• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | ছোটদের পরবাস | গল্প
    Share  
  • বাঘ : অচিন্ত্য দাস

    ডোরাকাটা বড় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, সরুসরু লম্বালম্বা ঠ্যাংওয়ালা চিতা, গোলগোল চাকাচাকা দাগ লেপার্ড – এরা সবাই বাঘ। তবে এই গল্পটা একটি লেপার্ডকে নিয়ে। একে আমরা বাঘই বলবো।

    ছত্তিশগড়ের এক জঙ্গলে তার বাস। জায়গাটা থাকার জন্য খারাপ না। ঘন ঠাস-বুনোট গাছপালায় ভরা বন। মাঝখান দিয়ে একটা নদী বয়ে যায়। জল তেষ্টা পেলে পুকুরও আছে বেশ কয়েকটা, দু-একটা তো খুব বড়। গরম কালেও অনেক জল থাকে। আছে কিছু ঘাসের জমি, মাঠই বলা যায়। সেখানে হরিণরা ঘাস খেতে আসে। আর সে ঝোপের আড়ালে তাক করে বসে থাকে। কোন একটা হরিণ একটু আলাদা হলেই দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ঘাড়ের ওপর। একটা হরিণ পেলেই তিন-চার দিন নিশ্চিন্ত।

    কী যে হয়েছে বাঘ কদিন কিচ্ছু শিকার পায়নি। খরগোশ, শুয়োর কিচ্ছু না। হ্যাঁ, আজকাল সে দেখছে জঙ্গলে বাঁদরের সংখ্যা বেড়েছে। সারাদিন গাছের ওপরে কিচিরকিচির করে আর মুখ ভেঙায়। সেদিন রাতে সে শিকার খুঁজতে সে চলে এসেছিল একেবারে জঙ্গলের কিনারায়। এখান দিয়ে একটা হাইওয়ে গেছে শহরের দিকে। একটা বড় গাছে অনেক কটা বাঁদর – বাঘ ভাবল এ গাছে উঠলে একটা না একটাকে ধরা যাবেই যাবে।

    লেপার্ডরা গাছে চড়তে ওস্তাদ। সে চুপি চুপি লতাপাতার আড়ালে উঠে পড়ল উঁচু দিকের একটা ডালে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। কী করে যেন বাঁদরগুলো টের পেয়ে হুপহাপ করে লাফিয়ে পালালো। শুধু একটা মাঝারি সাইজের বাঁদর মগডাল জড়িয়ে রয়ে গেল, ব্যাটা খুব ভয় পেয়েছে। তাই পালাতে পারেনি।

    বাঘ সাবধানে ডাল বেয়ে তার দিকে পায়ে পায়ে এগোতে লাগলো। বাঁদরটা তা দেখে ডালের শেষ প্রান্তে এসে কাঁপতে লাগলো। আর রক্ষা নেই!

    বাঘ আরও এগিয়ে গেল – কিন্তু এবার? আর খানিকটা এগোতেই হবে। লাফানো যাবে না কারণ লাফিয়ে ওটাকে ধরলে নিচে পড়ে যেতে হবে। সে আগেই দেখে নিয়েছে নিচে লতাপাতা ঝোপঝাড় বিশেষ কিছু নেই। আছে কালো পিচঢালা রাস্তা। সে জানে এই রাস্তা জিনিসটা শক্ত পাথরের মত। পড়লে ভীষণ লাগবে।

    বাঘ সাবধানে আরও এক পা এগিয়ে এক দৃষ্টে তার শিকারের দিকে তাকিয়ে থাকল। মোটামুটি আর দুপা এগোলেই নাগাল পেয়ে যাবে। কিন্তু এখানেই ঘটে গেল এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। ডালটা সরু ছিল, বাঘের ভার না রাখতে পেরে মচমচ করে ভেঙে পড়ল।

    বাঁদর আর বাঘ এরা কেউ নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র জানে না কিন্তু তাতে কী হবে! সোজা নিচে পড়তে লাগল। বাঁদরটা পড়তে পড়তেই কী করে যেন একটা লতার নাগাল পেয়ে সেটা ধরে নিয়ে বেঁচে গেল। বাঘও অবশ্য বেঁচে গেল কিন্তু তার বেঁচে যাওয়ার কারণটা অদ্ভুত।

    বাঘ পড়তে পড়তে হঠাৎ দেখল কী যেন হয়ে গেল আর সে শক্ত পিচ রাস্তার বদলে এসে পড়ল নরম একটা গদিতে। কী আরামের বিছানা! ঘাসপাতার ওপর সে অনেক শুয়েছে তবে এ একেবারে আলাদা জিনিস!

    এবারে হুঁশ হতে সে বুঝল সে হু-হু করে কোথায় যেন চলছে। নিজের পায়ের দিকে দেখল – না সে তো দৌড়চ্ছে না… এটা কী হচ্ছে? পাশের গাছের ডালগুলো সাঁই সাঁই করে পেছনে চলে যাচ্ছে। ঠাণ্ডা বাতাস লাগছে গায়ে মাথায়…।

    ব্যাপারটা বোঝার মতো জ্ঞানবুদ্ধি বাঘের নেই।

    রাস্তা দিয়ে একটা ট্রাক যাচ্ছিল। ম্যাট্রেস মানে মোটামোটা রবারের গদি বোঝাই ট্রাক। শহরে ডেলিভারি দিতে হবে। বাঘ ভাগ্যক্রমে পড়েছে তারই ওপর। ট্রাক ড্রাইভার একটা দুলুনি টের পেয়েছিল ঠিকই তবে ভেবেছিল ঘুমচোখে স্টিয়ারিং নড়ে গেছে হয়তো।

    বাঘের চাই খাওয়া আর ঘুম। খাওয়া হয়নি তবে ঘুমের ব্যবস্থাখানা খাসা হয়েছে আজ। বাঘ ঘুমিয়ে পড়ল।


    ঘুম যখন ভাঙলো তখন রাত শেষ হব হব। এখন সে আর অত গতিতে চলছে না। আর গাছপালাও বিশেষ নেই। এ কোথায় এল? বাঘ একটু উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে চোখটুকু ডালার বাইরে বার করলো।

    সর্বনাশ। এ তো ওই দু-পেয়েদের রাজ্য! সে দু-পেয়েদের দেখেছে কয়েকবার। তার মা তাকে ছোটবেলাতেই সাবধান করে দিয়েছিল – এই দু-পেয়েগুলোর থেকে সব সময় দূরে থাকবি। এদের না আছে গায়ে জোর, না দৌড়তে পারে, না আমাদের মতো পটাপট গাছে উঠতে পারে কিন্তু এরা ভীষণ বজ্জাত! বাঁদরের মত অনেকটা দেখতে কিন্তু এরা বাঁদরের থেকে অনেক বেশি বাঁদরামি জানে।

    দুটো-একটা দু-পেয়ে মানে মানুষ সে দেখতে পেল। আর দেখল অনেক সোজাসোজা চৌকোচৌকো কিসব। বাড়িঘর কী তা তো বাঘ জানে না। তবে বুঝল তাদের যেমন গাছপালা ঝোপঝাড়, তেমনি এদের থাকার জায়গা এগুলো।

    বাঘের মন বলল, এবার পালাতে হবে। সুযোগ একটা এসে গেল, দেখল বেশ কিছু গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে সে চলছে। এক লাফে একটা ডাল ধরে নিয়ে গাছের ডালপালার ভেতর লুকিয়ে পড়ল।

    আসলে জায়গাটা ছিল একটা আমবাগান। বাঘ দেখল একটু দূরে কটা কুকুর বসে আছে। আর দেরি না করে সে এক লাফে একটাকে ধরে ফেলল। বাকিগুলো ঘেউঘেউ করে পালালো। সে যাক। তার পেটটা তো ভরবে। কুকুর সে কখনো খায়নি। খেতে একটুও ভালো না, তবু খিদের মুখে যা পাওয়া যায় তাই অমৃত!

    আমবাগানের পাশেই একটা ইস্কুল। সকাল সাতটায় ক্লাস শুরু হয়। একতলার ক্লাস সেভেনের ঘরে বাংলাস্যার অবনীবাবু পড়াচ্ছেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা। বেশ ভাব এসে গিয়েছিল – চোখ বুঁজে আবৃত্তি করছিলেন, “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর/ লও যত লৌহ, লোষ্ট্র, কাষ্ঠ ও প্রস্তর …”

    এইখানে এসে অবনীবাবুর কেমন কেমন লাগলো। কেউ তো ‘লোষ্ট্র’ র মতন কঠিন কথার মানে জানতে চাইল না…

    চোখ খুলে দেখেন একি! ক্লাস তো ফাঁকা! একটাও ছেলে নেই! পেছনের দরজাটা খোলা, সকলে পালিয়েছে। এ কি কাণ্ড। হেড স্যারকে বলে এখুনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সামনের দরজা দিয়ে হনহন করে বেরোতে যাবেন কিন্তু পারলেন না। আবার চেয়ারে বসে পড়লেন! দরজায় একটা জলজ্যান্ত বাঘ দাঁড়িয়ে আছে। দাও ফিরে সে অরণ্য বলাতে অরণ্য ফিরে আসেনি তবে অরণ্যের দূত বাঘ আগেভাগে এসে হাজির… অবনীবাবু টেবিলে মাথা রেখে মুর্ছা গেলেন। এদিকে ইস্কুলে ভীষণ দাপাদাপি শুরু হয়ে গেল। রটে গেল অবনীস্যারকে বাঘে খেয়েছে! কে একজন বলল, “অঙ্কস্যারকে বল বোর্ডে চৌবাচ্ছা খালি হবার অঙ্ক দিতে। বাঘ এক্ষুনি পালাবে।”

    ইস্কুল জায়গাটা বাঘের ভালো লাগেনি। সে ক্লাস ঘর থেকে বেরিয়ে লংজাম্প আর হাইজাম্প মিশিয়ে একখানা লাফ দিয়ে পাঁচিলে চড়ে বসল। তারপর ছাত্র-শিক্ষক সবাই হৈচৈ করে উঠতে সে আর এক লাফে আমবাগানে অদৃশ্য হলো।

    অদৃশ্য মানে তো মানুষের চোখের আড়াল হওয়া। বাঘ তো আছে সেখানেই! মানে আমবাগানের ভেতরেই কোথাও।

    হেডস্যার আর দেরি না করে বনদপ্তরে ফোন করলেন। বনদপ্তরের অফিসার সবে আপিসে এসেছেন, এসেই এ কী ঝামেলা! তিনি বললেন, “অনেকেই ভাম বেড়ালকে বাঘ বলে ভুল করে। আপনি জন্তুটির দুটো ক্লোজ-আপ নেবেন। জন্তুটার ফুট তিনেক কাছে গিয়ে কিন্তু। আর দুটো প্রোফাইল মানে পাশ থেকে তোলা ফটো চাই। সবকিছু পাঠালে আমরা ‘পদক্ষেপ’ নেব। আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর …”

    বিরক্তিতে হেডস্যার ফোন কেটে দিয়ে সোজা জেলা কলেক্টারের নম্বর লাগালেন। কিছুক্ষণ পর কলেক্টর ম্যাডাম বললেন, “বনদপ্তরকে রাজি করাতে দিল্লীতে কথা বলতে হলো। এবারে কয়েকঘণ্টার ভেতর বনবিভাগ কাজে নামবে।”

    দিল্লীতে কথা চলে গেছে দেখে বনবিভাগ নড়েচড়ে বসল। তারা বলল, “জনতা যেন আমবাগান ঘিরে ফেলে। কিন্তু কেউ বাঘের ওপর লাঠিসোটা ঢিল-পাটকেল চালাবে না। বাঘ মরলে সাত আর আহত হলে পাঁচ বছরের হাজত-বাস। মনে থাকে যেন…”

    আমবাগানের চারিদিকে ভিড় জমতে লাগলো। এসে গেল মিডিয়ার লোকজন। একটা বড় সাইজের সবদিক বন্ধ ভ্যানের মতো গাড়ি এল, তার ছাদে আবার একটা বিরাট বড় কড়াই। সরাসরি টিভি সম্প্রচার করার অ্যানটেনা। কিছুক্ষণ পরেই ঝরঝরে পুরোনো লাঙ্গল দেওয়ার ট্র্যাক্টর ঘটর ঘটর করে একটা চাকা লাগানো খাঁচা টানতে টানতে নিয়ে এল। বাঘের খাঁচা। তারপর এল একটা অটোরিক্সা। শিকারি আর তার দুজন শাকরেদ এসেছে। খরচ বাঁচাবার জন্য তারা স্টেশন থেকে ট্যাক্সি নেয়নি। শিকারির নাম খোকা সর্দার। গোলগাল বেঁটে একটি লোক। অবশ্য চেহারায় কী এসে যায়? হয়তো প্রচুর অভিজ্ঞতা আর হাতে টিপ আছে। প্রথম শাকরেদের হাতে একটা বাক্স – ওষুধের বাক্স বলে মনে হলো। আর দুনম্বর শাকরেদের হাতে বন্দুক।

    বন্দুকের চেহারা দেখে সবাই এ হে এ হে করে উঠল। এ বন্দুকে বাঘ মারা হবে? এ তো চড়ক-সংক্রান্তির মেলায় বেলুন ফাটাবার হাওয়া-বন্দুক! পাঁচ-পাঁচটা বেলুন ফাটাতে পারলে দশটাকা ফেরত দেয়। বাঘ আর বেলুন এক হলো?

    শিকারি এবং তার দুজন শাকরেদ কিন্তু ঝটপট কাজে লেগে গেল। বন্দুকের নলের আগায় গুলির বদলে এক অদ্ভুত জিনিস ভরা হলো। ইনজেকশনের সিরিঞ্জ! মিডিয়ার একটি মেয়ে এসে শিকারির সাক্ষাৎকার নেওয়াতে এতক্ষণে ব্যাপারটা বোঝা গেল। সিরিঞ্জের ভেতরে ঘুমের ওষুধ আছে। এ ইনজেকশন বন্দুকের গুলির মতো ঢুকে যাবে বাঘের দেহে। ফলে বাঘ কয়েক মিনিটের ভেতর ঘুমিয়ে পড়বে। তখন তাকে ভরা হবে খাঁচায়। বাঘ মারা বেআইনি কিন্তু অজ্ঞান করা চলতে পারে।

    এদিকে আমবাগানের চারিদিকে ভিড় বাড়ছে। দূরের গাঁ থেকেও লোকে আসতে শুরু করেছে। যাদের মোটর-সাইকেল আছে তারা পুলিস-চেকিঙের খবর না পেলে কোনোদিন হেলমেট পরে না। আজ নিজের নিজের মাথা বাঁচাতে হেলমেট লাগিয়ে এসেছে। বাঘ নাকি মুণ্ডু তাক করে প্রথম লাফটা দেয়। এদিকে মাঠের ধারে ধারে ঝালমুড়ি, নুন-মরিচ মাখানো শশা, আলুকাবলি, ফুচকা বিক্রি শুরু হয়ে গেল। এত লোক জমেছে, ফেরিওয়ালাদের এই তো সুযোগ!

    হেলমেট পরা লোকদের থেকেও বেশি বুদ্ধির পরিচয় দিল সেখানকার ক্রিকেট ক্লাব। তাদের দুজন ওপেনিং ব্যাটসম্যান, পানু আর সানু, প্যাড-গ্লাভস-হেলমেট পরে ব্যাট ঘোরাতে ঘোরাতে হাজির। ব্যাট দিয়ে যদি আত্মরক্ষা না করা যায় তাহলে প্যাড-গ্লাভস ভেদ করে বাঘ কিছু করতে পারবে না। আর প্যাড বা গ্লাভসের রবার, তুলো এসব মুখে গেলে বাঘ ভাববে মানুষ মোটেই ভালো খেতে নয়। বিচ্ছিরি ছিবড়ে ছিবড়ে স্বাদ। এতে বহু মানুষের জীবন রক্ষা পাবে!

    ইস্কুল ফাঁকা। শুধু টীচারস রুমের বড় টেবিলটায় অবনীবাবুকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। কেমিস্ট্রির বিকাশবাবু একগাদা অ্যামোনিয়াম কারবোনেট অবনীবাবুর নাকেমুখে ঠুসে দিয়েছেন। এই বারই তো পরীক্ষায় প্রশ্ন দিয়েছিলেন – স্মেলিং সল্টে কী রাসায়নিক যৌগ থাকে? উত্তর – অ্যামোনিয়াম কারবোনেট। স্মেলিং সল্ট অজ্ঞান মানুষকে ঝাঁঝের চোটে সজ্ঞান করে তোলে। একসময় অবনীবাবু থু থু করতে করতে টেবিলেই উঠে বসলেন। হেডস্যার বললেন, “এখন কীরকম লাগছে অবনী …”

    শরীরে জ্ঞান ফিরলেও অবনীবাবু কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। টেবিলে বাবু হয়ে বসে হাতজোড় করে ছাদের দিকে তাকিয়ে বেসুরো বেতালা গলায় গেয়ে উঠলেন, “তিলেক দাঁড়া ওরে শমন, বদন ভওওওরে মাকে ডাকি…”

    হেডস্যার বুঝলেন অবনীবাবু এখনো বাঘটাকে চোখের সামনে শমন মানে যমরাজ রূপে দেখছেন। জ্ঞান ফিরলেও চেতনা ফেরেনি।


    আমবাগানের মাঠে শিকারি খোকা সর্দার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খাকি জামা-প্যান্ট পরে শিকারি ও তার দুই শাকরেদ রেডি! বন্দুকে গুলির বদলে সিরিঞ্জ ভরার তদারকি হচ্ছে। শাকরেদরা বন্দুকের নলে জিনিসটা ঠিক লাগাতে পারছিল না। খোকা রেগে গিয়ে বলল, “উফ, তোদের দ্বারা একটা কাজও যদি হয়! এত দেরি করলে বাঘ আর খুঁজে পাওয়া যাবে ভেবেছিস?” অধৈর্য হয়ে নিজেই বন্দুকটা ওদের হাত থেকে জোর করে নিতে গিয়ে সে এক কেলেঙ্কারি!

    ইনজেকশনের ছুঁচ প্যাঁক করে শিকারির পেটে ফুটে গেল। “বার কর বার কর” বলে শাকরেদরা ব্যস্ত হয়ে বার করে নিল কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। বাঘকে ঘুম পাড়াবার ওষুধ শিকারির শরীরে ভালোমত ঢুকে গেল!

    শিকারি বিরাট একখানা হাই তুলে বলল, “ওরে, এখন বাঘ বনেই থাক, একটু বরং জিরিয়ে নিই। কেউ একটা বালিশ দিতে পারিস রে…”

    কী হলো কী হলো বলে লোকজন, মিডিয়া সবাই ছুটে এল। শিকারি তখন ঘাসের ওপর শুয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে নাক ডাকছে। এখন তো সাক্ষাৎকার নেওয়া যাবে না – তাই মিডিয়ার রিপোর্টাররা শিকারির মুখের কাছে মাইক্রোফোন ধরল। আজকাল সাউণ্ড-সিসটেম এত উন্নতি করেছে যে নাক ডাকাটাই চমৎকারভাবে সারা দেশে সম্প্রচারিত হয়ে গেল। চ্যানেলে চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে! অনেকে তো আপিস-আদালত কামাই করে টিভি দেখতে বসে গেছে! দারুণ দারুণ সব হেডলাইন! যেমন, ‘বাঘ মারতে শিকারি অজ্ঞান’। এক চ্যানেলের এডিটর বাংলা অনার্সের ছাত্র ছিলেন। সে চ্যানেলে কবি জীবনানন্দের কবিতার লাইন দেখান হচ্ছে বারবার। পাশে ঘাসের ওপর ঘুমন্ত খোকা সর্দারের লাইভ ছবি! ‘এখন মরণ ভালো, শরীরে লাগিয়া রবে এইসব ঘাস …’। আর এক চ্যানেল আবার ছবি আর নাক ডাকার সঙ্গে ছড়া কাটছিল - ‘খোকা ঘুমালো, বাঘ লুকালো…’।

    দিল্লীর কর্তারা তো রেগে আগুন! শিকারি ঘুমিয়ে পড়েছে? কর্তব্যে এত বড় গাফিলতি – শিকারিকে অবিলম্বে সাসপেণ্ড করতে হবে! এবছরের মিটিং তো এই সেদিন হয়ে গেল, সাসপেণ্ড করার প্রস্তাব পেশ করা হোক সামনের বছরের মিটিঙে।

    বাঘ এত কিছু জানে না। জানার দরকারও তার নেই। সে একটা গাঢ় কালচে-সবুজ পাতায় ঢাকা ঝুপসি আমগাছের ভেতরের ডালে চুপ করে বসে আছে। দু-পেয়েদের চেঁচামেচি কানে আসছে কিন্তু সে জানে রাত্তির হলে এরা ফিরে যাবে। রাত্রি কখন হবে? বাঘেরা ঘড়ি কাকে বলে জানে না কিন্তু আকাশে লাল-হলদে রঙের ছটা, পাখিদের বাসায় ফেরা আর গাছের ছায়া লম্বা হয়ে আসা দেখে তারা বুঝতে পারে বেলা শেষ, এবার রাত্তির আসছে।

    লোকালয় বলে এখানের রাস্তায় দিনের বেলায় বড় বড় ট্রাক চলা মানা। রাত্তিরে লোকজন, গাড়িঘোড়া কমলে তখন ট্রাক চলাচল শুরু হয়। বাঘ গাছ থেকেই টের পেল রাস্তার দিক থেকে অন্য রকমের শব্দ আসছে। এ শব্দ তার চেনা। যখন এসেছিল তখন এরকম শব্দই তো পেয়েছিল।

    বাঘ আমগাছ থেকে চুপিসাড়ে নেমে এল। তারপর ট্রাকের আওয়াজ লক্ষ্য করে পৌঁছে গেল রাস্তার দিকটায়। একটা গাছে উঠে অপেক্ষা করতে লাগল – আগের বার চৌকো চলমান বাক্সে সে পড়ে গিয়েছিল ভাগ্যক্রমে। এবার বাঘ লাফ মারল বুঝেসুঝে। ধপ। পড়ল একটা চলমান ট্রাকের ডালায় – ট্রাকে ছিল চালের বস্তা। বাঘ দেখল এবারেরটা সেরকম নরম নয়। তবু মানানসই। অসুবিধে হচ্ছে না।

    আকাশে বাঁকা চাদ উঠেছে। শিরশিরে বাতাসের ঝাপটা আসছে আর গাছপালাগুলো সব হুসহুস করে পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে। আজও একবার বাঘ তার পায়ের দিকে তাকালো – না সে নিজে তো দৌড়চ্ছে না! এই আজব বাক্সই তাকে নিয়ে চলেছে।

    কিন্তু কোথায়? বাঘ তা জানে না। অতকিছু না ভেবে সে বস্তার খাঁজে মাথা রেখে আরাম করে শুয়ে পড়ল। চোখ বুঁজে ভাবতে লাগলো দু-পেয়েদের দেশে কী যে সব দেখল! নাঃ, তার একটুও ভালো লাগেনি। ভোরের দিকে সে আবার ঘন ডালপালা দেখতে পেলেই বনজঙ্গলে নেমে পড়বে। বাঘেরা কথা বলতে জানে না, তাদের ভাষাও নেই। কিন্তু মনের ভাব তো আছে। যদি তারা কথা বলতে পারতো তাহলে বাঘ এখন ঠিক বাংলাস্যার অবনীবাবুর মত বলত: “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর…”



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments