• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share
  • তিন বাঁক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা (২) : রাহুল মজুমদার
    পর্ব ১ | পর্ব ২


    মারিয়া: ঘোরাঘুরি

    দুপুরের বিশ্রামটা ঠিক জমল না; অবশ্য তেমন আশাও বুড়োবুড়ির ছিল না। দুটোয় লোকাল রথ দোরগোড়ায়। বুড়োবুড়ি রেডি হয়েই ছিল, নাচতে নাচতে রথে চাপল। এ বেলা বুড়োবুড়ির যাকে বলে ‘সাইড সীন’, ইয়ে, মানে সাইট সীয়িং। রথ গোটা চারেক বাঁক পেরোতেই পথের দু ধারে রঙিন ফুলের মতো মারিয়া বস্তি। মারিয়া বাজারে আজ হাট বসেছে। কত রকমের পসরা নিয়ে পসারীরা বসেছে। শহুরে চোখ ধাঁধানো জিনিসপত্র নয়, অতিসাধারণ প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় সাদামাটা পসরা। ক্রেতারাও সরল সাদাসিধে। দরদাম চলছে, কিন্তু তাতে মনোমালিন্যের আঁচ নেই, হাসিমুখেই চলছে বিকিকিনি। হাসিমুখেই বুড়োবুড়ির রথকে যাওয়ার পথ করে দিল সকলে। বাজারের কোলাহল মিলিয়ে গিয়ে যাত্রার সাথী হল পাখির গান। সারথির কথায় — বুড়োবুড়ি এখন একটা চার্চ দেখতে চলেছে; অনেক বয়েস সেই চার্চের। শুধু পাখির ডাকে ভরা দু’পাশে ছোটো ছোটো গাছের রেলিং দেওয়া চড়াই পথটা এনে ফেলল ফুলগাছে ঘেরা সবুজ ঘাসের এক চত্বরে। সামনে একটা সাধারণ দেখতে চার্চ। পুরোনো যে, দেখলেই বোঝা যায়। সংস্কারের কাজ চলছে। ডানদিকে একটা লম্বাটে বাড়ি, সেটা নাকি এই চার্চের রেসিডেনশিয়াল স্কুল। সব তথ্যের যোগানদার আমাদের সারথি। এগিয়ে এলেন একজন স্থানীয় মানুষ; উনি এখানকার দায়িত্বে আছেন। উনি জানালেন, চার্চের নাম বিজয়ারানী গির্জা। এই ক্যাথলিক চার্চের বয়েস নাকি ১৩৫ বছর! প্রথমে নাম ছিল নাকি সেন্ট মেরি চার্চ। মাতা মেরির নামেই নাকি এই বসতির নাম মারিয়া বস্তি। সঙ্গের স্কুলের নাম সেন্ট মেরিজ প্রাইমারি স্কুল। ভদ্রলোক বুড়োবুড়িকে নিয়ে চললেন চার্চের ভিতর। উনি জানালেন অন্দরের খানিকটা অংশ বাড়ানো হলেও বেশির ভাগটাই ১৩৫ বছরের প্রাচীন। অল্টারের কাঠের অনেকখানি খুব পুরোনো হয়ে যাওয়ায় সেগুলো বদলানো দরকার হয়ে পড়েছে। ভক্তদের প্রার্থনায় বসার কাঠের বেঞ্চিগুলোর প্রথম কয়েক সারি সেই ১৩৫ বছর প্রাচীন। দেওয়ালের যীশু, মাতা মেরি, যোসেফের ছোটো মূর্তিগুলো, কাঠের প্যানেলের কাজ ১৩৫ বছর পরেও নতুনের মতো ঝকঝকে।

    এই চার্চের প্রতিষ্ঠাতা ফরাসি পাদ্রী ফাদার এম. হার্ভাগল্ট। উনি ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্স থেকে এসেছিলেন, প্রথমে পেডংয়ে, তারপর ১৮৯১তে এখানে এসে স্থাপনা করেন এই চার্চের। আমৃত্যু (১৯৩৬) এখানেই থেকে যান। ওঁর মৃত্যুর পর চার্চের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়। তখন একজন স্থানীয় ভুটিয়া ভদ্রলোক চার্চে সংযোজন করেন। ওঁর মায়ের নামেই নাকি তখন এই চার্চের নাম হয় বিজয়ারানী গির্জা। সংস্কারের সময় বেশ কিছু গজাল বদলাতে হয়েছে তারই গোটা দুয়েক বুড়োবুড়িরও দেখার সৌভাগ্য হলো। এ ক শো পঁ য় ত্রি শ বছরের পুরোনো জিনিস হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার শিহরণ আজ গোটা দিনটা থেকে যাবে। বুড়োবুড়ি যেমন এমন প্রাচীন গির্জার দেখা পেয়ে হাঁ হয়ে গিয়েছিল, তেমনই ওখানকার কয়েক জন ছাত্রছাত্রীও এই দুই আজব চীজকে হাঁ করে দেখছিল। তবে একসঙ্গে ছবি তোলার সময় মুখগুলো অল্প হাসিহাসি হল।

    চার্চ দেখে নেমে আসার সময় দেখা গেল হাট ভাঙার মুখে। রথ কিন্তু হোম স্টে-র দিকে ফিরল না, উল্টোদিকে গড়াল। সারথি জানালেন, গন্তব্যের নাম বেন্দা; পথে পড়বে কাগে গ্রাম। গাছের টানেলের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ গাছপালারা সরে গিয়ে একটা গ্রামকে জায়গা করে দিয়েছে। সামনের মাঠটায় কোনও কিছুর আয়োজন চলছে। সামনে একটা অস্থায়ী ছাউনিতে রান্নার আয়োজন হচ্ছে। ছোটো বাচ্চারা রঙচঙে জামা পরে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। ভালো করে দেখার আগেই হুশ করে আবার গাছের টানেলে। পথ ক্রমশ নেমে চলেছে। নামতে নামতে বুড়োবুড়ি (সুয্যিঠাকুরও নেমে চলেছেন) নদীর শব্দ শুনতে পেল। নদী যত কাছে আসতে লাগল, দু-একটা করে বাড়ি চোখে পড়ছে। শেষ বাঁকটা পথটাকে নিয়ে ফেলল একটা লোহার ব্রিজের ওপর ব্রিজে চড়ে পথ নদী পেরিয়ে ঢুকে পড়ছে সিকিমে। এইপারে পশ্চিমবঙ্গ আর ওইপারে সিকিম, মাঝখানে মুডুম খোলা ওই বয়ে যায়। দু পারের প্রকৃতি একই রকম, অথচ রাজ্য দুটো!

    বেন্দা থেকেই ফেরার শুরু। কাগেয় এসে রথের চাকা থামল; সেই উৎসব উৎসব গ্রামটা। ছাউনিতে চা পাওয়া গেল, আশ্বাস পাওয়া গেল, দশ মিনিটে গরমাগরম মোমোও মিলবে। মাঠের দুদিকে দুটো মাইলস্টোনের মতো কাঠের পাটা। দুটো দল দুদিকে তৈরি। কেন, সেটার হদিশ পাওয়া গেল, মোমো বানানো দিদিদের কাছে। এক্ষুণি শুরু হবে ডার্ট (dart) গেম। টিপ করে ডার্ট ছুঁড়ে মাঠের ও প্রান্তে রাখা ওই কাঠের পাটায় লাগাতে হবে। লাগছে কমই, তবে বেশিরভাগই কাঠের পাটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। অতদূর থেকে স্রেফ হাতের জোরে এমন লক্ষ্যভেদ! শাবাস। যতক্ষণ পারা গেল, বুড়োবুড়ি দেখতে থাকল।

    বী-হাইভে ফিরতে ফিরতে আঁধার এসে আকাশে নিজের কালো চাদরটা বিছিয়ে দিয়ে রাজত্ব কায়েম করতে ব্যস্ত। আজকের আশ্চর্য অভিজ্ঞতা অনেক দিন বুড়োবুড়ির মনে বাসা বেঁধে থাকবে।




    অলংকরণ (Artwork) : স্কেচঃ লেখক
  • পর্ব ১ | পর্ব ২
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments