• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share  
  • স্মৃতিরেখা : অমিত মণ্ডল

    আমার মাস্টারমশাই বিকাশদা; — পৃথ্বীশ সিকদার; অনুলেখন- সন্দীপ মজুমদার; প্রকাশক— অনুভব প্রকাশনী, প্রচ্ছদ- দেবাদৃত বসু; প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০২৫; ISBN: ??

    পৃথ্বীশ সিকদার প্রণীত ‘আমার মাস্টারমশাই বিকাশদা’ মূলত স্মৃতিচারণমূলক একটি গ্রন্থ। উঠে এসেছে শিল্পীর জীবন, ছবির বিষয়, চিত্রশৈলী ও অঙ্কন পদ্ধতি। পৃথ্বীশ সিকদার বিকাশ ভট্টাচার্যকে প্রথম দেখেন Indian Art College-এ। ক্রমে ক্রমে শিক্ষক থেকে হয়ে উঠেছেন আত্মজন। সম্ভাষণ করেছেন ‘বিকাশদা’। মাস্টারমশাই হিসেবে তাঁর সান্নিধ্যে কেটেছে জীবনের অনেকগুলি বছর, পেয়েছেন অফুরন্ত ভালোবাসা ও স্নেহ। তারই অনুপুঙ্খ বর্ণনা গ্রন্থটির মূল নির্যাস। লেখক অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘তিনি (বিকাশ ভট্টাচার্য) শুধুমাত্র আমার গুরুদেব হিসাবেই রইলেন না, হয়ে উঠলেন আমার অভিভাবক, আমার বড়দা এবং আমার পথপ্রদর্শক অথচ আমার বন্ধু…।’ বিকাশ ভট্টাচার্য জীবনের সর্বক্ষেত্রেই ছিলেন পারফেকশনিস্ট। শিল্পী মানেই বোহেমিয়ান, এ বিশেষণ তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

    ভারতবর্ষের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য। শৈশব থেকেই শিল্পকলার প্রতি টান। সুররিয়ালিস্টিক বিষয় ভাবনা এবং রিয়েলিস্টিক লুকের মিলিত রসায়নে বিকাশ সৃষ্টির মায়াজাল নামিয়ে আনতেন ক্যানভাসের বুকে। সেই মায়াজালের অপ্রতিরোধ্য আবেদনে দর্শকরা ছবির সামনে এসে স্তব্ধ হয়ে যেতেন। বিকাশ ভট্টাচার্যের জন্ম ২১ জুন, ১৯৪০ কলকাতায়। শিল্পশিক্ষা The Indian College of Arts & Draftsmanship-এ। মাত্র ছয় বছর বয়েসে বাবাকে হারিয়ে মা ও একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে বিকাশ বড় হতে থাকেন মামার বাড়িতে। মামা ছিলেন পুরোহিত, উপার্জন বেশি ছিল না। ফলে বিকাশের ছোটোবেলা কেটেছে অভাব অনটনের মধ্যে। তিনি লিখছেন, ‘…সমস্ত ছেলেবেলা, কৈশোর এবং যৌবনের শুরুর সবটাই ওই মাতুলালয়েই কেটেছে, আরো অনেক ভাগ্য বিড়ম্বিত পিতৃহীনের মতো সেই একঘেয়ে কাহিনী।… তবে বাল্যের পিতৃহীনতা আমাকে একটা তীব্র নিরাপত্তার অভাবের বোধের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছে। আমার চরিত্রের গতিপ্রকৃতিকে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে। সারাটা জীবন বহু প্রয়োজনে মাথার ওপর এমন কাউকে একান্তভাবে পাইনি, যার পরামর্শ-উপদেশে নিশ্চিন্ত হব, শান্ত হব’। পরবর্তী জীবনে তাঁর আর্থিক স্বচ্ছলতা এলেও ছোটোবেলার স্মৃতি মন থেকে মুছে যায়নি, ফলে হয়ে ওঠেননি অমিতব্যয়ী।

    লেখক ৯ নং গ্রান্ট লেনের বিকাশ ভট্টাচার্যের প্রথম স্টুডিওর কথা উল্লেখ করেছেন। বাড়িটি ছিল ‘কেটি’ অর্থাৎ শিল্পী কাত্যায়ুন সাকলাতের যিনি বিকাশ ভট্টাচার্যের আর্ট কলেজের সহপাঠী। তিনতলা বাড়ির দোতলাতে ছিল বিকাশের স্টুডিও। এই স্টুডিওয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পীর নাম, যশ, খ্যাতি। এই বাড়ির কাঠের দরজা, জানালা, সিঁড়ি, পুরোনো দেওয়াল সবকিছুই একটা সময় বিকাশ ভট্টাচার্যের ক্যানভাসে জায়গা করে নিয়েছিল। ছবিগুলোর পশ্চাৎপট ছিল বাড়িটির বিভিন্ন অংশের দেওয়াল। নানা রঙের প্রয়োগে, তুলি চালনার অসাধারণ নৈপুণ্যে দেওয়ালের টেক্সচার এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতেন যা নির্দিষ্ট ছবি থেকে অন্যদিকে চোখ ফেরানো যেত না। গ্রান্ট লেনের বস্তি, বিভিন্ন গলি, পুরনো ঘরবাড়ি, চীনে পাড়া, দড়িতে ঝুলতে থাকা ছাল ছাড়ানো মুরগি, ছোটো ছোটো চীনা শিশুদের প্রাণচঞ্চল উপস্থিতি— সব কিছুই হয়ে উঠেছিল বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবির স্বর্গরাজ্য। অতি সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবনের গন্ধ ছবির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতো। দর্শকেরা ছবির সঙ্গে একাত্ম হতে পারতেন। লেখক সামনে থেকে দেখেছেন বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবি আঁকার পদ্ধতি। ড্রয়িং থেকে শুরু করে রঙ চাপানো পর্যন্ত। রঙের প্রাথমিক জমি তৈরির পর দ্বিতীয় স্তর, দ্বিতীয় স্তরের পর কীভাবে তৃতীয় স্তরের প্রলেপ দিচ্ছেন— সবটুকুই লেখক গভীর অভিনিবেশে লক্ষ করেছেন। জানা যায় বিকাশ ভট্টাচার্য একই সঙ্গে তিনটে বা চারটে ক্যানভাসে কাজ শুরু করতেন কারণ তেল রঙ শুকোতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাঁর স্ত্রী পার্বতী দেবী জানিয়েছেন শিল্পী প্রায় সারা রাত ধরে কাজ করতেন। গ্রন্থটিতে উল্লেখ আছে বিকাশ ভট্টাচার্যের কোলাজ পেন্টিং-এর যাবতীয় প্রক্রিয়া।

    লেখক পৃথ্বীশ সিকদার দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেছেন বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবির চরিত্রগত পরিবর্তন। তিনি লিখছেন, হয়তো বিকাশদা ভেতরে ভেতরে বদলে যাচ্ছিলেন। হয়তো সেটা সচেতন ভাবেই। ক্যানভাসে তাই সেই সামাজিক শিকড়ের প্রতি টান আর সেভাবে ছবি হয়ে ডানা মেলছিল না। ফলত ছবি থেকে সামাজিক আকর্ষণ, মাটির প্রতি আন্তরিকতা উধাও হয়ে গেল। অন্তরের অনুভুতিকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় ক্যানভাসে এলো মেধা ও বুদ্ধির পরিশীলিত প্রয়োগ, যাতে আন্তরিক অনুভূতিটা অন্তর্হিত। আছে এক ধরণের বুদ্ধিমত্তা, হৃদয়ের পরিবর্তে মগজাস্ত্র। এটা পৃথ্বীশ সিকদারের কাছে বস্তুচ্যুত হওয়ার মতোই ঠেকেছিল। সমাজের প্রতি আন্তরিক অনুভূতিটা হয়তো আর বিকাশদার ভেতরে বেঁচেবর্তে নেই, তাঁর ছবি হতে শুরু করলো জটিল, ক্রমশ জটিলতর, যা কিনা একান্তভাবে কলাসমালোচক ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে ছিল অত্যন্ত উপাদেয় কিন্তু সাধারণ দর্শকদের পক্ষে ছবিতে প্রবেশের পথটা সুগম ছিল না। লেখকের এই পর্যবেক্ষণকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। পাশাপাশি এটাও বলতে হয়, ছবির ক্ষেত্রে শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা-চিন্তার প্রতিফলন অস্বাভাবিক নয় এবং সেটাই শিল্পীর স্বতন্ত্র অস্তিত্বের সাক্ষ্য। বিকাশ ভট্টাচার্যর ছবিতে ছুঁয়ে যেত স্বপ্নের ডানা। ১৯৬৫-৬৭ সাল নাগাদ তাঁর ছবি বিমূর্ততার দিকে চলে গিয়েছিল। বিকাশ ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘ছেলেবেলাতেই আমি স্বপ্ন দেখতে শিখেছিলাম। অন্যভাবে বলতে গেলে স্বপ্ন দেখার নেশাটা আমাকে সেই সময়েই ভর করেছিল। আর সঙ্গ ছাড়েনি। এক এক সময় উড়তেও ইচ্ছে করত অপুর (পথের পাঁচালি) মতো। পরে যখন ছবি এঁকেছি সে ছেলেবেলাটা নিয়ে; তখন তার পিছনে দুটো ডানা লাগিয়ে দিয়েছি।’ এই ওড়ার ইচ্ছেটা কি বিকাশ পরবর্তী সময়েও মনের মধ্যে লালন করতেন? কারণ লেখক লক্ষ করেছেন বিকাশ রাস্তায় চলতে চলতে মাঝেমধ্যেই লাফিয়ে উঠতেন এবং কখনো কখনো দৌড় শুরু করতেন। লেখকের মনে হয়েছে এসব কিছুই বিকাশের শিশুসুলভ সত্তার অবিরল বহিঃপ্রকাশ।

    ১৯৬৯ সালে বিকাশ ভট্টাচার্যের অন্যতম সৃষ্টি ‘ডল’ সিরিজ। এই সিরিজের উৎসকথা আমরা লেখকের বয়ান থেকেই জেনে নিই— একদিন ৯ নং গ্রান্ট লেনের বিকাশদার স্টুডিওতে কেটিদির বোনঝি ছোট্ট নিলোফার একটি ছোট পুতুল হাতে ঘরে ঢুকলো, তার আবদার পুতুলের চোখ ঠিক করে দিতে হবে। বিকাশদা রাজি হলেন এবং তারপরেই ছোট্ট নিলোফার অত্যন্ত অবহেলায় পুতুলটা সেখানে রেখে দিয়ে চলে গেল। পরের দিন স্টুডিওতে ঢুকেই বিকাশদা একটা চার ফুট বাই চার ফুট ক্যানভাসে ঝড়ের গতিতে পুতুলটা আঁকা শুরু করে দিলেন। পুতুলটা যেমন ভাবে পড়েছিল সেভাবেই। পুতুলটার আশেপাশে যা ছিল সেগুলো সমেত পেছনের প্রেক্ষাপট সহ পুরো দৃশ্যটাই প্রচণ্ড দ্রুত গতিতে ড্রয়িং করে ফেললেন। এভাবেই একের পর এক বাড়ির বিভিন্ন অংশকে পশ্চাৎপট হিসেবে ব্যবহার করে পুতুলের ছবি এঁকে চললেন। সৃষ্টি হল বিকাশ ভট্টাচার্যের ভুবনজয়ী চিত্রকর্ম ‘ডল সিরিজ’।

    একটা সময় ৯ নং গ্রান্ট লেনের স্টুডিও ছেড়ে দিতে হয় বিকাশ ভট্টাচার্যকে। নতুন স্টুডিও হল জওহরলাল নেহরু রোডে। ব্যবস্থাপনায় কেটিদির বাবা। নতুন স্টুডিওতে সৃষ্টি হল বিকাশ ভট্টাচার্যর আর একটি নারী কেন্দ্রিক ছবির সিরিজ, নাম ‘শী’। তারপর নির্মিত হয় ‘দুর্গা’ সিরিজ।

    শিল্পের আকাশে যখন বিকাশ ভট্টাচার্য গনগনে সূর্যের মতো দেদীপ্যমান, তখনই তাঁর শরীরে পক্ষাঘাতের কামড়ে জীবন থমকে গেল হুইল চেয়ারে। মন ও মস্তিষ্ক সচল কিন্তু ডান হাত অসাড়। স্ত্রী পার্বতী বলেছেন সেসময় অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন বিকাশকে বাঁ হাতে ছবি আঁকতে। তুলুজ লোত্রেক, রেমব্রাণ্ট অনেকেই নাকি সেরিব্রালের পর বাঁ হাতে ছবি আঁকতেন। বিকাশও দু-একদিন চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ঐ যে সারাজীবন পারফেকশন খোঁজার চেষ্টা, ফলে একটা সময় হাল ছেড়ে দিলেন। এক অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণায় কিংবদন্তী শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের তুলি থেমে গেল, একধারে পড়ে রইলো ক্যানভাস ও রঙের প্যালেট। তারিখ ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৬। Society of Contemporary Artists-এর একটি প্রস্ফুটিত ফুল ঝরে গেল। বাড়ির ছাদে শতরঞ্জি বিছিয়ে সেই তুমুল আড্ডা, সঙ্গে মুড়ি, তেলেভাজা আর চা— সবকিছুই এখন স্মৃতির ব্যালকনিতে ধূসর বিকেলের মরা আলো যেন।

    গ্রন্থটিতে পৃথ্বীশ সিকদারকে লেখা বিকাশ ভট্টাচার্যের কিছু চিঠির উল্লেখ আছে যেগুলি একান্তই ব্যক্তিগত পরিসরের। সবশেষে যে কথাটা বলার, বেশ কিছু মুদ্রণপ্রমাদ অত্যন্ত পীড়াদায়ক। গ্রন্থটি আরও যত্নে সম্পাদিত হওয়া উচিত ছিল। একজন বিশিষ্ট শিল্পীকে জানার ক্ষেত্রে বইটি অপরিহার্য। বিকাশ ভট্টাচার্য ও পৃথ্বীশ সিকদারের ফটোগ্রাফ সম্বলিত প্রচ্ছদ মধ্যমমানের।



    অলংকরণ (Artwork) : বিকাশ ভট্টাচার্য-র ছবি উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments