




সৌমিতা: জুন ২০১২
এগারো ক্লাসে উঠেছি। ইস্কুলের টেন-ইলেভেনের সেকশনগুলোর মধ্যে দেয়াল পত্রিকার প্রতিযোগিতা হয়। প্রাইজ থাকে। গরমের ছুটির শেষে পত্রিকা বার হবে তাই সময় বেশি নেই। আমাদের বসার ঘরটা বড় বলে পত্রিকার ‘আপিস’ ওখানেই। পাঁচ-ছজন এসেছে – অত্রির হাতের লেখা ভালো, লেখার কাজটা ও করছে। প্রীতি দারুণ আঁকে, ওর কাজ অনেক। সারা মেঝেতে আর্ট পেপার, নানা রঙের স্কেচ পেন, কাঁচি, আঠা, সেলো টেপ, পেনসিল, রবার সব ছড়ানো। সকলেই কিছু-না-কিছু করছে এক দীপ্তেশ ছাড়া। ছেলেটা কিচ্ছু করতে চায় না। বলে তোরা কর, আমি পরিচালক।
তবে কে জানে কেন, দীপ্তেশ না এলে আমার ভালো লাগে না। মনে হয় ও সবার আগে এসে অনেকক্ষণ থাকুক। ঠারে ঠারে বুঝি, ও আমার আশেপাশেই থাকতে চায়। একদিন বলেছিল, “চল, লুকিয়ে লুকিয়ে সিনেমা দেখে আসি!” বলেছিলাম, “পাজি ছেলে, তোর বাড়িতে বলে দেব!”
কী একটা করছিলাম, দীপ্তেশ আমার কাছে এসে বসল। তারপর একটা কাগজে আঠা লাগিয়ে আমার হাতে ফট করে সেঁটে দিল। লিখেছে – আই লাভ ইউ। নিচে একটা লালরঙা পানপাতাও এঁকেছে! আমি সঙ্গে সঙ্গে কাগজটা টেনে ছাড়িয়ে নিলাম, আঠা ছিল বলে হাতটা চিনচিন করছিল। আমার কিন্তু রাগও হলো না, বিরক্তিও না। কীরকম যেন একটা মনে হলো, লিখে ঠিক বোঝাতে পারব না। ওর কানটা মুলে দিয়ে বললাম, “যাহ, ওদিকে যা।”
ঠিক এই সময় বাবা ঘরে ঢুকে বললেন, “ফোনের চার্জারটা দেখেছিস রে তোরা, এখানে রেখেছি কি!”
এই রে! কাগজটা দলা পাকিয়ে টেবিলে রাখা নীল চিনেমাটির ফুলদানিটায় চালান করে দিলাম।
অত্রি আড়চোখে দেখে বলল, “কী শুরু করেছিস তোরা, মাসীমাকে বলব?”
দীপ্তেশ বলল, “যা বলে আয় – অনেকক্ষণ কাজ করছি, বিস্কুট আর সন্দেশ চাই।”
দীপ্তেশটা ওরকমই।
***
দীপ্তেশ: মার্চ ২০২৫
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেখলাম ইস্কুলের বন্ধুদের গেট-টুগেদার হচ্ছে। ইস্কুল ছেড়েছি সেই কোন কালে! গত বছর বিয়ে করেছি। সৌমিতার অবশ্য বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন, তবে ওদের সেই বাড়িতেই হবে। মেয়েটাকে খুব খুব ভালো লাগত – কিন্তু অত কম বয়েসের ভালো লাগার কি কোনো মানে থাকে? তা জানি না তবে সৌমিতাকে দেখার একটা তীব্র ইচ্ছে আমাকে যেন ভেতর থেকে নাড়াতে লাগল।
বৌকে বললাম, “যাবে তো?”
“নিশ্চয়ই, তোমার গার্লফ্রেন্ডদের দেখব না!”
বৌ খোলাখুলি ধরনের। ওরও অনেক বয়ফ্রেন্ড।
গিয়ে দেখলাম ন-দশজন এসেছে। এই অনেক, কলেজের পর কে কোথায় চলে যায়।
ইস্কুলের পর সৌমিতাকে দু-একবারই দেখেছি, সেও হয়ে গেছে অনেক দিন। আজ ঢাকাই শাড়িতে ভারিক্কি ভারিক্কি লাগছে, চার বছরের ছেলে সামলে সব আয়োজন সৌমিতাই করছে। ওর মা-বাবা এসে কথা বলে গেলেন। সৌমিতার বর আসবে একটু পরে।
দারুণ আড্ডা জমল। আমি কিন্তু প্রথমেই লক্ষ করেছি নীল ফুলদানিটা টেবিলেই রয়েছে। সৌমিতার কাছে গিয়ে জিগেস করলাম, “সেই ফুলদানিটা?”
“হ্যাঁ রে, সেটাই। পুরোনো হয়ে গেছে।”
ফাঁক পেয়ে হেসে বললাম. “কি রে মনে আছে? কাগজটা ফেলে দিয়েছিলি তো!”
“তুই দুষ্টুমি করে কাগজে আঠা লাগিয়ে দিয়েছিলি যে…”
“তো?”
সৌমিতা আঁচল গুছিয়ে চোখ নিচু করে আস্তে আস্তে বলল, “ভেতরে আটকে আছে রে, ও আর বেরোবে না।”
সৌমিতা ওদিকে চলে গেল।
নীল রং দেখলে কি এমন মন কেমন করে ওঠে! ফুলদানিটা ধরতে যাচ্ছিলাম – আঙুল ঠেকতেই মনে হলো ওটার ভেতরে গোঁজা রয়েছে অদৃশ্য এক ফুলের স্তবক। তার পাপড়িগুলো কী যে মায়াময়, কী যে কোমল! চকিতে হাত সরিয়ে নিলাম। আমি জানি ফুলদানিটা ধরতে গেলে ফুলগুলো বিচ্ছিরি ভাবে ঝরে পড়ে যাবে।