• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪৫ | এপ্রিল ২০১০ | বিবিধ
    Share
  • হওয়া না হওয়ার বৃত্তান্ত (৫, শেষ) : মিহির সেনগুপ্ত

    বাবা রাজনীতি কোনোকালে করতেন না । তবে তাঁর শ্রেণির আর অনেকের মতই, স্বাধীনতা আন্দোলনের কাল থেকে কংগ্রেস মনোভাবাপন্ন । স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দু একবার কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন । এ ব্যাপারে তিনি বা তাঁর প্রজন্মের জনেরা যতটা রোমান্টিক ছিলেন, রাজনীতি সচেতন তার সিকিভাগের এক ভাগও ছিলেন না । তাঁদের মনে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার বিপ্লববাদী বা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ এবং গান্ধীজি অনুসৃত পন্থার মাধ্যমে ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের যে আদর্শবাদ জন্ম নিয়েছিল, তার প্রভাবে তাঁরা আজীবন আচ্ছন্ন ছিলেন । বলতে কী সেই আচ্ছন্নতা তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের মধ্যেও খুব কম সক্রিয় থাকেনি । পরিবারে আমাদের বড়দা ছিলেন প্রথম কম্যুনিস্ট মতাদর্শী । তত্কালীন অনেক ভদ্রলোক কম্যুনিস্টদের মত তিনিও ছিলেন সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের মানুষ । এই কম্যুনিস্টরা ভদ্রলোক হন না, এরকম কথা আমি বলছি না বটে তবে তাঁরা কোনোদিন পার্টির তৃণমূল স্তরে সংগঠনের কাজে খুব কমই পৌঁছতে পারেন বলে আমার মনে হয় । সাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চাইতে নেতৃত্ব করার বা দেওয়ার কাজেই তাঁদের বেশি দেখেছি । ব্যাপারটার অস্তিত্ব আজও দৃশ্যমান । এটা পার্টির সবাই বোঝেনও বটে, কিন্তু এর কবলমুক্ত হওয়া দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ আন্ত:সংগ্রাম সাপেক্ষ ।

    সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট এবং তাত্ত্বিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যাঁরা ঘোরাফেরা করেন, তাঁরা নি:সন্দেহে এক ধরনের সুবিধে ভোগ করেন । কিন্তু সেসব বিতর্কিত ব্যাপার এবং এই আলেখ্যে তার কোনো বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা নেই । সে যা-ই হোক, দাদার অনুসরণ করে আমরা পরবর্তী ভাইয়েরা অধিকাংশই কম্যুনিস্ট পার্টিকেই সমর্থন করতাম । তবে তা-ও ঐ সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট । ভদ্দরলোক যে, এর বাইরে যাই কী করে ?

    পার্টি একটা নিয়ত চলমান পদ্ধতি । সুতরাং তার মধ্যে অসম্পূর্ণতা, ত্রুটি বিচ্যুতি থাকবে না, কট্টর মার্কসবাদীও তা মনে করেন না । শুধু দেখা আর বোঝা দরকার যে ত্রুটি সংশোধন ক'রে ঘটনা ও পরিস্থিতি থেকে পার্টি শিক্ষা গ্রহণ করছে কীনা । তবু একথা নি:সংশয়ে বলব যে পার্টির সংসর্গে থেকে অনেক কিছুই শিখেছি এবং অভিজ্ঞতাও কম হয়নি ।

    একসময় পারিবারিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ে, শৈশব কৈশোরে প্রায় প্রাকৃতিক নির্বন্ধের মতো দারিদ্রের কারণে মধ্যবিত্ত জীবন যাপনের ঘেরাটোপ ডিঙিয়ে বাধ্য হয়েই প্রান্তিক জনেদের মধ্যে গিয়ে পড়েছিলাম । কিন্তু রক্তে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকী দূষণ তো ছিলই । সে কারণে সেই জীবনের সঙ্গে একাত্মতা, প্রকৃত বিচারে পুরোপুরি সম্ভব হয়নি । সেসব পূর্ববঙ্গে থাকাকালীন অবক্ষয়ী ভাঙা হিন্দু সমাজে থাকার সময়ের কথা । সমাজটা বা পরিবারটা ভাঙা হলেও কোনোটারই ঠ্যাকারটা কম তীক্ষণ ছিল না । সে জন্যে মনে বেশ একটা গ্লানি বোধ ছিল । প্রান্তিক জনেদের সঙ্গে মিশছি অথচ একটা কুচক্রী চোরাটানের জন্য তাদের সঙ্গে একাত্ম হতে পারছি না, সে এক চরম মানসিক দ্বন্দ্ব, গ্লানি আর ক্লেশের সময় গেছে । ছোটলোক ভদ্দরলোকের বহুচর্চিত টানাপোড়েন আর কী ।

    একটা কথা আমার লেখায় বার বার ঘুরে আসছে । সেটা এই ভদ্দরলোক - ছোটলোক সংক্রান্ত ব্যাপারটা । আমি ভদ্রলোক নই ------- এরকম একটা সত্যের প্রতিষ্ঠা দেওয়াটা যেন আমার বিশেষ প্রচেষ্টা হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে । আসলে আমার বড় হয়ে ওঠার দিনগুলোতে যাদের সাহচর্য আমি পেয়েছি, পারিবারিক বা সামাজিক অভিধায় তারা ভদ্রশ্রেণিতে পড়ে না । কিন্তু একটা সময় আমার এই নিম্ন এবং সাধারণ বর্গের সাহচর্যটাও একটা অহংকারে দাঁড়িয়ে গেল যেন । সেটাও যে একধরনের মধ্যবিত্ত সুলভ ভণ্ডামি হতে পারে, সে কথাটা খেয়ালে নেই । এই ভণ্ডামির বীজটা বোধহয় জিন্গত ভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির রক্তে স্বাভাবিক ভাবেই থাকে । এই যে অহংকারটা আমার মধ্যে এসেছে সেটা সম্ভবত মার্কসীয় শ্রেণিতত্ত্বটা সঠিকভাবে পরিপাক হয়নি বলেই ।

    গ্রামীণ জীবনে যাদের সঙ্গে মেলামেশা, আদান প্রদান চলেছে তাদের শ্রেণির মধ্যে এমন কী কিছু পেয়েছি, যার ভিত্তিতে ঐ শ্রেণিতেই নিজের অবস্থান নিশ্চয় করে নেওয়া যায় ? সে কারণেই একাত্মতা ঘটেনি । অথচ ভদ্দরলোক বগ্গে গ্রাম্য হিন্দু সমাজে, ওখানে কীই বা তখন ছিল ? সবচাইতে ক্লেশ হতো, যাদের সঙ্গে মিশতাম, আন্তরিকভাবে তাদের স্বাভাবিক শ্রদ্ধায় গ্রহণ করার অপারগতার জন্য । এর জন্য একটা ভিন্ন শিক্ষার দরকার । সেটা সেখানে একেবারেই লভ্য ছিলনা । সেই শিক্ষাটা পার্টির সংস্পর্শে এসে অনেকটাই লাভ হয়েছিল । কিন্তু তখন আবার মেলামেশার বাস্তব ক্ষেত্রটা থেকে ভদ্দরলোকের তথাকথিত শিক্ষিত গণ্ডির আওতার মধ্যে চলে গেছি । অর্থাৎ পার্টির কেতাবি ভাষায় বলতে গেলে, বলতে হয়, তত্ত্ব আর প্রয়োগে যেন একেক সময় একেক ধরনের লুকোচুরি চলেছে, যথাযথ মেলবন্ধন হয়নি ।

    নকশালবাড়ির ঘটনা ঘটলে, তার অসামান্য নির্ঘোষে মনে হয়েছিল রাস্তা একটা পাওয়া গেছে । অফিসিয়াল পার্টির সংশ্রব ছেড়ে, সুতরাং সেদিকে মনোযোগ গেল । গরমবুলির প্রভাব তীব্র মাদকের মতো । রাষ্ট্র ও সমাজে, বা পারিবারিক চৌহদ্দিতে স্ব-বিরোধিতার অন্ত নেই । বিক্ষোভের কার্যকারণও অঢেল । সুতরাং স্বল্প-অধ্যায়ী জনেরা তত্ত্বের মনোগ্রাহী ব্যাখ্যায় যে আকৃষ্ট হবেই তাতে আর বিচিত্র কী ? ভালমন্দ, সম্ভব অসম্ভব, স্বাভাবিক অস্বাভাবিক বিচারবোধ না থাকলে, দাদারা, মানে দলীয় বা গোষ্ঠীর কর্তারা যা বলবেন, তা-ই উপনিষদ । কিন্তু আসল ঘরে মুষল । মানুষের কথা, মানুষের জন্য কাজ করা, মানুষের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া বা দেওয়া, এ সমস্তই শুধু বুক্নি আর বক্তৃতার বিষয়, প্রয়োগে শুধু অস্ত্র-ব্যবহার, রক্তপাত এবং সন্ত্রাস । সন্ত্রাস এবং বিরুদ্ধ সন্ত্রাস । শৈশব কৈশোর কাল থেকে যে স্নেহ, ভালবাসা, করুণা, প্রীতি, মৈত্রী বা তাবৎ লব্ধ মূল্যবোধের অনুভব, এ যেন তার সব কিছুকেই ঝেঁটিয়ে দূর করা । কারণ ওর সবটাই বুর্জোয়া সমাজের । তাহলে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কোথায় ? কী ভাবেই বা পাওয়া যাবে ? কম্যুনিস্ট শ্রদ্ধাবোধ কী হঠাৎ গজাবে ? এই সময়ের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে । ডালহৌসি পাড়ারই অন্য একটা আপিসের ঘটনা । তখন সমাজ বিপ্লবের প্রায় পাহাড় প্রমাণ ঢেউ এর ওপর আমরা দোল খাচ্ছি । প্রাক্তন সব কিছুই আমাদের কাছে পরিত্যাজ্য । এমন কী রবীন্দ্রনাথও । অথচ, রবীন্দ্রসংগীত শুনবো না ------- এরকম একটা প্রতিজ্ঞা কিছুতেই বজায় রাখতে পারিনা । যা হোক্‌, সেই আপিসটিতে রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জলসা । প্রধান গায়িকা সুচিত্রা মিত্র । সুতরাং শুনতে যাবনা এতটা বিপ্লবী দৃঢ়তা কিছুতেই মনে আনতে পারছি না । অথচ ব্যাপারটা তখন প্রায় ব্রহ্মচর্য পালনের মতো । জলসায় যোগ দিলেই ব্রতভ্রষ্ট, যোগভ্রষ্ট হওয়ার ব্যাপার এবং কমরেডগণ প্রকাশ্যেই প্রতিবিপ্লবী আখ্যা দেবে । তথাপি রবীন্দ্রনাথ জয়ী হলেন । তাঁর চাইতেও বোধহয় সুচিত্রা মিত্র । কারণ, আমরা শুধ ংউতো রবীন্দ্রসংগীত শুনিনা, আমরা শুনি সুচিত্রা মিত্র বা দেবব্রত বিশ্বাস ইত্যাদিদের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত । সুতরাং গেলাম । গেলাম, কিন্তু সঙ্গে একজন কমরেড বোঝাতে বোঝাতে গেলেন । এই পচাগলা সমাজটিকে যখন আমূল পরিবর্তন করার তুমুল সংগ্রাম দাঁতে নখে চলছে, বিশেষ করে শিক্ষকশ্রেষ্ঠ `মাও' যখন নিজে চিনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিচালনা করছেন, তখন এইসব ভাববাদী, প্রতিক্রিয়াশীল গান বাজনার জলসায় সময় কাটানো যে কী প্রচণ্ড পাতিবুর্জোয়া মনোভাব, কমরেডটি তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা কানের কাছে সমানে করে গেল । আমি তার যুক্তির বিরুদ্ধে একটা কথাও বলতে সাহস করলাম না । কারণ সেটা পার্টি লাইনের বিরোধিতা । তথাপি জলসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কমরেডটির কথায় আমি স্থান ত্যাগ করতেও পারিনি । পুরোটাই শুনেছিলাম এবং যথাসময়ে, বেশ কিছুকাল ধরে আমার এই পাতিবুর্জোয়া মানসিক দৌর্বল্যের জন্য সমালোচিত হয়েছিলাম ।

    এই ঘটনাটি ঐ সময়ের হাজার ঘটনার একটি । চিন্তার জগতে এই দ্বন্দ্ব আমার মানসিক স্থিতিকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল তখন । একটা সময় এমনও মনে হচ্ছিল যে বিপ্লবের সঙ্গে সুকুমার বৃত্তির যেন একটা মৌলিক বিরোধ আছে । তাওতো আমি বিপ্লব করতে যাইনি । শুধুমাত্র যারা মনে করতো যে তারা বিপ্লবের কাজ করছে, আমি তাদের খুবই সাধারণভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করতাম । তার মধ্যে, এদের শেল্টার বা আশ্রয় দেওয়াটাই প্রধান । আমি জানতামও না, তারা কী ধরনের কাজ করতো । তবে আশ্রিতরা নিজেদের মধ্যে তত্ত্ব আলোচনা, রেড বুক পাঠ, বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত `অ্যাকসান্‌' নিয়ে নানান কথাবার্তা বলতো । আমার এবং বাড়ির অন্যদের একমাত্র কাজ ছিল তাদের অন্ন ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা । তখন আমার একার রোজগারে ব্যাপক পরিবার প্রতিপালন চলছে । মাইনের টাকায় টেনে টুনে চারদিন চলে, তারপর মাসকাবারি দোকান ভরসা । প্রতিদানে কমরেডদের কেউ কেউ আমাদের কষ্ট আহৃত সামান্য জামাকাপড় ইত্যাদি যাবার সময় চুরি করে নিয়ে যেতো । দেখলেও কিছু বলতে পারতাম না । পাছে, তাও প্রতিবিপ্লবী মানসিকতার দোষে দুষ্ট হয় । তখন একটা প্রকাণ্ড ঘোরের মধ্যে দিন কেটেছে । পরে সম্ভবত, অদম্য পাতি বুর্জোয়া স্বভাবের জন্যই মনে হয়েছে যে এরকম পরগাছা বিপ্লবী বোধহয় বিশ্ববিপ্লবে আর কোথাও দেখা যায়নি । যদিও এখানে একসময়কার নক্শালপন্থীদের নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গেই এইসব সামান্য খুঁটিনাটি অভিজ্ঞতার কথা বলছি, কিন্তু যখন অফিসিয়াল পার্টির সংশ্রবে ছিলাম এবং পার্টির এই উপভাগ ব্যাপারটি ঘটেনি, তখনও এজাতীয় অভিজ্ঞতা যে ঘটেনি এমন নয় । তবে ব্যক্তিগত অশুদ্ধতার জন্য পার্টিকে দায়ী করা চলে না ।

    এই অভিজ্ঞতাগুলো এমন কিছু বলার কথা নয় । তথাপি বলছি এজন্য যে, সাধারণ মানুষের পার্টি কর্মীদের বিষয়ে বেশ একটা বড়োসড়ো সম্ভ্রমবোধ এখনো আছে । এই বোধটা অনেক কাল ধরে পুষ্ট হয়েছে । মানুষ একদা পার্টিসদস্য বা সমর্থকদের অসীম ত্যাগ স্বীকার, ক্লেশ এবং মানুষের পাশে সবরকম সংগ্রামে দাঁড়ানোর নজির দেখেছে । সমাজের অন্য ক্ষেত্রে যেসব দোষযুক্ত স্বভাব মানুষ দেখে, কম্যুনিস্টদের আচরণে তা তারা কখনোই কাম্য মনে করে না । এটা বোধহয় ভারতীয় চারিত্র্যলক্ষণ । তারা এটা গ্রহণ করতে পারে না যে কম্যুনিস্টরাও রক্তমাংসের মানুষ । দেশের অবক্ষয়ী আচার আচরণ তাদেরকেও আশ্রয় করতে পারে । কারণ তারা এদেশেরই সন্তান, এখানকার দোষ গুণ নিয়েই তাদেরও নির্মাণ । স্বর্গ থেকে দেবশিশু হিসাবে তো আসেনি কেউ । হ্যাঁ, তাদের কোনো বিচ্যুতি ঘটলে, মানুষের উচিৎ তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া । দু:খের বিষয় বাস্তবে তা ঘটে না । ঘটলেও কম্যুনিস্টসুলভ আচরণে তার মূল্যায়ণও হয়না । একদল মিডিয়ার লোক আছেন, যারা তাঁদের কম্যুনিস্ট বিরোধী প্রভূদের আদেশে বা নিজেদের কম্যুনিস্ট বিদ্বেষের জন্যও অনেক সময়ই তিলকে তাল হিসাবে প্রচার করেন । তখন মানুষের সাধারণ দোষ ত্রুটিগুলোর পর্যন্ত কদর্য ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন যদি সেসব কোনো কম্যুনিস্ট নামধারীর মধ্যে দেখা যায়, যেন কম্যুনিস্টরা ষড়রিপুর শাসনের বাইরের ।

    সে একটা দিক । কিন্তু আমার ব্যক্তিগত যে অভিজ্ঞতার কথা ইতিপূর্বে বলেছি, সেগুলো কম্যুনিস্টসুলভ তো নয়ই, এমনকী সাধারণ মানবতাগুণ সমৃদ্ধও নয় । সেইসব আচরণ থেকে মুক্তি লাভ করার জন্যই তো এই মতবাদের আশ্রয় নেবার চেষ্টা করেছিলাম । কিন্তু সেখানেও যদি ব্যক্তিক স্বার্থসন্ধিত্সার ব্যাপকতা থাকে তাহলে মানুষ যায় কোথায় ? শুদ্ধতার খোঁজই বা কীভাবে করে ?

    ব্যাপারটা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ মোহমুক্তি ঘটলো কয়েক দিনের পুলিশ এবং জেল হাজত বাস করে । কিংবদন্তির নায়ক কমরেডদের আচার আচরণ, সংকীর্ণতা, নোংরামো ইত্যাদি দেখে আদর্শবাদের শক্তিটাকেই অবিশ্বাস করার উপক্রম হলো । কিন্তু এসবতো অন্যদের বিষয়ের কথা । নিজের কথাটা কী ? নিজের কথা অনেক এবং তাও কিছু মহৎ সংবাদ নয় । একটা দাবি করতেই পারি, আর সে ব্যাপারে নিজের কাছে আমি খুবই পরিষ্কার, জ্ঞানত কোনো নীচতা বা ধান্দাবাজির মধ্যে কখনো থাকিনি । ভুল পথে নিশ্চয়ই চলেছি, কিন্তু তার পিছনে কোনো ব্যাক্তিগত লাভালাভের উদ্দেশ্য ছিল না । পার্টির সদস্য বা সমর্থকদের জন্য কোনো কাজ করলে, তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা, যশ, অর্থ, প্রশংসা ইত্যাদির প্রত্যাশা যে মনে কখনোই জাগেনি, এ দাবি জোরের সঙ্গেই করতে পারি । এই মানসিকতাটা অনেকের মধ্যেই ছিল প্রাথমিক ভাবে । ত্রক্রমশ কেউ কেউ ক্ষমতার মোহে উদ্দেশ্যবাজ হয়েছে, কেউ বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই পার্টিতে এসেছে এবং একসময়, কোনো না কোনো ভাবে, ছোটবড়ো ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে ।

    আমি পার্টি আদর্শে শ্রমিক কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম না হলেও, তাদের কাছাকাছি মানুষ হতে চেয়েছিলাম, মানসিক ভাবে । কিন্তু আমার মন ছিল একটা একরৈখিক ধারণায় আবদ্ধ । শ্রমিক, কৃষক বা অন্যান্য মেহনতি ও নিপীড়িত মানুষের মধ্যেও যে ব্যক্তি মানুষ তত্ত্বসম্মত শ্রেণিস্বার্থের বাইরে গিয়ে আত্মস্বার্থপন্থী হতে পারে । তারাও যে সমাজের সবরকম দোষত্রুটিযুক্ত হয়, এরকম ধারণাই আমার ছিল না । আদর্শবাদের একটা অলীক বোরখা চাপিয়ে তাদের অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করতাম, ফলে ব্যাপারটা অনেকটাই সোনার হরিণ খোঁজায়ই পর্যবসিত হয়েছিল । আর মধ্য বা উচ্চবিত্ত মানুষ মাত্রেই খারাপ এবং পরিত্যাজ্য এরকম একটা অনড় ধারণা পোষণ করতাম বলে, ব্যবহারের দিক দিয়ে ভীষণ অ-সামাজিক হয়ে পড়েছিলাম । অবশ্য এটা শুধু যে আমারই একমাত্র ত্রুটি ছিল, একথা বলা যাবে না । আমাদের তাত্ত্বিক শিক্ষকদের এ ব্যাপারে দায় ছিল । তবে সবদিক বিবেচনা করে বলতে পারি, আমি কোনোমতেই এই পথের জন্য উপযুক্ত পথিক ছিলাম না । যে মেধা, বুদ্ধি, মনন, নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রম, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি থাকলে এই উদ্দেশ্যে মানুষের মধ্যে কাজ করা যায়, তার কোনোটাই আমার মধ্যে ছিলনা । উল্টো, যেটা অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং ন্যাক্কারজনক ত্রুটি, অর্থাৎ অলস সমালোচনা, অর্থহীন মাস্তানি তারই প্রকোপ ছিল সর্বাধিক । এমন কী এখন যে লিখতে বসে নানান আলোচনা করার চেষ্টা করছি পাঠক সেখানেও এই দোষেরই প্রকাশ অধিক দেখতে পাবেন । আত্ম-সমালোচনার থেকে আত্ম প্রতিষ্ঠার প্রকোপটাই বেশি ।

    এছাড়া আর একটা জিনিসও আমার মধ্যে এই সময় থেকে প্রায় একটা স্থায়ী স্বভাবে পরিণত হচ্ছিল । দৈহিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে মাস্তানসুলভ আচরণ, যার থেকে ঘৃণ্য একজন ব্যক্তিমানুষের আচরণে আর কিছুই হতে পারেনা । এর জন্য অবশ্যই নানা ধরনের নির্যাতন এবং অসম্মান অনেক সময়েই আমার কপালে জুটেছে, কিন্তু তার জন্য কাউকেই ন্যায্যত আমি দায়ী করতে পারি না । ব্যবহারিক আচার আচরণে অনেক ব্যক্তিমানুষের সঙ্গেই আমি অন্যায় আচরণে লিপ্ত হয়েছি বটে, তবে তার জন্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অনুতাপেও দগ্ধ হয়েছি । অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের কাছে নিজের থেকেই গিয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করেছি ।

    আমার জীবনের এই পর্বটা খুবই অসংলগ্ন । অনেক সময়ই এই অসংলগ্ন আচরণের কার্যকারণ আমি নিজের মধ্যে অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করেছি । যেটুকু বুঝতে পেরেছি, তা হলো শৈশবাবধি ঘরে বাইরে প্রায় সবার কাছে অশ্রদ্ধা এবং অনাদর । এর জন্য আমার মধ্যে জন্ম নিয়েছে এক অন্যায় অবরুদ্ধ অভিমান । পরবর্তী কালে যখন কিছু কিছু মর্যাদা, ভালবাসা, শ্রদ্ধা বা স্নেহের প্রকাশ কোথাও দেখেছি, পুরো বিশ্বাসে সেসব নিতে পারিনি । সেটাও বোধহয় আমার চারিত্রিক একটা ত্রুটি । ব্যাপারটা হয়তো একটা মানসিক রোগ । কিন্তু এখনো মনে হয়, ব্যাপারটা সবটাই কি তাই ? আমি যে বুঝতে পারি যে জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই আমি শুধু ব্যবহৃতই হয়েছি । তার মধ্যেও যে সত্য নেই, সেকথা বলতে পারি না ।

    এটা শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, পারিবারিক, সামাজিক এবং অফিস বিষয়ক, সব ক্ষেত্রেই । এর উদাহরণ অনেকই দেওয়া যায় । কিন্তু তাতে ভুল বোঝাবুঝির বোঝা শুধু বেড়েই যাবে । তাছাড়া ব্যাপারটা আমার রুচিসম্মতও নয় । বরং এই ভালো, সবদোষ নিজেরই এই প্রত্যয়ে স্থির থাকা । সংসারে কেইবা কার ভেতরটা বোঝে ? সবাইতো ভাবে যে সে শুধু ব্যবহৃত হয়েছে আমারই মতন ।

    ॥ আট ॥


    জেলে থাকতে নিজের শ্রেণিগত অবস্থান একদিন এমন উলঙ্গভাবে বুঝলাম যে তারপর থেকে আর কোনোদিন নিজেকে বিপ্লবী বা নিদেন সাধারণ মানুষের দরদী বলে ভাবার মতো মানসিক প্রত্যয়েও স্থিত হতে পারিনি । সেরকম চিন্তা করতে গেলেও বড়ো ভণ্ড বলে মনে হয় নিজেকে । ঘটনাটা সাধারণ । আজও ভাবি কতো ক্ষুদ্র ঘটনায়ও মানুষের সত্য দর্শন ঘটতে পারে ।

    তখন লালবাজার সেন্ট্রাল লক-আপে আছি । একেকটা সেলে পঁচিশজন করে পাঁচ মিশেলি কয়েদি । কেউ ডাকাত, কেউ চোর, কেউ পকেটমার আবার কেউবা তহবিল তছরূপকারী ইস্কুলের হেডমাস্টার । বাকি কয়েকজন আমরা বিপ্লবী তক্মাধারী । সবাই বিচারাধীন বন্দি, সে কারণে একজাত । এখানের ব্যবস্থাপনাটা প্রকৃতই সাম্যবাদী । অল আর ইকোয়্যাল । কিন্তু সে শুধু আইনের চোখে । এর মধ্যে মোর ইকোয়্যালও দুএকজন থাকে । পাসপোর্ট খোয়ানো, বা ড্রাগ পেড্লার, দু একজন সাদা চামড়ার কেউ থাকলে প্রাচীন কৃতজ্ঞতাবশত, তাদের ইকোয়্যালিটি একটু ভিন্ন মাপের হয় । এটা অন্য দাগী ক্রিমিনালদের ক্ষেত্রেও সত্য । সেখানে রিস্তাটা টাকার ।

    জেলখানা বা লক্‌-আপে সে সময় একটা বিশেষ কারণে বিড়ি সিগারেট প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল । না, smoking is injurious to health নামক ন্যাকা বোকা সতর্ক বাক্যটির তখনও উদ্ভব ঘটেনি বা কোর্টও প্রকাশ্যে বা পাবলিক প্লেসে ধূমপানে দুশো টাকা জরিমানা ধার্য করে ফতোয়া দেয়নি । এ তার ঢের আগের কথা । তখন দেশের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জরুরি অবস্থা জারি করে, উগ্র অনুগ্র সব বিরোধী দল ও নাগরিককে অনুশাসন শিক্ষা দিচ্ছিলেন । কারণ অনুশাসনহি দেশকো মহান বনাতা হ্যায়, এই শিক্ষার পাঠশালা হিসাবে দেশের তাবৎ জেলখানাগুলি বিনাবিচারে বন্দিদের প্রায় চিরস্থায়ী আবাসে পরিণত হয়েছিল অনুশীলন শিক্ষা দেবার জন্য । আজকের সত্‌, নিরপেক্ষ এবং ফতোয়া জারি করনেওয়ালা গণতান্ত্রিক আগমার্কা বিচার বিভাগ তখন প্রধানমন্ত্রীর পোষা কুত্তার মতো, তাঁর বৈঠকখানার সোফা সেটে ন্যাজ নাড়তো । তাই, নিরূপায় বিচারাধীন বন্দিরা একসময় জেল ভেঙে বেরিয়ে আসার হঠকারিতা করেছিল । কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জেলখানা গুলোতেই এই প্রচেষ্টা হয় । আলিপুর প্রেসিডেন্সি জেল, জেল কুলে কুলিন এবং শক্ত ঠাঁই হওয়ার কারণে এখানের প্রচেষ্টাটি বোধহয় একটু বড় ধরনের হয়েছিল । কী উপায়ে তার মধ্যে অস্ত্রশস্ত্র গিয়েছিল সম্যক জানা নেই । তবে স্বয়ং ভেতরে যাবার পর গালগল্পে শুনেছিলাম যে মোটামোটা বিড়ির মধ্যে বোমার মশলা পাচার হয়েছিল নাকি । ভেতর এবং বাইরের যুগপৎ সশস্ত্র আক্রমণের সময়ের বোমাগুলো নাকি ঐ মশলা দিয়েই তৈরি হয়েছিল । ব্যাপারটা প্রকাশ হয়ে পড়লে, ভেতরে ধূমপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় । অবশ্য তার স্বপক্ষে কোনো আইন বলবৎ হয়নি । নেহাতি পুলিশি সতর্কতা হিসাবে গা-জোয়ারি ।

    কিন্তু বিড়ি সিগারেটখোরদের নিবৃত্ত রাখা বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শকে স্তব্ধ রাখার মতো সহজ ছিল না, এখনো নেই । আসলে বিরোধী কোনো কিছুকেই জোর করে স্তব্ধ করা যায় না সম্ভবত । এ প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা বলছি । আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য যে অফিসারটি ছিলেন, স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের পুলিশ হলেও মানুষটি রসিক ছিলেন । পুলিশ রসিক হয় না এমন কোনো নিয়ম নেই, তবে ঐ সময়টায় ব্যাপারটা প্রায় অবিশ্বাস্য, বিশেষ করে স্পেশাল ব্র্যাঞ্চে । যাহোক, ভদ্রলোকের ধূমপানের অভ্যেস ছিল প্রবল । একদিন জিজ্ঞাসাবাদের সময় উনি একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছেন আর প্রশ্ন করছেন । ততদিনে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে আমাকে রগ্ড়ে কোনো লাভ নেই । আমি নিতান্তই ঢোঁড়া জাতীয় । সুতরাং তাঁর ব্যবহারে রসিকতাটা প্রাধান্য পাচ্ছিল । সেদিন আমি বললাম, আপনাদের উত্পীড়ন করার অনেক পদ্ধতি আছে জানি, কিন্তু এটা কী ধরনের অত্যাচার মশাই ? তিনি বললেন, কিন্তু আমি তো আপনার উপর কোনো অত্যাচার উত্পীড়ন করিনি, কেন একথা বলছেন ? বললাম, আমি মশাই একজন পাঁড় সিগারেট-খোর, সেলের মধ্যে ধূমপান নিষেধ বলে ফতোয়া জারি করে দিয়েছেন, আর এখানে আপনি আমার মতো একজন ধোঁয়া-উপোসির সামনে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে চলেছেন । এটা কী চরম একটা অত্যাচারের নমুনা নয় ? ভদ্রলোক তাঁর প্যাকেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব লজ্জিত হয়ে বললেন, অবশ্যই অত্যাচার, যথার্থই বলেছেন আপনি । কিন্তু জানেন তো, পুলিশ সিগারেট অন্যের কাছ থেকে খায়, খাওয়ায় না কাউকে । বলে একটা প্রবল অট্টহাস্য করলেন এবং সেটা আদৌ পুলিশ সুলভ ছিল না । কিন্তু আসল গল্পটা ভিন্ন । সেটা আদপেই রসিকতা ছিল না কোনো তরফ থেকেই ।

    লক্‌-আপে চোর বা পকেটমার জাতীয়রা নীচু তলার পুলিশ, রক্ষীদের জিগ্রি. দোস্ত । সেলে ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও তারা কায়দা কৌশল করে বিড়ি সিগারেট বাইরে থেকে আনিয়ে খেতো । আমাদেরও এক আধ টান ভাগ দিত । নেশার জিনিস এঁটো হয়না । একজন প্যাঁকাটি মতো চেহারার বন্দি ছিল, নামটা মনে আছে, পাঁচুদা । তার দুহাতের কনুইয়ের ওপরের অংশে দশ বারোটা কবচ-তাবিচ ছিল । তাকে দেখতাম সে গুলোর মধ্যে একটা কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সে যেন কী খায় । খাওয়ার পর ঘন্টার পর ঘন্টা ভোম মেরে বসে থাকে । আমাদের সঙ্গে একজন বিদেশি সাহেবও কী কারণে যেন বন্দি ছিল । সেও দেখতাম পাঁচুদার কাঠি চুষছে । আমরা একটা বিড়ি কেউ ধরালে, তাকে দশ বারোজন ঘিরে বসে তীর্থের কাকের মতো প্রত্যাশী হয়ে থাকি, যদি একটা টান অন্তত পাই । আর পাঁচুদা, সাহেব, তারা ওসব কী বস্তু খায় যে ভোম্‌ মেরে থাকে ? জিজ্ঞেস করতে পাঁচুদা বললে, কোকেন, আফিম ------- ওসব তোমরা বুঝবে না । ওগুলো সব উঁচুদরের জিনিস ।

    ------- পাও কোথায় ? আমরা একটা বিড়ি তক্‌ জোগাড় করতে পারিনা ।
    ------- মাল ফেলো আনিয়ে দিচ্চি । বিড়িতো ছেলেমানুষ, মদ, গাঁজা, আফিম, কোকেন, চরস, চল্লু, সাপের শিশি যা চাও স-অ-ব পাবে । পাঁচুর লাইন আছে ।
    ------- পুলিশ ধরে না ?
    ------- পুলিশের `ইয়েদের' নিয়ে পাঁচু শোয় । হে:, পুলিশ ধরবে ! তার বয়ে গেছে ধত্তে । কিন্তু মাল চাই, মাল । আস্লি মাল । পয়সা দাও পুলিশ তোমার চাকর ।

    এমার্জেন্সি পিরিয়ড । পশ্চিমবঙ্গের সিংহাসনে তখন দেশবন্ধুর দৌত্তুর সিদ্ধার্থশঙ্কর তাঁর দাদামশায়ের দেশপ্রেমের একাউন্টের সুদ উশুল করছেন । কেন্দ্রে দাদামশাইয়েরই সতীর্থ মতিলাল নেহেরুর নাত্নি, জেন্টেল-কোলোসাস্‌ জওহরলাল পুত্রী, এশিয়ার মুক্তিসূর্য । তখন এই আজকের, অর্থাৎ দুহাজার আট নয় সালের বিরোধী গণতন্ত্রপ্রেমী দলনেতা নেত্রী এবং তাদের সতীর্থরা প্রায় সবাই স্বঘোষিত ফ্যাসিস্ত এই আজকেরই মতো । তাদের দেশপ্রেমের আগুনে তাবৎ তত্কালীন বিরোধীপক্ষ ভস্মীভূত প্রায় । গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, মানবাধিকার রক্ষা, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি তথা ব্যাপক সুশীল বুদ্ধিজীবিদের অধিকার রক্ষার বর্তমান অভিভাবকদের অনেকেই সেদিন ছিলেন, তবে বড়ো শান্ত হয়ে ছিলেন । বড়ই সুশীল এবং অনুগত ।

    বয়স হয়ে গেলে পুরোনো কথা বলতে গিয়ে বড় লাগাম ছাড়া হয়ে পড়তে হয় । বলতে চাইছিলাম সেইসময়ে নিজের শ্রেণিগত অবস্থানের কথা । কিন্তু শ্রেণিচরিত্রটাই এমন যে সেখানেও বিশুদ্ধ আত্মসমালোচনাটা করতে পারছি না । পরনিন্দাই প্রধান হচ্ছে । শেষ পর্যন্ত আমিও তো একই ঝাড়ের বাঁশ, মধ্যবিত্তই, তা কোনো বিত্ত থাক বা না থাক । হবে না ?

    পাঁচুদাকে বললাম কয়েকটা বিড়ি আনিয়ে দাওনা তোমার লোক দিয়ে । পাঁচুদা বললে, পহা দাও, এক্কুনি পাবে । কিন্তু পয়সা কোথায় ? ওরা কীভাবে পয়সা জোগাড় করে জানলাম । যারা কয়েদিদের সঙ্গে দেখা করতে আসে, তাদের কাছ থেকে নেয় । সার্চ করার সময় শরীরের গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখে, বা যাদের দিয়ে মালপত্তর আনায় তাদের সঙ্গে অন্যরকম ব্যবস্থা করে নেয় ।

    মাঝে স্ত্রী একদিন দেখা করতে এলে, তাঁর কাছ থেকে দুটি টাকা নিলাম । নোটটি একটি গোল্লা পাকিয়ে মুখের এক কোণে লুকিয়ে ভেতরে এলাম । পাঁচুদা বললে, ষোলটা বিড়ি হবে এতে । তখন বিড়ির বাণ্ডিল ছিল ছ'সাত আনা । বাণ্ডিলে বিড়ি থাকতো চব্বিশটা । সেখানে দু'টাকায় ষোলটা মাত্র ? কিন্তু নেশা বড়ো বালাই । বাকি পয়সাটা দস্তুরি । তাই সই । সেদিন রাতে নৈশভোজের পর আমরা কমরেডরা একেকজন গোটা গোটা বিড়ি ধরিয়ে সেকি উত্তেজনা ! কিন্তু আসল ঘটনাটা এই সময়ই ঘটলো এবং আমি প্রকৃত সত্য দর্শন করলাম । সেলটার একটাই মোটা গরাদের গেট । চারদিকে উঁচু মোটা দেয়াল । সুতরাং অতগুলো লোকের উদ্গীরিত ধোঁয়া কুণ্ডলি পাকিয়ে প্রায় বয়লারের ধোঁয়ার আকারে সামনের গরাদ দিয়ে বেরোচ্ছিল । লক্‌-আপ সেন্ট্রি জনা দুয়েক হান্টারধারী পুলিশ কর্মচারীসহ গরাদ খুলে ঢুকতে না ঢুকতে আমি অবাক হয়ে দেখলাম সেলের পঁচিশজন বন্দি সরাসরি দুটো ভাগ হয়ে গেল । অরাজনৈতিক কয়েদিই বেশি ছিল । বিড়িগুলো আশু বিপদের শঙ্কায় আগেই মাড়িয়ে নিবিয়ে ফেলা হয়েছিল । কিন্তু তাতে মার থেকে রেহাই মেলেনি । মারটা খেলো চোর, পকেটমারের লোকেরা । দুটো ভাগের একদিকে আমাদের মতো তথাকথিত বিপ্লবী কয়েদিরা এবং অন্যদিকে ছোটলোক চোর, পকেটমার ইত্যাদি `ফাল্তুরা' । বন্দিদের মধ্যে `ফাল্তু' এই বিশেষণ ব্যবহার শুনেছিলাম একজন আগুনখেকো তাত্ত্বিকনেতার মুখেই ঐ সময় । অর্থাৎ এখানেও সেই শ্রেণিভেদ ------- বিপ্লবীরা ভদ্দরলোক এবং অন্যরা ছোটলোক ------- ফাল্তু ।

    সেন্ট্রি জানতে চাইছিল বিড়ি কে আনিয়েছে এবং কার কাছে আছে বের করো । কেউ কোনো কথা বললো না । তখন শুরু হলো এলোপাথাড়ি মার । আমাদেরই অর্থাৎ ভদ্দরলোকদেরই একজনের পকেটে বিড়িগুলো ছিল । সবাই তা জানতো । চোর, পকেটমারেরাও । ওরা মার খেয়েও কিছু বললো না । সেন্ট্রি তার সঙ্গের পুলিশদের বললো, সবাইকে সার্চ করো । যার কাছে বিড়ি পাওয়া যাবে, তাকে মার খেতে হবে । আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, আপনারা ভদ্রলোক, ভদ্রঘরের ছেলে । যদি কারু কাছে রেখে থাকেন দিয়ে দিন । অগত্যা দিয়ে দিতে হলো । সেন্ট্রি কিছু উপদেশমূলক কড়া কথা বলে চলে গেল তার লোকদের নিয়ে ।

    ঐ নির্দোষ `ফালতু'রা ওরকম বীভত্স মার খেলো আমাদের দোষে । অথচ আশ্চর্য ! এজন্য আমাদের মধ্যের কেউ সামান্য দু:খ প্রকাশ পর্যন্ত করলাম না তাদের কাছে । তারাও, ব্যাপারটা যেন এমনই হওয়ার কথা, সেভাবেই ব্যাপারটা মেনে নিল । যেন আমাদের কাছে তাদের কোনো সৌজন্য প্রত্যাশাও নেই । হায়, আমরা আনবো জনগণের মুক্তি নিপীড়ন থেকে ! কে কাকে মুক্ত করে ! অন্তত ভদ্দরলোকেরা যে করে না, সেটা সেদিন আত্মগ্লানিতে জ্বলে মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলাম । মনে মনে স্বীকার করেছিলাম, আমরা চূড়ান্ততম ভণ্ড এবং সুবিধেবাদী ।

    এই ঘটনার পর থেকে সমাজ-বিপ্লবের ফাঁকা আওয়াজ এবং মানবমুক্তির বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার বড়ো বড়ো বুলি উচ্চারণ করার মন হয়নি । তবে পুরোনো অভ্যাসবশত হয়তো দুচার কথা কখনো কখনো মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে, উগ্রস্বভাবটাও রাতারাতি যায়নি, তবে অন্তরে বুঝেছি, নিজে শুদ্ধ না হয়ে একাজে আসা ভণ্ডামিরই নামান্তর এবং আমাদের মতো তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্দরলোকেরা আর যাই হই, শুদ্ধ মানুষ নই । যতদিন সেই সাধনায় সিদ্ধি না হয়, ততদিন মানবমুক্তির জন্য কাজ করার অধিকার আমাদের নেই ।

    ( শেষ )

    (পরবাস ৪৫, এপ্রিল, ২০১০)

  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)