• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • গ্রন্থ-সমালোচনা : ভবভূতি ভট্টাচার্য

    || বটতলা, অশ্লীলতা ও বাংলা প্রকাশনার অমোঘ দলিল ||

    বটতলার বই: উনিশ শতকের দুষ্প্রাপ্য কুড়িটি বই (দুটি খণ্ড)—সম্পাদকঃ অদ্রীশ বিশ্বাস; গাঙচিল, কলকাতা ৭০০১১১; জুলাই ২০১৭; ISBN: 978-93-81346-01-3

    মৃজাপুর-নিবাসী জনৈক বাবুরাম ব্রাহ্মণ একটা চিঠি লিখেছিলেন উইলিয়ম কেরি সাহেবকে, শ্রীরামপুরের ঠিকানায়।

    ঊনবিংশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকের কথা এ’। লিখেছেন, শহর কলকেতায় এখন ছাপাখানা-ব্যবসার এতটাই রমরমা যে কোন কোন প্রিন্টার বড়লাটের কাউন্সিল-মেম্বারদের থেকেও বেশি টাকা কামাচ্ছে! (পরে সে চিঠি ‘ফ্রেণ্ড অব্‌ ইণ্ডিয়া’ কাগজে ছেপে বেরোয়।)

    এই বাবুরামই প্রথম বাঙালি যিনি কলকাতায় ছাপাখানা বসান (১৮১১ খৃ.) বঙ্গদেশে, তাহলে ভাবুন, সেই কবে থেকে বাংলা-বইয়ের কী বাজার ছিল!

    আর, সেটাকেই ধরে নিয়েছিল বটতলা। যদিও একটু অন্যভাবে।

    কী ভাবে? সেটাকে ঘিরেই তো এই গ্রন্থ-যুগল, যাদের নিয়ে এখন লিখতে বসেছি।

    ***

    অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ ও স্কুল বুক সোসাইটির ছত্রছায়ায় পুস্তক প্রকাশনার জোয়ার এসে পড়ে কলকাতায়। কিন্তু এগুলো সবই ছিল পরিশীলিত উচ্চকোটির বই—ধর্মপুস্তক ও স্কুলপাঠ্য ইত্যাদি।

    তাহলে সমাজের তথাকথিত নিচুতলার মানুষজন কী ভাবে, কী পড়তে চায় তা জানা যাবে কি করে?

    ১৮৩৫-৪০ নাগাদ শোভাবাজার-কালাখানা অঞ্চলের একটা বড় বটবৃক্ষের শানবাঁধানো তলায় অনেকেই গল্পগুজব করতে এসে বসতেন, আড্ডা এবং গানবাজনাও চলত। এখানেই প্রথম সস্তা বইয়ের পসরা খুলে বসলেন বিশ্বনাথ দেব বলে এক দক্ষিণরাঢ়ী কায়স্থ সন্তান, যিনি ঐ এলাকাতেই একটা কাঠের প্রেস বসিয়েছিলেন। সেই থেকে এই ‘বান্ধা-বটতলা’-ই উত্তর কলকাতার প্রকাশকদের এক পাকা ঠিকানা হয়ে ওঠে।

    বটতলা!

    ক্রমে ক্রমে বটতলা এক আইকনিক উচ্চতা পেয়ে যায়—সস্তায় জন-উপভোগ্য বইয়ের প্রকাশস্থল হিসেবে। যে সম্পূর্ণ ‘রামায়ণ’ শ্রীরামপুর প্রেস চব্বিশ টাকায় দিত, বটতলার ছাপায় সেটি দেড় টাকায় বিকোত, ‘চণ্ডীমঙ্গল’ এক টাকায়। ‘কোয়ালিটি’ তো আপেক্ষিক বিষয়, কিন্তু স্রেফ ভল্যুমের জোরে বটতলা বাংলা-প্রকাশনার গ্রাফটাকে উত্তুঙ্গে তুলে দিয়েছিল।

    ***

    বটতলার বই ও মুদ্রণশিল্প নিয়ে অন্তত চারজন মহীরুহ-গবেষকের নাম এক্ষুনি মনে পড়ছেঃ শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন, শ্রীপান্থ, আশিস খাস্তগির ও স্বপন চক্রবর্তী—যাঁদের লেখাগুলি শুধু যে উচ্চ গবেষণার ফসল তা-ই নয়, অত্যন্ত সুখপাঠ্য ও বহুবিক্রীত বই। তাই এখানে ‘বটতলা’ নিয়ে কেঁচেগণ্ডূষ করবার কিছু নেই, এ’ আম-বাঙালি পাঠকের অলরেডি জ্ঞাত বিষয়। বটতলাকে বাদ দিয়ে বাংলা-প্রকাশনার ইতিহাস লেখা হতে পারবে না।

    তাহলে অকালপ্রয়াত অদ্রীশ বিশ্বাস সম্পাদিত বর্তমান এই বইদুটির মাহাত্ম্য কোথায়?

    মনে করিয়ে দিই, ইনিই সেই অদ্রীশ যিনি ১৯৯০-এর দশকে ছাত্রাবস্থায় বৃটিশ লাইব্রেরিতে গবেষণা করতে গিয়ে প্রথম বাঙালি মহিলা-লেখিকার ‘মনোত্তমা’ উপন্যাসটি আবিষ্কার করেন, ‘দুর্গেশনন্দিনী’-র (১৮৬৫ খৃ.) মাত্র তিন বৎসর পরে লেখা হয়েছিল যেটি, কিন্ত চাপা পড়ে ছিল। আর হ্যাঁ, অদ্রীশের ডক্টরেটের বিষয় কী ছিল বলুন তো? উত্তরঃ বাঁটুল দ্য গ্রেট!

    এই অদ্রীশই বহু শ্রমে, একাধিক সোর্স থেকে (বেশিটাই বৃটিশ লাইব্রেরি), বটতলায় প্রকাশিত প্রতিনিধিস্থানীয় বিশ-বিশ চল্লিশটি বইয়ের এই সংকলনটি উপস্থাপিত করেছেন, যা দুই/চার মলাটের মধ্যে পড়তে পাওয়াটা সৌভাগ্যের বিষয়। এ’গুলির পাঠ অতি-উপাদেয় না মনে হতে পারে কোন কোন পাঠকের কাছে, কিন্তু সাহিত্যেতিহাসে ও সামাজিক-ইতিহাসে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।

    পরবাসের ১০১-তম সংখ্যায় আমরা ঢাকা-র ‘শিখা’ পত্রিকার একটি শতবার্ষিকী সংকলনের কথা পড়েছিলাম। বর্তমানের এই বটতলা-সংকলনটির চরিত্র তার কাছাকাছি। যদিও ‘শিখা’-র ঐ সংকলনে পুরনো পত্রিকাগুলির একজ্যাক্ট ফ্যাকসিমিলি সংস্করণ গ্রন্থায়িত করা হয়েছিল, এখানে তা নয়; তবু অনেকগুলি বটতলা-বইয়ের প্রচ্ছদ অবিকল ছাপা দেওয়া হয়েছে এখানে, যা থেকে তৎকালীন ফন্ট, ভাষা, বিজ্ঞাপনের ধরন, সন-তারিখ ইত্যাদি সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। খৃষ্টাব্দের ব্যবহার সেকালে ছিলই না, শকাব্দ/বঙ্গাব্দই ছাপা হত।

    সুকুমার সেন বা শ্রীপান্থের লেখায় বটতলার বই ও প্রকাশনার ইতিহাস সম্বন্ধে উপাদেয় পাঠ পাওয়া গেছে, কিন্তু বটতলার একটা বই ঠিক কী রকম দেখতে হতো? তার একজ্যাক্ট পাঠ কী? প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি পুরনো এবং অযত্নলালিত (কারণ বাংলার মেইনস্ট্রিম সাহিত্য কখনই বটতলার সাহিত্যকে জাতে তোলেনি, ব্রাত্য করে দূরে সরিয়ে রেখে দিয়েছিল) গ্রন্থরাজির পুনরুদ্ধার সহজ কাজ নয়—যেটাই অদ্রীশ করেছেন এখানে বহু যত্নে।

    আফশোষ, দ্বিতীয় খণ্ডটি উনি দেখে যেতে পারেননি; তার আগেই আত্মহনন।

    ***

    এই সংকলনে প্রকাশিত কয়েকটি বটতলার-বইয়ের শীর্ষনাম পড়ে নিইঃ

    • হুড়কো বউয়ের বিষম জ্বালা

    • বৃদ্ধা বেশ্যা তপস্বিনী

    • রাঁঢ় ভাঁড় মিথ্যা কথা

    • ইয়ং বেঙ্গল ক্ষুদ্র নবাব

    • লম্পট-দমন

    • সোনাগাছির খুন

    এ’কয়টি নমুনা দেখে অনুমান করে নেওয়া কঠিন নয়, কেন বঙ্কিমী-মাইকেলী বাঙালি পাঠক দূরে রেখে দিয়েছিল বটতলাকে, যদিও আবার লক্ষ লক্ষ পাঠক বুকে টেনেও নিয়েছিল (হয়ত বা চুপিচুপি), নতুবা বটতলার অত ব্যবসায়িক সাফল্য হতে পারে না। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ইউরোপে Chapbook এর যে রমরমা এসেছিল, অষ্টাদশ-শতকের কলকাতার বটতলা যেন তারই দেশীয় রূপ।

    অশ্লীলতার সঙ্গে বটতলার একটা অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক বসেই গিয়েছে, যেটা অমূলক নয়। যদিও পৌরাণিক কাহিনী, প্রেম ও সামাজিক বিষয়, ভূতের গল্প—এই রকম বিষয়ে অনেক বাণিজ্যসফল বই প্রকাশ করেছে বটতলা। গদ্য-পদ্য-ছড়া-নাটক রূপে লেখা হত বইগুলি। অবিশ্যি, যৌনগন্ধী সাহিত্যধারার চূড়ান্ত দেখিয়ে গিয়েছে বটতলা, উদাঃ ‘রতিমঞ্জরী’, ‘আদিরস’, ‘শৃঙ্গারতিলক’। এ’ তিনটি ছিল বেস্টসেলারের নাম।

    কয়েকটি লাইন পড়িঃ

    কামের সাগর প্রেমে উঠে উথলিয়া
    নাগর নিভাতে চায় মন্থন করিয়া||

    বা, বিপরীত-বিহারের বর্ণনাঃ

    কটিদেশ তুলে ঘন শব্দ করে
    জলবিন্দু তাহে তবু নাহি সরে||

    (দূতীবিলাস, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যাইয়)

    ইত্যাদি ইত্যাদি।

    সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উচ্চমানের ইতিহাসকার তো, এমনকি, ‘সোনাগাছি ও বটতলা যমজ বোন’ নামেও দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন, যেখানে উনি বলছেন, খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের হেতু সোনাগাছির গণিকাগণ বটতলার বই এনে পড়ে/পড়িয়ে ব্যবসা বাড়াতেন!

    বেচারা বটতলা!

    ***

    অশ্লীলতার দায়ে কোনো সাহিত্যকীর্তির ব্যান হওয়াটা কাম্য নয়, যদিও হয়নি যে, তা-ও নয়। সাড়ে ছয় শ’ বছর আগে জিওভানি বোকাশিও-র ডেকামেরন ব্যান হয়েছিল যৌন-আতিশয্যের দায়ে, মার্কুই সাদে-ও ব্যান হন যখন সেদেশে ফরাসী বিপ্লব চলছে। ‘লেডি চ্যাটার্লি’ বা ‘লোলিতা’ তো অনেক হালের বই। বাংলাভাষাতেও বিবর রাত ভ’রে বৃষ্টি-র নাম সকলে জানে।

    কিন্তু অশ্লীলতার দায়ে একটা গোটা প্রকাশনা-পাড়ার দিকে ‘সভ্য’-সমাজের অঙ্গুলি-নির্দেশের তুলনা এই বটতলার মতো পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা জানি না।

    সেই সংকোচ সেই দোদুল্যমানতার সঠিক বিচার করতে এই বই পড়তেই হবে।

    || নীল পরি বা বুলাদির গল্প, বা দুর্বারের ||

    লালবাতির নীল পরিরা—কৃষ্ণা দত্ত; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা-৯; প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০০৬; ISBN 81-7756-601-6

    বটতলার বই নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে বিশ বছর আগের একটি ল্যাণ্ডমার্ক বাংলা বই হাতে উঠে এল, সময়ের মাপকাঠিতে যাকে এই গোত্রের একটি ক্লাসিকের দর্জা দেওয়া চলে। জানি না, বর্ষীয়সী বিদূষী কৃষ্ণা দত্তের এই বইটি আজকাল পড়ে কিনা লোকে, তবু প্রথমদিকের এক পরিশ্রমী কাজ হিসেবে সম্মান পাওয়া উচিত এই গ্রন্থের। বিস্মৃত হলে চলবে না এই গ্রন্থটিকে। পরে এই বিষয়ের উপরে বাংলায় ভালো কাজ হয়েছে, একটির কথা তো আমরা পড়েছিলাম ৯৫-তম সংখ্যায় (পতিতাবৃত্তির উৎস সন্ধানেঃ উনিশ শতকের বাংলা—বিদিশা চক্রবর্তী দ্রঃ) তবু ক্ষেত্রসমীক্ষা-ভিত্তিক কৃষ্ণা দত্তের এই বইটির একটা আলাদা স্থান থাকবেই।

    ***

    গণিকাবৃত্তিকে বিশ্বের এক প্রাচীনতম পেশা বলা হয়ে থাকে।

    মধ্যযুগীয় লণ্ডনের এক পুথির কথা শুনিয়েছেন প্রখ্যাতা সোশাল-রাইটার ক্যাথরিন আর্নল্ড: টেমসের তীরে সাউদওয়ার্ক পল্লীতে একদল যুবতী অশ্বেতরের পিঠে চড়ে চলেছে, বিশ্রস্ত বেশবাস, কেশ আলুথালু, হাতে একটি করে সোনার গিলটি করা ছড়ি ধরা রয়েছে। সেটাই তাদের পরিচয়, তাদের বিজ্ঞাপন। তারা নগরনটী। সময়টা ১০৫৮ খৃষ্টাব্দ!

    কবেকার কথা! ভাবুন!

    খৃষ্টজন্মের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে সুমেরীয় দেবী ইনানার মন্দিরে নারীদের উৎসর্গ করা হতো, যারা পুরোহিত ও উঁচুতাকের কাস্টমারদের মনোরঞ্জন করত—অনেকটা ভারতের দেবদাসীদের মতো।

    যুগে যুগে নানান রূপে নানান ভাবে এই প্রথা বা ব্যবসায় চলে এসেছে যা নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা থেকে সমীক্ষা, গবেষণা কী না হয়েছে।

    সন ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত

    ডাক্তার উইলিয়ম ওয়ালেস সাঙ্গারের দ্য হিস্ট্রি অব প্রস্টিটিউশন বইটিকে একটি অতি উল্লেখযোগ্য বই মানা হয়; ৩৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত প্রায় সাড়ে সাত শত পৃষ্ঠার মহাগ্রন্থ এইটি। অর্থাৎ, আজ থেকে দেড়শ’ বছর আগে, ভারতে যখন ‘মিউটিনি’ চলেছে, গণিকাবৃত্তির ইতিহাস নিয়ে আমেরিকায় এত বড় ও প্রামাণ্য কাজ হয়ে গিয়েছে।

    কৃষ্ণা দত্তের বর্তমান বইটি বাংলাভাষায় সম্ভবত প্রথম এত ডিটেইল্ড ও সুসংহত কাজ। প্রবীণা অধ্যাপিকা শ্রীমতী দত্ত ফিল্ডে ঘুরে ঘুরে এই পুস্তকখানি লিখেছেন—সোনাগাছি, ওয়াটগঞ্জের নিষিদ্ধ পল্লীতে পল্লীতে ঘুরেছেন, ও সসংকোচ সে-সকল স্থানের বাসিন্দে মহিলাদের মুখের ভাষা ‘রেণ্ডি’ ‘নাঙ’ ‘বিচি’ ‘চোদা’ ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন এই বইয়ে। (পাঠকদের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছেন। কেন? জানি না।)

    ***

    প্রাচীন ভারতে গণিকাবৃত্তির প্রভূত উল্লেখ পাওয়া যায়। এ’নিয়ে অসাধারণ কাজ সুকুমারী ভট্টাচার্যের ‘প্রাচীনভারতে গণিকা’—সকলেই জানেন। উল্লেখে এসেছে। অতঃপর একে ওকে সঙ্গী করে বর্ষীয়ান কৃষ্ণাদি বেরিয়ে পড়েছেন, শহর কলকাতার ‘কুখ্যাত’ সব নিষিদ্ধপল্লীতে, কুড়িয়ে এনেছেন হরেক অভিজ্ঞতা, অধিবাসিনীদের ভয়াবহ জীবন, সমস্যা, দুর্দশা, রাজনীতিকরণ —এবংবিধ নানান বিষয়—যা ইন্ধন যুগিয়েছে বর্তমান কেতাবখানির। জানি না, গবেষণা করে ও আকর্ষক কেতাব লিখে এই প্রাচীন পেশার সমস্যার কোনো সুরাহা করা যেতে পারে কিনা, তবু এটাও তো সত্যি যে কোন একটি সমস্যার/বিষয়ের গভীরে না গেলে তার সমাধান সম্ভব নয়। তার জন্যেই এ’হেন ক্ষেত্রসমীক্ষা-ভিত্তিক গবেষণাগ্রন্থের প্রয়োজন আছে।

    ***

    দশটি অধ্যায়ে বিভক্ত প্রায় আড়াইশ’ পৃষ্ঠাব্যাপী এই গ্রন্থের সর্বাঙ্গে পরিশ্রমের দাগ। হাওয়ায়-হাওয়ায় কথা নেই কোনো—যেটা শ্রদ্ধা জাগায়। এ’বইতে যেমন বহু যৌনকর্মীর সাক্ষাৎকারভিত্তিক অভিজ্ঞতা/যন্ত্রণার কথা রয়েছে, তেমনি এসেছে নিবেদিতপ্রাণ ডাক্তারবাবু স্মরিজিৎ জানা-র কথা যিনি সোনাগাছির যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য-সচেতনতার কাজে নিবেদিত ছিলেন। ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’-র লড়াইয়ের কথা এসেছে—হতে পারে, কৃষ্ণাদির মতো গবেষকের কাজের পরোক্ষ ফল এমন সংগঠন। প্রখ্যাত ‘দুর্বার’ সংস্থা একটি মুখপত্রও চালিয়েছিলঃ ‘সোহাগনামা’। এটা আগে জানতাম না।

    ***

    আনন্দ পাবলিশার্সের বই, কিন্তু বানানের সমতাবিধি মানা হয়নি। ‘পরি’, ‘পল্লি’ লেখা হচ্ছে, আবার ওদিকে ‘কাহিনী’-ও লেখা হয়েছে। মদ্যপানের ছোট্ট ডোজ হিসেবে ‘শট্‌’ তো চালু শব্দ, যেটা ‘খেপ’ বোঝাতে বেপাড়াতেও ব্যবহৃত হয়। উচ্চবর্গীয়া লেখিকা সম্ভবত এ’হেন স্ল্যাং শব্দের সঙ্গে পরিচিত নন, বারবার ‘শর্ট’ লিখেছেন। ফরাসী গণিকাদের উল্লেখ বারে বারে করেছেন, এমনকি লণ্ডনের গণিকাদের উপরে একটি আলাদা অধ্যায়ও রেখেছেন, যেটাকে প্রক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। এক জায়গায় লিখেছেন, বর্গীরা বাংলা লুঠ করতে এসে মহা আনন্দে মেয়েদের উপভোগ করেছে, ধর্ষণ করেছে। এ’তথ্যের কোনো মান্য সোর্স নেই।

    ***

    লেখিকা কৃষ্ণা দত্ত এই বইটি লিখেছিলেন ১৯৯০-এর দশক জুড়ে। ঘোষণা করে বলেননি কোথাও, তবু এই কাজের পিছনে ওঁর কোনো মহৎ উদ্দেশ্য থেকে থাকলে সেটা ২০০৪-নাগাদ সাধিত হয়েছিল যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এইডস-সচেতনতা বাড়াতে ও কণ্ডোমের প্রতি সামাজিক স্টিগমা দূর করতে অতি-জনপ্রিয় ম্যাসকট ‘বুলাদি’ এনিমেশন-চরিত্রটিকে লঞ্চ করে। ১০৯৭--এই টোল-ফ্রি ডেডিকেটেড লাইন রাখা হয়, ও হোর্ডিং-প্যামফ্লেট-টিভি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চলে।

    এটি লেখিকার প্রচেষ্টার একটা বড় পরোক্ষ সাফল্য।

    বইটির শেষ প্যারাগ্রাফে বুলাদির উল্লেখটি আছে।


    || এক দূরতর দ্বীপ শহর কলকাতার কাছে ||

    মেটিয়াব্রুজ: দর্জিমহল্লার কথকতা—মহ. ফারুক ইকবাল; সম্পাদনাঃ শুভঙ্কর দেবনাথ; কালি-কলম-ও-ইজেল, কলকাতা-৩৯; ফেব্রুয়ারি, ২০২৫;

    ISBN 978-81-984350-8-8

    সে এক দূরতর দ্বীপ শহর কলিকাতার গায়ের কাছে!

    মেটিয়াব্রুজ বলতে লক্ষ্মৌর নবাব ওয়াজেদ আলি বা গঙ্গার তীরে সুরিনাম ঘাট বা আশির দশকের কুখ্যাত ডি সি মেহতা হত্যাকাণ্ডের কথা মনে করে ফেলি আমরা, কিন্তু এখানকার যে হস্তশিল্প আজ দু’শো বছর ধরে পূর্বভারতের ইকনমির এক বড় উপাদান হয়ে রয়েছে সেটা চট করে মনে পড়ে না—যদিও গায়ে হয়তো সেখানকার সেলাইকরা শার্ট পরেই বসে আছি।

    হ্যাঁ, আমি মেটিয়াব্রুজের রেডিমেড-বস্ত্র শিল্পীদের কথা বলছি, যাঁরা পূর্বভারতের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের গায়ে শার্ট-প্যান্ট-ম্যাক্সি-ফ্রক তুলে দিয়ে এসেছেন, দিয়ে চলেছেন। শুধু মাত্র আজ নয়, বা কলকাতায় নয়, এখানকার টেইলরদের ইজ্জত ছিল ডিমাণ্ড ছিল বৃটিশ আমলের রেঙ্গুন-সিঙ্গাপুর-বোর্নিওতেও, যেখানে গিয়ে গিয়ে এঁরা দর্জিপল্লী গড়ে তুলেছিলেন, ও সেখানকার অর্থব্যবস্থার এক উল্লেখ্য নাট-বল্টু হিসেবে কাজ করেছিলেন।

    না, এই তথ্যটা জানতাম না আগে।

    জানব কী করে? মেটিয়াব্রুজের দর্জিমহল্লা নিয়ে আগে কোনো বই লেখা হয়ে থাকলে তো? আর, এখানেই বর্তমান কেতাবখানির গুরুত্ব—যেটি কিনা লিখেছেন এক বর্ষীয়ান মানুষ নিজে যিনি বিগত ষাট বছর ধরে এখানকারই বাসিন্দা এবং নিজে একজন নিপুণ দর্জি।

    ***

    ধর্মতলা স্ট্রিট দিয়ে আজও হাঁটলে এসপ্ল্যানেডের কাছে বিশাল ‘ওয়াচেল মোল্লা’-র ডিপার্টমেন্টাল শপ নজরে পড়ে। আজকের শপিংমল-কালচার আসবার বহু আগে, সেই বৃটিশ আমল থেকে এই ভারতীয় বিপণীটি সাহেবী ‘হোয়াইটওয়ে এণ্ড লেডলো’ বা, ‘আর্মি এণ্ড নেভি স্টোর’-এর মতো কেতাদুরস্ত বৃটিশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সঙ্গে সমান টক্কর দিয়ে সফল ব্যবসায় করে এসেছে, এবং এক কিংবদন্তির দর্জা পেয়েছিল। দানধ্যানে মেটিয়াব্রুজের প্রায়-নিরক্ষর এই বঙ্গসন্তান জনাব ওয়াচেল মোল্লা পেয়েছিলেন দানবীর হাজী মহম্মদ মহসীনের মতো সম্মান, যিনি সেখানে প্রথম অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করে দিয়েছিলেন, স্থানীয় বালক এবং বালিকাদিগের জন্যে।

    সসম্ভ্রমে তাঁর গল্প দিয়েই বইটি শুরু করেছেন বর্তমান লেখক বর্ষীয়ান মহঃ ফারুক ইকবাল সাহেব, যিনি নিশ্চয়ই কোনো পেশাদার লেখক নন, কিন্তু তাঁর সহজ-সরল-পেলব লিখনভঙ্গিমাটি মন কেড়ে নিল। কোনো ভান নেই, সহজ কথা সহজ ভাবে বলা, যদিও সেটা বলতে গিয়ে মেটিয়াব্রুজের আজকের সমস্যাদির কথাগুলিকেও এড়িয়ে যাননি উনি—শুরুটি যদিও করেছেন ওঁর ছোটবেলার গল্প দিয়ে, নিজের পরিবারের কথা দিয়ে।

    ১৯২০-র দশকে ফারুকের পিতামহ বংশের তথা ঐ অঞ্চলের প্রথম গ্রাজুয়েট ছিলেন, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। উনি ছিলেন কবিবর আলাম্মা ইকবালের অন্ধভক্ত! সরকারি চাকুরিতে ঢুকেছিলেন। ফারুক কিন্তু সংসারের জোয়ালে পড়ে উচ্চশিক্ষা করতে পারেননি—এই দুঃখ তাঁর রয়ে গিয়েছে। কিন্তু তন্নিষ্ঠভাবে পেশাটিকে ভালোবেসে তাতেই নিবেদিত ছিলেন, সংসারের গুরুদায়িত্ব পালন করে গেছেন। এবং বয়সকালে এসে, এই দেখুন/পড়ুন, সহজ-সরল ভঙ্গিতে কী চমৎকার এই কেতাবখানি লিখেছেন!

    লিখেছেন ওঁর শৈশবে-বাল্যের সৌহার্দপূর্ণ দিনগুলির কথা—বাবা ঝুন্নুর শাহের মাজার, বিশ্বকর্মা পূজা ও ঘুড়ি ওড়ানো, প্রজাতন্ত্রদিবস পালন, ‘কিচিমিচি’ (ক্রীসমাস) উৎসব, এলাকার বিখ্যাত জালি-পরোটা, পান্তারাস-সামোসা। শুধু তা-ই নয়, মেটিয়াব্রুজের লুপ্তপ্রায় কথ্যভাষা ও প্রবাদ, ‘দর্জিভাষা’ নিয়েও দরকারি আলোচনা করেছেন এই বইতে। সমাজবিজ্ঞানীদের কাজে আসবার মতো তথ্যাদি সব! অনেকের ধারণা আছে যে মেটিয়াব্রুজের দর্জিরা সকলে অবাঙালি। মোটেই না, সিংহভাগই বাঙালি মুসলমান।

    বললে তো আরও কত কথা বলতে হয় বইটির সম্বন্ধে। কিন্তু না, থাক্‌। আপনারা পড়ে নেবেন’খন।

    আমি বরং ততক্ষণে ফের আরেকবার পাতা ওল্টাই বইটির—দেখে নিই কী কী পড়লাম।


    || ডগর সে হঠ্‌ কর্‌—রাঙা নয়, ভাঙা পথের গল্প ||

    Off The Beaten Track: The Story of My Unconventional Life— Saeeda Bano (Translated by Shahana Raza); Penguin books, New Delhi 110004; first published in 2020; ISBN 978-9-385-93299-1

    …তবু রচিত ইতিহাসগুলি চিরদিনই অন্তঃপুরের এই নারীদের প্রতি উদাসীন। নারী চিরদিনই অবহেলিত। বাংলাদেশের সেই অবজ্ঞাত অন্তঃপুরের নিভৃতে প্রথম যাঁরা বহন করে এনেছিলেন প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর এ'গ্রন্থ সেই অনামী মেয়েদের একজনের কাহিনী।

    (প্রথম প্রতিশ্রুতি—আশাপূর্ণা দেবী)

    এখন যে বইটি নিয়ে লিখতে বসেছি তার নায়িকা বঙ্গবাসিনী নন, তিনি অন্তঃপুরবাসিনীও ছিলেন না, ছিলেন ঘোরতর ‘বহির্বাসিনী’—কারণ নবাব-খানদানের কন্যা হয়েও তিনি ঐ অন্তঃপুরের ঘেরাটোপটাকেই কর্কশ হস্তে ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। তবু আশাপূর্ণার ঐ লাইন কয়টি মনে পড়ে গেল ‘প্রথম যাঁরা বহন করে এনেছিলেন প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর’—লিখেছেন বলে। আমাদের আজকের নায়িকা সঈদা বানু (১৯১৩-২০০১ খৃ.) ছিলেন ভারতের প্রথম পেশাদার মহিলা-ঘোষিকা (radio-announcer), যিনি এটাকেই জীবিকা করে তুলেছিলেন, এবং ‘সিঙ্গল মাদার’ হিসেবে মানুষ করেছিলেন তাঁর দুই পুত্রকে। কবে? ১৯৫০-এর দশকে।

    আরও উল্লেখ থাক্‌, ভারতের স্বাধীনতার দিনেই (১৫ই অগাস্ট, ১৯৪৭) তিনি তাঁর প্রথম রেডিও-ঘোষণাটি করেছিলেন। অল ইণ্ডিয়া রেডিও-তে তাঁর জয়েনিং এর দুই দিন মাত্র আগে হয়েছিল। দেশবিভাগ-সংক্রান্ত দাঙ্গা ও জনস্রোত নিয়ে রাজধানী তখন ভয়ংকর বিপর্যস্ত।

    উর্দু-ব্রডকাস্টিঙে সঈদা বানু-কে এক ‘ভগীরথ’ মানা হয়!

    ***

    কিরানা ঘরের নামী গাইয়ে ও প্রখ্যাত পি এন ধরের ঘরণী শীলা বয়সে ছিলেন সঈদার চাইতে বছর দশেকের ছোট, যদিও তাতে তাঁদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব আটকায়নি। আজীবন বন্ধু ছিলেন দু’জনে।

    রেডিও থেকে অবসর গ্রহণের পরে শীলা ধরের উৎসাহেই সঈদা আত্মজীবনী লিখতে কলম ধরলেন—তাই না বেরোল এই অনন্য গ্রন্থ-- ডগর সে হঠ্‌ কর্‌—মানে, চেনা ছকের/পথের বাইরে !

