



দেশ — দেবীপ্রসাদ সিংহ; প্রচ্ছদ— সুপ্রসন্ন কুণ্ডু; প্রকাশক— কেতাব-ই, কলকাতা, ৭০০০১০; প্রথম প্রকাশ— নভেম্বর ২০২৪; ISBN: 978-81-977121-1-1দেবীপ্রসাদ সিংহের ‘দেশ’ উপন্যাসের সূচনায় রয়েছে সাহির লুধিয়ানভি-এর বিখ্যাত পঙ্ক্তি—
ওহ আফসানা জিসে আনজাম তক লানা না হো মুমকিন, উসে এক খুবসুরত মোড় দেকর ছোড়না আচ্ছা।অর্থাৎ, যে গল্পকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাকে একটি সুন্দর মোড় দিয়ে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
প্রথম দর্শনে এটি হয়তো একটি প্রেমের উক্তি বলেই মনে হয়। কিন্তু দেশ উপন্যাসের প্রেক্ষিতে এই কয়েকটি পঙ্ক্তির মাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে “আফসানা” কেবল কোনো প্রেমকাহিনি নয়; এটি একটি দেশ, একটি সময়, একটি ইতিহাস, একটি ভাঙা স্বপ্ন কিংবা মানুষের অস্তিত্বসংকটের রূপক। যে গল্প পূর্ণতা পায় না, যার কোনো নির্ভুল পরিণতি নেই, যার সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না— সেইসব গল্পকেই দেবীপ্রসাদ গ্রহণ করেছেন তাঁর উপন্যাসের বিষয় হিসেবে।
সাহিত্যে আমরা প্রায়ই একটি পরিণতির প্রত্যাশা করি। মনে করি, প্রতিটি গল্পের শেষ আছে, প্রতিটি যাত্রার নির্দিষ্ট গন্তব্য। কিন্তু বাস্তব জীবন আমাদের অন্য শিক্ষা দেয়। অনেক সম্পর্ক, অনেক স্বপ্ন, অনেক আদর্শ কিংবা অনেক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন এমন এক জায়গায় এসে থেমে যায়, যেখানে তাকে আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। সেই থেমে যাওয়া সবসময় পরাজয় নয়; অনেক সময় সেটিই জীবনের সবচেয়ে সত্য মুহূর্ত। সাহির লুধিয়ানভির এই পঙ্ক্তি সেই জীবনদর্শনেরই কাব্যিক প্রকাশ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ উপন্যাসকে পড়লে বোঝা যায়, লেখক শুরুতেই এই পঙ্ক্তিগুলির মধ্যে দিয়ে পাঠককে প্রস্তুত করে দিচ্ছেন। যেন জানিয়ে দিচ্ছেন— এই উপন্যাসে সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে না, সব চরিত্র তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাবে না, সব ক্ষতের উপশমও ঘটবে না। কারণ ইতিহাসের মতো জীবনও সবসময় পূর্ণবৃত্ত নয়; তার ভেতরে থেকে যায় ছিন্ন অধ্যায়, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা এবং অনিবার্য বিচ্ছেদ।
বিশেষত যদি ‘দেশ’ উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকে দেশভাগ, সীমান্ত, বাস্তুচ্যুতি, পরিচয়ের সংকট, রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা মানুষের ভাঙাচোরা স্বপ্ন, তবে সাহির লুধিয়ানভির এই এপিগ্রাফ আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। তখন “আফসানা” হয়ে ওঠে একটি সভ্যতার গল্প; একটি ভূখণ্ডের গল্প; এমন এক ইতিহাসের গল্প, যার কোনো সম্পূর্ণ সমাপ্তি আজও লেখা হয়নি। রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি, ভালোবাসা, হারানোর বেদনা কিংবা পরিচয়ের সংকট কখনোই নির্দিষ্ট শেষবিন্দুতে পৌঁছায় না। ‘দেশ’ উপন্যাসের শুরুতে এই পঙ্ক্তির উপস্থিতি কেবল নান্দনিক নয়; এটি উপন্যাসটির পাঠপদ্ধতিও নির্ধারণ করে দেয়। পাঠককে শুরু থেকেই মনে করিয়ে দেয় যে এই কাহিনির মূল্য তার পরিণতিতে নয়, বরং তার অসমাপ্ত যাত্রায়। এখানেই এই এপিগ্রাফের সাহিত্যিক শক্তি। এটি আমাদের শেখায়— সব গল্পের শেষ হয় না; আবার সব অসমাপ্ত গল্পও ব্যর্থ হয় না। কখনো কখনো অসমাপ্ততাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে মানবিক এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমাপ্তি।
দেবীপ্রসাদ সিংহের ‘দেশ’ উপন্যাসের গভীরে প্রবাহিত হয়েছে দেশভাগের ইতিহাস। কিন্তু দেবীপ্রসাদ ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবেই লিখতে চাননি। তিনি জানেন, দেশভাগ কেবল রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়; এটি মানুষের মনের ভেতর বহু প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকা এক ভূমিকম্প। যে ভূমিকম্পের কম্পন শেষ হয়ে গেলেও তার ফাটল রয়ে যায় স্মৃতিতে, ভাষায়, সম্পর্কের ভিতরে, এমনকী স্বপ্নের মধ্যেও। তাই ‘দেশ’-এ দেশভাগ কখনও দলিল নয়, কখনও পরিসংখ্যান নয়; এটি এক অন্তহীন মানসিক প্রতিধ্বনি। এই উপন্যাস এমন এক উপন্যাস, যার ভেতরে প্রবেশ করা মানে কোনো কাহিনির মধ্যে প্রবেশ করা নয়; বরং এক দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিলোকের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া। সেখানে সময় সরলরেখায় প্রবাহিত হয় না, ইতিহাস কেবল ঘটনাপঞ্জি হয়ে থাকে না, আর দেশ কোনো স্থির ভূখণ্ডের নাম নয়। বরং সবকিছুই যেন ভেসে ওঠে কুয়াশার আবরণে— কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্পষ্ট; কখনও বাস্তব, কখনও স্বপ্নের মতো অলীক।
২০১৪ সালে প্রকাশিত প্রথম পর্বে উদ্বাস্তুজীবনের স্মৃতি ছিল আখ্যানের প্রধান অবলম্বন। পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল হয়ে আসা মানুষের বেদনা, হারিয়ে যাওয়া বাড়ির নস্টালজিয়া, শেকড়হীনতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা— এসবের মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়েছিল এক স্মৃতিনির্ভর জগৎ। কিন্তু ২০২৪-এর পূর্ণাঙ্গ দেশ সেই অভিজ্ঞতাকে সরাসরি পুনরুক্তি করেনি। বরং লেখক এখানে ইতিহাসের শরীরে ফ্যান্টাসি, জাদুবাস্তবতা এবং বহুস্বরিক কল্পনার রক্তসঞ্চালন ঘটিয়েছেন। ফলে এই উপন্যাসে কোনো একক সত্য নেই; আছে সত্যের অসংখ্য প্রতিরূপ, অসংখ্য সংস্করণ, অসংখ্য পুনর্নির্মাণ। এই কারণেই ‘দেশ’ মূলত স্মৃতি ও ইতিহাসের নির্মাণপ্রক্রিয়ার উপন্যাস। এখানে সত্য অপেক্ষা সত্যের নির্মাণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতি কখনও নির্ভুল নয়; বরং স্মৃতি নিজেই কল্পনার সাহায্যে অতীতকে পুনর্গঠন করে। দেবীপ্রসাদ সেই নির্মাণের জায়গাটিকেই শিল্পে রূপ দিয়েছেন। ফলে পাঠক বার বার প্রশ্নের মুখোমুখি হন— যা ঘটেছে, তা-ই কি সত্য? নাকি যা মনে রাখা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্য হয়ে ওঠে?
দেবীপ্রসাদ সিংহ তাঁর উপন্যাসে এমন এক রূপকথার নির্মাণ করেন, যার ভিত গড়ে ওঠে ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের স্বপ্ন, ভয়, বঞ্চনা এবং প্রতিদিনের সংগ্রামের বাস্তব মাটি দিয়ে। তাঁর কল্পনার জগৎ কখনও বাস্তব থেকে পালিয়ে যায় না; বরং বাস্তবের ধুলো, কাদা, রক্ত আর ঘামে মিশে নতুন এক সাহিত্যভাষা নির্মাণ করে। ‘দেশ’ উপন্যাসে আমরা দেখি সীমান্তের ওপর থমকে থাকা সেই মানুষের জীবন যার পা যেন এক অদৃশ্য রেখার উপর আটকে আছে। চারপাশের সাধারণ মানুষই তাঁর এই উপন্যাসের চরিত্র— যারা প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে, অপমান সয়, প্রতারিত হয়, তবু হাল ছাড়ে না। তাঁদের মুখে তিনি এঁকে দেন বঞ্চনার রেখা, ক্ষোভের আগুন এবং অসহায়তার দীর্ঘশ্বাস।
দেবীপ্রসাদ সিংহ তাঁর ‘দেশ’ উপন্যাসে পাঠককে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করান, যেখান থেকে অর্জুন ও রজব, হিন্দু ও মুসলমান, এপার ও ওপার— সব বিভাজন একসময় অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন মানুষের পরিচয় ধর্মে নয়, রাষ্ট্রে নয়; কেবল তার বেঁচে থাকার সংগ্রামে। আলো-অন্ধকার, শব্দ-নীরবতা এবং দৃশ্যের দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে তাঁর উপন্যাস যেন ক্যামেরার চোখে নির্মিত এক চলমান চলচ্চিত্র, মানুষের বেঁচে থাকার নির্মম, অথচ গভীর মানবিক মহাকাব্য।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় মোটিফ অর্জুন ও রজব আলির দেহ-বিনিময় এই প্রশ্নকেই আরও জটিল করে তোলে। বিস্ফোরণে মৃত অর্জুনের আত্মা আশ্রয় নেয় রজব আলির শরীরে। এই অলৌকিক ঘটনাকে দেবীপ্রসাদ নিছক আখ্যানগত চমক হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং এটি হয়ে উঠেছে উত্তরপূর্ব ভারতের অনুপ্রবেশ-রাজনীতি, নাগরিকত্বের সংকট এবং বাঙালি উদ্বাস্তু-অভিজ্ঞতার এক শক্তিশালী রূপক। একটি দেহে অন্য একটি পরিচয়ের বসবাস— এই চিত্রকল্প যেন সমগ্র উপমহাদেশের ইতিহাসকেই ধারণ করে। রাষ্ট্র মানুষকে নাম, ধর্ম, কাগজ ও সীমানা দিয়ে চিহ্নিত করতে চায়; অথচ মানুষের জীবন অনেক বেশি তরল, অনেক বেশি জটিল। অর্জুন ও রজব আলির এই পরস্পরবিনিমেয় অস্তিত্ব যেন রাষ্ট্রের ভাষাকে ব্যঙ্গ করে বলে— পরিচয় কখনও স্থির নয়, মানুষ কখনও একমাত্রিক নয়।
উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে যে নির্মাণভঙ্গি দেখা যায়, সেটিও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এটি নিছক স্মৃতি-চিত্র নয়; বরং ইতিহাসের সিনেম্যাটিক পুনর্গঠন। এখানে বাস্তবতা নিজেই অভিনীত, আবেগ দ্বারা পরিচালিত এবং পুনর্লিখিত। যেন ইতিহাস কোনো আদালতের নথি নয়, বরং এক অন্তহীন চলচ্চিত্র— যেখানে দৃশ্য কাটা যায়, সম্পাদিত হয়, নতুন অর্থে ফিরে আসে। স্মৃতি এখানে ক্যামেরার মতো; যা দেখায়, আবার আড়ালও করে।
দেবীপ্রসাদের কৃতিত্ব এই যে, তিনি তাঁর নিজস্ব নির্মাণের সীমাবদ্ধতাগুলোকেও অস্বীকার করেন না। প্রথম পর্বে মুসলমান পরিচয়কে বাংলাদেশি পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার যে প্রচলিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে, তার ছায়া উপন্যাসে রয়েছে। কিন্তু আখ্যান যত এগোয়, সেই সরলীকরণও তত ভেঙে পড়ে। মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে জটিল, বহুমাত্রিক এবং পরস্পরবিরোধী সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফলে উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত কোনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী পাঠে আবদ্ধ থাকে না।
‘দেশ’-এর নন্দনতত্ত্বের অন্যতম প্রধান শক্তি তার আন্তঃপাঠিক নির্মাণ। সালভাদর দালির স্বপ্নময় অতিবাস্তবতা, The Storm on the Sea of Galilee-এর বিপন্ন মানবযাত্রা, লুই বুনুয়েলের অবচেতনের সিনেমা, সত্যজিৎ রায়ের মানবিক দৃষ্টি, বব ডিলানের যাযাবর বিষণ্নতা কিংবা ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মৃত্যুচেতনা— এসব অনুষঙ্গ উপন্যাসে এমনভাবে মিশে আছে যে তারা একেকটি গোপন সুরের মতো কাজ করে। এইসব সাংস্কৃতিক প্রতিধ্বনি আখ্যানকে আরও গভীর, আরও বহুমাত্রিক করে তোলে। ফলে ‘দেশ’ কেবল সমাজ বা রাজনীতির দলিল নয়; এটি এক বিশাল নন্দনতাত্ত্বিক কোলাজ।
সবশেষে এসে উপন্যাসটি যে উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়, সেটিই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড়ো অর্জন। এখানে ‘দেশ’ কোনো মানচিত্রের রঙিন অংশ নয়। দেশ হল মানুষের বহন করে চলা স্মৃতি। দেশ হল মাতৃভাষার উচ্চারণে হঠাৎ জেগে ওঠা শৈশব। দেশ হল এমন একটি বাড়ি, যেখানে আর কখনও ফেরা সম্ভব নয়, অথচ যার দিকে সারাজীবন ফিরে তাকিয়ে থাকতে হয়। তাই দেশ শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী সীমান্তের উপন্যাস হয়ে থাকে না। হয়ে ওঠে— সমস্ত উদ্বাস্তু মানুষের উপন্যাস, সমস্ত নির্বাসিত স্মৃতির উপন্যাস, সমস্ত হারিয়ে যাওয়া বাড়ির উপন্যাস। উপন্যাসটি শেষ করার পর মনে হয়, আমরা যেন কোনো বই পড়িনি; বরং বহুদিন ধরে মানুষের ভেতরে জমে থাকা এক স্বপ্ন দেখেছি। সেই স্বপ্নে কাঁটাতার আছে, নদী আছে, ইতিহাস আছে, মৃত্যু আছে— কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে আছে মানুষের অনন্ত ঘর-খোঁজার আকাঙ্ক্ষা। আর সেই আকাঙ্ক্ষার নামই হয়তো— ‘দেশ’।