• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৭৯ | জুলাই ২০২০ | উপন্যাস
    Share
  • মহাসিন্ধুর ওপার হতে : অমিতাভ প্রামাণিক
    পর্ব ১১


    || এগারো ||

    ১৩৭৭ সাল। ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড সদ্য পরলোকগত হয়েছেন। তাঁর মৃতদেহের ওপর ঝুঁকে পড়েছে অ্যালিস পেরার্স, পঁয়ষট্টি বছর বয়সী রাজার যুবতী নর্মসহচরী। দূর থেকে তার দিকে লক্ষ করলে দেখা যেত, শক্ত-হয়ে-আসা রাজার মৃত শরীরের আঙুল থেকে সে এক এক করে খুলে নিচ্ছে বহুমূল্য আংটি। রাজার যে খুব চরিত্রদোষ ছিল তা নয়, রানি ফিলিপার খুবই অনুগত ছিলেন তিনি। কিন্তু যখন বোঝা গেল ফিলিপার শেষ সময় উপস্থিত, রাজার প্রয়োজন হল একজন শয্যাসঙ্গিনীর। তিনি বয়সের তুলনায় যত বেশি জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, যুবতী অ্যালিস ছিল ততটাই চতুরা। রাজার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে রাজকোষ ফাঁকা করে একের পর এক জমি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে অ্যালিস তখন দেশের সবচেয়ে বড় জমিদারদের একজন। কুমিরের ছানা দেখানোর মত করে একই দামী গহনা বারবার রাজাকে দেখিয়ে সেটা কেনার বাহানায় টাকাপয়সা বাগিয়ে নিয়ে বিশাল সম্পত্তির অধিকারী। এত অনাচার তো অলক্ষ্য থাকে না, রাজার মৃত্যুর পর পরবর্তী রাজন্যবর্গ শুরু করল অ্যালিসের বিচার। প্রায় বাইশ হাজার বড় বড় মুক্তো-সমন্বিত তার রত্নভাণ্ডার, যার অধিকাংশই দয়িত এডওয়ার্ডের কাছ থেকে উপহারের নামে বাগিয়ে নেওয়া, বাজেয়াপ্ত করা হল। অ্যালিসের শেষ জীবন কেটে গেল বিচারসভাতেই।

    দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধের ইওরোপে এসব নতুন কিছু নয়। দেশে দেশে রাজাদের নামজাদা সব রক্ষিতা। রাজপুত্রের বিয়ে যদিও অবশ্যম্ভাবী ছিল অন্য এক রাজার বা কোনো সম্ভ্রান্ত নোবলম্যানের মেয়ের সঙ্গে। কিন্তু সেই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে যথাসম্ভব সম্প্রীতির – আসলে যুদ্ধবিরতির – পরিবেশ সৃষ্টি ও দেশের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী প্রাপ্ত হওয়া। উত্তরাধিকারী অবশ্যই পুত্রসন্তান। ক্বচিৎ-কদাচিৎ কন্যারাও যে রাজার মুখরক্ষা করেনি তা নয়, তবে তাদের সংখ্যা নগণ্য। বিয়ের পর যৌবনবতী রানি যদি সন্তানসম্ভবা-ই থাকেন সর্বদা, রাজার তো বিছানা গরম করার সঙ্গিনী চাই। সুতরাং রক্ষিতার প্রয়োজন প্রায় অবশ্যম্ভাবী। রোম যখন ক্ষমতার শীর্ষে ছিল, তখন হয়ত চট করে চার্চ এসব অনুমোদন করত না। কিন্তু রোমের পতনের পর রাজাদের এই ব্যভিচার চার্চগুলো নীরবে মেনে নিয়েছে, এ নিয়ে আলোচনাও তেমন ধর্তব্য জ্ঞান করেনি।

    এই রক্ষিতাদের যে কী নাম, কী পদবি, তাও অনেক সময় জানা যেত না। রাজার কত নম্বর দিয়েই ছিল তাদের সাধারণ পরিচয়, যদিও তারা ছিল একদিক দিয়ে ভীষণ ক্ষমতাশালী। রাজার হাল খারাপ হয়ে গেলে বা রাজা মারা গেলে ধূমকেতুর মত এক এক করে উদয় হত রাজকীয় জারজ সন্তানেরা, নিজেদের পরিচয় দিত রাজার ছেলে বলে। তখন কারও খেয়াল পড়ত, হ্যাঁ, এরও তো একটা মা ছিল! সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য তো আর নথিভুক্ত করা থাকত না। লেখাপড়াই বা জানত ক’জন! রক্ষিতা তো দূরের কথা, কটা রাজা নিজের নাম সই করতে পারত, তারই ঠিক নেই।

    শুধু ইংল্যান্ডেই তো নয়, এ কাহিনি ইওরোপের সর্বত্রই। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের আজীবন শত্রুতা থাকলে কী হয়, এ ব্যাপারে সাদৃশ্য লক্ষণীয়। ফ্রান্সে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ষষ্ঠ শতকের শেষপাদে, ক্লোভিস নামে একজন সমস্ত ফরাসী উপজাতিদের একত্র করে তাদের রাজা হয়ে বসেছিলেন। সেই রাজতন্ত্র চালু ছিল বহু শতক ধরে, অষ্টাদশ শতকে ফরাসী বিপ্লবে রাজা ষোড়শ লুইয়ের গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত। তবে এই বিশাল সময়ের মধ্যে সমস্ত রাজাই তো আর ক্লোভিসের মত ক্ষমতাধর ছিলেন না। ফরাসী উপজাতিদের সংখ্যা কম ছিল না, তাদের উপভাষা আচার-আচরণে কিছুটা পার্থক্য ছিলই। তারা চাইত নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করতে। রাজার অধীনে এক একটা অঞ্চলের শাসন করত এক একজন লর্ড বা কাউন্ট বা ডিউক বা প্রিন্স। রাজা তাদের জমি দিত, তারা তার বদলে রাজার হয়ে যুদ্ধবিগ্রহ করত। তাদের ঐ জমি যারা চাষ করত, তারা কর দিত আর প্রয়োজনে দুর্গ বানাত, যুদ্ধও করত। এই ছোট শাসকরা যদিও রাজার অধীন, কিন্তু নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে রাজার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেও তাদের হাত কাঁপত না। রাজা এদের খুশি রাখার সব রকম উপায় বের করতেন, কখনও বিবাহাদির মাধ্যমেও সম্পর্ক স্থাপিত হত। কখনও কোনো কাউন্ট বা ডিউকের ঘরের মেয়েটিকে পছন্দ হয়ে গেলে তার ঠাঁই হত রানির শয্যা-প্রতিদ্বন্দ্বিনী হিসাবেও।

    একাদশ শতকের শেষ দিকে উইলিয়াম নামে এক ফরাসী, সে যখন নরম্যান্ডির ডিউক, আক্রমণ করে বসল ইংল্যান্ড এবং তার রাজা হ্যারল্ডকে যুদ্ধে পরাস্ত করে হয়ে বসল ইংল্যান্ডের রাজা। তার নাম হল উইলিয়াম দ্য কংকারার, যে একাধারে ফ্রেঞ্চ নরম্যান্ডির ডিউক এবং সেই কারণে ফরাসী দেশের রাজার অধীন, অন্যদিকে স্বাধীন ইংল্যান্ড দেশের রাজা। গোটা ইংল্যান্ড এবং কিছুটা ফ্রান্স তার অধীনে। তার প্রতিপত্তি কম ছিল না, পরিবারের ছেলেমেয়ের বিয়েশাদির মাধ্যমে সে নিজের রাজত্ব আরও বাড়িয়ে নিয়েছিল। তার মৃত্যুর এমনকি একশো বছর পরে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরি ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের আধখানারও শাসক ছিল। পরের দিকে অবশ্য এ ব্যাপারটা কমে যায়। তবে এতদিন ধরে এই ধরনের মেশামিশির ফলে গোটা পশ্চিম ইওরোপের রাজসংস্কৃতির মধ্যে প্রচুর মিল ছিল। রাজারা তাদের ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে বিয়ে দিত নিজেদের স্বার্থে। তাতে ভালবাসার ব্যাপারটা পারতপক্ষে থাকত না। কাজেই রক্ষিতা এমনকি পতিতাগমন জিনিসটা হয়ে পড়েছিল রাজসংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ।

    অ্যালিস পেরার্সের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ফরাসিনী অ্যাগনেস সোরেল। সে ছিল কুদঁ নামে এক ছোট্ট প্রদেশের শাসক লর্ড জঁ সোরের কন্যা এবং ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের প্রণয়িনী। তার জীবন শুরু হয়েছিল অতি সাধারণভাবে। সিসিলির রানি ইসাবেলার ঘরে সে ছিল এক অতি কম মাইনের দাসী, সাত মাসে তাকে বেতন দেওয়া হয়েছিল মাত্র দশ লুভ্‌র্‌। ১৪৪৩ সালের গ্রীষ্মে ইসাবেলা তুলুজ ও পরে সোমিউ পাহাড়ে ছুটি কাটাতে গেলে অ্যাগনেসকে সঙ্গে নেন। ঘটনাচক্রে সপ্তম চার্লসও সে সময় সেখানেই ছুটি কাটাতে গেছিলেন। চার্লস-অ্যাগনেসের সেখানেই প্রথম সাক্ষাৎ হয় ও পরের বছর গ্রীষ্মেই অ্যাগনেসের গর্ভে চার্লসের অবৈধ কন্যা মেরির জন্ম হয়। সে বছরই শেষদিকে তাকে দেখা গেল ফ্রান্সের রাজপ্রাসাদে সপ্তম চার্লসের রানি মেরির প্রধানা সহকর্মিণী হিসাবে। অতি শীঘ্রই তাকে রাজদরবার আলো করে তুলতে, এমনকি সেনাবাহিনীর কাজকর্মে মাথা গলাতেও দেখা যায়।

    অনেকের মতেই সামান্যা নারী হলেও বেশভূষা ও আদবকায়দায় চোস্ত সোরেলের সামনে রাজাকেই মনে হত অনুপযুক্ত। অ্যাগনেসই রাজাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল নর্ম্যান্ডি আক্রমণ করে ইংল্যান্ডের সেনাদের সেখান থেকে ভাগিয়ে নর্ম্যান্ডি পুনরুদ্ধার করতে। সত্যি বলতে কী, চার্লসের রাজভূষা নিষ্প্রভ ছিল রক্ষিতা অ্যাগনেসের সামনে।

    অ্যাগনেস অবশ্য বেশিদিন বাঁচেনি। মাত্র আঠাশ বছর বয়সে ১৪৫০ সালে তার মৃত্যু হয়। মাত্রই ছ-বছর ধরে সে ছিল ফ্রান্সের রাজসভায়, কিন্তু তার মধ্যেই সে হয়ে উঠেছিল সেখানকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত চরিত্র। বহু সভাসদই তাকে কামনা করতেন। শোকাকুল চার্লস তাকে মরণোত্তর ডাচেস-এর সম্মান দিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।

    এইটুকু সময়ের মধ্যে অবশ্য অ্যাগনেস বেশ গুছিয়ে নিয়েছিল। তার ছিল চার ভাই – চার্লস, লুই, জঁ আর আঁদ্রে। অ্যাগনেস তাদের প্রত্যেককে রাজকার্য ও উপযুক্ত দক্ষিণা পাইয়ে দিয়েছিল। ১৪৪৬ সালে চার্লস রাজপ্রাসাদে চাকরি পায়, প্রতি মাসে আশি লুভ্‌র্‌ তার মাইনে। লুই নিযুক্ত হয়েছিল রাজার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদলের সদস্যরূপে। তৃতীয় ভাই জঁ-এর চাকরি হয় আরও উচ্চপদে, বছরে তিন হাজার লুভ্‌র্‌ কামাত সে। এক কাকা জেফ্রিকে রাজা নিয়োগ করেন নাইমস চার্চের বিশপ হিসাবে। ছোটভাই আঁদ্রেকে সে সবচেয়ে বেশি ভালবাসত, উইল করে তার সম্পত্তির অনেক অংশ তাকে দিয়ে গেছিল। তখন তার বয়স মাত্র ষোল বছর, তাই জেফ্রির অধীনে চার্চের কাজকর্ম করত তখন। পরে সাবালক হলে প্যারিসে এক চার্চের যাজক হয় সে, রাজবাড়ির প্রদত্ত অর্থে প্যারিসে বিশাল বাড়ি কিনেছিল। তাছাড়া রাজকার্যে সোরেলের অন্তর্ভুক্তির পর থেকেই তার সঙ্গে ব্যাপক দহরম মহরম গড়ে ওঠে রাজার সেক্রেটারি ও ডান-হাত এতিঁয়ে শেভালিয়রের।

    এটা পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। তখন চিত্রকররা শুধুমাত্র উপাস্য দেবদেবীদের ছবিই আঁকত, সাধারণ মানুষের ছবি আঁকার চলন তখনও আসেনি। তবে সমাজে উচ্চপ্রতিষ্ঠিত ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চার্চের শিল্পীদের মোটা উৎকোচের প্রলোভন দেখিয়ে সেই সব সাধুসন্তদের ছবিতে নিজের মুখ আঁকিয়ে নিত। অ্যাগনেসের ছবিরও স্থান হল সে রকম চার্চের প্যানেলে। জঁ ফুকে নামে এক শিল্পীকে দিয়ে অ্যাগনেসের ছবি আঁকালেন চার্লসের রাজসভাসদ এতিয়েঁ শেভালিয়র, যাতে কুমারী মাতা মেরীর শরীরে অ্যাগনেসের মুখ বসিয়ে দেওয়া হল। সে ছবিতে তার সুবিপুল বক্ষসৌন্দর্য প্রবলভাবে প্রকাশিত। তিনি বালক যিশুকে স্তন্যপান করাচ্ছেন, কিন্তু যিশু বেচারির দুধ খাওয়ায় মোটে ইচ্ছে নেই, সে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। তার পাশেই আর এক প্যানেলে ছবিতে ভার্জিন মেরীকে প্রণতি জানাচ্ছেন সেইন্ট স্টিফেন্সের সঙ্গে এতিয়েঁ শেভালিয়র, তার প্রণতির লক্ষ্য অবশ্যই ভার্জিন মেরীরূপী পীনপয়োধরা অ্যাগনেসের উন্মুক্ত বক্ষসম্পদ।

    সত্যি বলতে কী, রাজাদের এই মিস্ট্রেসরা শুধু যে ‘তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী’র ইওরোপীয় সংস্করণ ছিলেন তাই নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। মুনি-ঋষিদের তপস্যা ভঙ্গ করার জন্যে ইন্দ্র ঊর্বশী-মেনকা-রম্ভা আদি তাঁর অপ্সরাদের যে কাজে নিয়োজিত করতেন, ইওরোপের রাজন্যবর্গ ঠিক সেই কাজের জন্যেই বেছে নিতেন এদের।

    বিয়ে অবশ্য করতেন যে রাজকন্যাদের, তাদের সবাইকে ছোটবেলা থেকে মানুষ করা হত প্রবলভাবে ব্রহ্মচর্যের পাঠ পড়িয়ে। সে পাঠক্রমে যৌনতার গন্ধমাত্র নেই। কেননা যার ভবিষ্যৎ ঘরণী হবে সে, তার চাই বিশুদ্ধ রক্তের ন্যায্য উত্তরাধিকারী। ফলে স্বামীর শয্যার উপযুক্ত সজ্জা তার হয়ে ওঠা সহজ ছিল না মোটেই। আর পাঠ না-হয় শেখানো যায়, কিন্তু সৌন্দর্য? এদিকে রাজপুত্র তো আর কুরূপাকে বিয়ে করবে না! ফলে অনেক সময় জাল-জোচ্চুরি করে নামী চিত্রকরদের দিয়ে সুন্দর ছবি আঁকিয়ে ছবি পাঠানো হত দূতদের হাত দিয়ে। রাজপ্রতিনিধিরা ব্যবসায়ীদের পণ্যের মতই রাজকন্যাটির রূপ নিয়ে রং চড়িয়ে প্রচুর গালগল্প করে তাকে আকর্ষণীয়া মনোলোভা পাত্রী বানিয়ে তুলত উপযুক্ত পাত্রের রাজসভায়। বিয়ে ঠিক হয়ে গেলেই তো তার জুটবে উপঢৌকন। অনেক সময়েই ছবির কন্যা আর আসল পাত্রীর মধ্যে থাকত আকাশ-পাতাল ব্যবধান।

    বিয়ের পর প্রতারিত রাজপুত্র এইসব নবোঢ়া পত্নীদের দুচ্ছাই করে খুঁজত তার পছন্দের নর্মসহচরীদের।

    রাজার এই রক্ষিতারা যে সবাই অবিবাহিতা কুমারী, তা মোটেই নয়। অনেকেই রীতিমত বিবাহিতা। রাজার চোখে পড়ে গেলে অবশ্য স্বামীদেবতাটিকে ছেড়ে রাজার বিছানা গরম করতে তার বিন্দুমাত্র সমস্যা হত না। কোথায় রাজা ভোজ আর কোথায় তার বর গাঙ্গু তেলি! পছন্দের মেয়েটি কুমারী হলে অনেক সময় রাজা নিজে তার বিয়ে দিয়ে দিতেন কারও সঙ্গে, তাতে মেয়েটির সায় থাকুক বা না থাকুক। রাজার জারজ সন্তানের সংখ্যা তো গুণে নিঃশেষ করা যেত না। তবুও রাজপ্রাসাদে অবিবাহিতা মেয়ে গর্ভবতী হওয়ার চেয়ে বিবাহিতা রমণী অন্তঃসত্ত্বা হলে পর্দার আড়ালে ফিসফাস একটু কম হয়। সেটুকুই বা কম কী!

    এর ফলে রাজা, রানি, রক্ষিতা ও তার স্বামী – এই চতুর্ভুজে জটিলতা যে একেবারেই সৃষ্টি হত না, তাও নয়। সাধারণভাবে স্বামীটির স্থান হত রাজসভায়, তবে সে সব কিছু দেখেও দেখত না। পুরস্কার হিসাবে তার কিছু খেতাব ও অর্থ নিশ্চিতভাবেই জুটত। সারাদিন রাজসভায় খিদমৎগিরি করে রাতে রাজার শয্যায় সে পাঠিয়ে দিত নিজের বৌকে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানি, রাশিয়া – সর্বত্রই এই সংস্কৃতির ধারা বয়ে চলত।

    তবে ঝামেলাও করত কেউ কেউ। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ম্যাগনা কার্টাখ্যাত ইংল্যান্ডের রাজা জন যেমন তার সভাসদদের মধ্যে ইউস্তাস দ্য ভেসিকে মোটেই সহ্য পারত না। নিজের বৌয়ের বদলে হতচ্ছাড়া ইউস্তাস রাজার অন্ধকার শয্যাগৃহে ঢুকিয়ে দিত সাধারণ নারীদের। ইউস্তাসের সুন্দরী যুবতী পত্নীটিকে জনের বিশেষভাবে পছন্দ ছিল। অন্ধকার শয্যায় তার কথা ভেবেই উত্তেজিত জন তার শারীরিক প্রয়োজন মিটিয়ে ভোরের সূর্যের প্রথম রশ্মিপাতে যখন দেখত তার বিছানায় উদ্দিষ্ট রমণীটি নয়, বরং তাদের ঘরমোছার চাকরানি, তার কি রাগ হওয়া স্বাভাবিক নয়?

    এই মিস্ট্রেসদের যত রমরমা, সবই কিন্তু রাজার জীবিতকালেই। কিন্তু জীবন তো অনন্তকালের জন্য নয়। একদিন না একদিন মৃত্যু এসে কেড়ে নেয় সমস্ত আহ্লাদ। আজকেই যে দেখাচ্ছে তার পেশির আস্ফালন, কালকেই হয়ত মুখ ভেটকে পড়ে থাকবে রাস্তায়, গায়ে ভনভন করবে মাছি, জনগণ তাকিয়েও দেখবে না। শেষ যাত্রা সকলেরই একার, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ, নিরাবরণ, নিরাভরণ। বিছানা, রমণী, শয্যাসুখ – সব তখন স্মৃতি। সমস্তই অতীত।

    রাজার মৃত্যুতে সবচেয়ে বিপদে পড়ত তার সর্বশেষ রক্ষিতাটি। হঠাৎ মৃত্যু না হলে তাকে মৃত্যুপথযাত্রী রাজার ধারেকাছে যেতে দেওয়া হত না, যদি না রাজা ভুগত গুটি বসন্তের মত কোনো ভীষণ ছোঁয়াচে রোগে। তখন তাকেই রাজার দেখভাল করতে হত। অন্যথায় রাজা মৃত্যুশয্যায় বুঝতে পারলেই তার পেয়ারের শয্যাসঙ্গিনীকে আর রাজার কক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হত না। কখনও কখনও জোর করে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হত। মৃত্যুপথগামী রাজার সামনে থাকবে চার্চের পুরোধারা, তারা রাজাকে পার করিয়ে দেবে স্বর্গের পথে প্রবেশের দরজা, সেখানে মূর্তিমতী অসচ্চরিত্রা নারীর কোনো স্থান থাকে? শেষ চোখ বোজার আগে রাজার যদি চোখ খোলার ক্ষমতা বিন্দুমাত্রও থাকে, সেই দৃষ্টি কি তার পাপকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যে?

    এক লহমায় চূর্ণ হয়ে যেত সেই নারীর এতাবৎকালের সব সম্ভ্রম, সমস্ত স্পর্ধা। রাজার শেষযাত্রার সঙ্গিনী বা শেষকৃত্যে উপস্থিতিও অনুমোদন করার প্রশ্নই ছিল না। রাজার শক্তিই তার শক্তি। রাজার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে হয়ে যেত সকলের চক্ষুশূল এক পাপীয়সী। রাজপরিবারের সকলেই তাকে বর্জন করত। ১৩৫০ সালে সিল্ক রুট বেয়ে আসা ব্ল্যাক ডেথে কাস্তিল, লিওন ও গ্যালিসিয়ারাজ একাদশ আলফনসো মারা গেলে তার শেষ সঙ্গিনী লিওনর দ্য গুজম্যানকে জেলে পুরে দিলেন অবহেলিতা রানি মারিয়া। জীবনে যে মর্যাদা তিনি পাননি তার জন্যে সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল লিওনরের ওপর। জেলে বন্দী করেও তার ক্ষোভ মিটল না। এক রাত্রে অনুচর পাঠিয়ে জেলের মধ্যেই তাকে খুন করিয়ে তিনি তার মৃত স্বামীর ওপর প্রতিশোধ নিলেন।

    প্রতিশোধ শুধু মৃত্যুর পরেই নয়, জীবিতকালেও নেওয়ার চেষ্টা করতেন অনেকেই। ভবিষ্যতে যে একজন রাজার শয্যাসঙ্গিনী হবে, সেই রাজকন্যারা তাদের বাবা বা দাদাদের দেখেই কি শিখে যেত না, তার জীবনেও একগুচ্ছ প্রতিদ্বন্দ্বিনী আসবে বিয়ের পর? তবুও মনের নিভৃত কোণে হয়ত একটুকরো আশা থাকত, তার পুরুষটি হয়ত অন্য রকম হবে, যে রকম লেখা আছে ধর্মপুস্তকে। সে হবে একমাত্র তার প্রতিই নিবেদিতপ্রাণ। এক জায়গায় এক রকম ভাবে বড় হয়ে ওঠার পরে হঠাৎ একদিন চার্চের পাদ্রীদের সামনে তার গুরুজনেরা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্যে তাকে সঁপে দিত অজানা এক রাজ্যে, এক যুবকের সঙ্গে। তার প্রতি তার হবু স্বামীর আচরণ সে এতকাল স্বপ্নে দেখে এসেছে। কিছুদিন সে অবশ্যই থাকত রাজপরিবারের প্রধান আকর্ষণ। কতজন দেখা করতে আসছে তার সঙ্গে, সঙ্গে নিয়ে আসছে বহুমূল্য উপহার, প্রশংসা করছে তার রূপের, তার সাজসজ্জার, তার সূক্ষ্ম রুচির। অচিরেই অবশ্য এই স্বপ্নমাখা দিনগুলো ফুরিয়ে আসত। একসময় নতুন বিয়ের অনুষ্ঠানাদি শেষ হয়ে যেত। তার মনের নিভৃত কুলুঙ্গিতে পুষে রাখা সেই কুহকিনী আশাও মিটে যেতে বেশি সময় লাগত না।

    রাজা-রানির পারস্পরিক ব্যাপারটা পুরোপুরির রাজার ইচ্ছানির্ভর। রানির কাজ শুধু রাজার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে বছর বছর সন্তান প্রসব করে যাওয়া, তাও যদি রাজা তাকে অনুগ্রহ করে, তবেই। রাজা-রানির শয্যাগৃহ রাজপ্রাসাদের মাঝখানে সবচেয়ে বড় ঘরটা হবে নাকি এককোণের এক খুপরি, তাও নির্বাচন করত রাজা নিজে। শয্যাসঙ্গিনীর মত রাজা-রানির দাসদাসীদেরও রাজা নিজে নির্বাচন করত। তারাও কোথায় থাকবে, কখন কী করবে, সবকিছুই রাজার ইচ্ছায়। রানির প্রতি রাজার ব্যবহার এই দাসদাসী ও রাজসভার অন্যদের অগোচরে থাকত না। রাজা রানিকে সম্মান দিলে তারাও রানিকে সম্মান দিত, রাজা দুচ্ছাই করলে তারাও দুচ্ছাই করত। রানিকে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হতে হলে রাজার কাছ থেকে শ্রদ্ধা বা সমর্থন আদায় করতেই হত। অনেক সময়েই সেই সমর্থনের এক উল্লেখযোগ্য শর্ত ছিল রানিসাহেবা রাজাসাহেবের নর্মসহচরীদের কতটা মেনে নেন। ইচ্ছে না থাকলেও রাজার ও রাজপরিবারের সদস্যদের সামান্য সম্মান পেতে রাজার যৌনসঙ্গিনীদের মেনে নেওয়া ছাড়া রানির আর উপায় ছিল না।

    চাকরানি দাসদাসীদের ভিড়েও তাই সে আস্তে আস্তে ক্রমেই খুব একা হয়ে উঠত। ভাবতে বসত, এ জীবনে হয়ত দেখা হবে না তার বাবা মা ভাইবোন বন্ধুবান্ধব কারও সঙ্গে। ভয়ে তার শরীর ঘেমে যেত, চোখের জলে ভিজে যেত রাজশয্যার বালিশ। দেখতে পেত তার মানুষটা রাতের পর রাত সময় কাটাতে শুরু করেছে অন্য এক নারীর সঙ্গে, তার সঙ্গেই মেটাচ্ছে তার মনের আর শরীরের খিদে। সেই তার শত্রু, তার প্রতিদ্বন্দ্বিনী, মনে মনে সে তার প্রতি হয়ে উঠত প্রতিহিংসাপরায়ণা।

    দ্বাদশ শতকের শেষদিকে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরির পত্নী চুয়ান্ন বছর বয়সী রানি ইলিয়ানর হেনরির সুন্দরী তরুণী উদ্ভিন্নযৌবনা সঙ্গিনী রোজমান্ড ক্লিফোর্ডকে খুন করলেন। বিষ খাইয়ে মারলেন, নাকি ছুরিকাঘাতে, না স্নানাগারে জলে ডুবিয়ে তা কেউ জানে না। তবে রোজমান্ড দিনে দিনে রাজসভায় রানির প্রতিদ্বন্দ্বিনী হয়ে উঠছিলেন, সুতরাং তাকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ ছিল। হেনরির সঙ্গে যখন রোজমান্ডের প্রণয় হয়, তখন রানি অন্তঃসত্ত্বা, তার পেটে তার শেষ সন্তান জন। রানির কাছ থেকে এই প্রণয় লুকাতে রাজা অক্সফোর্ডশায়ারের উডস্টকে এক গোলধাঁধার মত প্রাসাদ নির্মাণ করিয়ে তার সবচেয়ে গোপনতম কক্ষটি রোজমান্ড ও তার শয়নকক্ষ হিসাবে নির্বাচন করলেন। এ খবর রানির কানে পৌঁছে গেল একদিন। তিনি খুঁজে খুঁজে বের করে ফেললেন সেই অলিগলির ভেতরে রোজমান্ডকে। গল্প আছে, সে ছুরিকাঘাতে মরবে না বিষপান করে, তাকে পছন্দ করতে বলা হলে সে দ্বিতীয়টা বেছে নিল।

    তবে তাতেই রানির রাগ মিটল না। দোষ তো একা রোজমান্ডের না, তার প্রণয়ী ইলিয়ানরের স্বামী রাজা দ্বিতীয় হেনরিরও। কাজেই হেনরিকেও রাজার গদি থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। তবে তা করতে হলে রাজার শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হয়। সে সব তো আর রাজপ্রাসাদে বসে করা সম্ভব নয়, একমাত্র সেখান থেকে কোনোভাবে বেরিয়ে বাইরে কোথাও বুনতে হবে এই ষড়যন্ত্রের বীজ। কিন্তু তিনি রাজপ্রাসাদ থেকে বের হবেন কী করে? পুরুষের পোশাকে ঘোড়ায় চড়ে রাজপ্রাসাদ থেকে পালাতে গিয়ে তিনি ধরা পড়ে গেলেন। বন্দিনী হয়ে রইলেন হেনরির জেলে নয় নয় করে ষোলটি বছর।

    তবে এটাও সত্যি যে রক্ষিতাদের যত প্রভাব-প্রতিপত্তিই থাক, সবই রাজ-অনুগ্রহে যেহেতু, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। রানির ক্ষমতা না থাকলেও একটা বৈধ স্বীকৃতি আছে, রক্ষিতার সুসময় চলে যেতে পারে পান থেকে চুন খসলেই। রাজসভায় যতজনই তার সমর্থক থাক না কেন, সবই তার প্রতি রাজার সুনজরের জন্যে। রাজা তাকে স্বীকার না করলে এক মুহূর্তে তার জয়ধ্বজা মাটিতে লুটিয়ে পড়ত।

    সময় থাকতেই তাকে গুছিয়ে নিতে হত তাই। যারা বুদ্ধিমতী, তারা জানত, শুধু যৌবন আর রূপই নয়, রাজার মর্জি-মেজাজও কখন কালস্রোতে ভেসে যাবে, তা কেউ জানে না। এই অনুগ্রহটুকু চলে গেলে তাকে কেউ পুঁছবেও না, তার মূল্য এক নিমেষে স্বর্গের শিখর থেকে নেমে যাবে পাতালের চাতালে। কাজেই তাকে প্রথম থেকেই জোগাড় করে নিতে হবে অসময়ের পাথেয়, যাতে – ভগবান না করুন – দুঃসময়ে পড়লে না খেয়ে মরতে না হয়। এ জন্যে চাই টাকাকড়ি, সোনাদানা, রত্নরাজি, রত্নখচিত শকট, তেজি ঘোড়া, সোনা-রুপোর থালা-বাটি-চামচে। ডাচেস-কাউন্টেস-মার্কুইস টাইপের খেতাব-টেতাব পেলেও মন্দ হয় না। খেতাবের সুবিধা হচ্ছে সেগুলো ভাঙিয়ে দুর্গ আর জমি লাভ করা যায়, যা থেকে ভাড়া হিসাবে দু-পয়সা রোজগার হতে পারে। রাজার মিস্ট্রেস হলে বছরে বছরে উপঢৌকনও পাওয়া যায়। কিন্তু রাজা ইচ্ছে করলেই খেতাব কেড়ে নিতে পারে, রাজা মরে গেলে তার উত্তরাধিকারীরাও তাই। আর রক্ষিতার চাকরি গেলে উপঢৌকনের তো গল্পই নেই আর। কাজেই দুর্দিনের কথা মাথায় রেখে সমস্ত প্রাপ্তিযোগকেই টাকা বা তার সমতুল্য কিছুতে পরিণত করে নেওয়া দরকার সময়মত।

    রত্নরাজির প্রতি এই রক্ষিতাদের মোহ চিরকালীন। কারণটাও সহজবোধ্য। তারা এমনিতেই সুন্দরী, হাতে কানে গলায় কোমরে পায়ে আঙুলে রত্নরাজি পরিধান করে থাকলে সহজেই সে অভ্যাগতদের চোখের মণি। রত্নরাজি বিক্রি করে টাকা বানিয়ে ফেলা একেবারেই দুঃসাধ্য ব্যাপার নয়। তবে তার চাইতেও সুবিধা হচ্ছে রত্নরাজি যেহেতু বহুমূল্য, ছোট্ট পুঁটলিতেই অনেক মূল্যের রত্নরাজি নিয়ে পালানো সম্ভব। দরকার পড়লে তারা সেগুলো তাদের বস্ত্রে, বিশেষ করে অন্তর্বাসে সেলাই করেও লুকিয়ে নিতে পারে। তাই বিপদে পড়ে রাজপ্রাসাদ এমনকি রাজ্য পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেও কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ার ভয় নেই।

    এইভাবে বহু সম্পত্তির অধিকারিণী হওয়ার বহু নজির আছে ইওরোপের আনাচে কানাচের রাজ্যগুলিতে বহু বছর ধরে।

    অবশ্যই এর সঙ্গে ছিল রাজপ্রাসাদে ঘর পাওয়ার সম্মানও। অনেক ক্ষেত্রেই একাধিক। সভাসদদের অনেকেই ধনী ও বড় বড় প্রাসাদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের অনেকেরই রাজপ্রাসাদে ঠাঁই হত না। সে ক্ষেত্রে এক সামান্যা নারী যার একমাত্র সম্পত্তি তার রূপ ও যৌবন, যার হয়ত অন্যথায় রাজ্যের এক কুঁড়েঘরের স্বপ্নের বেশি দেখার কিছু ছিল না, একদিন হঠাৎ জায়গা পেয়ে যেত রাজপ্রাসাদের অতুল বৈভবে। যেখানে রানির জন্য বরাদ্দ হয়ত পাঁচখানা ঘর, সেখানে তার হয়ত বিশখানা।

    এবং ঐ রাজকীয় খেতাবও। ডাচেস, মার্কুইস, কাউন্টেসগুলো অন্য কোনো কারণে নয়, রাজার নিজের সুবিধার জন্যে। যে রাজার পাশাপাশি ঘুরবে রাজসভা আলো করে, অতিথি-অভ্যাগতদের আপ্যায়ন ও বিনোদন করবে, তার নামের আগে একটা কিছু না থাকলে কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগে না? দুর্ভাগ্যবশত অ্যাগনেস সোরেলের এই সম্মান জুটেছিল তার মৃত্যুর পর। ১৪৫০ সালে রাজা সপ্তম চার্লস তাকে ডাচেস বানালেন, যাতে তার কপালে একটা রাজকীয় সমাধি জোটে।

    সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে এই রীতির বিশেষ পরিবর্তন হয়েছিল, তা আদৌ নয়। বেশি অতীতের সংরক্ষিত রেকর্ড নেই, ইতিহাস লিখে রাখে শুধুমাত্র রাজার প্রভাব-প্রতিপত্তি, ঔদার্য-মহত্ত্ব, শৌর্য-বীর্য-বীরত্বের কথা। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে সময়ের কাঠগড়ায়। তবে সময় যত আধুনিক হয়েছে, তত তার পঙ্কিল গাথার কিছু কিছু অংশ টিঁকে গেছে। অতীতে রাজা, রানি বা রাজার সঙ্গিনীরা অধিকাংশই ছিল নিরক্ষর। তাদের নিয়ে ছবি যা আঁকা হত বা লেখা হত বীরত্বের গাথা, তাতে তো আর বিবাহ-বহির্ভূত গালগল্পের উল্লেখ থাকত না। গুটেনবার্গের ছাপাখানা জনপ্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে বই ছাপানো শুরু হলে রাজসভায় সাক্ষর ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। প্রণয়ের অঙ্গ হিসাবে উঠে এল পত্রালাপ। রাজপ্রাসাদের গোপন কুঠুরির রগরগে পত্রাবলি যদিও রাজার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও রাজপরিবারের সম্ভ্রম রক্ষার্থে, তার কিছু কিছু রাজপ্রাসাদের চৌহদ্দি এড়িয়ে বেরিয়েও গেছে। তাতে যেমন মাপা গেছে রাজা-রানির সম্পর্কের আসল উষ্ণতা, তেমনি সেগুলো কেচ্ছালেখকদের জুগিয়ে গেছে মুখরোচক গল্পের মশলা। রাজা ও তার প্রণয়িনীর উত্তেজক প্রণয়ালাপ ছাড়াও তাতে স্থান পেয়েছে সঙ্গিনীর আশঙ্কাও, কারা তাকে হিংসা করে, কার কাছ থেকে সে আশা করে প্রাণসংশয়, কে তার ওপর প্রতিশোধ নিতে উদগ্রীব।

    প্রতিশোধ যে শুধু রাজার অবহেলিতা স্ত্রীটি নিতেন, তাই নয়, অনেক সময় রাজপুত্রও – রাজার পর যে সিংহাসনে চড়ে বসবে পরবর্তী রাজা হিসাবে – মায়ের প্রতি অবহেলার কারণে তার রাগ গিয়ে পড়ত বাবার আদরের রমণীটির ওপর। সপ্তম চার্লসের ছেলে লুই পিতার প্রণয়িনী অ্যাগনেস সোরেলকে রাজপরিবারের দুর্ভাগ্যের একমাত্র কারণ হিসাবে গণ্য করে তাকে ঠাটিয়ে থাপ্পড় মেরেছিলেন। অ্যাগনেসের সৌভাগ্য তিনি শয্যাসঙ্গী চার্লসের আগেই মারা গেছিলেন, নইলে লুই তার জীবন সঙ্গীন করে দিত।

    বাবর বা নিমাইয়ের যে সময় জন্ম হয়, ঠিক সেই সময়েই মৃত্যু হয় ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ এডোয়ার্ডের। ইলিয়ানর, এলিজাবেথ নামে তার অনেকগুলো মিস্ট্রেস ছিল। সর্বশেষ সহচরী জেন শোরের ভাগ্য তার পূর্বসূরী অন্যদের তুলনায় কিছুটা ভালই বলতে হবে। তার বাবা ছিল ধনী ব্যবসায়ী, বাবার দোকানে পসরা কিনতে আসা অভিজাত মহিলাদের দেখে দেখে ছোটবেলাতেই ফ্যাসনসচেতন হয়ে ওঠে সুন্দরী এলিজাবেথ তথা জেন। বাবা তার বিয়ে দিয়েছিলেন উইলিয়াম শোর নামে এক ধনী ব্যাঙ্কারের সঙ্গে, কিন্তু সে জেনের তুলনায় বয়সে অনেক বড়। জেন তার বিরুদ্ধে অক্ষমতার অভিযোগ এনে বিবাহবিচ্ছেদ করে এবং তার কিছু পরেই রাজা চতুর্থ এডওয়ার্ডের নজরে পড়ে গিয়ে রাজার প্রধানা মিস্ট্রেসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রাজার মৃত্যুর পর পরবর্তী রাজা তৃতীয় রিচার্ড তার ওপর ষড়যন্ত্রের আরোপ লাগিয়ে জেনকে শোকের সাদা কাপড় পরিয়ে লন্ডনের রাস্তায় জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে হাঁটান ও জেলে পুরে দেন। জেলে থাকা অবস্থায় রাজার সলিসিটর জেনারেল টমাস লিনমকে রূপের মায়াজালে বশ করে বিয়ে করেছিল জেন ও জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বেশ অনেক বছরই বেঁচে ছিল। শুধু চতুর্থ এডওয়ার্ডের নয়, তার সৎ ছেলে (এডওয়ার্ডের রানি এলিজাবেথের প্রথম পক্ষের স্বামী জন গ্রে-র পুত্র) টমাস গ্রে-র অঙ্কশায়িনীও ছিল জেন শোর।

    রাজার ব্যাভিচার মেনে নিলে অবশ্য অন্য কথা। অ্যাগনেস সোরেলের কথা যেমন বলছিলাম। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের মিস্ট্রেস এই অ্যাগনেসকে মেনে নিয়েছিলেন রানি মেরি। মেরির কপাল মন্দ, তার যৌবনের একেবারে শিখরেও তাকে ঠিক সুন্দরী বলা যেত না। কাজেই মেরি ও রাজার পাশে অ্যাগনেসকে দেখলে যে কোনো পুরুষের দৃষ্টি কার ওপর নিবদ্ধ হবে, তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। প্রতিদিনই মেরিকে সহ্য করতে হত তার আশেপাশে সুন্দরী অ্যাগনেসের সদম্ভ উপস্থিতি, তা সে ঘরকন্নাতেই হোক বা রাজসভাতে। অতিথি অভ্যাগতরা দেখা করতে এসে অ্যাগনেসকেই উপহার দিত রত্নরাজি, তার অঙ্গেই সে সব ভাল মানাত। মেরি চুপচাপ দেখে যেত সে রানি হওয়া সত্ত্বেও অ্যাগনেসের শয্যা বেশি চকচকে আভরণে ঢাকা, তার শরীরেই বহুমূল্য প্রসাধনী ও গহনা, তার সবকিছুই রানির চেয়ে ভাল। মেরি এসব শুধু সহ্য করত তাই নয়, হাসিমুখে এমন ভাব করত যেন অ্যাগনেসের এই সমৃদ্ধি সে খুবই উপভোগও করছে।

    এর বদলে সে চার্লসের সঙ্গে শয্যাসঙ্গের অঙ্গীকার পেত মাঝেমধ্যে। এবং তাতেই জন্ম দিয়েছিল চোদ্দখানা সন্তানের। কপাল মন্দ হলে যা হয়, তার জীবিতকালে তাদের মধ্যে চারজন মারা যায়। শোকসন্তপ্তা মেরি সেই যে কালো পোশাকে নিজের সন্তানের শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিল, আজীবন সেই কালো পোশাককেই তার সজ্জা বানিয়ে নেয়। তার পাশে হালফ্যাশানে তার স্বামীর সহচরী অ্যাগনেস সোরেল দাঁড়ালে তার প্রতি আর কার আকর্ষণ থাকবে? সভাসদ জাঁ জুভেনাল দ্য আর্সিন্স ক্ষুব্ধ হয়ে রাজাকে বলেছিলেন, রাজামশাই, সুরুচি ব্যাপারটা সম্বন্ধে আপনার ধারণা কী? মহিলাদের পোশাকের নেকলাইন কতখানি নেমে আসাকে সুরুচির পরিচয় বলা যেতে পারে? সেটা যদি কেবল বক্ষপর্বতের কিয়দংশ নয়, এমনকি তার চূড়াদুটিও সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে দেয়, তবে কি তা কুরুচির পরিচয় নয়?

    কাকে উদ্দেশ করে এই উক্তি, তা জানতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে চার্লসের ব্যক্তিত্ব বলে কিছু ছিল বলে মনে হয় না, হয়ত অ্যাগনেসের পছন্দই তার পছন্দ ছিল, কাজেই সভাসদের খোঁচা তাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করল না। মেরির অবশ্য এ নিয়ে কোনো হেলদোল ছিল বলে মনে হয়নি। চার্লস আমার শরীর ও মনের একচ্ছত্র মালিক, তার ইচ্ছেই আমার কাছে প্রধান, এই ছিল তার নীতি।

    এই নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে তার আগে বা পরেও যে রানিরা খুব বেশি সুবিধে করতে পেরেছিল, তাও নয়।

    পছন্দের পাত্রীটির প্রতি নিখাদ ভালবাসাতেই হোক বা তার সৌন্দর্যে ও শারীরিক আকর্ষণে, নর্মসহচরীটির সঙ্গে রাজার শয্যাসম্পর্কটি ছিল নির্দ্বিধায় খাঁটি। ফলে এইসব রক্ষিতাদের গর্ভে জন্মাত অগুন্তি অবৈধ সন্তান। এই সন্তানদের অধিকাংশই রানির সঙ্গে জোর করে মিলিত হবার ফলশ্রুতিস্বরূপ রানির গর্ভজাত বৈধ রাজপুত্রদের চেয়ে দেখতেও সুন্দর, কাজেকর্মেও বেশি গুণবান ও বলশালী। মায়ের সৌন্দর্য ও বাবার বীরত্ব নিয়ে জন্মাত তারা, সে তুলনায় বৈধ সন্তানদের অনেকেই স্বাস্থ্যহীন, অসুন্দর। রানির গর্ভে রাজা চতুর্দশ লুইয়ের ছয় সন্তানের পাঁচজনের অকালে মৃত্যু হলে রাজবৈদ্য বলেছিল, এ তো হবারই কথা, মহারাজ। আপনি আপনার শরীরের সবচেয়ে ঘন রসটা বিলিয়ে দিচ্ছেন আপনার মিস্ট্রেসদের, রানিমার ভাগ্যে পড়ে থাকছে আপনার পাৎলা তলানিটা!

    শুধু তাই নয়, রক্তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে অনেক সময় রাজপরিবারে বিয়ে হত মাসতুতো খুড়তুতো ভাই বোনদের মধ্যে। স্বাস্থ্যহানি, বুদ্ধিহীনতা ও বিভিন্ন জেনেটিক সমস্যা তাই লেগেই থাকত পরবর্তী প্রজন্মে। সে তুলনায় জারজ সন্তানেরা সুস্বাস্থ্যের ও সুবুদ্ধির অধিকারীই হত না কেবল, তাদের মধ্যে রাজার প্রতি আনুগত্যও থাকত বেশি। রাজপুত্রেরা যেখানে অনেক সময় অকম্মার ঢেঁকি কিন্তু বিপুলভাবে দুর্বিনীত ও একগুঁয়ে, জারজ সন্তানেরা জানত তাদের ক্ষমতার উৎস তো রাজাই, তিনি তাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন বলেই তারা করে-কম্মে খাচ্ছে, তাই রাজার জন্যে জানপ্রাণ দিতে হলে তারাই থাকত। ১১৮৯ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরির মৃত্যুশয্যায় রাজার পাশে ছিল কেবলমাত্র একজন, অবৈধ সন্তান জেফ্রি। রাজার নিজের আইনানুগ সন্তানদের মধ্যে তখন জীবিত জন আর রিচার্ড দুজনেই চিরশত্রু ফ্রান্সের রাজার সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের বাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেমেছে। হেনরি জেফ্রির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তুই-ই আমার একমাত্র আদর্শ সন্তান রে, জেফ্রি। ঐ জন আর রিচার্ড হচ্ছে বেজন্মা।

    অনেক সময় রাজা নিজেই তার জারজ সন্তানদের বিশেষ আইনানুগ স্বীকৃতি দিতেন। চার্চের নিয়মে তাদের রাজার উত্তরাধিকারী হিসাবে দাবি করা যেত না, কিন্তু রাজা মেনে নিতেন যে তারা তাঁর সন্তান। এইসব জারজদের স্বাভাবিকভাবেই প্রতিপত্তিও অন্যদের তুলনায় বেশি হত, তাদের আশা-আকাংক্ষাও বেশি। ১৩৬০ সালে পর্তুগালের রাজা পেড্রো তার প্রণয়িনী ইনাজ দ্য কাস্ত্রোর গর্ভে জন্মানো বাচ্চাদের এ রকম স্বীকৃতি দিতে চাইলেন।

    রাজা ইনাজকে বিয়েও করেছিলেন, কিন্তু সেই বিয়ে এই সন্তানদের জন্মের পরে। ফলে তাদের জন্মের সময় তাদের মা রানি ছিলেন না, এমনকি রাজা ইনাজকে রানির শিরোপাও দেননি কখনও, তাই তারা রানির সন্তান নয়, ফলে পোপ বেঁকে বসল। পোপের কথা, রাজপুত্র হতে হলে তাদের মাকে রানির স্বীকৃতি দিতেই হবে। কিন্তু তা আর কী করে সম্ভব! ইনাজ পাঁচ বছর হল মারা গেছে, সে তখন কবরে শায়িতা। কুছ পরোয়া নেই, রাজা লোক ডাকিয়ে সেই কবর খুঁড়ে বের করে আনালেন ইনাজের কঙ্কাল, তাতেই পরানো হল রানির বহুমূল্য সাজ। ক্যাথিড্রালের চেয়ারে সেই অদ্ভুত জিনিসটি বসিয়ে বিপুল সমারোহে মন্ত্রঃপূত জল ছিটিয়ে ইনাজের কঙ্কালে রানিত্ব অর্পণ করা হল। রাজসভার সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে হাজিরা দিয়ে তার সাক্ষী রাখা হল, যেন কেউ বলতে না পারে ইনাজ রানি নয়। এই তামাশার ফলে তার ছেলেগুলো এক এক করে রাজপুত্রের স্বীকৃতি পেয়ে গেল।

    যতজনের কথা বললাম, সবই পঞ্চদশ শতকের বা তার আগের কাহিনি। পরবর্তী তিন চার শতকের ইওরোপ তৈরি করবে এর অজস্র উদাহরণ। ষোড়শ শতকের শুরুতেই ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাসোঁয়া চালু করবেন রয়াল মিস্ট্রেসদের মধ্যে তার সবচেয়ে পছন্দের নারীটির জন্যে বৈধ খেতাব মিত্রেস অঁতিত্র (maîtresse-en-titre) এবং রাজবাড়িকে হারেম বানিয়ে ফেলবেন। একই সময়ে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি তার দুজন পছন্দের শয্যাসঙ্গিনীকে বিয়ে করতে চেয়ে ফেঁসে যাবেন এবং শেষে উপায় না পেয়ে দুজনকেই নিজে হত্যা করবেন তরবারি দিয়ে মুণ্ডচ্ছেদ করে।


    * * *

    এই সব জেনে যদি মনে হয় রানিদের জীবন ছিল অতীব দুঃখের, একেবারেই নীরস ও গোপন অশ্রুবর্ষণের, তবে তা পুরোটা ঠিক নয়। সমস্ত রানি রাজার হাতের ক্রীড়নক ছিলেন না। কেউ কেউ সুন্দরী ছিলেন এবং স্বামীকে নিজের প্রতি প্রণয়াসক্ত রাখতে পারঙ্গমা ছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন অশ্বচালনায় রীতিমত পারদর্শী, নেত্রীস্বভাবা, পুরুষদের পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রেও অসমসাহসিনী।

    এবং স্বামীদেবতাটি নিজের পছন্দমত না হলে তাদেরও দরকার হত গোপন শয্যাসঙ্গীর। অন্তত একজনের। অনেকক্ষেত্রেই একাধিকও।

    জামাই বার্গেন্ডিরাজ রেমন্ড মারা গেলে ১১০৯ সালে কাস্তিল ও লিয়নের রাজা ষষ্ঠ আলফনসো কন্যা উরাকার আবার বিয়ে দিলেন, পাত্র ত্রিশোর্ধ্ব অ্যারাগনরাজ, তার নামও আলফনসো। ষষ্ঠ আলফনসো ভেবেছিলেন, তার সময় ঘনিয়ে এসেছে, আর বেশিদিন বাঁচবেন না, এখন কন্যার একজন বীর স্বামী না থাকলে তাকে কে দেখবে? বিধবা মেয়েদের জীবন সুখের নয়। এই আলফন্সো রীতিমত বীর, দেশ থেকে বিধর্মী মুসলমানদের হটাতে গোটা ত্রিশেক যুদ্ধ করে গেছেন সারা জীবন ধরে।

    রেমন্ডের সঙ্গে উরাকার বিয়ে হয়েছিল যখন তার বয়স মাত্র আট বছর। চোদ্দ বছর বয়সে তার এক কন্যা জন্মায়, কিন্তু সে বাঁচেনি। স্বামীর মৃত্যুর সময় তার বয়স আঠাশ বছর, ততদিনে তার আরও দুটো সন্তান জন্মেছে, এক কন্যা ও এক পুত্র। তার বাবা বিধবা উরাকাকে রাজ্যের পরবর্তী শাসক হিসাবে নিযুক্ত করতে চাইলে সভায় দাবি ওঠে, তার আবার বিয়ে দেওয়া দরকার। কাস্তিল আর লিয়নের কারও সঙ্গে বিয়ে দিলে নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি বাড়বে, এই বিবেচনায় তার বিয়ে স্থির হল লড়াকু যোদ্ধা অ্যারাগনের আলফন্সোর সঙ্গে।

    মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ষষ্ঠ আলফনসো পরপারে চলে গেলেন। এদিকে মেয়ে উরাকা আর তার নতুন স্বামী অ্যারাগনরাজ আলফনসো নিজেদের মধ্যে বিবাদেই দিন-মাস-বছর কাটাতে লাগল। পরস্পরের ফার্স্ট কাজিন হওয়ায় তাদের বিয়ে চার্চ অবৈধ ঘোষণা করলেও আলফনসো তা মানেনি, কেননা তাহলে শ্বশুরের রাজত্বটা হারাতে হবে। আলফনসো রীতিমত বীর হলেও বিছানায় বিশেষ বীরত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। রাজসভায় সবাই ফিসফাস করত, এ কেমন রাজা, যার একটাও পতিতা দরকার হয় না, একটাও রক্ষিতা নেই, মেয়েদের প্রতি কোনরকম উৎসাহই নেই! যুদ্ধে জিতে বিজিতদের ঘর থেকে সুন্দরী মেয়েদের ধরে শয্যাসঙ্গিনী করার প্রচলিত রীতিতেও তার উৎসাহ না দেখে তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে সে বলেছিল, সে হচ্ছে আলফন্সো দ্য ব্যাটলার, যুদ্ধই তার ঈশ্বর, যোদ্ধাদের নারীসঙ্গে কী প্রয়োজন? উরাকা কিছুদিন চেষ্টাচরিত্র করে শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে প্রথমে আলাদা জীবন যাপন করতে শুরু করে। কাউন্ট গোমেজ গঞ্জালেস হয় তার প্রেমিক। আলফন্সো তাকে যুদ্ধে হত্যা করলে বিয়ের বছর পাঁচেক পরে স্বামীর সঙ্গে তার আইনত বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পোপের সাহায্যে আলফনসোর কাছ থেকে সে ফেরত পেয়ে যায় কাস্তিল ও লিয়ন, তার রাজা হয়ে বসে প্রথম স্বামী রেমন্ডের ঔরসে তার গর্ভজাত পুত্র সপ্তম আলফন্সো।

    উরাকার তেজ কম ছিল না। অশ্বচালনায় সে ছিল রীতিমত দক্ষ। সতের বছরে তেরোটা যুদ্ধে সে তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে নাস্তানাবুদ করে রেখেছিল। তার প্রধান সেনাপতি ও পরবর্তী প্রেমিক পেড্রো গঞ্জালেস স্বামী আলফনসোর তুলনায় অনেক বেশি পুরুষকারের অধিকারী, কী যুদ্ধক্ষেত্রে কী বিছানায়! উরাকার অন্তত দুটো বাচ্চার পিতা এই পেড্রো। মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় উরাকা দ্য রেকলেসের বর্ণময় জীবন।


    * * *

    উরাকার মতই নিজের জীবনের দখল নিয়েছিল ইলিয়ানর। দ্বাদশ শতকে পঞ্চদশী ইলিয়ানরের সঙ্গে বিয়ে হয় আঠারো বছর বয়সী ফ্রান্সের রাজা সপ্তম লুইয়ের। আলফনসোর মত লুইয়ের শয্যার প্রতি অনীহা ছিল না, সে খুবই আগ্রহী ছিল ইলিয়ানরের প্রতি, কিন্তু কন্যা নাবালিকা বলে রাজপুরোহিতরা তাদের একত্র শয়নে বাদ সাধল। ইলিয়ানরও ছাড়ার পাত্রী নয়, খবর পেয়ে পাদ্রীদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে সবগুলোকে অপদার্থ বিবেচনা করে ছাঁটাই করার আদেশ দিল সে। লুইয়ের মাও প্রসন্না ছিলেন না উদ্ধত ও দাম্ভিক বৌমাটিক প্রতি।

    লুইও ঝামেলায় পড়ে গেল চার্চের সঙ্গে মনোমালিন্য সৃষ্টি হতে। স্থানীয় আর্চবিশপের পদ খালি হতে চার্চের মনোনীত সদস্যের ওপর ভেটো জারি করে সে তার সভাসদদের একজনকে ঐ পদে বসানোর সুপারিশ করতে পোপ গেল ক্ষেপে। রাজাদেশ অমান্য করে তার প্রার্থীকেই আর্চবিশপের পদে বসানো হল। ক্ষুব্ধ লুই বলল, ঐ আর্চবিশপকে যেন ওর রাজ্যে ঢুকতে না দেওয়া হয়। এই গোলযোগে চার্চ যেই দেখল তাদের প্রতিপত্তি নষ্ট হতে বসেছে, নিজেদের মধ্যে ফন্দি এঁটে রাজাকে পত্র লিখল তারা। গণনা করে তারা নাকি দেখেছে, রাজ্য ও রাজার সমূহ দুর্দিন আসন্ন এবং তার কারণ রাজার মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে এবং তার কারণ রাজপ্রাসাদে এক যুবতী ডাইনির অনুপ্রবেশ, সে এই রানি ইলিয়ানর।

    ইলিয়ানরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লুই তার সঙ্গে রাত কাটাতে গেলেই পাদ্রীর দল লোক পাঠিয়ে মিলনশয্যা থেকে তুলে আনে লুইকে। রাগে ও হতাশায় ফুঁসতে থাকে ইলিয়ানর। এর মধ্যে সে আরও কয়েকবার চার্চের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়েছে। সেইন্ট-ডেনিসে স্থাপিত নতুন চার্চের বিশপ বেনেডিক্ট ইলিয়ানরকে বারণ করলেন চার্চের ব্যাপারে নাক না গলাতে। ইলিয়ানর তার কাছে কেঁদে পড়ল বিয়ের এতদিনে তার একটাও সন্তান না হওয়ায়। রাজাকে একটা উত্তরাধিকারী দিতেও সে অপারগ। তার বান্ধবীদের সে প্রকাশ্যেই বলে, ভেবেছিলাম বিয়ে করেছি এক রাজাকে, দেখছি এ একেবারে সন্ন্যাসী! বেনেডিক্ট বললেন, আজেবাজে কাজে সময় নষ্ট না করে তার উচিত রাজার প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি করা, তাকে সুখী করার চেষ্টা করা।

    চেষ্টা করল ইলিয়ানর। বিয়ের আট বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর সে মা হতে পারল। কিন্তু তার কপাল মন্দ, ছেলে নয়, তার জন্মালো এক মেয়ে, মারিয়া।

    ১১৪৬ সালে লুই ঠিক করল, পাপস্খালন করতে সে ক্রুসেডে যাবে। ততদিনে ইলিয়ানর নিজের কুঠরিতে প্রায় বন্দীজীবন যাপন করে করে ক্লান্ত। লুইয়ের কাছে সে বায়না ধরল, সেও যাবে তার সঙ্গে। তার কাকা রেমন্ড অ্যান্টিয়কের রাজা। কাকা বহুদিন শত্রুদের সঙ্গে একা লড়াই করছেন, তার দরকার ফ্রান্সের সাহায্য। ইলিয়ানরের সঙ্গে রেমন্ডের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। লুইয়ের নিষেধ, চার্চের আজ্ঞা সমস্ত অমান্য করে সে প্রস্তুত হল স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার। তার জন্যে প্রস্তুত হল রুপোর বক্ষবন্ধনী ও এত দিন ব্যবহারের জন্যে বিশাল পোশাকের লটবহর। সে সব বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে সঙ্গে নিল শ তিনেক দাসদাসী। কনস্ট্যান্টিনোপলে তিন সপ্তাহ কাটিয়ে এশিয়া মাইনরে প্রবেশ করতেই শুধু হল গোলমাল। বাইজ্যান্টাইন রাজার কাছে তারা খবর পেল জার্মানির সেনারা তাদের শত্রু তুর্কি সেনাদের কচুকাটা করেছে। অ্যান্টিয়ক পৌঁছাতে হলে পথে পড়বে মাউন্ট ক্যাডমাস পাহাড়, সেই পাহাড়ে তুর্কি শত্রুদের ভয়। কিন্তু জার্মানরা যেহেতু তাদের সদ্য বধ করেছে, এখন তাহলে ভয় নেই। ঠিক হল ইলিয়ানর আর তার দলবল আগে আগে যাবে, তাদের দলের দলপতি হবে জেফ্রি দ্য র‍্যাঁকো নামে একজন। লুই সেনাবাহিনী নিয়ে পেছনে পেছনে যাবে, তারাই টানবে ইলিয়ানরের দলের পোশাক-আশাকের লটবহরও। ঠিক হল তাদের পরবর্তী ক্যাম্প হবে ক্যাডমাস শৃঙ্গের ওপর।

    সঙ্গে বিশেষ মালপত্তর না থাকায় ইলিয়ানরের দল দ্রুতগতিতে এগিয়ে ক্যাডমাস শৃঙ্গ পৌঁছে গেল। লুইয়ের কাকা অ্যামেদিও-ও এদের দলে। অ্যামেদিও ও র‍্যাঁকো আলোচনা করে ঠিক করল পর্বতশৃঙ্গের বদলে সেটা পেরিয়ে কোনো উপত্যকায় পৌঁছে তাঁবু খাটানোই ভাল হবে। তারা এগিয়ে চলল।

    এদিকে বাইজ্যান্টাইন রাজার খবর ছিল ভুল। আসলে জার্মান সেনারাই কচুকাটা হয়েছে তুর্কি সেনাদলের হাতে। তীর্যযাত্রীদের তারা ছেড়ে দিলেও লুইয়ের সেনাদলকে তারা আক্রমণ করল অতর্কিতে। সঙ্গে মালপত্তরের লটবহর থাকায় তারা না পারল পালাতে, না পারল ভাল করে যুদ্ধ করতে। বহু সেনার মৃত্যু হল। লুই কোনোমতে পালাতে সমর্থ হলেন অল্প কিছু সেনা নিয়ে। পাহাড়ের মাথায় এসে বাকিদের দেখতে না পেয়ে তার রাগ চড়ে গেল র‍্যাঁকোর ওপর।

    ওদিকে ইলিয়ানর গিয়ে উঠল তার কাকার রাজপ্রাসাদে। কাকা যুদ্ধক্ষেত্রে বীর এবং শয্যাক্ষেত্রেও পারঙ্গম। ইলিয়ানরের এত বছরের উপোসী শরীর তার দুর্নিবার আকর্ষণে ভেসে গেল। স্বামীসংসর্গ-বঞ্চিত ইলিয়ানর তীব্রভাবে অবৈধ শারীরিক প্রণয়ে জড়িয়ে পড়ল নিজের পিতৃব্যর সঙ্গে। সে আকর্ষণ এমনই প্রবল হল যে রাজা লুই যখন আরও সৈন্যসামন্ত আনিয়ে জেরুসালেমের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করে সেনাদের আদেশ দিল, ইলিয়ানর তার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করল, বলল সে কাকা রেমন্ডের সঙ্গেই থাকবে। লুই যখন জিজ্ঞেস করল, স্বামীর সঙ্গে ক্রুসেডে যাওয়ার জন্যে কদিন আগে যে হত্যে দিয়ে পড়েছিল, তার এমন মন পরিবর্তনের কারণ কী, ইলিয়ানর তার মুখের ওপর জবাব দিল, কারণ স্বামীটি একটি অপদার্থ, তার স্বামী হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই।

    হতচকিত লুইকে তার পারিষদরা বোঝাল, রানি রাজাকে ছেড়ে দিয়েছে, এ খবর ফ্রান্সে পৌঁছালে তা হবে ভীষণ লজ্জাজনক। সে যে ব্যভিচারে লিপ্ত, তা তো বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু তার জন্যে তাকে ত্যাগ করলে ফ্রান্সেরই ক্ষতি। বিয়ের সময় ইলিয়ানর ফ্রান্সকে দিয়েছে তার বাবার বিপুল রাজত্বও, যা তাকে ছাড়লে ফ্রান্সের হাতছাড়া হয়ে যাবে। ইলিয়ানরকেই আপাতত রানি হিসাবে স্বীকার করে কাজ চালাতে হবে।

    ফ্রান্সের সেনাদল যখন জেরুসালেম অভিমুখে রওনা হল, মাঝরাতে জোর করে ইলিয়ানরকে তার প্রণয়ী কাকার বিছানা থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে চাপিয়ে নেওয়া হল এক ঘোড়ার পিঠে, কাকার সঙ্গে তার আর দেখা হল না। সেটা ইলিয়ানরের পক্ষে এক দিক দিয়ে ভালই হল, কেননা এর কিছুদিন পরেই কাকা রেমন্ড এক যুদ্ধে নিহত হলেন। শত্রুরা তার মাখার খুলি রুপো দিয়ে বাঁধিয়ে সেটা একটা পানপাত্র হিসাবে ব্যবহার করতে লাগল।

    এর ছ’ বছর পরে ইলিয়ানর লুইয়ের সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন জানাল। কারণ হিসাবে দেখাল যে তারা যেহেতু একই গোত্রের, পরস্পরের ফোর্থ কাজিন অর্থাৎ একই পূর্বপুরুষের সন্ততি, তাদের মধ্যে বিয়ে চার্চের নিয়মে অবৈধ। আসলে এসব অজুহাত, সে আর লুইকে সহ্য করতেই পারছিল না। এতকালের বিবাহিত জীবনে তার ভাগ্যে সেই একটিই মেয়ে, কোনো ভবিষ্যৎ রাজার মা হওয়া তার কপালে নেই। লুই একটা ভেড়া, সে ধর্মযাজকদের হাতের পুতুল। তার সঙ্গে বিবাহিত থাকার কোনো মানেই হয় না।

    ডিভোর্সের দু-মাস যেতে না-যেতেই ইলিয়ানর বিয়ে করল ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরিকে। পিতৃদত্ত জমি যা এতকাল ফ্রান্সের অধীনে ছিল তা এখন হয়ে গেল ইংল্যান্ডের। হেনরির ঔরসে তার গর্ভে একে একে এসে গেল পাঁচ-পাঁচটা পুত্র ও তিন-তিনটে কন্যা।


    * * *

    ফ্রান্সেরই ইসাবেলার গল্প চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকের। ১৩০৮ সালে তার যখন বিয়ে হয় ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের সঙ্গে, তখন তার বয়স মাত্রই বারো আর এডওয়ার্ডের চব্বিশ। সে কি আর জানত ইংল্যান্ডের এই যুবক রাজপুত্রটি একটি উভকামী, মূলত সমকামী এবং পিয়ার্স গ্যাভেস্টোন নামে তার একটি পুরুষ প্রণয়ী আছে! সে একটু-আধটু প্রণয়ী নয়, তাকে কাছছাড়াই করে না এডওয়ার্ড।

    যাই হোক, কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে যথাবিহিত রাজ-উপচারে তাদের বিয়ে তো হয়ে গেল ফ্রান্সে। ইসাবেলার বাবা ফিলিপ জামাইকে সোনাদানা হিরে-জহরৎ দান করলেন প্রচুর। এডওয়ার্ড সেগুলো প্যাক করে উপহার হিসাবে পাঠিয়ে দিল গ্যাভেস্টোনের কাছে। তাতে ফ্রান্সের রাজবাড়ির লোকজন গেল ক্ষেপে। তবে জামাইকে তো আর বিয়ের পরদিনই কিছু বলা যায় না। চোখের জল মুছে ইসাবেলা এডওয়ার্ডের হাত ধরে হাজির হল ইংল্যান্ডের রাজপ্রাসাদে। তাদের শকট রাজবাড়ির সামনে হাজির হতেই সামনে গ্যাভেস্টোনকে দেখে নববধূর হাত ছাড়িয়ে এডওয়ার্ড তাকে জড়িয়ে ধরে ঢুকে গেল প্রাসাদের অভ্যন্তরে।

    ইংল্যান্ডের রাজবাড়ির বিবাহ-অনুষ্ঠানে গ্যাভেস্টোনই যেন প্রধান অতিথি, ইসাবেলা নয়। প্রচলিত প্রথা স্বামী-স্ত্রীর ছবি দিয়ে তৈরি থাকবে পর্দা। দেখা গেল পর্দার ছবিতে এডওয়ার্ড-ইসাবেলা নয়, এডওয়ার্ড-গ্যাভেস্টোনের ছবি। ফ্রান্সে গিয়ে বিয়ে করে এল এডওয়ার্ড, কিন্তু রাজবাড়িতে সমস্ত অনুষ্ঠানে মনে হতে লাগল যেন ইসাবেলা নয়, পুরুষ গ্যাভেস্টোনই আসলে এ অনুষ্ঠানে এডওয়ার্ডের বৌ!

    বালিকা-বধূ ইসাবেলা এইসব কাণ্ড দেখে তো হতচকিত হয়ে গেল। বয়সে যদিও সে নিতান্তই কচি খুকি, বিয়ের পর সে তো এই প্রাসাদের প্রধানা মহিলা, সে কী করে এ সব সহ্য করবে?

    ভাগ্য ভাল তার, এডওয়ার্ড তোল্লাই দিয়ে দিয়ে গ্যাভেস্টোনকে এমন মাথায় তুলেছিল যে অনেক ব্যারনদের জমি আর দুর্গ অন্যায়ভাবে সে দান করে দিয়েছিল গ্যাভেস্টোনের নামে। এসব সহ্য না করতে পেরে জনাচারেক ব্যারন একত্র হয়ে একদিন খুন করে ফেলল গ্যাভেস্টোনকে। পথের কাঁটা দূরে সরে যাওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল ইসাবেলার। রাজা এডওয়ার্ডও তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে তাকে শয্যাসঙ্গিনী করে ইংল্যান্ড শাসন করতে উৎসাহী করে তুললেন। একে একে কয়েকটা বাচ্চাও হল ইসাবেলার।

    গ্যাভেস্টোনকে হারালেও এডওয়ার্ডের পছন্দ তো বদলায়নি। ফলে বিয়ের বারো বছরের পর ইসাবেলা আবিষ্কার করল এডওয়ার্ডের এবার চোখে ধরেছে একটা নয়, একসঙ্গে একজোড়া পুরুষ, সম্পর্কে যারা পিতা-পুত্র। হিউ লা ডিস্পেন্সার সিনিয়র আর হিউ লা ডিস্পেন্সার জুনিয়র। নজর সম্ভবত বাচ্চাটার ওপরেই বেশি, বাবাটা সেই সুযোগে রাজকীয় ব্যাপারস্যাপারে নাক গলিয়ে নিজেদের ফায়দা তুলতে লাগল। অবস্থা এমন হল যে রাজার এই প্রণয়ীদের সম্মান, প্রতিপত্তি ও অর্থ দিন দিন বেড়েই চলল। একই সঙ্গে খর্ব হতে লাগল ইসাবেলার সম্মান, প্রতিপত্তি ও অর্থবল।

    কিন্তু এখন তো আর ইসাবেলা সেই কচি খুকিটি নেই। প্রায় দশ বছর রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা এখন তার, বয়সও পঁচিশ। সে থোড়াই তার ভ্যাবাগঙ্গারাম বরের দুখানা গাম্বাট পুরুষ-প্রণয়ীর ভয়ে তটস্থ থাকবে! রজার মর্টিমার নামে এডওয়ার্ডের এক প্রাক্তন জেনারেলের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক বেশ এগিয়েছে। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের সফল যুদ্ধ পরিচালনায় রজারই ছিল আসল বীর। কিন্তু এই ডিস্পেন্সারদের উপহার দিতে রাজা তার জমি ও দুর্গ বাজেয়াপ্ত করে নিলে সে রাজার পরম শত্রুতে পর্যবসিত হয়। রাজা তাকে বন্দী করে লন্ডন টাওয়ারে বন্দী করে রাখেন। সেখানকার প্রহরীদের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দড়ি-টড়িতে ঝুলে দুর্গ থেকে পালিয়ে টেমস সাঁতরে পেরিয়ে একদিন রজার হাজির হয়ে যান ফ্রান্সে।

    ওদিকে বাবা-মার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি বলে ইসাবেলাও তখন ফ্রান্সে। এতদিন যে শরীর শুধু মেয়েলি এডওয়ার্ডের ছোঁয়া পেয়েছে, সে শরীর রজারের দৃপ্ত স্পর্শে জেগে উঠল। একযোগে তারা আক্রমণ করল ইংল্যান্ড। সারারাত ধরে তাদের চলতে লাগল শারীরিক প্রণয়, সারাদিন ধরে তারা একত্রে যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়া ছোটাল। ইসাবেলার পরনে বিধবার পোশাক। সে প্রকাশ্যেই বলতে লাগল, আমার আর আমার স্বামীর মধ্যে কেউ আছে, সুতরাং আমি আমার বিয়ের পোশাক পরতে রাজি নই। আমি এই পোশাকেই আমার অপমানের বদলা নিতে চাই।

    ইসাবেলা-রজারের যুগ্ম আক্রমণে এডওয়ার্ড বাপ-ছেলে দুই প্রণয়ীকে নিয়ে ভেগে পড়ার তাল করেছিল, কিন্তু ধরা পড়ে গেল। ইসাবেলা নিজে আগে দুই প্রণয়ীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে হাত পা ও শরীরের সমস্ত অঙ্গঅপ্রত্যঙ্গ তরবারি দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে মনের জ্বালা মেটাল। কিন্তু এডওয়ার্ডকে হত্যা করতে পারল না। হাজার হোক তার বিয়ে-করা বর! এডওয়ার্ডকে জেলে ভরে দিয়ে জোর করে তাকে রাজার পদ থেকে সরিয়ে নিজের বড় ছেলে পনের বছর বয়সী তৃতীয় এডওয়ার্ডকে সিংহাসনে বসিয়ে দিল। বয়স কম বলে রাজার পক্ষে সে নিজে আর রজার মর্টিমার রাজত্ব চালাতে লাগল।

    এদিকে রাজা জেলে বসে মেয়েলি দুখ-ভরি পদ্য লিখতে লাগলেন। সেগুলো পড়ে দেশের জনগণের তার প্রতি দরদ উথলে উঠল। বার দুয়েক রাজাকে জেল থেকে উদ্ধার করার চেষ্টায় বিদ্রোহও হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। যদিও রাজার শরীরে তেজ নেই, তবুও তিনি রাজা, ফলে ইসাবেলা-রজারের প্রতিপক্ষ। কিন্তু বেশিদিন সেই সম্ভাবনাও রইল না। জেলের মধ্যেই একদিন তিনি রহস্যজনকভাবে খুন হলেন। তার পায়ুর মধ্যে গোরুর এক বিশাল শিং জোর করে ঢুকিয়ে কেউ তাকে হত্যা করে গেল।

    এদিকে রাজসভায় রজার মার্টিমারের প্রভাব বেড়েই চলল। পূর্ববর্তী এই রাজসেনাপতিকে ইসাবেলা ব্যবহার করেছিল স্বামীর বিচিত্র যৌনসঙ্গের প্রভাবে তার জীবন দুর্বিষহ হওয়ার জন্যে। রজার তো আর রাজা নয়, বস্তুত তার তেমন কোনো বৈধ সম্মানও নেই। ১৩৩০ সালে ইসাবেলার ছেলে আঠারো বছরের সাবালক তৃতীয় এডওয়ার্ড লক্ষ করল তার মায়ের প্রণয়ী দিন দিন উন্নাসিক হয়ে উঠছে। সে ভয় পেল মা আর তার এই সঙ্গী যেমন একযোগে তার বাবার পদচ্যুতি ও হত্যার কারণ, তাকেও একদিন এরা পদচ্যুত ও হত্যা করে হয়ত নিজেদের বংশানুক্রম চালু করবে ইংল্যান্ডে। তার মায়ের বয়সও তো বেশি নয়, মাত্রই চৌত্রিশ। রজার যে সমস্ত ব্যারনের সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছিল, তাদের সঙ্গে একজোট হয়ে সে একদিন রজার মার্টিমারকে বন্দী করল এবং সর্বসমক্ষে তার ফাঁসি দিল। খবর পেয়ে ইসাবেলা মূর্ছিতা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

    প্রায় দু-বছর একটা গৃহে অন্তরীণ থেকে শোক পালন করে ইসাবেলা বের হল এক নতুন রূপ ধারণ করে। রাজমাতা হিসাবে সে এখন সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ। রজার মার্টিমারের সঙ্গে তার অবৈধ প্রেম যেন গতজন্মের বিস্মৃত অধ্যায়। সন্তদের আশ্রমে শুরু হল তার আনাগোনা। তার রাজকীয় উদ্যানে গান গাইতে লাগল গান-গাওয়া পাখির দল, গায়ক-বাদকেরা গাইতে-বাজাতে লাগল মাটির সুর। ১৩৫৮ সালে সেইন্ট জর্জেস ডে অনুষ্ঠানে সে পরিধান করল বহুমূল্য রত্নরাজি-সমন্বিত পোশাক। তার অঙ্গে শোভা পেতে লাগল ১৮০০ মুক্তো ও ৩০০ চুনি বসানো অঙ্গশোভা। এর কিছুদিন পরেই ৬২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

    বিয়ের পোশাকে তাকে কবরস্থ করা হয় তার স্বামীর পাশে, হাতে এক কৌটা তার স্বামীর হৃদপিণ্ডের অনুকরণে প্রস্তুত, যে হৃদয় স্বামীর জীবিতকালে কোনদিনই সে জয় করতে পারেনি।


    * * *

    গ্যাভেস্টোন ও ডিস্পেন্সারদের সঙ্গে সমকামে লিপ্ত থাকলেও দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের ঔরসে ইসাবেলার গর্ভে চারখানা সন্তানের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু কাস্তিলের অক্ষম রাজা চতুর্থ হেনরি বহু চেষ্টাচরিত্র করেও তার দু-দুটো পত্নীকে মাতৃত্ব দিতে পারেননি। শেষে তিনি শরণাপন্ন হলেন এক অদ্ভুত পদ্ধতির।

    এই চতুর্থ হেনরির সৎ বোনই ইসাবেলা অফ কাস্তিল, যিনি বিয়ে করেছিলেন ফার্দিনান্দ অফ অ্যারাগনকে আর দুজনে মিলে সমস্ত ছোট ছোট কিংডমকে জুড়ে জন্ম দিয়েছিলেন আধুনিক স্পেনের, কলম্বাসকে পাঠিয়েছিলেন ভারতের খোঁজে। চতুর্থ হেনরি ছিলেন এক লাজুক প্রকৃতির রাজা, ভয়ঙ্কর বিষাদগ্রস্ত। একাকীত্বে ভুগতেন, নড়তে চড়তেও যেন কত কষ্ট তার। সোনালি চুল আর গাঢ় নীল চোখের অধিকারী, বিশালকায়। উন্নতনাসাও বলা যেত হয়ত, কিন্তু ছোটবেলায় কেউ তার নাক ভেঙে দিয়েছিল বলে সেটা একটু থ্যাবড়া। জীবনে স্নান করতেন না। প্রকৃতির কোনো এক আজব কারণে বিচিত্র সব দুর্গন্ধের প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল।

    ১৪৪০ সালে পনের বছর বয়সী রাজপুত্র হেনরির সঙ্গে বিয়ে হল অ্যারাগনের রাজা জুয়ানের কন্যা ব্ল্যাঙ্কার। রীতি অনুযায়ী কন্যা যে কুমারী, তার প্রমাণ রাখতে বিয়ের প্রথম রাতে নবদম্পতির শয্যাক্রীড়ার কিছু প্রমাণ রাখতে হবে, যাতে তার বৈধতা নিশ্চিত করা যায়। তার জন্যে বিছানার পাশেই বসবে তিনজন সাক্ষী, যারা নথিবদ্ধ করবে নবোঢ়া কন্যার প্রথম শীৎকার। সেটা লিপিবদ্ধ করে তারা এরপর টেনে নেবে বিছানার ওপরের সাদা চাদরটা। তাতে রক্তের দাগ চোখে পড়লেই জানিয়ে দেওয়া হবে শয্যাগৃহের বাইরে অপেক্ষায় থাকা প্রহরীদের। তারা বাজাতে থাকবে কাড়া-নাকাড়া। সেই বাজনা শুনে পাত্রের মাতাপিতা জানতে পারবেন ঘরের লক্ষ্মীটি কুমারী ছিল, এইমাত্র তাদের সুযোগ্য পুত্রটি তার কুমারীত্ব হনন করে তাদের বিবাহকে বৈধ ঘোষণা করল।

    শয্যা প্রস্তুত। ব্ল্যাঙ্কার সাদা রাতপোশাক খুলে তাকে চড়িয়ে দেওয়া হল শয্যায়। সে গিয়ে ঢুকে গেল কম্বলের তলায়। হেনরিও বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল তার পাশে। মশারির মত বিছানার পর্দা নেমে গেল। সাক্ষী তিনজন উদগ্রীব হয়ে রইল রাজকন্যার শীৎকার শোনার অপেক্ষায়। কান খাড়া করে রইল যাতে সেই শব্দ তাদের শ্রবণযন্ত্রকে উপেক্ষা করে কোনোমতেই মিলিয়ে যেতে না পারে। গৃহে সম্পূর্ণ নীরবতা। দূরে এক কোণে জ্বলছে মোমবাতি, গলে গলে পড়ছে তার মোম। বাইরে প্রহরীরা অপেক্ষায়, ভেতর থেকে ইশারা এলেই বেজে উঠবে তাদের ঢাকঢোল। গৃহে রাজা-রানি অশান্তচিত্তে পায়চারি করছেন, বাজনা না শুনে ঘুমাতে যেতে পারছেন না।

    রাত্রি প্রথম প্রহর চলে গেল। কোনো শব্দই ভেসে এল না পর্দার আড়াল থেকে। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর চলে গেল। একই রকম নিঃশব্দে। তৃতীয় প্রহর চলে গেলেও তাদের আশা পূর্ণ হল না। হতাশ সাক্ষীরা হাল ছেড়ে দিয়ে নিজেরাই ঘুমিয়ে পড়ল। নথির খাতায় লেখা হল, রাজকন্যার যেভাবে জন্ম হয়েছিল, এখনও সে সেই রকমই আছে।

    অসুখী রাজপরিবার নিজেদের প্রবোধ দিতে ভেবে নিল হয়ত রাজপুত্র বিয়ের এত আচার-অনুষ্ঠানে ক্লান্ত, সেজন্যেই বিয়ের রাতে ধকল নিতে পারেনি। কিন্তু দিন-মাস-বছর গড়িয়ে গেল, তাদের বিছানার চাদরে কোনো দাগের দ-ও দেখা গেল না। রাজপ্রাসাদের আনাচে-কানাচে ফিসফিসানি শোনা গেল, রাজপুত্র সমকামী, দেখিস না ওর সমস্ত বন্ধুগুলোই তাই!

    তখনও স্পেন রাজ্য সৃষ্টি হয়নি। কাস্তিল, লিয়ন, অ্যারাগন, গ্যালিসিয়া, ভ্যালেন্সিয়া নামে ছোট ছোট কিংডমে বিভক্ত ছিল সেই ভূখণ্ড। সবাই প্রভুত্ব করতে চায় এ ওর ওপর। রাজার উপযুক্ত উত্তরাধিকারী না থাকলে চলবেই না, সে রাজ্য কেড়ে নিতে চাইবে পাশের কিংডমের কিং। হেনরির পুত্রসন্তান না জন্মালে কাস্তিলের মহা দুর্দিন। তেরো বছর পেরিয়ে গেল তার বিয়ের, এখনও তার বৌ ব্ল্যাঙ্কার একটাও বাচ্চা হল না। এ তো চলতে দেওয়া যায় না। রাজপরিবারে নাক গলালো চার্চও। টলেডোর আর্চবিশপ বললেন, এ বিয়ে বৈধ নয়, কেননা ব্ল্যাঙ্কা সম্ভবত এখনও কুমারী। তাকে পরীক্ষা করে দেখা হোক। সতীত্ব না গেলে আবার বিয়ে কী!

    শ্রদ্ধেয়া ধাইরা ব্ল্যাঙ্কাকে পরীক্ষা করে নিদান দিলেন, ব্ল্যাঙ্কার শরীর অপাপবিদ্ধা, তার জন্মদিনে সে যেমন ছিল, এখনও তাই। বিয়ে ভেঙে গেল। ব্ল্যাঙ্কাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল। বাবা ক্রুদ্ধ সাপের মত ফোঁসফোঁস করে উঠলেন, হতচ্ছাড়া নিকম্মা, একটা যুবককে পুরুষ বানাতে পারলিনে!

    ডাক্তাররা পরীক্ষা করলেন হেনরিকেও। পরীক্ষার ফল এই রকম – শ্রীল শ্রীযুক্ত রাজপুত্র বাবাজির মিলনযন্ত্রটি একটু অদ্ভুত। তার গোড়ার দিকটা অতিশয় কৃশ এবং মুণ্ডদেশ অতিশয় স্থূল। এর ফলে যন্ত্রটি দৃঢ় হতে অসমর্থ। সে কথা জেনে গেল সব্বাই। হেনরির নাম হয়ে গেল হেনরি দ্য ইমপোটেন্ট।

    কিন্তু কাস্তিলরাজ তা মানলেন না। তার ছেলের মত মুশকো জোয়ানের এ অবস্থা হতেই পারে না। নিশ্চয় ব্ল্যাঙ্কারই দোষ। তাকে নিশ্চয় হেনরির পছন্দ হয়নি, তাই তার ইচ্ছে জাগেনি। অন্য একটা বৌ ধরে আনলেই এ সমস্যা মিটে যাবে, ঘরে আসবে উত্তরাধিকারী। ১৪৫৪ সালে যেই হেনরির রাজ্যাভিষেক হল, খুঁজে পেতে তার নতুন বৌ করে আনা হল পর্তুগালের রাজকন্যা জুয়ানাকে। ষোল বছরের জুয়ানা উদ্ভিন্নযৌবনা, তার চোখ দীঘির জলের মত কালো, মাথায় একঢাল ভ্রমরকৃষ্ণ চুল, উজ্জ্বল যৌবনের দীপ্তি তার ত্বকে। সে তন্বী, চঞ্চলা, আকর্ষণীয়া, আবেদনময়ী।

    নিজেকে মেজেঘষে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সুগন্ধী আতর গায়ে ঢেলে স্বামীর পাশে দাঁড়াতেই তার গায়ে ঘোড়ার পূরীষের দুর্গন্ধে তার তো বমি হওয়ার জোগাড়। বিয়ের পর তাদের নিয়ে যাওয়া হল ব্ল্যাঙ্কার মতই শয্যাগৃহে। তার আগে সান্ধ্যভোজে হেনরিকে খাওয়ানো হল সে যুগের বিখ্যাত অ্যাফ্রোডিসিয়াক – শজারুর কাঁটাচূর্ণ মিশ্রিত ষাঁড়ের অণ্ডকোষের স্যুপ। হেনরি এবার আর সাক্ষী-প্রহরী-ঢোলক কাউকেই তার শয্যাগৃহের ধারেকাছে আসার অনুমতি দিলেন না। কিন্তু তাতেও বিশেষ পার্থক্য হল না। রাজবাড়ির খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হল – রাজা-রানি রাজশয্যায় শয়ন করলেন। রানি তেমনই সম্পূর্ণা রইলেন, যেমন রাজবাড়িতে এসেছিলেন।

    হেনরিও অতদিনে অধৈর্য হয়ে উঠছে। তার বয়স হচ্ছে, তার চেয়ে ছাব্বিশ ও চব্বিশ বছরের ছোট সৎ বোন ইসাবেলা ও তার ভাই আলফন্সো বড় হচ্ছে। হেনরির বাচ্চাকাচ্চা না হলে রাজ্যের গদি চলে যাবে ওদের কারও হাতে। রাজা হলেই পরবর্তী উত্তরাধিকারীর নাম প্রচার করা নিয়ম, কিন্তু তার তো উত্তরাধিকারী জন্মাচ্ছেই না।

    বাচ্চার প্রয়োজনে হেনরি যা করল, তা অতি অনুপম। এক বৈদ্য তার সমস্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে বহু পরিশ্রমে অতিকষ্টে হেনরির স্রাবযন্ত্র থেকে কয়েক ফোঁটা জৈব তরল সংগ্রহ করতে সমর্থ হলেন। সেই তরলের বিবরণে নিজস্ব নথিতে লিখলেন – অতিশয় লঘু, জলবৎ। রানি জুয়ানাকে বিছানায় শুইয়ে উন্মুক্ত করে তার শরীরের অভ্যন্তরে পশুর প্রত্যঙ্গ দিয়ে বিশেষভাবে নির্মিত এক ড্রপারে করে চুইঁয়ে ঢোকানো হল হেনরির সেই মহার্ঘ লঘু রস।

    রাজা-রানি হেনরি ও জুয়ানা দুজনের পক্ষেই এই পদ্ধতি অত্যন্ত অবমাননাকর হলেও কৃত্রিম গর্ভাধানের এই আদিম পদ্ধতিটির উপর্যুপরি ব্যবহার ঠিক বিফলে গেল না। ১৪৬১ সালে জুয়ানা অন্তঃসত্ত্বা হল। হেনরি তো মহা খুশি, যেভাবেই হোক সে একজনকে মা তো বানাতে পেরেছে। প্রমাণ করতে পেরেছে, সে সক্ষম পুরুষ। রাজবাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে গেল। আসতে চলেছে কাস্তিলের উত্তরসূরী। এ নিশ্চয় ছেলেই হবে।

    তার সমস্ত আশাকে ধূলিসাৎ করে ১৪৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জুয়ানার গর্ভে জন্মাল এক কন্যা। এদিকে রাজপরিবারে আড়ালে আবডালে ফের ফিসফিসানি শুরু হল, ধুর, এই মেয়ে হেনরির না ছাই! জুয়ানার শোবার ঘরে অনেকদিনই দেখা গেছে সুপুরুষ যুবক বেলত্রাঁ ডি লা কুয়েভাকে। সে কি আর জুয়ানার সঙ্গে না শুয়ে এমনিই ফিরে এসেছে? এ মেয়ে তারই।

    মায়ের মতই নবজাতিকারও নাম রাখা হল জুয়ানা, কিন্তু লোকজন আড়ালে তার আসল বাবার নামানুসারে নাম দিল লা বেলত্রানিয়া। দেখা গেল নবজাতিকার মুখ অবিকল ঐ বেলত্রাঁর মতই।

    হেনরির দুর্দিন আর ঘোচে না। সে বুঝে গেল তার বৌ বিপথগামিনী এবং তার পক্ষে বাবা হওয়া অসম্ভব। অনেক দিন ধরে ড্রপার পদ্ধতি ব্যবহার করছে না তারা, কিন্তু জুয়ানা আবারও গর্ভবতী হয়েছে। এখন তার এই ব্যভিচার কারও কাছেই অস্পষ্ট নয়। রাজ্যের নোবলম্যানরা তাকে চাপ দিচ্ছিল ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারীর নাম ঘোষণা করতে। হেনরি চেয়েছিল মেয়ে জুয়ানার ভাবী স্বামীকে সে কাস্তিলের ভবিষ্যৎ রাজা ঘোষণা করবে। নোবলম্যানরা জানে জুয়ানা রাজপরিবারের অবৈধ সন্তান, তারা চায় হেনরির সৎ ভাই আলফন্সোকে। হেনরি উপায় না পেয়ে বললেন, ঠিক আছে, আলফন্সোর সঙ্গেই তবে জুয়ানার বিয়ে হবে। তাহলে দুদিকই রক্ষা পাবে।

    শেষে এ প্রস্তাবও কার্যকর হল না, কেননা আলফন্সো মারা গেল প্লেগে। তার দিদি ইসাবেলাকেই স্বীকার করে নিতে হল কাস্তিলের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হিসাবে। ইসাবেলা বিয়ে করলেন অ্যারাগনরাজ ফার্দিনান্দকে। তাদের যুগ্ম প্রচেষ্টায় শক্তিশালী হল স্পেন। সৎ দাদা হেনরির অবৈধ কন্যা যাতে কোনোমতেই উত্তরাধিকারী হিসাবে ভবিষ্যতে ঝামেলা পাকাতে না পারে, সেজন্যে রাজ্যের নথিতে লেখা হল – হেনরির রানি জুয়ানা বৈধভাবে স্বামীর সেবায় তার শরীরকে ব্যবহার করেনি।

    রাজপরিবারের নথি ঘেঁটে এ রকম কেচ্ছা বিশেষ পাওয়া যেত না অবশ্য। এর সবটুকুই সত্যি না নিজের স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে পরবর্তী রাজ-উত্তরাধিকারী ইসাবেলা এগুলো লিখিয়ে নিয়েছিলেন, তার উত্তর পাওয়া সহজ নয়।


    * * *

    রাজা সপ্তম চার্লস রানি মেরির বদলে রক্ষিতা অ্যাগনেস সোরেলের বা রানি জুয়ানা স্বামী চতুর্থ হেনরির বদলে তার প্রেমিকের সঙ্গে শয্যার্চনা করে যখন ইওরোপের রাজসংস্কৃতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেই পঞ্চদশ শতকের ভারতে তখন চলছে সুলতানি আমল। মুসলমান শাসক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা হিন্দুপ্রধান ভারতবর্ষে প্রাধান্য বিস্তারে খুঁজে চলেছে সংস্কৃতি-মিশ্রণের নতুন নতুন উপায়। হিন্দুসমাজও আগ্রাসী মুসলমান শাসনে পূজার্চনা-বিদ্যার্চনার বহু আশ্রম হারিয়ে দিশেহারা, অথচ ধর্মান্তরিত স্বজাতির সঙ্গে তাদেরও সহাবস্থানের পথ তো খুঁজে বের করতেই হবে।

    সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে বিভিন্ন জনপদে একে একে জন্ম নিতে লাগলেন নতুন মার্গসন্ধানীরা। তাঁদের গলায় প্রেমের গান, তাঁদের মন্ত্রে ভক্তির প্রাবল্য। সে বন্যায় একাকার হয়ে গেল ঈশ্বর ও সাধক।

    দক্ষিণ ভারতে আগেই এই রীতির অগ্রগামী পথপ্রদর্শক ছিলেন সন্ত মাধবাচার্য, পশ্চিমে মহারাষ্ট্রে সন্ত ধ্যানেশ্বর, সন্ত নামদেব। চতুর্দশ শতকে মধ্যভারতে এর বিস্তার ঘটালেন এলাহাবাদে সন্ত রামানন্দ, উড়িষ্যায় সরলদাস ও মার্কণ্ডদাস, অন্ধ্রপ্রদেশে শ্রীনাথ, মহারাষ্ট্রে জনাবাঈ, উত্তরে কাশ্মীরে লল্লা। পঞ্চদশ শতকে দেশের কোণে কোণে একে একে জন্মালেন সন্ত কবীর, গুরু নানক, বল্লভাচার্য, কৃত্তিবাস ওঝা, বিদ্যাপতি, দ্বিজ চণ্ডীদাস, চতুর্ভুজ মিশ্র, শঙ্করদেব, কনকদাস, কুমার ব্যাস, কুমার বাল্মীকি, তল্লপাক আন্নামাচারুয়ুলু, নরসিংহ মেহতা, রাইদাস প্রমুখ। নিমাই তার পূর্ববঙ্গ ভ্রমণশেষে নবদ্বীপে ফিরে যখন প্রিয়তমা পত্নী লক্ষ্মীর মৃত্যুসংবাদে কাতর, তখন রাজস্থানের এক অনামা গ্রামে জন্ম হল মীরাবাঈয়ের। অচিরেই কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে তিনি রাধিকার মত গাইবেন – মীরাকে প্রভু গিরিধারী নাগর ...

    ভক্তিরসের এই অনিন্দ্য স্রোতে মিশে যেতে লাগল মুসলমান সুফী-দরবেশদের ভজনাও। চিশতি, সুহরাবর্দি, কাদিরি, নাশবন্দি ঘরানার মানবিক আকুলতা ছেয়ে ফেলল ভারতবর্ষের এক একটি দরগা, এক একটি খনকা ...

    (চলবে)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ উইকিপেডিয়া ও
  • পর্ব ১১
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)