• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • নকশিকাঁথায় আঁকা জীবন : রঞ্জন ভট্টাচার্য (২)

    পথ ঢেকে যায় নকশিকাঁথায়;— পৃষতী রায়চৌধুরী ; প্রকাশক— লিরিক্যাল; হাওড়া ৭১১১০২; প্রচ্ছদ ও অলংকরণ- শুভঙ্কর চক্রবর্তী; প্রথম প্রকাশ— জানুয়ারি ২০২২; ISBN: 978-93-87577-52-7









    যা কখনো শুরুই হয়নি তা আর শেষ হবে কেমন করে!
    বানিয়ে তোলা বিলাপে নিষ্ফল সময় বয়ে যায়।
    কিন্তু তাই যদি বলো
    সবটাই তো বানিয়ে তোলা
    কেননা—
    শুরুও শূন্যে শেষও শূন্যে
    আর মাঝ পথটা
    বিলাপে বিলাপে ভরা চমৎকার এক ভাসমান নকশিকাঁথা
    পরতে পরতে বুনে যাওয়া।
                                                                                      (নকশি কাঁথা- শঙ্খ ঘোষ)
    জীবন একটি ভাসমান নকশি কাঁথা। শুরু এবং শেষ—দুই প্রান্তেই রয়েছে আদিম শূন্যতা। দুই শূন্যতার মাঝখানের সময়টুকুই হল মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও বিলাপে ভরা যাপন, যা মানুষ সুতোর বুননের মতো পরতে পরতে বুনে চলে। বুননের সৃজনে তৈরি হয় রকমারি নকশা— জীবনের মুহূর্ত ছবি।

    আত্মস্মৃতিকথা এরকমই শব্দের সুতোয় বোনা ছেঁড়া ছেঁড়া মুহূর্ত-ছবির নকশিকাঁথা। সৃজনের কুশলতায় ব্যক্তিগত বৃত্তের নিজস্ব রঙ-রূপ-রস-গন্ধের সংকীর্ণ পরিসর অতিক্রম করে তা পৌঁছে যায় সার্বজনীনতার অলৌকিক সঙ্গমে। স্রষ্টার জীবনের একক অভিজ্ঞতা পাঠককে বাধ্য করে ভাবতে, এ তো আমারও স্মৃতির আখরকথা। এরকমই একটি স্মৃতিকথার শাব্দিক অ্যালবাম পৃষতী রায়চৌধুরীর “পথ ঢেকে যায় নকশিকাঁথায়”।

    লেখিকার পূর্বপুরুষের ভিটে মুর্শিদাবাদ। মামার বাড়িও এই জেলারই প্রধান শহর বহরমপুরে। দক্ষিণবঙ্গের এই মফস্সল শহরে স্কুলের পাঠ শেষ করে উচ্চতর শিক্ষার জন্য লেখিকা পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতা শহরের যমজ হাওড়ার প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। সেখান থেকে আরও দূরের কানপুর আইআইটি হয়ে সাত সমুদ্র পেরিয়ে সুদূর আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া। শৈশব থেকে যৌবন— এই সময়বৃত্তে সম্মুখীন হওয়া নানান স্মৃতির ছবি, ছোটো ছোটো কাহিনি, শব্দের ক্যানভাসে লেখিকা আঁকতে চেয়েছেন ‘পথ ঢেকে যায় নকশিকাঁথায়’ স্মৃতিকথার ১৪৩টি পাতায়। আলাদা আলাদা শিরোনামে চিহ্নিত কাহিনিগুলির সূচিপত্রটিও একটি বিশেষ নামে অলংকৃত। সূচিপত্রের নাম এই প্রথম চোখে পড়ল। নামটিও আকর্ষণীয় — ‘জীবনপথের স্টেশনগুলি’। ঠিকই তো — মানুষের জীবন তো অনেকটা নানান স্টেশনকে ছুঁয়ে দূরের অজানা গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা ট্রেনের মতোই। বইয়ে সংকলিত আটটি ছোটো ছোটো পর্ব ক্ষণিকের জন্য থেমে যাওয়া সেই সব স্টেশন। কয়েকটির শিরোনাম এইরকম ‘লাল পাহাড়ির দেশে’, ‘মনকেমন ইস্কুলবেলা’, ‘সুতানুটি জংশন’, ‘এবার ফিরাও মোরে’। নামগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নস্টালজিয়ার আবেগ মিশে রয়েছে প্রত্যেকটি অংশের কাহিনি শরীরে। প্রত্যেকটি পর্বের শুরুতে রয়েছে বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, কবিতার প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ও কখনও কখনও শুভঙ্কর চক্রবর্তী চিত্রিত আলাদা আলাদা কভার। শুভঙ্কর চক্রবর্তীর প্রচ্ছদ ও পাতা জোড়া অসংখ্য ছবি বইটির পাঠ অভিজ্ঞতায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

    লেখিকা পৃষতী রায়চৌধুরীর বাবা রেলে চাকরি করতেন। সেই সূত্রেই তাঁর পরিচয় ‘লাল পাহাড়ির দেশে’-র সঙ্গে। তাঁর শৈশবের কয়েকবছর কেটেছে ঝাড়খণ্ডের বড়জামদায়। পাহাড় ও সারান্ডা জঙ্গল ঘেরা এই শহরের পড়শী চাঁইবাসা বা কিরিবুরু-মেঘাতবুরুর নাম পর্যটন প্রিয় বাঙালির স্মৃতিকথায় জায়গা করে নিলেও রেলশহর বড়জামদা জংশন অবহেলিত রয়ে গেছে। লেখিকার স্মৃতিকথায় বড়জামদার প্রকৃতি ও জীবন জায়গা করে নেওয়া এই লেখকের কাছেও বেশ তৃপ্তিদায়ক। বহুবার বড়জামদা ছুঁয়ে চলে গেছি এদিক-ওদিক কত জায়গায়।

    কোয়ার্টার জীবনে অভ্যস্ত প্রবাসী কর্মচারী বাঙালির বেঁধে বেঁধে থেকে নিজেদের জাতিগত আত্মপরিচয়কে টিকিয়ে রাখার একটুকরো ছবি লেখিকার স্মৃতির পথ ধরে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। সঙ্গে অন্তত একটি অভূতপূর্ব বিষয়ও পাঠককে বিস্মিত করবে — হাতির হকারি। না, হাতি হকার না, বিক্রেতা মানুষই। হাতির পিঠে সওদা চাপিয়ে বিকিকিনির এই দৃশ্য কতজনই বা দেখেছেন। লেখিকা নিজের ছোটোবেলায় দেখা সেই দৃশ্যের খুব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর লেখায়, “হাতির পিঠে সওদা থাকত নানা রকম। মিষ্টি, বাসনপত্র, মণিহারি। সে ছিল এক অদ্ভুত ভ্রাম্যমাণ বিপণি। হাতির পিঠে চাপানো কাচের বাক্সের মধ্যে দিয়ে দেখা যেত শোনপাপড়ি, প্যাঁড়া, লাড্ডু, গুজিয়া। হাতির পিঠে বসে থাকা মাহুত কাম দোকানদার হাঁক পাড়ত মিঠাইইইই-মিঠাইইইইই।”

    এই পর্বেই, বড়জামদা নয়, লেখিকার পৈতৃক ভিটে মুর্শিদাবাদের পাঁশলা গ্রামে অনুষ্ঠিত দুর্গাঠাকুর বিসর্জনের ছবিটিও অন্যরকম। আমার তো নয়ই অন্যকারোর অভিজ্ঞতাতেও বোধহয় এর উদাহরণ নেই। লেখিকার স্মৃতিতে ধরা সেই ছবি— “দশমীর দিন ঠাকুর বিসর্জনটা একটু অন্যরকম ভাবে হত এই গ্রামে। সকালে ঘট বিসর্জন হত লগ্ন মেনে,যেমনটা হয় সব জায়গায়। কিন্তু সন্ধেয় গ্রামের দিঘিতে ঠাকুর বিসর্জন দেওয়ার সময় কোনও নাচ-গান-উন্মাদনার ব্যাপার ছিল না। বিসর্জনের পর গ্রামের সবাই শান্তভাবে লাইন করে গ্রামে ফিরে আসত। লাইনের প্রথমে থাকতাম আমরা বাচ্চারা, তারপর মেয়েরা, সবশেষে পুরুষরা। ফেরার সময় সবাই একটা গান করতে করতে ফিরত। না কোনও জয়-মাতাদি টাইপ ভক্তিগীতি নয়। দেশাত্মবোধক গান একখানি। ধনধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক…। সকলেই সে কী আবেগ নিয়ে গাইত এই গান।”

    লেখিকার জন্ম ১৯৭৭ সালে। বড় হয়ে ওঠার সময় ৮০-৯০ দশক। তাঁর স্মৃতিকথায় এমন অনেক বিষয় উঠে এসেছে যা এই সময় জীবন ও সমাজকে কাছ থেকে দেখা অনেকের স্মৃতিকে উসকে দেবে নস্টালজিয়ার আবেশে। আনন্দমেলা পত্রিকার পাতায় কাকাবাবু-সন্তুর সঙ্গী হয়ে সকাল, দুপুর, সন্ধে কাটানোর স্মৃতি তো আমাদের অনেকেরই। এই পর্ব জুড়ে শহর বহরমপুরের ছবি লেখিকার ক্যানভাসে লাইন ড্রয়িং-এর মতো সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। পারিবারিক জীবনে প্রথম গ্যাস ওভেন আসার ছোট্ট বর্ণনা এই আলোচককে মনে পড়িয়ে দিয়েছে ৯০-এর দশকে গ্রামীণ ভাড়াটে ঘরে গ্যাস ও ওভেন আসার প্রায় উৎসব উৎসব সুখস্মৃতিটি।

    এরপর লেখিকার জীবন স্থানান্তরিত হয়েছে হাওড়া শহরের বি ই কলেজে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্নাতক শিক্ষার্থী হিসেবে এখানকার হোস্টেল জীবন, ছবির মতো প্রাচীন বি ই কলেজের প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গথিক ভবন, লর্ডসের মাঠ, বড় বড় ঝিল, ক্লক টাওয়ার — ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো পাঠককে মুগ্ধ করবে। এইখানেই যে একসময় বিশপ কলেজের ছাত্র ছিলেন মধুসূদন দত্ত তাও জানলাম লেখিকার লেখা থেকে। একইরকম ভাবে কানপুর আইআইটি ও আমেরিকায় পিএইচডির ছাত্রী হিসেবে প্রবাস জীবনের বর্ণনা এই স্মৃতিকথার উল্লেখযোগ্য দুটি পর্ব। লেখিকা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিশেষ একটি বিভাগ জিয়ো-টেকনোলজির ছাত্রী ছিলেন। বাড়ির গঠনে ভূমিকম্পের সুরক্ষা বিষয়ক এই গবেষণার কিছু কিছু বিশেষ বিষয় লেখিকার লেখায় উঠে এসেছে ক্যালিফোর্নিয়া জীবনে।

    গল্প-উপন্যাসের তুলনায় স্মৃতিকথা পাঠে একধরনের নির্ভার ভালো লাগার স্বাদ পাওয়া যায়। পৃষতী রায়চৌধুরীর এই স্মৃতিকথার সময়ের সুতোয় বাঁধা ক্রমশ ছোটো বৃত্ত থেকে বড় বৃত্তে অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া ছোটো ছোটো কাহিনির নির্ভার কথকতা সহজিয়া মুগ্ধতা তৈরি করে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments