• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share
  • শতবর্ষের স্মরণে--মহাশ্বেতা দেবী : কৌশিক সেন

    প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে আমি বাংলা সাহিত্যের একজন সাধারণ পাঠকমাত্র, বিশেষজ্ঞ আদৌ নই। সাম্প্রতিক কালের বাঙালি পাঠক সমাজে মহাশ্বেতা দেবী নামটি পরিচিত হলেও খুব সম্ভবত বহুচর্চিত নয়; যদিও তিনি ছিলেন পদ্মবিভূষণ, জ্ঞানপীঠ এবং ম্যাগসেসে পুরস্কারে ভূষিতা এবং তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস এযাবৎ কমপক্ষে পনেরোটি ভাষায় অনূদিত। এই বছরের ১৪ই জানুয়ারি তাঁর জন্মশতবার্ষিকী হয়ে গেছে। বীরসা মুন্ডা থেকে চোট্টি মুন্ডা অর্থাৎ ১৮৯৫ থেকে ১৯৭৫ অবধি আরণ্যক জীবনের যে ট্র্যাজিক মহাকাব্য তিনি তাঁর বইতে রেখে গেছেন তার প্রেক্ষিত এবং দ্যোতনা এখন আমাদের এই ২০২৬ সালের ডিজিট্যাল অস্তিত্ব থেকে অনেকটাই দূরে। কিন্তু, তা ছাড়াও পরিবেশ সচেতনতা এবং নারীবাদ, এই দুই এলাকায় তিনি এখনও পরিপূর্ণভাবে প্রাসঙ্গিক।

    বাংলা সাহিত্যে অরণ্য ধ্বংসের প্রসঙ্গটি এনেছেন অনেকেই। বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, বুদ্ধদেব গুহ আর সমরেশ বসুর লেখায় প্রান্তিক মানুষের প্রতি অবিচার-অত্যাচার আর সভ্যতার নামে শোষণের ছবি ফুটে উঠেছে, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে রোমান্টিক দুঃখবিলাসের সুরটিও শোনা যায়। মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় শুধুমাত্র ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা আর বস্তুবাদী উলঙ্গ সত্যের উপস্থিতি এবং তার উপরে জাদুবাস্তবতার অতি সামান্য অথচ নিপুণ প্রলেপ। সেইখানে বীরসা মুন্ডা “ধরতি-আবা” বা ভগবানের অংশ হয়ে ওঠে, চোট্টি মুন্ডার জাদুতীরে আস্ত একটা গ্রাম পুড়ে ছাই হয়। লেখিকা দেখিয়ে দেন যে এই সব অলৌকিক কাণ্ডকারখানা আসলে প্রতীকী, এর পিছনে রয়েছে বাস্তব বঞ্চনা আর প্রতিবাদের স্থিরচিত্র। মুন্ডাদের লিখিত ইতিহাস নেই, মুখে মুখে ফেরা কিংবদন্তী এবং কথকতার মাধ্যমেই তারা এক বিচিত্র বাগ্ময় পরম্পরা বজায় রাখে। শোষণের একের পর এক স্তর আছে, যার সার্বিক চেহারাটা বুঝতে পারলে বুকের মধ্যে আতঙ্কের শীতল স্রোত বহে যায়। বীরসা মুন্ডার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকও যেন অরণ্যের আত্মাকে এক ধর্ষিতা নারীর চেহারায় দেখতে পান--“হা, আমি অশুচি রে! দিকুতে সাহেবে মিলে বারবার অশুচ করে। আমার ছেলেদের ঘরছাড়া করে দিয়াছে। মোর কান্না কেউ শুনে না। মোরে চেয়ে দেখে না কেউ। ওয়ারা মোরে নেংটা বেবস্তা করে আকাশের নিচে ছেড়ে দিয়েছে। তুই মোরে লাজ দে!”

    কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপিকা এবং নারীবাদী সমাজকর্মী গায়ত্রী চক্রবত্রী স্পিভাক মহাশ্বেতা দেবীর ইংরেজি অনুবাদ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তিক জনজাতিগুলির উপর ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক শোষণের দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। সাহেবরা জঙ্গল কেটে চা বাগান বানিয়েছে, কোলিয়ারি খুলেছে কিন্তু তার এককাঠি উপরে দেশীয় জোতদার, মহাজন, বেনে, আড়কাঠি, পুলিশ, আমলা, ঠিকেদার, মুন্ডাদের ভাষায় ‘দিকু’রা মিলে চালিয়ে গেছে একচেটিয়া অত্যাচারের পর অত্যাচার। আদিবাসীদের জমি দখল করে তাদের দিয়েই জবরদস্তি বেগার খাটিয়েছে, চক্রবৃদ্ধি ঋণের ফাঁদে ফেলে বংশ পরম্পরায় ত্রীতদাসে পরিণত করেছে। এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অচ্ছুতদের যখন মূলধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে, তখনও আদিবাসীদের কেউ ভারতীয় বলে মনে করেনি, তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে মাথা ঘামায়নি কেউ। নিঃসীম দারিদ্র আর একচেটিয়া শোষণের হাত থেকে কিছুটা অন্তত রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল আদিবাসীদের সুপ্রাচীন সংস্কৃতি ত্যাগ করে খ্রিস্টান হওয়া। মহাশ্বেতা দেবী আবেগবর্জিত সরল ভাষায় বীরসা মুন্ডার মানসিক বিবর্তনের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। কেমন করে মিশনারিদের শিক্ষা পেয়েও সে তার আদিম উত্তরাধিকার ফিরে পেতে চাইল, কেন সে খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে মুন্ডাদের জাতীয় জীবন পুনরুদ্ধার করার জন্য ‘উলগুলান’ বা সর্বাত্মক বিপ্লবের ডাক দিল। কেমনভাবে সে তার আদি আরণ্যক সত্তাকে ফিরে পেল, ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্র আর মিশনারিদের ধর্মপ্রচার এই দুই শত্রুকেই একসঙ্গে চিহ্নিত করতে পারল। এসবের মধ্যে সুকৌশলে লেখিকা এনেছেন বাঙালি খ্রিস্টান অমূল্যকে, যে বীরসার সঙ্গে এক স্কুলে পড়েছে কিন্তু সভ্য মানুষ হিসাবে সে এখন ডেপুটি জেলার। তার কাজ বিদ্রোহী মুন্ডাদের জেলে পচিয়ে তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। অথচ তার ভিতরে এক বিবেকী কণ্ঠস্বর আছে যে বলে দেয়- “অরণ্যের অধিকার কৃষ্ণ ভারতের আদি অধিকার। যখন সাদা মানুষদের দেশ সমুদ্রের অতলে ঘুমচ্ছিল, তখন থেকে কৃষ্ণ ভারতের কালো মানুষরা জঙ্গলকে মা বলে জানে”। গুলি আর বেয়নেটের মুখে আদিবাসী বিদ্রোহ, সে মুন্ডাদের উলগুলান হোক বা সাঁওতালদের হূল, যে ছিন্নভিন্ন হবে এটা হয়তো প্রথম থেকেই জানা ছিল, তবুও যে নিরন্ন, সর্বহারা মানুষেরা সরল বিশ্বাসে তাদের জন্মগত অধিকার ছিনিয়ে আনার জন্য টাঙ্গি, বলোয়া, তীরধনুক আর বল্লম তুলে নেয়, তারা হয় ইতিহাসের ইন্ধন, তাদের প্রেরণা থাকে চিরকালীন। তথ্যবহুল উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’ এবং জীবনধর্মী লিপিচিত্র ‘চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর’, লেখিকার সামাজিক দায়িত্বপালনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

    মহাশ্বেতা দেবী তাঁর বলিষ্ঠ কলমে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের পাশে পাশে গত শতাব্দীর জনজীবনের মূলস্রোতে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার এক যন্ত্রণাময় কাহিনী শুনিয়েছেন। তাঁর সুপরিচিত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ সত্তর দশকের অতিবামপন্থী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা এক মর্মান্তিক উপাখ্যান, যার অভিঘাত সমসাময়িক দক্ষিণ গোলার্ধের অনেক দেশেই অনুভব করা যায়। কাহিনীর মূল চরিত্র সুজাতা একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের গৃহকর্ত্রী, তাঁর প্রিয় ছোটো ছেলে ব্রতী বাড়ির বাকি সকলের থেকে আলাদা। বাইরে তখন একদিকে চরমপন্থী নকশাল আন্দোলন, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দমবন্ধ পরিবেশ। সেখানে একদিন সুজাতাকে তাঁর ছেলের মৃতদেহ সনাক্ত করতে হয়, যা নাকি পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এক হাজার চুরাশি নম্বর রাজনৈতিক হত্যা। একদিকে আদর্শবাদী, কোমল স্বভাবের, মেধাবী, উনিশ বছরের ছেলে ব্রতী, অন্যদিকে হাজার চুরাশি নম্বর মৃতদেহ, যার গায়ে, মুখে ছুরি আর বুলেটের দাগগুলোর নিখুঁত বস্তুনিষ্ঠ বর্ণণা দিয়েছেন লেখিকা। এই দুইয়ের মধ্যে যে অসংখ্য প্রশ্নচিহ্ন আছে, উপন্যাসটি পাঠকের সামনে এনে সেগুলি হাজির করে কিন্তু কোনোরকম উত্তর মেলানোর প্রচেষ্টা সেখানে অনুপস্থিত। কীভাবে সভ্য এবং গণতান্ত্রিক নামধারী একটি প্রশাসনের অধীনে এইরকম পাইকারি হত্যাকাণ্ড ঘটে যেতে পারে? কেন অল্পবয়েসীদের শুধুমাত্র সন্দেহজনক অল্পবয়েসী হবার দোষে ইচ্ছেমতন হাজতে পুরে অকথ্য অত্যাচার চালানো যায়? কেন দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, যারা নাকি প্রতিবেশী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঘোরতর সরব, তারাই নিজেদের শহরে হাজার হাজার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য একটিও প্রশ্ন তুলতে, একটিও প্রতিবাদ দাখিল করতে অক্ষম? কেন নাগরিক অধিকার নিয়ে সমাজের উচ্চস্তরে একটিও নালিশ ওঠে না, সেখানে বইতেই থাকে অবক্ষয়ী বিলাসের স্রোত? উপন্যাসের শেষে এসে লেখিকা শুধু এই প্রশ্নগুলিই রেখেছেন-

    “--সুজাতার দীর্ঘ আর্ত হৃদপিণ্ড-ছেঁড়া বিলাপ বিস্ফোরণের মত, প্রশ্নের মত ফেটে পড়লো, ছড়িয়ে গেল কলকাতার প্রত্যয়ী বাড়ি-শহরের ভিতের নিচে ঢুকে গেল, আকাশপানে উঠে গেল। হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়লো রাজ্যের কোণ থেকে কোণে, দিক থেকে দিকে, ইতিহাসের সাক্ষী যত স্তূপের অন্ধকার ঘরে ও থামে, ইতিহাস ছাড়িয়ে পুরাণের বিশ্বাসের ভিতে। সে কান্না শুনে বিস্মৃত অতীত, গতকালের অতীত, বর্তমান, আগামীকাল, সব যেন কেঁপে উঠল, টলে গেল। প্রত্যেকটা সুখী অস্তিত্বের সুখ ছিঁড়ে গেল…”

    মহাশ্বেতা দেবীর রচনায় সমাজতান্ত্রিক মানবতাবাদ এবং নারীবাদ একসঙ্গে মিশে গেছে। প্রধানত তাঁর ছোটগল্পে তিনি যৌন অত্যাচারের বিষয়টি বার বার তুলে ধরেছেন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসাবে। ধর্ষণ শুধু ব্যক্তিবিশেষের উপর অত্যাচার নয়, পুরো জনগোষ্ঠীর উপর মানসিক অত্যাচার। ‘দ্রৌপদী’ গল্পে সরকারি গণধর্ষণের যে ভয়াবহ বিবরণ আমরা দেখি, সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য তার কাছাকাছি আসতেও ভয় পায়, একমাত্র মার্কেজে এবং অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকান লেখকদের কাজে এর তুলনা পাওয়া সম্ভব। তিনি এও দেখিয়েছেন যে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরে, পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে মেয়েদের শুধুমাত্র যোনি ও জরায়ুর সমষ্টি হিসাবে ব্যবহার করছে এবং কীভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক আধা পুঁজিবাদী আধা সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার গোড়াতেই রয়েছে মেয়েদের যৌনপণ্যে রূপান্তরিত করা। ‘গিরিবালা’ এবং ‘স্তনদায়িনী’ গল্পদুটিতে নারী শরীরের সম্পত্তিকরণ বিষয়টির মর্মস্পর্শী বিবরণ আছে। ঘরের ভিতরে গেড়ে বসা পিতৃতান্ত্রিক শোষণ বন্ধ না হলে ঘরের বাইরে পুঁজিবাদী শোষণ যে চলতেই থাকবে, লেখিকা সেই অস্বস্তিকর সত্যটিকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। মেয়েরা ব্যবহার ও বর্জনের জন্য জন্মায়নি, তারা পরিপূর্ণ নাগরিক, তাদের কল্যাণ সমাজের সার্বিক কল্যাণ।

    মহাশ্বেতা দেবী যে প্রশ্নগুলো চোখের সামনে তুলে ধরেছেন তাদের উত্তর খোঁজার দায়বদ্ধতা আমাদেরই রয়ে গেল কেননা অতীত আদৌ অতীত নয়, সে ভবিষ্যতের জননী। ইতিহাসের শিক্ষা উপেক্ষা করার স্পর্ধা যারা দেখায়, ইতিহাস পুনরাবৃত্তির অভিশাপ তাদের উপরেই বর্তাবে।



    নিবন্ধটি ২০২৬ 'নর্থ অ্যামেরিকা বঙ্গসম্মেলন'-এ পাঠ করা হয়েছে
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments