যেন কাকার নিজেরই সাফল্য। কাকাকে একদিন না দেখতে পেলে আমরা তিন ভাইবোন অস্থির হয়ে উঠতাম। ক্লাস থ্রি’র জানলা দিয়ে আমি মাঝে মাঝেই কাকাকে দেখতে পেতাম। আমার কাছে ওটা ছিল আনন্দ-জানলা।
আমার মা নিজে খেলাধুলোয় খুব ভালো হলেও আমাদের বিশেষ উৎসাহ দিত না। পরিবর্তে বাড়িতে একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে দিয়েছিল তিন ভাই বোনের জন্যে। মা-বাপী নিজেরাও তার অংশ। রুটিনে বাঁধা জীবনে গান, আবৃত্তি, তবলা, নাটক ভরপুর থাকলেও ছিল না খেলাধুলো। স্কুলে বন্ধুরা খেলতে নিলেও চোখে চোখে ইশারা করে নিত। আমি বুঝতাম খেলার মাঠে আমি একদম এলেবেলে। আজ যখন পাহাড়ে চড়ার নেশা আমায় টেনে নিয়ে যায় দুর্গম উচ্চতায়, মনে হয় ছোটোবেলার সেই এলেবেলে মেয়েটার অপূর্ণ সাধগুলোকে আমি যেন খুঁজে পাচ্ছি পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে, খাদের কিনারে, পাহাড়ি ঝর্ণার পাগলামিতে।
আমাদের ইস্কুলের পরীক্ষার সময় কারও কারও দাদা-দিদি জানলা দিয়ে ফিসফিস করে ভাই বোনদের উত্তর বলে দেওয়ার চেষ্টা করত। আমার দাদার ক্লাস ওয়ান-এর প্রথম পরীক্ষার দিন, ভাই কী করছে দেখার জন্যে আমার দিদি নাকি জানলা দিয়ে একবার উঁকি দিয়েছিল। ব্যস! দাদা সেটা দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল, “মাস্টারমশাই, আমার দিদি আমাকে জানলা দিয়ে উত্তর বলে দিতে এসেছে।” এমন অভিযোগ শুনে মাস্টারমশাই নিজেই অবাক! ভাই-এর ফাটানো বোমায় দিদি তখন দৌড়ে পালানোর পথ পায় না। আমার ক্লাসের রমাকে ওর বাবা প্রত্যেক পরীক্ষায় ক্লাসের ভিতরে এসে ওর পাশে বসে উত্তর বলে দিতেন। ভারি রাগ হত আমাদের। রমার বাবা মাস্টারমশাইদের বন্ধু। তাই তাঁরা কিছু বলতে পারতেন না। বরং না-দেখার ভান করে মাস্টারমশাইরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন। আমার তাই প্রতিবছর পরীক্ষার সময় কী ভীষণ দুশ্চিন্তা হত। এবার নিশ্চয়ই রমা ফার্স্ট হবে। আমার প্রতিযোগিতা তো রমার সঙ্গে না, রমার বাবার সঙ্গে। কিন্তু রমা কোনোদিনই ফার্স্ট হতে পারেনি। সেটা আমার কাছে আজও রহস্য!
দেখতে দেখতে চারটে বছর শেষ হয়ে আসে একদিন। ততদিনে ভয় কেটে গেছে। বুঝতে শিখেছি, স্কুলের তিনজন মাস্টারমশাই দুটি মাত্র ঘরে পাঁচটি ক্লাসের এতগুলো কচিকাঁচাদের কত কষ্ট করে সামলান। অনুভব করতে শিখেছি মাস্টারমশাইদের স্নেহের উষ্ণতা। তাঁরা আমায় নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, আমি একদিন বৃত্তি পাব। রাজ্য মেধা-মানচিত্রে স্কুলের নাম লেখা হবে। দিদি পেরেছিল। বোনকেও পারতে হবে। মন কেমন করতে থাকে প্রাইমারী স্কুল ছেড়ে দূরে বড়ো স্কুলে চলে যেতে হবে ভাবলেই। যেতে তো হবেই। মাস্টারমশাইদের ভালোবাসার ঋণ শোধ হওয়ার নয়। ক্লাস ফোর-এর বৃত্তি পেয়ে যেদিন মাস্টারমশাইদের প্রণাম করতে গিয়েছিলাম, আনন্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে আদরে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা আমায়। সেই আমার শেষবার যাওয়া। আমার শৈশবস্মৃতির ঝাঁপিতে পরম যত্নে আগলে রেখেছি আমার পড়ো-জীবনের প্রথম চারটে বছরকে। আমার বয়স এগোয়, পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমার স্মৃতির বয়স। তবু হাওড়া জেলার ‘দেবীপুর রায়চক বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়’ সেরকমই থেকে যায়। আজও চনমনে সেই স্মৃতি! সে যে আমার মিঠে-কড়া আনন্দ পাঠশালা! মনে হয় এক্ষুনি টিফিনের ঘন্টা পড়বে। ‘হো’ শব্দে ফেটে পড়বে কচিকাঁচারা। মা’র কথার অবাধ্য হয়ে আমিও ‘হো’ তে ‘হো’ মেলাব। একবার। গলা ছেড়ে।