• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share  
  • পুস্তক সমালোচনা: হিমালয় রূপে রূপান্তরে : তপেন্দ্র কুমার পাল

    হিমালয় রূপে রূপান্তরে (দুই খন্ড); — সম্পাদক- কল্যাণ কুমার নন্দী; প্রকাশক— লা স্ত্রাদা; ; প্রচ্ছদ ; প্রথম প্রকাশ— ; ISBN:

    হিমালয় এই গ্রহের বৃহত্তম পর্বত শ্রেণী। শুধু দৈর্ঘ্যে বা প্রস্থে নয়, বহু বৈচিত্রের সমাহার ঘটেছে এই পর্বতশ্রেণীতে। পশ্চিমে আকশাই চীনের রুক্ষ, শুষ্ক, তৃণহীন পার্বত্য মরুভূমি। আবার পূর্ব দিকে ঠিক বিপরীত চিত্র। অরুণাচলে দুর্ভেদ্য গভীর জঙ্গল, যেখানে সূর্যালোকের প্রবেশও মানা।

    সেই চতুর্থ শতকের মহাকবি কালিদাস তাঁর কুমারসম্ভবে হিমালয়কে দেবতাত্মা হিমালয় হিসাবে বর্ণনা করেছেন। হয়তো তার আগেও কেউ হিমালয়ের বর্ণনা করেছেন। আমাদের জানা নেই। তবে কালিদাস-পরবর্তীকালে অনেকেই হিমালয়কে তুলে এনেছেন তাঁদের লেখায়। অজস্র বই লেখা হয়েছে হিমালয়কে কেন্দ্র করে। বাংলা, ইংরেজি সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায়। উনবিংশ শতকে হিমালয়কে লেখার মাধ্যমে জনপ্রিয় করেছেন সারদা প্রসাদ ভট্টাচার্য, রাজেন্দ্র নাথ বসু, প্রমথনাথ বসু, স্বর্ণকুমারী দেবীর মত লেখক লেখিকারা। সাধারণ মানুষ এঁদের লেখা পড়েই প্রথম হিমালয়কে চেনেন।

    যুদ্ধ, ধর্ম প্রচার, জ্ঞান অর্জন ইত্যাদি কারণে অনেকেই বহু প্রাচীনকাল থেকে হিমালয় পাড়ি দিলেও মূলত বিবরণ রেখার কাজ শুরু হয় সম্রাট আকবরের আমলে ফাদার মন্সেরেটের হাত ধরে। এরপর শুরু হয়েছে মানচিত্র এঁকে পথঘাট চেনানো, হিমালয়ের অন্দরমহলে প্রবেশ, যে এলাকার খোঁজ কেউ রাখেনি সেই এলাকার বিবরণ লিপিবদ্ধ করা, বিভিন্ন গিরিপথ পেরিয়ে হিমালয় ভেদ করে তিব্বতের প্রবেশ ইত্যাদি। আর এই কাজ করতে গিয়েই হিমালয়ের ছবিটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। হিমালয়ের অকৃপণ ঐশ্বর্যের সন্ধান পেয়েছে মানুষ। যেমন জোসেফ ডালটন হুকার হিমালয়ের স্বল্প এলাকা পরিভ্রমণ করে যেসব অজানা, অপরিচিত গাছের সন্ধান পেয়েছেন তার উপরে ভিত্তি করে লিখেছেন দুখন্ডে হিমালয়ান জার্নাল। সমগ্র হিমালয়ের উদ্ভিদ নিয়ে লিখলে কত খন্ড হতো কে জানে?

    হিমালয় মানে তো শুধু উদ্ভিদ, ফুল, অর্কিড বা ওষুধি নয় হিমালয়ের ভূতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ভূগোল, ইতিহাস, হিমালয়ের অজস্র জনজাতির দীর্ঘকালের শিল্প-সংস্কৃতি, আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ইত্যাদিও আছে। উনবিংশ শতক থেকে শুরু হয়েছে হিমালয়ের বুকে অভিযান। ১৯২৮ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিশ্বের অন্যতম সেরা হিমালয়ান জার্নাল। আন্তর্জাতিক মানের যেকোনো বই বা জার্নালের ভাষা সাধারণত ইংরেজি হয়। বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছানোর কারণে। বাংলায় যে সব বই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তার সিংহভাগ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ঠাসা। হিমালয়কে চেনা বা জানার সুযোগ পাওয়া যায় না এইসব বইয়ের মাধ্যমে।

    তাই কেবলমাত্র হিমালয়ের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার কৌতূহল বাঙালি পাঠকদের মধ্যে সুপ্ত হয়ে বেঁচে ছিল। তাদের এই ইচ্ছেকে বাস্তবায়িত করার কাজটা নিঃসন্দেহে কঠিন। সেই সাথে আরো কঠিন পাঠকদের বইয়ের র‍্যাকে ঠাঁই করে নেওয়া। কারণ পর্বত প্রেমীদের সংখ্যা খুবই সীমিত। এই কারণে কোন প্রকাশনা সংস্থাও দীর্ঘকাল এই বই প্রকাশ করার জন্য বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। এই কঠিন বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে এসেছেন লা স্ত্রাদার কর্ণধার সুমিতা সামন্ত মহোদয়া। প্রকৃত পর্বতপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণ করার তাগিদে।

    বাংলায় এমন একটি বইয়ের খুবই প্রয়োজন ছিল। যেখানে পুরো হিমালয়কে না হলেও আংশিকভাবে তার আভাস পাওয়া যাবে। পাঠককুল যেন হিমালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কিছুটা হলেও ধারণা করতে পারেন। সমগ্র হিমালয় অবশ্য অনন্ত সম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শুধু হিমালয়ের প্রাচীন মানচিত্র নিয়ে কর্নেল আর এইচ ফিলিমোর চার খন্ডে একটি বই প্রকাশ করেন। হ্যাঁ শুধুমাত্র মানচিত্র নিয়ে। তাহলে সব বিষয়ে লিখলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়।

    তবুও এই বইয়ে হিমালয়কে যতটা সম্ভব ধরার চেষ্টার ত্রুটি হয়নি। সৌমিত্র শংকর সেনগুপ্ত লিখেছেন একটি তুলনায় কম চর্চিত বিষয় নিয়ে— হিমালয়ের ডাক টিকিট। বিরল ডাক টিকিটের ছবি সহ। অন্তত দুজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হিমালয় বিশেষজ্ঞ এই বইয়ের জন্য কলম ধরেছেন। কাষ্টমস এর প্রাক্তন চিপ কমিশনার রমেশ ভট্টাচার্য লিখেছেন পূর্ব কাশ্মীর নিয়ে। যেখানে পর্যটকের যাতায়াত খুবই কম। তাই এই অঞ্চলের পরিচিতিও কম। পাঁচটি ম্যাপ সহ এই অঞ্চলের বিশদ বিবরণ বোধহয় তাঁর কলমেই প্রথম পাওয়া যাবে এই বইয়ের মাধ্যমে। রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির পেট্রনস গোল্ড মেডেলে ভূষিত হরিশ কাপাডিয়া তিব্বতের দিহাং যেখানে ব্রহ্মপুত্র নাম নিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে সেই এস ব্যান্ডের অভিযানের কাহিনী শুনিয়েছেন ছবি ও ম্যাপ সহ ।

    তপেন্দ্র কুমার পাল ও কঙ্কন রায় হিমালয়ে প্রাচীন কালে যে দুঃসাহসীরা অভিযান করেছেন যখন মানচিত্র, পথঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় কিছুই ছিল না তাঁদের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা লিখেছেন। প্রকৃত অর্থে দুর্গম হিমালয়কে আমরা চিনতে পেরেছি এঁদের হাত ধরেই।

    হিমালয়ের ভূতত্ত্ব বিষয়ে লিখেছেন অধ্যাপিকা সূচনা তাড়াল। পূর্ব থেকে পশ্চিম হিমালয়ের অন্দরমহলের জনজাতিদের জীবন যাপন, সংস্কৃতি, লোকাচার, বন্যপ্রাণ, নদী-নালা ইত্যাদি নিয়ে বিস্তৃতভাবে তথ্য ও ছবিসহকারে লিখেছেন অভিজিৎ ভৌমিক ও সুতপা ভৌমিক। এই লেখা হিমালয়ের গহনে থাকা অধিবাসীদের সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা দেবে। বিজ্ঞানী স্বামী প্রণবানন্দ, যিনি ১৬ বার বিভিন্ন গিরিপথ অতিক্রম করে মানস সরোবরে গিয়েছেন বছরের বিভিন্ন ঋতুতে, গ্রীষ্মে, বর্ষায়, শীতে, তাঁর আশ্চর্য জীবন ও গবেষণার কথা শুনিয়েছেন জয়ন্ত মজুমদার।

