




[অনুবাদকের নিবেদন: মুঘল বাদশাহদের উত্তরাধিকারী মির্জা হামিদ বেগের জন্ম ১৯৪৯-এ, করাচিতে। উর্দু ভাষার খ্যাতনামা কথাকার, সমালোচক, গবেষক, অনুবাদক ও নাট্যকার। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি তিনি। উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর চল্লিশটির বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮১-তে প্রকাশিত ‘গুমশুদা কালিমত’ প্রথম গল্পগ্রন্থ। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গল্পসংগ্রহের মধ্যে আছে ‘তার পর চলনেওয়ালি’, ‘জানকি বাই কি আরজ়ি’ (جانکی بائی کی عرضی) ইত্যাদি। এডুকেশনাল পাবলিশিং হাউস, দিল্লি থেকে প্রকাশিত এই শেষোক্ত গল্পগ্রন্থ থেকে এবারের অনূদিত গল্পটি গৃহীত। অজস্র অনুবাদ ও সাহিত্য সমালোচনামূলক গ্রন্থ লিখেছেন মির্জা হামিদ বেগ। পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতির খেতাব তমঘা-এ-ইমতিয়াজ়, পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড, ন্যাশনাল বুক কাউন্সিল অফ পাকিস্তান ইত্যাদি বহু সংস্থা প্রদত্ত পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
বাংলা অনুবাদের অনুমতি দেওয়ার জন্য আমি লেখকের কাছে কৃতজ্ঞ]
ওয়াগাহ্-র সীমান্ত থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর সমঝোতা এক্সপ্রেস লাহোর স্টেশনে পৌঁছোলে ভ্যানে চিরঞ্জি আর কাজুবাদামের প্যাকেট, পান ছালিয়ার থলে, বস্তাবন্দি বেনারসি আর জরদোজ়ি কাপড়ের গাঁঠরি বোঝাই ঠেলাগাড়ি, কুলি আর ফেরিওয়ালাদের ভিড়ভাট্টার মধ্যে সেও ছিল একজন ।
লাহোরে এসেছিল পূর্বপুরুষদের হাভেলি আর গলি-মহল্লা ঘুরে দেখতে। দিল্লি ফিরে অসুস্থ বুড়ো বাপুকে বলতে হবে যে! তাঁর লাহোর তেমনই আছে নাকি বদলে গেছে। তা ছাড়া বাপের ছোটখাটো কিছু ফাইফরমাশও মেটানোর ছিল।
দাগায় ক্লিয়ারেন্সের ঝঞ্ঝাটে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও তার তো তেমন তাড়া কিছু ছিল না।
গাড়ি থেকে নেমে লাহোর স্টেশনের অসংখ্য লোহার থামের একটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বাপুর দেওয়া নির্দেশগুলো সে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল।
দিল্লির রেল স্টেশনে গাড়ির কামরা জোড়ার সময় বাপু পই পই করে বলে দিয়েছিল পাকিস্তানে পৌঁছেই থানায় আগমন বার্তা জানাতে। তারপরে রেল স্টেশনের কাছে সাফসুতরো দেখে একটা হোটেলে ঘর নেওয়ার পরেই যেন বাড়িতে ফোন করে নিরাপদে পৌঁছোনোর খবর দেয়।
‘জি......’
‘হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তবেই বাইরে বেরোবি কিন্তু।’
‘জি বাপু....’
‘আমাদের হাভেলি তো লাহোরে রেল স্টেশনের কাছেই! তোকে টাঙা-ট্যাক্সি কিছুই করতে হবে না, পায়ে হেঁটেই হাভেলিতে পৌঁছে যেতে পারবি।’
‘জি.....’
‘….সেখানে টাঙা যদি এখনও চলে তাহলে কোচোয়ানরা “ভাটি লোহারি” বলে চেঁচাচ্ছে দেখবি। ইচ্ছে হলে টাঙাই নিয়ে নিস না হয়। লুন্ডা বাজার আর সরাই সুলতান রোডের পাশাপাশি চলবে রাস্তা। ওই রাস্তার ওপরেই আছে ইসলামিয়া কলেজ আর আরব হোটেল। চক বরফখানা থেকে ওই সড়কটাই তো গোয়ালমণ্ডির দিকে গেছে! তুই দালগিরাঁর চকে নেমে পড়বি। কাছেই দেখবি সরাই সুলতানের পেছনের গেট। দালগিরাঁর মোড় পেরিয়ে সরাই সুলতানে পৌঁছেই লরিগুলো দাঁড়ায়। তারপরে আবার তারা রেল ইস্টিশন, নওলাখা, দো মোরিয়া ব্রিজের দিকে এগিয়ে যায়।’
‘জি বাপু......’
‘পাথি গ্রাউন্ডের দিকে চলে যাস না আবার! ওদিকে পরে নিশ্চই যেতে পারিস, কিন্তু আগে হাভেলি দেখে তবেই। শহরের ওদিকটায় গুজুর গাওয়ালদের বাস। আমার বন্ধু বালার ঘরও তো ওদিকেই ছিল। দালগিরাঁর মোড়েই জিজ্ঞেস করে নিবি লালা যশবন্তের হাভেলিটা কোন দিকে। কাছেই তো! সেখানে এখন যেই থাকুক না কেন দেখা করে আসবি। প্রণাম নমস্তে নয়......সালাম বলবি.....’
‘…..বলবি আমি লালা যশবন্তের নাতি। ভেতরে গিয়ে বসতে বললে লজ্জা পাবি না, কথা শুনবি। তারা অনুমতি দিলে উঠোনটাও ঘুরে দেখে আসবি। আগেকার সে সব দিনে আঙিনার বারান্দায় ছাউনির তলায় ভারি তক্তপোশটা পাতা থাকত। যখন খুব ছোট ছিলাম রামগলির স্কুলটাতে পড়তাম, তখন ওই তক্তপোশের ওপর বসেই তো লেখাপড়া করতাম। উঠোনে পাশের বাড়ির সঙ্গে লাগানো দেয়ালটার ঠিক নিচেই একটা কুয়ো ছিল। আমরা চরখির সঙ্গে লাগানো দড়িতে ক্যানেস্তারা বেঁধে ঝুলিয়ে দিতাম। ওদিক থেকে ওরাও তাই করত। কে জলভরা বালতি আগে টেনে তুলতে পারে তার টক্কর চলত চান্দু আর ওদিকের ছেলেদের সঙ্গে।
‘…ওপরে ছাদে ওঠার দরকার নেই। উঠোনে দাঁড়িয়েই ছাদের দিকে একবার তাকাস। বারান্দার ছাউনিতে পায়রা বসে থাকলে তাদেরও দেখতে পাবি। আমরা তো সে যুগের সিরাজ়ি, লক্কা আর লোটন পায়রা পুষতাম। বালে আর চান্দুও তো আমাদের দেখাদেখি পায়রা পোষা শুরু করেছিল। তাই সামনের ছাদেও হয়তো কবুতর থাকতে পারে। যদি আমাদের বারান্দায় পায়রা বসে আছে দেখিস, তা হলে কথায় কথায় জানার চেষ্টা করিস তো পায়রাগুলোকে কীসের মণ্ড খেতে দেয় ওরা। যা বলবেন সব কাগজে লিখে নিবি কিন্তু, ভুলে যাস না।’
‘জি, আচ্ছা.....’
‘… হাভেলি নিশ্চই কোনও খানদানি পরিবারের নামেই অ্যালট হয়েছে। হয়তো তারা তোকে তাদের ওখানেই থেকে যেতে বলবেন। তবে বেটা, ওদের ঘাড়ে চাপিস না, হোটেলেই থাকবি। টাকা পয়সা আছে তো সঙ্গে?.... এই নে, আরও কিছু নিয়ে রাখ......’
‘বাপু, টাকা-পয়সা তো আমার কাছে যথেষ্ট আছে, আপনি চিন্তা করবেন না।’
‘পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করিস না কিন্তু! দেখে শুনে চলিস বেটা, আর পাসপোর্টটা শার্টের ভেতরের পকেটে রাখিস সাবধানে।’
‘জি......’
‘হাভেলি থেকে বেরিয়ে ঋষি ভবন ঘুরে আসবি। কাছেই তো সেটাও! ঋষি ভবনের দেখভাল কেমন হচ্ছে ফিরে এসে আমাকে জানাবি।’
‘ জি আচ্ছা......’
ট্রেনের হুইসিল পড়তেই কুলিদের ছুটোছুটি যেন বেড়ে গেল। আর মালপত্রে উপচে পড়া ঠেলাগাড়িগুলোর কর্কশ আওয়াজে কান যেন ফেটে যায়!
বাপুর চেঁচিয়ে কথা বলার অভ্যাস নেই, কিন্তু ওই সময় অত শোরগোলের মধ্যেও তাঁর কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
‘হাঁ বেটা, হাভেলি সে হো কর গোয়ালমণ্ডি কি তরফ নিকালোগে না.... তখন রামগুলির স্কুলটার সামনে দিয়ে বেরোবি। বাইরে থেকেই এক ঝলক দেখে নিলি না হয়। আরব হোটেলটার দিকেও একবার তাকাস। বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরা সেখানে বসেন। হোটেলে ঢুকলে সালাম-কুরনিশ করেই ঢুকিস বেটা!’
‘জি বাপু....’
বাপু তখন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করা ট্রেনের পাশে পাশে হাঁটছেন, চারদিকে হইহট্টগোলও তখন খুব।
‘চক বরফখানা থেকে নাকের সিধে গোয়ালমণ্ডির দিকে বেরোলেই দেখবি বিশাল পুস্তক ভাণ্ডার (??) (বইয়ের দোকান)। ফেরার সময় পয়সা বাঁচলে আমার জন্য ওখান থেকে পুরোনো একটা নভেলই না হয় কিনে নিলি। আমার পিতাজি তো নাস্তিক ছিলেন, আমাদের প্রতিবেশী তেমন কেউ ছিল না ......ওই যে বালারা, তাদের ঘর থেকে বই ধার নিয়েই তো পড়তেন। সব রকমের নভেল, কত সব নাম তাদের! তারই মধ্যে থেকে একটা আমার জন্যে নিয়ে নিস। তোকে সেসব নামের একটা তালিকা তো দিয়েই রেখেছি।’
‘জি বাপু, সব কাগজে লেখা আছে, আপনি চিন্তা করবেন না।’
‘দেখিস, সম্ভব হলে লাহোরের ঠান্ডি সড়কের ওপর রিগাল সিনেমাও ঘুরে আসবি। আমি তো সেই হলেই সায়গল আর যমুনার ‘দেবদাস’ দেখেছিলাম। ঠান্ডি সড়কের ওপারেই চেয়ারিং ক্রস ….. এপারে চিড়িয়াখানা, ওপারে ভাইসরয়ের অফিস। ওই চকেই রাখা রয়েছে পেতলের বড়সড় মূর্তি রানি ভিক্টোরিয়ার! রানি ভাইসরয়ের অফিসের দিকে মুখ করে বসে আছেন। আমি তো প্রায়ই গরমের দিনে দুপুরবেলায় বেরিয়ে ওদিকে যেতাম.... রানির পায়ের কাছেই শুয়ে থাকতাম..... সেখানেই ঘুমিয়েও পড়তাম...... আর বাড়ির লোকজন……’
বাপু সেই সব কথাই বলে চলেছিলেন — ছোটবেলা থেকে ওসব কতবার যে সে শুনেছে!
‘অউর হাঁ বেটা.....’
চলতে থাকা ট্রেনের পাশে পাশে দৌড়োতে দৌড়োতে এবার উনি বেদম হয়ে পড়ছিলেন, আর শেষমেশ পেছনে পড়ে গেলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেখা গেল যে বাপু আর সকলের থেকে আলাদা হয়ে প্ল্যাটফর্মের ওপর ঝুঁকে বসে কাশছেন। আর আশপাশে যাত্রীদের বিদায় জানাতে আসা বাকি সবাই দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে চলেছে।
এবারে ট্রেনের গতি দ্রুত হল। সব পেছনে পড়ে রইল।
‘মন দিয়ে শুনবেন, করাচি থেকে রওনা হওয়া আওয়াম১ এক্সপ্রেস ……..’
সে নিজের চামড়ার থলে আর সুটকেসটা হাতে নিয়ে বাইরে তাকাল। লাউডস্পিকারে করাচি থেকে লাহোরে আসার কোনও ট্রেন লেট হওয়ার খবর জানানো হচ্ছে। লাহোর রেল স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে ভিসা অফিস থেকে পাওয়া কাগজপত্র দেখিয়ে সে জানতে চাইল যে ভারত থেকে পাকিস্তানে পৌঁছোলে কোথায় খবর দিতে হয়।
বাইরে আলো তখনও বেশ উজ্জ্বল। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই এই কাজটা মিটিয়ে ফেলা জরুরি।
ওয়াগাহ্-র আগে আটারি-তে সে একটা পাঁচ শো টাকার কারেন্সি বদলে নিয়েছে যা আপাতত প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট। তাই অটোরিকশা ধরে নিতে দেরি হল না, রিপোর্টিং সেন্টারের রাস্তা ধরল।
জেলার এসএসপির সদর দপ্তরে ঢোকার সময় সে যেন একটু চিন্তিত, তাছাড়া ক্লান্তিও ছিল।
সঙ্গের কাগজপত্র সব একদম তৈরি ছিল। ভিসায় কোনও সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও অজানা একটা ভয় তার ওপর চেপে বসছিল। যেন মাথার ওপর থেকে আকাশের ছাউনিটা সরে গেছে।
রিপোর্টিং অফিসারের সামনের প্রশস্ত টেবিলের ওপর নিজের জিনিসপত্র রেখে একটা খালি চেয়ারে সে বসল বটে, তবে এমনভাবে যেন কোনও আসামী বসে আছে।
টেলিফোনে কথা বলতে বলতেই রিপোর্টিং অফিসার একবার নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর ফোন রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে তার দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, বলুন?’
‘আমি আজই দিল্লি থেকে লাহোরে এসে পৌঁছেছি।’
‘জি, দেখান আপনার কাগজপত্র।’
রিপোর্টিং অফিসার এটুকু বলেই বাইরে বেরিয়ে গেলেন। তিনি বেরিয়ে গেলে কামরার দরজাটাও আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
এখন সে ঘরে একা। আর এই অবস্থায় এক একটা মুহূর্ত কাটানোও যেন মুশকিল হচ্ছে। বেশ খানিক পরে কামরার দরজা আবার খুলতেই এবারে অবশ্য সেই অফিসার বেশ তাড়াতাড়ি সব কাজ করে দিলেন।
‘ফেরার সময়ও কিন্তু আপনাকে এখানেই রিপোর্ট করতে হবে। সেই সময় পর্যন্ত আপনার এই সব কাগজ আমাদের কাছেই থাকবে।’
‘বিলকুল সাহেব, আমি তো বেশ একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সব আপনার কৃপা.... নমস্কার।’
সে যখন আবার রেল স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছোল তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। লাহোর স্টেশনের সামনে অনেক ছোট-বড় হোটেল ছিল। তাদের নিয়ন সাইনগুলো জ্বলছিল আর নিবছিল।
অটো রিক্সা থেকে নেমে হোটেলগুলো একটু যাচাই করে নেওয়ার জন্য পার্কের ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল সে। পার্কের মধ্যে বেশ ভিড়। কেউ কেউ আবার মাথা মালিশ করাচ্ছে। আর পার্কের চারধারের রাস্তায় চক্কর কাটতে থাকা মোটর গাড়ি আর মিনিবাসের হেডলাইটের আলো ফোয়ারা ছোটাচ্ছে।
‘ভাইসাব, ইহাঁ সে চক দালগিরাঁ কিতনি দূর হোগা?’ সে পার্কের রেলিংয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করল।
‘কাছেই তো! ওই হোটেলগুলোর সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা হাতের(??)(delete) ডানদিকে এগিয়ে গেছে ওই রাস্তা ধরে নিন। কয়েক পা এগোলেই.....’
‘জি আচ্ছা,’ বলে সে আগে এগিয়ে গেল।
বাপু ঠিকই বলেছেন! কিছুই তো বদলায়নি। স্টেশনের পরে একটু এগোলেই চক দালগিরাঁ। সেখানে ঋষি ভবনের কাছেই লালা যশবন্তের হাভেলি। ওই সড়কের উপরেই তো আর সবকিছু। আর সবার শেষে পুস্তক ভাণ্ডার(??)। পায়ে হেঁটেই সব ঘোরা যায়।
থাকার জন্য তার যে হোটেলটা পছন্দ হল তার সামনেই ‘মানি চেঞ্জার’। সেখানে কারেন্সি বদল করে নিয়ে সে হোটেলে ঢুকল যখন(??) (যখন ঢুকল) তখনও পার্কে মাথা মালিশ করতে থাকা ছেলেদের হাতে ধরা তেলের বোতলের ঝংকার(??) পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল।
দোতলায় থাকার ঘরটা বেশ বড়সড় আর সাফসুতরো। ফোমের গদি, জানলাগুলোয় ভারি পর্দা ঝুলছে। টালি লাগানো বাথরুমে ঠাণ্ডা আর গরম জলের ব্যবস্থা। দিল্লির জামা মসজিদের আশপাশের এলাকায় এমন হোটেল তো একটাও মিলবে না! হ্যাঁ, কনট প্লেসে এমন হোটেল অবশ্য অনেকই আছে। স্নান সেরে হলে বসে রাতের খাবার খেতে খেতে সে এ সবই ভাবছিল।
হোটেলের বাইরে আর লাউঞ্জে উজ্জ্বল আলো থাকায় মনে হচ্ছিল রাত হয়তো তেমন বেশি হয়নি। ঘড়ির দিকে নজর পড়তে বোঝা গেল দশটা বাজে ।
অনেক দেরি হয়ে গেল। বাপু তো নটা বাজলেই শুয়ে পড়েন। ভারতের সময় আরও আধঘণ্টা এগিয়ে থাকায় সেখানে সাড়ে দশটা বেজে গেছে। সে তো পৌঁছোনোর খবরই দেয়নি! ভাবতেই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এল। পাবলিক কল অফিসের অপারেটর বাপুর নম্বরটা ধরিয়ে দিতে বোঝা গেল বাপু জেগেই আছেন।
‘হ্যালো….হ্যালো বাপু …. জি, পৌঁছে গেছি......আপনি এখনও জেগে...... জি বিলকুল ঠিক হুঁ..... আপনি প্লাটফর্মে অত কাশছিলেন, শরীরটা......জি, রিপোর্ট করেছি..... আপনি ঠিকই বলতেন ......সব যেমন কে তেমনই আছে...... জি, হোটেল থেকে কয়েক পা এগোলেই.....জি, মাতাজির সঙ্গে কথা.....জি, আমার মনে আছে, চক দালগিরাঁ থেকে সড়ক ধরে সোজা যেতে হবে....তাজ কোম্পানি, ইসলামিয়া কলেজ, আরব হোটেল আর তারপর চক বরফখানা.... গোয়ালমণ্ডির আগেই হাকিম মুসা অমৃতসরির দাওয়াখানা...... জি, মুঝে ইয়াদ হ্যায়.... প্রকাশনা বিভাগ..... জি, বাপু.....বাপু, আমি তো সবকিছুই কাগজে লিখে এনেছি। হ্যাঁ সকালেই বেরোব। জি, আগে হাভেলিতেই যাব, চিন্তা করবেন না। অনেকক্ষণ ফোন হয়ে গেল। সব যেমন ছিল তেমনই আছে বাপু। রাখি তাহলে বাপু?......’
সে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল। ফোনের বিলটা বেশ ভালোই উঠেছে। ঠিক আছে, কোই বাত নহিঁ। বাপুর চিন্তাটা তো কাটানো গেল। পাবলিক কল অফিস থেকে হোটেলে ফেরার পথে ভাবছিল সে।
ঘরে ফেরার পরে সে কিছুক্ষণ সেই জানলাটার সামনে খাড়া দাঁড়িয়ে রইল যেখান থেকে স্টেশন দেখা যায়।
রাত প্রায় এগারোটা বাজে। নিচে রাস্তায় ট্র্যাফিক কমে এসেছে। স্টেশনের সামনের পার্কের চারধারে নাচতে থাকা আলোর ঝলসানিও একটু যেন কম চোখে পড়ছে। হঠাৎই নজরটা পার্কের ঠিক মাঝখানে আলোয় উদ্ভাসিত ছোট টিলার ওপর এসে থেমে গেল।
‘আরে এটা কী?’
পার্কের ঠিক মাঝ বরাবর ছোট টিলাটা, আর তার ঠিক পাশেই বিরাট ক্ষেপণাস্ত্র আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে!
দিনের আলোতে এসব তো চোখে পড়েনি তার! হতে পারে হয়তো সারাদিনের ঝামেলায় নজর এড়িয়ে গেছে।
দিনের বেলায় এই টিলাটাও ওখানে ছিল তো? সে ধন্দে পড়ে গেল। চারদিকে সার্চলাইটের আলো পার্কের মধ্যে টিলা আর মিসাইলটিকে আলোকিত করে রেখেছে। পার্কের যে সব জায়গায় মাঝারি আলোতে লোকজন বসে মাথা মালিশ করাচ্ছিল তারাই এখন টিলার পায়ের তলায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে রয়েছে, কোনো নড়ন-চড়ন নেই তাদের। মাথা মালিশ করার ছেলেগুলোর হাতের তেলের বোতলের ঝংকারও(??) এখন আর শোনা যাচ্ছে না ।
দেখতে দেখতে এসব কী হয়ে গেল! তার মাথাটা সত্যিই ঘুরে গেল। জানলার পাশ থেকে সরে কামরার লাইট নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে।
বাপু তাকে পাথি গ্রাউন্ডে যেতে মানা করলেও চক দালগিরাঁ থেকে সে সিধে যেন সেদিকেই এগিয়ে চলেছে। রামগলির স্কুলের ছুটির পরে বাচ্চারা সব পাথি গ্রাউন্ডে এসে ফুটবল খেলছে। ‘ও বালে, ও চন্ডু!’ বাচ্চাদের মায়েরা খাবার খেয়ে নেওয়ার জন্য তাদের চেঁচিয়ে ডেকে চলেছে — ঘামে ভিজে সপসপে বাচ্চাগুলো জবাব দিচ্ছে, ‘খাবো না, এখন একটু খেলতে দাও তো!’ আর সরাই সুলতানের দিকে যেতে থাকা বাসগুলো ভেঁপু(??) (হর্ন) বাজাতে বাজাতে রীতিমতো লাইন ধরে তাদের পাশ দিয়ে চলেছে।
সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। হোটেলের লবিতে নাস্তা করার সময় ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে সে জানতে পারল যে রেল স্টেশনের সামনে পার্কে ওই টিলাটা হল বালুচিস্তানের চাগাই২ এর মডেল — আণবিক পরীক্ষার ফলে যার রং বদলে গিয়েছিল।
‘ওহ্!’ কথাটা শুনে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ম্যানেজার লাহোরের সব দর্শনীয় জায়গাগুলোর নাম কাগজে লিখে দিলেন: ভাটি গেট, মিনার-এ-পাকিস্তান, শাহী কেল্লা, বাদশাহী মসজিদ..... আরও অনেক নাম।
লবি থেকে উঠে ঘরে জামাকাপড় বদলাতে গিয়ে সে ভাবল হাভেলি তো কাছেই আছে, মাত্র কয়েক পা। যখন খুশি সেখানে যাওয়া যাবে। তার চেয়ে বরং অটোরিকশা ধরে কয়েকটা দর্শনীয় জায়গাই দেখে নেওয়া যাক।
দিন তখনই খুব চড়ে গেছে। মার্চের শেষ, রোদের তেজ বাড়ছে। ভাবতে ভাবতেই অটোরিকশা ধরে সে বেরিয়ে পড়ল।
ভাটিগেটের এলাকাটা দিল্লির জামা মসজিদের আশপাশের মতো। ঘুরতে ঘুরতে সে যখন মিনার-এ-পাকিস্তানে পৌঁছোল, সূর্য তখন মাথার ওপরে। রঞ্জিত সিং এর সমাধি দেখে শাহী কেল্লার চারধারে একবার ঘুরে নিল। তারপরে হুজুরি বাগ়-এ বাদশাহী মসজিদের সামনে গিয়ে বসে পড়ল। ভাটি গেট থেকে মিনার-এ-পাকিস্তান পর্যন্ত পায়ে হেঁটে আসা আর কেল্লায় ঘোরাফেরার পর বেশ ক্লান্তই লাগছিল তার।
ফেরার পথে অটো রিকশা ধরে আনারকলি বাজার আর পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি দেখার পরিকল্পনাটা বাদ দিল। তবে জাদুঘরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল।
‘ভাই, জাদুঘর চলো...’
সেখানে পৌঁছে দেখে জাদুঘরের ভেতরে রানি ভিক্টোরিয়ার বিশাল এক পেতলের মূর্তি রাখা আছে। বাপুজি কি এখানেই আসতেন নাকি এটা অন্য কোনও স্ট্যাচু? একটু অবাক হল সে। কত বছর আগের ঘটনা সে সব! হতেই পারে বাপু ভুলে গিয়ে তাকে ভুল জায়গার কথা বলে ফেলেছেন।
কাছে দাঁড়িয়ে থাকা জাদুঘরের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই ভাইসরয়ের দপ্তরটা কোথায় হবে?’
‘ভাইসরয়ের দপ্তর? বুঝতে পারছি না আপনি কোন দপ্তরের কথা বলছেন!’ লোকটা বোধহয় একটু লজ্জাই পেল।
ঠিক আছে এবার তাহলে ঠান্ডি সড়কের ওপর চেয়ারিং ক্রসে যাওয়া যাক।
সে জাদুঘর থেকে বেরিয়ে একটা অটোরিকশাকে থামাল।
‘ঠান্ডি সড়ক যানা হ্যায়, ভাই! চেয়ারিং ক্রস লে চলো।’
‘জি? ঠান্ডি সড়ক তো মুঝে মালুম নহিঁ! আপনাকে চেয়ারিং ক্রসে পৌঁছে দিচ্ছি, সেখানেই জেনে নেবেন ঠান্ডি সড়ক কোথায়।’
‘চলুন...’
সূর্য তখনও ডোবেনি। তা সত্ত্বেও সড়কের দুধারে যেন আলোর বন্যা বইছে। চেয়ারিং ক্রসে পৌঁছে না পাওয়া গেল ঠান্ডি সড়ক না ভাইসরয়ের অফিস! যে দু-একজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হল তাতে জানা গেল যে আলোয় ভাসতে থাকা এ সরণি এখন শাহরাহ্-এ কায়েদ-এ-আজ়ম অথবা মল রোড নামে পরিচিত। ভাইসরয়ের দপ্তরের কোনও চিহ্ন সেখানে নেই। চিড়িয়াখানাটা যে আশপাশেই সেটা বোঝা গেলেও চেয়ারিং ক্রসের একদিকে ওয়াপডা হাউসের আকাশচুম্বী ইমারত, আর অপর দিকে পাঞ্জাব অ্যাসেম্বলি হল। চেয়ারিং ক্রসের তিনকোনা আঙিনায় পার্ক তো আছে — তবে তার আশপাশের নকশা গেছে পুরো বদলে। বাপু তাকে পই পই করে যা বুঝিয়েছিলেন তার সঙ্গে এই জায়গার কোনওই মিল নেই!
সে চেয়ারিং ক্রসের ত্রিকোণ আঙিনার ভেতরে ঢুকে দেখল সেখানে রানি ভিক্টোরিয়ার কোনও মূর্তি নেই। তার জায়গায় মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি কোরআন শরিফ রেখে পড়ার জন্য বিশাল বড় একটা স্ট্যান্ড রাখা আছে। তার ওপর দেখা যাচ্ছে মার্বেল পাথর কেটেই তৈরি আস্ত একখানা কোরআন!
সে এক পা পিছিয়ে এল।
এই ভেবে ফাঁপরে পড়ল যে যদি এখন চেয়ারিং ক্রসের এই অবস্থা হয় তা হলে ঠান্ডি সড়কেরই বা কী হয়ে থাকবে! যার দুদিকে নাকি গাছপালায় ছাওয়া ছিল। ভাইসরয়ের দপ্তরটাই বা কোথায় চলে গেল!
বাপুর স্মৃতি কি তা হলে উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে? আজ তো তা হলে কোনওভাবেই বাপুকে ফোন করা চলবে না। ঠান্ডি সড়ক, রানি ভিক্টোরিয়ার মূর্তি আর ভাইসরয়ের দপ্তর চেয়ারিং ক্রস থেকে গায়েব হয়ে যাওয়ার সংবাদ তো তাঁর গভীর দুঃখের কারণ হবে।
কাল বরং ফোন করে দেব, আজ থাক। কিছু একটা কারণ দেখিয়ে দেব না হয়। বলে দেব ফোনের লাইন পাওয়া যাচ্ছিল না। চেয়ারিং ক্রসে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে এসবই ভেবে চলেছিল।
হোটেলের লবিতে রাতের খানা খেতে খেতে সে ম্যানেজারকে বলেই ফেলল, ‘ভাইসাব আমার তো ভাইসরয়ের অফিসে যাবার ছিল, কিন্তু অনেক খুঁজেও পেলাম না।’
‘কোথায় যাবার ছিল?
‘ভাই ঠান্ডি সড়ক পর ভাইসরয় কা দফতর হ্যায় না?’
‘জি, কৌন সা দফতর? এখনই জেনে দিচ্ছি(??) (নিচ্ছি)। আমি তো এই নামটা আপনার মুখ থেকেই প্রথম শুনছি। বলেই ম্যানেজার কাজে ব্যস্ত এক ওয়েটারকে ডেকে নিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করতে সেও গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। তখন ম্যানেজার আবার বললেন, ‘আমি লাহোরে আছি তাও তো আট-দশ বছর হয়ে গেল। কিন্তু এমন কোনও দপ্তরের নাম তো কখনও শুনিনি! যাই হোক জেনে ঠিকই নেব।’
‘আপনি কি মিনার-এ-পাকিস্তান আর শাহী কেল্লা ঘুরে এসেছেন?
‘জি, দেখে এসেছি। আমাকে কোনওভাবে একটু জেনে বলবেন তো। আমাকে তো ওই দপ্তরে যেতেই হবে!’
‘ঠিক আছে, জেনে নেব, আপনি চিন্তা করবেন না।’
রাতে শুয়ে শুয়ে সে এই ভেবে স্বস্তি পেল যে আগামী কাল তো হাভেলি ঘুরতে যাব — সেখানকার গলি-মহল্লা আর হাভেলির খবরাখবর দিলে বাপু নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন।
রাতে শোওয়ার সময় ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে দিয়েছিল যাতে সকালে উঠতে আবার দেরি না হয়। রোদের তেজ বেড়ে যাবার আগেই হাভেলি ঘুরে আসতে হবে।
সকালে উঠে আর দেরি করল না। ওয়াশরুম থেকে ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে হোটেলের লবিতে চলে এল। ম্যানেজার তখন সিটে ছিলেন না। সে হালকা জলখাবার খেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে বাপুর বলে দেওয়া রাস্তা ধরল।
বাপুর নির্দেশ মতো লুন্ডা বাজার সড়কের সমান্তরাল চলতে থাকা রেলওয়ে রোড ধরেই এগিয়ে চলল। তবে পথ চলতে চলতে ওদিকে যাচ্ছে এমন টাঙা অথবা সরাই সুলতান থেকে রেলওয়ে স্টেশনের দিকে আসতে থাকা কোনও লরিও তার চোখে পড়ল না।
মাঝে বহু সময় তো পেরিয়ে গেছে, সে ভাবল।
নিজেকে অমন ভেবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও এগোতে এগোতে সে বেশ কয়েকবারই দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পথচারীরা সকলেই এখন তাড়াতাড়ি পথ চলতে ব্যস্ত, আর ফুটপাতের ধারের দোকানগুলো খোলেনি। সে জিজ্ঞেস করার মতো কাউকে না পাওয়ায় এগিয়েই চলল।
চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছে নান-চানা ফেরিওয়ালার গাড়ি ঘিরে নাস্তা করতে থাকা লোকজন দেখে সে থেমে গেল।
‘ভাইসাব এটাই কি চক দালগিরাঁ? আমার সেখানে যাবার ছিল।’
কথাটা শুনে নাস্তায় মশগুল মোটাসোটা একজন বলল, ‘আপনাকে আর যেতে হবে না! আপনি নিরাপদেই চক দালগিরাঁয় পৌঁছে গেছেন। বিসমিল্লাহ! আসুন না, নাস্তা করুন!’
‘আমি জানতে চাইছিলাম সরাই সুলতানের লরির গুমটিটা কি কাছেই?’
‘সরাই সুলতানের লরির গুমটি?’
সবাই আশ্চর্য হয়ে বিড়বিড় করতে করতে তখন এ ওর মুখ দেখছে!
‘ঠিক আছে ছাড়ুন, তা হলে এটা বলুন যে লালা যশবন্তের হাভেলিটা কোন দিকে হবে?’
‘লালা যশবন্তের হাভেলি?’
আবার ভিড়ের লোকজন হয়রান হয়ে বিড়বিড় করতে লাগল।
‘আচ্ছা কোই বাত নহিঁ। ঋষি ভবন তো নিশ্চয়ই কাছেই হবে?’
‘ঋষি ভবন?’
এবার ভিড়ের সবাই তাজ্জব হয়ে তার দিকে ঘুরে দেখল। সে হতভম্ব হয়ে জোরে জোরে পা ফেলে সেখান থেকে সরে পড়ল।
তারপরে যতক্ষণ পর্যন্ত না চৌরাস্তার মোড়ের সব দোকানগুলো খুলছে সে নির্বোধের মতো সে(??) বাজারে একবার ডাইনে তো আবার বাঁয়ে ঘুরেই চলল। আরেকবার কাউকে জিজ্ঞেস করতে সাহসে কুলোচ্ছিল না।
ক্রমশই হতাশ হয়ে যখন পথ চলছে তখন জঞ্জাল ফেলার ঢাকা জায়গার পাশে একটা বেশ বড়সড় মেহেরাবি গেটের ওপর নজরটা আটকে গেল তার। গেটের লাগোয়া দেওয়ালে লেখা রয়েছে ‘সরাই সুলতান’। তার নিচে আরও কিছু লেখা, যা এখন আর পড়া যাচ্ছে না।
মনের মধ্যে খুশির লহর উঠল, মুখটা তার বিজলির আলোর ছটায় যেন উজ্জ্বল হল। সে সেই আবর্জনার স্তূপের দিকে এমন ভাবে এগিয়ে গেল যেন তার সবকিছু পাওয়া হয়ে গেছে।
সরাই সুলতানের মেহরাবি দরজার ভেতরে আধো অন্ধকারে ভরা কাবাড়িখানায় কুঁজো এক বুড়ো জঞ্জালের স্তূপ থেকে ভাঙাচোরা জিনিসপত্র বেছে আলাদা করার কাজে ব্যস্ত ছিল।
‘বাবাজি সেলাম! এটাই সরাই সুলতান?’
‘হ্যাঁ, এক সময় তাই ছিল!’
কোমর-ভাঙা বৃদ্ধ তার দিকে না তাকিয়েই বলল।
‘বাবাজি এখানে কি আগে লরির গুমটি ছিল?’
‘হ্যাঁ তাও ছিল। সে তো অনেক কালের পুরোনো কথা।’
‘আমি হলাম লালা যশবন্তের নাতি, বাবাজি। দিল্লি থেকে আসছি!’
‘কী বললেন? লালা যশবন্ত?’
বুড়ো কাবাড়িওয়ালা এবার ঘুরে তাকে দেখে বসার জন্য একটা মোড়া এগিয়ে দিল।
‘জি, ম্যাঁয় লালা যশবন্ত কা পুতা হুঁ, হাভেলিতে যাব। বাপুজি বলে দিয়েছেন ঋষি ভবনের মোড়ের কাছেই সে হাভেলি।’ সে মোড়ায় বসতে বসতে বলল।
‘হ্যাঁ, লালা যশবন্তের হাভেলি! কিন্তু এখন গিয়ে আর কী দেখবেন? ওখানে তো লেদ মেশিনের কারখানা বসেছে। ওই মোড় পর্যন্ত গিয়ে বাঁ হাতে এগোলেই ইমামবাড়ার পতাকা উড়ছে দেখবেন। তার ঠিক আগেই লোহালক্কড়ের কারখানা। ওটাই লালা যশবন্তের হাভেলি ছিল.....’
‘হায়, তা হলে সবকিছুই কি শেষ হয়ে গেছে বাবাজি?’
‘না বাড়িটা আছে। কিন্তু এখন আর সেখানে কেউ থাকে না। লেদের কারখানা বসেছে যে! চা খাবেন?’
‘আর ঋষি ভবন বাবাজি?’
‘নিন চা নিন। অনেক দূর থেকে আপনি এসেছেন। কোক, ফ্যাণ্টা খাবেন?’
‘বাবাজি বহত মেহেরবানি আপ কি। এই সবে নাস্তা করে এসেছি। এবার আসি? আপনি আপনার কাজ করুন, আমাকে আরও এগিয়ে যেতে হবে। গোয়ালমণ্ডির দিকে ঋষি ভবনটা কোথায় তা তো বললেন না।’
‘বেটা বললাম তো, তোমাদের হাভেলির পাশেই যে ইমামবাড়া সেটাই এককালে ঋষি ভবন ছিল। শুনেছি সাতচল্লিশের পরে মহকুমা দপ্তর থেকে কিছুদিন ওটাকে বন্ধ রাখা হয়। তারপরে ইমামবাড়া বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
কথাটা শুনে সে উঠে দাঁড়াল বটে, কিন্তু পা দুটোতে যেন তেমন জোর পেল না।
‘বৈঠো না বেটা!’
‘বাস বাবাজি, কুছ কাম হ্যায় ছোটেমোটে, এবার আসি। নমস্কার।’
‘জিতে রহো!’
কাবাড়ি বাবা আবার আবর্জনার স্তূপ থেকে লোহার ছাঁট বাছার কাজে মন দিল।
জিনিসে বোঝাই ঠেলাগাড়ি আর ধোঁয়া ছাড়তে থাকা অটো রিক্সার ভেতর দিয়ে রাস্তা করে নিয়ে এগিয়ে বাঁদিকে ঘুরতে ইমামবাড়াটা চোখে পড়ল।
ওই কয়েক পা রাস্তা আসতে যেন কয়েক শো বছর লেগে গেল তার। ইমামবাড়ার পাশের ভাঙাচোরা হাভেলির দেউড়ির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। ভেতরে দেখতে পেল লেদ মেশিনের উপর ঝুঁকে মিস্ত্রিরা কাজ করছে, মেশিন থেকে আগুনের ফুলকি বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে।
সে সেখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঋষি ভবনের দিকে চেয়ে দেখল। ইমামবাড়ার উপরে কালো পতাকা লতপত করছে। পুরোনো ইমারতকে নতুন প্লাস্টার করে রংয়ের প্রলেপ লাগানো হয়েছে।
ঘুরে দাঁড়িয়ে চক দালগিরাঁ হয়ে গোয়ালমণ্ডির পথ ধরল সে। সামনে একটা ভাঙাচোরা বাড়ির চুড়োয় কতগুলো পায়রা বসে আছে। এদের মধ্যেই সিরাজি, লক্কা আর লোটন পায়রাও হয়তো আছে, কে জানে!
চলতে চলতেই তাজ কোম্পানির সদর দরজার ওপর চোখ পড়তে ভেঙেচুরে যেতে থাকা মনটায় হঠাৎ যেন আনন্দের লহর উঠল। কিন্তু পর মুহূর্তেই তা স্তিমিত হয়ে এল। পুরোনো বাড়িটার বাইরের দেওয়ালে নিলাম হবার ইশতেহার সাঁটা আছে। আরও এগোতে ডানহাতে ইসলামিয়া কলেজটাকে তো পাওয়া গেল, কিন্তু তার সামনে আরব হোটেলের কোনও চিহ্ন মিলল না। তার বদলে মেটাল পাইপ, স্যানিটারি আর রবারের জিনিসের সারি সারি দোকান দেখা গেল যাদের দুদিকেই দরজা। জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে বহুদিন হল আরব হোটেল উঠে গেছে। পাশেই রামগলি দেখতে পেয়ে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
বাপুর স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত রামগুলির সেই পুরোনো ব্যালকনিগুলো ভাঙা পড়েছে। গলি ধরে আরও এগোতে একটা ইস্কুল চোখে পড়ল। পুরোনো বাড়ির সামনে নাম লেখা ‘মুসলিম মডেল স্কুল’। তার মনে হল বাপু নিশ্চয়ই এই স্কুলেই পড়তেন যখন বালা আর চান্দু তাঁর সহপাঠী ছিল। স্কুলের গেটটা বন্ধ হলেও ভেতরে বাচ্চাদের দৌড়োদৌড়ির আওয়াজ পুরো গলিটাকে সরগরম করে রেখেছে!
চক বরফখানা থেকে এগিয়ে হাকিম মুসা অমৃতসরির দাওয়াখানা দেখতে পেলেও কাছাকাছি কোনও পুস্তক ভাণ্ডার(??) চোখে পড়ল না। আশপাশের দোকানদারদের কাছ থেকে খবর পাওয়া গেল যে গত বছর পাঞ্জাবের প্রকাশনা সংস্থার বাড়ি ভেঙে ফেলা হলেও জায়গাটা কিছুদিন পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। এখন সেখানে নবনির্মিত প্লাজ়া খাড়া দাঁড়িয়ে। নাম তার হামজা সেন্টার। আর তার ভেতরেও ধাতুর পাইপ, স্যানিটারি জিনিসপত্র আর রবার শিটের স্তূপ চোখে পড়ছে।
সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নতুন বাড়িটার দিকে চেয়ে রইল — কেমন দেখল বাপুকে বলতে হবে তো। হঠাৎই হামজ়া প্লাজ়া আর একটা ইলেকট্রিক পোলের মধ্যে টাঙানো ক্যানভাসের বিশাল ইশতেহার নজরে পড়ল। উর্দু তেমন না জানায় সে সবটা পড়তে পারল না। লেখা আছে:
‘চলো চলো মুলতান চলো
তিনদিনের সুন্নতে ভরা ইজতিমা৩
শের শাহ বাইপাস, সেহেরা-এ-মদিনা, মুলতান
ইসলামে বিশ্বাসীদের কাফিলা এগিয়ে চলেছে!’
সে ক্লান্ত পায়ে এবার হোটেলের পথ ধরল। মাথায় ঘুরছে আজ তো বাপুকে ফোনটা করতেই হবে। তাকে কী বলবে কী না বলবে এই চিন্তা হোটেলের লবিতে পৌঁছোনো পর্যন্ত তাকে যেন(??) আচ্ছন্ন করে রাখল।
‘আজ তো আপনি সাত সকালেই বেরিয়ে পড়েছিলেন! কোথায় কোথায় ঘুরলেন?’ ম্যানেজার হাসলেন।
‘সব জায়গাগুলোই তো দেখে এলাম ম্যানেজার সাহেব। খুব ক্লান্ত, আজ আর বসব না। খানা ওপরেই পাঠিয়ে দেবেন।’
‘শরীর ঠিক আছে তো আপনার?’
‘হ্যাঁ ঠিকই আছি, শুধু একটু ক্লান্ত লাগছে।’ সে কামরার চাবিটা নিয়ে ওপরে উঠে গেল।
বাকি দিনটা ঘরেই কাটিয়ে যখন নিচে এল তখন সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়েছে। ম্যানেজার তাকে দেখে দূর থেকে হাত নাড়লেও সে লবিতে দাঁড়ালো না, বাইরে বেরিয়ে এল।
পাবলিক কল অফিসের অপারেটর যখন দিল্লির নম্বরটা ধরিয়ে দিলেন তখন সে বুঝল আগের দিন ফোন না করায় বাপু বিরক্ত হয়েছেন।
‘কিন্তু বাপু আজ তো আমি হাভেলি ঘুরে এসেছি! সেখানে সব যেমন ছিল তেমনই আছে বাপু। কোনো কিছুই তো বদলায়নি! আমি তো অবাক হয়ে গেলাম দেখে যে চক দালগিরাঁ আর রামগুলির বয়স্করা তাদের দাদাজানকে এখনও ভোলেননি। ইকবাল গুজ্জর, যাকে আপনি বালা বলে ডাকতেন তিনিও জীবিত আছেন, সুস্থ আছেন! দেখা করলাম, খুবই ভালোবাসলেন। বলছিলেন তোর পিতাজি তো আমার থেকে দু-চার মাসের ছোটই হবে। সে কীভাবে বুড়ো আর নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে? উনি আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনাও করলেন।
‘হাভেলিতে এখন যারা থাকে তারাও খানদানি লোক বাপু! আমাকে তো ওখানেই থেকে যেতে বলছিলেন, কিন্তু আমি হোটেলেই আছি বাপু। হাভেলির উঠোন পেরিয়ে ঢুকেছিলাম ভেতরে, বারান্দার ছাউনির তলায় এখন তক্তপোশ আর নেই। বহু বছর তো কেটেও গেছে। কিন্তু আঙিনার কুয়োটা যেমন কে তেমনই আছে, ঠিক যেমনটি আপনি বলেছিলেন। শুধু ওরা কুয়োর জল তোলার জন্য একটা মোটর লাগিয়েছেন দেখলাম।
‘ওপরের চাঁদোয়াতে পায়রাও আছে! আর ঋষি ভবনের সৌন্দর্য তো দেখার মতো বাপু! মন্দিরে প্রার্থনা হচ্ছে, দীন-ধর্মের নেই কোনোও বাছবিচার। দানপুণ্যের জন্য অনেকে আসছেন দেখলাম। সব কিছু তেমনই আছে বাপু। ফিরে বাকি সব আপনাকে বলব। আর দু-চারদিন এখানে ঘোরাঘুরি করেই ফিরব বাপু। না, না, বেশি দেরি করব না। ঠিক আছে বাপু.......’
কথা চলতে থাকলেও এবার সে নিজেই ফোনটা কেটে দিল।
‘একটা ভার যেন মন থেকে নেমে গেল,’ সে নিজের মনেই বিড়বিড় করল।
হোটেলে ফিরে লবিতে বসে ভোজন সেরে ম্যানেজারের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে নিজের ঘরে চলে গেল সে।
দুপুর থেকে সন্ধে পর্যন্ত চিন্তাভাবনা আর ঘরময় অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিছানায় শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হল।
ঘুমের মধ্যে সে দেখছে যে গরমকাল, চারিদিকে লু বইছে, ঠান্ডি সড়কের দুধারের ঘন গাছের ছায়ায় লোকজন বসে আরাম করছে। আর চেয়ারিং ক্রসের ত্রিকোণ প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে বাপু শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন। জানেন না যে ঠাণ্ডা ছায়ায় শুয়ে আছেন তিনি তা রানি ভিক্টোরিয়ার মূর্তির নাকি মার্বেল পাথর কেটে তৈরি করা কোরআন রাখার টেবিলের!
১‘আওয়াম’ হল জনগণ। এই নামের একটি ট্রেন, যার পরিষেবার সূচনা হয়েছিল ১৯২৫-এ, এখনও করাচি থেকে পেশোয়ারের মধ্যে যাতায়াত করে।
২বালুচিস্তানের ‘চাগাই’ অঞ্চলে ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন আণবিক বোমা নিয়ে যে পরীক্ষা চালিয়েছিল তাতে পাহাড়ের কালো গ্র্যানাইট পাথরের রং বদলে সাদা হয়ে যায়।
৩সুন্নি ইসলামি সংগঠন দাওয়াত-এ-ইসলামি কর্তৃক আয়োজিত আধ্যাত্মিক ধর্মীয় সমাবেশ যেখানে জনসাধারণকে ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোর শিক্ষা দেওয়া হয়।