• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গল্প
    Share  
  • হাওয়াবাড়ি : মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

    তিস্তাবাজার ছাড়িয়ে আমাদের গাড়িটা ওপরে উঠতেই নড়েচড়ে বসলাম। দু’ধারে জারুল গাছ, সবুজ আর বেগুনি ছোপ, মাঝখান দিয়ে উঠে গেছে কালো পিচের রাস্তা। পথের দু’ধারে নিস্তব্ধ সেগুনবন, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মতো ধ্যানমগ্ন পাহাড়। অনেক নীচে পাহাড়ি জনপদ, দেশলাই বাক্সের মতো ঘরবাড়ি, পুতুলমানুষ, ফিতেনদী। বাইরে কুয়াশা, মেঘ আর রোদ্দুর এক্কাদোক্কা খেলছে। জানলার কাচ নামিয়ে হাত বাইরে রাখতে না রাখতেই চট করে ঢুকিয়ে নিলাম ভেতরে। উরেব্বাস কী ঠাণ্ডা রে বাবা!

    আমাদের নিজেদের গাড়ি নেই তো কী হয়েছে বেড়াবার শখ আছে ষোলো আনা। বাড়ি থেকে দু’পা দূরেই তো পাহাড়। আর কে না জানে পাহাড় ঋতু অনুযায়ী ভোল বদলায়। বসন্তের চেনা পাহাড় বর্ষায় হয়ে যায় অচেনা। তাই প্রতি ঋতুতেই পাহাড়ে পাড়া বেড়াতে না পারলে ভাত হজম হয় না। ফি মাসে স্যালারি অ্যাকাউন্টে মাইনে ক্রেডিট হতে না হতেই কোন পাহাড়ে ঢুঁ মারা যায় সেই প্ল্যান ভাঁজতে থাকি। পাইন বনে কাঁধে রোদ মেখে হাঁটছি ভেবে ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরে শুই।

    আমাদের গাড়ির অল্পবয়সি চালক নেপালি। কী একটা যেন খটোমটো নাম, মাথায় থাকে না মোটেই, পিছলে বেরিয়ে যায়, তবে পদবী মোক্তান যেটা মনে রাখা সহজ। গাড়িতে চেপেই তাকে মোক্তান ভাই বলে ডাকতে শুরু করে দিলাম। আমরা বলতে আমরা চারজন। আমি, স্বাতী আর আমাদের দুই ছানাপোনা।

    আগে থেকে বুকিং টুকিং করে বেরোইনি আমরা। একবার ভাবছিলাম ইচ্ছেগাঁও গেলে কেমন হয়। সেই প্রস্তাব ধ্বনিভোটে খারিজ হয়ে গেল। সকলে বলল, গড়িয়াহাটার মতো থিকথিকে ভিড় এখন ওখানে। মাথা চুলকে বললাম, লামাহাটা যাওয়া যায়? স্বাতী বলল, দুর্গাপুজোর ম্যাডস্ক স্কোয়ারের মতো অবস্থা এখন লামাহাটায়। তাহলে? তিস্তাবাজার ছাড়াবার পর ডেস্টিনেশন সেট করা হল। ভোটাভুটি হল নিজেদের মধ্যে। তিনচুলেই ভোট পেল বেশি।

    তিনচুলে বার তিন-চারেক এসেছি। আগে থেকে বুক করে গুরুং হোমস্টেতে থেকেছি। কিন্তু এখন সিজন টাইম। সেখানে ঠাঁই হল না। মোক্তান ভাই মাথাটাথা চুলকে বলল, তিনচুলে থেকে তাকদা যাওয়ার পথে হাওয়াবাড়ি নামে একটা জায়গা পড়ে। সেখানে আমার চেনা হোমস্টে আছে। গোর্খা হোমস্টে। গত বছর কলকাতার একটা ট্যুরিস্ট পার্টিকে নিয়ে এসেছিলাম। ওরা আমাকে খুশি হয়ে এক্সট্রা টিপস দিয়েছিল। যাবেন?

    আগে ঘুরে গেছে, বলে ছিল মোক্তান ভাই, কাজের সময় দেখা গেল সে ব্যাটা নিজেই রাস্তা চিনতে পারে না। জিপিএস-এ সার্চ করতে গিয়েও নাকাল দশা। এক একবার এক একরকম পথনির্দেশ দিয়ে মোবাইল ফোন বিভ্রান্তি বাড়ায়। হোমস্টে মালিকের ফোন নম্বরও নেই মোক্তান ভাইয়ের কাছে। এদিক সেদিক চক্কর খেয়ে অবশেষে ঠিক জায়গায় যখন পৌঁছনো গেল ততক্ষণে দুপুরের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। মোক্তান ভাই গাড়ি দাঁড় করাল রাস্তার ধারে। গাড়ি থেকে নেমে আড়মোড়া ভেঙে বলল, এটাই হাওয়াবাড়ি। এই যে নীচের পাইনবন দেখছেন, হোমস্টেটা তার আড়ালে আছে বলে দেখা যাচ্ছে না। ওই রাস্তা ধরে দু’কদম নীচে নামলেই গোর্খা হোমস্টে পাওয়া যাবে।

    দু’কদম যে আসলে দু’কদম নয় সেটা বুঝলাম নীচে নামতে গিয়ে। রাকস্যাক কাঁধে মোক্তান নামছে আগে আগে, সঙ্গে স্বাতীরা তিনজন। সকলের হাতে নিজের নিজের লাগেজ। আমার হাতে ভারী ট্রলি। ট্রলিটা মাটিতে নামিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম মৌজ করে। আহা, কী শান্ত চারদিক। কানে আসছে নানারকম পাখির ডাক। পিউ কাহাঁ ডাকটা চিনলাম। অন্য ডাকগুলো অচেনা। কত যে গাছ চারদিকে। গাছগুলো এতই পুরনো আর উঁচু যে আমাদের আগের জেনারেশনের মানুষ হলে এদের বৃক্ষ বলতেন। এদের মধ্যে দু-চারটে মোটে চিনি। বেশিরভাগ গাছই চিনি না। সামনে সরু সুঁড়িপথ, দিনের বেলাতেই ঝিঁঝিঁ ডাকছে। দূরে কোথাও মনাস্ট্রি আছে। সেখানে প্রার্থনা চলছে। বহু দূর থেকে ভেসে আসা মন্ত্রের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে পাইন বনে।

    এবার হল কেলো। পাইনবনের ভেতর দিয়ে চলা সরু রাস্তাটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একগাদা মেঘ আর কুয়াশা এসে এলাকা ঢেকে দিয়েছে। স্বাতীরা কোন পথে নেমেছে জানি না। ফোন বের করলাম। ও হরি, দেখি নেটওয়ার্ক নেই। এবার? ঠাকুরকে ডাকব কি না ভাবছিলাম, তখনই দেখি পথের ধারে একটা বেঞ্চের মতো আছে, গাছের কাণ্ড কেটে বানানো, বেঞ্চে মঙ্গোলয়েড মুখের এক ভদ্রলোক বসা। গায়ে টমেটো রঙের ফুল সোয়েটার, কালো প্যান্ট। সাদা মাফলার গলায় জড়ানো। পায়ে কেডস। চোখে নিকেলের গোল ফ্রেমের চশমা। মাথায় গোর্খা টুপি। বয়স ষাটের কাছাকাছি। নেপালিতে জিজ্ঞেস করলাম, দাজুভাই, গোর্খা হোমস্টে কোন পথে পড়বে? আমার অসামান্য নেপালি শুনেই বোধ হয় সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক হেসে ফেললেন। হাসিমুখে আঙুল উঁচিয়ে ডানদিকের রাস্তাটা দেখালেন। তাঁকে থ্যাংকস দিয়ে ট্রলি হাতে নামতে লাগলাম হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে।

    দু’কদম হাঁটার কথা বলেছিল মোক্তান ভাই; প্রকৃত প্রস্তাবে দেখা গেল তা অন্তত দুশো ফিট। এত ঝুটঝামেলা করে এতটা পথ নামার পর এই হোমস্টে যদি না-পসন্দ হত তাহলে হত চিত্তির। কিন্তু ছানাপোনারা বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে গোর্খা হোমস্টে ওদের পছন্দ হয়েছে জানিয়ে আশ্বস্ত করল। আলাপ হল প্রবীণ ও দুর্গারানি ছেত্রীর সঙ্গে। প্রবীণ এক্স আর্মি। রিটায়ারমেন্টের পর ঘরে ফিরে এসে হোমস্টে ব্যবসা চালু করেছেন। একজন পরিচারক আছেন তাঁদের সাহায্য করার জন্য। তাঁর নাম সুমন ভুজেল। পাশাপাশি তিনটে দ্বিশয্যাবিশিষ্ট ঘর। কিচেন আর ডাইনিং আলাদা। ড্রাইভারের জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা। আমরা নিজের নিজের ঘরে সিঁধিয়ে গেলাম। ঘরের ভেতর ছোট্ট একটা ব্যালকনি। কোমর অবধি রেলিং দেওয়া। ঠিক নীচে শুরু হয়েছে ঢেউ খেলানো জঙ্গল যা শেষ হয়েছে একটা টিলায় গিয়ে। তার ওদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার আভাস।

    দুর্গারানি এই অবেলায় ভাত বসালেন আমাদের জন্য। সুমন ছুরি দিয়ে খুটখুট করে সবজি কেটে ফেললেন। প্রবীণও হাত লাগালেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রেডি হয়ে গেল ভাত, ডাল, রাই শাক, আলু-স্কোয়াশের সবজি আর ডিমের ঝোল। সেই সঙ্গে ডালে খরসানি, মানে আগুনে ঝাল লঙ্কার আচার। খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল প্রবীণ আর দুর্গারানির সঙ্গে। দুই যমজ ছেলে ওঁদের। রাজেশ আর রাকেশ। দুজনই আছে ইন্ডিয়ান আর্মির গোর্খা রেজিমেন্টে। তাদের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা চলছে। কিন্তু ছেলেরা এখন বিয়ে করতে চায় না মোটেই। তা নিয়ে বাপ-মায়ের সঙ্গে ফোনে নিত্য অশান্তি লেগেই থাকে দুই পুত্রের।

    বিকেলে অল্প হেঁটে এলাম জঙ্গুলে জায়গাটা দিয়ে। বিকেলের বাসি হলুদ রংয়ে ধূসর ছাপ ধরছিল। সাড়ে পাঁচটা বাজতে না বাজতেই অন্ধকার নেমে এল ঝুপ করে। তারা ফুটে উঠল আকাশে। ঝাঁকে ঝাঁকে তারা। নাকে এসে ঝাপটা খেতে লাগল বুনো ফুল আর অর্কিডের গন্ধ। কানে ভেসে আসতে লাগল অচেনা পোকামাকড়ের কলতান, ঝিঁঝিঁর ডাক। তার সঙ্গে মিলেমিশে গেল কালো অন্ধকার। শেষ কবে এমন নিকষ অন্ধকার দেখেছি মনে করতে পারলাম না। নিজের হাত পা কোথায় আছে নিজেরই মালুম হচ্ছে না। পাহাড়ি অন্ধকারের মধ্যে বেশ একটা নেশা নেশা ব্যাপার আছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মাথা ঝিমঝিম করে। নাগরিক চাওয়া পাওয়া, দৈনন্দিনের দ্বন্দ্ব আর ছায়াযুদ্ধ থেকে অনেক দূরে এই নিবিড় অন্ধকারে ডুবে থাকার লোভেই তো সাধ হয় ঘন ঘন পাহাড়ে পা রাখতে।

    কনকনে হাওয়া দিচ্ছে। ড্রাগনের ছবি আঁকা মুন্ডি দেওয়া চিনেমাটির কাপে চা নিয়ে এলেন দুর্গারানি। দার্জিলিং চা, দুধ চিনি দেওয়া। চিকেন মোমোর প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলেন সুমন। প্রবীণ এলেন সঙ্গে সঙ্গে। আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, পাহাড়ে আমাদের নিত্য আসা যাওয়া। হাওয়াঘর নামে একটা ভিউপয়েন্ট আছে ঘুমের কাছে, সেটা জানি। লীলা মজুমদারের ‘বাতাসবাড়ি’-র কথাও জানি, কিন্তু হাওয়াবাড়ি নামে যে একটা পাহাড়ি গ্রাম আছে সেটা এই প্রথম জানলাম।

    দুর্গারানি বললেন, এখন তো তবুও কিছু বাড়িঘর দেখছেন। আটের দশকের শেষে আমি যখন এই বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসি তখন এসব কিচ্ছু ছিল না। একটা দেশলাই বাক্স কিনতে হলেও যেতে হত তিনচুলেতে। থাকার মধ্যে ছিল ভাঙাচোরা একটা স্কুলঘর। ওপরে টিনের চাল। বেঞ্চ টেঞ্চের বালাই ছিল না। ছাত্ররা মাটিতে বসে পড়াশোনা করত। ওদিকটায় ঢেউ খেলানো পাইনের জঙ্গল দেখেছেন? তার ওদিকে পাহাড়ের টঙের ওপর ছিল স্কুলটা। খোলা জায়গা বলে হু হু হাওয়া দিত সারাদিন। কী জানি সেই থেকেই হাওয়াবাড়ি তার নাম পেয়েছিল কি না।

    প্রবীণ বললেন, আমার বাবা সিংহাসন ছেত্রী ছয়ের দশকে হাওয়াবাড়ি এসেছিলেন প্রাইমারি স্কুলে চাকরি নিয়ে। ভাড়া থাকতেন তিন কিমি দূরের তিনচুলেতে। পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতেন। এখানে থাকতেন আমার দাদু-দিদিমা। দাদু কৃষিকাজ করতেন। ওঁদের তিন ছেলেমেয়ে জন্মের পর পরই মারা যায়। আমার মায়ের জন্ম তার পর। সে কারণে মা ছিলেন ওঁদের চোখের মণি। দাদু-দিদিমা মায়ের বিয়ে দেন গলা অবধি ধার করে। বাবাকে ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে সেটাই ছিল শর্ত। চালচুলোহীন বাবা এই শর্তে রাজি হয়ে যান। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার জন্ম এই বাড়িতে।

    স্বাতী বলল, স্কুলটা আছে এখনও?

    প্রবীণ বললেন, না নেই। পাহাড়ের আন্দোলনের সময় অ্যাকটিভিস্টরা পুড়িয়ে দিয়েছিল স্কুলবাড়িটা। বাবা বাধা দিতে গিয়েছিলেন বলে খুব মারধোর করেছিল ওরা। মুখে ভুষোকালি মাখিয়ে রাস্তায় হাঁটিয়েছিল। সেই অপমান মেনে নিতে পা্রেননি বাবা। হাসিখুশি মানুষটা ভেঙে পড়েছিলেন। লজ্জায় ঘর থেকে বেরোতেন না পারতপক্ষে। মা চোখে চোখে রাখছিলেন বাবাকে। কিন্তু এমন যে হতে পারে সেটা কেউ কল্পনা করেনি। স্কুলবাড়িটা যেখানে ছিল এক বর্ষার বিকেলে সেই পাহাড়চুড়োর মাথা থেকে খাদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বাবা। রিটায়ারমেন্টের তখন অল্প কিছুদিন বাকি। আমি তখন চাকরিসূত্রে লাদাখে।

    প্রবীণ বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। দুর্গারানি একটা বড় শ্বাস ফেলে তাঁর স্বামীকে অনুসরণ করলেন। সুমন ভুজেলও চলে গেলেন তাঁদের পেছন পেছন। ঘরের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা রয়ে গেল শুধু। রাতের মেনু চিকেন কষা, হাতে গড়া রুটি আর আলুভর্তা। আমার পুত্রের প্লেটে আরও দু’খানা চিকেন দিতে যাচ্ছিলেন দুর্গারানি। সে মৃদু আপত্তি জানিয়ে বলল, তিন পিস খেয়েছি তো! ভদ্রমহিলা বকুনি দিয়ে বললেন, গিনতা কিঁউ রে বেটা? স্বাতী আর আমি স্মিতমুখে দৃষ্টি বিনিময় করলাম। পাহাড়ি মানুষজনের অন্তরের ঐশ্বর্যের সত্যিই কোনও তুলনা হয় না।

    খাওয়া দাওয়ার পর ব্যালকনিতে এসে সিগারেট ধরালাম। চারধারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঝুপসি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আদিম সব বৃক্ষ। তারাভরা আকাশ। জঙ্গলের মাথায় টিলার মতো জায়গাটা। এককালে যেখানে ছিল হাওয়াবাড়ি প্রাইমারি স্কুল। তারও ওদিকে কালিম্পং শহরের আলো। আদিম নির্জন পাহাড় ছুঁয়ে ভেসে আসছিল কুয়াশাভেজা মেঘ। স্বাতী আমার পাশে এসে বসল। অন্যমনস্ক গলায় বলল, সব পাহাড়েই নানা রংয়ের গল্প ছড়িয়ে থাকে। এখানে এসে যেমন সিংহাসন ছেত্রীর গল্পটা জানা হল। মনটা কেমন ভারী হয়ে গেল, তাই না?

    পরদিন সকাল আটটার মধ্যে চলে এল ব্রেকফাস্ট। বাটার টোস্ট, ওমলেট, পাকা পেঁপে, কলা আর দার্জিলিং চা। আজ দুধ চা নয়, কমলারঙের সুগন্ধি চা। প্রাতরাশ শেষে মোক্তান ভাইয়ের গাড়িতে চেপে বেরিয়ে পড়া হল সাইট সিয়িং করতে। তাকদা ফরেস্ট, তিনচুলে, লামাহাটা। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সারা হল লামাহাটায়। সারাদিন চক্কর কেটে সন্ধের পর ফিরলাম হাওয়াবাড়িতে। তখন সন্ধে ঘন হতে শুরু করেছে।

    দুর্গারানি রাইস নুডলস বানিয়ে নিয়ে এলেন আমাদের জন্য। সঙ্গে কফি। কফিতে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কর্তা কোথায়? তাঁকে তো দেখছি না?

    দুর্গারানি বললেন, তাকলিং গ্রামে ওর এক কাজিন দাদা থাকে। লিভারের সমস্যায় ভুগছিল। সেই দাদা মারা গেছে আজ সকালে। খবর পেয়েই প্রবীণ তাকলিং চলে গেছে। দাহকাজ শেষ হতে হতে রাত্তির হবে। কাল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রওনা দিয়ে ও হাওয়াবাড়ি ফিরে আসবে। হোমস্টেতে অতিথি এলে প্রবীণই সামলায়। ও নেই আজ। আপনাদের আদরযত্নের ত্রুটি হলে আমাকে নিজ গুণে মাফ করে দেবেন।

    স্বাতী বলল, ছি ছি এভাবে কেন বলছেন! আপনি নিঃসঙ্কোচে আমাকে হেঁশেলে ঢুকতে দিতে পারেন। আপনাদের দুজনকে আমি রান্নার কাজে সাহায্য করতে পারি।

    দুর্গারানি বললেন, অতিথি হল ভগবান। আপনি যে নিজে থেকে এ কথা বলেছেন এটাই ঢের। আপনার সাহায্যের দরকার হবে না। তাছাড়া সুমন ভাই তো আছেই আমাকে হেল্প করার জন্য।

    স্বাতী ডিটেকটিভ গল্পের বইতে ডুবে ছিল। ছেলেমেয়েরা গেম খেলছিল মোবাইলে। আমি হোমস্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলাম। সুমন ভুজেল নিঃশব্দে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। দু’হাত দিয়ে বোতলের আকৃতি ইশারা করে নীচু গলায় বললেন, কিছু লাগবে নাকি সাব? বললে জোগাড় করে দিতে পারি। পঞ্চাশ টাকা বেশি পড়বে।

    আমি হেসে বললাম, কিচ্ছু চাই না। রান্না কতদূর?

    সুমন বললেন, আমি মশলা বেটে মাংস ধুয়ে রেখেছি। সবজিও কেটেকুটে দিয়েছি। এখন দুর্গা বইনি রান্না করছেন। কাল আপনাদের চেক আউট কখন?

    আমি বললাম, দশটার মধ্যে বেরিয়ে পড়ব। আমাদের জন্য ব্যস্ত হতে হবে না। আমরা রাস্তাতেই কোথাও ব্রেকফাস্ট করে নেব।

    সুমন বললেন, আমি ভোরবেলা উঠি। কোনও চিন্তা নেই সাব, সকাল আটটার মধ্যেই পুরি সবজি বানিয়ে দেব আপনাদের জন্য।

    আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে জানতে চাইলাম, এই হোমস্টেতে গেস্ট কেমন আসে টাসে?

    সুমন ব্যাজার মুখে বললেন, তেমন একটা আসে না। হাওয়াবাড়ির নাম ট্যুরিস্ট এখনও সেভাবে জানে না। ম্যাগাজিনে বা পত্রপত্রিকায় কেউ এই জায়গাটা নিয়ে লেখে না। ট্যুরিস্ট এর কথা জানবে কী করে?

    আমি বললাম, বহু মানুষ নির্জন পাহাড় পছন্দ করে। হাওয়াবাড়ি এখনও ভার্জিন। সেই ব্যাপারটাকে প্রোমোট করে সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও বা রিল বানাতে বলুন প্রবীণদাজুকে। তবে না লোকে গোর্খা হোমস্টের কথা জানবে?

    সুমন বললেন, ওসব প্রবীণদাজুর কর্ম নয়। রাজেশ আর রাকেশ এবার ছুটিতে এলে ওদের বলব রিল বানিয়ে দিতে।

    আমি হেসে বললাম, হাওয়াবাড়ির কথা আমার মনে থাকবে একটা বিশেষ কারণে। সেটা কী বলুন তো? এই হোমস্টে দেখভাল করছেন যে তিনজন তাঁরা সকলেই সাদা চুলের মানুষ। এমন সচরাচর দেখা যায় না।

    সুমন হেসে বললেন, আমি যে কর্মচারী ওঁরা আমাকে সেটা বুঝতে দেন না কখনও। আমার বাপ-মা নেই। মামাবাড়িতে মানুষ। মামা তাকদায় ফরেস্ট গার্ডের চাকরি করত। অভাবের সংসার। তার মধ্যেও আমাকে ফোর অবধি পড়িয়েছিল। যদিও আমার মোটা মাথায় পড়াশোনা ঢুকত না। আমি গাধা ছিলাম পড়াশোনায়, সিংহাসন স্যার পিটিয়েও আমাকে ঘোড়া বানাতে পারেননি।

    আমি বললাম, আপনি সিংহাসন স্যারকে পেয়েছিলেন বুঝি? ভদ্রলোক ছাত্রদের খুব পেটাতেন নাকি?

    সুমন আলগা গলায় বললেন, সত্যের অনেকগুলো স্তর থাকে। কাল প্রবীণদাজু্র মুখে যেটা শুনছিলেন সেটা সত্যের একটা দিক।

    আমি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বললাম, সত্যের অন্য দিকও আছে তার মানে?

    সুমন বললেন, আছে বৈকি। স্কুলের ছাত্রদের কাছে সিংহাসন ছেত্রী ছিল বিভীষিকার আর এক নাম। স্কুলের সবচাইতে দুষ্টু ছেলেটাও তাঁর ক্লাসে গোবেচারার মতো বসে থাকত। সবচাইতে বাচাল ছেলেটাও বোবাকালা হয়ে থাকত স্যারের ক্লাস চলাকালীন। আপনি কী ভাবছেন? দানবের মতো চেহারা ছিল ওঁর? পড়া না পারলে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে আসতেন? ছাত্রদের বেত দিয়ে যথেচ্ছ পেটাতেন? একদমই না। সিংহাসন স্যার ছিলেন সুদর্শন পুরুষ। ফর্সা টকটকে গায়ের রং। খুবই মিষ্টভাষী ছিলেন তিনি। কথা বললে মনে হত মুখ দিয়ে মধু ঝরে পড়ছে। ঠোঁটে লেগে থাকত বাচ্চাদের মতো নিষ্পাপ হাসি। সিংহাসন স্যারের মুখে হাসি নেই এমনটা কল্পনাও করা যেত না। খুবই আমুদে স্বভাব ছিল ওঁর। মজার মজার কথা বলতেন। স্কুলের সহকর্মীদের সঙ্গে, রাস্তাঘাটের মানুষজনের সঙ্গে, বাচ্চাদের অভিভাবকদের সঙ্গে, এমনকী ছাত্রদের সঙ্গেও ঠাট্টা মশকরা করতেন তিনি। বেত হাতে স্যারকে কখনও কেউ দ্যাখেইনি। অথচ, তার পরও তিনি ছিলেন ছাত্রমহলে মূর্তিমান ত্রাস।

    আমি বললাম, আপনার কথাটা হেঁয়ালির মতো ঠেকছে।

    সুমন বললেন, আমরা যমের মত ভয় পেতাম সিংহাসন স্যারকে। নেপালি আর ইংরেজি ক্লাস নিতেন উনি। তিনি কখনও রাগতেন না, তেড়ে আসতেন না, বকাঝকাও করতেন না। চড়চাপড় মারার তো প্রশ্নই নেই। শুধু পড়া না পারলে বাচ্চাদের কচি হাতটাকে পরম সোহাগে কাছে টেনে নিতেন স্যার। দু’আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল ঢুকিয়ে শিশুর মতো হাসতে হাসতে চাপ দিতেন। বাচ্চারা অসহ্য যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠত। যত তারা ককিয়ে উঠত তাঁর মুখের হাসি তত চওড়া হত। ইচ্ছে করলে ছাত্রদের জুলপি ধরে ঘড়ির কাঁটার দিকে কখনও বা ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ঘোরাতেন। সেই ছাত্র হাউমাউ করে উঠত ব্যথা পেয়ে। চোখ ফেটে বেরিয়ে আসত জল। ভারি আমোদ পেয়ে সিংহাসন স্যার শিশুর মতো দুলে দুলে হাসতেন।

    আমি তাজ্জব গলায় বললাম, বলেন কী!

    সুমন বললেন, সিংহাসন স্যার যখন কোনও ছাত্রের ওপর নির্যাতন চালাতেন তখন বাকি ছাত্রদের দিকে এমন মুখ করে তাকাতেন যেন ভারি মজার কাণ্ড চলছে ক্লাসে। এর অর্থ ইচ্ছে না হলেও হাসতে হবে তাঁর সঙ্গে। নইলে ছাত্রদের মধ্যে থেকে যে কাউকে তিনি ডেকে নেবেন কাছে। শিশুর মতো হাসতে হাসতেই তার দুটো আঙুলের ফাঁকে পেনসিল ঢুকিয়ে চাপ দেবেন জাঁতার মতো। মাথায় বসাবেন উপর্যুপরি গাঁট্টা। তাই ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে গেলেও ছাত্ররা ঠোঁট ফাঁক করে মুখটাকে হাসিহাসি করার চেষ্টা করত স্যারকে খুশি করতে। তাতে তাদের মুখগুলো যে আরও করুণ দেখাত তা বলাই বাহুল্য।

    আমি বললাম, ছাত্ররা কেউ বাড়িতে নালিশ করত না বাড়িতে?

    সুমন বললেন, আমরা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। আমাদের বাপ-মায়েরা চাষাভুষো মানুষ। কেউ স্কুলের মুখ দ্যাখেনি জীবনে। মাস্টাররা তাদের কাছে ভগবান। স্যারের নামে অভিযোগ করতে গেলে উলটে বাড়িতে চোরের মার খেতাম। কিন্তু ওপরওয়ালার হিসেব আলাদা। সিংহাসন স্যার ভাবতেও পারেননি এমন দিন তাঁকে দেখতে হবে একদিন।

    গল্পের গন্ধ পেয়ে আমি বললাম, কীরকম?

    সুমন বললেন, কোনও আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন সকলেই যে নীতি আদর্শের কথা ভেবে সামিল হয় তা নয়। বেনোজলও তাতে ঢুকে পড়ে। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাই তাদের মূল লক্ষ্য। স্কুলের বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো বহু ছেলে ঢুকে গিয়েছিল পাহাড়ের আন্দোলনে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কোনও একসময় সিংহাসন স্যারের ছাত্র ছিল। মনের মধ্যে বহু বছর দগদগে ঘা পুষে রেখেছিল তারা। তারাই নেতার চ্যালাচামুন্ডাদের উসকে নিয়ে এসেছিল হাওয়াবাড়িতে। জ্বালিয়ে দিয়েছিল স্কুলঘর। বেধড়ক মেরেছিল সিংহাসন স্যারকে। মুখে ভুষো কালি মাখিয়ে ঘুরিয়েছিল রাস্তায়। যার পরিণাম স্যারের আত্মহত্যা।

    একটা ঘটনার এক দিকে আলো ফেলেছিলেন প্রবীণ। সেই ঘটনারই সম্পূর্ণ অন্য আর একটা দিক জানা হল সুমনের কাছ থেকে। এমন সময় দুর্গারানির গলা ভেসে এল কিচেন থেকে। সুমন বললেন, ডিনার রেডি সাব। কিচেনে চলে আসুন আপনারা।

    খাওয়া দাওয়া হল। হাত আঁচিয়ে ঢুকে পড়লাম ঘরে। বিছানায় শুয়ে সিংহাসন স্যারের কথা ভাবছিলাম। সুমন ভুজেলের গল্প বলার মধ্যে একটা অদ্ভুত গুণ আছে। সব কিছু জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমার অবচেতনে ঢুকে পড়েছিলেন সিংহাসন স্যার। স্বপ্নে সেই মানুষটাকেই দেখলাম। ক্লাসে হাসিহাসি মুখ করে বাচ্চাদের ওপর নারকীয় নির্যাতন চালাচ্ছেন।

    সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। স্নান টান সেরে তৈরি হয়ে নিলাম আটটার মধ্যে। দুর্গারানি ও সুমন ভোরবেলা উঠে পড়েছেন। দুজন মিলে বানিয়ে ফেলেছেন পুরি আর ছোলার ডাল। সঙ্গে দার্জিলিং চা। খাওয়া শেষে হোমস্টের ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। দুর্গারানি বললেন, রাতে ভাল ঘুম হয়েছিল তো?

    স্বাতী আর ছেলেমেয়েরা ঘাড় নাড়ল। আমি দুর্গারানির উদ্দেশে বললাম, আপনার শ্বশুরমশাইয়ের কোনও ছবি আছে বাড়িতে?

    দুর্গারানি একটু অবাক হয়েছেন। সুমন ভুজেলের দিকে তাকালেন আড়চোখে। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, কেন বলুন তো?

    আমি ক্যাজুয়ালি বললাম, এমনিই জানতে চাইলাম আর কী।

    দুর্গারানি বললেন, যিনি ওঁর শ্রাদ্ধশান্তি করেছিলেন সেই পুরোহিত অপঘাতে মৃত মানুষের ছবি বাড়িতে রাখতে বারণ করেছিলেন। তাই ওঁর কোনও ফোটো রাখা হয়নি। তবে একটা গ্রুপ ছবি আছে। ওটা ফেলতে গিয়েও ফেলা হয়নি। দাঁড়ান দেখছি।

    দুর্গারানি ঘরের ভেতর থেকে একটা অ্যালবাম নিয়ে এলেন। একটা ছবির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, এই যে।

    স্টুডিওতে তোলা গ্রুপ ছবি। একজন মাঝবয়সি পুরুষ এবং ভদ্রমহিলা পাশাপাশি বসা দুটো কাঠের চেয়ারে। পুরুষটি যে সুদর্শন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ধারালো মুখচোখ, পাতলা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে। ফুল সোয়েটার, ফুল প্যান্ট পরে আছেন। গলায় মাফলার। পায়ে কেডস। চোখে নিকেলের গোল ফ্রেমের চশমা। মাথায় গোর্খা টুপি। ইনিই নিশ্চয়ই সিংহাসন ছেত্রী। শাড়ি পরা ভদ্রমহিলার সরু চোখ, পাতলা ঠোঁট, ভোঁতা নাক। চেহারায় বিশেষত্ব নেই তেমন। তাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়ানো একটি লাজুক মুখের ছেলে। ইনি বোধ হয় প্রবীণ ছেত্রী। আমি দুর্গারানির দিকে তাকিয়ে বললাম, ছবির এই ভদ্রলোককে আমার খুব চেনা চেনা লাগছে। এঁকে আমি কোথাও দেখেছি।

    দুর্গারানি আর সুমন নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলেন। সেটা আমার চোখ এড়াল না। দুর্গারানি বললেন, দেখার কথা নয়। ওঁর মৃত্যু হয়েছিল বহু বছর আগে। পাহাড়ের আন্দোলনের সময়।

    আমার গায়ে হঠাৎ করে যেন ইলেক্ট্রিক শক দিল কেউ। মুখ তুলে স্বাতীর দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বললাম, এবার মনে পড়েছে! পরশু হাওয়াবাড়িতে পৌঁছেছিলাম আমরা। গাড়ি থেকে নেমে খাড়া রাস্তা ধরে তোমরা আগে আগে যাচ্ছিলে। আমি ধীরে সুস্থে নামছিলাম পেছন পেছন। মেঘ আর কুয়াশায় সব ঝাপসা দেখাচ্ছিল। পাইনবনের মধ্যে সরু রাস্তাটা ভাগ হয়ে গেল। এক ভদ্রলোক বসে ছিলেন বেঞ্চে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, গোর্খা হোমস্টের রাস্তা কোনটা। তিনি হাসিমুখে আঙুল উঁচিয়ে দেখালেন ডানদিকের রাস্তাটা। সিংহাসন ছেত্রী অবিকল সেই ভদ্রলোকের মতো দেখতে!

    স্বাতী গলায় বিস্ময় মিশিয়ে বলল, তা কী করে হয়?

    আমি বললাম, আমার কোনও ভুল হচ্ছে না। দুজনের চেহারা শুধু এক নয়, পোশাক আসাকের ধরন, মাথার গোর্খা টুপি, এমনকী গোল ফ্রেমের চশমা সুদ্ধু এক।

    স্বাতী দুর্গারানির উদ্দেশে বলল, সিংহাসন ছেত্রীর কি কোনও যমজ ভাই-টাই ছিল?