    এছাড়া বহু বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তিদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই দুই খন্ডের হিমালয়। এঁদের মধ্যে আছেন ডাক্তার শঙ্কর কুমার নাথ, অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী, স্বাগতা দাস মুখোপাধ্যায়, গুরুপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সায়ন্তন দাস, রতনলাল বিশ্বাস, সমীর সামন্ত, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, জয়ন্ত সরকার, আনন্দময়ী ঘোষ, দেবাশীষ বিশ্বাস, কৌশিক ভট্টাচার্য, শান্তনু বন্দোপাধ্যায়, ডক্টর কুনাল চট্টোপাধ্যায় এবং স্বামী প্রণবানন্দ। এঁরা প্রত্যেকেই হিমালয় সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী, যা ফুটে উঠেছে তাঁদের লেখায়, প্রতিটি ছত্রে ছত্রে। এরা হিমালয় সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে কলম ধরেছেন পাঠকদের জন্য।

    এই বইয়ে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজিত হয়েছে। একটি সমগ্র হিমালয়ে যত ট্রেক রুট আছে তার সিংহভাগের ফ্লোচার্ট ডায়াগ্রাম। দ্বিতীয়টি বাংলা ও ইংরেজিতে হিমালয়ের উপর এ পর্যন্ত প্রকাশিত অসংখ্য বইয়ের মধ্যে থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বইয়ের তালিকা। শুধু ট্রেক রুট ও বইয়ের তালিকার জন্য খরচ হয়েছে ১১১ পৃষ্ঠা। যা একটি পূর্ণ বইয়ের সমতুল। নিশ্চিতভাবে বলা যায় কোনো বাংলায় প্রকাশিত বইয়ে এই তালিকা পাওয়া যাবে না। সমগ্র হিমালয়ের রঙিন ম্যাপ দিয়ে বইটিকে সমৃদ্ধ করেছেন হরিশ কাপাডিয়া মহাশয়। ছবি ও ম্যাপ ব্যবহারে সম্পাদক মহাশয় বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি, পাঠকদের কথা ভেবে।

    দুই খন্ডে প্রকাশিত এই বইয়ের সুষ্ঠু সম্পাদনা করেছেন বিশিষ্ট হিমালয় প্রেমিক কল্যাণ কুমার নন্দী। বইটি হাতে নিলেই বোঝা যায় এই বই দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল। প্রথম কঠিন কাজ, সঠিক লেখক নির্বাচন করা। তারপর বিষয় নির্বাচন করে তাঁদের কাছ থেকে লেখাটিকে আদায় করা। এই দুটি কাজেই সফল হয়েছেন সম্পাদক মহাশয়। কোনো বিষয়ের উপরে একাধিক লেখা যাতে না থাকে সেজন্য তিনি সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন। নজর দিয়েছেন হিমালয়ের উপরে অবশ্য-জ্ঞাতব্য বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দেবার দিকে। সেই সাথে লেখার সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী মানচিত্র ও ছবির দিকেও।

    এই বইয়ের সাথে পাঠকদের জন্য বিশেষ উপহার প্রখ্যাত পর্বতারোহী দীপঙ্কর ঘোষের এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে ও চৌ য়ূ-র মতো চারটি আটহাজারী পর্বত আরোহণের তথ্যচিত্র। দীপঙ্কর ভারতের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সাতটি আটহাজারী পর্বত শিখর আরোহন করেন। শেষে মাকালু আরোহন করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর সাথে থাকা ক্যামেরাটিকে তার মৃতদেহের সাথে উদ্ধার করা হয়। সেই ক্যামেরায় থাকা তাঁর তোলা শেষ ছবিও ঠাঁই পেয়েছে ওই চারটি তথ্যচিত্রের সাথে বুকমার্কে।

    সম্পাদক ও প্রকাশক উভয়েই সার্বিকভাবে চেষ্টা করেছেন বইটিকে ত্রুটিমুক্ত করতে। সেই সাথে যতটা সম্ভব তথ্য দিয়ে বইয়ের মান উন্নত করতে। মুদ্রণ ও বাঁধাই করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের। বাংলা প্রকাশনার জগতে এর তুল্য বই একেবারে যে হয়নি বলাটা হয়তো সত্যের অপলাপ হবে। তবে বিরল, এটা অবশ্যই জোর দিয়ে বলা যেতে পারে। বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব এই বই। বিশেষত এর মূল্যের কথা বিবেচনা করলে। এই বই কিনে পাঠকের কষ্টার্জিত অর্থ যে বিফলে যাবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এমন বই কয়েক দশকে হয়তো একটি প্রকাশিত হতে পারে বিশেষত বাংলা বইয়ের দুনিয়ায়। সে দিক থেকে বলা যায় জিজ্ঞাসু হিমালয় প্রেমীদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। এমন একটি বই বাংলা প্রকাশনার জগতে সংযোজিত হওয়ায়।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments