



স্মৃতির বইমেলা — সংকলক: শুভঙ্কর মাজি; প্রচ্ছদ— দিবাকর চন্দ; প্রকাশক— আখরকথা, হাওড়া, ৭১১৩০৩; প্রথম প্রকাশ— বইমেলা ২০২৬; ISBN: 978-93-91851-88-0যাঁরা বাংলা পড়েন, বাংলা ভাষা ভালোবাসেন, কলকাতা বইমেলা যে তাঁদের কাছে ‘প্রাণের উৎসব’, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই বইমেলার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘আখরকথা’-র পরিকল্পনা, বইমেলার পঞ্চাশ পূর্তির প্রাক্কালে এবং পঞ্চাশ পূর্তির বছরে দুটি ‘স্মরণিকা’ প্রকাশ করার।

প্রথম সংকলনটি প্রকাশ পেল ২০২৬-এ, এই সংকলনে সন্নিনিবিষ্ট হয়েছে ২৫টি লেখা। লেখক-সূচীতে রয়েছে পবিত্র সরকার, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়, শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, অরণি বসু, অমর মিত্র, ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়, তৃষ্ণা বসাকের মতন বিখ্যাত নাম। লেখাগুলি নানা মাপের। পবিত্র সরকার, অরণি বসু, সুজিত সরকার, নির্মল হালদার, সুশোভন অধিকারী, তৃষ্ণা বসাক লিখেছেন ছোটো লেখা, ৪-৫ পৃষ্ঠার। তুলনায় বড়ো লেখাগুলির (১০ পৃষ্ঠার অধিক) রচয়িতা শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, হরিপদ ভৌমিক, অমর মিত্র ও সুপ্রিয় চৌধুরী। বইটির মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ২১৪। প্রত্যেক লেখার বিষয়বস্তু বইমেলা নিয়ে স্মৃতিচারণ হলেও অবশ্যই প্রতি লেখায় আছে কিছু কিছু নতুন কথা, তাই প্রতিটি লেখার শিরোনাম এক হলেও (‘স্মৃতির বইমেলা’) লেখাগুলিতে রয়েছে আলাদা মেজাজ, রয়েছে বৈচিত্র্য। পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই মন ডুব দেয় স্মৃতির অতলে, হাতড়ে হাতড়ে দেখতে থাকে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে।

বইমেলাকে ঘিরে কিছু কিছু বিষয় ফিরে ফিরে এসেছে নানা জনের লেখায়। যেমন বিমল ধর, দেবজ্যোতি দত্ত ও বাদল বসুর প্রচেষ্টায় কলকাতা বইমেলার সূচনার কাহিনি, বইমেলার সঙ্গে বিশেষ কিছু মানুষের জড়িয়ে যাওয়া (যথা দেরিদা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়), বইমেলায় আগুন, বইমেলায় ধুলো ও তার জন্যে চলন্ত গাড়ি থেকে জল ছিটোনো, ময়দানের বইমেলা ও তার স্থানান্তর, অশোক কুমার সরকারের মৃত্যু, বইমেলার প্রথমদিকের বই-বাজার। অনেকেই উল্লেখ করেছেন প্রতিক্ষণ-এর স্টল বা অধুনালুপ্ত কফি হাউসের স্টলের কথা। মঁমার্ত-এর কথাও এসেছে একাধিক লেখায়। কেউ কেউ বইমেলাকে ঘিরে জড়িয়ে পড়েছেন ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে, সেখানে বইমেলা গিয়েছে গৌণ হয়ে। কেউ আবার বইমেলা নিয়ে লিখেছেন প্রবন্ধ বা ইতিহাসধর্মী রচনা। স্মৃতিচারণের ধর্মই হল, তা কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না। লেখাগুলিতে সেই বৈশিষ্ট্য পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। এখানে বিশেষ কৃতিত্ব দিতে হয় সংকলক তথা সম্পাদককে। এই বিচিত্র লেখার সম্ভার পরম যত্নে তিনি উপস্থাপিত করেছেন পাঠকের দরবারে। সকলেরই লেখার বৈশিষ্ট্য রক্ষা করেছেন, মর্যাদা দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতির। মুগ্ধ করেছে বইটির মলাট, বাঁধাই, মুদ্রণ এবং সজ্জা। চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন দিবাকর চন্দ। বইটি হাতে নিলেই পড়তে ইচ্ছে করে।
কয়েকটি লেখার সঙ্গে পাঠকদের একটু পরিচয় করাই। পবিত্র সরকার গোড়াতেই উল্লেখ করেছেন দেশ পত্রিকার রবীন্দ্রসংখ্যায় প্রকাশিত প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটি প্রবন্ধের, যেখানে প্রস্তাব ছিল একটা গ্রন্থ পার্বণ শুরু করার। সে সময়ে সকলে বই কিনবে, পরস্পরকে বই উপহার দেবে। ‘বই মেলা’র কথা হয়তো ভাবা হয়নি সে প্রবন্ধে, কিন্তু তার কাছাকাছি একটা ভাবনার কথাই ছিল সেখানে। পবিত্রবাবুর লেখাতে রয়েছে অরুণ মিত্রকে নিয়ে বইমেলার একটা কৌতুকজনক ঘটনার কথা, যার কথা অন্য কেউ কেউও বলেছেন— বইমেলায় ঢোকার সময়ে তাঁকে বড়ো অফিসার ঠাউরে পুলিশকর্মীদের খাতির করার কথা। বৃষ্টি (১৯৯৪) ও আগুনে (১৯৯৭) বইমেলার ক্ষতি, বইমেলায় যেতে গিয়ে তাঁকে আইন ভাঙার দায়ে পুলিশ ধরে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় ও পরে পরিচয় পেয়ে ছেড়ে দেয়— এ সব স্মৃতিও ধরা আছে তাঁর লেখায়। মীনাক্ষী চটোপাধ্যায় তাঁর লেখা শুরু করেছেন বইমেলা আরম্ভের আগে ময়দানের ‘মুক্তমেলা’ দিয়ে, যেখানে নানারকম কাণ্ডকারখানার সঙ্গে বই বিক্রিও হত, লিটল ম্যাগাজিনের দলও আসত। মীনাক্ষীর লেখায় ধরা রয়েছে কৃত্তিবাস বা অন্য পত্রিকার স্টলের কথা, প্রথমদিকে সে সব স্টল থাকত বইয়ের স্টলের পাশাপাশিই। সেই সূত্রে নানা লেখকের কথা স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে, যেমন কৃত্তিবাস-এ সুনীল, সন্দীপন, বেলাল, শরৎ মুখোপাধ্যায় কিংবা ‘এই দশক’ পত্রিকার স্টলে শেখর বসু বা রমানাথ রায়। আছে প্রতিক্ষণ স্টলে প্রিয়ব্রত ও স্বপ্না দেবের সুন্দর আপ্যায়নের ব্যবস্থার কথা, সেই স্টলে বসত শক্তি-সন্দীপন সহ লেখকদের আড্ডা। তিনি লিখেছেন ইন্ডিয়ান কফি হাউসের স্টলের কথা, শিঙাড়া কচুরি মিষ্টি জাতীয় খাবার দোকান থাকার কথা, তার সঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে “এখনকার মতো খাদ্যমেলায় পরিণত হয়নি তখনকার বইমেলা।” ধীরে ধীরে বইমেলার স্থান পালটে গেল, আকৃতি বৃদ্ধি হল, চরিত্রেরও পরিবর্তন হল। লেখার শেষে তাই ফুটে উঠেছে তাঁর মনের কথা: “বইমেলা এখন বাঙালির অন্যতম সাংস্কৃতিক বিনোদন, ছোটো থেকে এখন সে বিরাট মহীরূহ, আমি তার নাগাল পাই না”। শুধু তাঁর নয়, এ যেন আমাদের অনেকেরই মনের কথা।

শ্যামলী বসু মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৮৪ সালে কলকাতা বইমেলা ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা পেল, এই মেলা হয়ে উঠল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা। সম্ভবত এর পরই বইমেলায় ‘থিম’ ব্যাপারটা শুরু হয়। তাঁর ছোটো অথচ মনোরম লেখাটিতে শ্যামলী বইমেলাতে খাবারের স্টলের গরম কচুরি, চপ, কাটলেটের সঙ্গে পিঠে পুলি পায়েসের স্মৃতিচারণ যেমন করেছেন, তেমনই ভাগ করে নিয়েছেন কোনো স্টলে তাঁর নিজের লেখা বই সাজানো দেখে মন খুশিতে ভরে ওঠার অনুভূতি কিংবা সুবর্ণরেখার স্টলে ইন্দ্রনাথ মজুমদার বা সন্দেশের স্টলে শিশির মজুমদার বা ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের সঙ্গে গল্প-আড্ডার কথা।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের মতে, বইমেলা তাঁর কলকাতার সেরা স্মৃতির মধ্যে একটি প্রধান স্থান অধিকার করে রয়েছে। ১৯৯৭ সালে (আগুন লাগার বছর) বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা এসেছিলেন মেলা উদ্বোধন করতে, তাঁর বক্তৃতার কথা দিয়ে শুরু করে দেরিদার সঙ্গে কাটানো অনেক স্মৃতির কথাই লিখেছেন শঙ্করলাল। বলেছেন নানারকম বই পেয়ে যাওয়ার কথা, নানা লেখকের সঙ্গে আড্ডার কথা, তাঁর নিজের বই লেখা নিয়ে একজন বিশেষ পাঠকের সঙ্গে মূল্যবান আদান-প্রদানের কথা। তাঁর লেখাতেও ঢুকে পড়েছে বিষাদে মাখা এই বাক্য: “এখন বইমেলার যে অবস্থা হয়েছে, সেটা সত্যিই খুব দুঃখের বিষয়। কষ্ট দেয় আমাকে... একটা নতুন জনতা ওখানে ঢুকে পড়েছে, যাঁদের বইয়ের সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক নেই।... কেউ বই কিনতে নয়, শুধু খাবারের জন্য আসছে আর ভিড় করছে, সেলফি তুলছে। ...”
হরিপদ ভৌমিকের রচনা আবার শুরু হয়েছে বহুদিন আগেকার কথা দিয়ে, যখন বই কিনতে হত ছাপা-প্রেস থেকেই বা প্রকাশকের বাড়ি থেকে। ১৮১৯ সালে ‘সমাচার দর্পণে’ প্রকাশিত সেরকম একটি খবর দিয়ে শুরু হয়েছে তাঁর দীর্ঘ ও তথ্যবহুল প্রবন্ধটি। তাঁর লেখাতেই আছে, ১৯৭৬ সালে কলকাতা বইমেলা শুরু হওয়ার আগে, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট এরকম একটা বইমেলার আয়োজন করেছিলেন অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ (১৯৭৪); তাই দেখে পরের বছর ইউ এন ধর প্রকাশনার বিমল ধর সমমনস্ক প্রকাশকদের নিয়ে ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’ তৈরি করেন গ্রন্থমেলা করার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে। ১৯৮০ সালে রাজশেখর বসুর জন্মশতবর্ষে এম সি সরকারের স্টলে রাজশেখরের পাণ্ডুলিপির একটি চমৎকার প্রদর্শনী হয়েছিল, সে কথা উল্লেখ করেছেন হরিপদবাবু। লেখাটিতে ধরা আছে বইমেলার সামগ্রিক ইতিহাসের একটি রূপরেখা। এইরকম আর একটি লেখা আছে এই সংকলনে, লিখেছেন সুরজিৎ সেন। সেখানেও অনেক ইতিহাস, অনেক টুকরো স্মৃতি।
অমর মিত্রের লেখায় জানতে পারি, তিনি যখন প্রথম কলকাতা বইমেলায় গিয়েছিলেন, তখন সবে তাঁর দু-একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে এখানে সেখানে। পরপর কয়েক বছর বইমেলায় যেতে যেতে একদিন দেখলেন, তাঁর লেখা বইও এসে গেছে মেলায়, কিনে নিয়ে যাচ্ছেন অচেনা পাঠক। ১৯৭৬ সাল বা কাছাকাছি সময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি, যখন বইমেলায় ঢোকার টিকিট কাটতে দীর্ঘ লাইন পড়ত। আর একটি অদ্ভুত ব্যাপার তুলে ধরেছেন এই লেখক। তাঁর বইমেলার স্মৃতি “মৃত এবং জীবিতদের নিয়ে।” সেটা কীরকম? তিনি দেখলেন, “কত হারিয়ে যাওয়া লেখক স্বমহিমায় ফিরে আসছেন”। কারণ তাঁর বইয়ের খোঁজ করছেন পাঠকেরা— যেমন বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, রতন ভট্টাচার্য। তাই অমর মিত্রের অনুভব, “গুণী লেখকের পুনরুত্থান হয় বইমেলায়।” গিল্ড আয়োজিত ‘লেখক-পাঠক মুখোমুখি’ নামের চমৎকার অনুষ্ঠানের কথাও বর্ণনা করেছেন তিনি। বইমেলার কফিহাউস স্টলে লেখকদের দারুণ আড্ডার কথা পড়ে আক্ষেপ হয়, আর সে সব দিন ফিরে আসবে না।

অরণি বসুর লেখায় এসেছে বইমেলায় নানারকম চমকের কথা। সেটা কখনো সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মিনিবুক, কখনো এক টাকার ‘আনন্দমঠ’ কখনো আবার শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডুলিপি সংস্করণ। মেলায় প্রত্যেক দিন বেরোনো ‘প্রতিক্ষণিকা’-র (প্রতিক্ষণ থেকে প্রকাশিত ট্যাবলয়েড) কথাও মনে পড়েছে তাঁর। আর একটি খবর, এখন হয়তো সবাই ভুলে গেছি, উঠে এসেছে অরণিবাবুর লেখায়। বইমেলায় যেবার আগুন লাগে, তখন (১৯৯৭) একজন বিশেষ মানুষের লেখা প্রথম বইয়ের পুরো লট পুড়ে যায় তাঁরই চোখের সামনে। এর কিছুদিনের মধ্যে মানুষটিও প্রয়াত হন। তিনি আর কেউ নন, জনপ্রিয় অভিনেতা রবি ঘোষ। নির্মল হালদারও তাঁর লেখায় প্রত্যক্ষদর্শী রূপে ১৯৯৭-এর সেই আগুন লাগার ঘটনার কথা লিখেছেন বিস্তারিতভাবে। লিখেছেন বইমেলার মাঠে মহীনের ঘোড়াগুলির গানের কথা। এক সুবেশ ভদ্রলোক মেলার মাঠে ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’ চুরি করে ধরা পড়েছেন, প্রহাররত অবস্থায় তাঁকে দেখে সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ এসে নিজে বইয়ের দাম দিয়ে দিলেন, সে ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বই চুরি প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা লিখেছেন নির্মলবাবু।
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের লেখায় আবার অন্য রূপে ফিরে এসেছে বইমেলার গোড়ার কথা, সুবর্ণরেখার স্টলে ইন্দ্রনাথ মজুমদারের কথা, প্রতিক্ষণের স্টলের আড্ডা, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের নানা মজার মজার ঘটনা, বইমেলার দিনগুলিতে ‘প্রতিক্ষণিকা’ বা ‘সান্ধ্য আজকাল’ প্রকাশ, বই-বাজার। সুপ্রিয় চৌধুরী বলছেন, “ওই বইমেলার মাঠেই পুনর্যাত্রা শুরু মহীনের ঘোড়াদের”। কোনো একটা স্টলে ৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল একটা ছোট্ট বই, ‘আবার বছর কুড়ি পরে’। তার পাশে হিরণ মিত্রের আঁকা ছবি, আর টেবিল ঘিরে বসে আছেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জন ঘোষাল, আব্রাহাম মজুমদারের মতন সব “বুড়ো ঘোড়ার দল”। বাসবী চক্রবর্তীর লেখায় অনেক স্মৃতির টুকরো, অনেক ঘটনার বর্ণনা, লেখাটির শেষদিকে তিনি বলেছেন বইমেলা ৫০ বছরে পা দেবে ভাবলে যেমন মনে আনন্দের ছোঁয়া লাগে, আবার বিষাদও গ্রাস করে। কারণ “...ময়দানে বইমেলায় যে সৌন্দর্য আন্তরিকতা দেখেছি, তার চরিত্র কেমন যেন পালটে গেছে। ...বইমেলার মধ্যে যে আড়ম্বর, যে কর্পোরেট লুক দেখতে পাই— তা আমার মনকে ছোঁয় না। ... বইমেলায় কেন গাড়ির বিজ্ঞাপন, সরকারি স্টলে চিল-চিৎকারে গান ও নানা অপ্রয়োজনীয় হাবিজাবি স্টল থাকবে, বুঝে পাই না।” ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়ও লিখছেন, “মেলার মাঠে সেই সময়ে খাদ্যখাবারের দোকানের আধিক্য এখনকার মতো ছিল না।... এখন শুধুই বইমেলায় উপস্থিতির ক্রেজ আর খাদ্যখাবারের স্টলে ভিড়। বেড়েছে আয়োজকদের আধিপত্য এবং ধর্মীয় দল-উপদলের বাড়বাড়ন্ত।” তাঁর লেখাতে ফিরে এসেছে অতীতের বইমেলায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মজার ঘটনা, গানের খণ্ড আসর, মহীনের ঘোড়াগুলির কথা। সুশোভন অধিকারী মনে করিয়ে দিয়েছেন শিল্পীদের জমাটি আসর, ‘মঁমার্ত’-এর শিল্পের আখড়ার কথা। ছোটো এক স্টলে চটের ওপর বসে একমনে কার্ড এঁকে চলেছেন পূর্ণেন্দু পত্রী, ‘মহানগর’ পত্রিকা প্রকাশ করার পর্বে সমরেশ বসু বসে আছেন স্টলে—এইসব অমূল্য স্মৃতি পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন সুশোভন।
ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় তাঁর লেখা শুরু করেছেন বইমেলার গোড়াপত্তনের কথা দিয়ে। সেখানে এসেছে তাঁর পাবলিশার্স গিল্ডের সদস্য হওয়ার কথা, গিল্ডের ভেতরের ব্যাপার স্যাপার, কীভাবে বইমেলায় সরকার যুক্ত হল ইত্যাদি। রাণা রায়চৌধুরীর লেখায় নানা স্মৃতির সঙ্গে রয়েছে এই অভিযোগ বা আক্ষেপ: “বুকফেয়ারে আগের মতো শিল্পীরা আর ছবি আঁকে না। গিটার বাজিয়ে তরুণদের গানও গাইতে দেখি না। নেই মঁমার্ত। এখন শুধুই জলের পাউচ আর সতর্ক পুলিশ।” জয়ন্ত দে তাঁর স্মরণিকায় বলেছেন কিছু প্রকাশকের কথা— যেমন বামাচরণ মুখোপাধ্যায়, প্রিয়ব্রত ও স্বপ্না দেব। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, নিমাই ভট্টাচার্যের কথাও পাই তাঁর লেখায়। রঞ্জন আচার্যের লেখাটি মূলত লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে, তিনি নিজেও এরকম পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তৃষ্ণা বসাক লিখছেন, “প্রথম দর্শনে বইমেলাকে মনে হয়েছিল একটা অন্তহীন লাইব্রেরি যেখানে বই শুধু নাড়াচাড়া করা যায় না, কেনাও যায়।” তাঁরও অনুভব, “ময়দানের পর আর কোনও জায়গার মেলাকে আপন মনে হয়নি তেমন।”
বইমেলা নিয়ে এরকম একটি সংগ্রহযোগ্য সংকলনে আরও যার যার লেখা পড়ব বলে আশা করেছিলাম, তাঁরা হলেন যশোধরা রায়চৌধুরী, পলাশবরন পাল, অনিতা অগ্নিহোত্রী, রাজা ভট্টাচার্য, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, কৌশিক মজুমদার, অমিতানন্দ দাশ, রাহুল মজুমদার, শান্তনু ঘোষ ও দেবাশিস সেন। এঁরা প্রত্যেকেই সুলেখক, প্রত্যেকেরই বইমেলার সঙ্গে রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। হয়তো আগামী খণ্ডে এঁদের কারুর কারুর লেখা পাওয়া যাবে।