    চেনা ছকের বাইরে, নয় কি?

    নৈলে, যেকালে কেউ ভাবতে পারত না যে কেবল মতপার্থক্যের কারণে এক বিবাহিতা নারী বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে, এবং নূতন এক শহরে গিয়ে নিজের ছেলেদের নিয়ে বসবাস শুরু করতে পারে ও জীবনধারণ করতে পারে—সেটাই তো করে দেখিয়েছিলেন সঈদা। ওঁর অনবদ্য পঠনশৈলী ও মাদকতাভরা কণ্ঠস্বরের ভক্ত ছড়িয়ে ছিল ভারত-পাকিস্তান ছাড়িয়েও সারা বিশ্বে, যাঁদের ফ্যান-মেইলে ভরে উঠত দিল্লির রেডিও আপিসের বাক্স। ওঁর এক ভক্ত ছিলেন স্বয়ং নেহরুজী, যিনি প্রাতঃরাশে আমন্ত্রণ জানান সঈদা-কে।

    সঈদার এই স্বাধীনচেতা মানসিকতার পিছনে ভোপাল নবাব-বংশের প্রভাব থেকে থাকবে, লতায়-পাতায় যে বংশের সাথে তাঁর সংযোগ। উল্লেখ থাক্‌ ভারতবর্ষের প্রিন্সলি স্টেটগুলির মধ্যে একমাত্র ভোপালেই এক শতাব্দী ধরে পর পর চারজন বেগম রাজত্ব করে গিয়েছিলেন, নবাব নয়। উচ্চশিক্ষার জন্যে সঈদা-কে লক্ষ্মৌ প্রেরণ করা হয়েছিল, যেখানেই, তাঁর ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে ১৭ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। স্বামী জজ। দেবর আই সি এস। কিন্তু, বনিবনা হল না শ্বশুরবাড়িতে। লিখেছেন উনি আত্মজীবনীতে সে সব গল্প। বড় সুখপাঠ।

    সঈদা বানুর ইচ্ছা ছিল তাঁর লেখাটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়। কিন্তু কে করবে? নাতনি সাহানা রাজা এগিয়ে এলেন কিন্তু তিনি যে নাশতালিক অক্ষর পড়তে পারেন না। কী করে ডিঙোলেন সেই বাধা? বলব না, পড়ে নেবেন। তবে চমৎকার স্বচ্ছ-গতি অনুবাদ করেছেন নাতনি-সাহিবা। পড়তে বড় ভালো লাগল।

    পনেরোটি অধ্যায়ে বংশের ইতিহাস থেকে লক্ষ্মৌ ও শ্বশুরালয় থেকে দেশভাগের ঘা থেকে দিল্লির রেডিও-অফিস, সংসার থেকে...ব্যারিস্টার নুরুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সুদীর্ঘকালের বিবাহ-বহির্ভূত বন্ধুত্ব-সম্পর্কের কথা! ‘পদ্মভূষণ’ নুরুদ্দিন সাহেব ছিলেন দিল্লি শহরের তিনবারের মেয়র, যাঁর নিজের একটা পরিবার ছিল। কিন্তু এ’সম্পর্ক নিয়ে লিখতে সঈদা কোনো মিথ্যা ভানের আশ্রয় নেননি। স্বাধীনচেতা মহিলা।

    ***

    ‘পরবাস’-এর এই কলমে আমরা কল্যাণী দত্তের কথা পড়েছি, পড়েছি ডাক্তার হৈমবতী সেন, তহমীনা খাতুন, সুফিয়া কামালের কথা। সঈদা বানুও তেমনি একজন প্রথাভাঙা নারী ছিলেন যিনি মাথা উঁচু করে নিজের পছন্দের পেশাটিকে লালন করে গিয়েছিলেন। অনন্যা রূপবতী, হাস্কি ভয়েস—চাইলে স্ক্রিনে হয়ত সফল হতে পারতেন। কিন্তু সে চেষ্টা করেননি।

    তাঁর মতো শিল্পী না এলে পরবর্তীতে কী করে আমীন সায়নীর মতো কিংবদন্তীর রেডিও-ঘোষক আসতে পারতেন?

    দশে বারো দিই এই জীবনীগ্রন্থটিকে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments