• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৬৬ | মার্চ ২০১৭ | উপন্যাস
    Share
  • আয়নার ভিতরে : কৌশিক সেন


    ‘খোয়াই বলে একটা কবিতা আছে না?’ রিক্সায় উঠতে উঠতে আনমনে প্রশ্নটা করেছেন বিভাস। সমাদৃতা হাসি সামলাতে পারলেন না।

    ‘তুমিই তো আমায় শুনিয়েছিলে টুকুদা। ভুলে গেছো? আমাদের সেই মনে মনে শান্তিনিকেতন ভ্রমণ। বই পড়ে পড়ে জায়গাটাকে তো মনের মধ্যে ম্যাপ করে ফেলেছিলে তুমি।’

    ‘আশ্চর্য, এখন একটা লাইনও মনে আসছে না।’ বিভাস বললেন।

    সমাদৃতা মনে করার চেষ্টা করালেন। রিক্সাটা চলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে গায়ে একটা সুন্দর হাওয়া লাগছে। গাছের পাতায় একখন বিকেলবেলার রোদ্দুর, আকাশে খেয়ালী মেঘের আলপনা, ছায়াগুলো রুক্ষ মাটির ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে রয়েছে। দেখতে দেখতে কবিতার শেষ কয়েকটা লাইন মনে এসে গেল এতদিন বাদেও।

    ‘তার পরে রইবে উত্তরদিকে
    ওই বুক-ফাটা ধরণীর রক্তিমা
    পুব দিকের মাঠে চরবে গরু
    রাঙামাটির রাস্তা বেয়ে
    গ্রামের লোক যাবে হাট করতে
    পশ্চিমের আকাশপ্রান্তে
    আঁকা থাকবে একটি নীলাঞ্জনরেখা।’
    ‘অর্থাৎ সবকিছু থাকবে শুধু পর্যবেক্ষকটি থাকবেন না। এ রকম হয় না যে সবকিছু বদলে যাবে কিন্তু যে দেখছে সে একই রকম থাকবে।’ বিভাস ওইরকমই অন্যমনস্ক গলায় বললেন। ‘আসলে দুটোর কোনটাই হয় না। সে খোয়াইও নেই সে কবিও নেই, রাঙা মাটির পথে পীচঢালা হয়ে গেছে অনেকদিন। কিন্তু সবকিছুর কধ্যে সেই দিনের একটা আভাস থেকে গেছে। সেটুকুর জন্যেই তো আমরা ঝাঁকুনি খেতে খেতে এসেছি।’ সমাদৃতা ধুলো বাঁচাবার জন্য আঁচল দিয়ে নাকটা ঢেকে নিয়েছেন, ওঁর খুব সহজে অ্যালার্জি হয়ে মাথা ধরে যায়।

    ‘তিতলি, তোমাকে যে চোখে দেখছি, তোমার গা ছুঁয়ে দেখছি কিন্তু তাও মাঝে মাঝে ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুমি সত্যিই আছো। সেদিন যদি বাসে না উঠে তোমার সঙ্গে কফি খেতে যেতাম, আবার নতুন করে কথা শুরু হতো, তাহলে জীবনটা একেবারে অন্যরকম হয়ে যেত বোধহয়। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে সেই অন্যরকম জীবনটা যেন আমার কাছে ফিরে এসেছে কিন্তু তার পেছনে প্রেতের মতন উঁকি মারছে আরেকটা জীবন।’ বিভাসের গলার মধ্যে বিস্ময়ের রেশ। ‘বুড়োবয়েসে ভীমরতি হলে ওইরকমই অদ্ভুত লাগে।’ হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিলেন সমাদৃতা। রিক্সা থেমেছে সাইনবোর্ড লাগানো একটা ছিমছাম একতলা বাড়ির সামনে। সমাদৃতা রিক্সা থেকে নামতে না নামতেই পরিষ্কার সাদা শাড়ি পরা দুই ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দাঁড়িয়েছেন, তাদের পিছনে এক হাস্যমুখ মাঝবয়েসী ভদ্রলোককেও দেখা যাচ্ছে।

    ‘এই আমার প্রজেক্ট অফিস, এঁরা আমাদের স্টাফ। পরিচয় করিয়ে দিই, নার্স অসীমা সরকার, মিডওয়াইফ শর্বরী দত্ত আর ফার্মাসিস্ট ব্রজেন গাঙ্গুলি। এছাড়ার পাঁচজন ফিলড ওয়ার্কার আছেন। আর ইনি আমার বিশেষ বন্ধু, কলকাতার বিখ্যাত সার্জন ড: বিভাস দাশগুপ্ত।’

    সকলে নমস্কার করে বসলেন, চা সিঙ্গাড়ার সঙ্গে কথাবার্তা শুরু হলো। এই প্রজেক্টটা বেশ ভালো ফান্ডিং পেয়েছে, দেশের নানা জায়গায় এদের সেন্টার আছে, মূলত ট্রাইবাল মহিলা আর শিশুদের নিয়ে এঁরা কাজ করেন। কথা শুনছেন বিভাস, মাঝে মাঝে দু একটা মন্তব্যও করছেন কিন্তু ওঁর মন এখানে নেই। কিছুদিন বাদেই সমাদৃতা বুঝতে পারলেন যে বিভাস অন্যমনস্ক।

    ‘আজ তাহলে এই পর্যন্তই থাক। কাল সকালে দেখা হবে।’ উৎসাহী বক্তাদের এক এক করে চুপ করিয়ে যখন ওঁরা বেরলেন তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। বিভাসের ড্রাইভার ঠিক সময়ে গাড়ি নিয়ে হাজির, ওদের গন্তব্য রাঙামাটি গার্ডেন রিসর্ট। ঘন্টাখানেক বাদে ওঁদের ডিনার টেবিলে একসাথে বসে থাকতে দেখা যাবে। মোমের আলোয় ওদের দুজনকেই গম্ভীর দেখাচ্ছে, কিন্তু দুজনের মনের মধ্যে সংযোজনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে এখন। এক এক সময় কথা থেমে যাচ্ছে, নীরব মগ্নতায় ওঁরা সেই স্রোতের মধ্যে ডুবে থাকছেন । তারপর আবার কথাবার্তা শুরু হচ্ছে কিছুক্ষণ বাদে।

    ‘তার মানে দেখা যাচ্ছে বিয়ে সংসার করা আমাদের দুজনের কারোরই ধাতে সইল না, তাইতো? মাঝবয়েসে এসে আমরা আলাদাভাবে যে যার সংসার ভাঙলাম। আচ্ছা, তুমি কি ভেবে দেখছো যে আমাদের এই অনুত্তীর্ণ সম্পর্কগুলোর মধ্যে সংঘাতের জায়গাটা ঠিক কোথায় ছিল? যদি এর মধ্যে প্রথম থেকেই প্রতারণা থাকতো, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মামলা হতো, তাহলে হয়ত এর মানে করা যেত কিছু একটা। কিন্তু এসবের কিছুই তো প্রথমে হয়নি তিতলি, না আমার জীবনে না তোমার। প্রথমে আমরা পরস্পরের থেকে দূরে সরেছি, তৃতীয় ব্যক্তি এসেছে তার পরে, সেই ফাঁকা জায়গাটা ভর্তি করতে। লিপি যা করেছে তার জন্য ওদের আমি দোষ দিতে পারি না। আমাদের মধ্যে ভালবাসা বহুদিন যাবৎ ম্যালনিউট্রিশনে ভুগছিল।

    ‘এ নিয়ে আমিও অনেকবার ভেবে দেখেছি টুকুদা, কোনো লাভ হয়নি। সময় আর সৃজনশীলতা, এই দুটোই তো ভালবাসার খাদ্য আর পানীয়, তাই আমাদের যুগে তার ম্যালনিউট্রিশন ঠেকায় কে? আমরা শুধু চাপ বুঝি, যা কিছু করি চাপের ওপর করি। আমার মনে হয় চাকরি বলো আর সংসার বলো, মানুষ বাধ্য হয়ে যা করে সেটাই আপাতত টেঁকসই, তার ওপরেই সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে। বেশিভাগ সংসারই তো প্রেমহীন ছেলেমেয়ে মানুষ করার কারখানা কিন্তু এই যান্ত্রিকতার মধ্যেই লোকে দিব্যি জীবন কাটায়। সন্দীপকে আমি তো ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম যেমন তুমি করেছিলে লিপিকে। অমর প্রেম শুধু সিনেমাতেই হয়, আসলে অন্য সবকিছুর মতন ভালোবাসাও মরণশীল। কিন্তু ভালোবাসার একটা ভূত আছে, যে মৃত্যুর পরেও শাস্তি দেয় না, প্রতিদিন নানা ছুতোয় হিমঘরের দরজা খুলে মৃতদেহটাকে দেখিয়ে দেয়। তখন একটা অসহ্য কষ্ট হয় জানো, মনে পড়ে যায় একদিন ও কতো জীবন্ত ছিল, কি অসীম উষ্ণতা ছিল ওর মধ্যে। আমি তার চেয়ে একলা থাকাই পছন্দ করেছি, যদিও একলা থাকায় কষ্ট কম নয়। যাক গে, এবার তোমার কথা বলো।’

    ‘তিতলি আমার ব্যাপারটা আমি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। লিপিকে আমি ছেড়ে দিয়েছি না ওই আমাকে ছেড়ে গেছে এটাও আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট নয়। আমার জীবনের ঘটনাগুলো কেমন যেন মাঝখান থেকে তালগোল পাকিয়ে গেছে এখন কিন্তু এসবের মধ্যে আপাতত আমার একটাই ফোকাস একটাই ভরসা--এইরকম ম্যাজিক্যালি তোমাকে ফিরে পাওয়া। বাকি সবকিছু আমার কাছে অবান্তর মনে হচ্ছে এখন। অথচ এটাও বুঝছি যে হিসেবের খাতায় কোথাও একটা বিরাট গরমিল রয়েছে, ফাঁকতালে যেন বাদ পড়ে গেছে খানিকটা সময়।’

    ‘তুমি তো আগে এইরকম হেঁয়ালি করে কথা বলতে না টুকুদা। তোমার কি মেমরির কোনো প্রবলেম হচ্ছে, মানে সাধারণ জিনিস ভুলে যাচ্ছ নাকি আজকাল?’ শঙ্কিত গলায় বললেন সমাদৃতা, পরিচিত একটা অসুখের নাম হঠাৎ ভেসে উঠলো মনের ভেতর। বিভাস চিরদিন তীক্ষ্ণধী আর স্পষ্টবাক, কাটা কাটা যুক্তি দিয়ে কথা বলা ওর অভ্যাস। সেই মানুষ যেন একটু আগে খোয়াইতে দেখা বাউলটির মতন রহস্য করছে। ওর বিভ্রান্তিটা বুঝতে পেরেই যেন প্রায় জোর করেই হেসে উঠলেন বিভাস।

    ‘বোধহয় আমার আলঝাইমার্স ডিমেনসিয়া হচ্ছে তিতলি।’

    ‘নট ফানি টুকুদা।’ সমাদৃতা চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘আমি জানি তোমরা ডাক্তাররা নিজেদের সবজান্তা ভাবো কিন্তু তোমাদেরও একটা করে শরীর আছে, সেটা খারাপও হয়। আচ্ছা, তোমার বন্ধুকেও তো দেখাতে পারো।’

    ‘বন্ধু মানে সমু। তাহলেই হয়েছে, ও আবার লিপিকে খবর দেবার কথা তুলবে। না তিতলি, আমার যাই হয়ে থাকুক সেটা আমায় নিজেকে আবিষ্কার করতে দাও। জানো, রোজ সকালবেলায় চোখ মেলার সঙ্গে সঙ্গে কেমন একটা অজানা রহস্যের শিহরণ টের পাই। যেন এই দিনটা আসছে একটা পরিপাট করে প্যাক করা উপহারের মতন, তার মধ্যে কি থাকবে আমি জানি না, কিন্তু যাই থাক আমার ভালো লাগবে। এরকম করে ভাবতেই ভুলে গেছিলাম জানো। দিনগুলো আসতো হয় অফিসের ফাইল, নগ্ন বাজারের ফর্দ হাতে নিয়ে। না: স্বপন যদি মধুর এমন হোক সে মিছে কল্পনা। জাগিও না আমায় জাগিও না।’

    ‘তোমাকে মাঝবয়েসের ভূতে ধরেছে। বোধহয় আমাকেও।’ লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন সমাদৃতা, ‘নাহলে তোমার সঙ্গে আসতে রাজি হই! না টুকুদা, অ্যাডভেঞ্চার করার বয়েস গেছে আমাদের, হয়তো যে যার জীবনে ফেরত যাওয়াই সবচেয়ে ভালো। দরজা এখনও তো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখন কি মনে হয় জানো? আমাদের সম্পর্কের ভাঙন ধরার পিছনে সন্দীপের যতটা দায়দায়িত্ব ঠিক ততটাই বোধহয় আমার। সংসারের চারদিকে জমিয়ে তোলা প্রাণহীন মালপত্রের বোঝা আর ইমোশন্যাল একঘেয়েমি কাটানোর জন্য শুধু সেটাকে ভেঙে ফেলাই যথেষ্ট নয়। আমি নিজেকে খুব অন্যরকম ভাবতাম কিন্তু শেষ অবধি নতুন কি করলাম বলো? পাপুর জীবনটাও মাঝখান থেকে জটিল করে ফেললাম।’

    ‘তিতলি, ধরে নাও তুমি এসব কিছুই করোনি। হয়তো মনে মনে ভাবতে কিন্তু সত্যিকারের কিছু করার মতো না ছিল সাহস, না ছিল সময়। হঠাৎ একদিন সকালে উঠে দেখলে সবকিছু আপনা থেকে ওলটপালট হয়ে গেছে, তুমি ছাড়া কিছুই আর আগের মতন নেই। তাহলে কিরকম হতে পারে ভেবে দেখেছো?’

    সমাদৃতা একটু ঘাড় নাড়লেন। ওঁর বড়ো বড়ো চোখগুলো দেখেই বোঝা যায় এইরকম অদ্ভুত কথা উনি বাপের জন্মে শোনেননি।

    ‘হয়তো আমাদের এই হিসেবী কথা, নিয়ম-মানা জীবনের ঠিক পাশেই আরেকটা সমান্তরাল জগৎ আছে, যেখানে একই জীবন উলটো খাতে বয়ে যায়। একটা বইয়ের পাতা খুলে যদি আয়নার সামনে ধরো তাহলে বইটা একই রকম থাকবে কিন্তু অক্ষরগুলো উলটে যাবে তাই না। অনেকটা সেই রকম।’

    ‘তুমি আমার লেগ পুল করছো।’ এবারে হেসে উঠলেন সমাদৃতা, ‘আবোলতাবোল বকে আমার মাথাটা গুলিয়ে দিতে চাও। আসলে আমরা খুব খারাপ, যে যার সংসার ছেলেমেয়ে ছেড়ে শান্তিনিকেতনে প্রেম করতে এসেছি। অনেক হয়েছে এবার ঘরে চলো।’

    ভোরের ঠিক আগে, তন্দ্রা আর জাগরণের মধ্যে যখন চোর-পুলিশ খেলা হয়, ঠিক সেই সময়টায় খুব সন্তর্পণে উঠে পড়লেন বিভাস। সমাদৃতা তখন রূপকথার দেশের রাজকন্যার মতই অঘোর ঘুমে। ওঁর গায়ের ওপর চাদরটা ঠিকঠাক করে দিলেন বিভাস, এলোমেলো চুলগুলোকে সরিয়ে দিলেন মুখের ওপর থেকে। একবার মনে হল ডেকে তোলেন, তারপর মাথা নেড়ে একাই নেমে পড়লেন বিছানা থেকে। স্বপ্নে এতক্ষণ উনি সান হোসের একটা পাবে ছিলেন, যেখানে ওঁরা প্রায় সপ্তাহান্তেই আড্ডা মারতে যান। বেশ একটু মত্ত অবস্থায় পাব থেকে বেরিয়ে কিছুতেই আর নিজের গাড়িটা খুঁজে পাচ্ছিলেন না বরং তার বদলে খাস কলকাতায় বাস, ট্যাক্সি আর অটো চোখে পড়ছিল। ফুটপাথের ওপরে বাংলা বইয়ের দোকান আবার তার পাশেই এক মুষকো চুলদাড়িওয়ালা কালো লোক বসে স্যাক্সোফোন বাজাচ্ছে। লিপিকা একটা তাঁতের শাড়ি পরে পাশের টেবিলে ওঁর অফিসের সেই অতিচালাক কলিগটার সঙ্গে বসে কফি খাচ্ছেন, বিভাসের হয়রানি দেখে দুজনেরই আর হাসি ধরে না। তারই মধ্যে মিমি কোত্থেকে পাপুর হাত ধরে এসে হাজির হয়েছে, বলে কিনা ড্যাডি এই দেখো আমার বয়ফ্রেন্ড। পরের পর এইরকম জগাখিচুড়ি পাকানো উদ্ভট স্বপ্নের মিছিল, তার মধ্যে কোনোরকমে প্রথম পাখির ডাকটা শুনতে পেয়েই উঠে পড়ছেন বিভাস। গরম মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য মর্নিংওয়াকের মতো দাওয়াই আর নেই।

    নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ, এখনও ঠিক করে শীত পড়েনি, কিন্তু সকালবেলাটায় শিরশিরে ভাব। মাইলখানেক হাঁটার পর চায়ের দোকানের সামনে আরো কয়েকজন মর্নিংওয়াকারের দেখা পেয়ে গেলেন বিভাস। গরম চা অমৃতের মত লাগছে এখন। সমাদৃতাকে একটা টেক্সট পাঠিয়ে কোনো উত্তর পেলেন না, ও সম্ভবত এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। এমন রাত্রি তো রোজ হয় না যখন স্মৃতির অন্ধকূপ থেকে হারানো কথারা দরজা ভেঙে উঠে আসে, নিজের হাতে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা কষ্টগুলো ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলে দেয়। বিভাসও পারলে অনেক বেলা অবধি ঘুমোতেন, শুধু এই হতচ্ছাড়া স্বপ্নগুলোর জ্বালায় উঠে পড়তে হলো। দোকানের বাইরে রাখা বেঞ্চিটা শিশিরে ভিজে গেছে, একজন এসে সেটাকে গামছা দিয়ে বেশ করে মুছে দিয়ে গেল। রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে--বাহির পথে বিবাগী হিয়া কিসের খোঁজে গেলি। মশলার গন্ধ মাখানো চা টা যে কী অপূর্ব!

    ‘আরে ডাক্তার সাহেব আপনি এখানে। ছুটিতে এসেছেন বুঝি?’

    বিভাস প্রায় চমকেই মুখ তুলে তাকালেন। বক্তা সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা ও কাশ্মীরি শাল পরিহিত হাস্যমুখ এক ভদ্রলোক।

    ‘চিনতে পারলেন না তো? বিনয় চৌধুরী, এষার বাবা, অরিন্দমের শ্বশুরমশাই। সান হোসেতে আপনার বাড়ি গিয়েছিলাম। অবশ্য বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই ভালো।’

    বিভাস নার্ভাস মুখে একটা নমস্কার করলেন। ওদিকে ভদ্রলোক প্রবল উৎসাহে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন, চায়ের দোকানে অন্যান্য খদ্দেররাও এদিকে তাকাতে শুরু করেছে।

    ‘আমি তো মেয়েকে বলি এই আপনারাই হলেন বিদেশে আমাদের বল ভরসা। আমি আপনার হাসপাতালও দেখেছি, তুলনা হয় না। আমার মেয়ে তো লিপিকাদি বলতে অজ্ঞান। কেরিয়ার আর সংসারের মধ্যে এমন সামঞ্জস্য কি সহজে হয়, তার জন্য পরিশ্রম লাগে, নিষ্ঠা লাগে।’

    বিভাসের অর্ডার দেওয়া ঘুঘনি এসে গেছে। আপাতত কথা না বললেও হয়।

    ‘আমার মেয়ে তো চাকরি পেয়ে গেল, এখন ওরা ওখানেই সেটল করবে। আর করবে নাই বা কেন--যেমন সুন্দর জায়গা তেমন চমৎকার আবহাওয়া। সত্যি বলতে কি ছয়মাস ওখানে কাটিয়ে এখন আমারই কলকাতার গরমে কষ্ট হয়, তাছাড়া গিন্নির বাতের ব্যথাটাও ওখানে ভালো থাকে। আপনাদের মতন বড়ো ডাক্তাররা আছেন, আমরা যাকে বলি নিশ্চিন্ত। তাই এই শীতকালটা এখানে আছি, সামার হলেই আবার সান হোসে ফেরত যাবো। নাতিনাতনির মায়া বড়ো মায়া, বুঝলেন। তা আপনার কদ্দিন আছেন?’

    ‘ওই কয়েক সপ্তাহ। আছা আজ আসি তাহলে', শান্তিতে চা খাওয়ার আশা ত্যাগ করে উঠে পড়লেন বিভাস। বিনয়বাবুর সঙ্গে আলোচনাটা এক্ষুনি ওঁর গিন্নির গেঁটেবাত কিংবা নিজের ডায়াবেটিসের দিকে ঘুরবে, তার আগে কেটে পড়াই ভালো।

    ফিররে ফিরতে বিভাস বুঝতে পারলেন স্বপ্নের ছবিগুলো ওঁরই সঙ্গে আশেপাশে মাঠঘাট ধরে হাঁটছে কিংবা পাখির ঝাঁকের মতন পাক খাচ্ছে মাথার ওপরে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, ভদ্রলোককে উনি সত্যি চিনতে পেরেছেন, একটা পার্টিতে দেখা হয়েছিল। সুইমিং পুল সমেত বিরাট বাড়িতে হয়েছিল পার্টিটা, তার সামনে অতি যত্নে বানানো জাপানি বাগান, কমলালেবুর গাছে ফল ধরেছে, দিগন্তে ঢেউখেলানো পাহাড়ের সারি। একসময় ওগুলো সবুজ ছিল; এখন কয়েক বছর ধরে ক্যালিফোর্নিয়ায় একটানা খরা চলার দরুন আজকাল বেশ ন্যাড়া দেখায়। বিভাস একটা বিয়ারের ক্যান হাতে সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছিলেন না? লিপিকা একটা কালো আর সবুজ মেশানো সাউথ ইন্ডিয়ান সিল্কের শাড়ি পরেছিলেন সঙ্গে হাতকাটা ব্লাউজ। স্বপ্নের ভেতরে সবকিছুই স্পষ্ট অথচ আসলে অবাস্তব কারণ ঠিক ওই সময়ে বিভাস দিল্লীতে একটা কনফারেনসে গেছিলেন, সে কথাও ওঁর পরিষ্কার মনে আছে।

    লবির সামনেই খুব সুন্দর বাগান, সেখানে সমাদৃতার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। চা খেতে নেমেছেন, এর মধ্যেই স্নানটান করে রেডি, পরনে একটা হালকা রঙের সালোয়ার কুর্তি। বাগানের ফুলগুলোর মতই তরতাজা মুখের চারদিকে ভিজে চুলের ফ্রেম, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি আর শ্যাম্পুর গন্ধ মিশিয়ে যেন নিখুঁত একটি সকালবেলার ছবি হয়ে বসে আছেন এখন।

    ‘তুমি তো ভারী অদ্ভুত লোক! সকালে কিছু না বলে বেরিয়ে গেলে যে? তোমার ওপর তো ভরসা করা মুশকিল।’

    ‘হাঁটতে গেছিলাম। তুমি ঠিক একটা বাচ্চা মেয়ের মতো ঘুমোচ্ছিলে দেখে আর ডাকিনি।’

    ‘এরকম একটা কঙ্কোয়েস্ট, বাল্যপ্রেমিকা এবং পরের বৌয়ের সঙ্গে একটা অনন্য নিশিযাপনের পর সকালবেলা একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে বেরিয়েছিলে তাইতো? যুদ্ধ জেতার পর যেমন ভাবনা হয় জেতা জমি কিভাবে সামলে রাখা উচিত, কোথা দিয়েই বা বিপদ আসতে পারে?’ সমাদৃতা মজা করছেন কিনা বোঝা গেলো না।

    ‘না তিতলি কাল রাত্রির কথা ভাবতে পারলে তো বাঁচতাম, সেই ভাবনার রেখাগুলো দিয়ে নিশ্চিন্তে শুধু তোমার মুখের স্কেচ আঁকা যেত। হারজিতের প্রশ্নই আসে না, যদিও কালকের রাতটা যেমন তোমার, তেমনই আমারও জীবনে অনন্য। যে নিজের জমি কোনটা তাই ঠিক করতে পারছে না, সে অপরের জমি দখল করবে কি করে? আমি আসলে ভাবছিলাম কয়েক মাস আগের কথা, এই ধরো মিড জুলাই। ওই সময়টা আমি কোথায় ছিলাম বলো তো?’

    ‘তার মানে?’ সমাদৃতা আবার শঙ্কিত হয়ে উঠলেন, ‘তুমি কি সত্যিই সব কথা ভলে যাচ্ছো নাকি টুকুদা।’

    ‘আমি দিল্লীতে ছিলাম তাই না? তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’

    সমাদৃতা অবাক হয়ে বিভাসের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। দুর্বোধ্য কতগুলো ভাব সেখানে খেলা করছে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি একেবারেই কনফিউজড নয়, একই রকম তীক্ষ্ণ, তার মধ্যে বহুকালের চর্চিত বুদ্ধিমত্তা আর আত্মবিশ্বাসের পরিষ্কার ছাপ। ডিমেনশিয়া রোগীদের দৃষ্টি এ রকম হয় না।

    ‘ওই কনফারেন্সে গিয়েই তো তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল টুকুদা। গুরগাঁওয়ের সেই হোটেলে আমিও গেছিলাম ওষুধ কোম্পানির রেপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে। তখন একদিকে আমার ঘর ভাঙছে অন্যদিকে পাপুর অসুখটা নিয়ে সাংঘাতিক দুশ্চিন্তা। লেকচার হলে তোমার একটা প্রেজেন্টেশন ছিলো, নামটা দেখেই আমি দেখতে গিয়েছিলাম যে লোকটা আসলে তুমিই কি না। তখন তোমার প্রেজেন্টেশন শেষ, তুমি বেরিয়ে আসছো, নীল রঙের স্যুট, ইন্ডিগো টাই, চুলটা পেকেছে কিন্তু তুমিই বটে। হলের সামনে--‘

    ‘হলের সামনে তুমি দাঁড়িয়েছিলে তিতলি। আমার চারদিকে তখন একগাদা লোক, অজস্র ফালতু কথার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। তোমার সঙ্গে চোখাচোখি হবার মুহূর্তটায় সবকিছু যেন একটা তীব্র সাদা আলোর ঝলকের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে মিশে গেল। তুমি শুনলে হাসবে কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বুকের মধ্যে একটা অসহ্য ব্যথাও করে উঠেছিল। হঠাৎ মনে হয়েছিল অনেকক্ষণ ভালো করে দম নেওয়া হয়নি। অনুভূতিটা কিরকম জানো? ধরে নাও দুপুরবেলায় সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে একজন জলে ডুবে গেছে। প্রথমে দম আটকে খুব কষ্ট হলো, তারপর সে প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সেই মুহূর্তে কেউ একজন তাকে টেনে তুললো, বালির ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে দুচোখ খুলেই সে কি দেখবে? প্রথমে সূর্যটা তার চোখের ওপর সোজা রোদ্দুর ফেলেছে, চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া সাদা আলো। তারপরে সে দেখবে স্যিলুট হওয়া একটা মানুষের মুখ, যে তাকে টেনে তুলে রিসাসিটেট করেছে। এই দুটোর পর হয়তো তার খেয়াল যে চারদিকে গুচ্ছের লোক আছে সব মিলিয়ে বেশ একটা হট্টগোল। তাই না?’

    সমাদৃতা চায়ের কাপে চুমুক দিতেও ভুলে গেছেন। বিভাসের দৃষ্টি সোজা ওঁর চোখের দিকে, কথাগুলো যেন মগ্নচৈতন্য থেকে উঠে আসা স্বগতোক্তি অথচ তাদের মধ্যে রয়েছে গভীর আর্তি আর আন্তরিকতার ছোঁয়া। ভালোবাসার একটা বন্যা এসে ওঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই মুহূর্তে। বড়ো করে একটা দম নিয়ে নিলেন উনি। অনেকগুলো কথা গুছিয়ে বলতে হবে।

    ‘টুকুদা অনেকেই বলছে যে তুমি খুব বদলে গেছো। তোমার কি হয়েছে জানি না কিন্তু আমার জীবনে তোমার এই ফিরে আসাটা একেবারে ম্যাজিক্যাল। আমার জানা সেই ছটফটে আর একগুঁয়ে, অভিমানী আর কবিতা পাগল ছেলেটার বদলে ফেরৎ এলে এই যে এখনকার তুমি, এ তো একেবারে অন্য একজন মানুষ। এই মানুষটা একজন ব্যস্ত সার্জন অথচ কথাবার্তার মধ্যে একরকম মিস্টিক রহস্যময়তা, কেমন একটা হারিয়ে যাওয়া ভাব। সত্যি কথা বলবো সেই আগের ছেলেটাকে আমার বেশ চার্মিং মনে হয়েছিল কিন্তু ঠিক প্রেমে পড়েছিলাম কিনা বলতে পারবো না। সেই বয়সে কত কিছুই তো ভালো লাগে। কিন্তু আজকের এই মানুষটা আমাকে একেবারে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এ জীবনের এক অপ্রত্যাশিত দান, এক হৃদমাঝারে ধরে রাখতেই হবে, ছেড়ে দিলে আর পাবো না। তখন জীবনটা আবার কতগুলো একঘেয়ে ঘন্টা আর মিনিটের ভুখা মিছিল হয়ে উঠবে। এই বয়েসে নতুন করে বুক ভাঙা সহ্য হবে না টুকুদা। শুধু ভরসা দাও যে তুমি থাকবে তারপর তোমার বিভ্রান্তির বোঝা তুমি আমার ওপর ছেড়ে দিতে পারো, আমি খুশি হয়ে বইবো।’

    ‘এই মুহূর্তে আমি আছি আর থাকতে চাই তিতলি। তার পরের কথা জানি না। এইটুকু জানি যেতেই যদি হয় তাহলে যাবো কিন্তু যাবার জন্য আমার তাড়া নেই। কোথায় যেন পড়েছিলাম কথাটা? বোধহয় একটা কবিতায়?’ বিভাস কেমন যেন নার্ভাসভাবে ওর হাতটা চেপে ধরে আছেন এখন, সকালের ঠাণ্ডা বাতাসেও সেই হাতের পাতা ঘামে ভিজে।

    ‘তাহলে চলো আশ্রম থেকে ঘুরে আসি। সেই হলো বটে আমাদের একসঙ্গে শান্তিনিকেতন আসা।’ হাতটা সাবধানে ছাড়িয়ে নিয়ে সমাদৃতা চট করে চশমাটা মুছে নিলেন একবার। ওপাশে দুটো উটকো ছোকরা হাঁ করে এইদিকে তাকিয়ে আছে।

    অনেক ঘন্টা কেটে গেছে, খোয়াইতে সোনাঝুরি গাছের ছায়ায় লম্বা হচ্ছে এখন। উত্তরায়ণ দেখা শেষ করে ওঁরা হাঁটছেন কলাভবন থেকে ছাতিমতলা হয়ে শালবিথীর দিকে। সমাদৃতার সঙ্গে প্রথম দেখা হবার সময়টা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইছেন বিভাস, অথচ অনেক কিছুই দিব্যি মনে আছে ওঁর। অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছেন সমাদৃতা। দিল্লীর সেই কনফারেন্সে পাপুর অসুখ নিয়েই প্রথমে কথা হয়েছিল। প্রাথমিক বিহ্বলতা সামলে নিয়ে তারপরে বেশ পেশাদার ব্যবহারই করেছিলেন বিভাস। অসুখটার খুঁটিনাটি জেনে নিয়েছিলেন, তারপর মুম্বাইতে এক পরিচিত কার্ডিয়াক সার্জনের নাম দিয়েছিলেন সমাদৃতাকে।

    ‘মুম্বাইয়ের ডাক্তার নিয়ে আমি কি করবো? আমি তো কলকাতায় ফিরছি। কলকাতায় এই অপারেশনটা করতে পারে এমন কেউ জানা আছে?’ হাসিটা লুকোতে পারেননি সমাদৃতা।

    ‘তিতলি কলকাতায় আমি তোমার ছেলের অপারেশন করতে পারি। কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে?’

    ‘কি বলছো টুকুদা? তুমি করলে তো আমি নিশ্চিন্ত।’

    কলকাতার কাজে কবে জয়েন করবে? বাই দা ওয়ে সন্দীপ কেমন আছে।’

    ‘ভালো। আমাদের সেপারেশন হয়ে গেছে। ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দেবো ঠিক করেছি। ও ওর গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে মুভ ইন করবে, পাপু আমার কাছে থাকবে। কাগজপত্রে সই হয়ে গেলেই মুম্বাইয়ের পাট চুকলো।’

    ‘এত তাড়াতাড়ি। আই অ্যাম সরি তিতলি।’ বিভাসের মুখে সেই বস্তাপচা আই অ্যাম সরি ছাড়া অন্য কোনো কথা আসেনি। ‘আমরা কয়েকটা ধার করা শব্দবন্ধের দেদার প্রয়োগ করে ছোটবড়ো সবরকম আঘাতের ওপর পট্টি লাগাতে শিখেছি। তাই সত্যিকারের সহানুভূতি দেখাতে চাইলে কেমন যেন কথা হারিয়ে যায় আমাদের।’ মনে মনে ভেবেছিলেন বিভাস।

    ‘চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি। আমার নতুন কাজ একটা এন জি ও গ্রুপে।’

    সেই শুরু। সেখান থেকে আজ এই হালকা রোদ্দুরে শালবীথির মধ্য দিয়ে পঁচিশ বছর আগে প্ল্যান করে রাখা এক স্বপ্নভেজা সফরে চলেছেন ওঁরা দুজনে।

    *********

    লকাতা এয়ারপোর্টে যখন ওরা নামলো তখন মধ্যরাত্রি পেরিয়ে গেছে। লিপিকার মা মৌসুমি ওরফে মিঠু নিজে আসেননি, কিন্তু নাতি নাতনি আর তাদের বন্ধুদের জন্য সময়মতো গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। ড্রাইভার নরেশ বহুদিন ওই বাড়িতে আছে, সেই ওদের রিসিভ করলো। মুন্না মুন্নির সঙ্গে আরো দুজন এসেছে, একজন লম্বাচওড়া লালমুখো সাহেব, সে নাকি মুন্নির বন্ধু। আরেকজন ছোটখাটো চেহারার মাথায় ফেট্টি বাঁধা মেয়েছেলে, হিন্দী সিনেমায় মাঝে মাঝে এইরকম পোষাক দেখেছে নরেশ। এর কথা তো দিদিমণি বলে দেননি, কর্তামাও কিছু বললেন না। ওর নার্ভাস হাসি দেখেই বিতান ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গেছে।

    ‘নরেশভাই এই দিদির নাম রবিন, আপাতত আমাদের বাড়িতে যাবেন, তারপর কালকে একটা কিছু ব্যবস্থা হবে। আর এই হলো রনি, এর কথা আগেই শুনেছো। তাড়াতাড়ি চলো আমাদের ক্ষিধে পেয়েছে।’

    ‘আমি কিন্তু হোটেলেও উঠতে পারি।’ রবিন একটু কিন্তু কিন্তু করছে।

    ‘এতো রাতে কলকাতার ট্রানসপোর্ট আর হোটেল নিরাপদ নাও হতে পারে, বিশেষ করে তোমার জন্য। এখন চলো, কালকে দিনের বেলা একটা কিছু ব্যবস্থা হবে।’ বেশ গার্জেনি গলায় বলেছে বিতান। এই যাত্রায় ওর নেতৃত্বের ব্যাপারটা মোটামুটি মেনে নিয়েছে সবাই।

    ‘আইয়ে দিদিজি’ নরেশ এবার ট্রলিতে স্যুটকেস চাপিয়ে হাঁটা লাগিয়েছে, বিভিন্ন জাতিধর্মের অল্পবয়েসী দলটা ওর পিছনে, তাদের সকলের পকেটে ঈগলের ছবি আঁকা আমেরিকান পাসপোর্ট। সকলের মুখ গম্ভীর, কিন্তু চোখের মধ্যে চাপা উত্তেজনা আর নিভতে নিভতেও জ্বলে থাকা একটুখানি আশার সলতে। ওরা শুনেছে আন্দামানের কাছে একজায়গায় নাকি ইন্ডিয়ান নেভি প্লেনটার ভাঙা ডানার টুকরো ভাসতে দেখেছে। এখন খুব জোর খোঁজাখুঁজি চলছে যদি কোনো লাইফ র‍্যাফটের চিহ্ন পাওয়া যায়। জায়াগাটা উপকূল থেকে খুব একটা দূরে নয় যদিও দ্বীপমালার ওই অঞ্চলটায় খুব একটা জনবসতি নেই।

    এই সব কথা বলতে বলতেই ওরা বেহালায় ওদের বাড়িতে পোঁছে গেল। লিপিকার বাবা অনেকদিন হলো মারা গেছেন, বাড়িতে মা আর জেঠিমা, পরিবারের বাকি সবাই কলকাতার বাইরে। জেঠিমার অনেক বয়েস হয়েছে, বাত আর ডায়াবেটিসে মোটামুটি পঙ্গু, কিন্তু লিপিকার মা মিঠু চৌধুরি খুব শক্ত মহিলা। স্টেট ব্যাঙ্কের অফিসার ছিলেন, অল্পবয়সে বিধবা হবার পর প্রায় একা হাতে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন। এখনও জনাকতক কাজের লোক আর ওপরে নিচে দুই ঘর ভাড়াটে দিয়ে বেশ দাপটেই দিন কাটান। রাত আড়াইটের সময় চারটি ক্ষুধার্ত তরুণ-তরুণীকে আপ্যায়ন করার জন্য উনি হাসিমুখে টেবিল সাজিয়ে বসে আছেন। রনি আর রবিন প্রথমে খুবই আড়ষ্ট হয়ে ছিলে কিন্তু সুনন্দার ব্যবহার এতটাই সহজ আর আন্তরিক যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে বেশ একটা স্বস্তির পরিবেশ এসে গেছে, সবাই মন দিয়ে খাচ্ছে তখন। এই বাড়িতে অনেকগুলো ঘর আছে, ওদের থাকতে কোনো অসুবিধা হবে না। সবাইকে যে যার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তারপর উনি লিপিকাকে ফোনটা করবেন।

    ‘হ্যালো মা। ওরা ঠিকঠাক পোঁছে গেছে?’

    ‘হ্যাঁ রে, ঠিক আছে সবাই। শুনেছিস তো রবিন বলে একটা মেয়েও এসেছে ওদের সঙ্গে। ওর বর ছিল নাকি ওই ফ্লাইটে। আহা রে একেবারে বাচ্চা মেয়েটা, এই বয়সেই এমন আঘাতটা পেলো।’ মিঠু চৌধুরির গলা সমবেদনায় ভারি।

    ‘শুনেছি। আমেরিকায় জন্ম, পাকিস্তানি পরিবারের মেয়ে কিন্তু ছেলেটি ভারতীয়। মুম্বাইয়ের ছেলে।

    ‘আচ্ছা পাকিস্তানি মেয়েরা আমেরিকাতেও বোরখা পরে নাকি?’ কথাগুলো ফিসফিস করে বলা এবারে।

    ‘বোরখা নয় হিজাব, শুধু মাথা মুখের চারপাশটা ঢাকা থাকে। ঠিকমতো কালার কম্বিনেশন করলে খারাপ দেখায় না বরং বেশ একটা স্টাইল স্টেটমেন্ট হতে পারে। সর্দারজীর পাগড়ির মতন অনেকটা।’

    তা বটে। আমার মা তো সারা জীবন বাড়ির বাইরে ঘোমটা দিয়েই বেরোতেন। মেয়েটার মুখটা ভারি সুন্দর, দেখলেই মায়া হয়। আর সাহেবটিও বেশ ভদ্র। হ্যাঁরে ও বুঝি আমাদের হবু জামাই?’ ‘ভগবান জানে? এখানে কখন কি হয় কিছু ঠিক নেই। চিন্তায় মরি।’ লিপিকার গলায় আশংকার ছোঁয়া।

    ‘না রে লিপি, ছেলেমেয়েগুলো ভালো, ওদের নিয়ে চিন্তা করিস না। অল্পবয়েসে এই প্রথম এতবড়ো একটা দুর্ঘটনার সামনে দাঁড়িয়েছে তো, ভেতর থেকে জোর একটা ধাক্কা লেগেছে ওদের। এই বয়সে ঘা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়, ওরাও ঠিক হয়ে যাবে। তোকে নিয়েই চিন্তা।’

    ‘আমি ঠিক আছি মা। তুমি একটু দেখো ওদের। আসলে একটা ঠিকঠাক খবরও যদি আসতো, সবাই শোক করার জন্যও অবকাশ পেতো একটু। এ এমন একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে থাকা। আচ্ছা, আন্দামানের খবরটা সত্যি?’

    ‘আমার মনে হয় না রে। এ সব মিডিয়াগুলোর বাজার গরম করার কারসাজি।’

    ‘তোমার অনেক কাজ বাড়লো মা। এগুলো ভালোয় ভালোয় ফেরৎ এলে বাঁচি।’

    ‘কাজটা কষ্ট নয় রে, কাজের অভাবটাই আসলে কষ্ট। কয়েকদিন বাচ্চাগুলোর দেখাশুনো করে ভালোই কাটবে আমার। তুই সাবধানে থাকিস।’

    ফোন রেখে বাড়ির আলোগুলো এক এক করে নিভিয়ে দিলেন মিঠু। বারান্দার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে একটা ফিকে জ্যোৎস্নার আভাস ঢুকে পড়েছে। কুড়ি বছর আগে এরকম এক মধ্যরাত্রে একজনকে নিয়ে হাসপাতেলে গেছিলেন উনি। সুস্থ মানুষটা ট্যুর থেকে ফিরে শোবার সময় ডান পায়ে একটু ব্যথা আর ফোলার কথা বলেছিল, দুটো প্যরাসিটামল নিজের হাতে বার করে খাইয়ে দিয়েছিলেন উনি।

    ‘আর্থ্রাইটিস। এইরকম আট ঘন্টা গাড়িতে বসে থাকা বন্ধ করো এবার। বয়েস হচ্ছে।’

    মাঝরাত্রে হঠাৎ যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেছিল লোকটা। হাসপাতেলে যাবার পরে খুব কম সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে গেছিল সবকিছু--পালমোনারি এমবোলিজম, পায়ের শিরা থেকে ফুসফুসের দিকে ভেসে যাওয়া একদলা জমাট বাঁধা রক্ত। মিঠু এইরকম কান্ড সিনেমায় দেখেছেন, বইতেও পড়েছেন, সেদিন বুঝলেন বাস্তবেও হুবহু ওইরকম হতে পারে। ঝড় এলো, ঝড় বয়ে গেল, ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বেশ মজবুত করেই নতুন বাসা বাঁধা হলো আবার। তারপর দেখতে দেখতে সেই বাসাও খালি হয়ে গেল, পাখির ছানারা উড়ে গেল একদিন, আবার দিব্যি নতুন করে একলা থাকতে শিখে নিলেন উনি। আজ আবার দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়ে আশ্চর্যরকম নির্লিপ্ত আছেন মিঠু। মেয়ে, জামাই আর নাতিনাতনির জন্য চিন্তা করছেন, স্নেহ, সহমর্মিতা মেশানো এক স্নিগ্ধ জলজ অনুভূতি। এই পৃথিবীতে যারা অকারণ দুর্ভাগ্য আর দুর্ঘটনার শিকার তারা সবাই তো আসলে একই পরিবারের মানুষ।

    ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষের হাত মারতেও পারে, বাঁচাতেও পারে। সেই হাতই ধ্বংশস্তূপ পরিষ্কার করে নতুন করে আলো জ্বালায়।’ শুয়ে পড়তে পড়তে নিজের মনেই বললেন মিঠু।

    উলটোদিকের দেওয়ালে বিরাট ফ্রেমে বাঁধানো একজনের হাসিমুখ। এক একদিন ছবিটাকে যেন আরো বেশি করে জীবন্ত লাগে।

    ওদের সবার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে দুপুর বারোটা বেজে গেল।

    চায়ের গন্ধ যে এমন সুন্দর হয় জানতো না রনি। টেবিলে নানারকম সুখাদ্য সাজানো আছে, বিতান আর মিমি মন দিয়ে খাচ্ছে, বাকি দুজন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কুণ্ঠিত। রবিন আজকে হেডস্কার্ফ পারেনি, ভেজা চুলগুলো ওর পিঠের ওপর ছড়ানো। বিতানের দৃষ্টি মাঝে মাঝেই ওই দিকে চলে যাচ্ছে, একবার তো চোখাচোখি হয়েই গেল। বেশ একটু লজ্জা পেলো বিতান। হয়তো এই পরিবেশে অস্বস্তি বোধ করছে মেয়েটা। সকালবেলায় ওর ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় বিতান দেখেছিল মেঝের ওপর একটা ছোটো আসন বিছিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছে রবিন। ওর হাতদুটো বুকের কাছে, চোখ বোজা। তখন কিন্তু ওর মাথাটা ঢাকাই ছিল, তার মানে ঘর থেকে বেরোবার আগে ওটা খুলে রেখেছে।

    ‘আশা করি আমাদের জন্য কোনো অসুবিধা হচ্ছে না ওর।’ মনে মনে ভাবলো বিতান।

    ‘রনি আর রবিন তোমরা ঠিক করে খাচ্ছো না কিন্তু। পেট ভরা থাকলে প্ল্যান করতে সুবিধা হবে।' রনির প্লেটে লুচি মাংস চাপাতে চাপাতে বললেন সুনন্দা। ‘ঝাল মশলা কম দিয়ে করতে বলেছি।’

    ‘একদম শুকনো লঙ্কা দিইনি মা।’ রান্নাঘর থেকে তাপসীর গলা শোনা গেল। তাপসী, জেঠিমা, নরেশ আর তাপসীর পনের বছর বয়েসী কন্যাটিকে নিয়ে মিঠু চৌধুরির সংসার। নিপুণ গৃহিণীপনায় ছিমছাম, পরিমিত অথচ আরামদায়ক।

    ‘ভালো করে খাও।’ মিঠুর গলা থেকে স্নেহ ঝরে পড়লো। তারপর তোমরা যেখানে যেতে চাও, নরেশ তোমাদের নিয়ে যাবে। আন্দামানে যাবার টিকিট কাটতে চাইলে বোলো আমার ভালো ট্রাভেল এজেন্ট আছে।’

    ‘আমরা আরো কয়েকটা ফ্যামিলির সঙ্গে কথা বলছি। আন্দামান সী’তে যে সার্চ চলছে তার কম্যান্ড সেন্টার আপাতত কলকাতায়, এয়ারলাইনের লোকজনও এখানেই আছে। তাই কয়েক দিন আমরা এখানেই থাকবো, তারপর হয়তো পোর্ট ব্লেয়ারে যেতে হতে পারে।’ বিতান এবারে খাওয়া শেষ করে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে।

    ‘আমার কথা শোন, তোরা একটু বেড়িয়ে আয়। বাইরে অনেক লোকের মধ্যে থাকলে মনটাও ভালো লাগবে। অপেক্ষা করা ছাড়া আর তো কিছু করার নেই, সারাদিন বসে ইন্টারনেট ঘাঁটলেও কাজের কাজ কিছুই হবে না। আজকের দিনটা খুব সুন্দর, তোরা বরং গঙ্গার ধার থেকে ঘুরে আয় একটু।'

    ‘খারাপ প্রস্তাব নয়। নেক্সট বুলেটিন ওরা কাল সকালে পাঠাবে তার আগে সত্যিই কিছু করার নেই। এই ফাঁকে আমি ওদের একটু কলকাতা দেখিয়ে আনি।’ বিতান এমন ভারিক্কি চালে কথাটা বললো যেন শহর কলকাতার নাড়িনক্ষত্র সব ওর নখদর্পণে।

    এখন ওরা ভিক্টোরিয়ায়, রন আর মিমি ভেতরে ঢোকার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছে। বিতান আর রবিন বাগানের সামনে একটা বেঞ্চিতে, ওদের চারদিকে শীতের কলকাতার জনস্রোত। বেরোবার আগে হালকা বেগুনি রঙের একটা স্কার্ফ জড়িয়ে নিয়েছে রবিন, নিখুঁতভাবে ঢাকা পড়েছে গলা আর কাঁধ, ঘোমটার নিচে সামান্য উঁচু হয়ে আছে ওর পরিপাটি খোঁপা। ওর কালো আর বেগুনি মেশানো পোষাক নিউইয়র্কের নামকরা দোকান থেকে কেনা; যেমন আকর্ষণীয় তেমনই শালীন। সামান্য লিপগ্লস ছাড়া আর কোনো প্রসাধন নেই, কমনীয় অথচ বিষাদমাখা মুখের ওপর শীতের রোদ্দুর। বিতান এখন আর চেষ্টা করে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে না তাই প্রায়ই ওদের চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে।

    ‘কত মানুষ--’ অনেকক্ষণ বাদে আস্তে করে বললো রবিন।

    ‘শীতকালটা এখানে বেড়াবার সময়, নিউইয়র্কে যেমন সামার।’ কথা বলার সুযোগ পেয়ে বাঁচলো বিতান।

    ‘পনের বছর পরে সাবকন্টিনেন্ট এলাম। লাহোরের প্রায় কিছুই আমার মনে নেই।’

    ‘সে কি? আমরা তো প্রায় প্রতি বছর কলকাতায় আসি।’

    ‘লাকি তোমরা।’ অল্প একটু হাসলো রবিন। এই জায়গাটা বেশ সেন্ট্রাল পার্কের মতই, না?

