• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share  
  • ঝালমায় ঝামেলা : শুভ্রা বসু



    এ কী কাণ্ড! চন্দ্রতাল পেরিয়েই যে ছন্দপতন। বাসনা ছিল চন্দ্রতাল থেকে মানালি না গিয়ে আমরা ঢুকব শিশু গ্রামে। শিশু ভারি সুন্দর, ছোট্ট, মিষ্টি এক পাহাড়ি গ্রাম। সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। গড়ে উঠেছে বেশ কিছু হোটেল ও হোম স্টে। তার একটিতে থেকে শিশুর সৌন্দর্য গায়ে জড়িয়ে দু’দিন দিব্যি সুখে থাকা যাবে। কিন্তু না, বিধি বাম। কোনোমতেই ঠাঁই হল না সেখানে। উইক-এন্ড কাকে বলে টের পেলাম। সবই নাকি সোল্ড আউট। আমাদের এত দিনের সারথি ভিকি গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুততার সঙ্গে আমাদের অটল টানেল পার করে নিয়ে এল সোলাং ভ্যালিতে। রাত তখন প্রায় সাড়ে ন’টা। এখানেও হোটেলের চিত্র প্রায় একই। কোনোক্রমে একটি হোটেলের বেসমেন্টে একটি মাত্র ‘ডাবল বেড রুম’ জুটল। চারজনের মাথা গোঁজার ঠাঁই। সাধারণ সময়ে এরা এ ঘর নিশ্চয়ই পর্যটকদের দিতে সাহস করে না। উইক-এন্ডের দাপটে এখন সময়টা অ-সাধারণ হয়েছে। নিতান্ত বাধ্য হয়ে রাজি হতে হয়েছে। অন্য সময় হলে অবশ্যই অন্য অপশন খুঁজতাম। আজ সারাদিনের ক্লান্তি, বিশেষত আমাদের ভিকির পরিশ্রমের কথা ভেবেই আর বিশেষ খোঁজাখুঁজির মধ্যে গেলাম না। নাক কুঁচকে কাটিয়ে দিলাম রাতটা।

    এই বছরের মধ্য জুনে উনিশ দিনের ট্রিপের প্রায় শেষ লগ্নে এসে পৌঁছেছি। হিমাচলে আর মাত্র পাঁচ দিন। এযাবৎ আমাদের ভ্রমণ-গাড়ি চলছিল গড়গড়িয়েই। সুন্দর তাল ও ছন্দে। ছোটোখাটো পরিবার আমাদের। দু সেট স্বামী-স্ত্রী। দু-দু’বার হিমাচল ট্রিপ ক্যান্সেল হবার পর এবার ওপরওয়ালার আশীর্বাদে ছুঁতে পেরেছি হিমাচলের মাটি। হাওড়া থেকে কালকা। সেখান থেকে টয় ট্রেনে শিমলা। জীবনে প্রথম বার টয় ট্রেনে চড়ার রোমাঞ্চে মশগুল ছিলাম। শিমলায় দু’দিন কাটিয়ে শুরু হল আমাদের প্রকৃত হিমাচল ভ্রমণ। বেশ চলছিল। আগে থেকে হোটেল বুক না করেও কোথাও কোনো অসুবিধায় পড়িনি। নিজেদের পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী হোটেল পেয়ে গিয়েছি অল্প আয়াসে। আমাদের আইটিনারি অনুযায়ী শেষ তিন দিনের জন্য ছিল মানালি। এখানে একটু আয়েশ-আরাম করে কাটাবার উদ্দেশ্যে তিন দিনের জন্য একটি সুন্দর, আরামদায়ক হোটেল আগে থেকেই আমরা বুক করে রেখেছিলাম। কিন্তু আগের দিন শিশু গ্রামে থাকতে না পারায় আমাদের পরবর্তী বাকি দিনগুলি আমরা মানালির হোটেলেই আশ্রয় নেব বলে ঠিক করলাম। আর ঠিক হল সেখান থেকেই বাকি দ্রষ্টব্যগুলি দেখে নেব। অতএব, সোলাং ভ্যালিতে কষ্ট করে রাত কাটিয়ে পরদিনের গন্তব্য মানালি। থাকব সেখানে পাঁচ দিন।

    মানালি রওনা হবার আগে সোলাং ভ্যালির অন্যতম এক আকর্ষণ আনজানি বাবার মন্দির দর্শন করতে গেলাম। শীতকালে নাকি পাহাড়ি জলধারায় এখানে অমরনাথের মতোই শিবলিঙ্গের সৃষ্টি হয়। তাই ইনি দ্বিতীয় অমরনাথ। যাতায়াতের পথটি ভারি রোমাঞ্চকর। একটি এটিভি (All Terrain Vehicle) তে দু’জন করে সওয়ার হন। দুজনের সঙ্গে থাকে চালক। চার চাকার মোটর সাইকেলের সামনের সারথির আসনে। পাহাড়ি পাথরের রাস্তা দিয়ে ঝকরপকর করতে করতে এগোলাম মন্দিরের দিকে। শেষ রাস্তাটুকুর ভরসা পয়দল। মন্দির দর্শন করে, প্রসাদ গ্রহণ করে এবার আমরা মানালির পথে। মানালিতে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন আরামদায়ক হোটেলের আশ্রয়ে এসে আগের দিনের সব ক্লান্তি দূর হল। সারাদিন রেস্ট নিয়ে আমরা সবাই এখন চাঙ্গা।

    মানালির দ্বিতীয় দিন সকালে রওনা হলাম ত্রিলোকিনাথ ও উদয়পুরের উদ্দেশ্যে। সেই রাতেই ফিরব আবার মানালিতেই। আজ আমাদের চারজনের সঙ্গে মানালির হোটেলের সুদীপ্তাও সঙ্গী। পথের সৌন্দর্যে আমরা বিভোর। এসে পৌঁছলাম তান্ডিতে। চন্দ্রতাল থেকে উৎপত্তি হওয়া সেই ছিপছিপে, তন্বী জলধারা, যা নাকি চন্দ্র নদী, তার ব্যাপ্তি এখানে বিশাল। ভাগার সঙ্গে মিলিত হয়ে চন্দ্রভাগা নাম নিয়ে তান্ডি থেকে এগিয়ে চলেছে কাশ্মীরের পথে। ইনিই কাশ্মীরের চেনাব নদী। একটু চা খাওয়া, একটু রেস্ট, একটু ফটো সেশন। আবার এগিয়ে চলা ত্রিলোকিনাথের পথে। শিশু টপকেই আমাদের যাওয়া। বুঝতে পারি কেন শিশুতে স-অ-অ-ব সোল্ড আউট হয়। সৌন্দর্য মনকে তৃপ্ত করে না, উচ্ছ্বল করে। বারংবারই শুধু মনে হচ্ছিল, ‘এই কি আমার দেশ?’

    এক সময় এসে পৌঁছালাম ত্রিলোকিনাথ। ত্রিলোকিনাথ পৌঁছানোর কিছু আগেই পড়ে ঝালমা নালা। নালার ওপরের ব্রিজ ভেঙে গিয়েছে আগেই। এখন ঘুর পথে নালার উপরে তৈরি হওয়া অস্থায়ী ব্রিজ দিয়ে চলাচল হচ্ছে। এ পথে কম ভ্রমণার্থী আসেন। ত্রিলোকিনাথ মন্দিরটি একটি ব্যতিক্রমী মন্দির। এখানে হিন্দু এবং বৌদ্ধ দুই ধর্মেরই পুজো হয় একসঙ্গে। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের পরেই রয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁর মাথায় জল ঢেলে প্রবেশ করলাম গর্ভগৃহে। এখানেও শিবের মূর্তি। এই মূর্তির মাথায় ছোট্ট বুদ্ধমূর্তি। ভারী অভিনব। পূজারীর সঙ্গে কিছু কথা বলে দুপুরের আহার সারবার জন্য মন্দির চত্বরেই একটি ছোট্ট দোকানে ঢুকলাম। এল সেই সুসংবাদ! যে অস্থায়ী ব্রিজটি সদ্য পেরিয়ে এলাম, সেটি হঠাৎ জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। সরু অথচ খরস্রোতা ঝালমা এখন তাগড়া। প্রবল বলবান এবং ভয়ঙ্কর বেগবান। লালমোহনবাবুর অনুপ্রেরণায় বলা যেতে পারে, ‘ঝালমায় ঝামেলা’। অতএব, আজকে মানালি ফেরার চিন্তা স্থগিত। এদিকে ত্রিলোকিনাথে থাকার বন্দোবস্ত খুব জুতের বলে শুনলাম না। চটজলদি রওনা হয়ে গেলাম উদয়পুরের দিকে। উদয়পুর বাজারে মিলল ছিমছাম একটি লজ। রাস্তার ওপরে, বাজার চত্বরে থাকার ফলে আমরা, মানে দলের মহিলারা বেশ ডগমগ। হোটেলে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়েই ছুটলাম দোকান পরিভ্রমণে। এই জনপদটি ছোটো হলেও বর্ধিষ্ণু। দোকানপাটের মান বেশ ভালোই। এ দোকান ও দোকানে উঁকি-ঝুঁকি দিতে দিতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেলে উদয়পুরের প্রখ্যাত মৃকুলা দেবীর মন্দিরে গেলাম। পুরোহিত বললেন এটি দ্বাপর যুগের মন্দির। সন্দেহের অবকাশ যতই থাকুক পুরোহিত বলেছেন বলে কথা! মন্দিরটি কাঠের ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মন্দির চত্বরে অনেকক্ষণ সময় কাটল। হাল্কা মেজাজে ঘুরে বেড়িয়ে, দোকানে উঁকি মেরে, চা খেয়ে, গল্পে আড্ডায় গেল কেটে অনেকটা সময়। আমরা যে বিপদে পড়েছি, এক বস্ত্রেই সারাদিন রাত কাটছে, কবে কখন দুর্যোগ কাটিয়ে মানালি পৌঁছোব তার কোনো হদিসই কারুর জানা নেই, সেসব কিছু মনেই এল না। দোকান থেকে শুধুমাত্র পেস্ট ব্রাশ কিনে নিয়ে দিব্যি রাতে হোটেলে ভাত ডাল তরকারি খেয়ে নিদ্রা। আশায় ছিলাম পরের দিন ঠিকই আমরা মানালি পৌঁছে যাব। কিন্তু না। সকালে উঠে সেরকম কোনো সুখবর পেলাম না। যেখানেই বেড়াতে যাই সকালটা পায়ে হেঁটে ঘুরতে পছন্দ করি। তাই বেরিয়ে পড়লাম রাস্তা ধরে এদিক-সেদিক ঘুরতে। দেখলাম বহু মানুষ আটকে পড়েছেন। কেউ ছোটো গাড়ি নিয়ে এসেছেন। কেউ এসেছেন বড়ো দলে। সবাই উদয়পুরের বিভিন্ন হোটেলে রয়েছেন। অলসভাবে দিনটি কেটে গেল। এদিকে উদয়পুরের স্থানীয় মানুষদের কাছে আমরা ‘মেহমান’। তাঁদের আর্জি আমরা দু-তিন দিন এখানেই যেন থেকে যাই। দুপুরে হোটেলের নীচে বসে আড্ডা মারছি। হঠাৎ আমাদের হোটেলের মালিক আইসক্রিম নিয়ে এসে হাজির। আমরা বিস্ময়ে হতবাক!

    ইতিমধ্যে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। তাঁরা আশ্বস্ত করেছেন, পরের দিন সকালে তাঁরা আমাদের নালা পার করেই দেবেন। একে আমরা ভিন রাজ্যের পর্যটক, তায় সিনিয়র সিটিজেন। অতএব, বিশাল দায়িত্ব তাঁদের।

    বিকেলবেলা উদয়পুরের হাঁটা পথে এক দারুন সুন্দর জায়গা বেড়িয়ে এলাম। নদীর ধারে অনেকটা এলাকা জুড়ে ঝাউবন। গাছের ফাঁক দিয়ে দিয়ে নদীর জল দেখা যাচ্ছে। কেমন যেন দীঘার কথা মনে হচ্ছিল। অত্যন্ত মনোরম পরিবেশ। মনে হচ্ছে এক সুন্দর পিকনিক স্পট।

    আমার এই প্রথমবার হিমাচল দর্শন। শিমলা থেকে শুরু করে নারকান্ডা, সারাহান, সাংলা, ছিটকুল, নাকো, তাবো, কল্পা এত জায়গায় ঘুরলাম। প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির আশ্চর্য রূপ দেখে মুগ্ধ, মোহিত আমি। দুই এক বছরের মধ্যেই আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কাশ্মীর ও লাদাখ ভ্রমণের। আজ হিমাচলে এসে মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছিল বুঝি বা কাশ্মীরে চলে এসেছি। আর লাহুল-স্পিতি তো লাদাখেরই অংশবিশেষ। বারংবার মনে হচ্ছিল লাদাখের সেই রুক্ষ সৌন্দর্যের মাঝেই আছি আমি। সন্ধে হতে ফিরে এলাম হোটেলে। এবার অপেক্ষা শুধু রাত পোহাবার।

    পরের দিন সকালে উঠে একটু তৈরি হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গাড়ি নিয়ে প্রথম পৌঁছোলাম উদয়পুর থানাতে। এখানে ডিউটি অফিসার আমাদের খুব তৎপরতার সঙ্গে সব বুঝিয়ে দিলেন। যেখানে রাস্তা ভেঙেছে সেখানে যাঁরা কর্তব্যরত আছেন, তাঁদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে আমাদের রওনা হবার পরামর্শ দিলেন।

    এবার প্রকৃত দুর্ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে চলা। পৌঁছে গাড়ি থেকে নামতেই ছুটে এলেন ডিউটি অফিসার। আমাদের প্রত্যেককে হাত ধরে ধরে নদীর বেডে নামিয়ে আনলেন। বড়ো রাস্তায় রইল আমাদের এই ক’দিনের সঙ্গী সেই গাড়িসহ ভিকি। খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু উপায় নেই। মাথার উপর টিপটিপ বৃষ্টি। নিজের প্রতিটি হৃৎস্পন্দন গুনতে গুনতে ঝালমা নালা পেরোবার প্রস্তুতি। লোহার কয়েকটি পাইপ বেঁধে তৈরি করা একেবারেই নড়বড়ে একটা পারাপার ব্যবস্থা। পুলিশের হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে পেরিয়ে এলাম ঝালমা নালা, এক এক করে। এপারে এসে অসীম করুণাময় ঈশ্বরকে প্রণাম জানালাম।

    ঈশ্বর আপাতত আমাদের ওপর সদয় হলেন বটে। এদিকে প্রতি মুহূর্তে কতো মানুষের ওপর নির্দয় হচ্ছেন! দায় কার ভাবতে বসলে আঙুল ঘুরে সেই নিজের দিকেই আসে।

    রাস্তায় উঠে একটা সব্জি বহনকারী গাড়িতে উঠলাম। ঠিক হল মানালির হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। এর মধ্যে ভিকি ফোন করে জানালো গাড়ি বন্ধুর জিম্মায় রেখে সে আমাদের সঙ্গেই ফিরবে। পেলাম এক বড়ো স্বস্তি। এতদিন একসঙ্গে ঘুরে আজ ওপারে ভিকিকে রেখে চলে আসতে বড়ই অস্বস্তি লাগছিল। অতএব, ভিকির জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা। চলে আসতেই জয় মা মৃকুলা দেবী বলে রওনা হলাম। এতক্ষণের শ্বাসরুদ্ধ করা অবস্থার শেষে অবশেষে স্বস্তি। এরই মধ্যে আবার ফোন আসতে শুরু করেছে। বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত সংবাদপত্রে আমাদের এই আটকে পড়ার বিবরণ নামসহ বেরিয়েছে। ব্যাস আর কী! নিজেদের কেষ্টবিষ্টু মনে হতে লাগল। ১৯ দিনের হিমাচল ট্রিপের সব থেকে স্মরণীয় হয়ে রইল ত্রিলোকিনাথ-উদয়পুর দর্শনের এই তিনদিন।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments