




মণীন্দ্র গুপ্ত মুখ্যত কবি, তবে সুনির্দিষ্ট কোনো দশকের নন; বরং বলা ভালো, তিনি দশক-বিভাজিত বাংলা কবিতার বাইরে দাঁড়িয়ে-থাকা এক অন্যধরণের কবি, যিনি সবকিছু অন্যভাবে দেখেছেন এবং আমাদেরও দেখতে শিখিয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, মোমবাতি যেন বিধবা মায়ের মতো, রান্নাঘরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে যে ক্ষয়ে যায়; কুলুঙ্গিতে বসে থাকা পুরনো টাইমপিস ঘড়িটা ঘাড় কাত ক’রে সারাদিন বসন্ত বৌরির মতো ডাকে, মধ্যরাতে ট্রানজিসটরের ‘ভুতুড়ে আওয়াজ’ যেন ‘অশরীরীদের চুমুর শব্দ’, চল্লিশ বছর পরে সাইকেলে চেপে মনে হয়, তিনি যেন টাইম মেশিনে চ’ড়ে হু হু ক’রে পিছিয়ে যাচ্ছেন সময়ের মধ্যে এবং এইভাবে যেতে যেতে দেখতে পান, ‘দূরে বরফপাহাড়ের মধ্যে তার জন্মান্তরের মৃতদেহ। জমাট স্ফটিক হয়ে শুয়ে আছে’। তাঁর কবিতায় লৌকিক ও অলৌকিক জগৎ, পৌরাণিক ও আধুনিক জগৎ, ইহলোক ও পরলোক মিলেমিশে একাকার। মৃত্যুর পরেও তিনি দেখতে পান মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে, আর সেই অকালসন্ধ্যায়, তাঁর মেঘের মুণ্ড রক্তাকাশে রাহুর মুণ্ডের মতো ভেসে যাচ্ছে, আবার, ‘ছোট, নিচু, অলক্ষ্য দেশ’-এর সন্ধানে যেতে যেতে লক্ষ করেন ‘মাটির সঙ্গে প্রায় সেঁটে আছে শনিগ্রহের নীলাভ পাদপ’, লক্ষ করেন ‘সরু ফাটলে জন্মেছে সোনার তারের মতো একগোছা ঘাস’, আর তাঁর মনে হয়, প্রসারপিনার দীঘল চুলের প্রান্তভাগ, যা ঠিকমতো ধরলে ‘সুন্দরীর সাদা শরীরটাকে এখনো ফিরিয়ে আনা যায়’। তাঁর একটি সম্পূর্ণ কবিতা প’ড়ে নেওয়া যাকঃ
কামাতুর হয়ে রমণসঙ্গিনীকে সকাতরে বললাম,মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা সত্যি ভারি অদ্ভুত এবং তা কোনো বিচিত্র কাব্যভাষা বা আঙ্গিকের কারণে নয়, বিষয়বস্তুর কারণে। তাঁর কবিতায় একটি কাহিনীর মোড়ক থাকে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কোনো শব্দ নেই, বাক্য নেই। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়, এ এমন এক মানুষের রচনা যিনি হাজার বছর ধ’রে পৃথিবীর পথে হাঁটছেন, প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, প্রভূত জ্ঞান সঞ্চয় করেছেন, যাঁর সমস্ত আবেগ ঝরে গেছে, জগৎ ও জীবনকে নির্মোহ, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে দেখার মতো মানসিকতা বহু আগেই তৈরি হয়ে গেছে।
‘আমার মুখ গাল কপাল চেটে দাও।’
ভবতারিণী ভঙ্গি ক’রে জিব বার ক’রেই ছিল। ঘন হয়ে এসে
তার জিহ্বা দিয়ে আমার মুখখানা চাটতে লাগল—
সে চাটতে লাগল আর পুঁছে পুঁছে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে লাগল
আমার চোখ নাক গাল ঠোঁট কপাল। একটা চকোলেটের মুণ্ড যেন
ক্রমশ ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে ছোট্ট হয়ে এল।
ভবতারিণী চাটতে চাটতে নিচে নামতে লাগল,
ক্রমশ তার স্ফূর্তি আর উদ্দীপনা ভয়ংকর হয়ে উঠছে—
ভয়াল জিভের একটি লেহনে পাহাড় পর্বত সমুদ্র মাটি
গ্লোবের জলছবির মতো মুছে গেল।
ভবতারিণী রাত্রির তারকাখচিত আকাশ চাটতে লাগল—
আর গ্রহ নক্ষত্র কোয়াসার চিহ্নহীন হয়ে পুঁছে পুঁছে যেতে থাকল।
‘চাঁদের ওপিঠে’ মণীন্দ্র গুপ্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতাবিষয়ক গদ্যগ্রন্থ। ‘প্রিফেস টু লিরিকাল ব্যালাড্স্’-এর মতোই এ-ও কবিতা সম্পর্কে এতকালের প্রচলিত ধারণাকে বাতিল ক’রে সম্পূর্ণ নতুন এক ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। মনীন্দ্র গুপ্ত বলেছেন, কবিরা তাঁদের ছোট পৃথিবীতে সময় না কাটিয়ে অন্যান্য পেশার লোকেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে তাঁদের নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে এবং তাঁদের লেখায় স্পষ্ট হয়ে উঠবে বিষয়বৈচিত্র্য। তিনি আরো বলেছেন, কবিতার শেষে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছনো বা অভাবিত মোচড় দিয়ে থামা যেন বাদ্যকরের তেহাই মারার লোভ। নাটকীয়তার পরিবর্তে কবিতায় থাকা দরকার নিরভিমানতা।
তবে, মনীন্দ্র গুপ্ত সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘অক্ষয় মালবেরি’র জন্যে। ব্লার্বে লেখা আছে: ‘অক্ষয় মালবেরি উপন্যাস নয়, প্রচলিত আত্মজীবনীও নয়, একজন দুঃখী-না সুখী-না মানুষের চিহ্নপত্র। কাঁচা কঞ্চির কলমে বনের সবুজ কালিতে হোগলার পাতায় লেখা — উজ্জ্বল দুরন্ত দুঃখী ক্ষণমধুর অতীত যেন স্তব্ধতা থেকে এসে আবার স্তব্ধতায় ফিরে গেছে।’
মণীন্দ্র গুপ্তের আরো একটি অবিস্মরণীয় কীর্তি ‘আবহমান বাংলা কবিতা’ নামে পরমাশ্চর্য এক কবিতা-সংকলনের সম্পাদনা। চর্যাগীতি থেকে ঈশ্বর গুপ্ত, মধুসূদন থেকে নজরুল, জীবনানন্দ থেকে সুনীল বসু — তিনটি পর্বে বিভক্ত এই সংকলনের ‘ভূমিকা’ কিছুটা পড়া যাক: ‘কবিতার সংকলন অনেক রকমের হতে পারে। গভীর একটি সংকলন সংকলকের সত্তা পায়। … এই সংকলন, নেহাতই একজন পাঠকের করা, নিরভিমান ও সংস্কারহীন। কৌতূহল, ভালোবাসা আর নেশার টানে আমি বাংলা কবিতা পড়লাম সারাজীবন। সমকালে থেকেও ক্রমশ ধীরে ধীরে উজিয়ে গেছি মধ্য ও প্রাচীন যুগে। পরিচয় নিবিড় হলে ধরা পড়ে অনেক সত্য ও মিথ্যা। ... ছোট সমকালটুকুর বাইরে দশদিক ব্যেপে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে বিষাক্ত অন্ধকার, যাতে অন্য কোনো কবির মুখ না দেখা যায়। অমর কবিরা মৃত্যুর ওপার থেকে চেয়ে থাকেন — সমানধর্মা কেউ কি নেই!’
মণীন্দ্র গুপ্ত চুরাশি বছর বয়সে পেয়েছেন রবীন্দ্র পুরস্কার এবং পঁচাশি বছর বয়সে পেয়েছেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। তাঁর স্ত্রী বিশিষ্ট কবি দেবারতি মিত্র। রামকিঙ্কর-কে নিয়ে রচনা করেছেন জীবনীগ্রন্থ ‘রঙ কাঁকর রামকিঙ্কর’। একানব্বই বছরে রোগক্লিষ্ট শরীরে রচনা করেছেন অনবদ্য উপন্যাস ‘নেংটি’। ভারি সুন্দর বলেছেন কবি অরণি বসু, মণীন্দ্র গুপ্ত, তাঁর কাছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়’।