    দুর্গারানির মুখে যেন কালি লেপে দিয়েছে কেউ। একটা শ্বাস ফেললেন। আমতা আমতা করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, না ওঁর কোনও যমজ ভাই ছিল না। আপনাদের কাছে লুকোব না। আপনি পরশু আমার শ্বশুরমশাইকেই দেখেছিলেন। আপনিই প্রথম নন এর আগেও কেউ কেউ ওঁকে দেখেছে।

    আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছি পুরো। কী বলব ভাবছি। স্বাতী ঢোক গিলে বলল, আর ইউ কিডিং!

    দুর্গারানি বললেন, মজা করছি না। অপঘাতে মারা গিয়েছিলেন বলেই বোধ হয় আমার শ্বশুরমশাই মুক্তি পাননি। যাগযজ্ঞ কম করা হয়নি এই বাড়িতে। লাভ হয়নি। এমনিতে উনি সচরাচর কাউকে দেখা দেন না। কালেভদ্রে ওঁকে দেখতে পায় কেউ কেউ। হোমস্টে সার্ভিস চালু করার পর আপনার আগে হাতে গোনা কয়েকজনই শুধু ওঁকে দেখেছেন।

    সুমন ভুজেল বললেন, এত বছরে আমি নিজেই বার চারেক দেখেছি ওঁকে। টিলার ওদিকটায় কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকেন চুপ করে। কাউকে ভয় দেখান না। হোমস্টের দিকে আসেন না কখনও। পরশু কী খেয়ালে পাইনবনের দিকটায় এসেছিলেন কে জানে।

    স্বাতী উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, পুজোটুজো দেননি আপনারা?

    দুর্গারানি বললেন, আমি, প্রবীণ বা সুমন নিজেদের সান্ত্বনা দিয়েছি এই বলে যে, উনি নিশ্চয়ই আমাদের কোনও ক্ষতি করবেন না। কিন্তু হোমস্টের দু-চারজন গেস্ট ওঁকে যখন দেখতে পেল তখন টনক নড়ল প্রবীণের। পেশক থেকে একজন পূজারি ব্রাহ্মণকে নিয়ে এসেছিল ও। তিনি গোটা চত্বর ঘুরে ঘুরে দেখলেন। হোমস্টের উর্জা মাপলেন। প্রবীণকে বললেন গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান করতে। রাজেশ আর রাকেশের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছে প্রবীণের। ওরা এবার ছুটিতে এলে গয়ায় যাব আমরা।

    গলায় খাদা পরিয়ে আমাদের বিদায় দিলেন দুর্গারানি আর সুমন। গোর্খা হোমস্টেকে পেছনে রেখে তাঁদের দুজনকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের চারজনের একটা গ্রুপ ছবি তুলে দিল মোক্তান ভাই। সুমন বললেন, ফিরে গিয়ে সোশাল মিডিয়ায় হাওয়াবাড়ির ছবি পোস্ট করবেন নিশ্চয়ই? সিংহাসন স্যারের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু লিখবেন না যেন। এমনিই হোমস্টেতে গেস্ট কম আসে, এসব জানলে মানুষজন মুখ ফিরিয়ে নেবে।

    গাড়িতে চেপে রওনা দিলাম আমরা। মোক্তান ভাই ড্রাইভ করছে। ছেলেমেয়েরা পেছনের সিটে বাইরের প্রকৃতি দেখছে। তিনচুলে থেকে লপচু টি এস্টেটের দিকে নামছে আমাদের গাড়ি। স্বাতী বলল, তুমি তো বানিয়ে বানিয়ে ভূতের গপ্পো লেখো। এতদিনে একটা সত্যিকারের আনক্যানি ঘটনার সাক্ষী থাকলে। সুমন তো বারণ করলেন। তুমি এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছু লিখবে না?

    আমি বললাম, রংটং চড়িয়ে লিখতেও পারি কোনও গল্প। দেখা যাক।

    স্বাতী বলল, কিন্তু সে গল্প ছেপে বেরোলে লোকজন হাওয়াবাড়ির গোর্খা হোমস্টেতে ভয়েই আসতে চাইবে না। তবে?

    আমি বললাম, কেন আসতে চাইবে না? মানুষ ভয় পেতে ভালবাসে। নইলে গোস্ট ট্যুরিজম কনসেপ্ট দুনিয়া জুড়ে এত জনপ্রিয় হবে কেন? ভূত পর্যটন নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের মাতামাতিও কি কিছু কম? ভয় পেতে না চাইলে হন্টেড বাংলোয় পয়সা খরচ করে এত লোক থাকতে যায় কেন?

    স্বাতী কিন্তু কিন্তু করে বলল, সেটা অবশ্য ঠিক। তবে …।

    আমি হাতে বরাভয় মুদ্রা ফুটিয়ে বললাম, যদি গল্প লিখি তবে নাম ধাম সব বদলে দেব। ছাপা হবার পর সেই গল্প, অন্য লোকের কথা ছেড়ে দাও, সুমন ভুজেল, প্রবীণ ছেত্রী বা দুর্গারানি ছেত্রীকেও যদি পড়ে শোনানো যায় তবে ওঁরা অবধি সেই গল্পে নিজেদের খুঁজে পাবেন না। তোমার দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই।



    অলংকরণ (Artwork) : কল্লোল রায়
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments