




১
এই গল্প আমার নয় আমার পাড়ার নিমাই জেঠুর, আমরা আড়ালে যাকে বলতাম ব্রোন্টোসরাসের বন্ধু। এযুগে যদিও উইকি, হোয়াটস অ্যাপ, রিল ইউনিভারসিটির কল্যাণে সবাই কোটি কোটি গল্প ও প্লেটে গরম তথ্য পায়, বছর দশ-বারো আগে হাল ততটা বিগড়োয়নি। জেঠুর ঝুলিতে নানা অভিজ্ঞতার গল্প, বিশেষ উপলক্ষ্য—যেমন বিজয়া কি পয়লা বৈশাখে, তার বাড়ি চায়ের আসরে ডাক পড়ত। আগ্রহের সাথে আমরা কয়েক জন বন্ধু যেতাম, আমরাও কেউ কচি খোকা নই, কাজকর্ম করছি। জেঠুর ঝুলিতে নানা অভিজ্ঞতার গল্প, বলার কায়দা জানত জেঠু, আমরা বেশ উপভোগ করতাম।
একদিন আড্ডায় বললাম জেঠু আজকাল কেমন ভূত-প্রেত, ভয়-রহস্য ইত্যাদি নিয়ে চ্যানেলে চ্যানেলে রমরমিয়ে গপ্পো চলছে, সেরকম একটা শোনাও, তবে বুঝি। জেঠু বলে, “আমার ওসবে বিশ্বাসও নেই, পছন্দও করি না।”
“কোনও অলৌকিক ঘটনা কখনো দেখোনি? এত জল-জঙ্গলে একা নির্জন জায়গায় যে ঘুরেছ?”
এই এইসব চাপাচাপিতে জেঠুর মুখে এই গল্প শুনেছিলাম, মাঝখানে যে-সমস্ত প্রশ্ন ও নানান কথা গল্পের স্বাভাবিক গতিকে নষ্ট করেছিল তা বাদ দিয়ে এখানে জেঠুর বয়ানটুকুই থাকল—
২
কলেজ পাশ করে ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না, অনেক বড়ো সংসার আমাদের, বাবার অর্থের দরকার। তাই কাজ খুঁজতে নেমে পড়ি। আমার এক পাড়াতুতো জামাইবাবুর আসামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাঠের ব্যবসা, নিজস্ব করাতকল ছিল। তিনি সেসময় এসেছিলেন আমাদের পাড়ায়। কাজের দরকার শুনে বললেন— শিক্ষিত বেকার ছেলেরা তার অঞ্চলে কাজে যেতে চায় না, দুর্গম নির্জন এলাকা, তা আমি রাজি থাকলে যেতে পারি, ওঁর ব্যবসায় সবসময় আমার মতো বিশ্বাসযোগ্য লোক প্রয়োজন।
জামাইবাবুকে আমি অতীশদা বলে ডাকতাম, গিয়ে দেখি তাঁর ব্যবসা তখন দারুণ লাভজনক, বিরাট করাতকল, কর্মচারীদের দশ-বিশ ঘর কোয়ার্টার মিলের জমিতে। তাঁর পরিবার অর্থাৎ কনকদি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ডিগবয়-এ থাকত, কিন্তু অতীশদার করাতকল ছিল সেখান থেকে অনেক অনেক দূরে, এক জাংশন স্টেশনের কাছে, জঙ্গল ইজারা নিতে সুবিধে হয় এমন জায়গায়। বিশ্বস্ত লোকের অভাবে অতীশদার ব্যবসায় বিস্তর চুরি হচ্ছিল তখন, আমি হিসাবপত্র, শ্রমিক নিয়োগ, তাদের রোজের বেতন ইত্যাদি সব দেখাশোনায় বহাল হলাম।
ব্রহ্মপুত্রের নানা উপনদী ও শাখানদী জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ওইসব অঞ্চলে ঘন জঙ্গলই বেশি, লোকজন বলতে বেশিরভাগই আদিবাসী গ্রামের মানুষ। কোথায় কোথায় যে ঘুরে বেড়াতাম আজ এত বছর পর তা মনে করা খুব মুশকিল। জঙ্গলের বিরাট এলাকা ইজারা নিয়ে গাছ কাটা হত। এইখানে কাজ করার সময় সে অঞ্চলের অনেক গাছের নাম-ধাম আমাকে অনেকটাই শিখতে হয়েছিল। কতগুলো শ-টিম্বার রয়েছে এলাকায়, গাছ কী জাতের বা কোয়ালিটির, যেগুলো কাটা হবে তাতে দাগ দেয়া, এসব নানা কাজ— সব দেখতাম, শিখতাম। অতীশদা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সঙ্গে থাকতেন, একা ছাড়তেন না।
একবার আদিবাসী অধ্যুষিত উত্তর আসামের এক এলাকায় গিয়ে পড়লাম। ম্যাপে কেউ এখন খুঁজেও পাবে না, তবে বিখ্যাত দ্বীপ মাজুলি থেকে বেশ কিছুটা উত্তরের দিকে অরুণাচলের সীমানায় ছিল, সেটা মনে আছে। ব্রহ্মপুত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো দ্বীপ বলে সবাই মাজুলির নাম জানে, অনেক বৈষ্ণব থাকে সেখানে, সে অন্য গল্প, আরেক দিন হবে।
আশপাশে দু-একটা ছোটো আদিবাসী গ্রাম, একটা পাহাড়ি নদী যা ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে, আর অনন্ত জঙ্গল চারপাশে। সেই নদীর ধারে, গ্রাম থেকে বেশ দূরে জঙ্গলের সীমানা ঘেঁষে একটা কাঠের বাংলো। একসময় ইংরেজ অফিসাররা শিকারে আসলে তাদের থাকার জন্য বানানো হয়েছিল। স্থানীয় গাইড নিয়ে জঙ্গলে গাছ দেখতে ঢুকতাম, গ্রামের লোকেরা বলে দিয়েছিল সেই জঙ্গলে লেপার্ড থেকে শুরু করে হাতি, গণ্ডার, এমনকি রয়েল বেঙ্গল টাইগারেরও দেখা মেলে।
দিন তিনেক কাটতে না কাটতে অতীশদার বাড়ি থেকে লোক এল। বাড়িতে ছোটো ছেলেটার খুব অসুখ, ফিরে যেতে হবে ডিগবয়। অতীশদা আমাকে রেখে যেতে চাননি, কিন্তু ততক্ষণে আমার সেই কাঠের বাংলো, জঙ্গল ও পাহাড়ি নদীর ধার অসম্ভব ভালো লেগে গেছে, আমি কীরকম ভবঘুরে তা তো জানিস, চিরকালই নতুন জায়গা দেখা আমার শখ। এটাই প্রথম বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে সেরকম একটা অভিজ্ঞতা যার জন্য আমি অনেক যুগ অপেক্ষা করেছিলাম। আমি বোঝালাম আমি থেকে গেলে কাজ একটু এগিয়ে রাখা যাবে, তখন বাকি শ্রমিকদের নিয়ে দাদা ফিরে এলে লোকসান হবে না, সঙ্গে সঙ্গে গাছ কাটার কাজ শুরু করা যাবে।
তিনি কাছের গ্রামের মোড়লকে ডেকে পাঠালেন। সে বলল যে রাতে একজন থাকার লোক নিন, আপনি তো শহরের লোক, এ জায়গার রকম-সকম বুঝবেন না, এত রকমের বিপদ আছে, ইত্যাদি। আমি জানালাম দরকার হলে নেব। দাদা যখন বন্দুকটা রেখেই যাচ্ছে তখন আর ভাবনা কী? মোড়ল টুকটুক করে মাথা নেড়ে বলল, “বন্দুক দিয়ে কি সব ভয় তাড়ানো যায়? ভুলেও জঙ্গলে একা ঘুরবেন না; পথ হারিয়ে ফেলবেন। একা হলে এখানে অনেকরকম বিপদ আছে।”
আদিবাসীদের কুসংস্কার খুব বেশি, সব জায়গাতেই এই ধরনের কথা শুনতে হয় তা আমার জানা ছিল, তাই আমি পাত্তাই দিলাম না।
সপ্তাহে একদিন জাংশন স্টেশনে ট্রেন আসে, সুতরাং অতনুদার (??অতীশদা?) ফিরতে দেরি আছে, আমি তখন নিশ্চিন্তে এই নির্জন জলজঙ্গল উপভোগের জন্য প্রস্তুত। চাল-ডাল আমরা এনেছিলাম, মোড়লের সঙ্গে বাকি খাদ্য সরবরাহের চুক্তি ছিল। কেউ-না-কেউ সকালে রোজ আমার খবর নিতে আসত আদিবাসী গ্রাম থেকে, সঙ্গে বুনো মোরগ, ছাগলের দুধ আনত, আর একটা অদ্ভুত খেতে আচার। ওখানকার জঙ্গলে খুব চালতা হত, সারাবছর তা নানাভাবে ওরা শুকিয়ে, আচার বানিয়ে রাখত।
যে ছেলেটি সকালে আসত তার নাম মনে নেই, লোহিত বা ওইরকম কিছু, সে পরের দিনই এক অজগরের গল্প শোনালো আমাকে। সেটা নাকি এতই বুড়ো হয়ে গিয়েছে চলতে ফিরতে পারে না, কিন্তু বেঁচে আছে। পাহাড়ি নদী পেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে পথ দেখিয়ে সেই ছেলেটি আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। এটা একটা বিশেষ ঘটনা, তাই মনে আছে। অজগরটার গা-ভরতি শ্যাওলা ও ঘাস জমে গিয়েছে। মাথাটা একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়, পুরো সাপটা বিরাট লম্বা মাটির সঙ্গে একেবারে ক্যামোফ্লেজ করে গিয়েছে। মুখের সামনে দিয়ে কাঠবিড়ালি, খরগোশ, পাখি ইত্যাদি গেলে খপ করে মাথাটা নাড়িয়ে সেগুলো গিলে খেয়ে বেটা দিব্যি বেঁচে আছে।
আমি ছেলেটিকে বললাম, এটাকে তোমরা মেরে যে ফেলোনি তা দেখে ভালো লাগছে। ছেলেটি জানালো যা তাদের খাদ্য না তা ওরা মারে না, বনের দেবী তাতে চটে যান।
লোহিত আমাকে অতীশদার হাতে আঁকা ম্যাপ দেখিয়ে বাংলো থেকে নিরাপদ দূরত্বে কীভাবে জঙ্গলে একটু ঘোরাফেরা যায় তা বুঝিয়ে দিয়েছিল। পাহাড়ি নদীর জল এক জায়গায় একটা দিঘি সৃষ্টি করেছিল, পাখি শিকারের ভালো সুযোগ, বুনোহাঁস তো থাকবেই।
৩
তার পরের দিনই হবে খুব সম্ভব, সন্ধ্যেবেলা বারান্দায় বসে আয়েশ করে কড়া চা খাচ্ছি, দ্রুত অন্ধকার নামছে জঙ্গলে, কানে আসছে নদীর জলের আওয়াজ — এমন সময় সন্ধ্যের বুক চিরে এক তীক্ষ্ণ ডাক ভেসে এল দূর থেকে — সাথে সাথে একদল কুকুরের মতো জন্তু ছুটে গেল বাংলোর কিছুটা দূর দিয়ে অন্ধকার বনে। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালাম- কেউ ক বিপদে পড়েছে, মানুষের গলা কি? কেমন অপার্থিব আওয়াজটা, সেদিন রাত্রে ভালো ঘুমোতে পারলাম না, বেশ ভয় পেলাম একা বাংলোয়। বলতে লজ্জা নেই, রাতের জঙ্গলে নানা নিশাচরের আওয়াজে আতঙ্কিত অবস্থায়।
সকালে বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে বেরিয়ে দেখি এক শীর্ণকায় মহিলা বাংলোর সিঁড়ির কাছে বসে, ছেড়াঁ কাপড় জড়ানো শরীরে। বেশ অবাক হলাম। হাতজোড় করে ওদের ভাষায় সে জানালো— কাজ চায়, ধোয়া-মোছার কাজ, বিনিময়ে দুটো ভাত-ডাল হলেই চলবে। বলিরেখা ছাপিয়ে মুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি, বয়স হয়েছে বেশ, আবার খুব ন্যুব্জ দেহও না। কী একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে চেহারায় ভাবতে ভাবতে বললাম, “আমার কিন্তু দরকার নেই, আমি অল্পদিনই থাকব এখানে।”
বুড়ি পায়ের কাছে বসে পড়ে বলল, “দুসাজ ভাতর বর লোভ বাবু, কোনওবা ইয়াত থাকিব আহিলে ভাত খাবলৈ পাওঁ,” আমি এখন ও ভাষা ভুলে গেছি, বাংলার বেশ মিল থাকায় বোঝা যায়।
যেটুকু বুঝলাম, বারোমাস সে ফল-মূল খায়, কিছু শাকপাতা লাগায়, কিন্তু ভাত জোটে না। সে যে অসম্ভব গরীব; তার ছাপ সর্বাঙ্গে, আমাকে খুব নাড়া দিল তাই রাজি হয়ে গেলাম। খুশিতে ওর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তখনই খেয়াল করলাম চোখ দুটো কটা আর অত্যন্ত জ্বলজ্বলে, এ বয়সে তো ছানিতে ঝাপসা হওয়ার কথা।
বুড়ি কদিন খেটে পুরোনো ছোপ-ধরা মেঝে, রান্নাঘর সব বেশ ঝকঝকে করে তুলল, আমি বেশ খুশিই হলাম। একটা ধুতি দিলাম, শাড়ির অবস্থা এত খারাপ ছিল ওর, টাকা কিছুতেই নিতে চায়নি, তবু কিছু দিলাম।
দিন কয়েক পরে কাছের গ্রামের মোড়ল খবর পেয়ে এসে উপস্থিত, বললে যে ও বুড়ি ডাইনি আছে, ওকে রেখো না, ওকে আমরা গাঁ থিকে তাড়াইছি, এইসব।
আমি বললাম— বাহ্, কী ভালো কাজ করেছ, প্রায় শেষ করে এনেছো মানুষটাকে। বুড়ো মানুষ, অভাবে পড়ে এসেছে, তাড়াতে পারব না।
মোড়ল বুড়ির নানা কুকর্মের গল্প শোনালো, কার কার শিশু হারিয়েছে, বুড়ি তুক করে রোগে ফেলেছে কাকে কাকে এইসব। “মেকুরী-চকুরা বুঢ়ী, আন্ধারত তাইর চকু জিলিকি উঠে,” আমি বুঝলাম চোখটা একটু অন্যরকম হওয়াতেই আসল সমস্যা হয়েছে। সেই লোহিত নামে ছেলেটা… তার থেকে জানলাম বনের দিকটায় সে কুঁড়ে বানিয়ে থাকে, কেউ খোঁজ নেয় না।
বুড়ির ছেলে ও পরিবার পাশের গ্রামেই থাকত কিন্তু বুড়িকে দেখত না অথবা হতে পারে গ্রামের অন্য লোকেদের জন্য সে তার মাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। শুধুমাত্র দেখতে একটু অন্যরকম বলে বুড়ো মানুষকে এরা নিঃসংকোচে জঙ্গলে একা থাকতে বাধ্য করছে, ব্যাপারটা ভাবতেই আমার মাথাটা গরম হয়ে গেল।
৪
আমার কাজ একটু বেশি সকালে শুরু করি, দু-চারটে লোক নেওয়া হয়েছে, অতীশদা যা কাজ বুঝিয়ে গেছিলেন সেসব করি। জঙ্গলে আকাশছোঁয়া হলং গাছ আর তার ডালে ডালে লাফালাফি-করা সোনালি বাঁদরের কথা খুব মনে পড়ে, আর বিরাট হর্নবিল পাখির দিবারাত্রি চেঁচামেচি। সভ্যতা থেকে দূরে এই অঞ্চলের মানুষের দিন শেষ হয়ে যায় বেলা থাকতেই। দুপুরের খাওয়ার পর কদিন থেকে বুনোহাঁস শিকারে যাই নদী বরাবর। এ অঞ্চলে বৃষ্টি বেশি তাই জঙ্গলের হাওয়া ভিজে ও ভারী, গাছে গাছে ঝুলন্ত অর্কিড আর তাদের সে কী সুন্দর গন্ধ! তবে আমি ভাগ্যক্রমে বর্ষায় ওখানে ছিলাম না, বন্যার ঠেলায় ওসব জায়গায় টেঁকা দায় হয় শুনেছি।
কিছু ম্যাচিওর গর্জন গাছের খোঁজ পেয়েছিলাম, তাই একদিন মাত্র একজন লোক নিয়ে সেই গাছ দাগাতে গিয়ে আরও গভীরে ঢুকে পড়লাম। পথে দেখি একটু ফাঁকা মতো জায়গা, বেশ ঝোপঝাড় ছাড়া, সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে মনে হল, এইখানটা কেউ পরিষ্কার করেছে। তার মানে আমি বুড়ির বাড়ির কাছেই চলে এসেছি নাকি? এত দূরে যে থাকে তা বুঝিনি। একটু দেখেই যাই তবে কেমনভাবে থাকে, এই ভেবে ঘর খুঁজছি, দেখি কটা বনমোরগ চরছে, আর দুটো ছাগল। দুটো শুকনো পাতার স্তূপের মতো ঘর, একটা সম্ভবত পোষা ছাগল রাখার। এর মধ্যে মানুষ থাকে ভাবতেই খারাপ লাগছিল। হঠাৎ আমার কাঁধে টোকা, সঙ্গের লোকটি ফ্যাকাসে মুখে আমাকে বলছে ফিরে যেতে, ও বুড়ি তুক করে মানুষকে ওই মোরগ আর ছাগল বানিয়ে রাখে। আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম তোমার কাছে যে ডাইনি সে তো রোজ আমার বাড়ি আসে।
সে কেবলই বলে আমি ফিরে চলি বাবু তবে, আপনি আসুন।
আইতা আইতা বলে চেঁচালাম, এভাবে ডাকতে ওই বলেছিল, নাম বলতে চায়নি। ঘরের মধ্যে সে নেই, হয়তো জঙ্গলে কাঠকুটো ফল ইত্যাদি জোটাতে গেছে। ঘরের পিছনে গিয়ে দেখি একটা শক্ত কাঠ দিয়ে বানানো বেশ মজবুত খাঁচা আর তার ভিতরে একটা বাচ্চা লেপার্ড। সেটা আমাকে দেখে গর্জে উঠল কিন্তু বসেই থাকল, নড়াচড়ার চেষ্টা করেও পারল না। বুঝলাম ওটা অসুস্থ, পা ভাঙা সম্ভবত। তাহলে বুড়ি কি এটাকে বাঁচাতে এনে রেখেছে? কাল কাজে এলে জানতে হবে। ভাবলাম এমন খাঁচা যে বানাতে পারে সে নিজের ঘর অমন পাতার স্তূপের মতো বানিয়েছে কেন? কাউকে দেখতে দিতে চায় না ভিতরটা, আর না দেখতে পেলে ভয়ে কেউ চট করে ঢুকবেও না তাই কি? বুঝলাম, ওই গ্রামের কুসংস্কার আমার অবচেতনে ছাপ ফেলে যাচ্ছিল, এই হল সঙ্গদোষ।
৫
পরদিন বুড়িকে বলতেই তার চোখ ঝিলিক দিল, মনে হল আমার যাওয়া তার পছন্দ হয়নি। লেপার্ডটাকে একা একা কীভাবে পোষ মানিয়ে যত্ন করছে তা জানতে চাইলে, সে বলে তার আবার দোকা কে আছে, সবকিছুই সে একাই চালায়, লেপার্ডটা চোরা শিকারির ফাঁদে আটকে জখম হয়েছে। এই ব্যাপারটা যে সে জঙ্গলে ভয়ানক এক বিপদ, তা এর আগে আমি বুঝতে পারিনি। এ সেই সময়ের কথা যখন কাজিরাঙ্গা বা মানস কোনওটাই ন্যাশানাল পার্ক হয়ে ওঠেনি। শিকারের আইনকানুন নেই, থাকলেও মানানোর লোক নেই। আমি নিজেই বুনোহাঁস, খরগোস, পিগমি শুয়োর ইত্যাদি শিকার করতে যেতাম, তবে সেগুলো নেহাত মামুলি, খাওয়ার জন্যেই সে অঞ্চলের মানুষ মেরে থাকে।
আমার টিপ ভালো বলে গর্ব ছিল, এইখানে এসে তা গেল। পিগমি শুয়োর, পাখি, বুনো খরগোস কিচ্ছুটি বাগে আসছে না। কাজের শেষে সব লোক চলে গেলে, দুপুরের খাওয়া সেরে বেরোতাম, আলো থাকতে থাকতে ফিরে না এলে বিপদ, তা জানতাম। শিকার এক নেশা, সফল হলেও বাড়ে, ব্যর্থ হলেও বাড়ে।
জেদের বশে একদিন অপেক্ষা করে করে আঁধার (??অন্ধকার) হয়ে গেল, ফেরার পথে একটা ফিমেল বার্কিং ডিয়ার দেখতে পেলাম। সম্ভবত তার বাচ্চারাও ছিল সাথে, এ আমার শিকারের তালিকায় ছিল না কিন্তু সেদিন যেন শয়তান ভর করল, নিঃস্তব্ধ বনভূমি শিউরে ছুটে গেল গুলি।
ভাবলাম কত আর পথ, বাংলো থেকে খুব দূরে তো যাই না, টেনে বা পিঠে করে নিয়ে যাব হরিণটাকে। কিন্তু বাংলোর দেখা আর পাই না, পশুটাকে নিয়ে তখন আমার হাঁফ ধরে গেছে, বুঝলাম পথ হারিয়ে ফেলেছি, আর অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।
হঠাৎ দেখি ঝোপের মধ্যে জ্বলন্ত চোখ সারে সারে, ভয়ে ট্রিগারে হাত চলে গেল। একে একে বেরিয়ে এল একদল লেপার্ড, এরা যে দলে থাকে না তা তো জানাই ছিল, তাহলে এতগুলো একসাথে কেন! ভয়ে আমার বুদ্ধি গুলিয়ে গেল। ফায়ার করলাম একটার দিকে, সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরা, বন্দুক ছিটকে গেল। অসম লড়াইয়ে হারতে চলেছি ঠিক তখন ডাক ভেসে এল খুব কাছে— আয় আয় বাছারা, ছেড়ে দে ওকে।
জ্ঞান হারানোর আগে দেখলাম ওরা শান্ত বাচ্চার মতো বুড়িকে ঘিরে দাঁড়াল, যেন পোষা কুকুর, তারপর হারিয়ে গেল আঁধারে।
সম্ভবত সেই মাঝরাতে আমার একবার ঘুম ভেঙেছিল, অর্ধচেতন আমি নিজের বিছানায় পড়ে, কাছে বুড়ি দাঁড়িয়ে, হাতে একটা লন্ঠন উঁচু করে ধরা। আলোয় তার কটা চোখ ঝলসে উঠছে রাগে। ওর ভাষায় বলেছিল—
“সরল প্রাণীটোরে কী ক্ষতি করিছিল তোমার? প্রাণ লুয়াটো সহজ বাবু, দিবো পারিবা জানো?”
তারপর কিছু মনে নেই।
পরের দিন অতীশদা দলবল-সহ এসে পড়ে, বেশ যত্ন করে জড়িবুটি লাগানো ও ক্ষত পরিষ্কার করা ছিল আমার, জ্বরে অচেতন ছিলাম, আর নাকি আউতি আমাকে ক্ষমা কোরো, বলে চেঁচাচ্ছিলাম।
“প্রাণ নেওয়া সহজ, দিতে কী পারবে?” এ কথাটা আজও ভুলিনি।
যে কদিন ছিলাম তাকে আর দেখিনি। স্থানীয় ছেলেটি আমাকে বলেছিল বুড়ি কোথায় চলে গেছে, ঘর খালি ও পালিত জন্তুগুলো নেই। আমি জানতাম ওর উপরে হামলা করতে পারে গ্রামের লোকে, সব কিছুতেই তারা বুড়ির দোষ দেখত। আমি শহরে ফেরার আগে তাদের অনেক বুঝিয়েছিলাম যে সে আমাকে বাঁচিয়েছিল, তার যেন কেউ ক্ষতি না করে।
আমাকে খুব চিন্তিত দেখে সেই ছেলেটি বলেছিল চুপি চুপি— আউতি এ বনের দেবী; তার ক্ষতি কেউ করতে পারে না।
***
নিজের মনে একটাই খটকা থেকে গিয়েছিল, ইয়ং, ছ’ ফিটের পেটানো চেহারার আমাকে কীভাবে সেদিন বাংলোয় এনেছিল একটা ছোটোখাটো বুড়ি মানুষ? শুধু আনেনি বিছানায় পরিপাটি করে শুইয়ে দিয়েছিল। সাত ধাপ কাঠের সিঁড়ি ভেঙে যে বাংলোয় উঠতে হয়!
এটুকুই রহস্য। মোড়ল বলেছিল, “বুঢ়ী জন্তু বশ করি মানুহ মারে”— সেকথা ঠিক ছিল না।
গল্প শেষ হল, একটু করুণ রস ছড়িয়ে। তার রেশ কাটতেই আমি বলেছিলাম—
এঃ জেঠু এক্কেবারে সমাজ শোধরানো গপ্পো। এতে ভয় কই, লোম খাড়া করা? কাটাকুটি, ঘেন্নাঘাটি, রক্তচোষা? তাছাড়া গপ্পে প্রচুর ফাঁক, ওর লেপার্ডদের বুঝি বনদেবী শাক-পাতা খাওয়ায়? তোমার গল্প আর হিট হল না দেখছি।
আসরের এক বিজ্ঞ বন্ধু বলল— বাজে বকিস না, নেচারে ফুড পিরামিড কীভাবে কাজ করে জানিস না গবেট?
জেঠু হেসে বলেছিল— চা সিঙাড়া সাঁটিয়েছো, এবারে কেটে পড়ো।