    ঘোড়ার গাড়ি আছে, নানা ধরনের লোকজন বেশ যে যার মতো আনন্দ করছে।’

    ওদের পাশ দিয়ে বিরাট একটা দল যাচ্ছে এখন। সেখানে লম্বা দাড়ি আর টুপিওয়ালা লোকেরা আছে, সারা গা ঢাকা কালো বোরখা আছে, আবার বেশ কিছু দাড়ি কমানো, শার্ট প্যান্ট, সালোয়ার কামিজ পরা ছেলেমেয়েকেও দেখা যাচ্ছে।

    ‘সকালবেলায় তোমরা ভাবছিলে না, আমি হিজাব পরিনি কেন?’

    হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে হকচকিয়ে গেল বিতান, ‘না না আমরা লক্ষ্যই করিনি।’

    ‘তোমাদের তাকানোর মধ্যে প্রশ্নটা ছিল, তোমার গ্র্যান্ডমা জিজ্ঞাসাও করেছিলেন যে আমি কোনো কারণে অস্বস্তি বোধ করছি কিনা। আমি বললাম যে আমরা বাড়ির মধ্যে মাথা ঢেকে রাখি না। তোমাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, বিশেষ করে তোমার বাড়ি এসে আমার একবারও মনে হয়নি যে আমি অপরিচিতদের মধ্যে আছি।’

    ‘রবিন তোমার পোষাক বা ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আমাদের এক ফোঁটা চিন্তা নেই। আমাদের কাছে তুমি শুধু একজন ফেলো ভিকটিম। তাছাড়া মানে’--একটু থমকে গেল বিতান তারপর সাহস করে বলেই ফেললো, ‘মানে হেডস্কার্ফ পরে তোমায় ভালোই দেখায়।’

    ‘থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু অন্যদের আছে। বিশেষ করে যারা বিশ্বাস করে যে এটা টেররিস্টদের কাজ।’

    ‘আমরা তাদের দলে নেই রবিন। কোনোদিন থাকবোও না।’ খুব জোর দিয়ে বললো বিতান। ওর মনের মধ্যে যে কথাগুলো ঘোরাফেরা করছে, তাদের গুছিয়ে বলা মুশকিল অথচ এক্ষুনি একটা অসংলগ্ন লেকচার মারতে ও চায় না, তার চেয়ে চুপ করে তাকিয়ে থাকাই ভালো।

    মানুষের পোষাক, খাবারদাবার, প্রার্থনা করার ধরন আর এথিকস বোধ পুরোপুরি আনুষঙ্গিক, সে ছোটবেলা থেকে যাতে অভ্যস্ত, তাতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে। বড়ো হয়ে কিন্তু তাতে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সে কি ব্যবহারিক জীবনের সুবিধাজনক মূলস্রোত আর সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্কৃতির ধারাটাকেই অনুসরণ করবে, নাকি তার নিজস্বতা বজায় রাখার জন্য লড়ে যাবে। এই আইডেন্টিটি বজায় রাখতে চাওয়া মানেই কিন্তু মূলধারার প্রতি একরকম চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া। মানুষ যেমন দেওয়াল তুলে তার সম্পত্তি আগলাতে চায়, আমাদের যুগেও সংস্কৃতিরাও তেমন নিজের নিজের জায়গা দখল করে দেওয়াল তুলে বসেছে। দুর্ভাগ্যের কথা এটাই যে এই দেওয়ালের একদিকে টাকা, প্রযুক্তি আর অস্ত্রশস্ত্র, আরেক দিকে কোটি কোটি বেকার, আধা শিক্ষিত, কনফিউজড, রাগ চেপে রাখা ছেলেমেয়ে।

    ওরা যখন নিঃশব্দে ভাব বিনিময় করছিল, মেমোরিয়ালের ভেতরে রন আর মিমি তখন বেশ উত্তেজিত, মিউজিয়ামের সবকটা ঘর ওরা খুব উৎসাহ নিয়ে ঘুরে দেখেছে। ভিড়ের চাপে খুব ভালো করে কিছু দেখার উপায় নেই যদিও তাতে খুব একটা যায় আসেনি ওদের। আরো অনেকের মতন ওরা পরস্পরকেই বেশি করে দেখছে বরং।

    ‘আমার মনে হচ্ছে না কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে রনি। শুধু শুধু এত ঘোরাঘুরি করলাম।’

    ‘তুমিই সত্যিই ভেবেছিলে হারিয়ে যাওয়া এরোপ্লেনের যাত্রীদের খুঁজে পাওয়া যাবে? আমার মনে কিন্তু এক দিনের জন্যও ওরকম আশা ছিল না। তাও তোমাদের সঙ্গে গত সপ্তাহটা আমার জীবনের সবচেয়ে দামী সময়। হয়ত আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে তখনও তোমার সাথে পথ হাঁটছি। তখন দেখছি যে এই খোঁজাটাই বরাবর চলছে, ওটাই আসল, হাতের মধ্যে পেলেই নষ্ট হয়ে যায় সবকিছু।’

    ‘রনি আমার কি আরো মন খারাপ হওয়া উচিত? এক এক সময় এত ভালো লাগছে যে নিজেকে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছা জরছে আমার। তুমি সত্যি আমার সঙ্গে পঞ্চাশ বছর থাকবে? কি খুঁজবো আমরা অত্তদিন ধরে।’ মিমি ওর হাতটা চেপে ধরেছে।

    ‘হারিয়ে যাওয়া জিনিসের অভাব হবে না দেখো। পঞ্চাশ কেন, একশো বছর ধরে খুঁজলেও না।’

    ওরা হয়তো হাত ধরাধরি করে আরো অনেকক্ষণ ওখানেই ঘুরে বেড়াতো, ওদের মধ্যে বয়ে যেত মন ভাসানো কথার স্রোত। হয়ত বিতান আর রবিন ওইভাবেই নিঃশব্দে বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু নরেশ ড্রাইভার চিন্তিত হয়ে পড়লো। দাদাবাবু আর দিদিমণিরা এখানেই যদি সারা সময়টা কাটিয়ে দেয় তাহলে অন্ধকার হয়ে যাবে, ময়দানের ওদিকটা তো দেখাই হবে না। কর্তামা আবার বেশি রাত করতে মানা করে দিয়েছেন।

    একটু পরে প্রিন্সেপ ঘাট, মনুমেন্ট, ইডেন গার্ডেন ছুঁয়ে ওরা যখন নিউমার্কেটে এসে নামলো তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে, শনিবার সন্ধ্যাবেলা বলে ভিড়টাও বেশ জমজমাট। ওদের দলটা বেশ দুই জোড়ায় ভাগ হয়ে গিয়েছে, রবিনও এতক্ষণে দু একটা কথা বলতে শুরু করেছে। বাদশার দোকান থেকে শিককাবাব কিনে খেল ওরা, তারপর জনস্রোতের সঙ্গে মিশে পুরনো হগ মার্কেটের বাড়িটায় ঢুকে পড়লো চারজনে। রবিন খুব কম লাগেজ নিয়ে এসেছে, ওর দু একটা দরকারি জিনিস না কিনলেই নয়। বিতান ওর সঙ্গে দোকানে ঢুকলো, রন আর মিমি বসে রইলো সামনের একটা বেঞ্চিতে।



    (ক্রমশ)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ রাহুল মজুমদার
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)