• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৮ | অক্টোবর ২০২২ | উপন্যাস
    Share
  • ফাল্গুনের গান (৭) : যশোধরা রায়চৌধুরী



    ১৯

    ১৯৬৩ সাল। আশ্চর্য! বেরুল। আশ্চর্য নামটার পাশে, একটা বিস্ময় চিহ্ন জুড়ে দিল অদ্রীশ। সম্পাদক হিসেবে নিজের নাম না দিয়ে রাখল "আকাশ সেন" নামটা। সে বুদ্ধিও তাকে গুরুজনেরা দিয়েছেন। নানা রকম কাজে পরে অসুবিধা হতে পারে। নিজে যে চাকরি করে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। সেই চাকরির জগতে আবার সম্পাদনার ব্যাপার নিয়ে ঝামেলা বাঁধতে পারে। কাগজ দাঁড় করালেই চাকরি ছেড়ে দেবে ভেবেছে।

    শেষ পর্যন্ত সত্যজিৎ রায় লোগো করে দিতে সময় না পেলেও, বিমল দাশের পরিচ্ছন্ন লোগো নিয়ে, জানুয়ারি ১৯৬৩-তে পৃথিবীর আলো দেখল পত্রিকাটি।

    বিজ্ঞাপিত করা হল লেখকদের - "আশ্চর্য!" নতুন ধরনের পত্রিকা। ভারতীয় ভাষায় এ জাতীয় পত্রিকা ইতিপূর্বে প্রকাশ পেয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিটি গল্প হয় বিজ্ঞান নির্ভর। বিজ্ঞানীর বিচিত্র কল্পনা নিয়ে যুক্তিনিষ্ঠ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে লেখা হয় শ্বাসরোধী চমকপ্রদ কল্পকাহিনী। সে কাহিনীর মধ্যে থাকে উত্তেজনা শিহরণ আর অসম্ভব বৈজ্ঞানিক স্বপ্নের রঙিন রূপায়ণ।

    লেখকদের আহ্বান করে আশ্চর্য! অনুরোধ করল এমন লেখা লিখতে, যা বিজ্ঞানাশ্রয়ী হলেও বিজ্ঞান যাঁরা বোঝেন না, তাঁদেরকেও আনন্দ দিতে পারবে। বিদেশি বিজ্ঞান সাহিত্যের সার্থক অনুবাদও গ্রহণ করবে পত্রিকাটি, এ কথাও বলা হল।

    পত্রিকা বছরে বারোটি প্রকাশ পাবে, প্রতি সংখ্যা এক টাকা।

    গোটা পত্রিকায় সম্পাদকের ঝকঝকে মেধা আর তুখোড় রসবোধের ছাপ। হট কেকের মত উড়ে যেতে লাগল কাগজটা দোকান থেকে।

    মাত্র একত্রিশ বছর বয়সের অদ্রীশ যেন একটা যন্ত্রমানবের মত কাজ করতে লাগল। নিজে হেঁটে হেঁটে পায়ের নড়া ছিঁড়ে সে সঠিক দামে কাগজ কিনেছে মির্জাপুর থেকে, ঘাড়ে করে সে কাগজ দিয়ে এসেছে প্রেসে। কলেজপাড়ার প্রেস। কম্পোজিটরকে চা খাইয়ে তাড়াতাড়ি কাজ তুলেছে। এমনকি নিজে কোমর ঝুঁকিয়ে কম্পোজ করাও শিখেছে। কী পিঠ টাটানো কাজ। মোটা কাচের চশমা পরা, পাকাচুল কম্পোজিটর শশীবাবুর সঙ্গে তার এখন খুব ভাব। বই ছাপা বাঁধাই আঠা মেরে শুকনো অব্দি নিজে তত্ত্বাবধান করেছে। এ যেন নিজের সন্তান। তারপর ডিস্ট্রিবিউশন করেছে নিজেই। তার উদ্যম দেখলে অবাক লাগে।

    দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে, কাগজ পাওয়া যেতে লাগল শহর কলকাতার হাওড়া ও শেয়ালদা স্টেশনের উইলারগুলোতে। ট্রেনএর যাত্রীরাও আশ্চর্য! পড়ছেন সাগ্রহে। মফস্বলে চলে যাচ্ছে পত্রিকাটি। কিশোরদের কাছে বিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ের শুকনো কচকচি থেকে এই সব লেখা একরকম নিস্তার। বাবা মাও বিজ্ঞানভিত্তিক পত্রিকা দেখে মানা করেন না ততটা।

    বছর বছর প্রতিটি পুজোর সংখ্যাতে নতুন লেখকদের সঙ্গে সঙ্গে লিখছেন প্রেমেন্দ্র, ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ, লিখলেন সত্যজিৎ রায় লীলা মজুমদাররা। সূর্যর লেখাও ছাপা হল। আর অদ্রীশ নিজে স্বনামে লেখা ছাড়াও, গাদা গাদা অনুবাদ করল নানা বিদেশি গল্পের আর সব জায়গায় নতুন নতুন কলমিনাম ব্যবহার করল। নইলে কেমন দেখায়, সেই থোড় বড়ি খাড়া! সবেতে এক দুটো নাম। রণেন ঘোষ, সেও নিয়মিত লিখল গল্প আর ক'বছর পরে।

    নিজের কোম্পানি ক্যালকাটা কেমিক্যালের থেকে আয়োডিন কম্পাউন্ড, আয়োডিমা আর অ্যান্টিসেপটিক বেনজিটলের বিজ্ঞাপনও এনেছে অদ্রীশ। বাইরে থেকেও অল্পবিস্তর বিজ্ঞাপন পাচ্ছে তারা।

    আসলে এই যুগটাই তো বিজ্ঞাপনের। এখন ধর্মতলার মোড়ে দাঁড়ালে সবিস্ময়ে বালকেরা থেমে যায়। হাঁ করে দেখে বিশালাকার লিপটন চায়ের পট। আলোমালা দিয়ে তৈরি সে পট, চা ঢালছে। আবার থেমে যাচ্ছে। আলোর কারসাজি দিয়ে তৈরি, এও যেন এক টুকরো চলচ্চিত্র! এই যে সত্যজিতের মত বিশাল চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, তারও হাত পাকাবার জায়গা ছিল প্রথমটা বিজ্ঞাপনের জগতই! ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমারের আশি টাকার চাকরি করে ভিশুয়ালাইজার হিসেবেই জীবন শুরু করেন সত্যজিৎ। এ হল ছবির যুগ, ইমেজের যুগ, বিজ্ঞাপনের যুগ।

    ২০

    লেখা হচ্ছে না লেখা হচ্ছে না। লেখা কই? অদ্রীশ হাত পেতেই আছে। সূর্য লিখতে কেন পারছে না। এই ছটফটানির কোন ওষুধ জানা নেই তার।

    সেদিন শুক্কুরবার। রাজাবাজার শেয়ালদা পাড়ায় গিয়ে, নীপুকে রেখে এল বাপের বাড়িতে। আজ সেও আলিপুরে ফিরবে না। যাবে দাদুর কাছে। ভবানীপুরে।

    সেটা অমাবস্যার রাত। নটা বেজে যাবার পর বেরুল সূর্য। আজ কোন কারণে পথের বাতিও সব জ্বলছে না। নিবিড় অন্ধকার। পথে লোকসংখ্যা কমে গেছে। রাতের কলকাতা যেন মায়াবী, অন্য এক বাস্তবতার মত, অজানা রহস্যে ভরা। বাসের অপেক্ষায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে, তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে ফেলে সূর্য হাঁটা দেয়। দক্ষিণমুখী হাঁটে। আপার সার্কুলার রোড পেরিয়ে, নোনাপুকুর পেরিয়ে লোয়ার সার্কুলার রোডে পড়ে।

    সে রাতেই চলতে চলতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য এক দৃশ্য দেখে ফেলে সূর্য। উল্কাপাতের দৃশ্য। গাঢ় কালিঢালা আকাশে একটা সোনালি বিস্ফোরণ হল যেন। স্বর্গীয় ব্যাপার। হ্যাঁ, প্রাচীন যুগে এভাবে ভাবত মানুষ। এখন তো তারা জানে, যে, মহাকাশ থেকে কোন গ্রহাণুর টুকরো এসে আছড়ে পড়েছে কোনভাবে। এ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করতেই বাতাসের অক্সিজেনের উপস্থিতিতে তাইতে আগুন ধরে গেছে আর সেই জন্যই একটা পাথরের খণ্ড এভাবে জ্বলতে জ্বলতে উড়ন তুবড়ি বা রকেট বাজির শোভা নিয়ে নিচে নেমে এসেছে।

    এ দৃশ্য তাকে আনন্দে আপ্লুত করে। একেবারে একা এ অপূর্ব জ্যান্ত ছায়াবাজি বা চলচ্চিত্র দেখেছে, ভেবে পুলকিত হয়। আশ্চর্য, ক্ষণতরে নীপুর কথা মনে হয় না তার। হতেই পারত কিন্তু হয় না। এ মুহূর্তে তার আশপাশে কলকাতার পথচারী, বাসট্রাম ট্যাক্সি, সব অবলুপ্ত। খালি সে আর এই আকাশ, এই মহাবিশ্বের অজানার অন্ধকার চিরে আসা আলো। দূর মহাকাশের থেকে আসা একটা উল্কার টুকরো। কী বিস্ময়।

    বিদ্যুচ্চমকের মত সূর্যর মনে পড়ে যায় অনেক দিনের কথা। তার পড়া একটা দারুণ আগ্রহোদ্দীপক কাণ্ড। আর সঙ্গে সঙ্গে অলৌকিকের বোধে আপ্লুত হয় সূর্য। আরে! এই তো কদিন ধরে সে ঘাড় গোঁজ করে রোজ লেখার টেবিলে বসছিল আর উঠে যাচ্ছিল ব্যর্থ পায়ে। ঘুমোতে যাচ্ছিল অতৃপ্তি নিয়ে। অদ্রীশের কাগজে লেখার ভাল প্লট খুঁজেই পাচ্ছিল না কিছুতেই। প্রথমদিকে দুটো গল্প লিখেছে বটে। কিন্তু নতুন ভাবনা, নতুন আইডিয়া চাই। পরের গল্পটা কী নিয়ে লিখবে ভেবে ভেবে আকুল হয়ে ছিল সূর্য। অথচ এখন যেটা মনে পড়ে গেছে সেটা তো তার খুব জানা বিষয়। তার নিজের লেখাপড়ার ক্ষেত্রেরই জিনিস।

    আজ বাড়ি গিয়েই সে বসে যাবে লিখতে। তার আগে টেনে বার করবে আমেরিকা থেকে সেই যে এক গাদা জার্নাল এনেছিল সেগুলোকে। নামটামগুলো, খুঁটিনাটি তো মনে নেই অত। আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, মগজের কন্দরের ভেতরে যেন আলো জ্বেলে দিল এই উল্কাপাতটা ... মনে পড়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। মারে, কেনটাকি! হ্যাঁ! পঞ্চাশের আশপাশে কেনটাকির মারে অঞ্চলে একটা উল্কাপিণ্ড এসে পড়ে। সেটা পেয়ে রসায়নের আর পদার্থবিদ্যার লোকেদের মধ্যে বেশ একটা শোরগোল পড়ে যায়। উল্কাপিণ্ডের কণাগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পেলেন অ্যারোম্যাটিক হেটেরোসাইকেলস নামে একটা জৈব যৌগকে।

    হইচই বেঁধে গেল কী নিয়ে? এই যে যৌগটা, এটা পৃথিবীর প্রাণীদের মধ্যে প্রচুর দেখা যায়। কিন্তু অন্য গ্রহ থেকে আসা উল্কাতেও এর উপস্থিতি? যৌগটা ছ-টা কার্বন পরমাণু দিয়ে তৈরি ষড়ভুজ শৃঙ্খল একটা। সঙ্গে জোড় বেঁধেছে নাইট্রোজেন আদি মৌল।

    প্রাণীর অস্তিত্ব কি তবে আছে বহির্বিশ্বে? এইসব যৌগের উপস্থিতি কি তাই প্রমাণ করে না? এই ষড়ভুজ শৃঙ্খল দিয়েই তো তৈরি হয় প্রাণীর গঠনের একটা উপাদান নিউক্লিক অ্যাসিড। জীবদেহে প্রোটিন সংশ্লেষ করে যে!

    ফলে বিজ্ঞানীমহলে মহাজাগতিক প্রাণের সম্ভাবনার কথাটা আবার চালু হল। আবার নড়ে চড়ে বসল গোটা বৈজ্ঞানিক ফ্রেটার্নিটি। অন্য আরেকটা গবেষণায় ততদিনে প্রমাণ হয়েছে বৃহস্পতি ও শনির কিছু কিছু উপগ্রহেও আছে অক্সিজেনের ট্রেস।

    এই উল্কা হয়ত তেমনি কোন উপগ্রহের মৃত অংশ, অনেক দিন আগে ছিটকে পড়েছে। এতদিনে তা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে এল।

    উল্টো কথা বলার লোকও উদয় হলেন। অধিকাংশ গ্রহে বা গ্রহাণুতেই আসলে বায়ুমণ্ডল নেই। অক্সিজেন নেই। জীবনের জন্য দরকার অক্সিজেন। সেটা বাদ দিয়ে বিক্রিয়া করে যদি ল্যাবরেটরিতে উৎপন্ন করা যায় এইসব যৌগ?

    কাজ চলছিলই। এবার সামনে এল সে তথ্য। ল্যাবরেটরিতে অ্যামাইনো অ্যাসিড সংশ্লেষ করা হয়েছে। অক্সিজেন ছাড়াই। তার মানে প্রাণের সম্ভাবনা ছাড়াই এ ধরনের প্রোটিন যৌগ প্রস্তুত হয়ে থাকা সম্ভব। ল্যাব কন্ডিশনে যেমন হয়েছে, ওই উল্কাপিণ্ডেও তো নিশ্চয় প্রাণ ছাড়াই কোনভাবে অক্সিজেন ছাড়া জৈব যৌগ তৈরি হয়ে গিয়েছে।

    অক্সিজেন না থাকলে প্রাণ থাকবে না এটা শেষ কথা। সবাই মানেন। তাই বিতর্ক যেটা শুরু হল, শেষ আর হল না। বারে বারেই এই বিতর্ক দানা বাঁধে। এবারে যেটা বেঁধেছিল জৈবরসায়ন তার সঙ্গে বিশেষ ভাবে যুক্ত।

    সূর্য, কল্পবিজ্ঞানী হিসেবে তার গপ্পে যদি ভেবে নেয় যে সেই গ্রহাণুতে সত্যিই প্রাণ ছিল? গল্পে সেটা বানিয়ে তুলতে ক্ষতি কি? দাও না ডানা মেলে কল্পনার! নিজের তৈরি দুই গুর-শিষ্য চরিত্রকে দাও না পাঠিয়ে কেনটাকির প্রান্তরে?

    উত্তেজিত সূর্য একটা লালরঙা দোতলা তিন নম্বর বাসকে হাত দেখিয়ে উঠে পড়ে। ততক্ষণে সে এসে পড়েছে পিজি হাসপাতালের মোড়ে। কোথা দিয়ে সময় চলে গেছে। কয়েক মাইল স্বপ্নতাড়িতের মত এতক্ষণ ভাবতে ভাবতে কীভাবে এতটা পথ হেঁটেছে কে জানে।

    গল্পের আইডিয়াটাকে সযত্নে বাঁচিয়ে এনে, বাড়িতে ঢুকেই টেবিল ল্যাম্পের হলদেটে আলোর বৃত্তে খাতাখানা রেখে সে ফাউন্টেন পেনে সুলেখার ব্লু ব্ল্যাক কালি ভরে নিল। তারপর খাতায় নিব ঠেকিয়ে ধ্যানস্থ হয়ে গেল যেন। এটাই হবে আশ্চর্য! -তে তার তৃতীয় গল্প।

    ২১

    আরে, এস সমর, এস! আরে, সঙ্গে কারা?

    সমর লাজুক লাজুক মুখে ঢুকে এল। সঙ্গে দুটি মেয়ে। পাতলা ছিপছিপে, হাসিমুখ। বিনুনি পিঠের ওপর ছড়ানো, এই মেয়েটি শাড়ি পরা, বয়স কত? বড়জোর উনিশ কুড়ি হবে। দ্বিতীয় মেয়েটি ফ্রক পরা। হিলহিলে গড়ন। অনেক ছোট। স্কুলবালিকা।

    এই যে, রত্না আর রমা। আমার গ্রামের মেয়ে। আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। রত্না খুব ভাল পড়াচ্ছে বাচ্চাদের। আর রমা গান করে দারুণ।

    সমর বহুদিন পরে এসেছে আজ। এখন সে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পাশে এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়েছে। একটা দোকানের ওপরে। দোকানের কিছু কাজ করে দেয়। খাতা লেখার কাজ। তাছাড়া ক্রান্তি আর তরুণ তীর্থের প্রুফ দেখা, ছাপাবার কাজ তো করেই। বার বার কুলতলি, জয়নগর, সোনারপুরে বিস্তৃত তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য ছুটে ছুটে যেতে হয় সেখানেও। এই মেয়েরা তার কমরেড। দুই বোন। দুজনেই তরুণ তীর্থের কাজে জান লড়িয়ে খাটে।

    সূর্য সকালের ঝকঝকে রোদে বারান্দায় মোড়া পেতে বসেছিল। দাড়ি কামাচ্ছিল খবরের কাগজখানা মাটিতে পেতে।

    সমরকে দেখে আর কটা মোড়া দেখিয়ে দিল সূর্য। ওরা মোড়া টেনে বসল, রত্না ধপ করে মাটিতেই বসে পড়ল। কোন আড়ষ্টতা নেই।

    বৌদি কোথায়, সূর্যদা?

    সমরের মুখে চওড়া হাসি। দাঁত সেই আগের মত ঝকঝকে, মাজা ঘষা লোহাপেটানো শরীর, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ত্বক। লিকলিকে রোগা ভাব একটু কমেছে।

    বৌদি তো তার বাপের বাড়িতে। সন্তানসম্ভবা, তাই... ডেট মাসখানেকের মধ্যে।

    ওহ, ইশ, আমি আবার তরুণ তীর্থের প্রচ্ছদশিল্পীকে দেখাবার লোভ দেখিয়েই এখানে আনলাম দাদা এদের।

    ওহ আমার কোন আকর্ষণ নেই, আমি তো এলেবেলে তাই না?

    সূর্য গমগম করে হাসল, ওরাও। রিনরিনে হাসিতে ভরে উঠল বারান্দা।

    আচ্ছা বৌদির আঁকার সরঞ্জাম কিছু নেই, নাকি? এবাড়িতে?

    হ্যাঁ আছে তো। ওই কোণের ঘরটায় যাও। নীপু ওখানে স্টুডিও করেছিল। এখন অবশ্য আলিপুরেই বেশি জিনিস। তবে দেখে এস, কয়েকটা ক্যানভাস আছে। ইজেলটাও আছে।

    রত্না, রমা এক ছুটে দেখে আসে। একটা স্কেচের খাতাও নিয়ে আসে। সবিস্ময়ে পাতা উল্টে উল্টে দেখে চারকোলের পেন্সিল দিয়ে ঘষে ঘষে আঁকা কিছু রেখা। তাইতে ফুটে উঠেছে স্টেশনে বসে থাকা উদ্‌বাস্তু মা, শিশু, চেয়ারে বসে থাকা বয়স্ক মানুষ, মোড়ায় বসে থাকা সূর্যদাকেও চেনা যাচ্ছে, গায়ের গেঞ্জিটাও কয়েক আঁচড়ে যেন স্পষ্ট।

    একটা কাঠের তক্তা দেখে হাঁ হয়ে যায় রমা। শুকিয়ে শক্ত হয়ে থাকা নানার রঙের ছিটে তক্তাটায়। এটাতেই রং গোলা হয় বোধ হয়! কী দারুণ সব ব্যাপার।

    সূর্য ওর বিস্ময় দেখে খুব মজা পায়। এটাকে বলে প্যালেট। এখানে রং মিশিয়ে মিশিয়ে পছন্দের শেড আনে শিল্পীরা।

    তরুণ তীর্থের প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছে নীপমঞ্জরী। দু রঙে ছাপা হয়। ব্লক বানানো আছে। শুধু এক এক সংখ্যাতে রঙ পাল্টে দেওয়া হয়। এরকম প্রচ্ছদ সত্যজিৎ রায় লীলা মজুমদাররা সন্দেশ পত্রিকাতেও করেছেন। একই ছবি, একেক সংখ্যায় আলাদা রং। কালো রঙের ফাঁকে দুটোমাত্র রং দিয়ে প্রেসে ছাপে। তাইতে যেন মনে হয় কত রঙ ছড়িয়ে যাচ্ছে। আনন্দ ছড়িয়ে যায় আকাশে বাতাসে। দুটো ছেলেমেয়ে ভেঁপু বাজাচ্ছে, এইমাত্র ছবি। নীপুবৌদি এত চমৎকার এঁকেছেন যে জ্যান্ত হয়ে উঠেছে।

    এবারের সংখ্যায় বৌদিকে বলবেন, লেখা দিতে কিছু একটা? আপনার ওই মহাবিশ্বে অভিযানের লেখাটা এবার যাচ্ছে দাদা।

    ও কি আর এখন পারবে? শরীর ভাল নেই মোটে। প্রেমেনজেঠুর কাছে গেছিলে? দিলেন কিছু?

    হ্যাঁ দাদা এইবার যাব। আজই, আপনার এখান থেকে বেরিয়ে। উনি বলেছিলেন ছ আট লাইনের কবিতা অন্তত একটা দেবেন।

    বড় বড় কাঁসার বাটিতে মুড়ি, তেল পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ভেজে পাঠান দিদিমা ভেতর থেকে। চায়ের সঙ্গে ওরা খায়। তারপর কল কল করতে করতে বেরিয়ে যায়।

    ২২

    মায়ের বাড়িতে রাতে শুয়ে কান্না আসে নীপুর। সূর্যকে ছেড়ে থাকার অভ্যেস চলে গিয়েছে। মেয়েটা কুট্টি। একেবারে ছোট্ট। কয়েক মাস হোক, তারপর সে ফিরে যেতে চায় সূর্যর কাছে। কিন্তু কোন বাড়িতে থাকবে? আলিপুরের ফ্ল্যাট বন্ধ আছে। দিদিশাশুড়ির সংসারে যেতে চায় না। মেয়েরা এত কিছু পারল, এত শিক্ষাদীক্ষা। তবু কেন সমাজ এখনো মেয়েদের অপরিচিত বাড়িতে পাঠায় স্বামীর হাত ধরে। ভাল লাগে না ওদের রান্না। ভাল লাগে না ওদের কথা। সূর্যর তো ভাল লাগে। সূর্যর জন্য এত কিছু ছাড়তে হবে তাকে। হচ্ছে। এই যে আঁকা বন্ধ। সূর্যর তো অফিস বন্ধ না। সন্তান তো তাদের দুজনকার। সূর্য তাকে ছেড়ে ভাল থাকছে তো? নাকি তার মন অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে, যাবে? যেমন বিদেশে থাকার সময় সে আমেরিকান মেয়ের প্রেমে পড়েছিল? আবার আপিসের কোন মেয়েটেয়েকে ভাল লেগে যাবে না তো? নীপু এখন সন্তান নিয়ে ব্যস্ত, এই ফাঁকা ফাঁকা অবস্থাটায়? নীপুর মনে দ্বিধা সংশয় খুব কম। পৃথিবীকে সাদাকালো দেখতে চায়। তবু এই একটা লোক তার যাবতীয় দুর্বলতা নিয়ে, কেমন করে জীবনকে অধিকার করল।

    কী হবে তাদের ভবিষ্যৎ? সন্তানের নামকরণ করবে সূর্যই। তিনটে নাম ও ভেবে ফেলেছে। নীপুই ঠিক করতে পারছে না। বিপাশা, বিশাখা, শ্রাবস্তী। বিপাশা ভাল লাগছে নীপুর। হয়ত বিপাশাই রাখবে। ডাকনাম অনেক। কুট্টি, মুনুয়া, গুল্লু...

    ভবিষ্যতের ছবি তার কাছে সুন্দর ও স্পষ্ট ছিল এই সেদিনও। হঠাৎ সেটা ঝাপসা হয়ে, মন অন্ধকার হয়ে আসছে কেন?

    সূর্যও একলা ফিরে আসবে মনোহরপুকুরের বাড়িতে। দিদিমার শরীর ভাল নেই। দাদু মৃত্যুশয্যায়। পুরনো বাড়ির ছাতের দিকে অন্ধকারে সে চেয়ে আছে। আচ্ছা, মেয়েটা বড় হয়ে কেমন হবে? খুব সাধ সন্তানকে সায়েন্টিস্ট করবে। বিদেশেও যাবে মেয়ে। কিন্তু সে তো বড় হলে। এখন তো বড় ছোট্ট। আচ্ছা মেয়ে যখন বড় হবে, তখন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ কমে আসবে তো? গরিব আর বড়লোকের ভেদ? হিন্দু আর মুসলমানের ভেদ? বিপ্লব এলে নাকি সব সমস্যার সমাধান হবে, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা বলে। মন্টুদা কাজ করার কথা বলেন। ওঁরা বলেন, কথায় কথা বাড়ে। পনেরো বছরের এই খেয়োখেয়ির ইতিহাস মুছতে হবে। হিন্দু মুসলমান হানাহানি আজ একটা অতীত। একটা ইতিহাস। একে নিয়ে বার বার আলোচনা করো না। বরং নতুন করে মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো সূর্য।

    বড় হতে হতে তার মেয়েকে সে কত কিছু শেখাবে। বিজ্ঞান, সমাজ, শিল্প… সময় যেন বড্ড কমে আসছে...আজকাল বড় মৃত্যুচিন্তা আসে। কিছুই করা হল না জীবনে। অনেক কিছুর সাধ ছিল।

    সময় বড় কমে আসছে। সময় বড় কম। বার বার সূর্যর আমেরিকার কথা মনে পড়ে।

    কোন একদিন সে আবার ফিরে যাবে। একটা সুদূর স্বপ্নের মত কলকাতার আপিসে সন্ধে বেলা কাজ করতে করতে এসব মনে হয়। মাঝে মাঝে রিষড়াতে ফ্যাক্টরি ভিজিটে যায়। সে রাতটা একা গেস্ট হাউজে থেকে যায়। আর তখনই ভুলে যাওয়া পুরনো গানের মত ফিরে ফিরে আসে তার আমেরিকার ছাত্রাবস্থার দিনগুলির স্মৃতি। সে রোমান্সের খুব বেশি তুলনা নেই।

    সেই যে, আইওয়াতে একমনে ল্যাবরেটরিতে কাজ করা অথবা বন্ধু পিটারের কাঁধে হাত রেখে ব্লুজ শুনতে যাওয়া। তার বাদামি চামড়া দেখে কেমন সহজ আত্মীয়তায় যেন বন্ধু করে নিয়েছিল পিটার। ব্লুজের এর ভরাট গম্ভীর সুরেলা গান, অসম্ভব দৃপ্ত কালোমানুষদের কন্ঠের বেদনার্ত গান, সুর, শুনতে শুনতে এক অজানা পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া যেত। অনুভব করা যেত, এই পৃথিবীতে আছে কাজ করে যাওয়া ঘর্মাক্ত অবহেলিত শোষিত নিপীড়িত কালো মানুষের দল। ওরা কাজ করে। ওরা খাটে। পরিবর্তে পায় না কিছুই। কিন্তু মুখে ওদের হাসি। কালো চামড়া ঝকঝকে সাদা দাঁত কোঁকড়ানো চুল পিটারকে এই শ্বেতাঙ্গদের ঠান্ডা সমাজে সূর্যর বড় কাছের লোক বলে মনে হয়।

    একটা কোন উইকেন্ড-এ, ওরা ঠিক করেছিল বেড়াতে যাবে নিউইয়র্ক। ম্যানহ্যাটানের সুউচ্চ বাড়িগুলি দেখা হল তবে ওর মন কেড়ে নিল অন্য এক রূপ। রাত্রির রূপ।

    পিটারের বন্ধু রবার্ট নিউইয়র্ক শহরের বাইরে নিউ জার্সিতে থাকে। নিউ ইয়র্ক শহরের এক খবরের কাগজের অফিসে চাকরি করে ওরা তার বাড়িতে গিয়ে উঠলো। সেদিন রাতে রবার্ট ওদের নিয়ে গেল নিজের খবরের কাগজের অফিসে। অফিসটা রাত সাড়ে দশটার পরে জমজমাট। রিপোর্টার কপিরাইটার সম্পাদক প্রত্যেকের টেবিল কাগজে কাগজে ভরা। উপরতলায় ছাপাখানার লোকেরা খটখট আওয়াজ করে মেশিনে টাইপ সাজাচ্ছে। সূর্যের উত্তেজনা হচ্ছিল। পরদিন এইসব খবর ছাপা হয়ে বেরোনোর পর কফির পেয়ালায় তুফান তুলবে।

    ওরা সেদিন যখন আবার রবার্টের সঙ্গে ফিরেছিল তখন ভোরের আলো ফুটবে ফুটবে করছে। মোটর-এর হেডলাইট অ্যাভিনিউতে আস্তে আস্তে একে একে নিভে যাচ্ছে। আবছা আলোয় উদ্ধত বাড়িগুলোকে শান্ত পরিচ্ছন্ন ও মসৃণ দেখায়। দিনের ক্রোধ নেই এই সমাহিত নিদ্রাচ্ছন্ন ভোরবেলাকার গোলাপি শহরে। এই সময়ে কাজ সেরে বাড়ি ফিরবার মধ্যে পবিত্রতা আছে সন্দেহ নেই।

    সেই থেকে বড় শহরে গেলে সূর্য রাত্রির রূপ দেখতে চেষ্টা করে। ওসব দেশের শহরের বহু জরুরি কাজ রাত্তিরে সারা হয়। রুটি কেক ফলমূল মাছ-মাংস রাত্রির অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বাজারে আসা-যাওয়া করে। পথ যারা সাফ করে বন্দরে জাহাজ যারা চালু রাখে তারা অনেকেই নিশাচর।

    রাত্রি শহরের মহত্ত্ব বাড়িয়ে তোলে। রবার্টের উঁচু জানালা থেকে দেখা যায় ওই স্ট্যাচু অফ লিবার্টি। আলোয় সাজানো পবিত্র মন্দিরের মতো মনে হয় যেন। ওই যে পাইলট নৌকোগুলো বড় বড় জাহাজদের নদী পেরিয়ে সমুদ্রে গিয়ে দিয়ে আসে, ওদের রেডিও ঘরে গিয়ে বসলে আরেক ধরনের রাত্তিরের কাজের মানুষদের দেখা পাওয়া যাবে। শোনা যাবে - চার নং কথা বলছি ৬ নং শোন! জোহান ভ্যান বার্টলেটকে এগিয়ে দিয়ে ফেরবার পথে এক জাগ কফি নিয়ে এসো, কেমন? ধন্যবাদ!

    বাতাসে ভেসে আসে দূরাগত জাহাজের বাঁশির শব্দ। রেডিওতে শুরু হয়ে যায় জ্যাজ। ঘুম পাড়ানি গান চাই না এখন ঘুম তাড়ানি গান চাই! স্ট্যাটেন আইল্যান্ড থেকে তাকালে এখন দূরে শহরে আলোর মৌচাক দেখা যায় আর শান্ত নির্জন সমুদ্রে জাহাজে আলোর জ্যোতি বুদবুদ।

    নীপমঞ্জরী, ছোট্ট শিশুকন্যা এরা সূর্যকে জড়িয়ে ফেলেছে। কিন্তু নারীর প্রেম, সন্তানের কোমল আঁকড়ে ধরা আঙুল, এসবের পরও এক চিরপথচারী দূরাকাঙ্ক্ষী নিজের ভেতরে আছে, টের পায় সূর্যশেখর। তাকে মুক্তি দিতেই তো লেখার চেষ্টা তার যা কিছু। আর সে লেখাতেও তাই বার বার ফিরে আসে আমেরিকার কথা। আর আসে, দেশ-বিদেশের জার্নালে পড়া সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের নানা প্রয়োগ, নানা তত্ত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মানুষের বিজ্ঞানের অগ্রগতি যে হারে ঘটেছে তা বাকি অন্য কোন সময়ের সঙ্গে তুলনীয় না। ধ্বংসের জন্য অনেক নতুন সৃষ্টি হয়েছে সে সময়ে। যার সুফল ভোগ করতে পারছে আধুনিক মানুষ। সূর্য ভাবে। কীভাবে এসব কথা লিখে রাখা যায় তার গল্পে।

    ডিগাউসিং নামক পদ্ধতি ম্যাগনেটিক ফিল্ড নিষ্ক্রিয়করণের জন্য প্রথম ব্যবহার হয় হিটলার বাহিনির বিরুদ্ধে। বিজ্ঞানের এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধারার সাই ফাই সে লিখবে আশ্চর্য পত্রিকার জন্য। ক্যুগেল ব্লিৎস। নামটা কেমন?

    খবরের কাগজের আপিসে কাজ করে আনন্দ বাগচি, ওর সঙ্গে দেখা করবে একদিন, এর ভেতরেই সূর্য। কাগজের অফিসের সন্ধে বেলার গন্ধটা বড্ড মনকাড়া লাগে। ভারত এই সময়ে একটা সন্ধিক্ষণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ষাটের দশক শেষ হবার আগে বিক্ষুব্ধ উত্তাল পৃথিবীটা কিছু নতুন বিস্ময় দেখবে... আনন্দ এসব ভেতরের খবর ওকে দিতে পারবে নির্ঘাত।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)