




বিষ্ণু দে-র কবিতার ভাষা-নির্মাণে বিভিন্ন ধরনের নামশব্দ অর্থাৎ প্রপার নাউন নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা গিয়েছিল এই ধারাবাহিক নিবন্ধের প্রথম কিস্তিতে। আগেই বলা হয়েছে, বিষ্ণু দে-র লেখায় প্রপার নাউন-এর বহুবিধ বৈচিত্র্য ধাবিত হয়েছে একাধিক পথে — স্থাননাম, ঐতিহাসিক ব্যক্তিনাম, শিল্প ও স্থাপত্যকীর্তির নাম। কিন্তু পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য পুরা-কথা থেকে গৃহীত নামগুলি পাঠকের কাছ থেকে সর্বাধিক শ্রম দাবি করে। কারণ এক-একটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরা-কাহিনির বিভিন্ন ঘটনা ও কথাবৃত্ত। সেগুলি না জেনে নিলে কবিতায় সেই সব শব্দ প্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা পাঠকের মনে স্পষ্ট হবে না। কবিতা থেকে যাবে আংশিক পঠিত।
‘ক্রেসিডা’ এবং ‘অয়রিডিকে’ কবিতা দুটির নাম গ্রিক পুরা-কথার দুই নারীকে নির্দেশ করে। তাঁদের কেন্দ্র করে যে আখ্যান বিবৃত হয়েছে গ্রিক সাহিত্যে, সেই আখ্যানের সঙ্গে কবিতা দুটি এতই নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত, যে সেখানে সম্পূর্ণ কথাবৃত্ত দুটি না জানলে কবিতা দুটি পাঠ করাই হবে না। এই ধারাবাহিক নিবন্ধের প্রথম ভাগে বিষ্ণু দে-র কবিতায় এই দুই নারীর নাম প্রয়োগের বহুমাত্রিকতা আলোচিত হয়েছে। সব কবিতাতেই অবশ্য এত অবিচ্ছিন্নভাবে গ্রিক মিথোলজির চরিত্ররা কবিতার কেন্দ্রীয় স্থান গ্রহণ করেনি। অনেক কবিতাতেই প্রাসঙ্গিক উল্লেখের সাহায্যে কবিতার উপলব্ধিকে ব্যক্ত করেছেন কবি; যেখানে হয়তো সেই পৌরাণিক নাম না থাকলেও সেই অনুভূতিকে ভাষা দেওয়া যেত। কিন্তু সেই পুরা-প্রসঙ্গটির উল্লেখ থাকায় কবির কাব্য-ভাবনা একই সঙ্গে অর্জন করেছে বহুদেশীয় সাংস্কৃতিক পরম্পরার সংযোগে এক অভাবিত-পূর্ব বিস্তার। গ্রিক পুরা-কথা থেকে এমন কয়েকজন নারী ও পুরুষের উল্লেখ করে বিষয়টি দৃষ্টান্ত-সহ বুঝে নিতে পারি আমরা। প্রথমে পুরাণ-চরিত্রের পরিচয় তুলে ধরা হবে। তারপর সেই চরিত্রের সঙ্গে বিষ্ণু দে-র কবিতাটির প্রাসঙ্গিকতা অনুভব করবার চেষ্টা করব আমরা।
• কাসান্দ্রা/ কাসান্ড্রা/ ক্যাসান্ড্রা : ক্যাসান্ড্রা (Cassandra) চরিত্রটিকে দু-ভাবে পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও ক্যাসান্ড্রা-র আর এক নাম আলেকজান্ড্রা (Alexandra)। তিনি ট্রয় রাজ্যের একজন নারী-পুরোহিত, সূর্য-দেবতা অ্যাপোলো-র প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত। অ্যাপোলো (Apollo) তাঁকে বর দিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করবার ক্ষমতা থাকবে তাঁর; কিন্তু তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে কেউ বিশ্বাস করবে না। ট্রয়-যুদ্ধের সময় ক্যাসান্ড্রা ট্রয় রাজ্যেই ছিলেন; তাঁর সামনেই চলেছিল দশ বছর ব্যাপী এই যুদ্ধ। তাঁর সামনেই ঘটেছিল ট্রয় রাজ্যের ধ্বংস। ট্রয়-যুদ্ধের জয়ী গ্রিক নায়ক আগামেমনন (Agamemnon) ক্যাসান্ড্রাকে স্বদেশে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর রক্ষিতা রূপে। সেই যুগের যুদ্ধে এই রীতি খুবই প্রচলিত ছিল। কিন্তু নিজের প্রাসাদে পদার্পণ করবার সঙ্গেই নিজের পত্নী ক্ল্যুতেমনেস্ত্রা (Clytemnestra) এবং ক্ল্যুতেমনেস্ত্রা-র প্রেমিক ইজিসথাস (Aegisthus)-এর চক্রান্তে আগামেমনন নিজে এবং ক্যাসান্ড্রাও নিহত হন।
‘ইলিয়ড’ কাব্যে ক্যাসান্ড্রা-কে বলা হয়েছে ট্রয়-এর রাজা প্রিয়াম (Priam)-এর কন্যা। তিনি ছিলেন সুন্দরী, প্রশান্ত গাম্ভীর্যময় ব্যক্তিত্ব এবং কুমারী। যখন তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন তখন তাঁর চোখে দেখা দিত আলোর ঝলক। তাঁর শিরে অনেক সময় লরেল পাতার মুকুট থাকত। অ্যাপোলো ক্যাসান্ড্রাকে ভোগ করতে চাইলেও ক্যাসান্ড্রা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। সেজন্যই অ্যাপোলো তাঁকে ভবিষ্যদ্বাণী করবার ক্ষমতা দিলেও বলেছিলেন যে, তাঁর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। কোনও কোনও আখ্যানে বলে হয়েছে ক্যাসান্ড্রা অ্যাপোলো-কে মিলনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করেননি। সেজন্যই অ্যাপোলো ক্যাসান্ড্রা-র প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। ক্যাসান্ড্রা-র জীবন ছিল যন্ত্রণাময় কারণ তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী কেউ বিশ্বাস করত না; তাঁকে মনে করত উন্মাদ। রাজা প্রিয়াম তাঁকে ঘরে বন্ধ করে রাখতেন।
বিষ্ণু দে লিখেছেন ‘কাসান্ড্রা’ নামের কবিতা। কবিতাটি ‘সন্দ্বীপের চর’ (১৯৪৭) সংকলনের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত লিখিত পঁয়ত্রিশটি কবিতার সংকলন। চার স্তবকে রচিত কবিতার প্রতিটি স্তবকে ছয়টি করে পঙ্ক্তি আছে। কবিতাটিতে প্রতিফলিত হয়েছে দুর্যোগের কাল। ‘সন্দ্বীপের চর’ সংকলনের প্রকাশ-সময় লক্ষ করলেই পাঠক বুঝে নেবেন এই দুর্যোগের ব্যাপ্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ১৯৩৯-এ, ১৯৪১-এ হিটলার-এর নেতৃত্বে জার্মানি আক্রমণ করেছে সোভিয়েত রাশিয়া। ১৯৪২-এ ‘ভারত-ছাড়ো’ আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ, তারপর ১৯৪৩-এর মন্বন্তর। গণনাট্য আন্দোলনের উত্তেজনা চলেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তি ১৯৪৫-এ; সেই সমাপ্তির সঙ্গে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের ঘটনা বিংশ শতাব্দীর এক অবিস্মরণীয় ধ্বংস-কাণ্ড। তারপর ১৯৪৬-এ বঙ্গদেশে নোয়াখালি ও কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ১৯৪৭ হল সেই বছর যখন বাঙালি দেশবিভাগের বিপন্নতায় স্বাধীনতার স্বাদও যথার্থভাবে উপভোগ করতে পারেনি। কাজেই ‘কাসান্ড্রা’ বললেই যে বিপর্যয়ের আবহ স্মরণে আসে তার পুঞ্জীভূত উৎস ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৭-এর মধ্যে কবির চিত্তে বেদনা ও যন্ত্রণার উপলব্ধি ঘনিয়ে তুলেছিল — একথা অনুভব করা দুরূহ নয়।
প্রথম স্তবকেই কবি লেখেন — ‘বলো কাসান্ড্রা, এত দুর্যোগ ছিল কোথায়’। এই স্তবকে কাসান্ড্রা-র নামের সঙ্গে ‘সূর্য’ শব্দটিকে যোগ করা হয়েছে। কবি লিখেছেন — ‘সূর্য তোমার হানে আমাদের’। গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোকে সূর্যের সঙ্গে অভিন্ন মনে করা হয়। সেই অ্যাপোলো, কাসান্ড্রা-কে আকাঙ্ক্ষা করলে, কাসান্ড্রা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। সূর্যের ক্রোধে মর্ত্যের মানুষ বিপন্ন — একথা বলতে গিয়ে বিষ্ণু দে ‘সূর্য তোমার’ শব্দ-দুটি প্রয়োগ করেছেন।
কবিতাটির সম্মিলিত কথক-স্বরের উচ্চারক রূপে কবি ব্যবহার করেছেন ‘আমরা’ শব্দটিকে। এই ‘আমরা’ প্রত্যক্ষত ট্রয়-এর সাধারণ নাগরিক। সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় না। যুদ্ধ সর্বদাই সাধারণ নাগরিকের কাছে সংকট হয়ে দেখা দেয়। দ্বিতীয় স্তবকের প্রথমে চার পঙ্ক্তিতে এই সমবেত ‘আমরা’ জানিয়েছে —
আমরা কখনো হেরিনি হেলেন, সে মায়াননে আমরা খুঁজিনি মর্ত্যরূপের ঐশী সীমা,
ইথাকায় কভু কলাকৌশলে কিনিনি নাম তবু কেন মরি ঘরে বসে লোভী ট্রয়ের রণে…।
এই চারটি পঙ্ক্তিতে গ্রিক মহাকাব্যের অনুষঙ্গে হেলেন (Helen)-এর নাম করা হয়েছে। আর করা হয়েছে ইথাকা-র উল্লেখ। বিষয়টি একটু ভাবতে হবে। গ্রিস-এর একটি রাজ্যের অলৌকিক সুন্দরী হেলেন মুগ্ধ করেছিলেন ট্রয়-এর রাজপুত্র প্যারিসকে, প্যারিস (Paris) তাঁকে ট্রয় রাজ্যে নিয়ে আসবার পরিণামে ঘটেছে এই সর্বানাশা ট্রয়-যুদ্ধ। কিন্তু সাধারণ নাগরিকেরা হেলেনকে দেখেনি। ইথাকা (Ithaca) ছিল গ্রিক বীর ইউলিসিস (Ulysses)-এর রাজ্য। যুদ্ধকালে এবং যুদ্ধ-শেষে সমুদ্র-ভ্রমণ-অন্তে সব মিলিয়ে কুড়ি বছর পরে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। এই সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন দেশের রাজন্যবর্গ ইউলিসিস-এর পত্নী এবং ইথাকার রানি পেনেলোপি (Penelope)-কে অধিকার করবার মানসে এসে সমবেত হয়েছিলেন ইথাকায়। তখন মনে করা হত যে, কোনও রানি একা এবং অবিবাহিত থাকতে পারবেন না। রানি পেনেলোপি কৌশল করে তাদের ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, বিবাহের জন্য তিনি যে পোশাক বুনছেন তা শেষ হলেই বিবাহ হবে। কিন্তু প্রতি দিন যেটুকু বুনতেন, তা খুলে দিতেন প্রতি রাতে। এই রানি পেনেলোপি সেই সময়ের স্বামীর প্রতি বিশ্বাস এবং একনিষ্ঠা রাখবার শক্তিতে গ্রিক পুরা-কথায় এক অনন্য চরিত্র। কিন্তু ট্রয়-এর নাগরিকেরা বলে, তারা হেলেনকেও জানে না, পেনেলোপিকেও নয়। তাহলে কেন তারা এই দুর্ভাগ্যের অংশ-ভাক্?
পরবর্তী দুটি স্তবকে খুব সাধারণভাবে কবি বলেছেন, ‘রাজরাজড়ার বাজারে’ সাধারণ মানুষের কোনও দাম নেই। একথা মহাকাব্যের যুগে যেমন সত্য, তেমনই সত্য চারের দশকের ভারতে। তৃতীয় স্তবকের প্রথম পঙ্ক্তিতেই বলা হয়েছে — ‘উন্নত দেশ নই কোনোদিন, দিন আনি খাই’। এই বাক্যে পুরাকালের ট্রয় আর চারের দশকের ভারতীয় বাঙালির সংকট একই থেকে গেছে, তা হল — শাসকদের স্বার্থরক্ষায় সাধারণ মানুষের বিপন্নতা। এই কবিতায় কাসান্ড্রা-কে স্মরণ করা হয়েছে সেই অমোঘ বাণীর ঘোষক-রূপে, যেখানে ‘সর্বনাশ আসন্ন’ একথা উচ্চারণ করা সত্ত্বেও মানুষ তার প্রতিষেধক জানে না বলে অগত্যা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর মর্যাদা দিতে তারা অক্ষম।
‘কাসান্দ্রা’ নামে বিষ্ণু দে-র আর একটি কবিতা আছে — ‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার’ (১৯৫৩) সংকলনের। এখানে কবি বানান লিখেছেন ‘কাসান্দ্রা’। এই কবিতায় কাসান্দ্রা-র উল্লেখ কেন করা হয়েছে, তা খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাত নয়। কবিতার কথক কে তা-ও সহজে বোঝা যায় না। কখনও মনে হয় এই কবিতায় অনেক যুদ্ধের অনেক বিপন্ন নারীর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। পাঁচ স্তবকের কবিতা। মিশ্রবৃত্ত ছন্দ। প্রতিটি স্তবকের পঙ্ক্তি সংখ্যা সমান নয়; যথাক্রমে ৭, ১০, ১৩, ৪, ৩। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে ট্রয়-এর পরাজয় ও ধ্বংসের চিত্র আছে। যেমন অ্যাপোলো-র রথের চাকায় বাঁধা হেক্টরের মৃতদেহ; যেমন ট্রয়-যুদ্ধের শেষ লগ্নে বিশাল কাঠের ঘোড়া — যার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে গ্রিক সেনাবাহিনী রাত্রে উৎসব-মত্ত ও অপ্রস্তুত ট্রয়বাসীকে হত্যা করেছিল। ট্রয় রাজ্যের আর এক হতভাগ্য নারী — হেক্টর-পত্নী আন্দ্রোমাখে। যুদ্ধে স্বামী-পুত্র হারানো এই নারীর উক্তি হতে পারে এই কবিতা। আবার শেষ স্তবকের শেষ পঙ্ক্তি হল — ‘অজেয় আমার আলুলিত বেণী, যুগান্তে সংহতি’। ‘আলুলিত বেণী’ বললেই ভারতীয়দের মনে দ্রৌপদী-র স্মৃতি জাগে। মহাভারতের যুদ্ধে দ্রৌপদীরও ঘটেছে অবর্ণনীয় অসম্মান। এক রাত্রে পাঁচ পুত্রের হত্যা সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে। কিংবা হতে পারে, এই কবিতার কথক একজন নন। যে কোনও যুদ্ধেই নারীর দুর্ভাগ্য পুরুষের চেয়ে তীক্ষ্ণতর। হয়তো তেমন বিভিন্ন নারীর উক্তি সম্মিলিত হয়েছে এই কবিতার কথকের স্বরে। আবার এমনও হতে পারে ‘কাসান্দ্রা’ এখানে স্বগতোক্তি করে নিজেকেই সম্বোধন করেছে। দ্বিতীয় স্তবকের কয়েকটি পঙ্ক্তির সাক্ষ্যে এই সম্ভাবনাও থেকে যায়। প্রথমেই দ্বিতীয় স্তবকের চারটি পঙ্ক্তি দেখে নেওয়া যাক —
কাসান্দ্রা ঘুরি অতন্দ্র পথে পথে অলিতে গলিতে পিতা প্রিয়ানন্ ছায়াময় চোখ ঢাকে
… তবু কাসান্দ্রা তবু কাসান্দ্রা আমি মানিনি তো আমি সূর্যের রাঙা রোখ্।
প্রথম পঙ্ক্তিতে ‘কাসান্দ্রা ঘুরি অতন্দ্র পথে’ হয়তো নিজেকে উদ্দেশ করেও বলা হতে পারে। দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে ‘পিতা প্রিয়ানন্’ বাক্যবন্ধ কিছুটা দুর্বোধ্যই। কাসান্দ্রা-র পিতা ছিলেন ট্রয়-এর রাজা প্রিয়াম। ‘প্রিয়ানন্’ বলবার কারণ বোঝা যায় না। ‘পিতার প্রিয় আনন’ জাতীয় অর্থও বোঝাতে পারে। কাসান্দ্রা-র পিতার পক্ষে কাসান্দ্রা-র ভবিষ্যদ্বাণী মান্য করা সম্ভব ছিল না। ট্রয় ধ্বংস হবে জেনেও যুদ্ধ করতে বাধ্য ছিলেন তিনি, সেজন্যই তিনি ঢেকে রেখেছিলেন নিজের ‘ছায়াময় চোখ’।
দ্বিতীয় পঙ্ক্তি দুটিতে এই সম্ভাবনা আর একটু বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। এখানে স্পষ্টই বলা হয়েছে ‘তবু কাসান্দ্রা আমি’; তারপরে সেই কাসান্দ্রা বলেছেন — ‘মানিনি তো আমি সূর্যের রাঙা রোখ্’। এই দুটি পঙ্ক্তিতে এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের কাসান্দ্রা-রই উক্তি এই পঙ্ক্তি। নিজেই তিনি সম্বোধন করেছেন নিজেকে।
সামগ্রিকভাবে এই কবিতায় বিশ্বের বিপর্যয়-বিপন্ন নারী-সমাজের স্বর শ্রুত হয়েছে মনে করা যেতে পারে।
• আন্দ্রমিদা (Andromeda): প্রাচীন গ্রিস-এ ইথিওপিয়া নামের যে রাজ্য ছিল, তার রাজা সিফিয়ুস (Cepheus) এবং রানি ক্যাসিওপিয়া (Cassiopeia))-র কন্যা ছিলেন আন্দ্রমিদা। ক্যাসিওপিয়া তাঁর কন্যার রূপের গর্বে গর্বিত ছিলেন। এক সময় তিনি বলেন যে, আন্দ্রমিদা সমুদ্র-দেবতা পসেইডন (Poseidon)-এর কন্যাদের চেয়েও সুন্দরী। ক্রুদ্ধ পসেইডন পাঠিয়ে দিলেন সমুদ্র-দানব সিটাস (Cetus)-কে। সিটাস-কে আদেশ দিলেন দেবতা-প্রদত্ত শাস্তি-স্বরূপ ইথিওপিয়া-র সমুদ্র-উপকূল যেন সে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। এই বিপর্যয় থেকে নিস্তার পাবার জন্য ইথিওপিয়া-র রাজা সিফিয়ুস, অ্যামোন নামের পুরোহিতের শরণ নিলে অ্যামোন জানান যে, দেবতার কাছে আন্দ্রমিদা-কে উৎসর্গ না করলে এই শাপমুক্তি ঘটবে না। গ্রিক পুরা-কথার আর একটি মোটিফ এখানে দেখতে পাই — নিরপরাধ কন্যার বলিদান (যেমন ঘটেছিল অ্যাগামেমনন-কন্যা ইফিগেনেইয়ার ক্ষেত্রে)। তেমনই করা হল। আন্দ্রমিদা-কে নিরাবরণ করে সমুদ্র-তীরের এক প্রস্তর খণ্ডে শৃঙ্খলিত রাখা হল। শৃঙ্খলাবদ্ধ আন্দ্রমিদা-কে দেখতে পেলেন পার্সিয়ুস (Perseus)। এখানে পার্সিয়ুস-এর পরিচয় একটু দেওয়া দরকার। গ্রিক পুরা-কথার অন্যতম বীর পার্সিয়ুস ছিলেন দেবরাজ জিউস (Zeus) এবং ডানায়ে (Danae)-র বিবাহ-বহির্ভূত মিলন-জাত পুত্র। ডানায়ে ছিলেন মানবী। গ্রিক পুরা-কথায় প্রায় সর্বত্রই মানবী-গর্ভজাত দেবতাদের সন্তানকে বলশালী এবং ন্যায়বাদী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। তাদের বলা হত ‘টাইটান’। যেমন হারকিউলিস (Hercules), প্রমেথিয়ুস (Prometheus) এবং অ্যাটলাস (Atlas)। যে সময়ে আন্দ্রমিদা-র মৃত্যু আসন্ন, সেই সময় পার্সিয়ুস মেডুসা (Medusa)-র শিরশ্ছেদ করে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। মেডুসা ছিলেন গ্রিক পুরা-কথার তিন প্রধান দানবী-র অন্যতম। তাঁর কেশরাশি ছিল জীবন্ত সর্পের সমাহার। তাঁর ক্রুদ্ধ চোখের দৃষ্টিতে পাথর হয়ে যেত সকলে। দেবরাজ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক এই মেডুসা-কে বিনাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন পার্সিয়ুস। পার্সিয়ুস আন্দ্রমিদা-কে দেখে, তাঁকে মুক্ত করেন এবং বিবাহ করে তাঁকে রানির মর্যাদা দেবার জন্য নিয়ে আসেন গ্রিস-এ। পার্সিয়ুস সমুদ্র-দানব সিটাস-কে মেডুসা-র কাটা মাথাটি দেখিয়ে ভয় দেখান যে, ইথিওপিয়া-র সমুদ্র-উপকূল বিনষ্ট করা থেকে তাঁকে বিরত হতে হবে।
আন্দ্রমিদা-র আখ্যানের আরও একটু অংশ আছে। আন্দ্রমিদা-র সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কাকা ফিনিউস (Phineus)-এর বিবাহ হবে এমন প্রতিশ্রুতি আগে দেওয়া হয়েছিল। বিবাহের সময় ফিনিউস-এর সঙ্গে পার্সিয়ুস-এর সংঘর্ষ বাধে। ফিনিউসও আন্দ্রমিদা-কে দাবি করতে থাকেন। কিন্তু পার্সিয়ুস, মেডুসা-র মস্তকের সামনে দাঁড় করিয়ে ফিনিউস ও তাঁর সঙ্গীকে পরিণত করেন পাথরে। তারপর আন্দ্রমিদা-কে নিয়ে পার্সিয়ুস যান স্বদেশ সেরিফোস দ্বীপে, সেখানে পার্সিয়ুস তাঁর মা ডানায়ে-কে এক অবাঞ্ছিত বিবাহ-বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। তারপরে পার্সিয়ুস যান আর্গোস-এ। পার্সিয়ুস ছিলেন আর্গোস-এর সিংহাসনে প্রকৃত উত্তরাধিকারী। ভুল বোঝাবুঝির ফলে পার্সিয়ুস-এর হাতে মৃত্যু হয় তাঁর পিতামহের। তারপর তিনি আর্গোস-নিকটবর্তী টিরিয়ান রাজ্যের রাজা রূপে বৃত হন। আন্দ্রমিদা এবং পার্সিয়ুস-এর ছয় পুত্র ছিল — প্রত্যেকেই ছিলেন বিশিষ্ট বীর। বীর্যবান পার্সিয়ুস এবং তাঁর অনুগত ও অনুরক্ত পত্নী আন্দ্রমিদা-র কাহিনি গ্রিক পুরা-কথার অনেকটাই অধিকার করে আছে। কোনও কোনও আখ্যানে দেখা যায়, গ্রিক-দেবী অ্যাথেনা আন্দ্রমিদা-কে এক নক্ষত্রপুঞ্জ রূপে আকাশে স্থাপন করেন। সেই নক্ষত্রপুঞ্জের বিন্যাসে ফুটে ওঠে শৃঙ্খলিত আন্দ্রমিদা-র মূর্তি। এই কল্পনাটি যে কোনও দেশের পুরা-কথার বৈশিষ্ট্য। ভারতের কালপুরুষ ও সপ্তর্ষিমণ্ডলের ভাবনাতেও এই কল্পনার প্রক্ষেপ ঘটেছে।
আন্দ্রমিদা-র আখ্যান দীর্ঘকাল যাবৎ পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সাহিত্যে বিশিষ্ট এবং জনপ্রিয়। এক কিশোরী কন্যা নিজের বিন্দুমাত্র অপরাধ ছাড়াই ক্রুদ্ধ দেবতাকে প্রসন্ন করবার জন্য বলিপ্রদত্ত হয়েছিল। এক উদার-হৃদয়ের বীরপুরুষ তাঁর প্রাণরক্ষা করে তাঁকে স্ত্রী-র মর্যাদা দেন। গল্পটির সরল সংবেদনশীলতা দীর্ঘকাল ধরে মুগ্ধ করে এসেছে মানুষকে। আন্দ্রমিদা-কে ঘিরে বহু নাটক, কবিতা, আখ্যান, অপেরা, চলচ্চিত্র এবং চিত্রপট নির্মিত হয়েছে। রেনেসাঁস-পরবর্তীকালে এই বিষয়বস্তু — পার্সিয়ুস-এর হাতে আন্দ্রমিদা-র মুক্তি একাধিক শিল্পরূপে গৃহীত হয়েছে। বিপন্ন তরুণীকে উদ্ধার করেছেন এক বীরপুরুষ — এই কেন্দ্রীয় বিষয়টি পুরুষশাসিত সমাজেও বেশ মনের মতো।
আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত বিষ্ণু দে-র ‘কবিতাসমগ্র’-এর তৃতীয় খণ্ডে সম্পাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং পবিত্র সরকার বিভিন্ন অপরিচিত শব্দের যে টীকা দিয়েছেন, সেখানে আন্দ্রমিদা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা উদ্ধৃত হল — “Andromeda, গ্রিক পুরাণে কথিত ইথিয়োপিয়ার রাজা কেফেউস ও রানি ক্যাসসিওপেইয়ার কন্যা। সমদ্র-দেবতা পোসেইদোনের অভিশাপ একে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, গ্রিক বীর পার্সেউস তা থেকে একে উদ্ধার ও বিবাহ করেন।”
বিষ্ণু দে ‘আন্দ্রমিদা’ নামের যে কবিতাটি লিখেছিলেন, সেটি ‘আলেখ্য’ সংকলনের অন্তর্ভুক্ত। প্রকাশক এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স্; প্রকাশকাল বৈশাখ ১৩৬৫ বঙ্গাব্দ (১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ)। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৮-র মধ্যে রচিত সাতচল্লিশটি কবিতার সংকলন ‘আলেখ্য’।
‘আন্দ্রমিদা’ কবিতাটি পাঠে পাঠককে একটু হতাশই হতে হবে। পুরা-কথায় আন্দ্রমিদা-আখ্যানের যে একাধিক মাত্রা আছে, তার কোনও উল্লেখ এবং প্রাসঙ্গিকতা দুই স্তবকে বিন্যস্ত কবিতাটিতে একেবারেই প্রত্যক্ষ নয়। কবিতার নাম ‘আন্দ্রমিদা’; কবিতার শেষ পঙ্ক্তি হল — ‘নতুন মানুষ নতুন পৃথিবী নতুন সূর্য, আন্দ্রমিদা’। আট ও ছয় পঙ্ক্তির দুটি স্তবকে বিন্যস্ত এই কবিতা কলাবৃত্ত ছন্দে রচিত। কিন্তু কোনও পঙ্ক্তিরই পর্ব-সংখ্যা সমান নয় এবং পর্ব-বিন্যাসে কোনও প্যাটার্ন পরিলক্ষিত হয় না। তবে পর্বগুলি ছয় মাত্রা বিশিষ্ট।
‘আন্দ্রমিদা’ কবিতায় পুরাকাহিনির কোনও প্রসঙ্গ নেই। আন্দ্রমিদা-কে গ্রহণ করা হয়েছে নক্ষত্র-পুঞ্জ রূপে। এই নক্ষত্র-পুঞ্জ কবির অনুভবে অবসাদগ্রস্ত জীবনে আলোকিত আশার সঞ্চার করে — এটুকুই কবিতার বক্তব্য এবং উপলব্ধি। কবিতার কথক ‘আমি’-কে এখানে কবির স্বর বলেই গ্রহণ করা যেতে পারে। যদি সম্প্রসারিত অর্থে ধরি, তাহলে এই ‘আমি’-কে পাঁচের দশকের ভারতের এক নাগরিক, অথবা বিশ্বের যে কোনও মানুষ রূপেও ধরে নেওয়া যেতে পারে। কবিতায় প্রতিভাত হয় যে, এই কথক এককভাবে কবি নিজে হতে পারেন, বাঙালি তথা ভারতীয় নাগরিক হতে পারেন, অথবা বিশ্ববাসী যে কোনও মানুষ হতে পারেন। কিন্তু সেই কথক নিঃসঙ্গ এবং বিষণ্ণ। হয়তো বা দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভাঙন মানুষের ওপর দিয়ে চলে গেছে বলে সেই বিষাদ বহন করছেন কবিতার কথক। তবে কবিতায় বিষণ্ণতার অন্ধকার থেকে কবির আলোক-প্রত্যাশা উচ্চারিত হয়েছে। বিষ্ণু দে-র কবি-স্বভাবে নৈরাশ্য সাধারণত শেষ উপলব্ধি হয় না — তা তাঁর পাঠকেরা জানেন।
তিনি প্রথম স্তবকে অনুভব করেছেন তাঁর চারিদিকে ‘কালো অবসাদ’। কিন্তু কবিতার প্রথম পঙ্ক্তিতেই বলেছেন — ‘তোমার প্রবল হাতে তুলে দিই এই অবসাদ, আন্দ্রমিদা,’। তারপরেই কবিতার প্রায় প্রতিটি পঙ্ক্তিতেই ধ্বনিত হয়েছে আলোর প্রার্থনা। প্রথম স্তবকের শেষ চার পঙ্ক্তি —
উল্কা জাগাও শহরের শবে পাঁচটা-ছটার ট্রাফিকে, তারায় তারায় জ্বালাও জীবন জীবনেরও চারিদিকে
বিদ্যুতে ধাও নিরালম্বেরও পূর্বাপরে আকাশের মতো কালের আবেগে নাক্ষত্রিক চোখে।
নাতি-দীর্ঘ কবিতাটির প্রায় প্রতিটি পঙ্ক্তিতেই এই উপলব্ধি সঞ্চারিত হয়েছে। কবিতার শেষ পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে আগেই।
সব শেষে একটি কথা মনে হয়। আন্দ্রমিদা-র আখ্যান নয়, আন্দ্রমিদা-র হৃদয়কেই স্পর্শ করতে চেয়েছেন কবি। যদিও সেই হৃদয়কে অনুভব করার জন্য আন্দ্রমিদা-আখ্যানের নির্যাসটুকু জানতে হবে। নিরপরাধ বিপন্ন কিশোরী বিপদ থেকে মুক্ত হয়েছিল এক উদার-হৃদয় বীরপুরুষের ভালোবাসায়। তাঁর জীবনের গতি প্রবাহিত হয়েছে আসন্ন বিনাশ থেকে মুক্তির দিকে। তাঁর পরবর্তী অভিজ্ঞতা ছিল জীবন-তৃপ্তিতে পূর্ণ। আকাশে স্থাপিত সেই নক্ষত্র-পুঞ্জ আন্দ্রমিদা-র মধ্যেও সেই আশা আর আনন্দময় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত অনুভব করেছেন কবি।
• প্রসার্পিনা : প্রসার্পিনা (Proserpina) এবং পার্সিফোনি (Persephone) একই দেবীর নাম। পার্সিফোনি গ্রিকদের দেবী; প্রসার্পিনা তারই রোমান সংস্করণ, ল্যাটিন শব্দ। বিষ্ণু দে প্রসার্পিনা নামটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু পার্সিফোনি নামটি প্রাচীনতর। তাঁকে অনেক সময় ‘কোরে’ বা ‘কোরা’ (Kore/ Core) নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। দেবরাজ জিউস (Zeus) এবং ধরিত্রী দেবী দিমিতার (Demeter)-এর কন্যা প্রসার্পিনা। এই দিমিতার ছিলেন শস্য এবং কৃষির দেবী। একদিন কিশোরী প্রসার্পিনা পত্র-পুষ্প শোভিতে প্রান্তরে বিচরণ করছিলেন। তাঁকে দেখে মুগ্ধ হলেন পাতালপুরীর অধীশ্বর হেডিস (Hades), যাঁর অপর নাম প্লুটো (Pluto)। তিনি প্রসার্পিনাকে হরণ করে নিয়ে গেলেন পাতালে। প্রসার্পিনার অনুপস্থিতিতে ধরিত্রী দেবী দিমিতার শোকবিহ্বল হয়ে কন্যার অনুসন্ধান করতে গিয়ে পৃথিবীর মাটিকে শস্যপূর্ণ করে তোলবার এবং ফুল ফোটানো ও ফল ফলানোর কর্তব্য বিস্মৃত হলেন। ফলে ধরিত্রী হল মরুভূমির মতো নিষ্প্রাণ। তখন দেবতারা পরামর্শ করে প্রসার্পিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেন প্লুটোকে। প্লুটো সম্মত হলেন এক শর্তে। তিনি ছ-মাসের জন্য প্রসার্পিনাকে পৃথিবীতে থাকতে দেবেন, বাকি ছয় মাস তাঁকে থাকতে হবে তাঁর (প্লুটো) সঙ্গে পাতালপুরীতে। এই ব্যবস্থাই হল। ফলে পৃথিবীতে ছয় মাস থাকে ফুল-ফল-শস্যের কাল; বাকি ছয় মাস শীতের প্রকোপে প্রকৃতি হয় ফসলবিহীন। এই গল্প স্পষ্টতই কৃষিজীবী সভ্যতার ঋতুচক্রের পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করে। পাতাল-পুরীকে মৃত্যুলোকও বলা হয়েছে।
যেহেতু কৃষি-সভ্যতা বহু প্রাচীন এবং বহু-ব্যাপ্ত; সেই সঙ্গে ঋতুচক্রের আবর্তনের ব্যাপারটিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়ম। সেজন্য পার্সিফোনি তথা প্রসার্পিনা-র চরিত্রকে বিশ্বের বহু দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে লগ্ন হতে দেখা যায়। তাঁকে ঘিরে অনেক ধরনের আখ্যানও আছে। একাধিক আখ্যানে বলা হয়েছে যে, পাতালের রাজা হেডিস বা প্লুটো প্রসার্পিনাকে যথার্থই ভালোবেসেছিলেন এবং তাঁকে বিবাহ করেছিলেন। প্রসার্পিনা প্রথমে বিমুখ থাকলেও পরে তিনিও প্লুটোকে গ্রহণ করেন। পৃথিবীর জীবনচক্র অব্যাহত রাখার জন্যই দেবতাদের প্রার্থনায় তিনি ছয় মাসের জন্য ধরণীতে নেমে আসেন। কোথাও কোথাও, যেমন দক্ষিণ ইতালিতে তাঁকে বিবাহ এবং সন্তান-জন্মের দেবী বলেও গ্রহণ করা হয়। এই দেবীর প্রতীক হল শস্যবীজ, শস্য ঝাড়াই করবার দণ্ড এবং জ্বলন্ত মশাল। বিশ্বের বহু চিত্রকলায়, স্থাপত্যে, ভাস্কর্যে এবং আখ্যানে পার্সিফোনি বা প্রসার্পিনাকে অবলম্বন করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হেডিস তাঁকে হরণ করে নিয়ে যাচ্ছেন — এই বিষয়টি হয়েছে প্রধান।
রোমক-পুরাণে উর্বরতার দেবী লিবেরা (Libera)-র সঙ্গে প্রসার্পিনাকে একত্র কল্পনা করা হয়। রোমক-পুরাণের তিন দেব-দেবী সেরেস (Ceres), লিবার (Liber) এবং প্রসার্পিনা রোমের এক পাহাড়-চূড়ার মন্দিরে অবস্থান করেন। সেরেস হলেন শস্যদেবী, গ্রিক দিমিতার-এর প্রতিকল্প। লিবার পেটার পুরুষ দেবতা, সুরার দেবতা — গ্রিক ডায়োনিসাস-এর সঙ্গে অভিন্ন। লিবেরা-কে নারীর উর্বরতার নিয়ন্ত্রক দেবী বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কোনও গ্রিক প্রতিরূপ নেই। প্রসার্পিনা-আখ্যানে রোমক সংস্করণেও প্রসার্পিনাকে শস্যদেবী এবং পাতাল-রাজ্যের অধিপতি-কন্যা বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে এই দুই আখ্যান অনেকাংশেই অভিন্ন হয়ে গেছে। প্রধানত এই পুরা-কথাবৃত্ত প্লুটো কর্তৃক প্রসার্পিনা-র হরণ, বছরে ছয় মাসের জন্য প্রসার্পিনা-র পৃথিবীতে আগমন এবং ঋতুচক্রের বিবর্তন সংক্রান্ত অনুষঙ্গের সঙ্গেই যুক্ত।
পূর্বোক্ত বিষ্ণু দে-র ‘কবিতাসমগ্র’-এর তৃতীয় খণ্ডের টীকায় প্রসার্পিনা সম্পর্কে বলা হয়েছে — “পার্সিফোনির রোমান নামান্তর। গ্রিক পুরাণ-কথায় দেবরাজ জেউস ও দেমেতার-এর এই কন্যাকে পাতালরাজ হাদেস (প্লুতো) হরণ করে নেবার পর পৃথিবী শস্যহীন হয়ে যায়। দেবতার নির্বন্ধে হাদেস বছরে ছ’মাস তার স্ত্রী পার্সিফোনিকে মায়ের কাছে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়। ঐ ছ’মাস পৃথিবীতে বসন্ত বিরাজ করে, প্রসার্পিনার পাতালে বাস করবার সময়ই হল শীতকাল।”
বিষ্ণু দে, প্রসার্পিনা-র উল্লেখ করেছেন তিনবার। তিন-বারই ‘চোরাবালি’ সংকলনে। ‘চোরাবালি’ কবির দ্বিতীয় কবিতা-সংকলন, ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ‘ভারতীভবন’ থেকে প্রকাশিত। অন্তর্ভুক্ত একুশটি কবিতার রচনাকাল ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
‘চোরাবালি’ সংকলনে একটি কবিতায় প্রসার্পিনা-র নাম আছে। কবিতাটি হল ‘ওফেলিয়া’ (রচনাকাল ১৯৩৩)। শেক্স্পিয়র-এর ‘হ্যামলেট’ নাটকে হ্যামলেট-এর অকালমৃত প্রণয়িনী ওফেলিয়া, হ্যামলেট-এর অযৌক্তিক নিষ্ঠুর আচরণের কারণে আত্মঘাতী হয়েছিল। এই ওফেলিয়াকে সম্বোধন করেই রচিত এই কবিতা। শেক্স্পিয়র-এর নাটকের বিভিন্ন চরিত্র ও প্রসঙ্গ বিষ্ণু দে-র অনেক কবিতায় আছে। কিন্তু এই নিবন্ধে পাশ্চাত্য মিথোলজির চরিত্রগুলিকেই আমরা দেখব। সেদিক থেকে বলা যায়, প্রসার্পিনা-র তেমন গুরুত্ব কবিতাটিতে নেই। ছোটো ছোটো উনিশটি স্তবকে বিন্যস্ত এই কবিতার একটি মাত্র স্তবকে আছে প্রসার্পিনা-র নাম ও প্রসঙ্গ। —
প্রসার্পিনা কুসুমে ছায়, বৈতরণী পাশে ছড়ায় আহা! কোমল নীল ঘুমের আবাহন।
লোলুপ তবু দ্বিধায় কার আবির্ভাব-আশে প্রান্তরের প্রান্তে চায় ভিক্ষু দেহমন।
এই কবিতার কথক সম্বোধন করেছেন ওফেলিয়াকে। সেই কথক হ্যামলেট নয়, কবি স্বয়ং। যিনি ওফেলিয়ার এই শোকাবহ অকাল প্রয়াণে বেদনার্ত। কবিতাটি দুরূহ নয়। ওফেলিয়ার করুণ পরিণামকে সামনে রেখে তিনি বারবার নিজের চারিদিকে এক অন্ধকার এবং বিষাদ-বিদ্ধ সময়কে অনুভব করেছেন। এই উপলব্ধি ঘুরে-ফিরে ব্যক্ত হয়েছে প্রতিটি স্তবকে। পঞ্চম স্তবকে কবি একটি বাক্যে লিখেছেন — ‘রন্ধ্রহীন আর্তনাদে এ আঁধার হেডিসের মতো/ হৃদয় ধরেছে চেপে।’ অর্থাৎ কবির মনকে ভারগ্রস্ত করেছে পাতালের অন্ধকার। কবি বারবার এই কবিতায় শীতঋতুর উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ প্রসার্পিনা তখন রয়েছেন পাতালে। এই ইঙ্গিত আছে কবিতাটি-জুড়ে। তারপরই উদ্ধৃত স্তবকে প্রসার্পিনা-র উল্লেখ। প্রসার্পিনাকে আবাহন করছেন কবি। সে যখন আসবে তখন পৃথিবী হবে কুসুমাস্তীর্ণ। মৃত্যুর স্রোত হবে প্রতিহত। প্রসার্পিনা-র প্রত্যাশায় কবি-কথকের ‘দেহমন’ — ‘প্রান্তরের প্রান্তে’ চেয়ে থাকে। এ কবিতার সরল অর্থ দুঃসময়ের অন্ধকারে, সুসময়ের প্রতীক্ষা। বিষ্ণু দে তাঁর স্বভাব-মতো সাহিত্যিক পরম্পরার বিভিন্ন সংশ্লেষে কবিতাটি রচনা করেছেন। সেই সব উল্লেখের অর্থ আমাদের অবশ্যই বুঝে নিতে হবে; কিন্তু একথাও সত্য যে, সেই সব উল্লেখের সঙ্গে এই কবিতার উপলব্ধি খুব অবিচ্ছিন্ন নয়। আমরা এর আগে দেখেছি ‘ক্রেসিডা’ ও ‘অয়রিডিকে’। কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তির সঙ্গে মিশে আছে ক্রেসিডা এবং অয়রিডিকে-র আখ্যান। এখানে তেমন হয়নি।
অপর একটি কবিতা ‘চোরাবালি’ সংকলনেরই ‘পঞ্চমুখ’। পাঁচটি অংশে বিভক্ত একটি প্রেমের কবিতা। বিষ্ণু দে-র একাধিক কবিতার গঠনে দেখা যায়, প্রথমে বিরূপ সময়, দুর্গম পথ, সংকট-আকীর্ণ জীবনের কথা বলা হয়েছে। অতঃপর কবিতার শেষে সংকট-উত্তীর্ণ মুক্তিতে এবং কখনও বা প্রশান্তিতে নিজের স্থান খুঁজে পেয়েছে কবির হৃদয়। এই কবিতাও তেমনই। প্রথম চারটি অংশে বিপন্নতার বাতাবরণ। সেখানেই কবি একটি পঙ্ক্তি লিখেছেন — ‘প্রসার্পিনার পরশ পাওনি এ মরলোকে’। প্রসার্পিনা-র কথাবৃত্ত জানা থাকলে পঙ্ক্তির অর্থ সরল। ‘মরলোক’ অর্থাৎ পার্থিব জীবন তখন বিশুষ্ক; প্রসার্পিনা-র স্পর্শে তা শস্য-পুষ্প-পল্লবে সজীব হয়ে ওঠে। এভাবেই বিষ্ণু দে বারবার একাধিক পুরাণ-নামকে ব্যবহার করেছেন।
তৃতীয় কবিতার নাম ‘যযাতি’। ছয় পঙ্ক্তি বিশিষ্ট তিন স্তবকের নাতিদীর্ঘ কবিতা। বিষ্ণু দে-র অভ্যাস ছিল একই কবিতায় ভারতীয় পুরাণ এবং পাশ্চাত্য পুরা-কথাকে একত্রে কবিতায় গ্রথিত করা। তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকেই এই লক্ষণ পরিস্ফুট। ‘যযাতি’ কবিতার অর্থ খুব সরল নয়। সম্ভবত কবিতাটি যযাতির অস্থির হৃদয়কেই ব্যক্ত করেছে। ফলে এখানে যযাতি-র আখ্যানই আগে জানতে হবে। যৌবন অতিক্রান্ত হলেও রাজা যযাতি-র ভোগতৃষ্ণা অব্যাহত থাকায় তিনি তাঁর জরা তরুণ পুত্র পুরু-কে প্রদান করে বিনিময়ে তাঁর যৌবন পেতে চেয়েছিলেন। তেমনই ছিল দৈব বিধান। পুরু স্বীকৃত হলে যযাতি-র যৌবন-সুখ বর্ধিত হয়। তাঁর মনের মধ্যে একই সঙ্গে ভোগবাসনা এবং কিছুটা অনুশোচনা মিশে থাকে। এই কবিতায় যযাতি একই সঙ্গে তাঁর যৌবনবাসনার দহনকেও ভোগ করেছেন এবং এই ভোগবাসনার সপক্ষে সন্ধান করেছেন সমর্থন। এখানেই তিনি একটি পঙ্ক্তিতে লিখেছেন — ‘প্রসার্পিনার মুঠিতেও তাই প্রণয়রতি’। প্রসার্পিনাকে বাহুবলে হরণ করেছিলেন হেডিস। প্রসার্পিনা সেজন্য প্রথমে হেডিস-এর প্রতি বিমুখ থাকলেও ক্রমে হেডিস-এর প্রতি অনুরক্ত হন। অর্থাৎ হেডিস-এর ভোগবাসনা থেকেই শেষ পর্যন্ত প্রসার্পিনা-র প্রেম জাগ্রত হয়েছিল। ঈষৎ দুরূহ হলেও কবিতাটি সুলিখিত।
• আর্টেমিস (Artemis) : বিষ্ণু দে-র প্রথম প্রকাশিত কবিতা-সংকলন ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’। কিন্তু আর্টেমিস-এর নাম তাঁর কোনও কবিতায় প্রযুক্ত হয়নি। কবি যখন তাঁর প্রথম কবিতা-সংকলনের নামে এক ভারতীয় পুরাণ-নারীর সঙ্গে আর্টেমিস-এর নাম যুক্ত করেছেন, তখন কবির চিন্তনকে বোঝবার জন্য আর্টেমিস-এর পরিচয় আমাদের গ্রহণ করতে হবে।
গ্রিক ও রোমক পুরা-কথায় প্রায়শই দেখা যায়, একজন দেবতা বা দেবী একাধিক ভাব-কল্পনার দ্যোতক হয়ে ওঠেন। আর্টেমিস-এর ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি ঘটেছে বিস্তৃতভাবে। প্রথমত, তাঁকে অরণ্য-জীবন, বন্যপ্রাণী এবং শিকারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তাঁর রোমক প্রতিকল্পের নাম ডায়ানা (Diana)। তাঁর প্রতীক হল তির-ধনুক এবং জ্বলন্ত মশাল। একই সঙ্গে তাঁকে প্রকৃতি, ফসল উৎপাদন, শিশু-জন্ম, শিশু-পরিচর্যা এবং পবিত্রতার দেবী বলা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, আরও কোনও কোনও দেবীকে জন্ম-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও শিশু-পরিচর্যার বিষয়টি একমাত্র আর্টেমিস-এর ক্ষেত্রে কল্পনা করা হয়েছে। অথচ আর্টেমিস চিরকাল কুমারী ছিলেন।
দেবরাজ জিউস (Zeus) এবং লিটো (Leto)-র কন্যা আর্টেমিস। লিটো ছিলেন টাইটান গোষ্ঠীর এক নারী। তাঁকে এক কোমল-স্বভাব এবং মাতৃত্বের দেবী বলা হয়েছে। তাঁর যমজ সন্তান হলেন আর্টেমিস এবং অ্যাপোলো (Apollo)। জিউস-এর পত্নী হেরা (Hera) ঈর্ষান্বিত হয়ে গ্রিস-এর ভূমিতে নয়, সমুদ্র-বেষ্টিত ডেলোস (Delos) দ্বীপে লিটো-কে সন্তান-প্রসব করতে বাধ্য করেন। গল্পে দেখা যায়, আর্টেমিস প্রথম ভূমিষ্ঠ হন, এবং তারপরে ভাই অ্যাপোলো-র প্রসবের সময় জননীকে সাহায্য করেন। আর্টেমিস-এর এই আচরণ একটি প্রতীক। সব সময় আর্টেমিস-কে শিশু-জন্ম, শিশু-পরিচর্যা এবং বিশেষ করে নারীদের রোগমুক্তির দেবী বলে মনে করা হয়েছে। গ্রিক পুরা-কথায় তিন জন প্রধান কুমারী দেবী আছেন — তাঁরা হলেন অ্যাথেনা (Athena), হেস্টিয়া (Hestia) এবং আর্টেমিস। এই তিন দেবীর ওপর প্রেমের দেবী আফ্রোদিতে (Aphrodite)-র কোনও প্রভাব ছিল না।
আর্টেমিস-কে সাধারণভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং চিত্রিতও করা হয়েছে অরণ্যে ভ্রমণ-রত রূপে, যাঁর সঙ্গে থাকত শিকারি কুকুর। একদা এক শিকারি তাঁর নগ্ন স্নান-দৃশ্য দেখে ফেলায় আর্টেমিস তাকে (শিকারি) হরিণে রূপান্তরিত করেন এবং তাঁর কুকুরেরা তাকে (শিকারি) খেয়ে ফেলে। আর্টেমিস-এর সঙ্গিনী ছিলেন জল ও অরণ্যের উপদেবীরা। আর্টেমিস-এর সঙ্গিনী রূপে তাঁদেরও ছিল কুমারী থাকবার সংকল্প। সেই সংকল্প ভঙ্গ করায় একজনকে আর্টেমিস বিতাড়িত করেছিলেন।
ট্রয়-এর যুদ্ধের সঙ্গে আর্টেমিস জড়িয়ে আছেন বিচিত্রভাবে। যখন গ্রিক রণতরী-বাহিনী নিয়ে আগামেমনন ট্রয়-এর দিকে যাচ্ছিলেন, তখন মধ্যপথে অলিস (Aulis) দ্বীপে তিনি আর্টেমিস-এর দ্বারা রক্ষিত একটি হরিণকে বধ করেন। ক্রুদ্ধ আর্টেমিস তখন হাওয়া চলাচল বন্ধ করে দেন এবং জাহাজের পালে হাওয়া না লাগায় যুদ্ধ-যাত্রা থেমে যায়। আর্টেমিস-কে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলে তিনি আগামেমনন-এর কিশোরী কন্যা ইফিগেনেইয়া (Iphigenia)-কে উৎসর্গ করতে হবে — এই শর্ত রাখেন। কিন্তু একাধিক আখ্যানে দেখা যায় যে, শেষ পর্যন্ত মেয়েটির প্রতি করুণা-বশত, তার জায়গায় একটি হরিণকে রেখে তিনি ইফিগেনেইয়া-কে নিয়ে তিনি চলে যান।
ট্রয়-যুদ্ধে আর্টেমিস ট্রয়-রাজ্যকে সমর্থন করেছিলেন। জিউস-পত্নী হেরা-কে তিনি যুদ্ধে আহ্বান জানিয়েছিলেন। গ্রিক দেবদেবীদের মধ্যে আর্টেমিস অন্যতম প্রধান। তাঁর নামে উৎসর্গীকৃত বিশাল মন্দির প্রাচীন সভ্যতার সাতটি আশ্চর্য স্থাপত্যের একটি রূপে গণ্য হয়। এই মন্দির ইফেসাস (Ephesus) নগরীতে স্থাপিত। আর্টেমিস-এর এই প্রাধান্যের কারণ হল বহু প্রাচীন কাল থেকে তাঁর অস্তিত্বের উল্লেখ আছে। অরণ্য-জীবন যখন পৃথিবীতে প্রধান ছিল, তখন থেকেই তাঁর কল্পনা করা হয়েছে অরণ্যচারিণী এবং অরণ্য-রক্ষয়িত্রী দেবী রূপে। মধ্যযুগের বাংলা চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের চণ্ডীকেও একটি রূপে অরণ্যদেবী বলে কল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন চিত্রে ও ভাস্কর্যে তাঁকে দেখা যায় তির-ধনুক হাতে। তিনি প্রায়শই থাকেন হরিণ, কুকুর; কখনও বা ভাল্লুক এবং চিতাবাঘের সঙ্গে। একই সঙ্গে তিনি যে শিশু-জন্ম ও শিশু-পরিচর্যার দেবী — এটিও সভ্যতার প্রাচীনত্বের সূচক। আর্টেমিস-এর বৈশিষ্ট্য হল তিনি স্বাধীন, মুক্ত এবং পুরুষের অনুগামিনী নন।
উর্বশী আর আর্টেমিস-কে বিষ্ণু দে ঠিক কোন্ কারণে একত্র কল্পনা করেছেন, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। হতে পারে একই সঙ্গে সাদৃশ্য এবং পার্থক্য — দুটি দিক সম্পর্কেই কবি ভেবেছিলেন।
প্রথম সাদৃশ্য হল চিত্তের স্বাধীনতায়। উর্বশী এবং আর্টেমিস কেউই সমাজের পারিবারিক-বৃত্তে অধিষ্ঠিত নারী নন। উর্বশী স্বর্গের অপ্সরী এবং দেবসভার নর্তকী। তাঁর উৎপত্তি ব্রহ্ম-উপাসক নর-নারায়ণের উরুদেশ থেকে হয়েছে বলে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে। তিনি এবং আরও কয়েকজন অপ্সরা দেবসভায় নৃত্য পরিবেশন করতেন। উর্বশীকে অসামান্য রূপসী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘উর্বশী’ (‘চিত্রা, ১৮৯৫)-তে এই নারীকে বলা হয়েছে ‘নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ’। তাঁকে বলা হয়েছে অতীন্দ্রিয় রোমান্টিক সৌন্দর্যের প্রতীক। তাঁকে কেউই আয়ত্ত করতে পারেনি। পুরাণ-কাহিনিতে মাঝে মাঝে কোনও কোনও পুরুষ উর্বশীকে কামনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে রাজা পুরুরবা উর্বশীকে কিছুকালের জন্য স্ত্রী-রূপে পেয়েছিলেন। একাধিক শর্তে উর্বশী পুরুরবার সঙ্গে কিছু দিন বাস করবার পর আবার স্বর্গে ফিরে যান। দেবী আর্টেমিস এবং তাঁর রোমক বিকল্প ডায়ানা-কেও অরণ্যচারিণী, স্বাধীন দেবী রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। উর্বশী এবং আর্টেমিস দুজনের কেউই কোনও প্রেমের বন্ধনে বা কোনও পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত হননি।
কিন্তু অন্যান্য দিক থেকে আর্টেমিস-এর সঙ্গে উর্বশীর সাদৃশ্য নেই। উর্বশী অলৌকিক সুন্দরী, দেবসভার নর্তকী এবং পুরুষের মনোমোহিনী। আর্টেমিস নর্তকী নন; তাঁর রূপের বর্ণনাও প্রাধান্য পায়নি; পুরুষের মুগ্ধতার বৃত্তেও তাঁকে দেখা যায় না।
সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য হল আর্টেমিস নিজে কুমারী হলেও তিনি মাতৃত্ব, শিশু-জন্ম, শিশু-পরিচর্যা এবং বিপন্ন নারীদের সহায়ক রূপে পাশ্চাত্য পুরা-কথায় বন্দিত হয়েছেন। এরপর আমরা ভেবে নিতে পারি — কেন বিষ্ণু দে, তাঁর প্রথম সংকলনের নাম রাখলেন ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’। সম্ভবত তিনি স্বাধীন-চিত্ত এবং সমাজ-শাসন মুক্ত নারীত্বের এক পরিপূর্ণ সর্বায়তিক অস্তিত্বকে তুলে আনতে চাইছিলেন।
অবশ্য এই সংকলনের কবিতাগুলিতে সেরকম কোনও নির্দিষ্ট অভিমুখ অনুভূত হয় না, যেখানে সংকলনের নামকরণের সঙ্গে বিশেষ কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে। কবি তখন তরুণ বয়স্ক। ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ (১৯৩৩) তাঁর প্রথম কবিতা-সংকলন। কবির বয়স তখন তেইশ। এই সময়ের মধ্যেই তিনি পড়েছেন অনেক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পুরা-কথা। তারুণ্যের উৎসাহে সেই অধীত জ্ঞানকে কিছুটা কবিতায় ব্যবহার করবার প্রাথমিক আগ্রহ থাকা সেই তরুণ বয়সে অসম্ভব নয়। লক্ষ করা যায় যে, প্রথম পাঁচ-ছয়টি কবিতা-সংকলনে পাশ্চাত্য পুরা-কথার সাঙ্গীকরণ ঘটেছে বেশি।
আমরা বিষ্ণু দে-র কবিতায় গ্রিক ও রোমক মিথোলজির নারী চরিত্রদের স্বরূপ এবং বিষ্ণু দে-র কবিতায় সেই নারীদের সাঙ্গীকরণ কীভাবে ঘটেছে সেই আলোচনায় কাসান্ড্রা, আন্দ্রমিদা, প্রসার্পিনা এবং আর্টেমিস-এর কথা বললাম। পরবর্তী কোনও সংখ্যায় অ্যাথেনা, ডানায়ে, পেনেলোপি এবং ভেনাস বিষ্ণু দে-র কবিতার ফ্রেম-এ কীভাবে চিত্রিত হয়েছেন, তার সন্ধানের পর গ্রিক-রোমক মিথোলজি-র পুরুষ চরিত্রগুলির দিকে দৃষ্টিপাত করা যাবে।