




মাহি ক্লাস থ্রিতে পড়ে। একেবারে পাকাবুড়ি, বেশ চঞ্চল আর খুব বকবক করতে পারে! সবসময় এটা-সেটা প্রশ্ন করে করে মা-বাবা আর চেনা সবাইকে অস্থির করে তোলে! মাহি দিদার বাড়িতে বেড়াতে গেলে মামারা বলেন, “এই রে মাহি বাড়ি এসে গেছে! এবার ওর প্রশ্নের ঠেলায় আমরা খড়কুটোর মতন উড়ে যাব!”
মাহির অবশ্য প্রশ্ন করা ছাড়া আরেকটা বিশেষত্ব আছে এবং সেটা হল ওর চুল। মাহির চুল বেশ বড়ো আর ঘন। সেই চুলের ও তো আর দেখাশোনা করতে পারে না, তাই ওর মাকেই সব করে দিতে হয়। চুলে শ্যাম্পু করে দেওয়া, আঁচড়ে দেওয়া, বেঁধে দেওয়া, সব কিছু। তবে ওই চুল নিয়ে মাহির বেশ গর্ব। মা অবশ্য অনেক সময় বলেন, “এখন তো তুমি ছোট তাই এখন কেটে দিই। বড়ো হয়ে যখন নিজের যত্ন নিতে পারবে তখন রেখো। চাইলেই বড়ো করতে পারবে। এখন গরম লাগে, জট পাকিয়ে ফেলো, আমি আর সামলাতে পারছি না বাপু!”
সত্যি চুল নিয়ে প্রচুর ঝামেলা। পিসির ছেলে টিটো মহা দুষ্টু। দিল মাহির চুলে চিবানো চুইং গামের দলা লাগিয়ে! সে এক হলুস্থুল কাণ্ড। অতি কষ্টে চুল থেকে সব ছাড়ানো হল। মাহির তো সে কী কান্না! টিটোও প্রচণ্ড বকুনি খেল। রোজ স্কুলের পুল-কার এসে দাঁড়িয়ে থাকে, কি না মাহির চুল বাঁধা হচ্ছে! ড্রাইভার পোলোদা রোজ রেগে গিয়ে বলে, “মাহি, কাল থেকে আর তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারব না কিন্তু!” মাহি পরের দিনটা হয়তো একটু তাড়াতাড়ি করে, দুয়েকদিন বাদে আবার যে কে সেই!
কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলের জন্যই সব সমস্যা কিন্তু মাহি কিছুতেই চুল কাটতে দেবে না। সে বলে কিনা, “আমার বড়ো চুল ভালো লাগে। আমাদের ক্লাসে কারো এত বড়ো চুল নেই।”
শীতকালে চুল শুকাতে দেরি হয় বলে মাহির প্রায়ই ঠান্ডা লেগে যায় কিন্তু তাও মাহির ভ্রূক্ষেপ নেই। চুল সে কিছুতেই কাটবে না। মা-বাবা বলে বলে হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
সেদিন স্কুল থেকে ফিরে মাহি চুপ করে বসেছিল। সেটা একটা বেশ অদ্ভুত ব্যাপার কারণ মাহিকে চুপ করে বসে থাকতে খুব একটা দেখা যায় না। তাই ওকে ওইভাবে দেখে মাও বেশ আশ্চর্য হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে মাহি? শরীর খারাপ লাগছে?”
মাহি মাথা নেড়ে বলল, “না।”
তারপর বলল, “আচ্ছা মা, আমি কেন বার্ষিক উৎসবে কোন প্রাইজ পাই না? তোর্সা, দিয়া, আইরিন সবাই প্রাইজ পাচ্ছে!”
মা শুনে বললেন, “পড়াশোনা করবে না, সব সময় খেলবে তো আর কী হবে? জানা অঙ্ক সব ভুল করে আসবে, জানা উত্তর না লিখে চলে আসবে, তাহলে কী আর প্রাইজ পাওয়া যায়? ওগুলো যারা মন দিয়ে পড়াশোনা করে তাদের জন্য!”
মাহি আর কিছু বলল না।
মার তারপর মনে হয় একটু খারাপ লাগল, বললেন, “দুষ্টুমিটা একটু কম করলে তুমিও প্রাইজ পাবে। যাকগে ও নিয়ে আর মন খারাপ করো না। খেয়ে নাও। আমাকে আজ ট্রেন-এ করে পাটনায় বড়োমামুর বাড়ি যেতে হবে, মনে আছে তো? খুব ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে বাবা আর দিপু পিসির সঙ্গে, কেমন?”
মাহি ঘাড় নেড়ে “হ্যাঁ” বলল।
সেদিন রাতে মার ট্রেন ধরার তাড়া, গন্ডগোল, সব মিলিয়ে আর মাহির সঙ্গে তেমন কথা হল না। মা পাটনায় বড়োমামুর বাড়ি চলে গেলেন মামুর অপারেশন বলে।
সাত দিন বাদে মা যখন বাড়ি ফিরলেন তখন মাহি স্কুলে চলে গেছে। স্কুলের ছুটির সময় মা যেমন পুল-কারের থামার জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা করেন সেইরকম গিয়ে দাঁড়ালেন।
গাড়ি থেকে যে মাহি নামল তাকে দেখে মা একটু অবাকই হলেন। মাহির মাথায় স্কার্ফ বাঁধা।
ওখানে আর কিছু বললেন না কিন্তু বাড়িতে ঢুকেই মা জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল মাহি, ঠান্ডা লেগেছে বুঝি? মাথায় স্কার্ফ বেঁধেছো কেন?”
মার কথা শুনে মাহি এক টানে মাথার স্কার্ফটা খুলে ফেলতে মা দেখলেন মাহির মাথা সম্পূর্ণ ন্যাড়া! সব চুল কেটে সাফ!
ভীষণ রেগে গেলেন মা, “এটা কী করেছো তুমি! সব চুল কেটে ফেলেছো কেন? আর আমাকে কেউ কিছু বলল না কেন? তুমি আর বাবা তো রোজ দুবেলা করে আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলছ কিন্তু এসব করেছ তো বলনি!”
মাহির চোখে জল, ফুঁপিয়ে কেঁদে সে শুধু বলল, “তুলির জন্যে কাটাতে হল!”
“মানে?”
“তুলি ক্লাসে আসছিল না বেশ কয়েকদিন। ওর অসুখ করেছিল। তারপর যখন এল তখন ওর মাথাটা ন্যাড়া! খুব দুঃখী লাগছিল ওকে। আর ক্লাসের ছেলেগুলো এত বদমাইশ যে ওকে খেপাচ্ছিল ‘বেলতলায় আবার যাবি নাকি’ আর আরো বাজে বাজে কী সব বলে। তাই আমি আর রুচি ঠিক করলাম যে আমরাও চুল কেটে ফেলে ন্যাড়া হয়ে যাব! তখন আর ওরা শুধু তুলিকে খেপাতে পারবে না! আমি একা কাটিনি মা, রুচিও কেটেছে চুল। আজ ওরা কোথায় একটা যাবে তাই ওর মা স্কুল থেকে ওকে তুলে নিয়ে গেছেন বলে ও পুলকারে ফেরেনি। তুমি কাল দেখো!”
মাহির মা চুপ করে গেলেন ওর কথায়। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। যে মাহি শত পীড়াপীড়িতেও চুল কাটাতে চাইত না সে কিনা বন্ধুর দুঃখে দুঃখী হয়ে এক কথায় সব চুল কেটে ফেলেছে!
মা কিছু বললেন না দেখে মাহি ভয়ে ভয়ে বলল, “আমাদের চুল আবার গজিয়ে যাবে মা। কিন্তু তুমি যদি তুলিকে দেখতে! আমাদের দেখে ওর মুখে কেমন সুন্দর হাসি ফুটেছে! আর জানো পার্লারের আন্টি বললেন আমার কাটা চুলগুলো দিয়ে তুলির মতন বাচ্চাদের জন্যে উইগ তৈরি করা হবে। আমার ক্লাস টিচার তোমাদের জন্যে একটা চিঠি দিয়েছেন। সেটা বাবার কাছে আছে। অফিস থেকে ফিরলে দেখাবে তোমাকে, ওটা সারপ্রাইজ!”
এবারের স্কুলের বার্ষিক উৎসবে স্টেজে উঠে প্রিন্সিপালের হাত থেকে প্রাইজ নিয়েছে মাহি আর রুচি।
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলেছিলেন, “হিংসায় ভরে ওঠা পৃথিবীতে ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের কী অপরূপ উদাহরণ রেখেছে দুটো আট বছরের বাচ্চা মেয়ে! ওদের কাছ থেকে আমাদের বড়োদের শেখা উচিত। বন্ধু তুলি অসুস্থ হয়ে কেমোথেরাপিতে সব চুল হারিয়ে স্কুলে ফিরতে, ওকে যখন ক্লাসের অন্য বাচ্চারা খেপাচ্ছিল তখন এই দুজনের কোমল মনে গভীর আঘাত লেগেছিল। ওরা অসমসাহসী, ওরা বন্ধুকে দুঃখের মধ্যে একলা ফেলে রেখে দিতে রাজি নয়, তাই ওরা নিজদের সুন্দর চুল বিসর্জন দিয়ে বন্ধুর হাত ধরে দাঁড়িয়েছে! সেই জন্যেই এ বছরের দৃষ্টান্তমূলক কাজের পুরস্কার মাহি ঘোষ আর রুচিস্মিতা সরকারকে দেওয়া হচ্ছে। আরেকটা কথা আমি খুব আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে তুলি সম্পূর্ণ সেরে উঠেছে এবং সে এখন নিয়মিত স্কুলে আসছে।”
দুই ন্যাড়া-মাথা বন্ধু যখন হাত ধরে স্টেজে প্রাইজ নিতে উঠেছিল তখন হাততালিতে ফেটে পড়েছিল হলঘর।