• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪১ | এপ্রিল ২০০৮ | গল্প
    Share
  • বিহঙ্গ ও সাগর : ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত

    বর্ষার বিকেল । বেলা চারটে টারটে হবে । আকাশে ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে আলো । ফুরফুরে একটা হাওয়া দিচ্ছে । বিহঙ্গ সাগরের বাড়িতে এসেছিলেন দেখা করতে । সঙ্গে প্রতাপচন্দ্র হাজরা, ভবনাথ চট্টোপাধ্যায় ও মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত । প্রতাপের বয়স চুয়ান্ন পঞ্চান্ন । মেট্রোপলিটান স্কুলের প্রধানশিক্ষক মহেন্দ্রনাথের বয়স আঠাশ । ভবনাথ নিতান্তই ছেলেমানুষ, তার বয়স উনিশ ।

    চারজন নামলেন ঘোড়ার গাড়ি থেকে । বাদুড়বাগানে বাগানঘেরা বড় বাড়ির চারদিকে পাঁচিল । দুতলার একটা ঘরকে সাগর বৈঠকখানা, গ্রন্থাগার এবং শোবার ঘর এই তিনরকমভাবেই ব্যবহার করেন । গাড়ি থেকে নেমেই বিহঙ্গ ভয়ে ভয়ে বললেন - মাস্টার, আমাদের তাড়িয়ে দেবে না তো ?

    বিহঙ্গের পরনে লালপেড়ে ধুতি, গায়ে লংক্লথের জামা । বয়স পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ হবে । মহেন্দ্রনাথ বিহঙ্গকে আশ্বাস দিয়ে বললেন - না, না । ভারি অমায়িক লোক । আগে থাকতেই বলে রেখেছি তো আপনাকে নিয়ে আসব । জামার বোতাম খোলা বলে ভয় পাচ্ছেন ? উনি মানুষকে পোষাক-পরিচ্ছদ দিয়ে বিচার করেন না ।

    - আচ্ছা চলো তাহলে ।

    একদিকে প্রতাপ এবং অন্যদিকে ভবনাথকে নিয়ে আড়ষ্টভাবে সিঁড়ি ভাঙতে আরম্ভ করলেন বিহঙ্গ । আগে আগে মহেন্দ্রনাথ । এবাড়ির পথঘাট মহেন্দ্রনাথের চেনা । অতএব সিঁড়ি দিয়ে উঠে দুতলার বৈঠকখানা ঘর অবধি পৌঁছতে কোন অসুবিধে হল না ।

    বৈঠকখানার ঘরের একদিকে কাঠের চেয়ার টেবিল পাতা । দেয়ালের সঙ্গে লাগানো আলমারিভর্তি অনেক রকমের দেশি-বিদেশি বই ও পুঁথি । তার মধ্যে মনুসংহিতা, পরাশরসংহিতা থেকে শুরু করে নিউটনের প্রিন্সিপিয়া এবং ডারউইনের বিবর্তনতত্বের বই রয়েছে । ঘরের আরেকদিকে ছোট একটা খাটের উপর সাদামাটা বিছানা পাতা । টেবিলের আশেপাশে কয়েকজন বয়স্ক লোক বসে ছিলেন । এঁদের চশমা ও টিকির সঙ্গে মহামহোপাধ্যায় বা তর্কচঞ্চু উপাধি বেমানান নয় । যে দরজা দিয়ে ঢুকলেন বিহঙ্গ, তার পাশে একটা কাঠের বেঞ্চির উপর সতেরো আঠেরো বছর বয়সের একটা ছেলে একটু উদ্বিগ্ন মুখ নিয়ে বসে ছিল ।

    মহেন্দ্রনাথ ও বিহঙ্গকে ঢুকতে দেখে সাগর শশব্যস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন । অতিথিবত্সল লোকটির পরনে থানের ধুতি আর ফ্ল্যানেলের জামা । তিনি সহাস্যে বলছিলেন - আসুন, আসুন । বিহঙ্গ সাগরের মুখের দিকে চোখ রেখে ঘরে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠে হোঁচট খেলেন । আর তক্ষুনি তাঁর ভাবাবেশ হল ।



    ***


    বাষট্টি বছর বয়সেও সাগরের ছোটখাটো শরীর ঋজু এবং বলিষ্ঠ । গায়ের রঙ শ্যামলা । বিশেষ লোম নেই । কুস্তি করতে ভালোবাসতেন এককালে । মুখশ্রী যুবকের মত । উন্নত কপাল ও চিবুক আর দুচোখের প্রখর দৃষ্টির মধ্যে একটি অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের আভাস পাওয়া যায় । বিহঙ্গকে দেখে সাগরের প্রথম প্রতিক্রিয়া হল - লোকটা হয় ফ্রড, নয় ফিটের রুগি ।

    বিহঙ্গের দুহাত অঞ্জলিবদ্ধ, দেহ একেবারে নিস্পন্দ, চোখ বিস্ফারিত এবং মুখের ভঙ্গীতে উল্লাস । মহেন্দ্র এবং ভবনাথ বিহঙ্গকে দুদিক থেকে ধরে ধৈর্যযসহকারে দাঁড়িয়ে । সাগর প্রথমে ভেবেছিলেন ডাক্তারকে খবর দেবেন । তারপর মুহূর্তটি ত্রক্রমশ প্রলম্বিত হচ্ছে দেখে তাঁর মনে হল পুরো ব্যাপারটাই সাজানো । একটা অতিরিক্তরকমের নাটকীয় আবির্ভাব ঘটানোর জন্য বিহঙ্গ আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল । কিছুটা বিরক্ত আর কিছুটা হতাশ হয়ে সাগর ঠিক করলেন ডাক্তার ডাকার দরকার নেই । ফিটের ব্যাপারটা যদি পথশ্রমহেতু হয় তাহলে একটু জলমিষ্টি খাইয়ে দেখা যাক । আর যদি সাজানো হয় তাহলে এই প্রহসনে কোন ভূমিকাই পালন করবেন না তিনি । মৌনই হবে তাঁর সমালোচনার ভাষা । তাঁর নীরবতার ইঙ্গিত বুঝে যদি ভণ্ডগুলো পালায় তাহলে সব ভালো যার শেষ ভালো । মহামহোপাধ্যায় আর তর্কচঞ্চুর সাথে যে কৌতুহলোদ্দীপক আলোচনা জমে উঠেছিল সেটা শেষ করা যেতে পারে ।

    বিহঙ্গ একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে বেঞ্চের উপর বসতে যাচ্ছিলেন । সাগর জল আর মিষ্টি আনাবার ব্যবস্থা করলেন ।



    ***


    বিহঙ্গের যখন ভাবসমাধি হয় তখন তাঁর মনে হয় যেন আশেপাশের লোকগুলোর মনের ভিতরটা একটা টলটলে দীঘির জলের মত স্বচ্ছ হয়ে গেছে আর তিনি তার তল পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছেন । সাগরের মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখলেন সেখানে যেন একটা ভয়ানক লম্বা অসমাপ্ত কাজের ফিরিস্তি অনবরত অজগরের মত ওলটপালোট খাচ্ছে । ভক্তি-শ্রদ্ধার লেশমাত্র নেই । মেজাজটা খিঁচড়ে যাচ্ছিল বিহঙ্গের । আড়চোখে বেঞ্চিতে বসা সতেরো-আঠেরো বছর বয়সের ছেলেটাকে দেখে মনে হল নির্ঘাৎ চাকরির উমেদারি করতে এসেছে । পয়সা আর মেয়েমানুষ । এছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবেই না এসব লোক ! তাকেই নিয়ে পড়লেন বিহঙ্গ । - বড়ই সংসারী ছেলে হে তুমি । তোমার পুরোটাই অবিদ্যা । মুক্তি হল না আর এ জন্মে ।

    শুনে ছেলেটা বেশ ঘাবড়ে যায় । মুক্তি টুক্তি নিয়ে ভাবছিল না সে । তার ধারণা হয় যে চাকরি হবে না একথাটাই বলা হচ্ছে তাকে । মুখটা আরো শুকিয়ে যায় তার । দূর থেকে সাগর তাকে ইঙ্গিতে জানান চুপ করে বসে থাকতে ।

    বিহঙ্গ হঠাৎ সাগরের দিকে চেয়ে বললেন - এতদিন খাল বিল হদ্দ নদী দেখেছি । এবার সাগর দেখলাম ।

    সাগর বুঝতে পারলেন না, তাঁকে নিয়ে পরিহাস করা হচ্ছে কিনা । সাবধানের মার নেই । হাসতে হাসতে বললেন - হ্যাঁ, শুধু জলই মিলবে, তাও নোনা ।

    বিহঙ্গ তাড়াতাড়ি বললেন - নোনা হবে কেন ? তুমি তো ক্ষীরের সমুদ্র । বিদ্যার সাগর, দয়ার সাগর । এত তোমার দয়া, তুমি তো সিদ্ধ পুরুষ ।

    - অ্যাঁ ! আমিও সিদ্ধ পুরুষ ? সেটা হলাম কীভাবে ?

    - কেন, আলু পটল সিদ্ধ হলে নরম হয় না ? তোমার মন তো খুব নরম । অত দয়া !

    ঘরের সবাই, মায় চাকরিপ্রার্থী ছেলেটা পর্যন্ত এ-কথায় হাসতে শুরু করেছে । সাগর জীবনে বহু তর্কে জিতেছেন । কিন্তু সে সব তর্ক ছিল শুকনো পণ্ডিতি কচকচানি । এরকম প্রবল দিশি বাক্চাতুর্যের সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় তাঁর ভালো জানা নেই । তিনি আমতা আমতা করে বললেন - কিন্তু কলাই বাটা সিদ্ধ করলে শক্তই হয় !

    - তুমি তা নও গো । তুমি তা নও । শুধু পণ্ডিতগুলো দরকচা পড়া ।

    বিহঙ্গ সাগরকে বললেন যে পণ্ডিত যত উঁচুতে ওঠে শকুনের মত তার দৃষ্টি চলে যায় তত নিচুতে, ভাগাড়ে । সাগর এরকম দিশি পণ্ডিত অনেক দেখেছেন । নিজেকে তিনি কোনো অর্থেই পণ্ডিত বলে মনে করেন না । ছোটবেলা সস্কৃতের সম্যক্‌ জ্ঞানকেই পাণ্ডিত্যের পরিচয় বলে মনে করতেন । কিন্তু বড় হয়ে বুঝলেন সংস্কৃত একটি মৃত ভাষা । এত কষ্ট করে যা শিখেছেন সেই ভাষাতে কথা বলতে সাহস হয় না তাঁর । লিখতে গেলে ভুল হয়ে যায় । যে সব পণ্ডিত বিদ্যা জাহির করার জন্য লেখে তাদের লেখাতেও দেখা যায় অসংখ্য ভুল । নিজের চেষ্টায় পরবর্তীকালে ইংরেজি শিখেছেন । সাগরের মনে হয় আরেকবার যদি ছোট থেকে বিদ্যার্জন শুরু করার সুযোগ তিনি পেতেন তাহলে এবার অংক আর বিজ্ঞানই হত তাঁর সাধনার বিষয় । নিউটনের দৃষ্টি কী ভাগাড়ের দিকে ? গ্যালিলিওর ? ডারইনের ? অথচ দেশের লোক জ্ঞান বিজ্ঞানের জগত্টা চিনলই না । এ কী এক সমাজ আমাদের যাতে পণ্ডিত বলতে লোকে শুধু চেনে লোভী ও দাম্ভিক কয়েকজন জোচ্চোরকে যাদের সত্যিকারের জ্ঞান সামান্য, বিচারবোধ স্বার্থসর্বস্ব এবং কোনো কিছু সৃষ্টি করার বা আবিষ্কার করার ক্ষমতা শূন্য ?

    বিহঙ্গের প্রশংসার মধ্যেই রয়েছে বিদ্রুপ । সাগর তার কারণটা বুঝতে পারছিলেন না । তিনি তো কোনোদিন পাণ্ডিত্যের অভাবের জন্য কাউকে ছোট করেননি ।

    বিহঙ্গ অনর্গলই কথা বলে চলেছেন । তাঁর কথার স্রোত একটি বিশেষ খাতে চলেছে । তিনি বলছেন ব্রহ্মবিদ্যার কথা । ব্রহ্ম নির্লিপ্ত । বিদ্যামায়া ও অবিদ্যামায়া দুয়েরই প্রতিই তার সমান অপক্ষপাত । অর্থাৎ তাকে লাভ করতে গেলে বিদ্যা ও অবিদ্যা দুইই অতিক্রম করা প্রয়োজন ।

    সাগর বক্তব্যটা একটু একটু ধরতে পারছেন । অর্থাৎ পড়াশোনা করে যে জ্ঞান অর্জন করা যায় সে সবের উর্ধ্বে কোনো একটা উপলব্ধির কথা বলা হচ্ছে । সাগরের মতে অবশ্য এ সব মিস্টিক ব্যাপার স্যাপার বুঝতে চেষ্টা করাই বৃথা । `বিদ্যামায়া,' `অবিদ্যামায়া', `ব্রহ্মবিদ্যা' সবই এক একটা কথার ধাঁধা । কোনটারই মানে পরিষ্কার করে কেউ বুঝিয়ে বলে না ।

    - ব্রহ্ম যে কী আজ পর্যন্ত কেউ মুখে বলতে পারে নাই । বলছিলেন বিহঙ্গ । - বেদে পুরাণে যা বলেছে - সে কিরকম বলা জানো ? যেন কেউ একজন সাগর দেখে ফিরেছে, তাকে জিজ্ঞেস করলে, কেমন দেখলে । সে শুধু মুখ হাঁ করে বলে - ও:, কী দেখলুম ! কি হিল্লোল কল্লোল ! এই হল তার বলা । ব্রহ্ম যে কী তা মুখে বলা যায় না । সব জিনিস উছিষ্ট হয়ে গেছে । বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, ষড়্‌ দর্শন - সব এঁটো হয়ে গেছে ! মুখে উচ্চারিত হয়েছে যে ! কেবল একটি জিনিস উচ্ছিষ্ট হয় নাই । সে জিনিসটি ব্রহ্ম !

    শেষ তুলনাটা বেশ লাগল সাগরের । মনে হল - না: লোকটার এলেম আছে তো ! বেশ কবিত্ব করে বলল জিনিসটা । পরক্ষণেই মনে হল - কিন্তু তাই বলে কি কোনো মানে হল কথাটার ? যদি তাকে মুখে না বলা যায়, লিখে না বোঝানো যায় তাহলে তোমার উপলব্ধি আর আমার উপলব্ধি সমান কিনা কী করে জানা যাবে ? এ তো একটা অমীমাংস্য ব্যাপারই দাঁডালো । যে কোন অন্ধবিশ্বাসের সঙ্গে এর তফাৎ কি ?



    ***


    প্রায় ঘন্টা দুয়েক কেটে গেছে । এর মধ্যে দুবার ফিটও হয়েছে বিহঙ্গের । দুবারই ঘটনাটা ঘটে ভাবাবেগে গান গাইতে গিয়ে । সাগর প্রায় সারাক্ষণই শ্রোতা । শুনতে তাঁরও ভালোই লাগছে মাঝে মাঝে, কিন্তু বুঝতে গেলেই বিপত্তি । যুক্তি বা প্রমাণের ধার ধারেন না বিহঙ্গ । প্রমাণের অভাব একটা গল্প কিম্বা কিছু উপমা দিয়ে ভরাট করে নিচ্ছেন । উপমাগুলো কিন্তু বেশ জবর । ব্রহ্মজ্ঞানী চুপ করে থাকে এর তুলনা বিহঙ্গ করলেন গরম তেলের সাথে । কাঁচা তেলের কলকলানি, পাকা তেলের সেটা নেই । সাগর মনে মনে বাহবা দিয়েও ভাবলেন - কিন্তু জল ? জল তো যত গরম ততই সরব । এ জিনিস ডারউইনের ফসিল এভিডেন্স নয়, বা গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা চন্দ্র-সূর্যের গতি নয় যার যাথার্থ্য হাতে কলমে ল্যাবরেটারিতে প্রমাণসাপেক্ষ, বা উল্টো উদাহরণ দিলে লোকে যুক্তির অভাবটা বুঝবে । সাগর ভাবলেন - এ ব্যাটাকে যদি পাকড়ে ধরে প্রিন্সিপিয়াটা পড়ানো যায় । তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন - এ দেশের জলবায়ুটাই বোধহয় মানুষকে এরকম যুক্তিপরাঙ্মুখ আর ভাবালু করে দিচ্ছে । এমনকি মহামহোপাধ্যায় মশাইয়ের মুখটাও কেমন আপ্লুত হয়ে এসেছে । কেবল তর্কচঞ্চুরই ঠোঁটে অল্প অল্প ব্যঙ্গের হাসি । এ আরেক বিপদ হল । তর্কচঞ্চু মুখ-আলগা লোক । বেফাঁস রূঢ় কিছু একটা বলে বসবেন না তো ? তাহলে আরো কত লেকচার শুনতে হবে কে জানে ?

    বিহঙ্গ এবার তাঁর সার কথাটি বলে নিচ্ছেন । কলিযুগে ব্রহ্মকে জানার একটাই উপায় । ভক্তি । পাণ্ডিত্যকে অতিক্রম করে যেতে হবে কোথায় ? না বিশ্বাসে । সাগর একটু রুষ্ট হলেন । কথাটা যে আপামর জনতা খাবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । পড়াশোনা করো, অনুসন্ধান করো, গবেষণায় মন দাও এ সব বলে কখনো জনপ্রিয় হওয়া যায় নাকি ? কিন্তু যদি বল চৈতন্যদেবের মত দুহাত তুলে নৃত্য করতে তাহলে বঙ্গসন্তান সর্বদাই রাজি । ভাবলেন একবার বলবেন - মহাশয় এইসব আগডুম বাগডূম কথা বলে লোকগুলোকে আরো অপদার্থ না করে তুলে যদি কিছু কাজের কাজ করতে বলতেন তাহলে অন্তত এদের ছেলেমেয়েগুলো খেয়ে পরে বাঁচত ।

    বিহঙ্গ বলছিলেন - গীতা পড়ে কী হবে ? কী আছে ওতে ? `গীতা' কথাটা দশবার বল্লে কী হয় ? না 'ত্যাগী' `ত্যাগী' । সেটাই গীতার শিক্ষা । আসক্তি ত্যাগ করে ঈশ্বরকে লাভ করার চেষ্টা কর ।

    যখনই সাগর ভাবেন প্রতিবাদে কিছু বলা উচিৎ তখনই এরকম একটা দারুণ কিছু বলছেন বিহঙ্গ যে সাগরের মুখ বন্ধ হয়ে যায় । হঠাৎ তাঁর ভীষণ ভয় হতে থাকে । একেই কী বলে সম্মোহন ? আচ্ছা এমন তো নয় যে এক অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিকাল ব্যক্তিত্ব তার সম্মোহনের জাল আস্তে আস্তে গুটিয়ে আনছে চারদিকে ? এই যে মহেন্দ্রনাথ গম্ভীরমুখে ঘন ঘন মাথা নাড়াচ্ছে - এ ছোকরার তো ইংরেজি বিদ্যে কম নয় । বিহঙ্গের এইসব ভাবাবেশ দেখতে দেখতেই কখন নিজের অলক্ষ্যে তিনিও কি এদের মত ভক্ত হয়ে যাবেন ? সাগরের দম বন্ধ হয়ে আসছে ।

    সাগর মনে মনে গরুড়পুরাণের যাজ্ঞবল্ক্য সূক্ত আওড়াতে থাকেন । জীবনে বহু যুদ্ধে নেমেছেন তিনি । জয়ের চেয়ে পরাজয়ের সংখ্যাই বেশি । পরাজয়ের পঙ্ক থেকে আবার উঠে আসার সময় তিনি শাস্ত্রের সেই শ্লোকগুলি ভাবেন যাতে তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি হয় এবং বাহুতে বল আসে ।

    রক্ষেৎ কন্যা পিতা বাল্যে যৌবনে পতিরেব তাম্‌ ।
    বার্ধক্যে রক্ষতে পুত্রো হি অন্যথা জ্ঞাতয়স্তথা ॥

    নিজের সম্মুখে একটি অর্বাচীন প্রতিদ্বন্দ্বীকে কল্পনা করে কুলীনপ্রথা ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে একটি নতুন যুক্তি নিয়ে ভাবতে থাকেন সাগর ।



    ***


    সন্ধ্যে উত্রে দিয়ে তবে বিদায় নিলেন বিহঙ্গ । আলো হাতে পথ অবধি এগিয়ে দিতে এসেছিলেন সাগর । ঘোড়ার গাড়িটা দাঁড়িয়েছিল । সাগর ফিসফিস করে মহেন্দ্রকে জিজ্ঞেস করলেন ভাড়াটা মিটিয়ে দেবেন কিনা । মহেন্দ্র বললেন আগেই দেওযা আছে ।

    বিহঙ্গ বললেন - আমাদের ওদিকে এসো কিন্তু । ভুলবে না তো ?

    - পাগল ? সে আর ভুলি ?

    মনে মনে সাগর বললেন - নৈব নৈব চ ।

    ঘোড়াগাড়িকে রওনা করে দিয়ে সাগর যখন ফিরলেন ঘরে তখন চাকরির জন্য আসা ছেলেটা ক্লান্ত হয়ে হাই তুলছে । সাগর তার জন্য ভাত আনতে বলে তাকে ঠেলেই তুললেন একরকম । তারপর ধরে ধরে চটপট ইংরেজিতে দরখাস্ত লেখালেন একটা । লেখা শেষ করে ছেলেটা টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল ।

    মহামহোপাধ্যায় আর তর্কচঞ্চু আগেই বিদায় নিয়েছিলেন । বাতির আলোয় দ্রুত টেবিলের উপর রাখা চিঠিগুলো পড়তে শুরু করলেন সাগর । প্রথমটা শুরু হয়েছে এভাবে -

    মহাশয়, আমি যখন বিধবা হই তখন আমার বয়:ক্রম তেইশ । তখন আমার কন্যা সন্তানের বয়:ক্রম ছিল দুই । ইচ্ছা ছিল তাহার বিবাহ সম্পন্ন করিয়া কাশী চলিয়া যাইব । আজ কন্যার বয়:ক্রম আট পুরাইয়াছে । সে স্বামীগৃহে যাইবার পূর্বেই বিধবা হৈয়াছে । আপনি মহানুভব, কি করিয়া তাহার প্রতিপালন কর্ব্ব বলিয়া দিন ।
    ডাল আর আটার রুটির খাওয়া সারতে সারতে সাগর বাকি চিঠিগুলোর উপর চোখ বোলাতে লাগলেন ।



    ***


    ঘোড়ার গাড়িতে বসে মহেন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করলেন - সাগরকে কেমন লাগল আপনার ?

    বিহঙ্গ মুখের সামনে একটা তুড়ি মেরে বললেন - শালা সত্বগুণ থাকলেই কি ঈশ্বর মেলে ? লোকটা জ্ঞানী, দানী হতে পারে কিন্তু ব্রহ্মের খপর নাই । শোন একটা গল্প বলি । এক বনের মধ্যে দিয়ে এক গেরস্থ যেতে যেতে পথ হারিয়েছিল । তাকে ধরল তিন চোর । এক চোর বলল - আয় এটার গলা কাটি । অন্য এক চোর বলল - তার চেয়ে টাকাকড়িগুলো কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দে । তারপর তারা টাকাগুলো নিয়ে পালাল । একটু পরে তৃতীয় চোরটা ফিরে এল, কিছু টাকাও সে ফেরৎ আনলে । সে লোকটাকে বলল - চলো তোমাকে বাড়ির পথ দেখিয়ে দিই । সে যত্ন করে গেরস্থকে তার বাড়ি অবধি পৌঁছে দিল । লোকটা বড় খুশি, সে চোরের হাত ধরে বলল - তুমি এতদূর এলে তো বাড়ি অবধি চলো ভাই । তখন সে চোর হাত ছাড়িয়ে পালাচ্ছে । বলছে - পাগল, ও বাড়িতে গেলে পুলিশ ধরবে ।

    বিহঙ্গ বললেন - এই তিন চোর হল সত্ব, রজ: আর তমোগুণ । তমোগুণ তো মানুষের বিনাশ চায় । রজ: অর্থলাভ করায় । আর সত্বগুণ হাত ধরে তাকে ব্রহ্মজ্ঞানের দরজা অবধি নিয়ে যায়, কিন্তু নিজে সেখানে যেতে পারে না । কারণ সেখানে তো পুলিশ । ব্রহ্মজ্ঞান হল ত্রিগুণাতীত । একে পেতে গেলে সত্বকেও ছাড়াতে হবে । কলিতে একে পেতে গেলে চাই বিশ্বাস, চাই ভক্তি । তোমাদের সাগরের সে চোখ হয়নি এখনও হে ।

    ভবনাথ, মহেন্দ্রনাথ ও প্রতাপচন্দ্র তিনজনেই মাথা নেড়ে স্বীকার করলেন কথাটা ঠিক ।



    ***


    গভীর রাতে গঙ্গার ধারে একটি বৃহৎ কালীমন্দিরের চাতালে এসে পড়েছে পূর্ণিমার জ্যোত্স্না । তার মধ্যে থপ থপ করে খালি পায়ে হাঁটছে একটা লোক । ষোলধাপ সিঁড়ি ভেঙে সে এসে থামল কালীমূর্তির সামনে । তার মুখে রহস্যময় হাসি, চোখে জল । একটি হাত পদ্মের ভঙ্গিমায় ধরা বুকের সামনে, অন্য হাতটি কালীমূর্তির দিকে বাড়ানো । লোকটির ভাবাবেশ হচ্ছিল । আস্তে আস্তে তার শরীর কাঁপতে লাগল । দুবার ঠোঁট দিয়ে উচ্চারিত হল `মা' শব্দ । ওমনি কালীর মৃন্ময় মূর্তিটিও কাঁপতে আরম্ভ করল মোমের শিখার মত । আলো ও ছায়ার মধ্যে সেই মাটির মূর্তি থেকে জন্ম নিল একটি সাত আট বছরের বালিকার শরীর । লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরা মেয়েটা লাফিয়ে মন্দিরের মেঝেতে নেমে বিহঙ্গকে ধরে বসিয়ে দিল পুরুতের আসনে । তারপর তার সামনেই মাটিতে বসে পড়ে রিনরিনে গলায় বলল - পূজো করবি নে আমায় ?

    বিহঙ্গের দুচোখ দিয়ে গড়াচ্ছিল অনবরত অশ্রু । মুখমণ্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত । তিনি অং বং চং বলে উল্টোপাল্টা মন্ত্রে পূজো করতে লাগলেন বালিকাটিকে । মাঝে মাঝে গাঁদা ফুলে ছুঁড়ে দিতে লাগলেন তার দিকে । আস্তে আস্তে তাঁর বাহ্যজ্ঞান লোপ পেতে লাগল । পূজারীর আসনে বসে পাথরের মূর্তির মত জড় ও জমাট হয়ে গেল তাঁর শরীর । দেহের স্বেদবিন্দুগুলো বরফের কুঁচি হয়ে খসে পড়তে লাগল ধুতির উপর । চাঁদের কিরণ তুষারের ফলার মত বিদ্ধ করছিল মন্দিরের চত্বরে সমস্ত কীট পতঙ্গদেরও । তারাও দেখতে দেখতে শীতল ও জড় হয়ে ভেঙ্গে যেতে লাগল ।

    লালপেড়ে শাড়ি পরা মেয়েটা মন্দিরের মেঝে থেকে উঠে পড়ে ফিস ফিস করে বলল - চুপ করে বোস । আমি আসছি এক্ষুনি ।

    এই বলে মেয়েটা এক ছুটে বেরিয়ে এল রাস্তায় । হাওয়ার উপর ভর দিয়ে সে উড়তে শুরু করল । একটু পরে তাকে দেখা গেল বাদুড়বাগানের গলি দিয়ে একটা পাঁচিলঘেরা বাগানবাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে ।

    সাগর নিজের পড়ার ঘরের একদিকে খাটের উপর চিৎ হয়ে ঘুমোচ্ছিলেন । মেয়েটা সেই ঘরে ঢুকে পড়ে একমুহূর্তের জন্য থামল । হঠাৎ তার শরীরটা সূক্ষ্ম হতে হতে বায়ুর মত পাত্লা আর ধুলোর মত ক্ষুদ্র হয়ে গেল । সে এক লাফে টুক করে নেমে পড়ল সাগরের মস্তিষ্কের মধ্যে । একেবারে তার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে সে থামল ।

    সাগর ঘুমের মধ্যে অনুভব করলেন তাঁর কাছে একটা সাত আট বছরের মেয়ে এসেছে । তার পরনে বৈধব্যের সাদা থান ।

    সে রিন রিন করে বলল - কি সাগর, আমাদের কী হবে বলে দিলি না তুই ?

    ঘুমের মধ্যে সাগরের ঠোঁট বিড়বিড় করে নড়তে লাগল । তিনি বলতে চাইলেন - তিন জায়গায় দরখাস্ত করে দিয়েছি । কাল নিজে গিয়ে তদ্বিরও করে আসব । কোথাও না কোথাও একটা মাসোহারার ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে । কিছু টাকা মনি-অর্ডার করেও পাঠাচ্ছি পত্রপাঠ । আমি থাকতে ভয় কী ?

    - ঠিক তো ? কথার খেলাপ হবে না তো ?

    সাগরের চিন্তা হল । বাষট্টি বছর বয়স । যদি মরে যাই কাল ? তাহলে এদের মাসোহারার কী হবে ? না:, ছোট মেয়েটাকে এ কথা বলা যায় না । মরলে চলবে না । নিজেকে শক্ত সমর্থ ও যুবা থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলেন সাগর । ঘুমের মধ্যে তাঁর ডান হাতের তর্জনী সোজা হয়ে গেল ।

    - ঠিক ।

    - না তুই কথা দে । সত্যি করে বল যতদিন বেঁচে আছিস ততদিন তোর কাছে এসে বাংলাদেশের কোন মেয়ে অভুক্ত থাকবে না । কোন অত্যাচার হতে দিবি না তুই তাদের উপর । বল । কথা দে । দিবি না ?

    এত শক্ত কথা কী দেওয়া যায় ? এই বয়সে ? সাগরের দুই হাতের পাঞ্জা তাঁর নিজের অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল । কিন্তু মেয়েটা বোধহয় কথা আদায় করেই ছাড়বে ।

    - দিলাম ।



    ***


    কলকাতার রাস্তার উপর দিয়েই নাচতে নাচতে ফিরে এল মেয়েটা বিহঙ্গের কাছে । বিহঙ্গের বরফ হয়ে জমে যাওয়া শীতল দেহে আগুনের হলকার মত ফিরে এল প্রাণ । তুষার হয়ে যাওয়া স্বেদবিন্দুগুলো আবার গলে হল জল ।

    পরম সন্তোষে তাঁর অং বং চং ইত্যাদি উল্টোপাল্টা সরল মন্ত্রের শিশুসুলভ পূজো উপভোগ করতে থাকল বাচ্চা মেয়েটা ।



    (পরবাস-৪১, মে, ২০০৮)



    অলংকরণ (Artwork) : রাজর্ষি দেবনাথ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)